#বৈরিতার_আড়ালে|০২|
#সিনথিয়া_ইসলাম_সীমা
#ছোটগল্প
*********
জামা কাপড়ের ছোট্ট ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে সোজা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছি। এতো অপমানের পর এই বাড়িতে থাকার কোনো প্রশ্নই উঠে না। এমনিতেই তখনকার সেই অপমান, সাথে এই মাত্র লোকটা আমাকে যেভাবে কথা শুনিয়ে গেল এতে গা পুরো জ্বলে যাচ্ছে। ভেবেছিলাম নাচতে নাচতে উনার ঘুমের বারোটা বাজিয়ে ছাড়ব আজ। কিন্তু হলো উল্টোটা! নাচার মধ্যেই উনার রাম ধমক খেয়ে রাত্রি দরজা খুলতে বাধ্য হয়। দরজা খুলতেই তিনি বাহির থেকেই রাত্রির মাধ্যমে ইন্ডিরেক্টলি আমাকে ধুয়ে দিয়ে গেলেন। আমাকে জবাব দেয়ার সুযোগটুকুও দিলেন না। আর সেটাই আমার মাথায় আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। অপমানের জবাব দিতে না পাড়ার অনুভূতি টা যে কি– কীভাবে বুঝাব আপনাদের!
এখন আমি এখানে থাকলেই বিপদ। আমার দ্বারা কি থেকে কি হয়ে যাবে আমি নিজেও জানি না। আচ্ছা লোকটা কোন অধিকারে আমাকে এতগুলো কথা বলল? আমি নাকি ম্যানার্সলেস? আমার নাকি শিক্ষার অভাব আছে?
মানে যা পেরেছে তাই বলে গিয়েছে। আমাকে কিছু বলারও সুযোগ দেয়নি এর আগেই উধাও। অথচ নিজের যদি এতোই ম্যানার্স থাকে তাহলে একজন মেহমানের সাথে কেউ এভাবে আচরণ করে?
মানলাম, আমরা একটু হইহুল্লোড় করেছি। কিন্তু বিয়েবাড়িতে এটা কি অস্বাভাবিক? এমনিতেই এই বিয়েতে কোনো ডিজে নেই, গানবাজনা নেই, নাচানাচি নেই। তাই ভাবলাম, নিজের নিজেরাই একটু এনজয় করি।
আর কথা রইল বিয়ারের…
ওটা তো শখের বশে জীবনে প্রথমবার এনেছিলাম। তাও কত কষ্ট করে! রাত্রির ছোট ভাই তথা আমাদেরই ক্লাসমেট ইরহামকে দিয়ে গোপন মিশনের মতো জোগাড় করিয়েছিলাম। বেচারার উপর দিয়ে হয়তো এতক্ষণে টর্নেডো বইয়ে দিয়েছে লোকটা।
আসলে সিনেমায় মানুষজন যখন ড্রিংক করে উল্টাপাল্টা মাতলামি করে, তখন দেখতে বেশ মজাই লাগে। সেই থেকেই আমাদের মাথায় ভূত চাপল—জীবনে একবার ট্রাই করে দেখা যাক না!
কিন্তু দুঃখের বিষয়, বোতলের মুখটাও খুলতে পারিনি এর আগেই যমদূতের মতো হাজির হলো ইশতিয়াক খান ইরাজ!
ভেবেছিলাম মুভিটা শেষ করে চিল মুডে শখের জিনিসটা ট্রাই করব। সেটা আর হয়ে ওঠেনি।
তার আগেই পুরো বোতলটা আমার মাথায় উৎসর্গ করে দিলেন সেই মহামান্য ব্যক্তি!
থাক গে! এসব না খাওয়াই ভালো!
আমি গটগট করে দরজার দিকে এগোতেই রাত্রি দৌড়ে এসে আমার ব্যাগটা টেনে ধরল।
“ এই মার্জি! ভালো হচ্ছে না কিন্তু! এতো রাতে কোথায় যাচ্ছিস তুই? ”
“ বাড়ি। ”
“ দেখ, এখন তুই আমার হাতে মার খাবি কিন্তু! তুই কার জন্য এখানে এসেছিস? "
“ যার জন্যই এসেছি! এই মুহূর্তে আমার পক্ষে এখানে থাকা ইম্পসিবল। ”
রাত্রি ব্যাগটা আরও শক্ত করে ধরে ফেলল।
“ দোস্ত প্লিজ! দুদিন পর আমার বিয়ে। তুই এখন চলে গেলে সবাই কী বলবে? ”
“ যা খুশি বলুক। আমার কিছু যায় আসে না। ”
এবার রাত্রির খালাতো বোন তানহাও এগিয়ে এল।
“ আরে, এত রাগ করিস না। ইরাজ ভাইয়ার স্বভাবই এমন। ”
“ উনার স্বভাব নিয়ে গবেষণা করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। ব্যাগটা ছাড়ো আপু! আমি বিয়ের দিন আম্মু- আব্বুদের সাথে আসব। এখন বাসায় যাব! ”
কথা শেষ করেই ব্যাগটা টান দিতে গেলাম। কিন্তু এবার রাত্রি একা নয়, আরও দুজন অর্থাৎ তানহা আপু ও রাহি মিলে আমাকে ঘিরে ধরল।
“ তুই এক পা এগিয়ে দেখা শালি! ”
“ দেখে মেজাজ খারাপ হচ্ছে কিন্তু! ”
“ তোর মেজাজ ভালো থাকে কবে শুনি? ”
“ রাত্রি, ভালোভাবে বলছি, ব্যাগটা ছাড়। ”
রাত্রি এবার প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
“ তুই যদি আজ চলে যাস, আমি বিয়ের করব না বলে দিলাম! ভাইয়ার জন্য আমার বিয়ের আনন্দটাই নষ্ট করে দিবি? ”
কথাটা শুনে খানিকটা সরু চোখে ওর দিকে তাকালাম আমি! রাগ এখনও কমেনি। কিন্তু রাত্রির চোখের দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলাম।
“ ডায়লগ মারছিস? ”
বাক্য টুকু শেষ করতে না করতেই ধুম করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল মেয়েটা আমার বাহুতে।
“ ডায়লগ না, সিরিয়াসলি বলছি! ”
একটু থেমে,
“ দেখ, মাত্র দুটো দিন। শুধু আমার জন্য থেকে যা। ”
আমি বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
“ তোর ভাইয়ার মুখ যেন এই দুদিন আর আমাকে দেখতে না হয়। ”
রাত্রি সঙ্গে সঙ্গে হেসে ফেলল।
“ ওটার গ্যারান্টি দিতে পারছি না... তবে চেষ্টা করব। ”
আমি চোখ রাঙিয়ে বললাম,
“ চেষ্টা না, ব্যবস্থা কর! ”
“ আচ্ছা বাবা, এখন ব্যাগটা নামা। ”
আমি অনিচ্ছাসত্ত্বেও ব্যাগটা বিছানার ওপর ছুড়ে ফেললাম। ওরা আমার সাথে কিছুক্ষণ গল্প করে মাইন্ড ফ্রেশ করল। অতঃপর আমার চারজন একসাথে ঘুমিয়ে পড়লাম।
********************
সেদিনটা আমার যতটাই বিরক্তিকর আর অসহ্য কেটেছিল এর পরের দিনগুলো ঠিক ততটাই শান্তিতে কাটিয়েছি আমি! কথাটা শুনলে প্রথমে অবাক হবেন যে– এক বাড়িতে থেকেও ঐ লোকটার সাথে আর দেখা হয়নি আমার! উনি বিয়ের কাজে বেশিরভাগ সময়ই বাড়ির বাইরে থাকতেন। আর আমি? আরামে,আয়েশে, ফুর্তিতে বাড়ির সবার সাথে– একেবারে বিন্দাস লাইফ কাটিয়েছি। এবার আজকের দিনটাও কোনোরূপ ঝামেলা ছাড়া কেটে গেলেই হয়।
অবশেষে এসে গেল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আজ আমার জানেরজিগার, ঝামেলার বন্দুকের ট্রিগার—অর্থাৎ আমার পরানের বান্ধবী রাত্রির বিয়ে।
বিয়েতে তেমন কোনো জাঁকজমক পূর্ণ আয়োজন করা হয়নি। শুনেছি আংকেল নাকি বড় করেই অনুষ্ঠান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাঁধা দিয়েছেন ঐ বদ লোকটা। তার নাকি এসব পছন্দ না! তাই কেবল বর পক্ষ ও গুটি কয়েক নিকট আত্মীয়ের জন্য সাধারণ ভাবেই সবকিছুর বন্দোবস্ত করা হয়েছে।
অনুষ্ঠান যেমনি হোক না কেন? আংকেল কে পটিয়ে আমরা মেয়েরা সবাই, একটা জব্বর বিয়ের গেইট করিয়েছি। কেনোনা এখানে আমাদের একটা বড় পাওনা রয়েছে। আর সেটা মোটেও ছাড় দেয়া যাবে না।
আপাতত সেই পাওনার জন্যই আমরা সব মেয়েরা গেইটে হালকা তর্ক বিতর্ক করছিলাম। যদিও সেটা ছিল নিছকই দুষ্টুমির ঝগড়া। কিন্তু এর মধ্যেও একটা ঝামেলা পাকিয়ে দিলেন ঐ লোকটা(ইরাজ)। আমাদের কথা কথাবার্তার মাঝেই সেখানে উপস্থিত হয়ে তানহা আপু আর ইরহামকে সাইডে ডেকে নিয়ে উনি কি যে বললেন আল্লাহ মালুম! এরপরেই ওরা দুজন গোমড়া মুখে ফিরে এসে বর পক্ষ যেই টাকা দিয়েছিল সেটুকুও না নিয়ে তাদের ছেড়ে দিলেন!
আমিতো পুরো হা হয়ে ছিলাম। কিছুক্ষণ ওদের দিক আহাম্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে পরমুহূর্তেই আসল ঘটনা আন্দাজ করতে পারলাম। ওমনিই মেজাজ চওড়া হলো। লোকটার চলে যাওয়ার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকালাম, যেন চোখ দিয়েই মানুষ পোড়ানো সম্ভব হলে এতক্ষণে উনার পাঞ্জাবিটা ছাই হয়ে যেত।
এর মাঝেই পাশ দিয়ে একটা ছোট্ট বাচ্চা হাতে দই নিয়ে যাচ্ছিল। আমি এক সেকেন্ডও চিন্তা না করে টুপ করে দইটা কেড়ে নিয়ে ধুপ করে ছুড়ে মারলাম উনার দিকে। কিন্তু আফসোস! আমার নিশানা দেখে রাস্তার পাশের ছোট বাচ্চা কাচ্চা রাও আমাকে ক্রিকেট দলে নেবে না।
দইটা গিয়ে আগে মাটিতেই আছড়ে পড়ল। তবে সান্ত্বনার বিষয়, সেখান থেকে ছিটকে ওঠা কয়েক ফোঁটা দই ঠিকই গিয়ে উনার পাঞ্জাবিতে লেগে বসল। উনি তৎক্ষনাৎ থেমে গেলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে চাওয়ার আগেই আমি অন্য পাশে ফিরে কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। দেখে বুঝার উপায় নেই যে আমার দ্বারা এরকম একটা কাজ সম্পাদন হয়েছে।
পরিবেশ স্বাভাবিক, লোকটা বোধ হয় চলে গিয়েছেন। আমি ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। উনাকে না দেখে স্বস্তির একটা শ্বাস নিতে যাব–
ঠিকতখনি দেখলাম সেই ছোট্ট বাচ্চা টা ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে তার মাকে নিয়ে আমার দিকেই এগোচ্ছে!
“ এইযে এই আপুটা আমার দই নিয়ে গিয়েছে! ”
আমারতো মাথায় হাত! যাহ শালা, জিন্দেগি তে এমন সিনারিও দেখার বাকি ছিল? রাহি পাশ থেকে ফিসফিস করে বলল,
“ কিরে তুই এই অকাজ করলি কখন? ”
“ কথা না বলে তাড়াতাড়ি একটা দই নিয়ে আয়। নয়তো আমার মান ইজ্জত নিয়া আজ দই ভাত খাবে মানুষ! ”
ও তৎক্ষনাৎ হাত ঝাড়া দিয়ে বলল,
“ তোরটা তুই নিয়ে আয় গিয়ে আমি পারব না। যাহ ভাগ! ”
বিপদের সময় বুঝা যায় এই বন্ধুবান্ধব কত বড় পল্টিবাজ। থাক এখন এসব বলে লাভ নেই। আগে এই ঝামেলা থেকে মুক্ত হই তারপর সব।
আমি তৎক্ষনাৎ বাড়ির ভিতরে ঢুকে একটা দই নিয়ে ফিরে আসছিলাম। পথিমধ্যেই একটা ছেলে আমার দইয়ের কাপ থেকে এক চামচ দই খেয়ে ফেলল। আমি তাড়াহুড়ো থাকায় প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে পারলাম না। পরমুহূর্তেই ছেলেটার মুখের দিক তাকিয়ে ভ্রূ কুঁচকে ফেললাম। এটা তো ইরাজ খানের বন্ধু। কিছুক্ষণ আগেও তাদের একসাথে দেখেছিলাম আমি। আমার বিগড়ানো মেজাজটা এবার আরো বিগড়ে গেল। ছেলেটা হাসিমুখে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল।
আমি তাকে সেই সুযোগটুকু না দিয়েই পুরো দইটা তার হাতে ধরিয়ে দিলাম।
“ নিন! যেহেতু শুরু করেছেন, এখন পুরোটাই গিলে ফেলুন। নাদান লোক কোথাকার!”
খিটখিটে মেজাজে কথাটা বলেই আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালাম না। তার মুখের এক্সপ্রেশন দেখারও প্রয়োজন বোধ করলাম না।
আবার ভেতরে গিয়ে এবার একসঙ্গে দুটো দই নিয়ে বের হলাম। ভাবলাম, একটা যদি আবার কোনো নাদান লোকের পেটে যায়, অন্তত আরেকটা হাতে থাকবে!
এইদিকে খানিক টা অদূর হতে আমাকে একের পর এক দই নিতে দেখে, আমার দিকে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন ইরাজ। আর আমি উনার পাঞ্জাবির দিক তাকিয়ে রইলাম। চেঞ্জ করা পাঞ্জাবিটা দেখে এমন ঝামেলার মধ্যেও ফিক করে হেসে উঠলাম।
************
সব ঝামেলা শেষ করে প্রায় সন্ধ্যার দিকে বান্ধবীকে বিদায় দিয়ে পরিবারের সঙ্গে বাসায় ফিরে এলাম। ওদের বাড়ির সবাই অনেক করে থাকার জন্য বলছিল, কিন্তু আব্বু রাজি হলেন না। অবশ্য আমার নিজেরও আর থাকার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না।
বাড়িতে ফিরেই এমন একটা ঘুম দিলাম, মনে হচ্ছিল কয়েক বছরের ঘুম একসঙ্গে পুষিয়ে নিচ্ছি।
ঘুম ভাঙতেই অদ্ভুত একটা শূন্যতা এসে ভর করল মনজুড়ে।
রাত্রির কথা বারবার মনে পড়ছিল।
আজ সকাল পর্যন্ত যে মেয়েটা আমার পাশে দাঁড়িয়ে হাসছিল, ঝগড়া করছিল, আমাকে ধরে বসিয়ে রাখছিল—সে এখন সম্পূর্ণ অন্য একটা বাড়ির মানুষ।
ভাবতেই কেমন যেন বুকের ভেতরটা হালকা মোচড় দিয়ে উঠল।
জানি, বিয়ে প্রত্যেকটা মেয়ের জীবনেই একদিন আসে। তবু নিজের পরিচিত ঘর, বাবা-মা, ভাইবোন, শৈশবের স্মৃতি—সবকিছু ছেড়ে একেবারে নতুন একটা পরিবেশে গিয়ে মানিয়ে নেওয়ার ব্যাপারটা ভাবলেই আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।
আর এই একটা কারণেই বিয়ে জিনিসটাকে আমি ভীষণ ভয় পাই।
ভাগ্যিস এখন আমার পরিবারের বিয়ে নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই। সেই সুবাদে একটু নিশ্চিন্তে থাকতে পারছি। দিনকাল সবসময়ের মতোই বাঁদরামি করে কাটাতে লাগলাম। এমনিতেই উচ্চ মাধ্যমিক বোর্ড পরীক্ষা দিয়ে ছুটিতে আছি, পড়ালেখার চাপ ও নেই মনে হচ্ছে জীবনে শুধু সুখ আর সুখ!
কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন টিকল না। হঠাৎ করেই একদিন আমার বাবা আমাকে ডেকে নিয়ে বিয়ের কথা বললেন। তাও পাত্রের জায়গায় এমন একটা নাম শুনলাম যে আমার পুরো পৃথিবী থমকে গেল।
ইশতিয়াক খান ইরাজ!
এই একটা নামই আমার জীবনের সকল সুখে কাল হয়ে নেমে আসলো!
চলবে….