ফন্ট সাইজ:
থিম:
বৈরিতার আড়ালে

৩য় পর্ব

লেখক: সিনথিয়া ইসলাম সীমা

#বৈরিতার_আড়ালে|০৩|

#সিনথিয়া_ইসলাম_সীমা
***********
নিজের চির শত্রুকে বিয়ে করব না বলে আজ সারাটা দিন না খেয়ে আছি! 
এই না, ভুল বললাম! কথাটা “না খেয়ে ” হবে না বরং ভাত না খেয়ে আছি। ভাত ছাড়া ঘরে যা কিছু আছে সবকিছুই কুরকুর করে খেয়ে যাচ্ছি। 
গতকাল রাতে বাবা যখন বিয়ের কথা বলেছিলেন তখন উত্তরে কিছুই বলতে পারিনি আমি। আমার যত উড়নচণ্ডী স্বভাব– সব এই একজন মানুষের কাছে এসেই হারিয়ে যায়। আসলে বাবা প্রবাসে থাকেন তো তাই বাবার সাথে সম্পর্ক টা অতোটাও গভীর নয় যে, ঠুস ঠাস কিছু বলে ফেলব। 
আমাকে চুপ থাকতে দেখে বাবা বলেছিলেন পরে ভেবে চিন্তে মতামত জানাতে।
হাহ! আমার আবার ঐ লোককে নিয়ে কিসের চিন্তা ভাবনা? আমি তৎক্ষনাৎ আম্মুর কাছে এসে বিয়ের ব্যাপারে অমত পোষণ করে দিয়েছিলাম। একেবারে কড়া নিষেধাজ্ঞা যাকে বলে। তবে ভদ্র মহিলা আমাকে এক ইঞ্চি পাত্তাও দেয়নি। উল্টো আমাকেই বুঝ দিতে লাগলেন! 
শেষ মেষ মায়ের সাথে কথা কাটাকাটি করে গাল ফুলিয়ে বসে আছি। না কথা বলছি, আর নাতো খাবার খেতে ডাকলে খেতে যাচ্ছি। এভাবেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। এর মাঝে আম্মু এসে অনেকবার এসে ডেকে গিয়েছেন তবে বিয়ের ব্যাপারে তার মত পাল্টায়নি বলে আমিও নিজের জেদ ছাড়িনি। পেটের ইঁদুর তখন বুলেটের বেগে দৌড়াচ্ছে। আমি বিছানায় পেট চেপে শুয়ে রইলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই তলিয়ে গেলাম ক্লান্তির ঘুমে। সেই ঘুম ভাঙল বাবার ডাকে। চোখ খুলে দেখি, চারপাশে রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে।
বাবা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ধীর গলায় বললেন,
“ মুখ ধুয়ে খাবার খেতে এসো।”
আমি ঘুমঘুম চোখে ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালাম। বাবা চলে যেতে গিয়েও আবার ফিরে তাকালেন।
“ দ্বিতীয়বার যেন আর ডাক দিতে না হয়। তাড়াতাড়ি এসো।”
“ আসছি।” 
বোঝা গেল, আমার এই জেদ আর বেশিক্ষণ টিকবে না।
অবশ্য বাবা ঘরে ছিলেন না বলেই এতক্ষণ নিজের জেদ ধরে রাখতে পেরেছি। আমাদের বিল্ডিংয়ের কাজ চলায় তিনি সারাক্ষণ সেখানেই ব্যস্ত ছিলেন। 
***********
ফ্রেশ হয়ে এসে, ছোট বোনের পাশে খাবার টেবিলে বসে পড়লাম। সবাই তখন চুপচাপ খাবার খাচ্ছে। আমিও কোনোরূপ কথাবার্তা হীন খাওয়ায় মনযোগ দিলাম। প্লেটের খাবার প্রায় শেষের দিকে আসতেই শুনতে পেলাম বাবার গলা, 
“ শুনলাম তুমি নাকি বিয়েতে রাজি না? ” 
আমি মুখের খাবার টুকু ধীরে সুস্থে গলাধঃকরণ করলাম। অতঃপর রয়ে সয়ে উত্তর দিলাম, 
“ জ্বি..” 
বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে ফের জিজ্ঞেস করলেন,
“ কারণ কী?”
আমি উত্তর দেওয়ার আগেই মা কথার মাঝে ঢুকে পড়লেন।
“ আপনি ওকে কেন এসব জিজ্ঞেস করছেন? এই মেয়ে কিছু বুঝে? ওর সিদ্ধান্ত শুনলে তো…”
“ হাসনা, ওকে বলতে দাও। ”
বাবার শান্ত গলায় মা থেমে গেলেন। এবার তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ বলো মার্জিয়া। কেন রাজি না? ”
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। কীভাবে বলব সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। শেষমেশ ধীরে ধীরে বললাম,
“ আসলে. আমার উনাকে আমি পছন্দ না।”
উত্তর শুনে বাবা ভ্রূ কুঁচকে ফেললেন। 
“ ইরাজকে তোমার পছন্দ না..? ” 
“ উহু! ” 
“ অন্য কোনো পছন্দ আছে? ” 
“ না তেমন কিছু না। ” 
“ শুনুন মারিয়ামের(আমার বড় আপু)বাপ, আপনি এই মেয়ের কথা আপনি কানে নিবেন না। ওর কাছে পৃথিবীর অর্ধেক মানুষই অপছন্দ! শুধু ওর মতো যে কয়টা পাগল আছে সেগুলোই ওর পছন্দ। আজকাল ইরাজের মতো ছেলে হয় নাকি! ” 
“ হ্যাঁ, উনার মতো অসভ্য আর একঘেঁয়ে লোক আসলেই হয়না! জাস্ট বিরক্তিকর! ” 
মনে মনে বিড়বিড় করলাম আমি।
বাবা চুপ করে রইলেন। তবে মুখের ভাব দেখে বোঝা গেল, তিনি আমাদের দুজনের কথাই মন দিয়ে শুনছেন। আম্মু সুযোগ পেয়ে আবার শুরু করলেন,
“ আর সবচেয়ে বড় কথা— পুরো এলাকাবাসী ওকে ইরাজের বউ হিসেবেই চিনে। দুষ্টামি করে হলেও সবার মাঝে একটা অন্যরকম চিন্তা আছে ওদের নিয়ে। কেউ কেউ মনে করে ওদের দুজনের গোপনে সম্পর্কও আছে। ” 
শেষ কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আমি কেশে উঠলাম। 
“ আম্মু! এসব কি বলছো তুমি? ” 
“ কি আবার? আমাকে আজ পর্যন্ত কতজন জিজ্ঞেস করেছে—‘ভাবি, মার্জিয়া আর ইরাজের বিয়ে কবে?’ আমি যতই বলি এমন কিছু না, কেউ বিশ্বাসই করতে চায় না। সবাই মনে করে ওদের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। ”
“ মানুষের তো আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই তাই এসব ভাবে! উনাদের কি কখনো বলা হয়েছে আমাদের বিয়ে ঠিক? নিজেরাই আমাকে ভ্যাঙায় আবার নিজেরাই গুজব ছড়ায়! ” 
“ এখন এসব বলে লাভ নেই! ” 
“ দেখো আম্মু…” 
বাক্যের মাঝপথেই বাবা বলে উঠলেন,
“ মার্জিয়া আমার মনে হচ্ছে তোমার এই বিষয়ে আরেকটু ভাবা উচিত। তোমার আম্মু যা বলেছে ভুল বলেনি। ” 
একটু থেমে বললেন, 
“ আর একটা কথা, আমরা যদি ইরাজকে তোমার জন্য উপযুক্ত মনে না করতাম, তাহলে কখনোই এই প্রস্তাবে রাজি হতাম না। ”
আমি আর কোনো উত্তর খুঁজে পেলাম না।
বাবা খাবার শেষ করে উঠে গেলেন।
আর উনি চলে যেতেই বুকের ভেতর জমে থাকা রাগটা আবার মাথা তুলল।
চোখের কোণে পানি জমে গেল।
আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বললাম,
“আমি উনাকে কিছুতেই বিয়ে করব না।”
বলেই গটগট করে নিজের ঘরের দিকে চলে এলাম।
********** 
খান বাড়ি।
বসার ঘরের নরম আলোয় পুরো পরিবেশটা বেশ শান্ত। সোফায় মুখোমুখি বসে আছেন ইসরাইল খান এবং তার বড় ছেলে ইশতিয়াক খান ইরাজ। দুজনের মাঝখানে রাখা টেবিলের ওপর ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। কিন্তু কারো সেদিকে মন নেই।
ইসরাইল খান কিছুক্ষণ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
“ এখন তোমার মতামত এটাই যে তুমি মার্জিয়া কে বিয়ে করবে না? ” 
“ হুম, আমি ঐ মেয়েকে বিয়ে করতে পারব না। 
“ এখন কেন বিয়ে করতে পারবে না? ছোট বেলা তো সব জায়গায় মেয়েটাকে নিজের বউ বলে বেড়াতে। সারাক্ষন ওকেই বিয়ে করার কথা বলতে! 
“ ছোট বেলার কথা কেন ধরা হচ্ছে! তখন আমার বুঝটাই ছিল কতটুকু? আর তখন ঐ মেয়ের চঞ্চলতা আমার ভালো লাগতো এখন বিরক্ত লাগে। এরকম চঞ্চল আর বেয়াদব মেয়ে আর যাই হোক বউ হওয়ার যোগ্য নয়! ” 
“ আমি তো আজ অব্দি ওর মধ্যে কোনো বেয়াদবি দেখিনি? হ্যাঁ একটু চঞ্চল- কিন্তু এটাতো স্বাভাবিক। আমাদের রাত্রিও তো ওর মতোই। ” 
“ রাত্রি আর ও আলাদা। ওর মাঝে কোনো মানার্সই নেই। ” 
ভদ্রলোক কয়েক মুহূর্ত নীরবে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“ তুমি কি জানো, আশেপাশের সবাই জানে তোমাদের বিয়ে ঠিক?”
ইরাজ চুপ করে রইল। 
“ আর মার্জিয়াকে এখনো সবাই তোমার বউ বলেই ডাকে। যেটা অন্য কেউ না, তুমি নিজেই সবার মাঝে ছড়িয়ে ছিলে ”
ইরাজের মুখের ভাব কিছুটা বদলে গেল। কিয়ৎক্ষণ নীরব রইল সে। পরপর নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে উঠে দাঁড়াল। 
“ এতো কিছু জানিনা আমি! আমার পক্ষে ঐ মেয়েকে বিয়ে করা সম্ভব নয়। ” 
কথাটুকু বলে আর এক মুহুর্তও দাঁড়াল না সে। রওনা হলো নিজ কক্ষে। 
******** 
মত অমতের এই খেলা চলল প্রায় এক সপ্তাহ। কখনো আমার পক্ষ থেকে বিয়েতে অস্বীকৃতি, আবার কখনো উনার পক্ষ থেকেও স্পষ্ট অনিচ্ছা– দুই দিক থেকেই যেন একই জেদ। 
কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুই পরিবারের সদস্যদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হলো। আমরা আর নিজেদের জেদে অটল থাকতে পারলাম না।
রাত্রির থেকে শুনেছিলাম, উনিও নাকি এই বিয়েতে রাজি ছিলেন না। কথাটা শুনে যে আমার কী ভীষণ ভালো লেগেছিল! জীবনে এই প্রথমবারের মতো উনার একটা কাজ আমার পছন্দ হলো।
অবশ্য তাতে হয়েই বা লাভ কী? বিয়েটা তো আর আটকাতে পারলেন না! আকাইম্মা লোক একটা!
আগামী শুক্রবার আমাদের বিয়ে। মানে আর মাত্র দুটো দিন বাকি।
এই কয়েকটা দিন আমার কেমন কেটেছে, সেটা শুধু আমিই জানি। কখনো পরিবারের সবার সাথে জেদ দেখাচ্ছি, আবার কখনো নিজের ঘরে বসে লুকিয়ে লুকিয়ে চোখের পানি ফেলছি। 
তবে একটা বিষয় জানলে হয়তো আপনারা টাস্কি খাবেন—এতসব ঝামেলা, রাগ, অভিমান আর কান্নার মাঝেও আমি নিজের একটা স্বপ্নের কথা ভুলিনি। ভুলবই বা কেন? বিয়ে তো একবারই হবে। সেটা যার সাথেই হোক না কেন পরে ভাবা যাবে। আগে নিজের স্বপ্ন!
এখন স্বপ্নটা শুনুন- ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন যে আমার বিয়েটা হবে একদম জাঁকজমক ভাবে। নিজের বিয়ের দিন আমি খুব সুন্দর করে সাজব, হাসব, নাচব, আর চারপাশের সবাইকে নিয়ে আনন্দ করব। 
এমনকি একবার ফেসবুকে পোস্টও দিয়েছিলাম–  
 “ বিয়ের দিন নিজেও নাচব, সাথে চৌদ্দ গুষ্টিকেও নাচাব! ” 
কিন্তু আমার সেই স্বপ্নের পথেও যে একজন দাঁড়িয়ে আছে, সেটা কে জানত?
ছোট বোনের থেকে খবর পেলাম—তিনি(ইরাজ) নাকি বিয়েতে কোনো রকম অনুষ্ঠান চান না। 
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন