গল্পঃ-ওগো_তোমায়_নিয়ে
লেখিকাঃ-মাইরা_ইসলাম
পর্বসংখ্যা_০২
“সন্ধ্যা তখন ৭ টা বেজে ৫৯ মিনিটের কাঁটায়। লিভিং রুম থেকে প্রচন্ড চিৎকার চেচামেচি শুনা যাচ্ছে। বিশেষ করে যেটা কানে বাঁজছে একটা মেয়ের কান্নার আওয়াজ। বিরক্তিতে চোখ মেলে তাকালো ইয়াশ। ঘুমিয়েছে ঘন্টাখানেক ও সময় হলো না এরই মধ্যে চেঁচামেচি শুরু।
না আর শুয়ে থাকা গেল না। কানে বালিশ চেপে ধরেও কান্নার আওয়াজ ভেতরে যাচ্ছে। তীব্র বিরক্ত নিয়ে কপাল কুঁচকে উঠে বসলো সে। কান পেতে শুনলো কান্নার আওয়াজ টা কার আর কোত্থেকে আসছে।
মাইরার কান্নার আওয়াজ বুঝতে পেরেই ইয়াশ দৌড়ে গেল সেদিকে। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই দেখল মাইরা মেঝেতে বসে পায়ে হাত দিয়ে কান্না করছে। ইয়াশ একবার চার পাশ তাকিয়ে মাইরার কাছে এসে হাঁটু মুড়ে বসে জিজ্ঞেস করল।
—“কি হয়েছে এখানে? মাইরা মেঝেতে বসে কাঁদছ কেনো?
মাইরা ইয়াশকে দেখা মাত্রই কান্নার গতি বাড়াল। ডান পা এগিয়ে দেখিয়ে আহ্লাদী গলায় বলল।
—“দ-দেকু না বর,আমাল পা কেতে গেছে, আমি বেতা পেয়েচি খুউব।
হকচকিয়ে উঠলো ইয়াশ। “ কিভাবে ব্যাথা পেলে পাখি?
মাইরার আঘাত পাওয়া পা টা নিজের হাতে তুলে নিল। ইশশ মেয়েটা কত ব্যথা পেয়েছে। নিশ্চয় খুব কষ্ট হচ্ছে মেয়েটার। ইয়াশ এবার গম্ভীর কন্ঠে তার মা এবং ছোট মা কে শুধালো।
—“ মা, ছোট আম্মু তোমরা থাকতে ও ব্যাথা পেল কি করে?
ইয়াশ এর কথায় তার চাচি শারমিন দেওয়ান বলল।
—“কিভাবে পেয়েছে সেটা তোমার বোনকেই জিজ্ঞেস করো। সারাদিন টইটই করা ছাড়া আর কিছু আছে নাকি ওর? ইচ্ছে তো করছে আমি আরেকটা চড় বসিয়ে দেয়।
মায়ের মুখে এমন কথা শুনে ছোট মাইরা কেঁদে উঠলো শব্দ করে। মাইরার কান্না ইয়াশের মস্তিষ্কে গিয়ে ভারি খেতেই খানিক রেগে গেল ইয়াশ। এবং গম্ভীর কন্ঠে মা এবং চাচির উদ্দেশ্য শুধাল।
—“ খবরদার তো কেউ যদি মাইরার গায়ে হাত তুলেছো, এর ফল কিন্তু ভালো হবে না। তোমাদের গাফিলতিরর কারনেই মেয়েটা আজ এতবড় একটা আঘাত পেয়েছে।
ইয়াশ এর মুখে এতবড় কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল ওরা। দুই জা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। মুহূর্তেই লিভিং রুমে নেমে এলো অস্বস্তিকর নীরবতা। কেউ আর একটি শব্দও উচ্চারণ করার সাহস পেল না। দেওয়ান বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষের অবগত ইয়াশের রাগ নিয়ে।
ইয়াশ আর কারও দিকে তাকাল না। সম্পূর্ণ মনোযোগ দিল কাঁদতে থাকা ছোট্ট মেয়েটার দিকে।
নরম স্বরে বলল,
—“ কাঁদে না লক্ষী টি, আমি এসে গেছি না? দেখবে তোমার ইয়াশ বর তার মাইরা পরির সমস্ত ব্যাথা সারিয়ে দিবে।
মাইরা ফোঁপাতে ফোঁপাতে দুই হাত বাড়িয়ে দিল।
—“আমাল খুউব বেতা করচে তো।
ইয়াশের বুকটা যেন হটাৎ করেই মোচড় দিয়ে উঠল। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে আলতো করে মাইরাকে কোলে তুলে নিল। মাইরা অভ্যাসবশত দুই হাত দিয়ে ইয়াশের গলা জড়িয়ে ধরল, মুখটা গুঁজে দিল তার কাঁধে।
ইয়াশ ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমের দিকে উঠতে লাগল। পুরো সময়টাতেই এক হাতে মেয়েটার পিঠে আলতো চাপড় দিচ্ছিল, যেন ব্যথাটা কিছুটা হলেও ভুলে থাকে।
পেছন থেকে মাইরার মা চেঁচিয়ে উঠলেন।
—“ আদর দিয়ে দিয়ে ওকে আরও বানাও আহ্লাদী। দেখবে একদিন মাথায় উঠে নাচবে এই মেয়ে।
সিঁড়িতে দাঁড়িয়েই ইয়াশ উত্তর দিল,
—“সেটা নিয়ে আপনি না ভাবলেও চলবে ছোট আম্মু। ওকে নিয়ে ভাবার জন্য আমি তো আছিই।
কথা শেষ করেই সে নিজের রুমে ঢুকে দরজা টেনে দিল। শারমিন দেওয়ান আরও কিছু বলতে যাবে তার আগেই ইয়াশের মা ঝুমা দেওয়ান তাকে থামিয়ে দিলেন।
— “আহ্ ছোট। তুইও না শুধু শুধু মেয়েটার সাথে রাগ দেখাস। মাইরা কি আর ইচ্ছে করে পা কেটেছে বল?
—“ তুমি জানো না আপা। মেয়েটাকে নিয়ে শান্তিমতো এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকতেই পারিনা। সারা বাড়ি টইটই না করলে এই মেয়ের পেটের ভাত হজম হয়না।
—“ হয়েছে বাদ দে তো। যা হবার হয়েছে এসব নিয়ে আর মাথা ঘাঁটাস না। আয় কিচেন রুমে রাতের খাবার তৈরি করতে হবে। কিছুসময় বাদে উনারা ও চলে আসবেন।
শারমিন দেওয়ান ও আর কিছুই বললেন না। বিরবির করতে করতে চলে গেলেন বড় জা ঝুমা দেওয়ান এর পিছু পিছু।
~~~~~~~
বিছানার ওপর খুব যত্ন করে মাইরাকে বসিয়ে দিল ইয়াশ।
রুমের এক কোণে রাখা ফার্স্ট এইড বক্সটা নিয়ে এসে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর হাঁটু গেড়ে বসে আলতো করে মাইরার আহত পাটা নিজের হাঁটুর ওপর তুলে নিল।
ক্ষতস্থান দেখে ইয়াশের কপাল আরও কুঁচকে গেল।
কাঁচের ছোট্ট টুকরোয় লেগে পা কেটে গেছে দেখে এমনই মনে হচ্ছে । চারপাশে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের ছুপছুপ দাগ লেগে আছে।
সে সাদা তুলোয় অ্যান্টিসেপটিক লাগিয়ে খুব সাবধানে ক্ষতটা পরিষ্কার করতে শুরু করল।
তুলো আর অ্যান্টিসেপটিক স্পর্শ লাগতেই মাইরা কেঁপে উঠে চোখ-মুখ কুঁচকে বলল,
—“আহ্... বর... আমার লাগচে তো। তুমি পঁচা তুমি টুকটুকি বউকে বেতা দিচ্ছো।
ইয়াশ ফুঁ দিতে দিতে মৃদু হেসে বলল,
—“আর একটু সহ্য কর পাখি। জীবাণু পরিষ্কার না করলে তো আরও বেশি ব্যথা করবে।
মাইরা ঠোঁট ফুলিয়ে চুপচাপ বসে রইল। মাঝে মাঝে ব্যথায় চোখে পানি চলে আসছিল, আর ইয়াশ প্রতিবারই ক্ষতস্থানে আলতো করে ফুঁ দিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল।
পরিষ্কার করা শেষ হলে সে ওয়ানটাইম অ্যান্টিবায়োটিক ক্রিম লাগিয়ে ছোট্ট একটা ব্যান্ডেজ করে দিল।
শেষে মাইরার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
—“এই তো! আমার ছোট্ট পাখি একদম সাহস করে সব সহ্য করে ফেলেছে।
মাইরা চোখের পানি মুছে নিষ্পাপ হাসি দিল।
—"আমি কি তাহচী?
ইয়াশ মুচকি হেসে তার কপালে একটা চুমু এঁকে দিল। তারপর মোলায়েম কন্ঠে বলল,
—"পৃথিবীর সবচেয়ে সাহসী এবং গুড গার্ল মেয়ে হচ্ছে আমার মাইরা পাখি।
—“তুমি চবচময় আমাতে এবাবে বালুবাসবা তো বর? কখুনো আমাতে চেড়ে যাবা না তো?
—“ উহুম কখনো ছেড়ে যাবো না। এক মৃত্যু ছাড়া আমার থেকে তোমাকে কেউ আলাদা করতে পারবে না বুঝলে পাখি?
মাইরা মাথা নাড়াল। যদিও ছোট মাইরা মৃত্যু সম্পর্কে অবগত নয়। স্বভাবসুলভ ভাবে ইয়াশের গলা জড়িয়ে ঠোঁটে পরপর দুটো চুমু খেল। তারপর ইয়াশের কাঁধে মাথা রেখে মুখে হাসি টানল এবং বলল,
—“আমিও ককুনো তোমালে চেড়ে যাব না বর। তব তময় বালুবাসবু হ্যাঁ? তোমালে ছারা অন্য ছেলের দিকে তাকাবু না।
হাসলো ইয়াশ। বিয়ে মানে মেয়েটা কি এমন বুঝে? কিছুই না। তবুও সে মাইরা কে বকলো না। আজ পর্যন্ত সে মাইরাকে মুখের কথাটুকু বলেছি কি না সেটাই সন্দেহ।
ইয়াশ মাইরাকে জড়িয়ে নিল বুকের মধ্যিখানে।
নরম ঠোঁটে চুমু আকঁলো মাইরার কপালে। এটাই সেই মেয়ে যার জন্য ইয়াশ সব করতে প্রস্তুত। দুনিয়া উল্টেপাল্টে হলেও মাইরার আবদার সে পুরোন করবে।
~চলবে~