ফন্ট সাইজ:
থিম:
ওগো তোমায় নিয়ে

৩য় পর্ব

লেখক: সোহাগী আক্তার

#ওগো_তোমায়_নিয়ে

                  #পর্বসংখ্যা_০৩ 
         #লেখিকা_মাইরা_ইসলাম
“ভোরের প্রথম আলো ধীরে ধীরে রাতের অন্ধকারকে সরিয়ে দিচ্ছে। পূর্ব আকাশে লালচে আভা ছড়িয়ে পড়তেই চারপাশ যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল। শিশিরভেজা ঘাসের ডগায় সূর্যের সোনালি কিরণ ঝিলমিল করে উঠেছে। বাগানের রঙিন ফুলগুলো হালকা বাতাসে দুলে দুলে নিজেদের সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিচ্ছে।
দেওয়ান বাড়িটা এই মুহূর্তে অদ্ভুত রকমের শান্ত। বিশাল বাড়িজুড়ে নেই কোনো হইচই, নেই কারও উচ্চস্বরে কথা বলার শব্দ। শুধু দূরের গাছের ডালে বসে থাকা দোয়েল, শালিক আর বুলবুলি পাখির মিষ্টি কিচিরমিচির শডাক শুনা যাচ্ছে। তাদের কিচিরমিচির যেন সকালের নিস্তব্ধতাকে আরও মায়াময় করে তুলেছে।
রান্নাঘরের দিক থেকে ভেসে আসছে কড়াইয়ে তেল চড়ার টুকটুক শব্দ। কখনো হাঁড়ির ঢাকনা লাগানোর ঠুনঠুন আওয়াজ, কখনো প্লেট-গ্লাসের টুংটাং, আবার কখনো মশলা ফোড়নের ঘ্রাণ পুরো বাড়িময় ছড়িয়ে পড়ছে। কাজের লোকেরা দিনের শুরুতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সকালের নাস্তার আয়োজন নিয়ে। চায়ের কেটলি থেকে ধোঁয়া উড়ছে, আর সদ্য বানানো পরোটা ও ভাজির সুগন্ধ ধীরে ধীরে পুরো নিচতলাটা ভরিয়ে তুলছে। সোফায় বসে খবরের পত্রিকা পড়ছেন দেওয়ান বাড়ির বড় কর্তা নওশাদ দেওয়ান এবং ছোট কর্তা রাশেদ দেওয়ান খাচ্ছেন গরম ভাপ উঠা চা। শারমিন দেওয়ান এবং ঝুমা দেওয়ান আপাতত কিচেন রুমে নাস্তা বানাতে ব্যস্ত।
★
খোলা জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া শীতল সকালের বাতাস সাদা পর্দাগুলোকে আলতো করে দুলিয়ে দিচ্ছে বারবার। সেই ফাঁক গলে সূর্যের কোমল আলো আঁচড়ে পরছে ইয়াশের বিছানার কিনারায়।
সাদা রঙের পর্দা ভেদ করে সূর্যের আলো বিছানার একপাশে এসে থেমেছে। নরম সাদা চাদরের উপর ছড়িয়ে পড়া সেই আলোয় ইয়াশ এর ঘুমন্ত মুখটা আরও শান্ত ও মায়াময় দেখাচ্ছে । এলোমেলো কালো চুলগুলো কপালের উপর পড়ে আছে এলোমেলো হয়ে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ইয়াশের বুকটা ধীর ছন্দে উঠানামা করছে।
ঘরের কোণের ডিজিটাল ঘড়িতে তখন সকাল আটটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। অথচ এতক্ষণেও তার ঘুম ভাঙার কোনো লক্ষণ নেই। গত কয়েকদিন ধরে কলেজ
 আর নানা ব্যস্ততায় নিজের বিশ্রামের দিকেই যেন খেয়াল রাখেনি সে। ঠিক তখনই করিডোর থেকে ছোট ছোট পায়ের নুপুরের ঝনঝন শব্দ ভেসে উঠল।
এক জোড়া গোলাপি খরগোশের ছবি আঁকা স্যান্ডেল পরে দুই হাতে শাড়ির কুঁচি আঁকড়ে ধরে চুপিচুপি ইয়াশের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল মাইরা। 
চারপাশে একবার তাকিয়ে নিশ্চিত হলো কেউ তাকে দেখছে না। তারপর দুষ্টু হাসি হেসে খুব আস্তে করে পা টিপে টিপে দরজার হাতল ঘুরিয়ে ভেতরে উঁকি দিল।
দরজাটা আগে থেকেই আধখোলা ছিল। 
মাইরার ঠোঁটের কোণে চওড়া হাসি ফুটে উঠল। ফিসফিস করে বলল,
—“ দাড়াও দেকাচ্ছি তোমাল ঘুমানো।
বলেই বিড়ালের মতো নিঃশব্দে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল ছোট্ট মাইরা। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে উঠে বসলো ইয়াশের মুখ বরাবর খাটে। ছোট ছোট হাত দিয়ে ইয়াশের কাঁধ ঝাঁকাতে লাগল আর মিষ্টি সুরে ডাকতে আরম্ভ করল,
—“ ও বর। দেকু না তোমাল পরি বউ সেঁঝেচে। ও বর ওঠো।
ডাকতে লাগল মাইরা একনাগাড়ে। তবুও যখন ইয়াশ উঠলো না তখন দুষ্টু হেসে গিয়ে পাশের টেবিলের রাখা পানির গ্লাস টা হাতে করে নিয়ে আসলো। এবং কিছু পানি হাতে নিয়ে ছিটা দিতে লাগলো ইয়াশের চোখে মুখে। ঠান্ডা পানির স্পর্শ পেতেই ইয়াশ ধরফরিয়ে ঘুম থেকে উঠে বসলো। চোখ দুটো বেসামাল লাল,হয়তো ঘুম পুরোপুরি হয়নি। মাইরা পানির গ্লাসটা আবারও টেবিলে রেখে এসে দাড়ালো ইয়াশের সামনে। মাইরাকে শাড়ি পড়া অবস্থায় দেখে ইয়াশের যেন ঘুম ছুটে গেল। কি সুন্দর লাগছে তাকে শাড়ি পড়ায়। ইয়াশ এর হৃৎস্পন্দন যেনো বেড়ে গিয়ে ধুকপুক শুরু করে দিল। ইয়াশ বুকে হাত দিল নিজের আনমনেই, নিষ্পলক চেয়ে রইলো সে ছোট মাইরার দিকে যে এখনো তার দিকে তাকিয়ে। মাইরা ইয়াশকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে মুখে হাসির রেখা টেনে ওর সামনে এসে দাঁড়াল। 
ইয়াশ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। মাইরা আর একটু সামনে এসে খুশীমনে মুখে হাসি রেখে বলল,
—“বর দেখু, শাড়ী পলেছি আমি। আমাকে তোমাল লাল টুকটুকি বউ লাগচে না? এখুন বলো বিয়ে করবে আমাকে?
ছোট মাইরার কথা শুনে না চাইতেও হেঁসে উঠলো ইয়াশ। বুক থেকে হাত সরিয়ে সে মাইরাকে নিজের কাছে টেনে নিল। তারপর মাইরার ছোট মুখটা নিজের দু'হাতের আজলায় নিয়ে নরম সুরে জবাব দিল। 
—“হুমম! বিয়ে করবো তোকে। লাল টুকটুকে বউ বানাবো আমার। ইয়াশ দেওয়ান এর আদুরে আহ্লাদী বউ হবি তুই।
ইয়াশ এর কথা বোধহয় বুঝল মাইরা? ইয়াশ এর কথা শেষ হতেই সে খুশিতে লাফিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো। তারপর ইয়াশ কে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেলো। ইয়াশ মাইরাকে নিজের ঊরুর উপর বসিয়ে দিল। ইয়াশ তাকিয়ে রইলো মাইরার নিষ্পাপ মুখটার দিকে। মাইরা ইয়াশ এর শার্ট এর বোতাম দুই হাত দিয়ে গুটাতে গুটাতে বলল।
“ আমাতে কেমন লাগচে বললে না তো?
“ অপূর্ব।
“অপুবর্রু মানে কি বর? 
“ মানে হচ্ছে আমার মাইরা পরিকে খুব কিউট লাগছে। তা এখন বলো তো হটাৎ এই সাতসকালে শাড়ি পড়ার কারন কি? আর কে পড়িয়েছে এতো সুন্দর করে শাড়ি? 
—“ আপুই পলিয়েছে,ইচফা আপুই।
—“ ইশফা পড়িয়েছে?
মাইরা দুইপাশ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সম্মতি জানাল। ইশফা হচ্ছে ইয়াশের ছোট বোন। ইয়াশের থেকে কয়েক বছর খানেক এর ছোট হবে হয়তো। 
ইয়াশ আবারও প্রশ্ন করলো, 
—“ কিন্তু কেনো? আজকে কি এমন আছে লিটল কুইন? যে তোমাকে শাড়ি পড়তে হলো?
—“ কিছু নেই তো, এমনি পলেচি। 
এমন সময় ইশফা ইয়াশের রুমে আসে। মাইরাকে তার ভাইয়ের কোলে বসে থাকতে দেখে ভাইয়ের উদ্দেশ্য বলল। 
—“ সরি ভাইয়া, মাইরা এসে তোমার ঘুমটাকে নষ্ট করে দিল। আমি ওকে এখুনি নিয়ে যাচ্ছি তুমি বরং ঘুমাও। 
এই বলে ইশফা যখনই মাইরার নিকট আসতে লাগলো অমনি মাইরা চেঁচিয়ে উঠলো ইয়াশের গলা জড়িয়ে। 
—“ না, না, আমি যাবু না। আমি একানেই থাকবো।
—“ এমন করেনা মাইরা। চলো আমরা নিচে যাই তোমার বড় আব্বু তোমাকে দেখবে বলেছে। 
বড় আব্বুর কথা শুনতেই মাইরা হামাগুড়ি দিয়ে খাট থেকে নেমে দৌড় লাগাল দরজার দিকে। তা দেখে ইয়াশ বলে উঠলো,
—“ সাবধানে যাও মাইরা, নাহলে পরে গিয়ে আবারও ব্যাথা পাবে। 
মাইরা শুনলো না ইয়াশ এর কথা। সে এক প্রকার দৌড় দিয়েই বেড়িয়ে গেল রুম থেকে। মাইরাকে বের হতে দেখে ইশফাও পিছন পিছন ছুটলো তাকে ধরতে। ইয়াশ বিছানা ছেড়ে উঠে সে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। কয়েক মিনিট পর ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে আলমারি খুলে কালো টি-শার্টের সঙ্গে কালো ট্রাউজার পরে নিল। ভেজা চুল তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতেই নিচতলা থেকে মাইরার খিলখিল হাসির শব্দ ভেসে এলো।
ইয়াশ মাথা নেড়ে মৃদু হেসে রুম থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল।
নিচে নেমেই দেখল, ডাইনিং টেবিলের একপাশে নওশাদ দেওয়ান চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন আর মাইরার সঙ্গে খুনসুটি করছেন।
পাশে বসে রাশেদ দেওয়ান ফোনে কারও সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথা বলছেন।
ইয়াশকে দেখেই নওশাদ দেওয়ান বললেন,
—“অবশেষে মহারাজের ঘুম ভাঙল?
ইয়াশ মাথার পেছনে হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে বলল,
— “ জ্বি বাবা।
সেই মুহূর্তেই সোফার আড়াল থেকে ছোট্ট মাইরা দৌড়ে এসে ইয়াশের পা জড়িয়ে ধরল।
— “ জানু বড় আব্বু? তোমাল ছেলে জানি তকনও ঘুমাচ্চিলো আমি তো মুখে পানি দিয়ে উঠাইচি।
মাইরার কথায় ইয়াশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “আচ্ছা! তাহলে এখন থেকে আমার অ্যালার্ম ক্লক তুমি ঠিক আছে?
— "হ্যাঁ!
মাইরার দৃঢ় জবাবে আবারও হাসির রোল পড়ে গেল পুরো লিভিং রুমে। এমন সময় শারমিন দেওয়ান রান্নাঘর থেকে গরম গরম পরোটা, ডিমভাজি আর সবজি এনে টেবিলে সাজিয়ে রাখলেন।
— “সবাই এসো, নাস্তা ঠান্ডা হয়ে যাবে।
ইশফা চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,
— “ভাইয়া, আজ কিন্তু কলেজে যেতে ভুলে যেও না। গতকালও তো দেরি হয়েছিল মনে নেই?
ইয়াশ গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে বলল,
— "আজ সময়মতোই বের হবো, তোকে পাকনামি করে বলতে হবে না। 
ইয়াশ এর কথা শেষ হতে না হতেই মাইরা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— "আমিও যাবু।
ইয়াশ হেসে তার নাকটা আলতো চেপে ধরল।
— "তুমি এখনও অনেক ছোট। বড় হলে নিয়ে যাব।
মাইরা ঠোঁট ফুলিয়ে বসে রইল।
— “আমি বড় হয়ে গেচি তো। দেখো না, শাড়িও পলেছি!
তার সেই অভিমানী মুখ দেখে উপস্থিত সকলে হেসে ফেললেন। এবং মাইরার মা শারমিন দেওয়ান বললেন।
— "আমাদের মাইরাকে তো আজ একেবারে ছোট্ট রাজকন্যাদের মতো লাগছে মাশাল্লাহ।
লিভিং রুমজুড়ে তখনও হাসি-আনন্দের আবহ। ছোট্ট মাইরার একের পর এক শিশুসুলভ কাণ্ডে মুখে হাসি ফুটে উঠেছিল দেওয়ান পরিবারের সবার। 
★
“কেটে গেছে দীর্ঘ বারোটি বছর।
সময় কখনো কারও জন্য থেমে থাকে না। তার নিজস্ব গতিতেই এগিয়ে চলে, আর সেই চলার পথে বদলে দেয় মানুষ, সম্পর্ক, অনুভূতি—এমনকি ভাগ্যও।
এই বারো বছরে অনেক কিছুই বদলে গেছে দেওয়ান বাড়িতে। একসময় যে অট্টহাসিতে মুখর থাকত বাড়ির প্রতিটি কোণ, সেখানে এখন নেমে এসেছে অদৃশ্য এক নীরবতা। মানুষগুলো একই আছে, কিন্তু তাদের চোখের ভাষা আর মনের আনন্দের রেশ আগের মতো নেই। সময় যেন প্রত্যেকের জীবনে আলাদা আলাদা গল্প লিখে দিয়েছে।
ইয়াশ এর যখন আঠারো বছর পূর্ণ হলো তখনই বাবার সঙ্গে কথা কাটাকাটি করে এক পর্যায়ে ঝগড়া করে অভিমান আর আত্মসম্মান বুকে নিয়েই সে ছেড়ে দিয়েছিল দেওয়ান নিবাস। কাউকে কিছু বোঝানোর চেষ্টাটুকুও করেনি সে। নীরবে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল সেই বাড়ি থেকে। যেখানে কেটেছিল তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলো। কারোর সঙ্গেই আর যোগাযোগ রাখেনি ইয়াশ। প্রত্যেকটা মানুষ সেদিন কেঁদেছিলেন ইয়াশ এর চলে যাওয়াতে। ঝুমা, শারমিন, রাশেদ দেওয়ান উনারা বারবার করে আটকাতে চেয়েছিলেন ইয়াশকে চলে যাওয়া থেকে। কিন্তু সে কারোর কথায় শুনেনি। সেদিন বাবার প্রতি তীব্র রাগ, অভিমান নিয়ে বেড়িয়ে গিয়েছিল এক কাপড়ে ইয়াশ। ছেলেকে একটু আটকানোর প্রয়োজন বোধটুকুও করেননি নওশাদ দেওয়ান।  
যে ছেলে বাবার অবাধ্য হতে পারে সে ছেলের কোনো দরকার নেই উনার। মনকে শক্ত করে ঠাই দাঁড়িয়ে ছিলেন কোঠোর হয়ে। 
ইয়াশ যেদিন বাড়ি ছেড়ে ছিল সেদিন অনুপস্থিত ছিল ইশফা ও মাইরা। মূলত ইশফা মাইরাকে নিয়ে তার ফ্রেন্ড এর বাড়িতে গিয়ে ছিল কিছু নোটস আনতে। এসে যখন শুনে ইয়াশ বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে তখন দুজনই কান্নাই ভেঙে পড়ে। বিশেষ করে মাইরা। সে তো মেঝেতে শুয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে কেঁদেকুটে বুক ভাসিয়েছিল। মনে মনে খুব করে বকেছিল ইয়াশকে। 
তার সেদিন চলে যাওয়া শুধু একজন মানুষের বিদায় ছিল না।যেন দেওয়ান বাড়ির আনন্দ, প্রাণচাঞ্চল্য আর হাসিরও বিদায় ছিল।
আর আমাদের সেই ছোট্ট মাইরা পরি। যে একদিন শাড়ি পরে নিজেকে 'ইয়াশের পরি বউ' বলে পরিচয় দিত, সেই মেয়েটিও এখন আর বাচ্চা নেই। সময় তাকে বড় করেছে, বদলে দিয়েছে তার চেহারা, চিন্তা ভাবনা আর জীবনকে। এখন সে সতেরো বছরের কিশোরী। দেখতে বেশ মাশাল্লাহ। ঘন কালো চুল গুলো হাঁটু ছুঁইছুঁই ঠিক যেন রুপানজেল। গায়ের রং ধবধবে ফর্সা। হাসলে ডান গালে ছোট একটা ডিম্পল পড়ে। হরিণের ন্যায় টানাটানা দুই কাজল কালো চোখ। ঠোঁটের নিচে কুচকুচে ছোট একটা তিল দেখতে বেশ ভালোই লাগে মাইরা কে। প্রানবন্ত এখনো কমেনি তার। সারাদিন টইটই করা ছাড়া যেন ওর আর কোনো কাজই নেই। ওদিকে ইশফা হয়েছে শান্ত শিষ্ট একজন মেয়ে। দেখতে বেশ সুন্দরী। গায়ের রং ফর্সা, তবে মাইরার চেয়ে কম। চুল গুলো কোমরের নিচে নেমে এসেছে। এইতো ইশফা যা পরবে মাইরাকেও মেচিং করে তাই কিনে দিতে হবে নাহলে অভিমানে মুখ ফুলিয়ে বসে থাকবে কারোর সঙ্গে কথা না বলে।  
★
সকাল হতেই মাইরার ছুটাছুটি হয়ে গেছে শাড়ি নিয়ে। মূলত আজ তার কলেজে একটা অনুষ্ঠান আছে বলতে গেলে। সে জন্যই শাড়ি পড়া আরকি। সবুজ পাইরের লাল শাড়ি হাতে নিয়ে অনবরত ডেকে যাচ্ছে ইশফাকে। যখন ইশফা দরজা খুলছে না তখন আবারও গলা উঁচিয়ে ডেকে উঠলো।
—“ আপু দরজাটা একটু খুলো না।
দরজা কড়া নাড়ার তীব্র শব্দে ঘুম ভাঙে ইশফার। সে বিরক্তি নিয়ে একবার দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো সবে মাত্র ৬ টা বেজে ৫১ মিনিট। রাতে দেরিতে ঘুমানোর কারনে এখনো চোখে ঘুম স্পষ্ট ইশফার। মাইরা কেন ডাকছে সেটা দেখতে কপালে বিরক্তির ভাজ রেখেই দরজার নিকট এগিয়ে যায়। দরজা খুলতেই মাইরা হুরমুড়িয়ে ঘরে প্রবেশ করে। এবং ইশফাকে ঘুমঘুম চোখে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মাইরা ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলে,
—“ সরি আপু এতো সকালে তোমাকে বিরক্ত করার জন্য। আজকের জন্য সরি হ্যাঁ? আর এখনো এতো সকালে তোমাকে বিরক্ত করবো না। 
ইশফা তাকালো মাইরার ইনোসেন্ট বানিয়ে রাখা মুখটার দিকে। না চাইতেও হেঁসে ফেলল সে। তারপর মাইরার হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“ হাতে শাড়ি নিয়ে ঘুরছিস কেনো? মতলব কি রে?
মাইরা হাতের শাড়িটা বিছানার উপর রাখতে রাখতে বলল,
—“ওসব মতলব ফতলব কিছু না আপু। তোমাকে কাল কলজে থেকে ফিরে বললাম না আজকে আমাদের কলেজ এ অনুষ্ঠান আছে? তার জন্যই শাড়ি পড়ে যাবো আরকি।
—“ তা নাহয় বুঝলাম। কিন্তু তুই যে শাড়ি পড়ে বাড়ির বাহির হবি সেটা কি বাড়িতে জানিয়েছিস?
—“ তুমি তাহলে চিনোই না আপু আমাকে! আমি তো কালকেই সব ম্যানেজ করে নিয়েছি। মানে মা বাবা বড় আম্মু বড় আব্বু সকলেই আমাকে পারমিশন দিয়ে দিয়েছে। তবুও খুব কষ্টে বুঝলে?
—“ তা কয়জন মিলে শাড়ি পড়ার প্ল্যান করেছিস?
—“ বেশি কেউ না। আমি ফাতিহা, তোয়া,আর হচ্ছে টুম্পা।
—“ টুম্পা টা আবার কে শুনি? 'ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল ইশফা'।
—“ ধ্যাত, টিয়াকেই টুম্পা বলি বুঝলে? এখন জলদি করে শাড়ি পড়িয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে দাও তো। 
ইশফা আর কথা বাড়ালো না। খাট থেকে শাড়িটা হাতে নিল। মাইরা কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওয়াশরুমে গিয়ে জামা কাপর পাল্টে ব্লা*উজ আর পেটিকোট পড়ে বেড়িয়ে আসে। মাইরাকে শাড়ি পড়াতে পড়াতেই ইশফা বলে উঠে, 
—“ এই নিয়ে দ্বিতীয়বার তোকে শাড়ি পড়াচ্ছি আমি। যখন ছোট ছিলিস তখন তো তোকে শাড়ি পড়াতে বেশ হিমসিম খেতে হয়েছিল আমাকে। 
ইশফার কথা শুনে মাইরা ভ্রু কুঁচকে বলল,
—“ আগেও শাড়ি পড়েছি আমি? কই আমার তো মনে নেই।
ইশফা হেসে উঠলো। মাইরার মাথায় গাট্টি মেরে বলল,
—“ গাধী, তখন তো তুই পাঁচ বছরের বাচ্চা ছিলিস। 
—“ যাক গে,ছোট ছিলাম মানেই অতীত তাই হয়তো ভুলে গেছি। এখন তারাতাড়ি পড়াও তো আমাকে যেতে হবে। 
—“ এতো তাড়া দিস না তো মাইরা। পরে তোর শাড়ি পড়ানোই সুন্দর হবে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক, নাহলে মারবো এক চড়। 
মাইরা তাই করলো। গাল ফুলিয়ে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। কিছু সময় নিয়ে মাইরাকে শাড়ি পড়িয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে দিল। চুল গুলোকে ভালো করে বেঁধে পিঠে সবগুলোকে ছেড়ে দিল। 
—“ এই নে কমপ্লিট, মুখ গুমড়া করে না রেখে এখন আয়নাতে গিয়ে নিজেকে দেখ।
মাইরা মিটিমিটি পায়ে হেঁটে গেলো। যখন সে নিজেকে আয়নাতে দেখলো তখন তার সমস্ত অভিমান গলে পানি হয়ে গেল। সে খুশিতে লাফিয়ে উঠলো তারপর কোনো বনিতা ছাড়ায় ইশফা কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই মাইরা তার গালে একটা চুমু খেলো। তারপর খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,
—“ থ্যাংকু আপু। সত্যি তুমি খুউব ভালো। এখন যাই আমি টাটা। 
মাইরা দৌড় দিতেই ইশফা পেছন থেকে বলে উঠলো,
—“আরে আস্তে ধীরে যা মাইরা, নাহলে পড়ে যাবি তো। 
মাইরা যেতে যেতেই গলা উঁচিয়ে বলল, 
—“পড়বো না আপু আমি গেলাম, আর আলাভিউ তোমাকে।
মাইরার কথা শুনে হেঁসে ফেলল ইশফা। তারপর ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে মুখে হাসি নিয়েই বিরবির করলো।
—“ পাগলি একটা। 
★
—“ বাহ্, আমার মাইরা মামুনিটাকে তো খুব সুন্দর লাগছে। একদম বউ লাগছে তাই না রে রাশেদ? 
—“ হ্যাঁ ভাই ঠিক বলেছো, কদিন বাদে বিয়ে ও দেওয়া যাবে। ছেলে এক দেখাতেই পছন্দ করে ফেলবে আমার মেয়েকে।
লিভিং রুমে প্রবেশ করতেই বাবা আর জেঠুর থেকে প্রসংশা পেয়ে তো মাইরা বেজায় খুশি। এরই মাঝে রান্না ঘর থেকে বেড়িয়ে আসলেন ঝুমা এবং শারমিন দেওয়ান। হাতে কিছু নাস্তার প্লেট। ঝুমা দেওয়ান ডাইনিং টেবিলের উপর বাটি গুলো রাখতে রাখতে শুধালেন,
—“ কিরে মা! এই সাতসকালে শাড়ি পড়েছিস যে? কোথাও কি যাবি?
মাইরা ঝুমা দেওয়ান এর দিকে তাকিয়ে মুখে হাসি ফুটালো।
—“ তোমাকে বলেছিলাম না বড় আম্মু? আজ আমাদের কলেজ এ অনুষ্ঠান আছে? 
—“ ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। দেখছিস? আজকাল সব ভুলে যাচ্ছি। 
—“ কদিন পর তো নিজেকেই ভুলে যাবে দেখছি। যাক গে আমি আসি নাহলে আবার দেরি হয়ে যাবে। 
মাইরা সোফা থেকে উঠে যেতে যেতে কথাটা বলল। পেছন থেকে ওর মা শারমিন দেওয়ান চেঁচিয়ে উঠলো। 
—“ কিছু তো খেয়ে যা মাইরা। 
মাইরা যেতে যেতেই গলা উঁচিয়ে উত্তর দিল'—“ না মা খাবো না, দুপুরে এসে একবারে খাবো,এখন আসি বাইইই।
           ~চলবে~

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন