যেই তোমার হাওয়া আমাকে ছুঁলো
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
১৪.
দমকা বাতাসের চোটে তরীর শাড়ির আচল এবং চুল উড়ছে। কাল বৈশাখীর আবহাওয়া। এই কাল বৈশাখী যেমন গ্রীষ্মের উগ্রতা কমিয়ে এনেছে তেমন প্রকৃতিতে এক নতুন তান্ডব শুরু করেছে। তান্ডব তো তরীর জীবনেও কম হয়নি। এই যেমন কিছুক্ষণ আগেই তার জীবন এক নতুন ঝড়ের সাথে বাঁধা পড়েছে। সেই ঝড়ের নাম পার্থ মুন্তাসির চৌধুরী।
সেই ভয়ংকর রাতে যখন পার্থ তাকে জোর করে বিয়ে করে সেদিন ওর গায়ে শোক রঙা কাপড় ছিলো, যা পরিস্থিতি অনুযায়ী একেবারে মানানসই ছিলো। কিন্তু আজ তার গায়ে কালোর বদলে লাল রঙ শোভা পাচ্ছে। এই লাল রঙ আসলে কিসের প্রতীক? ভালোবাসার নাকি ঘৃণার?
রুমে প্রবেশ করতেই পার্থ দূর হতে তরীকে বারান্দার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। আচমকাই তার মনে পড়ে যায় রুবেলের বলা সেদিনের কথাটি। মনে জায়গা না পাক, কিন্তু সকলের সামনে তিন বার কবুল বলে পার্থর জীবনে তো তরীর জায়গা হয়েছে। তা পার্থ কখনোই অস্বীকার করবে না। সেই সম্পর্কের ভিত্তি হতেই এই নারীর নিরাপত্তার দায়িত্ব এখন থেকে তার। কেউ যদি ক্ষতি করার কথা চিন্তাও করে তাহলে তাকে পিচঢালা পথে পিষে দিবে পার্থ।
তরী আচমকা ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে ফিরে দরজার কাছে পার্থকে বিয়ের শেরওয়ানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। তরী ভ্রু কুচকে সাথে সাথে বলে উঠে,
“ এই ফুল টুল দিয়ে রুম সাজানোর আইডিয়া কার ছিলো? “
পার্থ নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে আপনমনে পাঞ্জাবির উপর হতে শেরওয়ানি খুলতে খুলতে বলে উঠে,
“ আপনার দেবর, ননদের আইডিয়া। “
তরী সাথে সাথে চিল্লিয়ে উঠে,
“ এই! করছেন কি আপনি? “
পার্থ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় তরীর আচমকা চিৎকারে। অত:পর বিরক্ত মিশ্রিত সুরে বলে,
“ ছাগলের মতো চিল্লাচ্ছেন কেন? “
তরী দুই পা এগিয়ে এসে বলে,
“ শেরওয়ানি খুলছেন কেন? “
পার্থ অবাক হয়। কি অদ্ভুত প্রশ্ন! ডাক্তার সাহেবার এসব আজগুবি প্রশ্ন শুনলে মাঝে মাঝে তার মনে হয় তরী বুঝি চিটিং করে সব এক্সাম পাশ করে ডাক্তার হয়েছে। নাহয় আইকিউ লেভেল এরকম কেন হবে? পার্থ বিরক্তি নিয়েই বলে,
“ আপনি নিজের সকল গয়না খুলে আর আটা ময়দা তুলে বসে আছেন কেন? যাতে একটু আরামে ঘুমোতে পারেন। আমিও সেজন্যই শেরওয়ানি খুলছি। “
তরী নিজের দুই হাত বুকের উপর ভাজ করে বলে,
“ আমাকে আপনার বোকা মনে হয়? আমি খুব ভালো করে বুঝি আপনাদের মতো পুরুষদের ইনটেনশন কি। প্রথমে শেরওয়ানি খুলবেন, তারপর পাঞ্জাবি। আর তারপর নিজেদের জিম করা বডি দেখিয়ে মেয়ে মানুষকে সিডিউস করার ট্রাই করবেন। কিন্তু আমি এসব দ্বারা মোটেও ইম্প্রেসড হবো না। “
পার্থ তাজ্জব বনে যায়। সে তো এতো ডিপ চিন্তাভাবনা করেও নি। অথচ এই ডাক্তার একটা ছোট বিষয়ের কতো গভীরে চলে গেলো। পার্থ ফুস করে উঠে নিজের গায়ের পাঞ্জাবিটাও খুলে ফেলে। তরী সাথে সাথে রাগে লাল হয়ে যায়। কি নির্লজ্জ বেহায়া পুরুষ মানুষ! শরম হায়া নামে কোনো জিনিস এই লোকের ভেতরে নেই।
পার্থ এক পা করে তরীর দিকে এগিয়ে আসে। তরী এক বিন্দুও নড়ে না। সে হাতে শক্ত করে মুষ্টি করে রেখেছে। আজকে সে এই বেহায়া পুরুষের মুখের নকশা বদলেই ছাড়বে। পার্থ তরীর কাছাকাছি এসে দাঁড়াতেই তরী নিজের মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে ধরে আঘাত করার উদ্দেশ্য। কিন্তু সেই হাত পার্থকে ছোঁয়ার আগেই পার্থ একহাতে তা শক্ত করে ধরে ফেলে। তরী আবার আরেক হাত তুলে। এবারও পার্থ তা ধরে ফেলে। অত:পর তরীর দুই হাত কোমরের পিছনে নিয়ে শক্ত করে আটকে ধরে তার কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
“ আপনাকে ইম্প্রেস করার আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহও নেই। উল্টো আমার তো মনে হচ্ছে আপনি আমাকে সিডিউস করার প্ল্যান করেছেন। শাড়ির আঁচল সড়ে যে আপনার কোমরের বাক দৃশ্যমান সেই খেয়াল কি আছে? “
তরী হতভম্ব হয়ে যায়। দুই হাত আবদ্ধ থাকায় পার্থকে লাথি মারার উদ্দেশ্যে ঠিক করা পা বরফের ন্যায় জমে গিয়েছে ইতিমধ্যে। এই নির্লজ্জ লোকের কথায় রাগে তার কান দিয়ে যেন গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। পার্থ তরীর হাত সামান্য আলগা করে একই সুরে আবার বলে উঠে,
“ স্টিল আই হ্যাভ কন্ট্রোল অভার মাইসেল্ফ। একইভাবে আপনিও নিজের উপর কন্ট্রোল রাখতে শিখুন তরী। “
কথাটা বলেই পার্থ তরীকে ছেড়ে পাশ কেটে চলে যেতে নেয়। যাওয়ার সময় সে আরেকটা কাজ করে। তরীর কাধে তুলে রাখা শাড়ির আচলটা ছেড়ে দেয়। সাথে সাথেই তরীর এতক্ষণের দৃশ্যমান কমোরের বাক ঢেকে যায়। তরী হতভম্ব দৃষ্টি নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায়। পার্থ আলমারি হতে নিজের টি শার্ট এবং বিছানা হতে একটা বালিশ নিয়ে বাহিরের সোফার রুমে চলে যায়।
তরী দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে ভিতর থেকে দরজা লক করে গায়ের শাড়ি পরিবর্তন করে নেয়। আর জীবনে এই নির্লজ্জের সামনে শাড়ি পড়তে যাবে না সে।
__________
দীর্ঘ রাত। সারাদিন মানুষে গিজগিজ করা বিয়ে বাড়িটা এখন বেশ শান্ত। আকাশটা থেমে থেমেই গর্জন করে উঠছে আপন ছন্দে। যেকোনো সময়ই মেঘগুলো বৃষ্টির বিন্দু হয়ে ঝড়ে পড়তে শুরু করবে। পৃথা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বারবার ঘুরেফিরে নিজেকে দেখতে ব্যস্ত। তার বড় দা আর বড় ভাবীর বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ কয়েক ঘন্টা হয়ে গেলো। অথচ সে এখনো নিজের পরিহিত লেহেঙ্গা বদলাচ্ছে না। নিজেকে দেখতে নিজের কাছেই বেশ সুন্দর লাগছে তার। এই লেভেন্ডার রঙের লেহেঙ্গাটা তূর্য তার জন্য পছন্দ করে এনেছিলো।
তূর্য নিজেও আজকে লেভেন্ডার রঙের পাঞ্জাবি পড়েছে। সে চুপচাপ বিছানায় বসে আড়চোখে পৃথাকে দেখতে ব্যস্ত। এইযে এই অষ্টাদশী সারাদিন তার বউ রূপে তার সামনে এই রুমময় পায়চারি করে বেড়ায় বিষয়টা তূর্যর কাছে বেশ উপভোগ্য। তার অবচেতন মন ক্ষণে ক্ষণে পৃথামোহে ডুব দিয়েছে তার অজান্তেই। কিন্তু ঠিক করে রেখেছিলো সেই কথা পৃথাকে এখন জানতে দিবে না। নাহয় পড়াশোনা চাঙ্গে তুলে এই মেয়ে গভীর প্রেমে ডুব দিবে। কিন্তু তূর্যর মন এখন তাকে শাসিয়ে বলছে,
“ পড়াশোনা গাঙ্গে ভাসুক, তুই তোর মনের কথা জানিয়ে দে। নিজের বউকেই তো ভালোবেসেছিস। এটা নিয়েও এতো ভাবাভাবির কি আছে? “
তূর্য মনকে সায় দেয়। ফোন রেখে উঠে গিয়ে সে পৃথার পিছনে দাঁড়ায়। পৃথা তাকে দেখেই চোখ ছোট করে বলে,
“ আপনার ঘুম পেলে লাইট অফ করে ঘুমিয়ে পড়ুন। আমার এসব মেকাপ তুলতে টাইম লাগবে। “
তূর্য একবার বারান্দার থাই গ্লাস দিয়ে বাহিরে তাকায়। অত:পর প্রশ্ন করে,
“ ছাদে যাবে? “
পৃথা চোখ ছোট করে বলে,
“ এখন? বৃষ্টি নামবে মনে হচ্ছে। “
“ ভিজতে সমস্যা আছে? “
পৃথার ছোট ছোট চোখ মুহুর্তেই প্রফুল্ল হয়ে উঠে। সে হাসি দিয়ে বলে,
“ আপনিও কি বৃষ্টিতে ভিজতে পছন্দ করেন? ওহ মাই গড! আই মিন থ্যাংক গড! জানেন আম্মা কখনোই আমাকে পারমিশন দিতো না। “
তূর্য পৃথার হাত ধরে বলে,
“ এখন চলো। “
নিশ্চুপ অন্ধকারে তলিয়ে আছে সম্পূর্ণ ঘর। তূর্য আর পৃথা সাবধানে রুম থেকে বের হয়। ছাদের সিঁড়ি পেরিয়ে দরজা খুলে ছাদে প্রবেশ করতেই পৃথা বলে উঠে,
“ থ্যাংক গড পাপা ঘুমোচ্ছে। পাপার সামনে ধরা খেলে লজ্জায় পড়তে হতো। “
কথাটা বলতে বলতেই সিঁড়ির কাছ থেকে হুমায়ুন রশীদের গলা ভেসে আসে,
“ ছাদে কে রে? “
সাথে সাথে পৃথার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। তূর্য নিচু গলায় শিট বলে পৃথার হাত ধরে ছাদের পিছনের দিকে দৌড় লাগায়। পৃথার একহাত তূর্যর হাতের মুঠোয় ও অন্য হাত তার লেহেঙ্গা সামলাতে ব্যস্ত। ছাদের রেলিঙের কাছাকাছি যেতেই তূর্য পৃথাকে কোলে তুলে পাশের ছাদে নামিয়ে দেয়। পরপর নিজেও লাফ মেরে পাশের ছাদে নেমে আবার পৃথার হাত ধরে দৌঁড়ে সেই ছাদের একটা পিলারের আড়াল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।
এত কম সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো চোখের পলকে ঘটে যাওয়ায় পৃথার বোধগম্য হয় না। যখন বোধগম্য হয় ততক্ষণে সে তূর্যের দু হাতের সীমানার ভেতর আবদ্ধ। মাথা তুলে তাকাতেই দেখে তূর্য পিলারের আড়াল হতে উঁকি দিয়ে তাদের বাসার ছাদের দিকে দেখছে। পৃথা কিছু বলতে নিলেই তূর্য তার ঠোঁটের উপর আঙুল রেখে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
“ পাপা ছাদে। শব্দ করো না। “
পৃথা নিচু স্বরে প্রশ্ন করে,
“ কিন্তু আমরা এভাবে পালাচ্ছি কেন? ইলিগ্যাল কিছু করছি না তো আমরা। “
তূর্য মৃদু স্বরে হুশ বলে পৃথাকে থামিয়ে দেয়। হুমায়ুন রশীদ চলে যেতেই তূর্য পৃথার দিকে ফিরে তাকায়। সাথে সাথে বিদ্যুৎ চমকে উঠে। বিদ্যুতের আলোয় পৃথার মুখের দিকে তাকিয়েই বলে দেয়,
“ আই লাভ ইউ। “
পৃথার চঞ্চল দৃষ্টি স্থির হয়। কিন্তু আবহাওয়া আর স্থির থাকে না। ঝপঝপিয়ে বৃষ্টি নামে ধরণীর বুকে। পৃথা লজ্জায় মিইয়ে গিয়ে দৃষ্টি নত করে ফেলে। কঠোর চেতনার তূর্যর মনে আচমকা পৃথাকে ছুঁয়ে দেওয়ার বাসনা জাগে। সেই বাসনাকে সে অগ্রাহ্য করে না। নিবিড়ভাবে একহাত বাড়িয়ে সে পৃথার গালে রাখে আর অন্য হাত তার কমোরে। ধরে আসা গলায় বলে,
“ আগ্রহ নয় ভালোবাসা থেকে ছুঁইছি। “
পৃথা লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে বলতে নেয়,
“ তূর্য আপনি… “
কথা শেষ করার আগেই অষ্টাদশীর ওষ্ঠ যুগল তূর্যর দখলে চলে যায়। বৃষ্টির পানিতে পৃথার ভেজা চুলগুলো তূর্যর হাতের আঙ্গুলের ফাঁকে আবদ্ধ। কিছু সময়ের ব্যবধানেই তূর্য পৃথার কানের কাছে মুখ নিয়ে তাকে লজ্জা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বলে উঠে,
“ বলো তো মেয়ে, তুমি প্রেমিকা নাকি স্ত্রী? “
পৃথা জবাব দেয় না। নিজের রুদ্ধশ্বাস গুণতে ব্যস্ত সে। তার রক্তিম আবিরে রাঙা চেহারা দেখে তূর্য মৃদু হেসে আবার বলে,
“ দেনমোহর তো বিয়ের দিনই পরিশোধ করে দিয়েছিলাম। এখন কি তাহলে নিজের হক বুঝে নিবো? “
পৃথা তূর্যর বুকে দু'হাতের সাহায্যে আলতো ধাক্কা দিয়ে তাকে দূরে সরিয়ে দৌড়ে ছাদের রেলিঙের কাছে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু সাথে সাথে সে বুঝতে পারে এই ছাদের রেলিঙ একা টপকানোর সাধ্যি তার নেই। অর্থাৎ তূর্যর থেকে পালানোর কোনো রাস্তাও নেই। পৃথা ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে ফিরে তাকায়। তূর্য এখনো বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি পৃথাতেই নিবদ্ধ। পৃথাকে তাকাতে দেখেই সে নিজের দু'হাত মেলে দিয়ে বলে,
“ ক্যান আই হ্যাভ ইউ ইন মাই আর্মস রাইট নাও? “
পৃথা আকুল চোখে তাকিয়ে রয়। এতোদিন তো সে এটাই চাচ্ছিলো। তূর্যকে সে পেয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু তূর্যর হৃদয় পাওয়া তার বাকি ছিলো। আজ তূর্য আর তার হৃদয় দুটোই পৃথার হয়ে গিয়েছে। তাহলে এতো সংশয় কেন?
অষ্টাদশী আর অপেক্ষা করে না। ভারী বর্ষণ চিড়ে সে দৌড়ে তূর্যর কাছে এসে এক লাফে তার গলা জড়িয়ে ধরে। তূর্যও পৃথার কোমর নিজের পেশল বাহুর বেষ্টনীতে আবদ্ধ করে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। পৃথার পা এখন আর মাটি ছুঁইছে না। পৃথাকে আগলে রেখেই তূর্য বলে উঠে,
“ ভাগ্যিস সে রাতে তুমি কল করেছিলে। “
পৃথা নিজের ছোট্ট মুখটুকু তূর্যের ঘাড়ে লুকিয়ে উত্তপ্ত নিঃশব্দ ছেড়ে বলে উঠে,
“ ভাগ্যিস সেদিন আপনি আমার ইন্টারভিউ নিতে এসেছিলেন। “
চলবে…