ফন্ট সাইজ:
থিম:
যেই তোমার হাওয়া আমাকে ছুঁলো

১৫তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

যেই তোমার হাওয়া আমাকে ছুঁলো

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

১৫.

রাতের কাল বৈশাখীর তান্ডব পেরিয়ে ঝলমলে সকালের আগমন ঘটে। তরীর ঘুম ভাঙে সকাল ৭ টার দিকে। যদিও সাধারণত সে খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে। কিন্তু এই বিয়ের ধকলের কারণে আজ কিছুটা দেরি হয়ে গিয়েছে তার। তরী চোখ ডলতে ডলতে উঠে বসে। চোখ মেলে ভোরের আলোয় বিভিন্ন ফুল দিয়ে সজ্জিত রুমটা দেখতেই তার মন আবার বিরক্তিতে ভরে উঠে। সে আজ পর্যন্ত এই ফুল দিয়ে বাসর ঘর সাজানোর লজিক বুঝলো না। এদের প্রয়োজনীয়তা কি আসলে? শুধু শুধু এদের অপচয় হয়। এই তুলনায় গাছেই এদের বেশি ভালো মানায়।

তরী উঠে গিয়ে নিজের লাগেজ খুলে একটা থ্রি পিস বের করে নেয়। অভ্যাসবশত সোজা ওয়াশরুমে চলে যায় শাওয়ার নেওয়ার জন্য। শাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুমের আয়নার সামনে দাঁড়াতেই সে আয়নায় নিজের স্নিগ্ধ মুখটা দেখতে পায়। বিয়ের গেটাপে কালকে থেকে বেশ হাসফাস অনুভব করছিলো সে। ফাইনালি এখন মনে হচ্ছে সে নিজেকে ফিরে পেয়েছে।

তরী ওয়াশরুম থেকে বের হতে নিয়েও ফিরে আসে। একটা ব্রাশ হোল্ডারের একপাশে তার ব্রাশ রাখা এবং অপরপাশের সেই বড় ব্রাশটা নিশ্চয়ই নেতা সাহেবের? তরীর মাথায় একটা বুদ্ধি কাজ করে। সে দৌড়ে রুমের ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে পার্থর একটা হেয়ার ব্রাশ নিয়ে ফিরে আসে। অত:পর পার্থর টুথব্রাশ দিয়ে সেই হেয়ার ব্রাশটা ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করে। মুহুর্তেই ফকফকা সফেদ টুথব্রাশটা একটা বিদঘুটে রঙ ধারণ করে। তরী সেটা পূর্বের জায়গায় রেখে দিয়ে পৈশাচিক হেসে বলে উঠে,

“ বেস্ট অফ লাক ফর ইউর ম্যারিড লাইফ মাই লাভ। “

__________

সকাল সকাল নাস্তার টেবিলে থমথমে মুখে বসে আছে পার্থ। কিছুক্ষণ আগে ফ্রেশ হতে গিয়ে সে একটা বিদঘুটে সিচুয়েশন ফেস করেছে। তার টুথব্রাশের কেউ ইজ্জত মেরে দিয়েছে। ঘটনাটার সাথে যে রান্নাঘরে নাস্তা বানাতে ব্যস্ত তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রী জড়িত তা নিয়ে পার্থর মনে তিল পরিমাণ সন্দেহ নেই। মহারাণী আগেই তাকে ওয়ার্নিং দিয়েছিলো যে বিয়ের পর সে পার্থর জীবন দূর্বিষহ করে তুলবে। পার্থও তা মেনে নিয়েছিলো। তাই এই নিয়ে কোনো অভিযোগ করা তাকে সাজে না। বরংচ পার্থ দেখতে চায় তরী তার ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিতে কত দূর যেতে পারে।

বাড়ির বাকি সকল সদস্য ইতিমধ্যে নতুন বউর হাতে তৈরি করা নাস্তা খেয়ে যে যার কাজে বেরিয়ে পড়েছে। সকালে তরী যখন নিচে নামে তখন সে সাদিকা বেগমের সম্মুখীন হয় সর্বপ্রথম। উনি তরীর হাতে একটা নতুন জামদানি শাড়ি দিয়ে বলেছিলেন নববধূকে শাড়িতে বেশি মানায়। তরী নিজের শাশুড়ির কথা ফেলে নি। উপরে গিয়ে নিজের থ্রি পিস বদলে শাড়ি পড়ে নিয়েছে, সাথে হালকা কিছু অলংকারও।

শাড়ির আঁচল কোমরে গুজে তরী একহাতে পরোটার প্লেট নিয়ে ডাইনিং রুমে প্রবেশ করে। ডাইনিং টেবিলে পার্থর সাথে তখন আসিফ, শামীমসহ আর চার পাঁচজন ছেলে বসে ছিলো। সবাই-ই তরীকে এই রূপে দেখে বেশ অবাক। তরী হাসিমুখে সবার প্লেটে পরোটা তুলে দিয়ে নিজের হাতে রান্না করা গরুর মাংস পরিবেশন করে। আফিস শামীমের কানে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,

“ দেখসোস আমগোর ভাইয়ের জাদু? একদিনেই ভাবীরে বাঘের তে বিলাই বানায় ফেলসে। “

শামীমও কথাটা শুনে মুখ টিপে হাসে। তরী সৌজন্যমূলক হাসি হেসে পার্থর উদ্দেশ্যে বলে উঠে,

“ এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? খাওয়া শুরু করুন। আমি খুব ভালোবেসে আপনার প্রিয় গরুর মাংস রান্না করেছি এই সকাল সকাল। খেয়ে বলুন কেমন হয়েছে। “

পার্থ সন্দিহান দৃষ্টি নিয়ে তরীর দিকে তাকিয়ে আছে। তরীর এই হাসির পিছনে যে কোনো ইবলিশ মার্কা রহস্য আছে তা সে নিশ্চিত। সে একটু পরোটা ছিড়ে মাংসের ঝোলে ভিজিয়ে মুখে দেয়। অত:পর বেশ স্বাভাবিক গলায় বলে উঠে,

“ ভালো রান্না জানেন আপনি। “

তরীর হাসির রেখা কিছুটা কমে আসে। ইতিমধ্যে বাকিরাও খাওয়া শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু খাবার মুখে দিতেই তাদের সকলের চেহারার রঙ বদলে যায়। তা দেখে তরী আবার হেসে দিয়ে বলে উঠে,

“ আমার জানামতে আপনাদের রাজনীতির একটা অলিখিত নিয়ম আছে। নিজেদের নেতা যাই করুক না কেন, আপনারা সর্বদা সহমত ভাই, ঠিক ভাই বলে বেড়ান। একইভাবে এখন থেকে নেতার স্ত্রী যা-ই খেতে দেক না কেন, মজা হয়েছে ভাবী, সুস্বাদু হয়েছে ভাবি বলে বেড়াবেন। ওকে? “

তরীর কথা কেউ কানে তুললো কিনা বুঝা গেলো না। সবাই পানি খেতে ব্যস্ত। ঝালের চোটে তাদের চোখ দিয়ে পানি ঝরবে প্রায়। পার্থ খাবার ছেড়ে উঠে তরীর হাত ধরে রান্নাঘরে নিয়ে আসে। অত:পর শক্ত গলায় বলে উঠে,

“ ব্যক্তিগত আক্রোশ আমার উপর একশোবার মেটান আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আজকের পর থেকে আমার আশেপাশের কোনো মানুষের সাথে এধরণের বেহুদা ইয়ার্কি করলে আমার খারাপ রূপ দেখাতে বাধ্য হবো। “

তরী তাচ্ছিল্য ভরা হাসি দিয়ে বলে,

“ খারাপ রূপ নাকি আসল রূপ? “

পার্থ তরীর হাত ছেড়ে দিতেই তরী একটা বড় ফিরনির বাটি হাতে নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যায়। পার্থও তার পিছু পিছু বেরিয়ে আসে। তরী সবাইকে ফিরনি সার্ভ করতে করতে বলে উঠে,

“ এটা আপনাদের পাওনা ছিলো। সেদিন রাতের হিসাব মিটিয়ে নিলাম। এখন নিশ্চিন্তে এটা খেতে পারেন। “

ফিরনি মুখে দিতেই সকলের ঝালে জ্বলে যাওয়া জিভ স্বস্তি খুঁজে পায়। তরী আরেক বাটি ফিরনি নিয়ে পার্থর দিকে এগিয়ে ধরে। পার্থ এক মুহুর্ত তরীকে দেখে হনহনিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। তার পিছু পিছু বাকিরাও বেরিয়ে যায়।

__________

নাস্তার টেবিলে খাবারের বাটির টুনটান শব্দের পাশাপাশি আরো দুটো মানবীর ঠান্ডায় হাচ্চির শব্দ ভেসে আসছে। পৃথা নিজের লাল হয়ে থাকা চোখটা সামান্য কচলে হুমায়ুন রশীদকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে,

“ আরেকটা রুটি দেই পাপা? “

হুমায়ুন পরম আদর মিশিয়ে পুত্রবধূকে বলে,

“ না আম্মু। তুমি আগে তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করো। আমি ঠান্ডার এবং এলার্জির মেডিসিন দিচ্ছি সেট খেয়ে নাও। তাহলে আরাম পাবে। “

পৃথা লজ্জায় নিচের দিকে তাকিয়ে খেতে থাকে। গত রাতের এই তূর্যের সাথে এডভেঞ্চারাস বৃষ্টি বিলাস করতে গিয়েই তার এই ঠান্ডা বেঁধেছে। ঠান্ডার কবল থেকে তূর্যও রেহাই পায় নি। নিজের বউয়ের সাথে দু দন্ড ব্যক্তিগত মুহুর্ত কাটানোর খেসারত হিসেবে ক্রমাগত হাচ্ছি দিয়ে যাচ্ছে সে।

হুমায়ুন রশীদ আড়চোখে ছেলের দিকে তাকায়। অত:পর কিছুটা গলা ঝেড়ে খাবার টেবিল ছাড়ার আগে বলে উঠে,

“ এরপর থেকে রাতে ছাদে যাওয়ার আগে আবহাওয়া চেক করে যাবে। “

কথাটা শুনতেই তূর্যর খাবার গলায় আটকে যায়। পৃথাও লজ্জায় মিশে যাচ্ছে। পাপা তবে বুঝতে পেরেছিলো যে কাল রাতে ছাদে তারাই গিয়েছিলো? হুমায়ুন রশীদ ততক্ষণে নিজের রুমে চলে গিয়েছে। পৃথা একবার আড়চোখে তূর্যর দিকে তাকায়। তূর্যও ততক্ষণে নাস্তা সেরে উঠে গিয়েছে। তার অফিসের সময় হয়ে গিয়েছে। পৃথা তূর্যর পিছু পিছু দরজা পর্যন্ত এগিয়ে আসে। বের হওয়ার আগে তূর্য আচমকা পিছনে ফিরে পৃথার গালে নিবিড়ভাবে ওষ্ঠ স্পর্শ করে। আকস্মিক ঘটনায় পৃথা লজ্জা পায়। তূর্য একইভাবে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,

“ আই লাভ ইউ। “

বলে সে আর এক মুহুর্ত অপেক্ষা করে না। সাথে সাথে বেরিয়ে যায়। ভালো লাগার আবেশে পরিপূর্ণ অষ্টাদশী দরজার সাথে হেলান দিয়ে তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রয়।

__________

“ রুবেল এখনো নির্বাচন প্রত্যাহার ঘোষণা করলো না কেন? “

শামীমের প্রশ্ন শুনে আসিফ বলে উঠে,

“ আজকের সারাদিন তো এখনো সময় আছে। যেকোনো সময়ই দেখবি নিউজ পাবি যে বেডায় গা ঢাকা দিসে। “

পার্থ এতক্ষণ নীরবে বসে ছিলো। তার মাথায় ঘুরছে অন্য চিন্তা। সে রফিকের উদ্দেশ্যে বলে উঠে,

“ রফিক একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে তোমার জন্য। “

“ হ্যাঁ ভাই বলেন। “

“ কাল থেকে তরী আবার হসপিটালে যাওয়া শুরু করবে। উনি যতক্ষণ হসপিটালে থাকবে উনার উপর নজর রাখবে। উনি আসা যাওয়ার সময়ও চোখ কান খোলা রাখবে। মেক শিওর শি ইজ অলরাইট। “

আসিফ অবিশ্বাসের সুরে বলে,

“ ভাই আপনে কি ওই রুবেলের থ্রেটরে সিরিয়াসলি নিয়া নিসেন? আপনার মনে হয় ওর এতো বড় কলিজা আছে? “

পার্থ শান্ত ভঙ্গিতে জবাব দেয়,

“ প্রতিপক্ষের প্রতিটা বিষয়কেই আমি সিরিয়াসলি নেই। রুবেল ইলেকশনে টিকে থাকার জন্য যে কোনো কিছু করতে পারে। তাই সব ধরনের সম্ভাবনাই আমার ভেবে রাখতে হবে। আর তাছাড়া তরীর সেফটিও আমার দায়িত্ব। “

আসিফ মুখ টিপে হেসে বলে,

“ ভাই আপনি তো ভাবীর প্রেমে পইড়া গেসেন মনে হইতেসে। “

পার্থ গরম দৃষ্টিতে তাকায় আসিফের দিকে। অত:পর বলে উঠে,

“ দায়িত্ব আর ভালোবাসার মধ্যে পার্থক্য আছে। আমি শুধু আমার দায়িত্ব পালন করছি। “

__________

এতো বিশাল বাড়ির মধ্যে এই মুহুর্তে সাদিকা বেগম এবং তরী ছাড়া আপাতত আর কেউ উপস্থিত নেই। আফজাল সাহেব আর পার্থ ঘন্টা খানিকের মধ্যেই ফিরে আসবে। শোভনের ফিরতেও সময় লাগবে। সন্ধ্যা বেলায় ঝড়ো হাওয়া বইছে বাহিরে। তরী নিজের রুমে বসে অলস সময় পার করছে। সাদিকা বেগম এতক্ষণ তার সাথে বসে গল্প করছিলেন। কিছুক্ষণ আগেই তিনি নামাজ পড়ার জন্য নিজের রুমে ফিরে যান।

আচমকা ফোনের রিংটোনটা বেজে উঠতেই তরী ফোনের দিকে তাকায়। হসপিটাল থেকে কল আসছে। তরীর ভ্রু কুচকে আসে। এই মুহুর্তে হসপিটাল থেকে কেনো কল আসবে? আজকে তো তার ডে অফ। তবে? ইমার্জেন্সি কোনো কেস নাকি?

তরী দেরি না করে ফোন রিসিভ করে। তার ধারণাই ঠিক হয়। কেবিন নং ৮০৬ এর পেশেন্টের আচমকা শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে। উনার সার্জারির শিডিউল আগামীকাল ছিলো। কিন্তু উনার বর্তমান অবস্থার উপর নির্ভর করে এই মুহুর্তে সার্জারি করা আবশ্যক। যেহেতু উনি তরীর পেশেন্ট সেজন্য তরীর সেখানে উপস্থিত থাকতে হবে।

ফোন রেখে তরী তাড়াহুড়ো করে নিজের গাড়ির চাবি নিয়ে নেয়। হাতে আপাতত তার সময় নেই তাই গায়ের শাড়িটাও বদলায় না সে। ব্যস্ত পায়ে নিচে নেমে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে নিলেই পিছন থেকে সাদিকা বেগমের গলা ভেসে আসে,

“ কোথায় যাচ্ছো তরী? “

“ হসপিটালে যেতে হবে আম্মা। একটা ইমার্জেন্সি কেস। চিন্তা করবেন না আমি গাড়ি নিয়ে যাচ্ছি। “

সাদিকা বেগমের কপালে চিন্তার ভাজ ফুটে উঠে। তিনি কিছু বলবে তার আগেই তরী ব্যস্ত পায়ে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বেরিয়ে যায়। সাদিকা বেগম এতক্ষণ দো তলার সিড়ির পাটে দাঁড়িয়ে ছিলো। এখন তিনি নিচে নেমে আসে। বাহিরের দিকে তাকাতেই দেখে তুফানি তান্ডব চলছে। তার উপর তিনে সন্ধ্যার প্রহর। উনার মনে কিছু একটা কু ডাকছে। মেয়েটা এক দন্ড অপেক্ষাও করলো না। লোক মুখে শোনা কিছু কু প্রথার কথা উনার মাথায় ঘুরছে। নতুন বউদের নাকি এরকম ভর দুপুর, তিনে সন্ধ্যা এবং মাঝ রাত্রে বাহিরে যেতে নেই। এতে নাকি গায়ে খারাপ বাতাস লাগে। সাদিকা বেগম চিন্তিত সুরে বিড়বিড়িয়ে বলে উঠে,

“ আল্লাহ রক্ষা করো। “

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন