ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিকাহ

৮ম পর্ব

লেখক: ফিজা সিদ্দিকী

#নিকাহ্ (৮)

#ফিজা_সিদ্দিকী

বিছানার উপর আড়ষ্ঠ ভঙ্গীতে বসে আছে তৃষা। ড্রেসিং করতে গিয়ে তার হাত কাঁপছিল রীতিমত। রায়েফ গজ কাপড়টা তার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজেই নিজের ড্রেসিং সেরে ফেলল। এরপর আর কোনদিকে তাকিয়ে শুয়ে পড়েছে বিছানায় আগের মতো। তৃষা উঠে গেল। আলমারি থেকে একটা নীল রঙের শাড়ি নিয়ে গোসলঘরে ঢুকলো। মাথায় আর কোমরে বেশ অনেকখানি চোট পেয়েছে সে। ঠান্ডা পানির স্পর্শ পেতেই মাথার পিছনের ক্ষতস্থানটা জ্বলে উঠল মুহূর্তেই। তবুও কোনোক্রমে বেশ সময় নিয়ে গোসল শেষ করে বের হতেই হতবাক সে।

বিছানার উপর দুই পা ভাঁজ করে বসে আছে রায়েফ। বিছানার পাশে রাখা গরম তেল আর ড্রেসিংয়ের জিনিসপত্র। অথচ গোসলে যাওয়ার আগে তো এগুলো চুলে রেখে গিয়েছিল সে। ভ্রু কুঁচকে রায়েফের দিকে তাকিয়ে ভেজা তোয়ালেটা চুলে পাকিয়ে জিনিসপত্রগুলো আবারও জায়গামতো রেখে দিতে গেলে চোখ তুলে তাকালো রায়েফ। তৎক্ষনাৎ প্রশ্ন করল,

"কোথায় আঘাত লেগেছে?"

তৃষা থতমত খেল রায়েফের কথায়। নিজের সমস্যার কথা মুখ ফুটে জানাতে অপারগ সে বরাবরই। সেই ধারা অব্যাহত রাখতে ধীর কন্ঠে বলল,

"আমি ঠিক আছি। তেমন লাগেনি।"

"কেমন লেগেছে সেটা আমাকে বুঝতে দিন। আপনি শুধু বলুন কোথায় লেগেছে।"

রায়েফের বিরক্তিভরা রুক্ষ কণ্ঠের বিপরীতে আর কিছু বলার মতো খুঁজে পেল না সে। হাতের ইশারায় মাথার পিছনের দিকের অংশ দেখিয়ে দিলো সাথে সাথে। রায়েফ উঠে গিয়ে হারিকেনের আলোটা বাড়িয়ে দিলো। এরপর বিছানার দিকে ইশারা করে বলল, "বসুন"

তৃষা বাধ্য মেয়ের মতো রায়েফের দিকে পিঠ করে বসলো। রায়েফ আলতো করে তার চুলগুলো একপাশে সরালো। তৃষার উন্মুক্ত মৃদু রোমশ পিঠের উপর নজর পড়তেই দৃষ্টি আটকে গেল তার। হাতে নেওয়া তরল জাতীয় ঔষধি একবারের বদলে কয়েকবার আঙুল দিয়ে লাগাতে লাগলো ক্ষতস্থানে। আচমকা ধ্যানভঙ্গ হতেই সাথে সাথে সরে এলো। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে উল্টপাশ ফিরে একটা মলম এগিয়ে দিলো তৃষার দিকে। বলল,

"কোমরে লাগিয়ে নিন। আরাম পাবেন।"

ভোররাত অব্দি আর ঘরে ফেরেনি রায়েফ। ধীর পায়ে যখন সে ঘরে ঢুকলো বাহিরের পরিবেশটা তখন ধীরে ধীরে কালো আঁধার কেটে আলো ফোটার অপেক্ষায়। বিছানার দিকে চোখ পড়তেই দেখল বিছানার ধার ঘেঁষে উল্টোপাশ ফিরে উবু হয়ে শুয়ে আছে তৃষা। রায়েফ কোনো কথা না বলে দরজাটা লাগিয়ে ধীর পায়ে বিছানার অন্যপাশে এসে শুয়ে পড়ল।

থেমে থেমে মৃদু কান্নার স্বর ভেসে আসছে। রায়েফ ভ্রু কুঁচকে তাকালো তৃষার দিকে। শব্দটা বড্ড ক্ষীণভাবে ওদিক থেকেই আসছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও রায়েফ নড়েচড়ে সোজা হয়ে চোখ বুঁজলো। মেয়েটাকে এই মুহূর্তে অস্বস্তিতে ফেলতে চায়না সে। কিন্তু তার নড়াচড়া টের পেয়ে এদিকে ফিরল তৃষা। অজানা এক কারণে খানিকটা সরেও এলো রায়েফের দিকে। এরপর তার পাঞ্জাবির হাতাটা নিজের মুঠোয় খামচে ধরে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার মুখের দিকে। রায়েফ এতক্ষণ ঘুমের ভান ধরে চোখ বন্ধ করে ছিল। তৃষার এহেন কান্ড দেখে চোখ খুলে সরাসরি তাকালো তার দিকে। ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাতেই ঠোঁট কামড়ে ধরে নিভু নিভু কন্ঠে বলে ওঠে,

"আমার অস্বস্তি হচ্ছে। শরীর কেমন যেন করছে।"

মাঝরাতে হিঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে তৃষার বলা কথা শুনে তাকে নিজের কাছে টেনে নেয় রায়েফ। চুলের ভাঁজে আঙুল চালাতে চালাতে অস্থির কন্ঠে বলে,

"কেমন লাগছে? কী সমস্যা হচ্ছে, আমাকে বলুন সবটা।"

"আমি যতবার ভাবছি একজন পরপুরুষের স্পর্শ পড়েছে আমার শরীরে, আমার কান্না পাচ্ছে। নিজের শরীরের চামড়া ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে।"

রায়েফ কী করবে ভেবে পেল না তৎক্ষনাৎ। এই সমস্যার সমাধান তার কাছে নেই। চাইলেও মেয়েটার দিকে ঘনিষ্ঠভাবে হাত বাড়াতে পারছে না সে। রায়েফের দ্বিধান্বিত চোখের দিকে কান্নাভেজা চোখে তাকালো তৃষা। বড্ড ধীর কন্ঠে, আবদারের সুরে বলল,

"আমাকে একটু ছুঁয়ে দেবেন? ওই নাপাক স্পর্শগুলোকে আপনার পবিত্রতায় মুছে দেবেন?"

কী যেন ছিল তৃষার কন্ঠে। রায়েফ তৎক্ষনাৎ উঠে বসলো। বাইরে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। তৃষার হাত ধরে টানতে টানতে ঘর থেকে বের হয়ে উঁচু কন্ঠে মাকে ডেকে বলল,

"কাজি ডাকো। আমি এই মুহূর্তে শরীয়ত মোতাবেক বিয়ে করব।"

ইরিনা চমকে উঠলেন ছেলের কথা শুনে। হাত বাড়িতে ছেলের কপালে উষ্ণতা আছে কিনা পরখ করলেন। পরমুহূর্তে তৃষার দিকে তাকিয়ে বললেন,

"ওর শরীর ঠিক নেই মনে হয়। জ্বর তো আসেনি, তবে কিছু একটা তো হয়েছে। তুমি ওকে ঘরে নিয়ে নাও তো! আমি বরং ডাক্তার ডাকি।"

রায়েফের স্বাভাবিক কণ্ঠের বিপরীতে শাশুড়ির অস্বাভাবিক আচরণের কোনো কারণ খুঁজে না পেয়ে অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলো তৃষা। মায়ের অতিরঞ্জিত আলাপে বেজায় বিরক্ত হয়ে রায়েফ তৎক্ষনাৎ বলে বসলো,

"এতো অবাক হওয়ার কী আছে, মা? এসব ধর্ম কর্ম আমি না মানলেও উনি মানেন।"

এতক্ষণে ব্যাপারটা খানিকটা বোধগম্য হলো তৃষার। তবে সেই সাথে চরম অবাকও হলো সে। লোকটা কি তবে নাস্তিক নাকি!

ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে আর হাই তুলতে তুলতে কাজী সাহেব বেরিয়ে এলেন মসজিদ থেকে। এই শেষরাতে তাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে এনেছে রায়েফের দলের দুইজন বিশ্বস্ত সহকর্মী ওবায়েদ আর আসমান। তৃষাকে সাথে নিয়ে মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল রায়েফ। কাজী সাহেব ইশারায় তাদের মসজিদের ভেতরে আসতে বললে সাথে সাথে গুরুগম্ভীর কন্ঠে রায়েফ জানায়,

"বিয়ে এখানেই হবে। এই চৌকাঠের বাইরে।"

রায়েফের কথার উপর আর কিছু বলতে পারল না কেউ। অতঃপর মসজিদের বাইরের দালানে বসেই শরীয়ত মোতাবেক সম্পন্ন হলো দুজনের বিয়ে। তৃষার তরফ থেকে সাক্ষী হিসেবে ছিল আসমান আর রায়েফের তরফ থেকে ওবায়েদ।

ঘরে ফিরে রায়েফ নিজের মতো শুয়ে পড়ল বিছানায়। আর তৃষা ওজু করে এসে নামাজের পাটি বিছিয়ে তাহাজ্জুদ পড়ল। এরপর একেবারে ফজরের নামাজ আদায় করে দীর্ঘ সময় ধরে হাত তুলে দোয়া চাইলো। নামাজ পাটি গুছিয়ে ঘুমন্ত রায়েফের মাথার কাছে এসে তার সারা গায়ে ফুঁ দিলো। রায়েফ জেগেই ছিল। তৃষা যখন মনোযোগ দিয়ে নামাজ পড়ছিল। বিড়বিড় করে ঠোঁট নাড়িয়ে দুয়া চাইছিল, সবটা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিল সে। কিন্তু যেই দুয়া শেষ হলো তৎক্ষনাৎ মুখের উপর হাত দিয়ে চোখ বুঁজে ফেলল সে।

গ্রামের মহিলারা দেখতে আসবে আজ তৃষাকে। ছোটখাটো একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সর্দারের বউ বলে কথা! আবার মেয়েটা নাকি ভারী সুন্দরী। যেমন গায়ের রং তেমন সুশ্রী বদন। লোকমুখে এই কয়দিন বেশ চর্চা হয়েছে সর্দারের বউ নিয়ে। একে অন্যের মুখে প্রশংসা শুনতে শুনতে সকলে একপ্রকার মুখিয়ে আছে এই আয়োজনে সামিল হওয়ার জন্য। ইরিনাও বেশ হাসিমুখে বেশ বড় করে আয়োজন করতে চাইলেন। কিন্তু বাধ সাধলো রায়েফ। কড়া কন্ঠে মাকে জানালো এই অনুষ্ঠানে কোনো পুরুষ মানুষ যেন না আসে। মহিলাদের নিয়ে ছোটখাটো একটা আয়োজন করে নিয়ম পালন করা হোক। ছেলের রাগ, জেদ সম্পর্কে বেশ অবগত ইরিনাও দ্বিমত করলেন না। রায়েফ নিজ দায়িত্বে দলের লোকজনকে নিয়ে আমন্ত্রণ পাঠানো পুরো গ্রামের মহিলাদের। সাথে কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া হলো এই আয়োজনে কোনো পুরুষ মানুষের অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ। ছলে, বলে কিংবা কৌশলে কোনো পুরুষ মানুষের প্রবেশ সনাক্ত করা গেলে তার শাস্তি হবে কঠোর থেকে কঠোরতম।

সকাল থেকেই বাড়ির পিছনে আয়োজন চলছে। বড় বড় হাঁড়ি চড়েছে চুলায়। দুইশ লোকের রান্নার আয়োজন চলছে সেখানে। তবে রায়েফ এসব আয়োজনের কোথাও নেই। ইরিনা নিজ দায়িত্বে দেখভাল করছেন সবটা।

ঘরের মধ্যে প্রবেশ করতেই রায়েফের চোখ পড়ে বিছানায় মুখ নামিয়ে বসে থাকা তৃষার দিকে। আজও তার পরনে মায়ের পুরোনো শাড়ি। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে শব্দ করে কাশি দিলো রায়েফ। হাতে থাকা ব্যাগগুলো বিছানার উপর রেখে তার স্বভাবসুলভ গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলল,

"আপনার জন্য, মা পাঠিয়েছে। তৈরী হয়ে নেবেন।"

এরপর আরও কিছু বলতে চাইছিল বোধহয় সে। কিন্তু তার আগেই বাইরে থেকে ডাক পড়ল তার। ব্যাগগুলো সেখানে রেখেই সাথে সাথে ঘর ছাড়ল সে।

বিছানার উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা 7টা শাড়ি। যার মধ্যে একটা টকটকে লাল রঙের, একটা হালকা গোলাপি, একটা নীল, একটা সাদা, একটা সবুজ, একটা হলুদ আর সবশেষে কালো রঙের একটা শাড়ি আর শাড়ির সাথে প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র। সবগুলো শাড়ির সাথে ম্যাচিং করে কাগজে মোড়ানো কাঁচের চুড়িও রয়েছে। আর সবশেষে দুই জোড়া জুতো। সবকিছু শাড়ি এত সুন্দর যে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে তৃষার। একেবারে যেন তার পছন্দমতো সব। সবগুলো জিনিসই যেন ভীষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাছাই করে আনা হয়েছে।

বাহিরের সবকিছু পরখ করে ঘরে তাড়াহুড়ো করে ঘরে এলেন ইরিনা। তৃষা তখন সবকিছু গুছিয়ে আলমারিতে জায়গামতো রাখছে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে তাকে পিছন থেকে ডাক দিলেন তিনি। বললেন,

"তোমার শাড়ি এসেছে?"

"জি" ছোটো করে জবাব দিলো তৃষা।

"তোমার পছন্দ হয়েছে তো? এতো করে বললাম আমি গিয়ে পছন্দ করে কিনে আনি। কিন্তু ছেলেটা আমার কথা শুনলে তো! সে নাকি নিজে পছন্দ করে কিনবে তোমার জন্য সব।"

তৃষা চমকে উঠলো তার কথা শুনে। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে প্রশ্ন করল,

"উনি কিনেছেন এগুলো?"

"হ্যাঁ। নিশ্চয়ই পছন্দ হয়নি তোমার তাইনা?"

"না না। বেশ পছন্দ হয়েছে আমার।"

কথাটা বলতে গিয়ে চোখ নামিয়ে লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল সে। রায়েফ ঠিক তখনই মায়ের পিছনে এসে দাঁড়ালো। তার মিথ্যা ধরা পড়ায় চোখ ফিরিয়ে এদিকে সেদিক তাকিয়ে আবারও উল্টো ফিরে ঘরের বাইরে পা বাড়ালো।

To be continued......

আপনাদের রেসপন্স কমে যাচ্ছে কেন এত? রেসপন্স করবেন সবাই।

বিঃ দ্রঃ রিচেক দেওয়া হয়নি। ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন