#নিকাহ্ (২০)
#ফিজা_সিদ্দিকী
বিগত তিনদিনের অভুক্ত শরীরটা আর ধকল সহ্য করতে পারল না। তলপেটের অংশ থেকে এক বিশ্রী তেতো স্বাদ ক্রমান্বয়ে উঠে আসতে লাগলো খাদ্যনালী থেকে। অতঃপর গলদেশে পৌঁছাতেই দুই হাতে মুখ চেপে ধরে দৌড় দিলো তৃষা। ঢুকে পড়লো বাথরুমের মধ্যে।
শব্দ পেয়ে ছুটে এসেছেন ইরিনা। রায়েফের নিখোঁজের বিষয়টা সম্পর্কে অবগত হলেও তার মৃত্যুর খবর এখনও অজানা তার। বিগত দিনগুলোতে খানিকটা মূর্ছা পড়লেও ছেলের দায়িত্বপরায়ণতা সম্পর্কে অবগত তিনি। তাই রায়েফের অনুপস্থিতিতে তৃষার মধ্যে যতখানি প্রভাব পড়েছে, তেমন একটা প্রভাব পড়েনি তার উপর।
বমি করতে করতে হাঁটু ভেঙে বাথরুমের মেঝেতে বসে পড়েছে তৃষা। ঠোঁট দুটো তিরতির করে কাঁপছে, গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অবাধ্য অশ্রু। একহাত পেটের উপর রেখে আরও একবার বমি করতে উদ্যত হতেই পিছন থেকে তার কাঁধে হাত রাখলেন ইরিনা। লম্বা, এলোমেলো চুলগুলো কোনোক্রমে খোঁপায় জড়িয়ে পিছন থেকে দুইহাতে আগলে নিলেন পুত্রবধূকে। অতঃপর ডানহাতটা মৃদুভাবে বোলাতে লাগলেন তার পিঠে।
কান্নার দমকে নিঃশ্বাস আটকে আসার উপক্রম তৃষার। শারীরিক যন্ত্রণায় শরীর তখন কাহিল তার। তবুও শরীরের সম্পূর্ণ ভার শাশুড়ির উপর ছেড়ে দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠছে সে। থরথর করে কাঁপছে তার শরীর।
তৃষাকে পরিষ্কার করিয়ে দুইহাতে বুকের সাথে আগলে নিলেন ইরিনা। দুর্বল শরীরটাকে ধরে বিছানায় এনে বসাতেই দ্বিতীয় দফায় শরীর গুলিয়ে উঠলো তার। মোচড় দিতে থাকা তলপেটে হাত রেখে দৌড় দিলো সে বাথরুমের দিকে।
শাশুড়ির বানানো ঔষধি খেয়ে গভীর ঘুমে তৃষা। ইরিনা ইচ্ছে করেই চেতনানাশক দ্রব্য মিশিয়েছিলেন তাতে। এই বাহানায় যদি মেয়েটা একটু বিশ্রাম নিতে পারে!
তৃষার গায়ে চাদর টেনে দিয়ে পাশের ঘরে ঘুমিয়ে থাকা নূরের কাছে গিয়েছিলেন ইরিনা। তন্মধ্যে গভীর ঘুমের মাঝেই অবচেতনে বিড়বিড় করা আরম্ভ করে তৃষা। ঘুমের মাঝেই কাতরাতে কাতরাতে ডাকতে থাকে রায়েফের নাম ধরে। মৃদু গোঙানি তুলে বলে,
"আপনি কোথায়? দস্যু সাহেব, আমার কষ্ট হচ্ছে। আপনি আসুন। আমার কাছে আসুন। "
"উমমম.... আমাকে ছেড়ে আপনি কোথাও যেতে পারেন না..... আপনি ওয়াদা করেছিলেন আমাকে সুরক্ষিত রাখার।"
"আমি আপনাকে চাই... আসুন... আসুন না! আমি হাত বাড়ালে আপনাকে পাচ্ছি না কেন?"
কথাগুলো বলতে বলতেই বিছানায় ছটফট করেছে আর দুর্বল দুই হাত দিয়ে কী যেন হাতড়াচ্ছে বিছানায়।
"আমি আর কিছু চাইনা। কাউকে চাইনা। শুধু আপনাকে চাই। এতটা যন্ত্রণা দেবেন না, আমার কষ্ট হচ্ছে।"
"আমার খুব শীত করছে। আপনি না মাঝরাতে আমার গায়ে কাঁথা টেনে দেন! দেখুন, আমি শীতে কাঁপছি। আমি মরে যাচ্ছি। আপনার বেগমজান মরে যাচ্ছে শীতে। আসুন, ফিরে আসুন।"
বিড়বিড় করে কথাগুলো বলতে বলতে আচমকা তার মাথাটা একপাশে হেলে গেল। গাল বেয়ে সাদা ফেনার মতো তরল কিছু গড়িয়ে পড়তে লাগলো। শরীর কাঁপতে লাগলো বিশ্রীভাবে। দুই হাতের তালু দিয়ে জোরে জোরে বিছানায় আঘাত করতে লাগলো সে। অতঃপর মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ করতে করতে আচমকা থেমে গেল সব। নিথর দেহটা শান্ত হয়ে বিছানায় লুটিয়ে পড়ল।
মাঝরাতের দিকে তৃষাকে দেখতে এসে বিছানায় এমন হুলস্থূল অবস্থা দেখে রীতিমত ভয় পেয়ে যান ইরিনা। কাছে এগিয়ে আসতেই চমকে ওঠেন। তৎক্ষনাৎ চিৎকার দিয়ে ডাক দেন রজার আর আনিসুলকে। রাতের শান্ত, নিস্তব্ধ পরিবেশে সেই চিৎকার তাদের কানে পৌঁছাতে খুব একটা সময় নিলো না। আজ রাতে রজারের ডিউটি ছিল, তাই আনিসুল বৃদ্ধা দম্পতির পাশের কক্ষে ঘুমাচ্ছিল। মাঝারি আকারের এই শয়নকক্ষটা তাদের দুই প্রহরীর জন্যই বরাদ্দ।
হাকডাক আর হুল্লোড় শুনে ঘুম ভেঙে গেল কেয়ারটেকার চাচা আর তার স্ত্রীর। তারাও ছুটে এলেন পড়িমড়ি করে।
তৃষার মাথাটা কোলে তুলে বারবার ঝাঁকাচ্ছেন ইরিনা। গাল বিয়ে গড়িয়ে পড়া ঝাঁক মুছে ফেলে বারবার হাত দিয়ে ঠান্ডা শরীরটা পরখ করছেন। শরীরটা নিথর। সময়ের সাথে সাথে আরও শীতল হচ্ছে। বুকের ভিতর ভয় দানা বাঁধতে শুরু করেছে তার। পালাক্রমে ডেকে যাচ্ছেন সবাইকে। তার হাঁকডাক শুনে ঘুম ভেঙে গেছে নূরের। পাশের ঘর থেকে দৌড়ে এসে বসে আছে আছে সে তৃষার পায়ের কাছে। চোখ দুটো জলে টলটলে তার। তৃষার পা দুটো বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে ঠোঁট উল্টে বিড়বিড় করে আওড়ে যাচ্ছে একই বুলি,
"পুতুল বউ... পুতুল বউ... কী হয়েছে পুতুল বউ?"
তৃষাকে নিয়ে যাওয়া হয় রাজধানী মোগাদিশুতে অবস্থিত একটা বেসরকারি সংস্থা দ্বারা পরিচালিত হাসপাতালে। ১৯৯১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সোমালিয়ার সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিদ্যুৎ, পরিমিত ওষুধ আর অভিজ্ঞ ডাক্তারের ঘাটতি ছিল অনেক। তবুও এই গত বছর, অর্থাৎ ২০০৫ সালে শেষের দিকে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্বারা পরিচালিত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা তুলনামূলক উন্নত।
হাসপাতালে আসার প্রায় ঘণ্টাখানেক পর হুঁশ ফেরে তৃষার। কিন্তু তাকে কোনোভাবেই শান্ত রাখা যাচ্ছিল না বিধায় চেতনানাশক প্রয়োগ করে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে।
কাঁদতে কাঁদতে চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে নূর। বারংবার হাত পা ছুঁড়ছে তৃষার কাছে যাওয়ার জন্য। বাড়িতে নূর একা রয়েছে বিধায় বাকিদেরকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়ে রজার আর কেয়ারটেকার চাচার স্ত্রী রয়ে গেছেন বাড়িতে। বয়স হওয়ার ওষুধ খেয়ে রাতে ঘুমান তিনি। তাই চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার একরাশ ঘুম জড়ো হয় তার চোখে। অতঃপর রজার তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে পাঠিয়ে দেয় নিজের কক্ষে। এখন এই অশান্ত মেয়েটাকে নিয়ে রজার পড়েছে বিপাকে। মেয়েটাকে কোনোভাবেই শান্ত করা যাচ্ছে না। বারবার দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
অবশেষে বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে নূরের সামনে বসে যথাসম্ভব শান্ত কণ্ঠে বলে,
"কান্নাকাটি করলে আপনি অসুস্থ হয়ে যাবেন। দয়া করে শান্ত হন একটু।"
কিন্তু রজারের কথায় কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না নূরের। বরং ভেজা চোখের পাপড়ি তুলে একপলক তার দিকে তাকিয়ে উঠে পালাতে উদ্যত হলো সে। তৎক্ষনাৎ রজার তার বাহু আঁকড়ে ধরে ঝট করে নিজের পাশে বসালো। চোখ মুখ বেজার গম্ভীর করে জোরে একটা ধমক দিলো তাকে। কাঠকাঠ কন্ঠে বলল,
"কথা বললে কানে যায়না? আপনি এমন বেয়াদব হয়েছেন কবে থেকে?"
এতে খানিকটা কাজ হলো বোধহয়। মুহূর্তের মধ্যেই শান্ত হয়ে গেল তার দূরন্তপনা। কিন্তু পরক্ষণেই গোল গোল চোখদুটো দিয়ে ড্যাব ড্যাব করে রজারের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করতে লাগল। সময়ের সাথে সাথে সেই কান্না ফোঁপানিতে রূপ নিলো ধীরে ধীরে। রজার কপাল চাপড়ালো রীতিমত। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই পিদ্দি মেয়েটাকে নিয়ে নাজেহাল সে।
তার ফোঁপানোর শব্দ কানে আসতেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে মাথা এদিক সেদিক ঝাঁকালো সে। নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলো নিজের বাড়ন্ত রাগটাকে। অতঃপর যথাসম্ভব নরম কন্ঠে বলল,
"দয়া করে কান্না করবেন না আপনি।"
নূর আবারও কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। অতঃপর দুইহাতে চোখের পানি মুছে নিয়ে নিজের ডানহাতটা উল্টো করে রজারের সামনে ধরলো। এরপর নাক টানতে টানতে বলল,
"তাহলে এখানে পাপ্পি দিয়ে সরি বলুন। মা যখন বকা দেয়, এখানে পাপ্পি দিয়ে সরি বলে।"
রজার হতবিহ্বল চোখে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ নূরের দিকে। এরপর নূরের প্রতিনিয়ত তাড়া দেওয়া দেখে কোনো উপায় না পেয়ে চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকালো। অতঃপর নূরের ওই ছোটখাটো হাতটা নিজের কালচে হাতের তালুতে স্পর্শ করালো আলতো করে। এরপর মুহূর্তখানিক সময় দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো নিজের ওই বৃহৎ হাতের মাঝে ঠাঁই পাওয়া সর্বদিক দিয়ে অসম ওই হাতটার দিকে। এরপর আলতো করে ঠোঁট স্পর্শ করলো নূরের হাতের উল্টোপিঠে।
চলবে....
কালকে আরও একটা পর্ব দেওয়ার চেষ্টা করব। জলদি কাল বিকালের মধ্যে 700+ রিয়েক্ট আর 200+ কমেন্ট হয় এই পর্বে।
বিঃ দ্রঃ রিচেক দেওয়া হয়নি। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।