#নিকাহ্(২১)
#ফিজা_সিদ্দিকী
কেটে গেছে দুদিন। এই দুদিন তৃষাকে হাসপাতালেই রাখা হয়েছে। দূর্বল শরীর আর মাত্রাতিরিক্ত শক দুটো একসাথে সহ্য করতে পারেনি। ফলস্বরূপ হার্ট ব্লকেজ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল তার। সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে আসতে না পারলে তাকে বাঁচানো সম্ভব হতো না।
সুলায়মান ছায়ার মতো সারাক্ষণ ছিল তাদের কাছে। কখনও ওষুধ, কখনও স্যালাইন আবার কখনও ইরিনাকে জোর করে কিছু খাওয়ানোর জন্য ছোটাছুটি করে গেছে সে রীতিমত। তবে এখনও অব্দি ইরিনাকে জানানো হয়নি রায়েফের মৃত্যুর খবরটা। মানুষটা মৃত কিনা তার সঠিক প্রমাণও নেই তাদের হাতে। জাহাজে ওটার ঠিক আগের মুহূর্তে রায়েফ তার পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে সুলায়মানের হাতে দিয়েছিল। অতঃপর নিরেট কন্ঠে আদেশের সুরে বলেছিল,
" আমার কোনো খবর না পাওয়া গেলে, এটা ওনাকে দিও। আর খেয়াল রেখো তার, আমি আর সে আলাদা নই।"
রায়েফের ইশারা সেদিন বেশ ভালোভাবেই বুঝেছিল সে। উনি বলতে সে যে একমাত্র তাদের সর্দারনীকে সম্বোধন করে, এ কথা অজানা নয় তার। তাই একদিকে রায়েফের জন্য চিন্তায় ভীতসন্ত্রস্ত হৃদয়কে সামলে নিয়ে সর্দারের দেওয়া গুরুদায়িত্ব পালন করতে বদ্ধপরিকর হয়েছিল।
শেষ অব্দি সুলায়মান তার দায়িত্ব পালন করেছিল। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে ইরিনাকে কীভাবে জানাবে তাও জানে না সে। রায়েফ যে আদৌ মৃত, তারও তো কোনো প্রমাণ নেই তাদের কাছে। তাই অপেক্ষা করছে তৃষার সুস্থ হওয়ার। সে সুস্থ হলে ইরিনাও জেনে যাবেন বিষয়টা।
তৃতীয় দিন জ্ঞান ফেরার পর থেকেই আর এক মুহূর্ত হাসপাতালে থাকতে চায়নি তৃষা। অগত্যা তাকে নিয়ে আসা হয় বাড়িতে। এই দুইদিনে ইরিনার শরীরটাও বেশ কাহিল। তাই তৃষাকে নিজের ঘরে দিয়ে তিনি একটু বিশ্রাম নিতে চাইছিলেন। কিন্তু ঘরের চৌকাঠে পা রাখতেই তৎক্ষনাৎ হাঁটু গেঁড়ে মেঝেতে বসে পড়ল তৃষা। পাগলের মতো কিছু একটা খুঁজে বেড়াতে লাগলো পুরো ঘরে। ইরিনা তাকে ধরার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কুলিয়ে উঠলেন না তার শক্তির সাথে। কোনো এক অশরীরী ভর করেছে যেন তার শরীর জুড়ে। পাগলের মতো জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে যখন কোথাও কিছু খুঁজে পেলো না, অবশেষে ক্লান্ত শরীরটা লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে।
শীতল মেঝেতে লেপ্টে নারীদেহ। একহাত মাথার পিছনে দিয়ে অন্যহাত দিয়ে মুখ চাপা দিয়েছে সে। পুরো ঘর জুড়ে পিনপতন নীরবতা তখন। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু অবিরাম ধারায়। অতঃপর নদীর মতো আঁকা বাঁকা পথ বেয়ে লুটিয়ে পড়ছে শীতল মেঝেতে।
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তৃষার ফোঁপানোর শব্দ বাড়ল। শরীর কেঁপে উঠছে তার ক্ষণে ক্ষণে। মুখ দিয়ে বিড়বিড় করে উচ্চারণ করছে কিছু একটা। ইরিনা আর সহ্য করতে পারলেন না এই দৃশ্য। মায়ের মন এতক্ষণে কিছু একটা আঁচ করতে পারল বোধহয়। ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে গেলেন তিনি। একেবারে নিঃশব্দে তৃষার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেও কীভাবে যেন টের পেয়ে গেল মেয়েটা। ওভাবে শুয়ে থেকেই জড়িয়ে ধরলো তার পা। ইরিনা ঝুঁকলেন। হাঁটু মুড়ে বসলেন তার সামনে। মেয়েটা তৎক্ষনাৎ বুক ভাঙ্গা কান্নায় লুটিয়ে পড়ল তার বুকে। শব্দ করে কেঁদে উঠলো। মুখটা তার কানের একদম কাছাকাছি থাকায় স্পষ্ট শুনতে পেলেন তাকে বিড়বিড় করে কিছু একটা বলতে।
"আমিই কেন হারাই বারবার! কেন এতটুকু সুখ আমার কপালে সয় না? আমি কি এতটাই খারাপ, মা?"
ইরিনা কিছু বলে উঠতে পারলেন না। তার আগেই ফোঁপাতে ফোঁপাতে দ্বিতীয় দফায় বলে উঠল তৃষা।
"সব হারিয়ে আমি শুধু এই মানুষটাকেই পেয়েছিলাম। তারপর একদিন সবকিছু ছেড়ে, সব হিসেব-নিকেশ ভুলে, নিজের পুরো পৃথিবীটাই ওনার হাতে তুলে দিয়েছিলাম। ওনার কঠোরতা মেনে নিয়েছি, অবহেলা মেনে নিয়েছি, রাগ মেনে নিয়েছি, বৈরাগী মনটাকেও আপন করে নিয়েছি। কখনও অভিযোগ করিনি। তবু খোদা কেন আমার সঙ্গে এমন করলেন?
মা... তুমি তো মা। সন্তানের জন্য মায়ের দোয়া নাকি কখনও ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। তুমি খোদার কাছে একবার বলো না! শুধু একবার বলো, উনাকে ফিরিয়ে দিতে। বলো, আমার জন্য, এই ভাঙা সংসারের জন্য তিনি যেন আবার ফিরে আসেন। এই বিশাল পৃথিবীতে উনি ছাড়া যে আমার আর কেউ নেই, মা!
আমি আর কোনো অভিযোগ করব না। উনি বকা দিলে মাথা নিচু করে শুনব। অবহেলা করলে চুপচাপ ওনার পাশেই পড়ে থাকব। দূরে সরে যেতে বললে দূরেই বসে থাকব। অপেক্ষা করব। সারাজীবন অপেক্ষা করব। আমাকে ওনার জীবন থেকে চলে যেতে বললে, আমি তাই করব। একবিন্দু পরিমাণ অভিযোগ না রেখে চলে যাব। শুধু জানব, মানুষটা কোথাও তো আছেন। এই পৃথিবীরই কোনো এক প্রান্তে শ্বাস নিচ্ছেন।
আমি ওনাকে আর কোনো কষ্ট দেব না। নিজের সব অভিমান, সব কান্না, সব চাওয়া-পাওয়া বুকের গভীরে চাপা দিয়ে রাখব। শুধু একবার... শুধু একবার ওনাকে ফিরিয়ে দাও। উনি ছাড়া আমি কীভাবে বাঁচব, মা?
এই ঘরে ঢুকলেই বুকটা হুহু করে ওঠে। একসময় এই দেয়ালজুড়ে ওনার উপস্থিতি ছিল। বাতাসে ওনার গন্ধ মিশে থাকত। এখন ঘরটা একই আছে, অথচ কোথাও ওনার অস্তিত্ব নেই। চারদিকে শুধু শূন্যতা। এমন এক শূন্যতা, যা আমাকে গিলতে আসে প্রতিনিয়ত।
ওনার ওই সবুজ দুটো চোখ, সেই চোখে গভীর মাদকতা নিয়ে আর কোনোদিন কি আমার দিকে তাকাবেন না? সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, যেটাকে একসময় ভয় পেতাম, আজ সেই দৃষ্টির জন্যই বুকের ভেতরটা ছটফট করছে। মানুষটা নেই, অথচ প্রতিটি মুহূর্তে মনে হয় এই বুঝি দরজাটা খুলবে, এই বুঝি ভারী পায়ের শব্দ ভেসে আসবে!
মা, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। এমন কষ্ট, যার কোনো ভাষা নেই। মনে হয়, বুকের ভেতর কেউ ধীরে ধীরে ধারালো তলোয়ার চালিয়ে যাচ্ছে। এই যন্ত্রণা নিয়ে কীভাবে মানুষ বেঁচে থাকে, আমি জানি না। তুমি শুধু খোদার কাছে দোয়া করো, মা। বলবে, তিনি যেন আমার মানুষটাকে ফিরিয়ে দেন। কারণ পৃথিবীতে এমন অনেক কিছু আছে, যেগুলো ছাড়া মানুষ বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু আমার পৃথিবীটা তো ওই একজন মানুষকে ঘিরেই ছিল। সেই যদি না থাকে, তবে এই পৃথিবীটা আমার জন্য অর্থহীন। এরচেয়ে ভালো আমাকে মেরে দাও। আমার গলা চেপে ধরে মুক্তি দাও আমাকে এই যন্ত্রণা থেকে।"
টেনে টেনে নিঃশ্বাস নিচ্ছে তৃষা। একটানা এতগুলো কথা বলতে বলতে যেন শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। কথার শেষ প্রান্তে এসে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। নিস্তেজ শরীরটা শাশুড়ির বুকে এলিয়ে দিল। দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে। পরমুহূর্তেই বাঁধভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। বুকের গভীরে জমে থাকা এতদিনের সমস্ত আর্তনাদের একসাথে বিস্ফোরণ ঘটেছে যেন! তার প্রতিটা হাহাকার ঘরের চারদেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসছে বারংবার।
ইরিনা কিছু বললেন না। বলবার মতো কোনো কথা তার জানা নেই। শুধু ধীরে ধীরে তৃষার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন। ছোটবেলায় ছেলে ঘুমোতে না পারলে ঠিক এভাবেই পিঠে হাত বুলিয়ে দিতেন তিনি। আজ সেই হাতই ছেলের বিধবা স্ত্রীর পিঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কী অদ্ভুত নিয়তি!
তার নিজের চোখও ভিজে এসেছে। তবুও কাঁদলেন না তিনি। মায়েরা বোধহয় সহজে কাঁদতে পারে না। অথচ তার নিজের বুকের ভেতরটাও তো ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। জীবনে তিনি কম কষ্ট দেখেননি। একের পর এক ঝড় পেরিয়ে এসেছেন এ অব্দি। এমন অনেক যন্ত্রণা এসেছে, যেগুলো হয়তো আজকের যন্ত্রণার চেয়েও বড়ো। তবুও আজ মনে হচ্ছে, সেসব কষ্টকে ছাপিয়ে একটাই শূন্যতা তার পুরো অস্তিত্ব গ্রাস করে নিয়েছে। সন্তানহারা হওয়ার শূন্যতা। প্রতিটা নিঃশ্বাসে যেন অদৃশ্য কোনো ধারালো অস্ত্র তার বুক চিরে যাচ্ছে। তবু নিজের কান্না গিলে ফেলেন তিনি। কারণ তার বুকের সঙ্গে লুটিয়ে থাকা এই মেয়েটার কান্না আরও অসহায়, আরও নির্মম। কীভাবে সামলাবেন তিনি মেয়েটাকে? কীভাবে বোঝাবেন, যে মানুষটার জন্য ওর প্রতিটা মোনাজাত, প্রতিটা স্বপ্ন, প্রতিটা নিঃশ্বাস, সেই মানুষটা আর নেই। প্রিয়জনকে হারিয়েও মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়। জীবন তো আর থেমে থাকার বস্তু নয়!
কিই বা বোঝাবেন তিনি! মেয়েটা তো সবে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেছিল। বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে সংসার গড়তে চেয়েছিল। অভিযোগ না করে যেটুকু পেয়েছিল, সেটুকুই বুকভরা ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখতে চেয়েছিল। অথচ নিয়তি এমন নিষ্ঠুরভাবে তার থেকে সবকিছু কেড়ে নিল যে, স্বপ্নগুলো পূর্ণতা পাওয়ার আগেই ভেঙে চুরমার গেল।
ইরিনা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন তৃষাকে। কখনো কখনো মানুষকে শান্তনা জন্য কোনো শব্দ প্রয়োগ করতে লাগে না। লাগে শুধু একটা আশ্বস্ত বুক, যেখানে নির্দ্বিধায় ভেঙেচুরে কাঁদা যায়।
তৃষার এলোমেলো চুলে আলতো করে হাত রাখলেন ইরিনা। বুকের ভেতর হুহু করে উঠল। এই মেয়েটার দিকে তাকালে তার নিজের ছেলের মুখটাই ভেসে ওঠে। কত স্বপ্ন ছিল তার! ছেলেটা সংসারী হবে। হয়তো একদিন এই ঘরেই ছোট্ট ছোট্ট পদধ্বনিও শোনা যাবে। কিন্তু কিছুই হলো না। নিয়তি যেন এক মুঠো সুখ দেখিয়ে সবটুকু কেড়ে নিল।
তৃষা তখনও কাঁদছে। ইরিনা তাকে আরও শক্ত করে বুকে টেনে নিলেন। একটা মেয়ে তার স্বামীকে হারিয়ে কাঁদছে।আর একজন মা নিজের বুকের ভেতর সন্তানকে হারানোর যন্ত্রণা কবর দিচ্ছেন।
দুই মাস কেটে গেছে। সময় নাকি সব ক্ষত সারিয়ে দেয়! কথাটা ইরিনার কাছে আজ বড় মিথ্যে মনে হয়। সময় ক্ষত সারায় না, মানুষকে শুধু ক্ষত বয়ে নিয়ে বাঁচতে শিখিয়ে দেয়।
সেদিনের পর থেকে তৃষাই হয়ে উঠেছে তার একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান। নিজের শোককে বুকের গভীরে চেপে রেখে তিনি দিনরাত আগলে রেখেছেন মেয়েটাকে। আর কেউ না জানুক, তিনি তো জানেন, তার ছেলেটা এই মেয়েটাকে কতটা ভালোবাসত। মায়ের চোখকে ফাঁকি দেওয়া বড় কঠিন। সন্তানের কণ্ঠের সামান্য পরিবর্তন, চোখের ভাষা, মুখের নীরবতা কোনোকিছুই মায়ের অজানা থাকে না। ছেলের সেই নীরব ভালোবাসাও তার অগোচরে ছিল না। তাই আজ মনে হয়, তৃষাকে আগলে রাখা মানেই যেন ছেলের শেষ আমানতটুকুকে আগলে রাখা।
কিন্তু ইদানীং তৃষার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা তাকে প্রতিদিন একটু একটু করে গ্রাস করছে। আজ তিনি আছেন বলেই মেয়েটার দিকে কেউ চোখ তুলে তাকানোর সাহস পায় না। তার একটুখানি ইশারাই যথেষ্ট। কিন্তু এই ক্ষমতা আর কতদিন থাকবে? একদিন না একদিন নতুন সর্দার আসবে। নতুন ক্ষমতা, নতুন নিয়ম, নতুন মানুষ। সেদিন?সেদিন তৃষার পাশে দাঁড়াবে কে?
এই দেশে কোনো আইন নেই। কোনো শৃঙ্খল নেই। এখানে ক্ষমতাই শেষ সত্য। যার হাতে ক্ষমতা, তার মুখের কথাই আইন হয়ে যায়। আর যার ক্ষমতা নেই, তার আর্তনাদ শোনার মতো কেউ থাকে না।
অপরাধ এখানে লুকিয়ে হয় না। দিনের আলোয়, মানুষের চোখের সামনেই ঘটে। মনে হয় যেন বাজারে ফলমূল কেনাবেচার মতোই এরও প্রকাশ্য বেচাকেনা চলে।
ইরিনার বুকের ভেতর হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। যদি একদিন তিনি আর না থাকেন! যদি কোনো ক্ষমতালোভী মানুষের কুদৃষ্টি এই অসহায় মেয়েটার ওপর পড়ে! যদি তার ছেলের শেষ স্মৃতিটুকুকেও তিনি রক্ষা করতে না পারেন! তাহলে ছেলের মুখোমুখি হয়ে কিয়ামতের দিন তিনি কী জবাব দেবেন?
ভাবনাটা মাথায় আসতেই তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন শীতলতায় ছেয়ে গেল। তৎক্ষনাৎ কি যেন ভাবলেন, অতঃপর খবর পাঠালেন সুলায়মানকে।
রায়েফের পর এই দলের সবটুকু দায়ভার নিজের কাঁধে উঠিয়ে নিয়েছে সুলায়মান। দায়িত্বশীল হয়েছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। বর্তমান সময়টায় সে ভীষণ ব্যস্ত। দম ফেলার ফুরসত নেই। অথচ ইরিনার ডাক পেয়ে আর এক মুহূর্ত দেরি করেনি সে। সব কাজ ফেলে ছুটে এসেছে এই বাড়িতে।
আজকাল তৃষা রোজ নিয়ম করে অশ্বশালায় যায়। ঘোড়াগুলোকে ঘাস দেয়, তাদের কাছে বসে থাকে কিছুটা সময় চুপচাপ। এরপর আবার ফিরে আসে নিজের ঘরে। সেদিন পাগলের মতো খুঁজেও রায়েফের দেওয়া শেষ চিঠিটা পায়নি সে। পরে অবশ্য রজার নূরের হাত দিয়ে চিঠিটা পাঠিয়েছিল তার কাছে। সেদিন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিঠিটা নিজের কাছে যত্ন করে রেখে দিয়েছিল সে।
সময়টা বিকাল। মাঠ থেকে ঘাস কেটে তৃষা ঘোড়াদের খাবার দিতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই সুলায়মানকে অন্দরমহলে প্রবেশ করতে দেখে একপলক তাকালো তার দিকে। অতঃপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেল অশ্বশালার দিকে। না কোনো কথা, না সৌজল্যমূলক হাসি। এই জিনিসটা এই প্রথম নয়। বরং এখন আর হাসে না মেয়েটা। কথাও বলে না খুব একটা প্রয়োজন ছাড়া। সুলায়মান থেমে গিয়ে একপলক তাকালো মেয়েটার দিকে। অতঃপর তপ্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পা বাড়ালো অন্দরমহলের দিকে।
চার দিন পর...
হঠাৎই মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠেছিল তৃষার। চোখের সামনে সবকিছু কেমন ঝাপসা হয়ে এল। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই শরীরটা আর সায় দিল না। মুহূর্তের মধ্যেই নিথর দেহটা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
শব্দ পেয়ে ইরিনা ছুটে এসে তৃষার মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিলেন। মেয়েটার ফ্যাকাশে মুখটা দেখে বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল তার। গত কয়েক সপ্তাহে মেয়েটার শরীর যে কতটা ভেঙে গেছে, তা তিনি ঠিকই খেয়াল করেছেন। গাল দুটো কেমন বসে গেছে, চোখের নিচে নেমেছে গাঢ় কালি। খাওয়া-দাওয়া বলতে কিছুই নেই। তিনি জোর করে মুখে দু-চার লোকমা তুলে না দিলে, হয়তো সারাদিন এক ফোঁটা পানিও খেত না মেয়েটা।
কয়েক দিন ধরেই তিনি ভাবছিলেন, তৃষাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন। কিন্তু তার আগেই এমনটা ঘটে গেল।
রজার তাড়াহুড়ো করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল ডাক্তার আনতে। ডাক্তার এসে বেশ কিছুক্ষণ ধরে তৃষাকে পরীক্ষা করলেন। রক্তচাপ মাপলেন, প্রাথমিক কিছু চিকিৎসা দিলেন। তারপর কয়েকটা পরীক্ষার পরামর্শ দিয়ে শেষে গম্ভীর মুখে বললেন,
"কাল সকালেই ক্লিনিকে নিয়ে আসবেন। কিছু পরীক্ষা জরুরি।"
এর বেশি কিছু বললেন না আর। তবে তার চোখে মুখে লেপ্টে থাকা গভীর চিন্তার রেখা ইরিনার চোখ এড়াল না। অজানা এক আশঙ্কা বুকের ভেতর বাসা বাঁধল তার।
পরদিন সকালেই সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হলো। দুপুর অব্দি অপেক্ষা করলেন তারা রিপোর্টের জন্য। রিপোর্ট হাতে নিয়ে ডাক্তার কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকালেন ইরিনার দিকে। চিন্তিত মুখটায় এখন একফোঁটা মৃদু হাসি ফুটে উঠেছে।
"অভিনন্দন। উনি মা হতে চলেছেন।"
কথাটা শুনে থমকে গেলেন ইরিনা। বিশ্বাসই করতে পারছেন না যেন। তার চোখের কোণে জমে থাকা জল এক নিমিষে গড়িয়ে পড়ল। এতদিনের চাপা ভয়, শোক আর দুশ্চিন্তার ভেতর দিয়ে হঠাৎ যেন একটা আশার আলোর দেখা মিলল।
চেম্বার থেকে বের হয়ে তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তৃষাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন। কাঁপতে থাকা হাতে আলতো করে চুমু খেলেন ওর কপালে। চোখ বেয়ে টুপটুপ করে জল পড়ছে তার।
তৃষা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। এখনও সে পুরো বিষয়টা বুঝে উঠতে পারেনি। খুশিতে তিনি আবারও তৃষাকে বুকে টেনে নিলেন। হয়তো এই অনাগত ছোট্ট প্রাণটাই তৃষাকে আবার বাঁচতে শেখাবে।
------------------------
রাতের কালো চাদর সরিয়ে ভোরের আলো তখন ধীরে ধীরে আকাশে ফুটে উঠছে। ঠিক সেই সময় চারদিক থেকে ভেসে এলো ফজরের আজান। তৃষা ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠল। কলঘরে গিয়ে অজু করল। ঠান্ডা পানির স্পর্শে শরীর কেঁপে উঠলেও চোখে মুখে কোনো পরিবর্তন এল না তার।
জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়াল সে। দীর্ঘ সময় ধরে নামাজ আদায় করল। তারপর দুহাত তুলে রইল স্রষ্টার দরবারে। ঠোঁটদুটো মৃদু কাঁপছে তার। শব্দগুলো খুব ক্ষীণ।
একসময় দোয়া করতে করতেই চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার। নীরবে কাঁদল সে। স্রষ্টার কাছে নিজের সমস্ত ভাঙাচোরা হৃদয় উজাড় করে দিল। কখনও মিনতি করল, কখনও অভিমান করল। আবার কখনও এমন সব প্রশ্ন করল, যার উত্তর হয়তো এই পৃথিবীর কোনো মানুষ জানে না। শেষ অব্দি শোনা গেল কয়েকটা ক্ষীণ শব্দ.
"কেন এত অল্প সময়েই সব শেষ হয়ে গেল? কেন ভালোবাসার মানুষগুলোই সবচেয়ে আগে হারিয়ে যায়? কেন আমার সন্তানকে জন্মের আগেই পিতৃহারা করলে?"
দীর্ঘক্ষণ পর দুহাত মুখে বুলিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল তৃষা। অতঃপর আলমারি খুলে রায়েফের একটা শাল গায়ে জড়িয়ে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
চারপাশ তখনও আধো অন্ধকার। ভেজা ঘাসের ডগায় শিশির জমেছে। কুয়াশার পাতলা চাদরে ঢাকা পথ ধরে ধীর পায়ে হাঁটতে লাগল সে। কোনো গন্তব্য নেই। পা দুটো যেন আপনাআপনি তাকে কোথাও নিয়ে চলেছে।
হাঁটতে হাঁটতে একসময় এসে দাঁড়াল সেই নদীর ধারে।এই নদী, এই বাতাস, সবকিছুই একই রকম আছে। শুধু নেই একজন মানুষ। এই নদীর পাড়েই একদিন রায়েফের পাশে দাঁড়িয়ে সূর্য ডোবা দেখেছিল তৃষা। সেদিন সন্ধ্যা ছিল, নদী ছিল, বাতাস ছিল। ছিল রায়েফের নীরব উপস্থিতি। তার গভীর সবুজ চোখে তখন অদ্ভুত এক প্রশান্তি ছিল। আজও নদীটা একইভাবে বয়ে চলেছে।শুধু পাশে দাঁড়িয়ে নেই সেই মানুষটা, যার উপস্থিতিতেই একদিন পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য তার কাছে পরিপূর্ণ মনে হতো।
তৃষা ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। পরণের শালটা দিয়ে নাক ঢেকে নিলো। অতঃপর জোরে একটা নিঃশ্বাস টেনে নিলো। যেন শালটা থেকে মানুষটার শরীরের ঘ্রাণ ভেসে আসছে।
নদীর শীতল বাতাস এসে তার এলোমেলো চুল ছুঁয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, ঠিক পেছনেই যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে। যেমন করে একদিন দাঁড়িয়েছিল রায়েফ।
আচমকা পিছনে ফিরল তৃষা। আর ঠিক তখনই একটা অবয়ব চোখে পড়লো তার। একটা উষ্ণ নিঃশ্বাস। পিছনে ফিরতে গেলে তৎক্ষনাৎ একজোড়া পুরুষালী বাহু তার নাক মুখ চেপে ধরলো। এরপর আর কিছু মনে নেই তার। যখন হুঁশ ফিরল, নিজেকে আবিষ্কার করলো একটা বিলাসবহুল বিছানায়। একটা তপ্ত নিঃশ্বাস তার চোখ, মুখ, শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে যেন। একটা হাত গোলগোল করে আঙুল ঘোরাচ্ছে তার উদরের মাঝে।
#চলবে....
বিশাল বড়সড় পর্ব দিয়েছি আজকে। যদি বেশি বেশি কমেন্ট না পাই তো আর এমন বড় পর্ব দেব না😒