ফন্ট সাইজ:
থিম:
গোধূলির গাঙচিল

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: তারিন ভূঁইয়া মুনা

গোধূলির_গাঙচিল 

(মার্ডার মিস্ট্রি সাসপেন্স থ্রীল)

পর্ব-৬
মাগরিবের আজানের ধ্বনিতে প্রকৃতি মাতোয়ারা, আকাশে গোধূলিলগ্ন, পাখিদের বাড়ি ফেরার তারা। কিছু মানুষ নিয়মের বেড়াজালে পৃষ্ঠ হলেও তাদের অন্তর হয় ভবঘুরে - ছন্নছাড়া। সাফায়াত এদের দলেরই একজন।অফিসের কাজ শেষ করে এ কংক্রিটের ব্যস্ত শহরের রাস্তা ধরে সে এগিয়ে যাচ্ছে নির্ধারিত গন্তব্যে। 
_____________
শতাব্দী টিম নিয়ে বুশরা মার্ডার স্পট এ বেশ খুঁতিয়ে দেখছে আশপাশের পরিবেশটা, ছিমছাম পরিবেশ। 
সন্ধ্যার ঘুটঘুটে আধার আশেপাশে পাখিদের কিচিরমিচির আর ধু ধু কুয়াশার জাল চারিধারে, মূহুর্তেই অন্তরআত্মায় কাঁপন ধরাতে যথেষ্ট । পাঁচ জন পুলিশ সদস্য টর্চের আলোয় সাবধানতা অবলম্বন করে ঝোপঝাড় পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। সামনে দুইতলা প্রকান্ড এক বাড়ি। বাড়িখানা ব্রিটিশ আমলের তৈরি হবে হয়তো। পাথরের দেয়ালের গায়ের তাজা জীবন্ত শ্যাওলাগুলো জানান দিচ্ছে এ বাড়ি হয়তো অনেক বছরের পরিত্যক্ত। শতাব্দী হাতের ইশারায় টিমের সদস্যদের সাবধান করে দিলো। সকলে নিজ নিজ বন্দুক নিয়ে বাড়ির চারিধার ঘিরে ফেললো।এরপর ধীরে ধীরে বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করতেই কতগুলো বাদুড় উড়ে গেলো শতাব্দীর মাথার উপর দিয়ে। এ অন্ধকার অমানিশায় শতাব্দীর মাথা ব্যাথা শুরু হলো, প্রচন্ড মাথা ব্যাথা, তবে কী এখনই জেগে উঠবে অশরীরীরা? যাদের বসবাস শতাব্দীর মস্তিষ্কে?
টিমের সকলে আশেপাশে ভালো ভাবে লক্ষ্য করে সামনে এগিয়ে এলো, দেখা গেলো সবাই এসে ড্রয়িং রুমে জমায়েত হয়েছে। শতাব্দী আবিরের ফিসফিসে নিজেকে সামলে নিলো কিছুটা।
“ম্যাম এ বাড়িতে বোধহয় কেউ নেই।” (আবির)
আবিরের কথা শেষ না হতেই সরু কান্নার আওয়াজ পরিবেশ ভারী করলো। কে এভাবে কাঁদছে? সকলে সতর্ক হলো আরও এক দফা।শতাব্দী ইশারা করতেই সকলে খুঁজতে লাগলো কান্নার উৎস।
দুইতলার কর্ণারের রুমটিতে টিমটিম আলোর ঝলকানি দেখা যাচ্ছে বদ্ধ দরজার কাঠের ফাঁক ফুকোরে।শতাব্দী ধীরে ধীরে দরজাটি খুলে ফেললো। সামনে তেরোজন মেয়েকে হাত, মুখ বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে। এটাই সন্দেহ করেছিলো শতাব্দী এটা কোন চক্রের কাজ যারা মেয়েদের ছলচাতুরী করে ঢাকায় নিয়ে আসে। তবে সামনের চেয়ারে 
বেঁধে রাখা আধমরা মধ্যবয়সী লোকটিকে দেখে শতাব্দীর বেশ খটকা লাগলো। একেও কী কিডন্যাপ করা হয়েছে?
পুলিশ সদস্যরা মেয়েদের মুক্ত করলো, শতাব্দী বন্দুক নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো লোকটির দিকে।মেয়েদের মাঝে একটি মেয়ে শতাব্দীর উদ্দেশ্য বললো,
“ম্যাম ওই জানোয়ারকে ছাড়বেন না।” 
বলেই হু হু করে কেঁদে দিলো। শতাব্দী দু পা পিছিয়ে এসে আবিরকে ইশারা করলো ওই লোককে এ্যারেস্ট করে জিপে নেয়ার জন্য । সকল মেয়েদের বের করে আনা হলো সযত্নে। সবার বার হওয়ার পরে টর্স হাতে শতাব্দী রুমের চারপাশটা ভালোভাবে নজর বুলাতেই নজর পরলো আধপোড়া সিগারেটের দিকে। সিগারেট এর গোড়াতে এখনও ধোঁয়া উড়ছে বলে ঠেকলো, শতাব্দী হাঁটু ভেঙে বসলো, হাতে গ্লাভস পরে তুলে নিলো সিগারেট টি।হাতে নাড়িয়ে দেখলো, কেমন পরিচিত ঠেকছে, শতাব্দী মুখে হাসির রেখা টেনে বললো, আর যাই হোক অপরাধী কোন না কোন ভুল করবেই।
___________________
টানা চার ঘন্টা থেরাপি দেয়ার পরে লোকটি মুখ খুললো, এ চক্রের প্রধান কাজ মেয়েদের পাচার করা।এক্ষেত্রে টার্গেট করা হয় বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলোর হতদরিদ্র পরিবারের মেয়েদের। তাদের টাকার লোভ দেখিয়ে কিংবা মডেলিংএ সুযোগ দেয়ার কথা বলে ব্রেন ওয়াশ করা হয়। এরপর এদের গুপ্তআস্তানায় রাখা হয় এক সপ্তাহের ও বেশি সময়। তখন এসব মেয়েদের কাজ শুধুমাত্র মনোরঞ্জন করা। এর পরে বিশেষ ভাবে তাদের বর্ডার ক্রস করানো হয়।
বুশরা বারিক ও ছিলো এমন একজন ভিক্টিম।তার সাথেও এই নরপশু গুলো বারকয়েক ঘৃণ্য কাজ করেছে।
 মেয়েদের খেতে দেয়া হতো দুই দিনে একবার। আর কড়া পাহারায় হাত খুলে দেয়া হতো তখনই।তবে বুশরা নামক মেয়েটি ছিলো বেশ লাস্যময়ী, সুতরাং পাহারারত প্রত্যেকেই তার প্রতি আকৃষ্ট এবং নমনীয় ছিলো। যার ফায়দা তুলে গত এক মাস আগে সে পালিয়ে যায়। ভয় ছিলো সে হয়তো সকল তথ্য ফাঁস করে দিবে তাই পুরোদস্তুর খোঁজ লাগানো হয়। তাকে খুঁজে পাওয়া তেমন কঠিন ছিলো না কারণ সে ঢাকায় তেমন কিছুই চিনতো না।
“মেয়েটির অতিরিক্ত চালাকিতে রেগে গিয়ে মেয়েটির উপর নির্যাতন করা হলে এক পর্যায়ে বুশরা অকথ্য ভাষায় গালি দিতে শুরু করে, ফলে আমার জিদ তীব্র হয়ে যায়। তখন বাকি মেয়েদের সামনেই তার পেটে একের পর এক ছুরিকাঘাত করলাম যখন বুঝলাম সে আর জীবিত নেই তখন লাশটাকে কী করবো ভাবছিলাম সকলে মিলে। এর মাঝেই সংবাদ মাধ্যমে প্রীতী মার্ডার কেইস এর ঘটনা ছড়িয়ে পরলো। সকলে মিলে ঠিক করলাম মৃত মেয়েটির দেহে সায়ানাইড ইনজেকড করে তাকে যদি ফেলে আসা হয় তবে পুলিশ এটাকেও প্রীতী মার্ডার কেইস এর মতো ভাববে। তাদের ধারণাতেও আমরা আসবো না।এসবের কিছুই আমাদের বস জানতেন না, তিনি জানতে পারলে আমাদেরকেই মেরে ফেলতেন।”
শতাব্দী চেয়ারে বসা লোকটির বুকে সজোরে লাথি মারতেই সে ছিটকে পরলো মেঝেতে, কাঠের চেয়ারটি ভেঙে গেলো।তীব্র ঘৃণায় শতাব্দী থু থু ছুড়লো লোকটির মুখে.
“একটা জীবন্ত মেয়েকে একের পর এক ছুড়ি দিয়ে আঘাত করে নিষ্ঠুরভাবে খুন করেছিস, মেয়েটির চিৎকারে তোদের আত্মা কাঁপে নি? জানোয়ার! মেয়েদের শরীরের প্রতি খুব লোভ তাই না??”
বলতে বলতেই হাতের রড দিয়ে বেধড়ক মারতে শুরু করলো শতাব্দী।ঘৃণায় তার শরীর রি রি করে উঠলো। 
“আবির,একে দু পায়ে রশি বেঁধে সিলিং এ উল্ট করে ঝুলিয়ে রাখো, এদের বসের ডিটেইলস বের করে তদন্ত শুরু করো ইমিডিয়েট।”
____________
“নাহ না এ হতে পারে না, কীভাবে এতোবড় ভুল করলাম?”
(শতাব্দী)
“ম্যাম এতটা বিচলিত হবেন না। তাছাড়া কায়সার রিয়ান এখনও সাসপেক্ট লিস্টে আছেন এবং আমরা প্রতিনিয়ত তার উপরে নজর রাখছি।” (রিমি)
“মি.সাফায়াতকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কক্ষে বসাও।”(শতাব্দী)
“ইয়েস ম্যাম!” (রিমি)
__________
“সাফায়ত খান দূর্জয় ;”
শতাব্দীর কন্ঠস্বর কর্ণগোচর হতেই সাফায়ত শান্ত ভঙ্গিতে হাসলো,চেয়ারে গা এলিয়ে। 
শতাব্দী বিরক্তিতে ভ্রু কুচকে শক্ত কন্ঠে বললো, তা আপনি কোন পরিচয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন? আইটি এক্সপার্ট সাফায়ত? নাকি মিঃ দূর্জয়? যে কিনা দূর্জয় গ্রুপের কর্ণধার? 
শতাব্দীকে চমকে দিয়ে সাফায়ত মুছকি হাসলো, বললো—
“আপনার পছন্দ সই যেকোনো টাই বলতে পারেন, মিসেস খান।”
শতাব্দী এবার আরও বিরক্ত হলো,
“আপনি কী জানেন যে আপনি ক্রাইম সাসপেক্ট? আমরা আপনাকে সন্দেহ করছি?”(শতাব্দী) 
“ হ্যা।সন্দেহ করাটা মন্দ নয়। তবে ইতোমধ্যে আপনাদের জেনে যাওয়ার কথা আমি এসব কেইসের সাথে সম্পৃক্ত নই।”
“খুনের সাথে সম্পৃক্ত না থাকলেও, আপনি যে ওই চক্রের সদস্য নন তার প্রমাণইবা কী?”
“আমি যে ওই চক্রের সদস্য আপনি সেটা কীভাবে প্রুভ করবেন মিসেস খান?”
“ প্রথমত আপনি নিজের পরিচয় লুকিয়েছেন, তার উপরে বুশরা বারিক এর লাশ বহন করার জন্য আপনার কম্পানির নোটেট ভুক্ত সিএনজি ব্যাবহার করা হয়েছে।
আপনি বুশরা বারিক এর খুনীকে বেধরক মেরে বেঁধে রেখেছেন চেয়ারে। সবচেয়ে বড় কথা আপনার ছবি দেখে মেয়েরা নিশ্চিত করেছে।”
“আমি কখনো পরিচয় লুকাইনি।বরং আমার মনে হয় নি যে কম্পানির কথা অত ফলাও করে বলার কিছু আছে।পারিবারিক ব্যাবসা জন্ম সূত্রে পেয়েছি শেষ। সব কিছুর উর্ধ্বে আমার নিজস্ব পরিচয় আছে।আর রইলো বুশরা বারিকের মার্ডারারকে ধরা? যদি বলি এটা আপনাদের ব্যর্থতা। পুলিশের আইটি টিম যে এতটা নড়বড়ে তা তো জানা ছিলো না। আমি জানতাম আমার কম্পানি ফেঁসে যাবে এ কেইসে,আর দ্রুত খুনীকে ধরা না গেলে এরা পরিকল্পনা বদল করবে। সুতরাং আমিতো আপনাদের সহায়তা করলাম!”
যদিও শতাব্দীর বলার মতো কিছু রইলো না, তবুও সে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালো সাফায়াত এর দিকে।
সাফায়ত সে দৃষ্টি উপেক্ষা করে এক প্রকার গাঁ ছাড়া ভাব নিয়ে বেড়িয়ে গেলো।
____________
“মিসেস শতাব্দী আপনার এ কেস আরও জটিল হচ্ছে;
আমি চাই না আর কোন সমস্যা হোক। তাই আজ থেকে তুরাগ ও আপনার কেইসে হেল্প করবে।” (সিনিয়র অফিসার) 
নিজের কেইসে অন্য কারো ইনভলভমেন্ট শতাব্দীর যদিও ভালো লাগলো না তবুও কী আর করা!
শতাব্দী তুরাগকে সাথে নিয়ে মিটিং রুমে ঢুকলো। তুরাগ এটা ওটা জিজ্ঞেস করলেও শতাব্দী শুধু উত্তর করলো। 
মিটিং রুমে আগে থেকেই ওয়েট করছিলো আবির, রিমি সহ আরও পাঁচ জন। তুরাগকে প্রীতি মার্ডার কেইস সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হলো। 
“আমাদের সাসপেক্ট লিস্টে কে কে আছে?”(তুরাগ)
“ আপাদত কায়সার রিয়ান। “(শতাব্দী)
“ বুঝতে পারছি, এটাই সন্দেহ হবে বা হওয়া উচিত। তবে গভীরে ভাবুন। এতটা সহজে সলভ হবে এ কেইস? আর বুশরা বারিক এর মার্ডার কেইসের কী হলো?”
“যদিও আমরা এটাকে সিরিয়াল কিলিং ধরে নিয়েছিলাম। তবে বুশরা বারিক এর মার্ডার কেইস সম্পূর্ণটাই ভিন্ন।”(রিমি)
“ এখানে স্পষ্ট লেখা রয়েছে প্রীতি মার্ডারার বাম হাতি এবং বুশরা মার্ডারার ডান হাতি।এত বড় ভুল আপনাদের হলো কীভাবে বুঝতে পারছি না। একই পদ্ধতিতে খুন মানেই যে একই ব্যক্তি করছে তা তো নয়!”(তুরাগ)
“কী বলতে চাচ্ছেন? “ (শতাব্দী)
“না এই যে আজ থেকে দশ বছর আগে এক মধ্যবয়সী লোকের পেটে এপোড়ওপোড় করে ছুড়ি চালানো হয়েছিলো লোকটিকে ঘুমের ঔষধ দিয়ে বেহুশ করে।গেইস হোয়াট? মার্ডার উইপন পাওয়া যায় নি। সাসপেক্ট লিস্টে ছিলেন ওই লোকের নিজেরই ষোল বছরের কন্যা। তাই না মিসেস শতাব্দী?”
বলেই ঠোঁট বিস্তৃত করে হাসলেন তুরাগ।
শতাব্দী ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো তুরাগের চোখে। 
তখনই রিমি প্রশ্ন করলো–
“তারপর কী হয়েছিল?”
“তারপর আর কী? মেয়েটির বিরুদ্ধে কোন শক্ত সাক্ষ্য প্রমাণ না থাকায় তাকে পুলিশ এ্যারেস্ট করতে পারে নি।তবে কী আমরা ওই মার্ডার কেইসের সাথে প্রীতি মার্ডার কেইসের সামাঞ্জস্যতা খুঁজবো? এটা কী বোকামি হবে না? মিসেস শতাব্দী?” (তুরাগ)
“হ্যা দরকার পরলে খুঁজবো সামাঞ্জস্যতা।”(শতাব্দী)
তুরাগ টিটকিরির ভঙ্গিতে বললো,
“তা নিজের বিরুদ্ধে নিজে প্রমাণ খুঁজবেন?”
শতাব্দী বেশ আশ্চর্য হলো, নিজের বিরুদ্ধে মানে? কী বোঝাতে চাইছেন তুরাগ?শতাব্দীর কানেকশন কোথায়? 
শতাব্দী শান্ত ভঙ্গিতে বসে মিটিং শেষ করতেই সকলে একে একে রুম ছাড়লো।শতাব্দীর হঠাৎ ভীষণ মাথা যন্ত্রণা শুরু হলো। একপ্রকার ডুলতে ডুলতেই সে মিটিং রুম ত্যাগ করলো।
তুরাগ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করলো তাকে, চেয়ারে আয়েশি ভঙ্গিতে বসলো।এর পরে ফোন করলো কোন এগারো ডিজিট এর নাম্বারে।কল রিসিভ হতেই তুরাগ –
“স্যার আপনি যেমনটা বলেছিলেন তাই হয়েছে। হতে পারে মিসেস খান তার আগের স্মৃতি ভুলে গেছেন কিংবা এও হতে পারে সব কিছু মনে থাকা সত্ত্বেও নাটক করে যাচ্ছে।”
চলবে......
তারিন_ভূঁইয়া_মুনা 

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন