ফন্ট সাইজ:
থিম:
গোধূলির গাঙচিল

৭ম পর্ব

লেখক: তারিন ভূঁইয়া মুনা

গোধূলির_গাঙচিল 

(মার্ডার মিস্ট্রি) 

পর্ব-৭
শতাব্দী বাসায় ফিরেই দেখলো সাফায়ত বাসায় নেই।এ সুযোগে শতাব্দী সাফায়াতের রুমে প্রবেশ করলো।পরিপাটি ভাবে সাজানো রুমটিতে কালো বেডশিট পাতা, বেডসাইড টেবিলে কালো রঙের ওয়াটার বোতল এবং হালকা কমলা আভা সম্পন্ন একটি টেবিল ল্যাম্প। দরজা দিয়ে ঢুকে হাতের বা পাশেই একটি টেবিল রাখা, টেবিলে তেমন কিছুই নেই। হয়তো সাফায়াত এখানে বসে অফিসের কাজ করে।বুক সেলফ এ বেশ কিছু বই, শতাব্দী এগিয়ে গেলো সেদিকটাতে৷ তবে শতাব্দীর নজর আটকালো দ্বিতীয় সেলফের বই গুলোতে, ইংলিশ লেখকদের লেখা কিছু সিরিয়াল কিলিং এর উপন্যাস । শতাব্দীর বেশ খটকা লাগলো। ধীরে ধীরে সে এগিয়ে গেলো আলমিরার কর্ণারে। 
প্রতিটি ডোর খুলে সে চেক করতে লাগলো। আলমিরার প্রায় বেশির ভাগ জামা কাপড়ই কালো। বিষয়টা কেমন যেন! পুলিশের মন সব কিছুতেই সন্দেহ খোঁজে। তবে আলমিরার একটি ড্রয়ার তালাবদ্ধ। কী আছে এখানে? হেয়ার পিন দিয়ে লক খোলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো শতাব্দী।
শুরু থেকেই তার মাথায় প্রচন্ড ব্যাথা ছিলো, হঠাৎ লোডশেডিং এ মনে হলো সে ব্যাথা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।চোখের পলকে আশেপাশের পরিবেশ পরিবর্তন হয়ে গেলো শতাব্দীর। 
শতাব্দী ভয়ে সেখানেই সেন্সলেস হয়ে পরলো মেঝেতে।
______________
সাফায়াত বাসায় ফিরেই বুঝলো হয়তোবা লোডশেডিং হয়েছে। শহরের মধ্যে বাসা হলেও এখানে লোডশেডিং এর উপদ্রব খুব।পুরনো সরকারি কোয়ার্টার। যদিও সাফায়াত এখানে থাকতে চায় না তবে কিছু করারও নেই।
মোবাইলের ফেলাশ অন করে সামনে এগোতেই কিছু একটা পায়ে বাঁধল তার। চেক করতে নিচে আলো ফেলতেই সাফায়াত বিস্মিত হলো— শতাব্দীকে পরে থাকতে দেখে।
মেয়েটা কী তার রুমে তল্লাশি চালিয়েছে? নাকি লোডশেডিং হওয়ার পরে এখানে এসেছে?
সব ভাবনা চিন্তা সাইডে রেখে সাফায়াত শতাব্দীকে মেঝে থেকে তুলে সযত্নে তাকে বেডে শুয়িয়ে দিলো। বেড সাইড টেবিলের ড্রয়ার হাতরে মোমবাতি জ্বালালো।
মোমবাতির উষ্ণ উজ্জ্বল আভায় একমুহূর্তের জন্য সাফায়াত থমকে তাকালো মেয়েটির মুখপানে। ঘুমন্ত এ মেয়েটিকে দেখলে কেউ কী বিশ্বাস করবে যে তাকে দোষী প্রমাণ করে চাকরিচ্যুত করতে তারই ডিপার্টমেন্ট এর অফিসাররা ডেস্পারেট? কারণ সে সৎ।
বিষয়টা নিতান্তই ভাবিয়ে তোলে সাফায়াতকে বারংবার।তাদের বিয়ে হয়েছে বেশ কয়েক মাস – প্রথম দিকে যদিও সাফায়াত এ মেয়েটিকে নিয়ে ভুল ধারণা পোষণ করতো তবে ধীরে ধীরে সেসব বদলেছে। 
জীবনে সাফায়াত কেবল একবার প্রেমে পরেছিলো। একটি মেয়ের সংস্পর্শ তার ভালো লাগতো। সে মেয়েটির মাঝে শতাব্দীর মতো দৃঢ়তা ছিলো না, না ছিলো শতাব্দীর মতো বিচক্ষণতা । মেয়েটির চোখ দুটি জ্বলজ্বল করতো। 
হঠাৎ ইচ্ছে হলো শতাব্দীর চোখ দুটি পর্যবেক্ষণ করতে, এ মেয়ের চোখগুলোও কী ঠিক তার মতো? 
সে মেয়েটির চেহারা ছিলো লাস্যময়ী, জোড়াভ্রু আর সুরু ঠোঁট মেয়েটিকে অনন্য করেছিলো।সাফায়াত ভাবতো ও মেয়ের মতো কোন মেয়েই হয়তো এতো সুন্দর নয়।
তবে মোমের হলদে-সোনালি আভায় শতাব্দীর চেহারাখানা তাকে ভুল প্রমাণিত করলো। শতাব্দীর চেহার লাবণ্য, নিষ্পাপ মুখশ্রী আর ফোলা ঠোঁটে তাকে মোহনীয় লাগছে।সবচেয়ে বড় কথা এ মেয়েটির মন সুন্দর, স্বচ্ছ এবং স্ট্রং।
সাফায়াত শতাব্দীকে ওই মেয়েটির সাথে তুলনা করছে? কেন করছে? সবচেয়ে বড় কথা জীবনের প্রথম প্রেম ছিলো যে রমণী তার চেয়েও কয়েক কাঠি উপরে সে শতাব্দীকে বসাচ্ছে? তার মস্তিষ্ক তার সাথে গেইম খেলছে।
সে কী শতাব্দীর প্রেমে পরেছে? সে ভালোবাসতে শুরু করেছে তাকে? এ হতে পারে না।একই ভুল সে দ্বিতীয় বার করবে না। না, না কখনো না।
ভুলভাল ভাবনা থেকে বার হতে সাফায়াত সজোরে চর মারলো নিজের গালে। 
ফোন রিং হতেই সাফায়াত নড়েচড়ে বসলো। রিংটন শব্দের তরঙ্গ উৎস খুঁজতে লাগলো, মেঝেতে পরে আছে শতাব্দীর ফোন।সাফায়াত ভাবলো রিসিভ করাটা ঠিক হবে না, তবে বারবার রিং হতে লাগলো ফোনটি। একপ্রকার বিরক্ত হয়ে সাফায়াত হাতে তুলে নিলো, রিমির কল। তাহলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু হতে পারে ভেবে রিসিভ করলো সে। রিমি চিন্তিত কন্ঠস্বরে বললো, 
“ম্যাম সে লোকটি মারা গেছে। উপর মহল হতে আপনাকে সাসপেন্ডও করা হতে পারে।তারা তো সে সুযোগই খুঁজছিলো এত দিন। ”
সাফায়াত বেশ অবাক হলো, সে বুঝতে পারলো যে লোকটিকে সে মেরে বেঁধে রেখেছিলো রিমি হয়তো তার কথাই বলছে। 
সে কিছু না বলেই ফোন কেটে দিলো। 
বিছানায় ঘুমন্ত মেয়েটির দিকে নজর বুলালো। 
কী এমন আছে মেয়েটির অতীতে? 
সাফায়াতের বেশ খটকা লাগে শতাব্দীর এভাবে সেন্সলেস হওয়ার বিষয়টা, মাঝে মাঝে মেয়েটি ট্রমাটাইজ হয়ে পরে, অস্বাভাবিক আচরণ করে। 
_______________
আন্ডার কভার এজেন্ট মিস্টার এক্স। শুনশান নিস্তব্ধ অন্ধকার গলিতে মেনহোল এর ঢাকনা খুলে ছয় জন মাস্ক পরা ব্যাক্তি ডুকলো। উপর থেকে কখনো বোঝা সম্ভব নয় এখানে রীতিমতো সুসজ্জিত একটা বাঙ্কার। যেখান থেকে পরিচালিত হয় পুরো শহর।
একটি রয়েল ভিন্টেজ সোফায় পায়ের উপরে পা তুলে বসে আছেন মিস্টার এক্স। আলোআঁধারিতে লোকটির চেহারা বোঝা যাচ্ছে না।সামনের টেবিলে সজ্জিত বেশ কয়েক প্রকার অস্ত্র। একজন ফিসফিস করে মিস্টার এক্সকে বললো,
“স্যার ফরেনসিক টিম রিপোর্ট নিয়ে এসেছে।”
এক্স এর হাতের ইশারায় লোকটি রিপোর্ট গুলো তার হাতে দিলো। ফরেনসিক টিম বিস্তারিত বললো রিপোর্ট অনুযায়ী। 
নিজের সন্দেহ সঠিক প্রমাণিত হওয়াতে এক্স হাসলেন। 
এখন অপেক্ষার প্রহর, সামনে কী ঘটে তাই দেখার অপেক্ষা। 
ধোঁয়াসা ভেদ করে, গার্ডদের চেকিং পার করে বাঙ্কারে প্রবেশ করলো অফিসার তুরাগ।কেইস ফাইলগুলো এক্স এর সামনের টেবিলে রেখে পাশের সোফায় বসলো।
বললো,
“বস, মিসেস শতাব্দীকে এবার উপরমহল হতে সাসপেন্ড করা হবে।তিনি রিমান্ডে অপরাধী কে টর্চার করে মেরে ফেলেছেন।”
মিস্টার এক্স শান্ত - শীতল কন্ঠে গম্ভীর মুখে বললেন
“জানি।কিন্তু এটা শতাব্দীর কাজ নয়। হতে পারে চক্রের তথ্য ফাঁস হওয়ার ভয়ে তাকে খুন করা হয়েছে।যে খুনটা করেছে সে তোমাদেরই একজন। আবার এও হতে পারে এটা উপরমহলের চাল। কী মনে হয়?”
তুরাগ চোখ নামিয়ে চুপ করে রইলো।মিস্টার এক্স যা সন্দেহ করেন তাই হয়।অভিজ্ঞ লোক।
মিস্টার এক্স জিজ্ঞেস করলো—
“মিসেস শতাব্দীকে সাসপেন্ড হওয়া থেকে আটকানো যাবে কীভাবে?”
“বস যদিও এটা বেশ কষ্টসাধ্য। একজন সিনিয়র অফিসার যদি তার পক্ষ হয়ে কথা বলেন এবং সেও আর কখনো এমন ভুল হবে না বলে ক্ষমা চান তবেই তা সম্ভব।”
“তুমি তার হয়ে উপরমহলে কথা বলো।”
“কিন্তু বস, আমাকে তো এখানে আনাই হয়েছে যাতে করে আমি মিসেস শতাব্দীর বিরুদ্ধে এমন কোন প্রমাণ পেশ করি যার ভিত্তিতে তাকে সাসপেন্ড করা যাবে।”
“হ্যা সবটাই বুঝেছি কিন্তু এও জানি তুমি এটা পারবে।আমাদের মিশন ভুলে গেলে হবে না।আর এই মিশনে শতাব্দী ছাড়া নির্ভরযোগ্য কাউকে দেখছি না।”
ঘুম ঘুম চোখে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে শতাব্দী যতদূর বুঝলো, সে সাফায়াতের বেডে। ইশ কী লজ্জা! তদন্তে এসে সে কিনা ধরা পরে গেলো?আর সাফায়াত,কী ভাবলো সে? শতাব্দীর ইচ্ছে হলো মাটিতে মিশে যেতে। 
চুপি চুপি উঠে চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে নজর পরলো বেড সাইড টেবিলের আধখোলা ড্রয়ারে — গাড়ো বাদামি রঙের একখানা ডায়রী। ডায়রীটা হাতে তুলে নিলো শতাব্দী, ডায়রীর উপরে খোদাইকৃত ২০১২। 
সাফায়াত ডায়রী লেখে? মানুষ হয় দুই প্রকার — প্রথম.যারা নিজের মনের কথা স্বাচ্ছন্দ্যে প্রকাশ করতে পারে আর অপর দল হলো যারা কাউকে কিচ্ছুটি বলতে না পারায় সব কিছু ডায়রীর পাতা বদ্ধ করে।
কিন্তু শতাব্দী? সে এ দু দলের একটাতেও নেই। সে কখনো ডায়রী লেখে নি যদিও সে বেশ চাপা স্বভাবের। 
শতাব্দী ওলট পালট করে পাতা উল্টাতে লাগলো, ধারাবাহিক ভাবে লেখা হয় নি। ২০১২ সাল থেকে ২০১৮ সাল অবদি লেখা, যদিও কেবল তিনটি তারিখ উল্লেখ করা।কৌতূহলবশত শতাব্দী পড়া শুরু করলো —
২০১২ সালে সাফায়াত ইন্টারমিডিয়েট এর ছাত্র ছিলো, সে ক্যাডেট কলেজে পড়েছে। তার কৈশোর - যৌবনের সন্ধিক্ষণে অচাতনে মনে আসা কথা গুলো লেখা।এর পর দীর্ঘ বিরতি ২০১৪ সাল, মায়ের মৃত্যুর পরে ছোটচাচা যেভাবে তাদের ব্যাবসা প্রায় হাতিয়ে নিচ্ছিলো এবং মা বাবার স্মৃতি রক্ষার্থে সে ঠিক কতটা স্ট্রাগল করে কম্পানি রক্ষা করছে তা পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে লেখা।(বলাবাহুল্য তার বাবা মারা গিয়েছিলেন ২০০৯ সালে।) 
২০১৬ 
লেখার ধরনেই শতাব্দী বুঝতে পারলো— সাফায়াতের জীবনের সকল ঝড়ঝাপটা পেড়িয়ে বাসন্তি ভ্রমরের আগমন। 
বেশ আগ্রহ হলো শতাব্দীর— সাফায়াত অন্য কাউকে ভালো বাসতো তবে কেন তাকে বিয়ে করলো? কেন সে ওই মেয়েকে বিয়ে করলো না?আচ্ছা মেয়েটি কী শতাব্দীর থেকেও বেশি সুন্দরী?  
_________________
জীবনের একুশটি বছর কাটলো কেবল পড়াশোনা, পরিবার পরিজন নিয়ে। কখনো মেয়েদের সাথে সামান্য কথা বলার অবকাশ ও মেলে নি। আম্মু বড্ড চাপা স্বভাবের, সে কখনোই কিচ্ছু বলতো না তার নিজের সম্পর্কে। তবে এতটুকু বুঝতাম বাবার প্রতি ছিলো তার একরাশ অভিমান, ঘৃণাও হতে পারে।এর মূল কারণ কী তা আমি জানি না তবে বাবার এক্সট্রাম্যারিটিয়াল এ্যাফেয়ার ছিলো — বোধকরি একটা নয় বেশ কয়েকটা।
আম্মু জেনে গেলে বাসায় হুলুস্থুল হতো, প্রচুর ঝগড়া হতো দুজনার এরপর কয়েকদিন সব ঠিক থাকতো। এর পরেই আবার নতুন নারী নতুন এ্যাফেয়ার। মজার ব্যাপার হলো তার মৃত্যু টাও হয়েছিল এক পরনারীর সাথেই। বাবা এবং তার প্রেমিকা লংড্রাইভে যাচ্ছিলেন হয়তো তবে কার এক্সিডেন্টে দুজনেই ডেট। বিষয়টা হয়তো দুঃখজনক বলা উচিত ছিলো তবে আমার মজাই লাগলো — অন্তত সে তার প্রেমিকার সাথে হাতে হাত রেখে রোমান্টিক ভাবে চোখ বুঝেছিলেন। এর চেয়ে বেশি আর কী চায় প্রেমিক হৃদয়! তার মৃত্যুতে আম্মুকে কাঁদতে দেখি নি — মৃত মানুষের প্রতি অভিমান থাকে না তাই ধরে নিলাম ঘৃণা ছিলো।এমনকি বাবার মৃত্যুর পরে আম্মু যতদিন বেঁচে ছিলেন কখনোই বাবার কথা মনে করেন নি।
আম্মু বরাবর আমায় একটি কথা বলতেন, জীবনে সঠিক মানুষ খুঁজে পাওয়ার আগ অবদি কোন ভুল কাজে জরাবি না,আর একবার তাকে পেয়ে গেলে আসমান থেকে হুরপরী নেমে আসলেও নজর দিবি না। 
কথাটা আম্মু এতবার বলেছিলেন যে আমার বিরক্তি ধরে গিয়েছিল তবে আজ মনে হয় আমি আমার জীবনে সঠিক মানুষটিকে খুঁজে পেয়েছি।
ইউনিভার্সিটির করিডরে দাড়িয়ে ছিলাম সেদিন হঠাৎ দৃষ্টি আটকালো এক লাস্যময়ী তরুণীর চোখে। চোখ দুটি কেমন জ্বল জ্বল করছিলো, আমার হঠাৎ মনে হলো ও চোখে হাজারও রহস্য, না বলা কথা লুকিয়ে। 
এরপর ক্লাস প্রিয়ডে সময় পেলেই লুকিয়ে চুরিয়ে দেখতাম ওই মায়াবী মুখশ্রী।মেয়েটির কোন বন্ধুবান্ধব নেই।প্রতিদিন ক্লাসে আসতো এবং একাই বসে মনোযোগ সহকারে ক্লাস করতো, যেনো ক্লাসে স্যার আর সে ব্যাতীত কেউ নেই।
সব স্যারদের আদরের ছিলো সে, কারণ পরপর তিন সেমিস্টারে হায়েস্ট মার্ক নিয়ে ফাস্ট হয়েছিলো সে।
…
মেয়েটির নাম সুশ্রী শরীফ। যেদিন নামটা জানলাম মনে হলো সুশ্রী নামটা তার জন্যই বোধহয় সৃষ্টি। 
ডিপার্টমেন্ট এর ফারুক স্যার কে গাল টিপে চুমু খেতে ইচ্ছে হলো, তার টিম ওয়ার্কের কল্যাণে আমি সুশ্রীর সাথে পরিচিত হতে পেরেছি।
মেয়েটি বড্ড কম কথা বলে, আমার আম্মুর মতো কিছুটা।
গতদিন প্রজেক্ট এর কাজে প্রায় সন্ধ্যা অবদি আমাদের ভার্সিটিতে থাকা হলো, এতে অবশ্য আমি মোটেও বিরক্ত নই। কারণ আমি সেই ছুতোয় সুশ্রীকে হোস্টেল অবদি ছেড়ে এসেছি।আমি রিকশা ডাকবো ভেবে সে আমাকে আগেই নিষেধ করে দিলো, ওদিকে তখন আমার গাড়ি পার্ক করা ছিলো ভার্সিটির পার্কিংএ, ভাগ্যিস সে বলেছিলো নাহলে আমি হয়তো তাকে গাড়িতে লিফ্ট দিতে চাইতাম।তার সেটা পছন্দ হতো না এবং আমাকে নিয়ে খারাপ ধারণা পোষণ করতো। যতদূর জানি সুশ্রীর মতো মেয়েদের টাকাওয়ালা ছেলে পছন্দ নয়।যারা টাকার গরম দেখিয়ে বেরয় তাদের থেকে দূরত্ব নিয়েই চলাচল এদের।
গোধূলি লগ্নে প্রীয় মানুষটির সাথে একসাথে হাঁটছি এইতো ঢের! তবে কথায় আছে না মানুষের স্বভাব হলো চাই চাই—
এই যে এত সুন্দর সপ্নের মতো একটা সন্ধ্যা দুজনে একসাথে হাঁটলাম তবুও মনে হচ্ছে ইশ যদি হাতে হাত রেখে হাটা যেতো! কতই না ভালো হতো।
হাঁটতে হাঁটতে কত টং দোকান পেরোলাম, ইশ যদি একসাথে চা খাওয়া যেতো! চায়ের প্রসঙ্গ মাথায় আসতেই জানতে ইচ্ছে হলো সুশ্রী কী ধরণের চা পছন্দ করে? আমার বরাবর ইচ্ছে প্রেয়সীর সাথে একই কাপে চা খাবো, চুমুকে চুৃমুকেই প্রেম রমরমা হবে, হবে খুনসুটি কিছু বেহুদা আলাপ সাথে এক কাপ কড়া লিকারের চা, দু চামচ দুধ, এক চামচ চিনি। প্রেয়সী বোধ করি আর মিষ্টি চাইবে না চাতে কারণ ততক্ষণে সে আমার কথার মিষ্টতেইতো কয়েকদফা ডুবেছে।
সংকোচ হলেও প্রশ্নটা চেপে রাখলাম না, জিজ্ঞেস করাতে সুশ্রী বললো সে চা পছন্দ করে না।
আমি বেশ অবাক হলাম, কিছুটা মনঃক্ষুণ্ন। আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম, চা কী সে খায় না? 
নিয়ন আলোয় স্পষ্ট দেখলাম তার ঠোঁটের চাপা হাসি, 
 হেঁসেই বললো — চিনির কেজি মূল্য বেশি বলে কখনো বাসায় চা বানানো হতো না, একেবারেই হতো না তা নয়। বাসায় অতিথি এলে দু একবার করা হতো।
চা হলো বড়লোকদের সখের বস্তু। 
মেয়েটির চোখ এখনও জ্বলজ্বল করছে, ওই চোখে সংকোচ, সংশয় কিংবা কোন রূপ লজ্জার আভাসটুকু নেই। 
আমি আনমনেই বলে ফেললাম তবে কী আমি বড়লোক? 
সুশ্রী খিলখিল করে হাসলো যদিও বুঝি নি হাসির মতো কী এমন হয়েছে? তবুও আমি নিরলস তাকিয়ে দেখলাম ওই প্রণবন্ত হাসি। তাকে এভাবে হাসতে কেউ কখনো দেখে নি।
সুশ্রী আমাকে দুর্জয় বলে ডাকে, কেনো সে চিরাচরিত নামে না ডেকে এ নামে ডাকে তা বোধগম্য হয় নি। তবে ভালো লাগে। 
“দুর্জয়? তুই কী পরিবারের খরচ বহন করিস?”
যদিও সুশ্রী জানেই না আমার পরিবার বলতে কেউই নেই, 
“হ্যা।”
“ধর মাসের খরচা বাদে তোর কিছু পছন্দ হলো, বা ধর তোর সখের কোন কিছু তা কী তুই কিনতে পারিস?”
“হ্যা।”
“তোর সখ আছে এবং পূরণের সাধ্যও আছে। তবে মধ্যবিত্তের সখ থাকে সাধ্য থাকে না। তুইতো তবে বড়লোক।”
আমি ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। 
দূরে হলের গেইট দেখা যেতেই মনটা মুচরে উঠলো, 
গাইতে ইচ্ছে হলো — এ পথ যদি না শেষ হতো!
—----------------------
এরপর প্রায়ই সুশ্রীর সাথে সময় কাটানো হতো, ঘোরাঘুরি হতো। আনমনে হাতা হাত রাখাও হয়েছে বার কয়েক। আমার ভার্সিটি লাইফের সেরা সময়গুলো আমি তার সাথে কাটিয়েছি। 
আমার মনে হয় সুশ্রীও হয়তো আমাকে পছন্দ করে।সেদিন কথায় কথায় জিজ্ঞেস করেছিলাম, 
“সুশ্রী তুই কারো প্রেমে পরেছিস কখনো?”
সে হেসে বললো—
“তোর মতো কাউকে পাই নি দূর্জয়, যে হাসলে বাম গালে টোল পরে!”
আমার গালে টোল পরে? আমি তো খেয়াল করি নি কখনো। যে মেয়ে আমাকে এতটা খেয়াল করে লক্ষ্য করে সে নিশ্চয়ই আমাকে পছন্দ করে।আচ্ছা এও তো হতে পারে সে রসিকতা করছে।
যাইহোক আমি সুশ্রীকে মনের কথা বলবো , সে হয়তো আমাকে না করতে পারবে না।।
_________________
কখনো গুছিয়ে কথা বলতে পারি না, অনুভূতি প্রকাশ আমার জন্য যুদ্ধের সমকক্ষ। তবুও সুশ্রীকে বললাম নিজ অনুভূতি। এতে তার ভাবভঙ্গি নূন্যতম পরিবর্তন হলো না, হাঁটতে হাঁটতে সে বললো—
বাবা পনেরো হাজার টাকা বেতনে সরকারি চাকুরী করতেন।মা ছিলেন গৃহিণী। দুজন দুজনকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো। সুতরাং তাদের বাড়িতে তাদের জায়গা হয় নি। আমার বয়স যখন নয় বছর তখন থেকে আম্মাকে দেখেছি ভীষণ অসুস্থ। রান্নাটুকু দায়ছাড়া ভাবে করতেন তবে এরপরে সারাদিন শুয়ে থাকতেন।আম্মার ঔষধ আর সংসার খরচা সামলাতে বাবার তখন বেসামাল অবস্থা। 
ক্লাস এইট হতে নিজে টিউশনি করতাম। যখন ইন্টারমিডিয়েট এ পড়ি, পরীক্ষার আগের দিন বাবাকে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে গেলো।আম্মার ঔষধ খরচা ব্যাবদ বাবা কিছু টাকা ধার করেছিলেন, এবং তারা বাবার নামে কেইস করে দিয়েছিলো।যাই হোক বাবার টাকা না থাকলেও আত্মসম্মান ছিলো আকাশ চুম্বি। একরাত জেলে থেকে সকালে তার মৃতদেহ বাসায় পৌঁছে দেয়া হয়েছিলো।
এর পর তিন মাস আম্মা বেঁচে ছিলেন, নিজেকে দোষারোপ করতেন প্রতিনিয়ত। 
ঠিক তখন থেকে আমার কাছে ভালোবাসার মূল্য নেই। জীবনে টাকাটাই আসল। যদি জিজ্ঞেস করিস আমি সবসময় সেমিস্টারে টপ করি কীভাবে? বলবো আমারও পড়তে ভালো লাগে না তবে আমি জানি ভালো চাকরি পেতে আমাকে পড়তে হবে।
আমি কখনো মধ্যবিত্ত হতে চাই না। আমার কাছে প্রেম মানে টাইম পাস না, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একসাথে থাকা।
আমি বুঝলাম সে বোঝাতে চেয়েছে ভালোবাসা না থাকলেও হবে, সে বড়লোক কাউকে চায় নিজের জীবন সঙ্গী হিসেবে।তবে আমি এটাকে খারাপ ভাবে নেই নি।
আম্মু বলতো সে চেয়েছিলো স্বামী রিকশাওয়ালা হোক, টাকা পয়সা না থাকুক তবে ভালোবাসার কমতি যেন না থাকে।ঠিক তেমনি সুশ্রীও চায় ভালোবাসা না হোক টাকাপয়সার কমতি যেন না থাকে।এটা তো অন্যায় নয়। 
আমার মনে হলো আমি সুশ্রীকে ডাক দিয়ে বলি, আমার গাড়ি, বাড়ি এবং কম্পানি সহ সকল সম্পত্তি তোকে লিখে দেবো তবুও তুই আমাকে একটু ভালো বাস।কিন্তু মনের কথাটুকু বলার সাহস হলো না — ততক্ষণে সুশ্রীও আমার দৃষ্টির বাহিরে চলে গেলো। 
আর জীবনে কাউকে ভালোবাসবো না, ভালোবাসার মূল্যায়ন সকলে করতে জানে না। এর পর থেকে আর কখনো সুশ্রী ক্লাসে আসছে কিনা জানি না। তাকাই নি কখনো। তবে লাস্ট সেমিস্টারে আমি টপ করেছিলাম, তাকে কষ্ট দিতে নয়, এমনি।
—----------
শতাব্দী ডায়রীটা বন্ধ করে যায়গামতো রেখে আবারও বিছানায় পিঠ এলালো। ভালো হয়েছে সেদিন সুশ্রী সাফায়াত কে না করেছে। কিন্তু এতে ভালো লাগার কী আছে?
শতাব্দী জানতেও পারলো না আর দুটি পৃষ্ঠা উল্টোলে সে সাফায়াতের নতুন অনুভূতিগুলোর সাথে পরিচিত হতে পারতো।
—ভেবেছিলাম জীবনে আর কখনো ডায়রী লিখবো না। তবে আমি আর নিজের মনের সাথে পারছি না। যতটুকু বুঝলাম কারো প্রতি ভালোলাগা, মুগ্ধতা খুব দ্রুত আসে, এমনি এমনি আসে। তবে ভালোবাসা নয়, বরং ভালোবাসা হয় অচাতনে এরপর হয় প্রেম।ভালোলাগা থেকে প্রেম হয় না।সুশ্রীর প্রতি যেটুকু ছিলো তা কেবলই মুগ্ধতা। 
তবে যতদূর শতাব্দীকে জানি, আমি কেবলই নতুন করে প্রেমে পরি বোধহয়। হয়তো মনের অজান্তে আমি মেয়েটিকে ভালোও বাসি।এ অনুভূতি সত্যি না হোক!
আমি চাই না এ জীবনে সে জড়াক , যতটুকু তা একান্ত আমার ব্যক্তিগত হোক।মাঝে মাঝে মেয়েটিকে যখন বেশ স্ট্রেসে দেখি তখন খুব করে মন চায় — আমার স্পেশাল মশলা-দুধ চা তাকে করে দিবো, সে চায়ে চুমুক দিয়ে তৃপ্ত হবে আর আমি তার ঘাড় টিপে দিবো যাতে করে তার স্ট্রেস একটু হলেও কমে।
কারো কষ্ট সহ্য করতে না পেরে তা কমাতে চাওয়াকেই বোধহয় ভালোবাসা বলে, হয়তোবা! 
____________
সকালের নাস্তার ট্রে হাতে রুমে প্রবেশ করলো সাফায়াত। 
শতাব্দী অস্বস্তিতে তার দিকে তাকাতে পারলো না, উঠে বসলো বেডে হেলান দিয়ে। 
সাফায়াত তাকে চা এগিয়ে দিতে দিতে বললো— আপনি আবারও সেন্সলেস হয়ে গিয়েছিলেন কাল রাতে।আমাকে খুঁজতে এসেছিলেন বোধহয় তবে লোডশেডিং এ ভয় পেয়েছেন। 
শতাব্দী চাতে চুমুক দিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো, ভাগ্যিস সাফায়াত বুঝতে পারে নি শতাব্দীর তার ঘরে আসার কারণটা। চায়ের স্বাধ নিতেই শতাব্দী বুঝলো অসম্ভব ভালো হয়েছে, পারফেক্ট চিনি, দুধ, মশলার ফ্লেভারে স্ট্রং চা। 
“আপনি চা তো বেশ ভালো বানান!”
সাফায়াত বড্ড অবাক হলো, সে ভাবে নি শতাব্দীর ভালো লাগবে। 
“ধন্যবাদ ম্যাম।”
“আমাকে ম্যাম বলবেন না।”
“জ্বি, আপনি বললে আপনাকে স্পেশাল চা বানিয়ে দিবো মিসেস খান।”
শতাব্দী যদিও মিসেস খান শুনলে বিরক্ত হয়, সেটা বুঝেও সাফায়াত তাকে ক্ষেপায়, মেয়েটা বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকালে মন্দ লাগে না।বেশ কিছুক্ষণ নিরব ছিলো ঘরময়৷ নিরবতা ভেঙে সাফায়াত বললো—
“আপনার ভয় লাগলে আপনি এ রুমে থাকতে পারেন, আমি নাহয় সোফায় শুয়ে পরবো। বেশ কিছু দিন লক্ষ্য করলাম আপনার ভালো ঘুম হয় না, সাথে কোন বিষয় নিয়ে চিন্তিত।”
প্রতিউত্তরে শতাব্দী কিছু বললো না, সে আনমনে কিছু একটা ভাবতে ভাবতে চাতে চুমুক দিচ্ছে। 
“আপনার ডাক্তার মিসেস আইরিন আমায় কল করেছিলেন, আপনি বিগত দুটি সেশন এ আপনার সমস্যা নিয়ে তাকে কিছুই বলেন নি। যদিও আমার আপনার বিষয়ে মাথা ঘামানো আপনার অপছন্দ তবুও মানুষ হিসেবে এটা আমার দায়িত্ব। ভাবছি আপনার রোগ লক্ষন গুলো আমি তাকে বলবো।”
“এগুলো কী?”
“ডিম টোস্ট।”
সাফায়াত বুঝলো শতাব্দী বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে গেলো।
____________
“মি.তুরাগ আপনি আমার হয়ে উপরমহলে সুপারিশ করেছেন,কেন??আমাদের সম্পর্ক ঠিক ততটাও ভালো নয় যে আপনি আমার জন্য কথা বলবেন ।”(শতাব্দী)
“আমার মনে হচ্ছে আপনাকে শুধু শুধুই ফাঁসানো হচ্ছিল , আমি কেবল সত্যি বলেছি। তাছাড়া আমরা একটি টিম হয়ে কেইস সলভ করছি। সে কেইসের এখনও কোন সুরাহা হয় নি এবং আপনি আমার টিম লিডার। সর্বসাকুল্যে বিবেচনা করেই পদক্ষেপ নিয়েছি।” (তুরাগ)
শতাব্দী বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলো, দৃষ্টি মেঝেতে স্থির।
“তুরাগ, আপনি কাল যে কেসটির কথা বলছিলেন..?”
“হ্যা।”
“আমাকে বিস্তারিত বলুন”
“আপনি জানেন না?”
“নাহ, কিন্তু আমার কেমন মাথা যন্ত্রণা হচ্ছে বিষয়টি নিয়ে ভাবলেই।মনে হচ্ছে আমি ঘটনাটা জানি মস্তিষ্কে আর একটু জোর দেয়া প্রয়োজন।”
“ভুলে গিয়েছেন?”
শতাব্দী বিড়বিড় করে বললো, কীভাবে? আমি ছোট থেকে মামার কাছে বড় হয়েছি। মা আমার জন্মের সময় এবং এরপর বাবাও মরে গিয়েছিলেন। আমার কোন পরিবার নেই, ওরা আমার কেউ না।”
“কিছু বললেন না তো?” (তুরাগ) 
“ হ্যা? না মানে হয়তোবা আমি ভুলে গিয়েছি।”
চলবে............
তারিন_ভূঁইয়া_মুনা

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন