ফন্ট সাইজ:
থিম:
গোধূলির গাঙচিল

১১তম পর্ব

লেখক: তারিন ভূঁইয়া মুনা
গোধূলির_গাঙচিল
পর্ব-১১

শতাব্দী ঘাড় টেপা শুরু করলেই তিনি বরাবরের মতোই বললো সামনে এসে কপালে একটু মাসাজ করতো । মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। শতাব্দীর শরীর রাগে ঘৃনায় তখন রি রি করছে৷ এর পর তার সাথে ঠিক কী ঘটবে তা তার অজানা নয়। সে প্রতি নিয়ত এই একই যন্ত্রনা সহ্য করে আসছে। শতাব্দী দাঁতে দাঁত চেপে গিয়ে দাঁড়ালো তার সামনে। যথেষ্ট দূরত্বে দাড়িয়ে সে কপালে হাত রাখলো। 

‘কিরে তুই এতো দূরে দাঁড়ালি কেন? প্রতিদিন শিখিয়ে দিতে হবে?’
বলেই শতাব্দীর কোমড়ে হাত দিয়ে তাকে নিজের দিকে টেনে নিলো সে৷ ওই নরপিশাচ লোকের দ্রুত গতিতে চলা শ্বাস-প্রশ্বাসের গরম হাওয়া শতাব্দীর বুকে পরছে।এতোটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতেও শতাব্দীর হাত থামতে পারবে না। তার ভাবতে হবে এখানে কিছুই হচ্ছে না৷ তখন রুমের দরজাটা হা করে মেলা, করিডর দিয়ে বাড়ির সদস্য রা হেঁটে বেড়াচ্ছে তবে কেউ এ ঘরে নজর দিচ্ছে না। 
লোকটি কিশোরীর সদ্য পরিস্ফুটিত মাংসল অঙ্গে নিজের চেহারা ঘষলো বার কয়েক। ঘৃণায় ,শতাব্দীর চোখে তখন জল টলমল করছে। হাত অসাড় হয়ে আসছে।
‘কিরে তুই থামলি কেন? চালিয়ে যা।’
বলেই শতাব্দীকে নিজের পায়ের উপরে বসালো।শতাব্দী গলাকাটা মুরগির ন্যায় ছটফট করতে লাগলো।
‘কী হলো? তোর কাজ কর৷ একদম নড়বি না বলে দিলাম।’
শতাব্দীর তখন নিজেকে এতটা অসহায় লাগছিলো — যে পৃথিবীর সবটুকু দুধ দিয়ে গোসল করলেও হয়তো তার শরীরে বহমান কলঙ্ক ধুয়ে শেষ করা যাবে না। সে পবিত্র হতে পারবে না - সর্বশেষ ফোটা দুধের কল্যানেও।
‘তুই দেখতে তোর মার মতো হইছিস।তোরে দেখলে আমার তনুর কথা মনে পরে।’
(শতাব্দীর মায়ের নাম তনুশ্রী রহমান।বাবা মায়ের নামের সাথে মিল করেই শতাব্দীর নাম রাখা হয়েছিলো শতাব্দী রহমান অনুশ্রী।) 
স্পর্শ কাতর অঙ্গ গুলিতে ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো হাত বুলালো নরপিশাচ লোকটি।যখন শতাব্দীর কান্নার বেগ বাড়লো তখন তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো মেঝেতে।
‘তোকে দিয়ে কোন কাজ হয় না। যা রিফাকে পাঠা। রিফা হলো এ বাড়ির কাজের মেয়ে। এই মেয়েটাও এ নরপিশাচ এর খেলার পুতুল। 
_________________
ঘটনাটা মনে পড়তেই শতাব্দীর রাগ, ঘৃণায় মস্তিষ্কে পোকা খুবলানো শুরু হলো। প্রতিশোধের নেশায় সে বুদ হয়ে রইলো। তার বারংবার মনে হতে লাগলো, মাতো শহুরে শিক্ষিত মেয়ে ছিলো। তবে সে কেনো প্রতিবাদ করলেন না? কেনো সে ওই জানোয়ার কে যথাযথ শাস্তি না দিয়ে নিজে আত্মবলি দিলেন? নিজে আত্মবলি দিয়ে তিনি যে পাপ করেছেন তা মোচন করতেই শতাব্দী সব ওলট পালট করে দিবে। সব ধ্বংস করে দিবে সে।সে তার মায়ের মতো অবলা ঘরোয়া নারী হবে না, সে হবে জাহান্নামের লেলিহান অগ্নিশিখা। 
বার কয়েক লাইনটি সে আওড়াল, 
“মা! আমি তোমার মতো অবলা ঘরোয়া নারী নই, আমি জাহান্নামের লেলিহান অগ্নিশিখা।” ‘ আমার অঙ্গে লিখিত সবটুকু কলঙ্ক আমি ঝলসে ফেলবো এ আগুনেই।কেবল আমার নয়, তোমার যন্ত্রণাটুকুও আমি ধূলিসাৎ করবো! মনে রেখো।’
মাগরিব এর আজান হচ্ছে চারিদিকে, শতাব্দী গিয়ে দাঁড়ালো ডাক্তারের ঘরের সামনে।
‘আসলামুআলাইকুম কাকু।’
‘ওয়ালাইকুম উচ্ছালাম, মা। কী খবর? এ সময়ে?’
‘কাকু চাচার ঘুমের ঔষধ নিতে পাঠিয়েছেন।’
‘কালকে দুটো নিয়ে গেলেন, আমি বললাম বেশি করে নিতে তখন তিনি নিলেন না। আজ আবার তোকে পাঠালো, শুধু শুধু তোকে কষ্ট দিলো।’
‘কাকু দুই পাতা দিতে বললো।’
‘নে। কিন্তু এতোগুলা?’
‘রোজ রোজ সে নাকি নিতে পারবে না, আবার ঔষধ ছাড়া ঘুমতেও পারে না তাই।’
‘আচ্ছা। মা তোকে কী পৌঁছে দিয়ো আসবো? ভয় পাবি?’
‘না কাকু ভয় পাবো না। আমি জলন্ত অগ্নিশিখা আমার ভয় নেই।তুমি বরং নামাজ পড়ো।’
‘আচ্ছা! সাবধানে যাস।’
মেয়েটির কথার ধরণ কেমন অন্যরকম।এ কনকনে শীতেও মেয়েটির গায়ে কোন শীতের কাপড় নেই।ডুলতে ডুলতে এগোতে লাগলো শতাব্দী।তখনও তার প্রচন্ড মাথা যন্ত্রণা -প্রতিশোধের আগুনে তার আত্না কেবলই পুড়ছে। 
___________
বাসায় ফিরতে দেরি হওয়ার অপরাধে বড়চাচী এসে কতো গুলো কথা শুনিয়ে দিলেন।পাশ থেকে মেঝো চাচী বললেন আজ রাতে তোর খাওয়া বন্ধ। 
শতাব্দী কোন প্রতিউত্তর করলো না। রান্না চাপালো মাটির চুলোয়। তাকে গ্যাসে রান্না করতে দেয়া হয় না। 
রাত নটায় ঘরের সকলে একসাথে খেতে বসলো। কেবল শতাব্দী এবং রিফা ছাড়া৷ এ ঘরের কিছু রীতি আছে তার মধ্যে একটি হলো — রাতের খাওয়ার পরে ঘরের সকল সদস্য এক গ্লাস করে গরম দুধ খান। আজও এর ব্যতিক্রম হলো না। রিফাকে আজ শতাব্দীর ভাগের দুধটুকু দেয়া হলো, বরাবর সে এ থেকে বঞ্চিত। যদিও রিফার শতাব্দীর জন্য খারাপ লাগছিলো তবে সচারাচর খেতে না পাওয়ায় অতি উৎসাহে সে সবটুকু দুধ খেলো।
শীতের শুরু থেকে শতাব্দী রিফাকে বলেছে তার খাটে ঘুমোতে। আগে মেয়েটি বসার ঘরের মেঝেতেই শুয়ে পরতো।রিফার ঘুম খুব হালকা। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দেও তার মধ্যরাতের ঘুম ভেঙে যায়। তবে আজ মেয়েটি বেঘোরে ঘুমাচ্ছে।নাক ডাকছে সে— যেনো মনে হচ্ছে ঘুমের ঔষধ খেয়ে মেয়েটি এমন অচেতনের মতো ঘুমাচ্ছে। 
একটু আগের বিকট শব্দে যে গ্যাস সিলিন্ডার ফেটে সমস্ত বাড়িতে আগুন লেগেছে সে বিষয়ে মেয়েটি কেন এ বাড়ির কোন মানুষই টের পেলো না। তারা কী তবে মরার মতো ঘুমাচ্ছে? বিপদের আগে ঘুম বাড়ে এ কথা কী তবে সত্যি? 
শতাব্দী এক বালতি পানি এনে ঢেলে দিলো রিফার মুখে, মেয়েটি হুড়মুড় করে উঠে বসলো,
‘কী হয়েছে আপা? কী হয়েছে?’
‘ বাড়িতে আগুন লেগেছে।দ্রুত বাইরে চল। এখানে আর সময় নষ্ট করলে আমরাও আটকা পরবো।’
‘বড় বাবু? বড় চাচী…..?’
যে মানুষ টা তাকে পশুর মতো টর্চার করে প্রতিনিয়ত সে কিনা আগে তাকে বাঁচানোর কথাই ভাবছে।মানুষ কী বিচিত্র! 
‘তুই আগে নিজে চল।’
দুজনে দৌড়ে বের হতেই দেখলো বাড়িময় দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে।রিফা দৌড়ে গেলো গ্রামের মানুষদের ডেকে আনতে। প্রতিটি মানুষ এ ভয়াবহ আগুন নেভাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো।বরং আগুন কেবলই বাড়ছে।
আগুনের হলদে আভায় শতাব্দীর মুখ জ্বলজ্বল করে উঠলো, চোখদুটি অনিয়মিত ভাবে এদিক থেকে অদিক ঘুরতে লাগলো। সাদা চাদর গায়ে দেয়া মেয়েটির কোমড় অবদি খোলা চুলগুলো বাতাসের মোহে সদ্য কিশোরীর মতো নাচতে লাগলো।ঠোঁটে তাহার পৈশাচিক হাসি।
আজ এই আগুনের সাথেই জ্বলে পুড়ে শেষ হলো তার জীবনের কলঙ্কিত অধ্যায়।নিঃশেষ হলো তার দেহের কলঙ্ক। এই আগুনে পুরেই তার মায়ের পাপটুকুকে সে ধোঁয়ার মতো উড়িয়ে দিলো।
সকালের আলো ফুটতেই আগুন নিভলো, এখনও ধোঁয়া উঠছে বিধ্বস্ত বাড়িটি হতে।পুলিশ, উদ্ধারকর্মীদের জটলা বাড়ির চারপাশে। পুলিশ আটটি ডেডবডি বার করলো পোড়া বাড়িটি হতে।কোন লাশকেই সনাক্ত করা সম্ভব নয়, শরীর জ্বলে পুড়ে হাড় থেকে মাংস আলাদা হয়ে গেছে।
পুলিশ জিজ্ঞেসাবাদে শতাব্দী কোন কথাই বললো না, সে রাতের পর থেকে আর একটি কথাও বলে নি।সকলে ভাবলো একসাথে পরিবার এর এতোগুলা সদস্যকে মরতে দেখেই হয়তো সে ট্রমা টাইজ।রিফা সব ঘটনা বিস্তারিত বললো পুলিশকে।যদিও প্রশ্ন থেকেই যায় - এতগুলো মানুষ কেন বাঁচার চেষ্টা করলো না? এসবের উত্তর কারো জানা নেই, কেবলই ধোঁয়াস। 
এর তিন দিন পরে ফিরে এলেন শাখাওয়াত রহমান, মেয়েকে নিয়ে চলে এলেন ঢাকায়। নতুন স্কুল শতাব্দীর দারুণ কাটছে সময়। দুজনের রান্না, পড়াশোনা করেই কাটে দিন।হঠাৎ ২৪ এ এপ্রীল ২০১৫ শতাব্দীর বাবা একটা চকচকে লাল রং এর স্মার্ট ফোন নিয়ে এলেন শতাব্দীর জন্য — জন্মদানের গিফট হিসেবে।
এর মাঝে একদিন শতাব্দীকে তার মামার সাথেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো তার বাবা। নানা বাড়ি তে এ একমাত্র মামাই আছে শতাব্দীর। 
তাদের বাসা থেকে মামার বাসা মিনিট পাঁচেকের পথ।তার ধারণা মতে মামাও হয়তো হলেন অন্য সকল পুরুষের মতোই, তবে তাকে ভুল প্রমাণিত করে তার মামা হয়ে উঠলেন তার বাবার পরে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ । 
________
শতাব্দীর তখন প্রীটেস্ট পরীক্ষা শেষ, পড়াশোনার চাপ অনেক। ফোন ধরার সময় কোই! 
সন্ধ্যায় ফোন স্ক্রিনে তাকিয়ে হতভম্ব মেয়েটি। ওয়েবসাইট এর সার্চ অপশনে সার্চ করা কয়েকটি লিংক। যেখানে ঢোকার সাথে সাথে তার চোখ অগ্নি চক্ষু ধারণ করলো।মাথায় অসহনীয় যন্ত্রণা শুরু হলো।মস্তিষ্কে পোকারা দল বেধে খুবলে ধরলো, 
তার ফোন তার বাবা ছাড়া কেউ দেখে না। তবে কী বাবাই?
বাবাও কী আর সকল তথাকথিত পুরুষের মতোই? তার বাবার দৃষ্টিতেও তার কেমন ঘৃণা হতে লাগলো। এই দৃষ্টিও কী লোলুপ দৃষ্টি? যাতে আছে কেবলই নিষিদ্ধ কামানা?
তবে কী তার বাবার ছোঁয়া গুলোও নোংরা? তার দেহের কলঙ্ক কী তবে বিলীন হয় নি? সে কলঙ্কিত? আজও তার দেহ নাপাক?
এতসব চিন্তার সাথে সাথে বাড়লো মাথা যন্ত্রণা। শতাব্দী দৌড়ে গিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো।কল ছেড়ে বসে রইলো পানির নিচে।মস্তিষ্কে সুরে সুরে বাঝছে ভয়ংকর প্রতিশোধের গান।প্রতিশোধের নেশায় মত্ত মেয়েটি।এবার তবে কী হবে? কেমন হবে এ প্রতিশোধের শেষটা??
চলবে........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন