#পরাণ_ছোঁয়ার_বাহানা
পর্ব: ৬
ইমতিয়াজদের বাড়িটা টিচের চালার, ছাদে ওঠার উপায় নেই। ভীষণ মন খারাপের সময় ছাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগে অরনীর। নিজের বাড়িতে তাই করতো।
মীরার জন্য একটা পাকা ঘর তুলেছে মবিনুর বাড়ির একপাশে, মেয়েটার পাকা ঘরের খুব ইচ্ছা। কাজ এখনো চলছে। অরনী কাউকে কিছু না বলে সেই ঘরের ছাদে এসেছে। শেঁতলা পড়া সিঁড়িতে উঠতে কিছুটা ভোগান্তিই হচ্ছিলো বটে। পা টিপে টিপে তবুও এসেছে সে। নিজের কোনো ইচ্ছা অপূর্ণ রাখাকে নিজের উপর জুলুম মনে হয় তার।
ছাদটা আহামরি বড় না হলেও সুন্দর, রেলিঙ নেই। কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে এদিকে ওদিকে শেঁওলা পড়েছে। কোনোরকম অসাবধান হলেই সোজা নিচে। অরনী বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়। এখান থেকে রাস্তা অনেকটা দেখা যাচ্ছে। সেখানে দু'টো বাচ্চা তাদের বাবা মায়ের সাথে খুনসুটি করতে করতে কোথায় যেনো যাচ্ছে। বাচ্চাদের বাবা হয়তো কোনো একটা কৌতুক বলছে। বাচ্চাগুলো খিলখিল করে হাসছে। তাদের হাসি দেখে মনের অজান্তেই অরনীর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। তার জীবনে এমন কোনো দিন এসেছিলো কিনা তার মনে নেই। শেষ কবে তার বাবা তার সাথে হেসেছে তা-ও তার মনে নেই। মা তাকে অবাধ স্বাধীনতা দিলেও, সময় দিতো না মোটেই। সাজগোজ, বান্ধবীদের নিয়ে ঘোরাঘুরি করেই দিন কাটতো তার। অরনী একা একাই থাকতো, বিরক্ত হতো সবার উপর। এই বাড়িতে এসে সে যা-ই দেখছে তাতেই অবাক লাগছে। মীরা আর ইরার মা ভাত মেখে ওদের দুই বোনকে খাইয়ে দেয়। অরনী বাঁকা চোখে মাঝে মাঝে তাকায় সেদিকে। কখনো কখনো ইচ্ছা কি তার হয়না? তবুও মুখ ফুটে বলতে পারে না সে। এ বাড়ির মানুষেরাও আপন করতে পারছে না তাকে। তারা যে চেষ্টা করছে না ব্যাপারটা এমন না। অরনী-ই নিজেকে এমন একটা গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেছে যে ওরা চাইলেও সেই গণ্ডিতে ঢুকতে পারছে না। অরনী সবই বোঝে। কিন্তু কিছু করার নেই। সে এক বছরের বেশি এই বাড়িতে থাকবে না, শুধু শুধু মায়া বাড়িয়ে লাভ কি? কেনো অকারণে অন্যের কষ্টের কারণ হবে সে?
আবোল তাবোল ভাবতে ভাবতে ছাদের একদম কিনারায় এসে দাঁড়ায় অরনী। চুলগুলো খুলে দেয়। ভেজা, শীতল বাতাস ছুঁয়ে যায় তাকে। অরনী দুই হাত দু'দিকে ছড়িয়ে চোখ বন্ধ করে। জীবনটা উপভোগ করতে খুব ইচ্ছা হয় তার। মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে সব কিছু ছেড়েছুড়ে দিয়ে দূরে কোথাও যদি একা একা থাকতে পারতো, কি ভালোই না হতো। যা মন চায় করতে পারতো।
অরনী গুটি গুটি পায়ে আরো একটু এগিয়ে যায়। কি আশ্চর্য! ভয় করছে না তার মোটেই। মনে হচ্ছে কিছু যেনো চুম্বকের মতো টানছে তাকে। সে নিজেকে আটকাতে পারছে না। আর কিছু সেন্টিমিটার যাওয়ার পরেই হয়তো সে পড়ে যাবে, এই চিন্তা তার মাথাতেই নেই। সে এগিয়েই যাচ্ছে শুধু।
আচমকা হাতে হ্যাঁচকা টান পড়ে তার। কল্পনা জগৎ থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে যেনো সে এক ধাক্কাতে। ধাতস্থ হতে সময় নেয়। কম্পিত চোখে তাকাতেই ভয় পেয়ে যায়। কি হতে যাচ্ছিলো আরেকটু হলে। সে কেনোই বা এমন আচরণ করলো হঠাৎ?
"এসব পাগলামির মানে কি?"
কর্কশ গলার আওয়াজে অরনীর ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে দেখে মীরা দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। রাগে থমথম করছে তার মুখ। তবে কি মীরা-ই বাঁচালো তাকে?
"কি হলো কি? এভাবে তাকিয়ে না থেকে উত্তর দাও। এসব কেনো করছিলে? আমার ভাইজানকে ফাঁসাতে চাও?"
অরনী সরু গলায় বললো,"তার মানে?"
"আমার ভাইজানকে যদি তোমার পছন্দ না হয় চলে যাও এই বাড়ি থেকে। তোমার মা তো তোমাকে নিতে এসেছিলো। কেনো গেলে না? এই বাড়িতে থেকে তুমি মরতে চাও, তখন দোষটা তো আমার ভাইজানেরই হবে। তার উপর কিসের এতো রাগ তোমার?"
অপমানে মুখটা কালো হয়ে ওঠে অরনীর। হ্যা এটা ঠিক যে এই পরিবারটিকে সে কোনোভাবেই আপন ভাবতে পারছে না। তাই বলে তাকে এভাবে অপমান করার অধিকার কি এই মেয়েটার আছে?
"শোনো এই এক তলার ছাদ থেকে পড়ে কেউ মরে না, বুঝেছো? যদি সম্ভব হতো অনেক আগে আমি নিজেই....."
অরনী ঝট করে তাকায় মীরার দিকে। মীরার চোখের কোণে চিকচিক করে ওঠা পানিটুকু চোখ এড়ায় না তার। বেশ অবাক হয় অরনী। কি বলতে চাইলো মেয়েটা? অনেক আগে ও নিজেই মারা যেতো? কিন্তু কেনো? ধারালো চেহারার নিচে কি মেয়েটার কোনো ভয়ংকর কষ্ট লুকিয়ে আছে?
মীরা তৎক্ষনাৎ চোখ মুছে ফেলে। আবেগী হওয়াটাকে নেহাৎ নেকামি মনে হয় এখন তার। হ্যা সে কাঁদে, তবে গোপনে। কারো সামনে নয়, এই মেয়েটার সামনে তো নয়-ই।
"চলে যাও এখান থেকে, আর কক্ষণো এই ছাদে উঠবে না তুমি। আর একান্তই যদি আমার ভাইজানের সাথে তোমার থাকতে মন না চায় তবে চলে যাও। ওই মানুষটাকে কোনো বিপদে ফেলো না। সে আমাদের বটবৃক্ষ, তার ছায়ায় আমরা বেঁচে আছি। এতোগুলো মানুষকে আশ্রয়হীন করার অধিকার বোধহয় তোমার নেই।"
অরনীর রাগ হওয়া উচিত, ভীষণ রাগ হওয়া উচিত। কিন্তু সে অবাক হয়ে খেয়াল করে তার রাগ হচ্ছে না। কেনো যেনো একরাশ মায়া অনুভব করছে সে মেয়েটার জন্য। যে মেয়েটা উঠতে বসতে তাকে অপমান করে চলেছে, তার জন্য মায়া হচ্ছে। অদ্ভুত তো! সে তো এমন নরম মনের মেয়ে ছিলো না কখনোই। পারিপার্শ্বিক পরিবেশ কি তাকে বাধ্য করছে বারবার অবাঞ্চিত মায়ায় জড়াতে?
মীরা ভ্রু কুঁচকে তাকায় অরনীর দিকে। অরনী কীভাবে যেনো তাকিয়ে আছে তার দিকে। মীরা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। সে কি একটু বেশি কষ্ট দিয়ে ফেললো মেয়েটাকে? বাড়াবাড়ি করে ফেললো?
"আর কখনো এখানে এসো না। যাও।"
"তুমি যাবে না?"
মীরা অরনীর দিকে তাকায়। অরনী মুচকি হেসে বললো,"আমি এই বাড়ি থেকে চলে গেলে সবচেয়ে বেশি খুশি তুমি হবে তাইনা?"
মীরা উত্তর দেয়না। অরনী হাসতে হাসতে চলে যায়।
অরনীর অদ্ভুত আচরণে মীরা ভেবাচেকা খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অনুশোচনা বাড়ে, সেই সাথে বাড়ে রাগ। কেনো নিজের অপার্থিব কষ্টের ভার অন্য কারো উপর চাপিয়ে দেয় সে? কেনো সে এমন হয়ে গেলো?
হাঁটু মুড়ে ছাদের উপরই বসে পড়ে মীরা। অনেকদিন বৃষ্টিতে ভেজা হয়না। আজ বৃষ্টি হলে ভিজবেই সে। নিজেকে বড্ড অপবিত্র লাগে। বৃষ্টিধারা কি পারবে তার অপবিত্রতা মুছে দিতে আজীবনের জন্য? তা কি সম্ভব আর?
★
"আজ তো অনেকটা অঙ্ক করে ফেলেছেন, আজ থাক।"
অরনী ভরাট গলায় বললো,"আরো কিছুক্ষণ করবো, আপনার কি অসুবিধা আছে?"
ইমতিয়াজ পিছন ঘুরে ঘড়ির দিকে তাকায়। রাত এগারোটা চল্লিশ। এখনো রাতের খাওয়া হয়নি। সবাই না খেয়ে বসে আছে ওদের জন্য। এদিকে অরনীর অঙ্ক করাই শেষ হচ্ছে না।
"আজ একদিনেই বই শেষ করে ফেলবেন?"
"খুব খুশি হতাম এমনটা করতে পারলে।"
ইমতিয়াজ হাসে, মেয়েটা মেধাবী। সে যতোটা আশা করেছিলো তার চেয়েও আরো কয়েকগুণ বেশি মেধাবী। ফর্মুলা গুলো খুব তাড়াতাড়ি ধরে ফেলছে সে। এমন মেধাবী একটা মেয়ে দুইবার ফেইল করেছে এটা মানতে কষ্ট হচ্ছে ইমতিয়াজের। বুঝতেই পারছে ইচ্ছা করেই মেয়েটা পড়াশোনা থেকে দূরে থাকতো।
ইমতিয়াজ চেয়ার কিছুটা টেনে অরনীর দিকে এগিয়ে আসে। সে ভেবেছিলো অরনী পিছিয়ে যাবে, কিন্তু অরনী ঠাঁয় বসে থাকে।
ইমতিয়াজের হঠাৎ কেমন সাহসী হতে মন চায়। অরনীর অবাধ্য চুলগুলো কপালের কাছে এসে জমেছে। অরনী মাথা গোঁজ করে থাকায় চুলগুলো তার মুখ ঢেকে দিয়েছে। কেমন যেনো ঘোর লাগে ইমতিয়াজের সেদিকে তাকিয়ে। বাম হাত দিয়ে চুলগুলো কানে গুঁজে দেয়।
আচমকা ইমতিয়াজের স্পর্শে কেঁপে ওঠে অরনী। লাফ দিয়ে পিছিয়ে যায়। হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকায় ইমতিয়াজের দিকে। ইমতিয়াজের দৃষ্টি নির্লিপ্ত, যেনো কিছুই হয়নি।
"বসুন অরনী, আমার সামনে একটু বসুন।"
"বলুন কি বলবেন।"
"আরে বসুন তো।"
অরনী অনিচ্ছাসত্ত্বেও বসে তবে বেশ অনেকটা দূরত্ব নিয়ে। ইমতিয়াজ এক হাত দিয়ে টেনে অরনীর চেয়ারটা নিজের দিকে এগিয়ে আনে। অরনীর রাগ হলেও মুখে প্রকাশ করেনা।
"আমার দিকে তাকিয়ে একটা প্রশ্নের উত্তর দিবেন?"
"কি?"
"আগে তাকান আমার দিকে।"
"তাকাতে হবে কেনো?"
"সাইকিয়াট্রিস্টদের মতে কেউ যদি নিতান্তই প্যাথেলজিকাল লায়ার না হয় তবে অন্যের চোখের দিকে তাকিয়ে মিথ্যা বলতে পারেনা সে। আর আমি চাচ্ছি আপনি সত্যটা বলুন।"
অরনী ইমতিয়াজের চোখের দিকে তাকায়৷ সেই অভেদ্য দৃষ্টিও যেনো ভেদ করে ইমতিয়াজের ভিতর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী পুরুষও বোধহয় নারীর এই দৃষ্টির কাছে অসহায়। অরনীকে সত্য বলানোর জন্য নিজেই অসহায় হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা সুখের মতো যন্ত্রণা!
"মুখের পানে চাহিনু অনিমেষ, বাজিলো বুকে সুখের মতো ব্যথা!"
"কি উল্টোপাল্টা বকছেন?"
"ও কিছু না।"
"বলুন কি বলবেন, আমি সত্যটাই বলবো।"
ইমতিয়াজ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আস্তে আস্তে বললো,"এইযে আপনি এতো কষ্ট করে পড়াশোনা করছেন, জিদ চেপেছে আপনার পাশ করতেই হবে। এর পিছনে কারণ কি শুধুই আমার কাছ থেকে মুক্তি পাওয়া?"
"সত্যটা শুনলে কষ্ট পাবেন না তো?"
"আপনার উদ্দেশ্য আমাকে কষ্ট দেওয়া, কষ্ট না পেয়ে কোথাও যেয়ে যে আমার মুক্তি নেই।"
"এতো ভারী ভারী কথা আমি বুঝিনা। আর হ্যা, মূখ্য কারণ এটাই। আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই। এজন্য পাশ করাটা জরুরি। তবে অন্য কারণও আছে, যা বলতে চাচ্ছি না আমি। আপনি কি আপনার উত্তর পেয়েছেন?"
ইমতিয়াজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,"আপনি কি কাউকে পছন্দ করতেন? ভালোবাসতেন?"
"এমন কোনো অনুভূতি কখনো তৈরি হয়নি।"
ইমতিয়াজের স্বস্তি হয় মনের অজান্তেই।
ইমতিয়াজকে চুপ করে থাকতে দেখে অরনী বললো,"দেখুন আপনাদের কষ্ট দিতে চাইনা আমি। আপনারা অনেক ভালো মানুষ, কিন্তু আমি তো নই।"
"কে বলেছে আপনি ভালো মানুষ না?"
অরনী ছোট্ট করে হাসে, কিছু বলেনা।
উঠে দাঁড়ায় পরক্ষণেই সে। এ বাড়িতে কেউ কাউকে ছাড়া খায়না। সে খুব ভালো করে জানে মানুষগুলো অপেক্ষা করছে তাদের জন্য।
"খেতে চলুন।"
"আপনি যান, আমি আসছি।"
অরনী কথা না বাড়িয়ে চলে যায়, ইমতিয়াজ পিছন থেকে ঘোর লাগা কণ্ঠে বললো,"আমি যদি অপেক্ষায় থাকি?"
অরনী অবাক হয়ে পিছন ঘুরে বললো,"কিসের?"
"কিছু না, আপনি যান।"
অরনী চলে যেতেই ইমতিয়াজ বিড়বিড় করে বললো,"আপনার প্রথম অনুভূতির সাক্ষী হওয়ার মিসেস হাওয়াই মিঠাই।"
ইমতিয়াজ দুই হাত টেবিলে ঠেকিয়ে মাথা চেপে রাখে কিছুক্ষণ, প্রথম স্পর্শটা তার অস্থিরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। নিজেকে সামলানোর উপায় তার জানা নেই, এই অনুভূতি যে তার নিজেরও প্রথম।
★
খাওয়ার টেবিলে চুপচাপ বসে আছে অরনী। খাবারগুলো শুধু নেড়েচেড়ে যাচ্ছে একমনে। খেতে ইচ্ছা করছে না। সবাই একই খাবার খেলেও তার জন্য প্রতিদিনের মতো অন্য খাবার। সে-ই বলেছিলো তাকে এগুলো দিতে। কিন্তু আজ এগুলো দেখে কেমন বিস্বাদ লাগছে তার।
বৃষ্টির সময়ে প্রায় রাতেই এ বাড়িতে খিচুড়ি হয়। খিচুড়ির মিষ্টি সুবাসে ম ম করছে যেনো পুরো বাড়ি। সাথে আবার রয়েছে আমের আচার, গন্ধেই পেট ভরে যাবে যেনো।
দুই মেয়ের বায়না, মা'কেই খাইয়ে দিতে হবে। আঁখি বেগম অগত্যা বড় গামলায় ভাত মেখেছে। লোভ সামলাতে পারেনি ইমতিয়াজও। সে নিজেও মেঝেতে বসে পড়েছে দুই বোনের সাথে। তিন ছেলেমেয়েকেই আজ খাইয়ে দিতে হবে আঁখি বেগমের।
"আমার ছানা তিনটা আর বড় হলো না। এই বুড়ো খোকাখুকুগুলোকে নাকি এখনো মায়ের খাইয়ে দিতে হবে। এতো জ্বালাস কেনো তোরা আমাকে?"
আঁখি বেগমের সেই কথায় বিরক্তি নয় বরং প্রশ্রয়ের পরিমাণটাই বেশি ছিলো। ছেলেমেয়েরা তা ভালোভাবেই বুঝে গেছে।
"বুঝলে মা জননী, আমার এই পাগলগুলো এমনই করে। সবসময় তো আমাদের বাড়ি ভালোমন্দ রান্না হয়না। তবে যা-ই রান্না হোক, মা খাইয়ে দিলে ওরা অমৃত মনে করে খেয়ে নেয়।"
অরনী মবিনুরের কথা শুনে হাসির চেষ্টা করে, ঠিক ফোটে না হাসিটা। দুইজন শুধু বসে আছে টেবিলে, বাকিরা মেঝেতে। অরনীর সামনে ওটস, ফল, দুধ। আড়চোখে সে ইরাদের দিকে তাকায়। ইশ! যেনো সত্যিই অমৃত খাচ্ছে। অরনীর মোটেই এই বিস্বাদ ওটস খেতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু বলতে বাধাও পাচ্ছে, কীভাবে বলবে তারও খিচুড়ি খেতে ইচ্ছা করছে? আমের আচারের গন্ধে তার পেটেও লোভ মোচড় দিয়ে উঠছে।
কিছুক্ষণ এভাবে মূর্তির মতো বসে থেকে অরনী উঠে দাঁড়ায়। সবাই কিছুটা অবাক হয়ে যায়।
আঁখি বেগম শুষ্ক হাসি দিয়ে বললো,"উঠে দাঁড়ালে যে মা? কিছুই তো খেলে না।"
অরনী শক্ত গলায় বললো,"আমার খিদে নেই।"
"সে কি কথা? সেই দুপুরে খেয়েছো অল্প কয়টা। না খেয়ে রাতে থাকবে কীভাবে তুমি?"
"খিদে না থাকলে কীভাবে খাবো? খাবার দেখে বমি আসছে।"
মবিনুর ছেলের দিকে তাকিয়ে বললো,"এতো তাড়াতাড়ি?"
ইমতিয়াজ রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,"বাবা কথায় লাগাম টানো, কোথায় কি বলতে হয় এই বুড়ো বয়সেও বুঝলো না লোকটা।"
মবিনুর কিছু না বুঝে মাথা চুলকায়।
অরনীর হঠাৎ অভিমান হয়, কোনো কারণ ছাড়াই। অতিরিক্ত অভিমান হলে তার চোখে পানি জমা হয়। সেই পানি এই মানুষগুলোকে দেখাতে চাচ্ছে না সে কোনোভাবে।
রাগে ধুপধাপ করে পা ফেলে চলে যাচ্ছিলো, হঠাৎ হাতে টান পড়ায় সে ঘুরে তাকায়। ইমতিয়াজ তার হাত চেপে ধরে আছে।
অরনী ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকায় তার দিকে।
"আচ্ছা আজ নাহয় আমার মায়ের হাতের খিচুড়ি খেয়ে দেখুন, নেহাৎ খারাপ লাগবে না আপনার। আপনার ওই শুকনো ওটসের থেকে খুব একটা খারাপ হবে না।"
অরনী থতমত খেয়ে যায়, এই মানুষটা কি মাইন্ড রিড করতে জানে? যদি সত্যি জানে সে তো ভারী কেলেংকারীর কথা। লজ্জায় পড়ে যেতে হবে যে ভীষণভাবে।
"আমি কেনো খিচুড়ি খাবো? রাতে আমি এমন ভারী খাবার খাই?"
"আজ নাহয় খেলেন একটু কষ্ট করে।"
অরনী ইমতিয়াজের দিকে তাকায়, ইমতিয়াজের দৃষ্টি যেনো তাকে ভরসা দিচ্ছে। অরনীর ষোলো আনা ইচ্ছা থাকলেও নিজের সেই অদৃশ্য গণ্ডির থেকে সে বেরোতে পারছে না, যে প্রাচীর সে নিজে তুলে দিয়েছে নিজের চারপাশে।
"বসুন।"
আঁখি বেগম ইতস্তত করে বললো,"ও কি আমার হাতে খাবে রে? ও যদি খিচুড়ি খেতে চায় ওকে আলাদা দিই, জোর করিস না।"
"উনি তোমার হাতেই খাবে মা, কি তাইনা?"
অরনী তীর্যক চোখ মীরার দিকে তাকায়। মীরা মায়ের দিক থেকে কিছুটা সরে বসে। ইশারাতেই যেনো অরনীকে মায়ের কাছে বসার জায়গা বুঝিয়ে দেয়। আঁখি বেগম হাতের ইশারায় তাকে কাছে ডাকে।
অরনীর মনে হচ্ছে সে বুঝি স্বর্গের কাছাকাছি কোনো স্থানে পৌঁছে গেছে। সে শুনেছে বেহেশতে শুধু অনাবিল আনন্দ, সেখানে কোনো কষ্ট নেই। আঁখি বেগমের খাইয়ে দেওয়া প্রতিটা লোকমা আসলেই তার কাছে অমৃতের মতো লাগছে। মনে হচ্ছে সে সারাজীবন এই খিচুড়ি খেয়েই কাটিয়ে দিতে পারবে। আর কোনো কিছুর প্রয়োজন হবে না। আচ্ছা রান্না কি আসলেই এতো মজা হয়েছে নাকি মায়ের মমতা ঢালা খাবার সত্যিই এমন মজা হয়? অরনী জানেনা, তার মা তাকে কখনো খাইয়ে দেয়নি তো, কীভাবে জানবে? মায়ের কাছে সেই সময়-ই ছিলো না কখনো।
আরামে চোখ বুঁজে আসে অরনীর। সেই নিষ্পাপ মুখের আদলের দিকে তাকিয়ে ইরা, মীরা, আঁখি বেগম, মবিনুর সবার ভীষণ মায়া হয়। সবচেয়ে বেশি মায়া ঘিরে ধরে ইমতিয়াজকে। আচ্ছা অরনীর মনে কি এই মায়ার ছিটেফোঁটাও পৌঁছায়নি? এই মায়া কাটিয়ে সে চলে যেতে পারবে? ইমতিয়াজ ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে। একই সাথে বুকভরা আনন্দ আর পাঁজর ভরা কষ্টের অনুভূতি এই প্রথম। মানুষ হয়ে জন্মানো বড়ই কঠিন গো, কতো রকম অদ্ভুত অনুভূতির মুখোমুখি-ই না হতে হয় এই ছোট্ট জীবনটিতে।
(চলবে.....)