ফন্ট সাইজ:
থিম:
পরান ছোঁয়ার বাহানা

৭ম পর্ব

লেখক: মিথিলা জামান নিভা

#পরাণ_ছোঁয়ার_বাহানা

পর্ব ৭:

অরনী আজ সকাল সাতটার সময় ঘুম থেকে উঠেছে। এতো তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস তার নেই। ইমতিয়াজও কিছুটা অবাক। তবুও কিছু জিজ্ঞাসা করেনি তাকে। টেবিলে বসে নিজের পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে আড়চোখে দেখছিলো শুধু অরনীকে। খুব স্বাভাবিকভাবে অরনী বিছানা থেকে উঠে, হাতমুখ ধুয়ে এসেছে। বাথরুম থেকেই পোশাক পালটে এসেছে। ধূসর রঙা চুড়িদারের সাথে কালো ওড়নাতে কাউকে এতোটা স্নিগ্ধ লাগতে পারে ইমতিয়াজের ধারণা ছিলো না।

অরনী ব্যাগ থেকে কিছু সাজগোজের জিনিস বের করে। মেয়েরা ভয়ংকর প্রতিকূল পরিবেশেও নিজের সাজগোজের প্রতি নজর রাখে। অরনী যেই অবস্থায় নিজের বাড়ি থেকে এখানে এসেছে সাজগোজের এসব জিনিস যে সাথে করে আনবে তা ধারণাই করা যায়নি। ইমতিয়াজের কিছুটা অপরাধবোধ হয়। স্বামী হিসেবে তার দায়িত্ব ছিলো নতুন করে এগুলো তাকে কিনে দেওয়া। অরনী তাকে মানতে পারুক বা না পারুক, ইমতিয়াজ নিজের দায়িত্বকে অস্বীকার করতে পারেনা।

অরনী খুব যত্ন নিয়ে চোখের নিচে কাজল টেনে দেয়, অনেকটা সময় নিয়ে চুল বাঁধে। কোঁকড়া, ফোলা চুলগুলো আঁচড়াতে যেয়ে বারবার বিপাকেই পড়ে মেয়েটা। ছিপছিপে শরীরের সাথে মাথাভর্তি এতো চুল বড্ড বেমানান হওয়ার কথা, তবে অরনীকে বেশ মানিয়ে যায়। ইমতিয়াজের ইচ্ছা করে অরনীর হাত থেকে চিরুনিটা নিয়ে নিজেই আঁচড়ে দিতে। কিন্তু নিজের ইচ্ছাটুকু দমন করে রাখে সে। বোঝাই যাচ্ছে মেয়েটার মন ভালো, অকারণে মেজাজ খারাপ করিয়ে দেওয়ার কোনো মানে নেই।

এ পর্যন্ত অরনীকে ইমতিয়াজ কখনো ঠোঁটে লিপস্টিক ছোঁয়াতে দেখেনি। অবশ্য তার প্রয়োজনও পড়ে না। গোলাপরঙা ঠোঁটে লিপস্টিক অপ্রয়োজনীয়। আজ আবার সে কিছুটা লিপস্টিকও ছোঁয়ায়। ইমতিয়াজ সরু চোখে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। আচ্ছা সে কি অতিরিক্ত করে ফেলছে না? সামান্য একটা লিপস্টিককেও কেনো হিংসা করছে সে? কেনো মনে হচ্ছে ওই ঠোঁটজোড়া ছোঁয়ার অধিকার শুধুমাত্র তার? কোনো মানুষের তো নয়-ই, কোনো জড়বস্তুরও নয়। এসবের কোনো মানে হয়? ত্রিশের কোঠায় পা দিবে সে বছরখানেক পরেই। এখন এমন ছেলেমানুষী কি তাকে মানায়? মনে হচ্ছে যেনো অষ্টাদশে পা দেওয়া কোনো কিশোর নতুন করে প্রেমে পড়ছে। প্রেম কি মানুষকে ছেলেমানুষ বানিয়ে দেয়?

ইমতিয়াজ বইয়ের দিকে তাকিয়েই জিজ্ঞেস করলো,"কোথাও কি যাওয়া হচ্ছে?"

অরনী উত্তর দেয়না, আয়নায় নিজেকে দেখতে ব্যস্ত সে। কতোদিন নিজেকে দেখা হয়নি এভাবে সাজগোজ করে। সে তো ভুলেই গিয়েছিলো যেনো নিজের সুন্দর মুখটা।

ইমতিয়াজ উঠে এসে অরনীর মুখোমুখি দাঁড়ায়, অরনী ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকায়। কিছুটা বিরক্ত হয় সে।

"আপনি কি কোথাও যাবেন?"

"তো আপনার কি মনে হচ্ছে আমি সেজেগুজে আপনাকে দেখাবো বলে সকাল সকাল সাজতে বসেছি?"

ইমতিয়াজ ঠোঁট কামড়ে হাসে, অরনীর কথা গুলো ভীষণ মজার। হাসি আসতে বাধ্য।

"হাসছেন কেনো উজবুকের মতো?"

"হাসি যদি মোর অপরাধ হয় হে প্রিয়তমা, তবে শূলে চড়িয়ে দিন আমাকে। আপনার দেওয়া শাস্তি আমি মাথা পাতিয়া গ্রহণ করিতে প্রস্তুত আছি।"

অরনী বিরক্ত হয়ে ইমতিয়াজকে হালকা ধাক্কা দিয়ে আয়নার সামনে থেকে সরিয়ে দেয়, এরপর আবার নিজের চুলটা ঠিক করতে থাকে। তাকে আসলেই ভীষণ সুন্দর লাগছে আজ। নিজেই নিজের দিক থেকে চোখ সরাতে পারছে না।

"আপনি যে সেজেগুজে আমাকে দেখাবেন না সে আমি জানি, সে সৌভাগ্য এই অধমের নেই। বুঝতেই পারছি বের হবেন। তো বলুন কোথায় যাবেন, আমি পৌঁছে দিই।"

"তার কোনো প্রয়োজন হবে না। আমি একাই যেতে পারবো।"

"সে আমি জানি, আপনি আমার স্বনির্ভরশীল ঘরনী। তবুও আমার কিছু দায়িত্ব তো আছেই।"

"আমি কলেজে যাবো, আর আমি একাই যাবো। এ নিয়ে আর একটা কথাও আমি শুনবো না।"

ইমতিয়াজ কিছুটা অবাক হয়ে বললো,"হঠাৎ এই সময়ে কলেজে?"

"কলেজ থেকে জানিয়েছে যারা আবার নতুন করে পরীক্ষা দিবে তাদের অ্যাপ্লিকেশন করে ফেলতে এই সপ্তাহের মধ্যে। নাহলে পরীক্ষা দেওয়া হবে না।"

"কে জানালো এই কথা?"

"আমার বান্ধবীরা।"

"বান্ধবীরা মানে? আপনার বান্ধবীরাও কি পরীক্ষা দিবে?"

"হ্যা।"

ইমতিয়াজের মুখ হাঁ হয়ে যায়।

"তারাও কি দুইবার ফেইল করেছে?"

অরনী বিরস মুখে বললো,"করলে করেছে, তাতে আপনার কি?"

"আমার আবার কি? আমার কিছু না।"

"তাহলে মুখটা বন্ধ রাখুন, আর আমার সামনে থেকে সরে যান।"

"আপনি সত্যিই একা যাবেন? আমি পৌঁছে দিলে খুব অসুবিধা হবে?"

অরনী ইমতিয়াজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার চোখে চোখ রাখে। ইমতিয়াজও শান্ত চোখে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।

"হ্যা অসুবিধা হবে। আমি চাইনা ওরা আপনাকে দেখুক।"

ইমতিয়াজ মুচকি হেসে নিজের চুলগুলো ঠিক করতে করতে বললো,"কেনো? আপনি চাননা ওরা কেউ আমার প্রেমে পড়ুক, তাই?"

অরনীর শরীর জ্বলে ওঠে। লোকটা এতোটা অসভ্য, চেহারা দেখলে বোঝার উপায় আছে? চেহারা দেখে মনে হয় ভাজা মাছটা উলটে খেতে জানেনা। ভিতর ভিতর বদমায়েশের বাসা।

"মোটেই তা নয় মিস্টার লাউ ওরফে ইমতিয়াজ মাহমুদ। আপনি নিজেকে যতোটা সুদর্শন মনে করেন আপনি মোটেই তা নন। তাছাড়া ওদের সবার প্রেমিক আছে। তা ফেলে আপনার মতো একটা উজবুকের প্রেমে পড়বে? অসম্ভব।"

ইমতিয়াজ অরনীর অনেকটা কাছাকাছি সরে আসে, অরনী পিছিয়ে যেতে গেলে ইমতিয়াজ তার বাম হাতের বাহু কিছুটা শক্ত করে চেপে ধরে। ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে যায় অরনী।

"যতোটা অপদার্থ, উজবুক আমাকে মনে করছেন, ততটা আমি নই। একদিন ঠিক বুঝিয়ে দিবো এ কথা আপনাকে।"

অরনী নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বললো,"আমার বোঝার প্রয়োজন নেই।"

"কেনো? ভয় পেয়ে গেলেন?"

"মানে? কিসের ভয়?"

"যদি সামলাতে না পারেন তার ভয়? যদি সব রাগ, অভিমান, অহংকার ভেঙে চুরমার হয়ে যায়? যদি ভালোবাসারা ডানা মেলার সুযোগ চায়? যদি এই হৃদয় ভালোবাসতে চায়? যদি এই হরিণ চোখের রমনীটি এই উজবুকের প্রেমে পড়ে যায়?"

"এমন দিন কখনো আসবে না, কোনোদিনও না। আপনি ভুল মানুষকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন। মাত্র একটা বছর, এরপর আপনার আর আমার রাস্তা আলাদা।"

"মানুষ তো বেঁচেই থাকে তার অপূর্ণ স্বপ্নগুলোকে পূর্ণতায় রূপ দেওয়ার আশা নিয়ে। তবে সত্যিই যদি এমন কিছু কখনো হয়, আপনাকে আমি সেদিন স্বর্গ ঘুরিয়ে আনবো, এটা আপনাকে দেওয়া আমার প্রতিশ্রুতি।"

অরনী ভ্রুকুটি করে বললো,"তার মানে?"

"মানে বোঝার জন্য সময় দিলাম আপনাকে, কাউন্টডাউন বিগিনস ফ্রম নাও।"

অরনীকে ছেড়ে দিয়ে ইমতিয়াজ ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, রাগত দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকে অরনী। রাগে হাত-পায়ের তালু চিড়বিড় করে ওঠে তার।

★

"অরু দাঁড়াও।"

অরনীর পা দু'টো নিশ্চল হয়ে যায়। কলেজের কাজ শেষ করে বান্ধবীদের সাথে গল্প করতে করতে কেবলই গেটের বাইরের দিকে যাচ্ছিলো সে। সেই পরিচিত গলার স্বর শুনে তার শরীর ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। ঠিক যে ভয়টা সে পাচ্ছিলো তাই হলো।

অরনী ঘাড় ঘুরিয়ে বান্ধবীদের দিকে তাকায়। ওরা মাথা নিচু করে ফেললেও ওদের অপরাধী মুখটা চোখ এড়ায় না অরনীর। সে হতভম্ব হয়ে যায়। তার মানে সে আজ কলেজে আসার খবরটা ওরাই নিয়াজকে জানিয়েছে? এতোটা বিশ্বাসঘাতক ওরা? অরনী চোখমুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে যায়। তপ্ত শ্বাস পড়তে থাকে তার ঘনঘন। ফর্সা মুখ ক্রমশ লাল হতে থাকে।

নিয়াজ নামের ছেলেটা এসে দাঁড়ায় অরনীর সামনে। ঘৃণায় অরনী এক দলা থুতু ফেলে মাটিতে। সেদিকে তাকিয়ে নিয়াজ খ্যাক করে হেসে দেয়। পিছনে দাঁড়িয়ে তার সাঙ্গপাঙ্গরা। তারাও নিয়াজকে দেখাদেখি হাসে।

নিয়াজ এই কলেজের নেতাগোছের এক ছাত্র, ডিগ্রী নিয়ে পড়ছে। পড়াশোনায় অষ্টরম্ভা। বড়লোক বাবার বখে যাওয়া ছেলে যাকে বলে এক কথায়। দলবল নিয়ে কলেজে মহড়া দেয়, মেয়েদের উত্যক্ত করে, খারাপ নেশাতেও জড়িত। শিক্ষকরা এক সময় শাস্তি দিয়েছে, তাতে লাভ হয়নি। এখন তারা কিছুটা এড়িয়েই চলে নিয়াজকে।

অরনী প্রথমদিন কলেজে পা দিতেই টার্গেটে পড়ে যায় নিয়াজের। যা চলছে এখন পর্যন্ত। অরনী ভেবেছিলো এ যাত্রায় হয়তো নিয়াজ তাকে ভুলে যাবে। কিন্তু না, সে ভুল। আর এই বিশ্বাসঘাতক বান্ধবীগুলো কিনা এই নিয়াজকেই জানিয়ে দিয়েছে আজ সে কলেজে আসবে? ওদের তো সে পরে দেখে নিবে, আগে এই বদমায়েশটাকে শিক্ষা দিতে হবে।

"কি হলো অরু? তাকাবে না আমার দিকে?"

"সামনে থেকে সরে যান, আমাকে যেতে হবে।"

"যাবেই তো, অবশ্যই যাবে। এতোদিন পর চাঁদমুখখানা দেখলাম, মিষ্টি খাবো না?"

অরনী দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে। দাঁতে দাঁত ঘষতে থাকে রাগে। ইচ্ছা করছে এক ঘুষি দিয়ে দাঁত ফেলে দিতে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অসভ্যটার।

নিয়াজ একটা সিগারেট ধরায়, ধোঁয়া ছাড়ে অরনীর মুখে। অরনী কাশতে কাশতে নাক চেপে ধরে। পালানোর উপায় নেই, নিয়াজের দলবল ঘিরে ধরে রেখেছে তাকে।

"এসব কি হচ্ছে? কি অসভ্যতা এগুলো?"

"আমরা অসভ্য মানুষ, অসভ্যতা করবো। তোমার বাবা সভ্য মানুষ, কিন্তু প্রতিশোধ তো আমরাও নিতে জানি তাইনা?"

"তার মানে? আমার বাবার কথা কেনো আসছে এখানে?"

নিয়াজ হাসে, বাকিরাও হাসে সাথে।

"কি করেছে তোমার বাবা শুনতে চাও?"

অরনী কিছুটা অবাক হয়ে তাকায়। নিয়াজ শার্টের হাতে গোটাতে গোটাতে বললো,"আমার বাবা তোমার আর আমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলো তোমার বাবার কাছে। তোমার বাবা কি করলো? অপমান করে আমার বাবাকে তাড়িয়ে দিলো। এই শহরে কারো ক্ষমতা নেই আমার বাবাকে অপমান করার। সে চাইলে সেদিনই তোমার বাবাকে কেয়ামত পর্যন্ত পাঠিয়ে দিতো, কিন্তু দেয়নি। কারণটা কি জানো? কারণ তাকে কুত্তার মতো মারলে তার যতোটা কষ্ট হতো, তারচেয়েও বেশি কষ্ট হবে তোমার কোনো সর্বনাশ হলে। আমার বাবার এই আস্থাটুকু আমার উপর আছে, আমি তা করতে পারবো।"

এই বলে নিয়াজ আবারও বীভৎসভাবে হাসে। অরনীর শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে যায়। রক্ত হিম হয়ে আসে তার। এসব কবে হলো? বাবা তাকে এগুলো কিছু জানায়নি কেনো? এজন্যই কি তাড়াহুড়ো করে বিয়ের ব্যবস্থা করলো বাবা?

"আর কি জানো অরনী? তোমার বাবা বলেছে আমি নাকি গুন্ডা, আর এই গুন্ডার সাথে নাকি তোমার মতো ননীর পুতুলের যায়না। আচ্ছা যদি ননীর পুতুলের শরীরে একটা খুঁত সৃষ্টি করে দেওয়া যায়? তাহলে কেমন হবে?"

অরনীর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে। বান্ধবীগুলো বুঝতে পারেনি ঘটনা এদিকে মোড় নিবে। হুমকি দিয়েছিলো নিয়াজ তাদের, বাধ্য হয়ে এটা করতে হয়েছে তাদের। ভয়ে তারা জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অরনী ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় এদিক ওদিক। দুপুরের এই সময়ে রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকে, কদাচিত একটা কি দুইটা খালি রিকশা চলাচল করছে। চিৎকার করলেও কাউকে পাওয়া যাবে না, কেউ আসবেও না। নিয়াজদের সাথে থাকে ধারালো চাপাতি, হকিস্টিক। এর আগে নিয়াজ তাকে বিরক্ত করলেও এতোটা বেপরোয়া কখনো হয়নি। অরনীর বাবার উপর জমে থাকা রাগ কি এবার অরনীর উপর দিয়ে শোধ নিতে চায়?

"গুন্ডা বলবে অথচ গুন্ডামী দেখবে না, তাতো হয়না।"

অরনী নিজের সাহস হারায়না, এই মুহুর্তে সাহসটুকু ছাড়া আর কিছু নেই তার।

"নিয়াজ সামনে থেকে সরে যাও, আমি কিন্তু চিৎকার করবো।"

"করো, শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করো। কেউ আসবে না তোমাকে বাঁচাতে। তোমার সামনে এখন দুইটা অপশন আছে। এক, তুমি আমার সাথে এখন কাজী অফিসে যাবে, বিয়ে করবে আমাকে। আর দুই....."

"দুই?"

নিয়াজ কিছুটা হেসে বাকিদের দিকে তাকায়। বাইক ঘিরে ধরেছে ইতোমধ্যে অরনীকে। অরনীর বুকটা কেঁপে উঠলেও উপরে প্রকাশ করেনা। কেনো সে ইমতিয়াজের কথা শুনলো না সে। বলেছিলো নিতে আসবে সে, অরনীই তো মাতব্বরি করে মানা করে দিলো। আর সে এসেও বা কি করতো? এতোগুলো জানোয়ারের সাথে লড়াই করার ক্ষমতা কি তার আছে?

নিয়াজ হঠাৎ করে এসে অরনীর হাত চেপে ধরে। স্তম্ভিত হয়ে যায় অরনী। অরনীর বান্ধবীরা ছুটে এসে অরনীকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে নিয়াজের হাত থেকে। নিয়াজের দলবল তাদের টেনেহিঁচড়ে সরিয়ে দেয়। অরনী যেনো চিৎকার করতেও ভুলে গেছে, গলা দিয়ে একটা কথাও বের হচ্ছে না তার। অদৃশ্য কেউ যেনো গলাটা চেপে ধরেছে তার।

"ছাড় নিয়াজের বাচ্চা, কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস আমাকে?"

"আপাতত তো কাজী অফিসে নিয়ে যাচ্ছি। তারপর কোথায় নিবো জানিনা, বাসর করতে চাও কোথায় তুমি? তুমি যেখানে চাইবে সেখানেই নিবো।"

"ছাড় আমাকে জানোয়ার, আমার বাবা জানতে পারলে তোর বিয়ের করার সাধ সারাজীবনের মতো ঘুচিয়ে দিবে।"

নিয়াজ হাসতে হাসতে বললো,"তা বেশ! ডাকো তোমার বাবাকে। দেখি কে তোমাকে বাঁচায়। এই তোল ওকে, আজ শুধু মাস্তি হবে।"

অরনী চিৎকার করে চোখ বন্ধ করে ফেলে। হুটোপুটির আওয়াজ শোনা যায়, অরনী চোখ খুলতে পারেনা। ভয়ে তার ঠোঁটজোড়া গাঢ় নীল হয়ে গেছে, কাঁপছে তিরতির করে। যে কোনো সময় বুঝি কিছু শক্ত, নোংরা হাতে তাকে চেপে ধরে, অপবিত্র হবে তার শরীর। যে কোনো মুহুর্তেই যেনো জ্ঞান হারাবে সে।

★

"এই তুই কে?"

"তোর বাপ, আপাতত আমার আর কোনো পরিচয় তোর না জানলেও চলবে।"

হতভম্ব অরনী ঝট করে তাকায় সামনের দিকে। চোখ বড় বড় হয়ে যায় তার। না না এটা বাস্তব নয়, এটা স্বপ্ন। অবশ্যই স্বপ্ন। এটা কীভাবে সম্ভব? উনি এখানে? এই সময়ে? অরনীর বড্ড বেশি ক্লান্ত লাগে, মনে হচ্ছে সে এক্ষুনি মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। শরীরের সমস্ত শক্তি কমে আসে। মনে হচ্ছে তপ্ত মরুর বালুর উপর দিয়ে মাইলের পর মাইল রাস্তা পাড়ি দেওয়ার পর হঠাৎ শীতল কোনো জলাশয়ের দেখা পেয়েছে সে, ভীষণ ঘুম আসে।

★

অরনীকে নিয়ে ইমতিয়াজ যখন বাড়ি পৌঁছায় তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। অরনী মাথা এলিয়ে দিয়েছে ইমতিয়াজের পিঠে। ইমতিয়াজ খুব আস্তে বাইক চালিয়েছে যাতে অরনী পড়ে না যায়। বিধ্বস্ত মেয়েটার প্রতি অসম্ভব মায়া কাজ করছে তার। যদিও তা প্রকাশ করেনি একটা বারের জন্যেও। চোখমুখে কাঠিন্য তার। শুধু স্নেহ নয়, কখনো বজ্রের মতো কঠিনও হতে হয় পুরুষ মানুষকে তার শখের নারীর জন্য।

আঁখি বেগমের মনটা দুপুর থেকে কেমন যেনো করছে। অকারণে বুক ধড়ফড় করছে। একবার ঘর, একবার বারান্দা আরেকবার উঠোন। এভাবেই ছুটোছুটি করেছে সে পুরোটা দুপুর। বারবার গেটের দিকে তাকাচ্ছে, ইমতিয়াজ বা অরনী কেউ ফিরছে না। মীরা আর ইরা মা'কে শান্ত করার চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি, তাও সে বিন্দুমাত্র শান্ত হতে পারছে না।

হঠাৎ গেটের বাইরে ইমতিয়াজের বাইকের আওয়াজ শুনে ছুটে যায় সেদিকে আঁখি বেগম। শাড়ির আঁচল মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিলো, কোনোরকমে তা তুলে শরীরে পেঁচায় সে।

ইমতিয়াজ বাড়ি ঢোকে, আঁখি বেগম হতবাক হয়ে যায়। বাম হাত থেকে রক্ত ঝরছে তার, ফোঁটা ফোঁটা রক্ত সাদা শার্টেও লেগেছে। বাইকের পিছনে এলোমেলো অবস্থায় অরনীকে দেখে আরো চমকে ওঠে সে।

বাইক থামিয়ে ইমতিয়াজ নামে, আঁখি বেগম দুই হাতে জাপটে ধরে অরনীকে। ছেলের চেয়েও বেশি চিন্তা তার বউমাকে নিয়ে, তার কোথাও লাগেনি তো?

ইমতিয়াজ হেলমেট খুলতেই আরো একপ্রস্ত চমকে যায় আঁখি বেগম। কপাল চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে, বেশ অনেকটাই কেটে গেছে সেখানে।

ইরা-মীরা 'ভাইজান' বলে চিৎকার করে দুইপাশ থেকে জড়িয়ে ধরে ইমতিয়াজকে। ইমতিয়াজ তাদের মাথায় হাত দিয়ে তাদের শান্ত করার চেষ্টা করে, এমন কিছুই হয়নি তার যে এতো শোরগোল করতে হবে এটা বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু কোথায় কি? দুই বোনের আর্তচিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। অরনীর মাথা তখন আঁখি বেগমের বুকে। ঝড়ে পড়া ভীত পাখির মতো কাঁপছে সে। আঁখি বেগমের আঁচলে কি মিষ্টি একটা গন্ধ, একদম যেনো মা মা গন্ধ। অরনীর মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে। মাথা উঠাতে ইচ্ছা করে না এখান থেকে। ঘুম এসে যায়, মনে হয় কতোকাল ঘুমায় না সে শান্তি করে।

★

মুখের উপর বাম হাত দিয়ে ঢেকে শুয়ে আছে ইমতিয়াজ। তার পাশেই কাচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে আছে অরনী। কিছু একটা বলতে চাচ্ছে সে ইমতিয়াজকে, পারছে না। হঠাৎ ইমতিয়াজের ঠোঁটের দিকে চোখ যায় তার। এক দলা রক্ত শুকিয়ে কালো হয়ে আছে ঠোঁটের কোণায়। ওখানেও কেটে গেছে?

অরনী তুলোতে কিছুটা ওষুধ নিয়ে ধীরে ধীরে ইমতিয়াজের দিকে এগিয়ে যায়। কিছুটা ইতস্তত করে তুলোটা চেপে ধরে তার ঠোঁটে। ব্যথায় কঁঁকিয়ে ওঠে ইমতিয়াজ। অরনীও শিউরে ওঠে কিছুটা। তাকে দেখে ইমতিয়াজ কিছু বলেনা, আবারও চোখ বন্ধ করে ফেলে।

অরনী বুঝতে পারে না কি বলবে, সবসময় দুষ্টুমি করা মানুষটা এভাবে শুয়ে থাকবে চুপচাপ, এটা সে মানতে পারছে না। কিন্তু কে বলবে? এই মানুষটাই এতোগুলো গুন্ডাকে মেরে শুইয়ে দিয়েছে? কে বিশ্বাস করবে এই শান্তশিষ্ট মুখটা দেখে যে সে রেগে গেলে অন্য মানুষ হয়ে যায়?

"কিছু বলবেন?"

অরনী ব্যস্ত হয়ে বললো,"না না কিছু বলবো না, আপনি বিশ্রাম করুন।"

"আমার তো মনে হচ্ছে আপনি কিছু বলবেন আমাকে।"

"কি বলবো?"

ইমতিয়াজ শুকনো মুখে হাসির চেষ্টা করে, হাসিটা ঠিক ফোটেনা। যন্ত্রণা করে ওঠে ঠোঁটের পাশে।

"কিছু সিনেমাটিক ডায়লগ দিতেই পারেন। এই যেমন, আজ যদি আপনি না থাকতেন কি যে হতো আমার। মেয়েরা আবার এসব ডায়লগ খুব ভালো দিতে পারে।"

অরনীর আবার রাগ উঠে যায়। এ মানুষ শোধরাবার নয়। সে চেষ্টা করছিলো তাকে ধন্যবাদ জানানোর। কিন্তু কীভাবে? এই অবস্থাতেও কেউ অবলীলায় এমন মজা করতে পারে?

অরনী চাচ্ছে না এখন ঝগড়া বাঁধাতে। এরচেয়ে ঢের ভালো, উঠোনে যেয়ে একা একা বসে থাকা।

অরনী চলে যেতে গেলে হঠাৎ পিছনে টান অনুভব করে। অবাক হয়ে পিছন ঘুরে তাকাতেই দেখে ইমতিয়াজ তার ওড়না টেনে ধরে রেখেছে। অরনী টেনে ওড়নাটা ছাড়িয়ে নেয়।

"কি হয়েছে?"

ইমতিয়াজ অরনীকে পাশে বসতে ইশারা করে। অরনী অনিচ্ছাসত্ত্বেও বসে, কিছুটা দূরত্ব নিয়ে।

আচমকা শরীরটা শিরশির করে ওঠে তার। ইমতিয়াজ তার কোমর বাম হাত দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে তাকে নিজের কাছে টেনে আনে। অরনী বরফের মতো জমে যায়। রাগ কিংবা ভালো লাগার এক মিশ্র অনুভূতি তাকে ঘিরে ধরে। সে বুঝতে পারে না সে রাগ করবে নাকি লজ্জা পাবে? এমন অদ্ভুত আচরণের মানে কি এই লোকটার? যদিও ততক্ষণে হাত সরিয়ে নিয়েছে ইমতিয়াজ।

"সকালে আপনাকে একটা কথা বলেছিলাম মিসেস হাওয়াই মিঠাই। যতোটা অপদার্থ আমাকে ভেবেছেন আমি তা নই। আমার ক্ষমতা হতে পারে সীমিত, তবে সৃষ্টিকর্তা যে দায়িত্ব আমাকে দিয়েছেন সেই দায়িত্ব রক্ষায় আমি সিংহের চেয়ে হিংস্র হতে পারি। স্কুল, কলেজে মাস্তান কিংবা গুন্ডা হিসেবে পরিচয় আমারও ছিলো। একবার এক ইভটিজারকে মেরে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। বাবা জানতে পেরে তার চিকিৎসার সব ভার নিজে নিয়েছিলো আর বাড়ি ফিরে আমাকে ভীষণ মেরেছিলো। সেদিন তাকে কথা দিয়েছিলাম আর মারামারি করবো না। কিন্তু যেখানে প্রশ্ন আমার ঘরনীকে নিয়ে, সেই প্রশ্নে কোনো আপোষ নেই। আজ অনেকদিন পর বাবাকে দেওয়া নেই কথা আমি ভেঙেছি। প্রয়োজনে পরবর্তীতে আমার ভাঙবো। যতোবার আমার প্রিয়তমার চোখে বিপদের আভাস দেখবো, ততবার আমি আমার সেই পুরোনো আমি'কে ফিরিয়ে আনবো। এ আমার ওয়াদা।"

অরনী থতমত মুখে মাথা নিচু করে বসে থাকে। এই প্রথম হৃৎপিণ্ডের কোনো একটা প্রকোষ্ঠে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে তার। এই অনুভূতির মানে সে জানেনা, জানার চেষ্টা করেও লাভ হবে না। অরনী ওভাবেই মাথা নিচু করে বসে ওড়নার কোণা দিয়ে আঙ্গুল পেঁচাতে থাকে। ইমতিয়াজ আবারও চোখের উপর হাতটা ঠেকিয়ে দেয়, বোধহয় গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় সে তার ঘরনীকে নির্ঘুম অবস্থায় রেখে।

(চলবে.....)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন