ফন্ট সাইজ:
থিম:
পরান ছোঁয়ার বাহানা

৮ম পর্ব

লেখক: মিথিলা জামান নিভা

#পরাণ_ছোঁয়ার_বাহানা

পর্ব: ৮

"ভাবী আসবো?"

অরনী বিছানার উপর উলটো হয়ে শুয়ে অঙ্ক করছিলো। তার মোটেই টেবিল চেয়ারে বসে পড়তে ভালো লাগেনা। এই বাজে স্বভাবের জন্য বাবার কাছে বকাও খেয়েছে অসংখ্য বার। এখানে যেহেতু বাবা নেই তাই এখানে সে তার মন মতো যা ইচ্ছা তাই কর‍তে পারে।

ইরার ডাক শুনে অরনী উঠে বসে। আজ ইরা'কে মাত্রাতিরিক্ত সুন্দর লাগছে। মেয়ে হয়েও মাঝে মাঝে নিজেই মুগ্ধ হয়ে যায় অরনীর ইরার সৌন্দর্যে। ভূবনভোলানো সুন্দরী হয়েও মেয়েটার মধ্যে এতোটুকুও অহংকার নেই। উপরন্তু সে অরনীর সাথে এভাবে কথা বলে যেনো অরনী তার মালকিন, অরনীর হুকুমের গোলাম সে। প্রথম প্রথম অরনী ব্যাপারটা উপভোগ করলেও আজকাল মোটেই তার এসব ভালো লাগেনা। তারচেয়ে ইরা যদি মাঝে মাঝে তার পাশে বসে একটু গল্প করে তাহলেই ভালো লাগতো বুঝি। দুই বোন কি সুন্দর তেঁতুলের আচার খেতে খেতে গল্প করে, হাসতে হাসতে একে অন্যের গায়ের উপর ঢলে পড়ে। অরনী দূর থেকে দেখে আর হাসে। এমন দৃশ্য তার জীবনে আসেনি কখনো। অরনী কাছে গেলে ওরা কেমন ভীত চোখে ওর দিকে তাকায়, যেনো এক্ষুনি ধমক দিবে ও ওদের। ওরা চলে যায় সেখান থেকে। অরনী থতমত খেয়ে যায়, ফিরে আসে। চরম মাত্রার ইগোর জন্য কখনো ওদের বলা হয়না, 'এই তোমরা আমার সাথেও একটু গল্প করো না' কিংবা 'আমিও তেঁতুলের আচার খাবো তোমাদের সাথে'। ও বুঝতে পারে ও নিজেই দায়ী সবার থেকে ওর দূরে সরে যাওয়ার পিছনে।

"ইরা কিছু বলবে?"

ইরা জোর করে হাসি দিয়ে বললো,"ভাবী উঠোনে যাবে?"

"উঠোনে কেনো?"

"আজ পূর্ণিমা তো, তাই।"

"কি অদ্ভুত! পূর্ণিমা হলে উঠোনে যেতে হবে কেনো?"

ইরার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে যায় হঠাৎ, অরনীর ভালো লাগে।

"সে এক মজার কাহিনী ভাবী। সেই ছোট্টবেলা থেকে দেখছি জানো তো, পূর্ণিমা এলেই বাবার মন ভালো হয়ে যায়। সারাটা দিন সে খুব খোশমেজাজে থাকে। আর সন্ধ্যার পরেই, শুক্লপক্ষের চাঁদ যখন কিরণ ছড়ানো শুরু করে তখন বাবার অদ্ভুত আনন্দ হয়। সারা উঠোনে উথালপাতাল জ্যোৎস্না। মনে হয় যেনো আকাশে একটা রূপার থালা চকচক করছে। বাবা আমাদের নিয়ে জ্যোৎস্না বিলাশ করেন সেই রাতগুলোতে। অনেক রাত পর্যন্ত আমরা জেগে থাকি। ভাইজান আর বাবা একসাথে বসে থাকে। আমি আর আপাও খুনসুটি করি। মা আমাদের জন্য তেলে ভাজা বানায়। সে এক দারুণ অনুভূতি। আমরা এখনো মুখিয়ে থাকি জ্যোৎস্না রাতের জন্য।"

শুনতে শুনতে অরনী অন্য জগতে চলে যায়। তার ধারণাতেও এসব নেই। জ্যোৎস্না বিলাশ বলে আলাদা কিছু আছে? পরিবারের সবাই মিলে এভাবে একসাথে জ্যোৎস্না দেখাও বুঝি এতোটা মজার? ইরার চোখমুখের সরল ভাষাই বলে দিচ্ছে এই রাতগুলো ওদের কাছে কতোটা উপভোগ্য। কতো সুন্দর, সাবলীল ভাষায় ও সবটুকুর বর্ণনা দিলো, যেনো কোনো কবি কবিতা লিখছে।

অরনী আর কিছু না ভেবেই বই বন্ধ করে উঠে দাঁড়ায়, ইরার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কোনো কারণ ছাড়াই এই মেয়েটিকে ইরা ভালোবেসে ফেলেছে। অত্যন্ত লাজুক গোছের মেয়ে হওয়ায় সে কখনো তার ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারেনা। তবে সে ঠিক করে রেখেছে, তার ভাবী যদি কোনোদিন তাদের ছেড়ে চলে যেতে চায় সে সোজা পা ধরে বসে পড়বে। একটুও লজ্জা করবে না তার। যেতেই দিবে না সে ভাবীকে। তার স্বল্প উপস্থিতিও যেনো তাদের ছোট্ট কুটিরে আলো জ্বেলে দিয়েছে, সে আলো শুক্লপক্ষের জ্যোৎস্নার চেয়ে কম কিছু নয় বৈকি।

★

অরনী উঠোনে এসে কিছুটা চমকে যায়। জ্যোৎস্নাকে এতো সুন্দরভাবে উপলব্ধি করা হয়নি তার কখনো, দেখা হয়নি এভাবে। পুরো উঠোনে যেনো কেউ রূপো গলিয়ে ঢেলে রেখেছে। চকচক করছে যেনো। সবুজ পাতাগুলো সেই আলোয় চিকচিক করছে। একেই বুঝি বলে উথালপাতাল জ্যোৎস্না। অরনী বুক ভরে শ্বাস নেয়। বেশ কিছুদিন যাবৎ বৃষ্টি নেই তবে কামিনী ফোঁটার অন্ত নেই। মাতাল করা সেই ঘ্রাণ অরনীর সমস্ত মন খারাপকে নিমিষেই দূর করে দেয়। পিছনে ফেলে আসা সমস্ত কষ্ট ভুলিয়ে দেয়।

অরনীকে দেখে মুখে হাসি ফোটে সবার, মীরা বাদে। মীরা বেশ অবাক চোখে তাকায় অরনীর দিকে। যদিও কিছুটা সরে বসে সে, যেনো অস্ফুট ভাষায় অরনীকে বসার জায়গা করে দিচ্ছে।

উঠোনের মাঝে মাদুর পেতে বসে আছে মবিনুর, তার গা ঘেষে মীরা আর ইমতিয়াজ। দুই ছেলেমেয়েকে তালপাখা দিয়ে সমানে বাতাস করছে মবিনুর। যেনো ওরা ছোট বাচ্চা। আঁখি বেগম মাত্রই বড় গামলায় করে কিছু একটা এনে রাখে ওদের মাঝে। তেলেভাজার গন্ধে অরনীর খিদে পেয়ে যায়। সে মাঝে মাঝে নিজের উপরই অবাই হয়। সে কবে এতো ঘরোয়া হয়ে যাচ্ছে? তেলেভাজা খাওয়া একদমই বারণ ছিলো তার। ত্বকের ক্ষতি হবে এই ভয়ে তার মা তাকে কখনো খেতে দেয়নি এসব। বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে কখনো কখনো খেয়েছে। তবে এতো লোভ তো কখনো হয়নি তার, আজ যেমন হচ্ছে।

মবিনুর এক হাত বাড়িয়ে অরনীকে কাছে ডাকে। মীরা কিছুটা সরে যাওয়ায় অরনী সেখানে এসে বসে। ইমতিয়াজ বাঁকা চোখে তাকায় একবার অরনীর দিকে। মেয়েটা দিন দিন আরো সুন্দরী হচ্ছে। সত্যিই কি হচ্ছে নাকি তার ভ্রান্ত ধারণা? শ্বেতশুভ্র চুড়িদার কামিজে তাকে একটা অতসী ফুলের মতো লাগছে, সদ্য ফোঁটা অতসী।

"জ্যোৎস্না তোমার কেমন লাগে মা?"

মবিনুরের কথায় অরনী বুঝতে পারেনা কি বলবে। জ্যোৎস্না আবার আলাদা করে কেমন লাগবে? কখনো তো আজকের মতো উপলব্ধি করা হয়নি তার।

অরনীকে চুপ করে থাকতে দেখে আঁখি বেগম গামলাটা প্রথমে তার দিকে বাড়িয়ে দেয়। অরনী কিছুটা ইতস্তত করে।

"আর বলো না মা, এই পাগলদের নিয়ে আমার সংসার। বিয়ের পর থেকেই দেখছি এই মানুষটা শুধু পাগলামি করে পূর্ণিমার রাতগুলোতে। আমাকে জোর করে শাড়ি পরাবে, চুল খুলে দিয়ে কানে ফুল গুঁজে দিবে। তখন আমার কাঁচা বয়স শাড়ি পরতে পারিনা ভালো, আনাড়ি হাতে কোনোরকমে পরতাম। যৌথ পরিবার তখন, দেবর, ভাসুর, ননদসহ গমগমে সংসার। লজ্জায় এতোটুকুন হয়ে যেতাম। গুটিসুটি মেরে বসে থাকতাম এই উঠোনে। সবাই মুখ টিপে হাসাহাসি করতো, জায়েরা তোমার বাবাকে পাগল বলতো। আমার ভারী রাগ হতো। স্বামী যেমনই হোক, বাইরের কেউ সে যদি একান্ত কাছের লোকও হয় স্বামীর বদনাম করলে, তাকে নিয়ে হাসাহাসি করলে স্ত্রীর কষ্ট হয়। আমি বারণ করতে যেয়েও করতে পারতাম না। একটা মানুষ এতো আশা করে থাকে জ্যোৎস্নার জন্য, আমি কীভাবে বারণ করি? প্রথম প্রথম খারাপ লাগলেও পরে আর লাগতো না। আমিও যেনো প্রেমে পড়ে গেলাম এই রাতের। সারাদিন অপেক্ষা করে থাকতাম রাতের। নিজে থেকে শাড়ি পরতাম, চুল বাঁধতাম। এরপর ইমতিয়াজ এলো, সংসার ভেঙে ছোট হলো তবুও আমাদের উৎসাহে ভাটা পড়লো না। একটা সময় আমাদের এই পাগল ছানাটাও আমাদের মতো জ্যোৎস্না পাগল হয়ে গেলো। এরপর মীরা, ইরা এলো। ওরাও তাই। এভাবেই চলছে।"

অরনী অবাক হয়ে আঁখি বেগমের কথা শোনে। কেমন স্বপ্ন স্বপ্ন একটা পরিবার। এতো সুন্দর গুছিয়ে কথা বলে সবাই। ওদের বাড়িতে তো শেষ কবে সবাই একসাথে হেসেছে তাই মনে নেই অরনীর। অথচ এখানে প্রতি পূর্ণিমার রাতেই নাকি সবাই একসাথে জ্যোৎস্না বিলাশ করে, কি অদ্ভুত!

মবিনুর মাথা নিচু করে হাসতে হাসতে বললো,"ওসব কথা থাক আঁখি। মা জননীর যদি ভালো না লাগে ওকে জোর করোনা। তুমি কি ব্যস্ত ছিলে মা?"

অরনী মৃদু গলায় বললো,"না না, ব্যস্ত ছিলাম না।"

মবিনুর কিছু বলার আগে ইমতিয়াজ বললো,"আপনি কি চলে যেতে চান? ভালো না লাগলে যেতে পারেন, আমরা কেউ কিছু মনে করবো না। নিজের মনকে, নিজের মস্তিষ্ককে কষ্ট দিয়ে কিছু করবেন না। সে যে কাজই হোক না কেনো।"

অরনী পূর্ণ দৃষ্টি মেলে ইমতিয়াজের দিকে তাকায়। ইমতিয়াজ কিছুটা ঘাবড়ে যায়, অরনীর এই দৃষ্টির সাথে পরিচিত নয় সে। ইরা মুখ টিপে হাসে ভাইয়ের অবস্থা দেখে।

আঁখি বেগম অরনীর হাত চেপে ধরে।

"থাকো মা, ভালো লাগবে।"

ইমতিয়াজ মাথা নিচু করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

হাসিঠাট্টা আর আড্ডায় পুরোটা সময় চলে যায়। পুরোটা সময় ইমতিয়াজ শুধু তার ঘরনীকেই দেখতে থাকে, তার হাওয়াই মিঠাইকে। মেয়েটা এতো হাসতে পারে? এতো প্রাণবন্ত থাকতে পারে? সে যেনো নিজের খোলস থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে এসেছে আজকে, নিজের পুরোটা সত্ত্বা উন্মুক্ত করে দিয়েছে। তবে কি সব ক্রেডিট ওই চাঁদের? মানুষ হয়ে একটা উপগ্রহকে হিংসা করলে কি ক্ষতি হবে খুব? পরক্ষণেই নিজের ভাবনায় নিজেই লজ্জা পায় ইমতিয়াজ। ইতিউতি তাকায়, ভাগ্যিস মনের কথা কেউ শুনতে পায়না। সে ভারী লজ্জার ব্যাপার হতো!

হঠাৎ ইমতিয়াজের ঈষৎ লাল হওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বোঝার চেষ্টা করে মবিনুর। মুচকি হাসি ফুটে ওঠে মুখে। মনে মনে বলে,'বাপকা বেটা একেবারে। বুক ফেটে যাবে তাও মুখ ফুটবে না।'

"ইমতিয়াজ।"

ইমতিয়াজ থতমত খেয়ে বললো,"একটা গান ধর তো বাপজান।"

"কি বলছো বাবা? ধুর!"

"ধুর কি? আগে কতো সুন্দর গান করতিস তুই। এখন তো ভুলেই গিয়েছিস। অল্প বয়সে মুরুব্বি সাজতে কে বলেছে তোকে?"

"তাহলে কি তোমার মতো শিং ভেঙে বাছুরের দলে ঢুকে যাবো?"

মবিনুর হালকা হেসে ইমতিয়াজের পিঠে হাত দিয়ে বললো,"কিছু কিছু সময় জীবনকে পরিপূর্ণ ভাবে উপভোগ করার জন্য শিং ভেঙে বাছুরের দলে ঢোকার দরকার আছে। নাহলে এক সময় জীবনের অন্তিম ক্ষণে এসে দেখবি বস্তাভর্তি একাডেমিক সার্টিফিকেট ছাড়া তোর অর্জন আর কিছুই নেই।"

ইমতিয়াজ কিছুটা ইতস্তত করে। বাবা সবসময় মজামাস্তি করা মানুষ। হঠাৎ ভারিক্কি কথা বললে মেনে নিতে কষ্ট হয়। আর মবিনুরও বোঝে ছেলেকে কীভাবে কথা শোনাতে হয়। একটু ভারী কথা বললেই হলো।

অরনী মনে মনে হাসে, এই মূর্তিমান লাউটা আবার কি গান করবে? শুধু জ্ঞানের কথা ছাড়া আর কিছু পারে? সে কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় ইমতিয়াজের দিকে। সোজা বুকে আঘাত হানে সেই দৃষ্টি ইমতিয়াজের। কৌতুকপূর্ণ হাসির বিপরীতে সে-ও কিছুটা হাসি ফিরিয়ে দেয়, যার অর্থ 'ম্যাডাম যতোটা অপদার্থ মনে করছেন এই অধমকে ততটা বোধহয় আমি নই, কিছুটা পদার্থ আছে।'

"ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে

সামলে রাখো জোছনাকে

কারো নজর লাগতে পারে

কারো নজর লাগতে পারে

মেঘেদের উড়ো চিঠি

উড়েও তো আসতে পারে

ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে

ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে

ঝলমল করিও না গো

তোমার ঐ অতো আলো

ঝলমল করিও না গো

তোমার ঐ অতো আলো

বেশী রূপ হলে পরে

সাবধানে থাকাই ভালো

মুখের ঐ উড়নিটাকে একটু রাখো

খুলোনাকো দোহাই... একেবারে.

ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে

ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে

এই সবে রাত হয়েছে

এখনি অমন হলে

মাঝরাতে আকাশটাতে

যাবে যে আগুন জ্বলে

এই সবে রাত হয়েছে

এখনি অমন হলে

মাঝরাতে আকাশটাতে

যাবে যে আগুন জ্বলে

সেই ফাঁকে তুমিও কখন চুরি যাবে

কাকে পাবে বাঁচাতে তোমারে

ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে

ও ও ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে"

==================================

ইমতিয়াজ থামে, সুরের মূর্ছনায় গমগম করতে থাকে উঠোন। অরনী হতবাক চোখে তাকিয়ে আছে, যদিও ইমতিয়াজের দৃষ্টি আকাশ পানে, রূপোর থালার মতো চকচক করতে থাকা বিধুর দিকে। আঁখি বেগম চোখ থেকে ছিটকে আসা দু'ফোঁটা পানি মুছে সন্তোর্পনে, উঠে চলে যায় সেখান থেকে। মীরা বারান্দায় হেলান দিয়ে শূন্যের দিকে তাকিয়ে থাকে। বুকটা ভার হয়ে আসে তার, কাঁদতেও ভুলে গেছে সে। যে কষ্ট তার বুকে চাপা, কেঁদে চন্দ্রদীঘি ভরে গেলেও সেই কষ্ট বিগলিত হবে না।

মবিনুর ইমতিয়াজের পিঠে হাত রেখে হাসে, ইমতিয়াজও হাসি ফিরিয়ে দেয়। অরনীর বুকে কেমন কষ্ট হতে থাকে, চাপা কষ্ট। যে কষ্টের উৎস সে জানেনা। জানা দরকার কি আসলে? তা-ও সে জানেনা। শুধু জানে এই কষ্ট কমানো দরকার, নাহলে মন, মস্তিষ্ক অশান্ত হয়ে থাকবে। শান্তি দিবে না ছিটেফোঁটাও।

★

মহাসমারোহে রান্নাঘরে রান্নার আয়োজন চলছে। রাধুনী স্বয়ং অরনী, তাকে সাহায্য করছে ইরাবতী। রান্নাঘরের দরজায় পাংশুমুখে দাঁড়িয়ে আছে আঁখি বেগম আর মীরা। যে মেয়ে চুলাই জ্বালাতে পারেনা ঠিক মতো, সে কীভাবে রান্না করবে? ইমতিয়াজ খুব সকালে বেরিয়েছে আজ, কোনো একটা কাজে। এসে খেয়েই রওনা দিবে আবার স্কুলে। খেয়ে যেতে না পারলে তার সারাদিন মেজাজ খারাপ থাকে। এদিকে অরনী রান্নাঘর দখল করে আছে। আঁখি বেগম ভেবে পায়না কি করবে। এতো আগ্রহ নিয়ে মেয়েটা রান্না করছে তাকে মানা করতেও পারছে না। আদৌ কি রান্নাবান্না কিছু জানে সে? যদিও ইরা আছে আছে তাকে সাহায্য করার জন্য। কিন্তু অরনী কারো সাহায্য নিবে না।

মীরা বিরক্ত হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,"মা এগুলো কি হচ্ছে?"

"দেখতেই তো পাচ্ছিস কি হচ্ছে।"

"ওকে বের করো রান্নাঘর থেকে। কয়টা বাজে খেয়াল আছে? ভাইজান এসে খাবার না পেলে কিন্তু রাগ করবে।"

আঁখি বেগম কাচুমাচু মুখে বললো,"মেয়েটা কতো আগ্রহ নিয়ে রান্না করছে। এখানে আসার পর থেকে তো মেয়েটাকে এতোটা আনন্দ করতে দেখিনি। কীভাবে ওকে বের করবো?"

মীরা হতাশ হয়। এই অসহ্য রকম ভালো মানুষ দুইজনের ঘরে জন্ম নেওয়ায় মাঝে মাঝে নিজের উপর নিজেরই রাগ হয়। এতোটা ভালো কেনো হতে হবে তাদের? আশ্চর্য!

রাগে ধুপধাপ পা ফেলে ঘরে চলে যায় সে। আঁখি বেগম ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। মেয়েটা আবার হাত পুড়িয়ে না ফেলে। মা হওয়ার অনেক জ্বালা, সব দিকে খেয়াল রাখতে হয়।

★

ইমতিয়াজের ভীষণ খিদে পেয়েছে আজ। মবিনুরও বসেছে খেতে। সবাই খেয়ে বেরোবে যে যার কাজে। মবিনুর জানলেও ইমতিয়াজ জানেনা আজকের রাধুনী কে!

"মা এটা কি খাবার? দেখতে কেমন অদ্ভুত।"

অরনী ভ্রু কুঁচকে তাকায়, কিছু বলেনা।

মবিনুর এক গাল হেসে বললো,"সারাজীবন কূয়োর ব্যাঙ হয়েই রয়ে গেলি বল? সবসময় ওই একঘেয়ে রুটি আর ভাজি খেতে খেতে অন্য কিছু চিন্তাই করতে পারিস না।"

"তাহলে তুমি বলো বাবা এটা কি?"

"এটা বিদেশী খাবার। কথা না বলে চুপচাপ খেয়ে ওঠ বাপধন।"

ইমতিয়াজ অবাক হয়ে বললো,"বিদেশী খাবার? কোন দেশী?"

মবিনুর চোখমুখ কুঁচকে বললো,"তোদের একটাই সমস্যা, মায়ের মতো বেশি কথা বলিস। খেয়েই দেখ না, নিশ্চয়ই সুস্বাদু কিছুই হবে।"

আঁখি বেগম অগ্নিদৃষ্টি ফেলে স্বামীর দিকে, মুখে কিছু বলেনা।

ইমতিয়াজ বিরক্ত হয়ে চামচে করে কিছুটা মুখে দেয়, অরনী বেশ উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে থাকে ইমতিয়াজের দিকে। সে নিশ্চিত খেতে ভীষণ ভালো হয়েছে। যদিও ইমতিয়াজকে খুশি করার কোনো ইচ্ছা তার নেই। তবুও সে জানুক, অরনীকে যতোটা ইউজলেস সে মনে করে অরনী তা নয়।

মুখে নিতেই ইমতিয়াজের মুখ লাল হয়ে যায়, ব্যতিক্রম নয় মবিনুরও। যদিও মবিনুর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। একই সাথে সে হতাশ এবং অনুভূতি শূন্য।

"মা এসব কি রেঁদেছো? গুয়ের মতো স্বাদ।"

অরনীর রাগে চোখে পানি এসে যায়।

"ওমা! আপনি গু-ও টেস্ট করে দেখেছেন বুঝি?"

ইমতিয়াজ এক গ্লাস পানি ঢকঢক করে খাচ্ছিলো, অরনীর কথায় তার বিষম লাগে। আঁখি বেগম ছেলের মাথায় তালু ঘষতে থাকে।

"ভাইজান আজকের রান্না মা বা আমি নই, তোমার বউ করেছে।"

মীরার কথায় অত্যাশ্চর্য হয় ইমতিয়াজ। রান্না? অরনী? এ-ও বুঝি সম্ভব?

ততক্ষণে রাগে কাঁপতে কাঁপতে অরনী ঘরে ছুটে গেছে। মবিনুর রাগী গলায় বললো,"মেয়েটা কষ্ট করে সবার জন্য রান্না করেছে। যেমনই হোক, সে চেষ্টা তো করেছে। তুই তো এতোটুকুও পারবি না। দিলি তো মেয়েটার মনটা খারাপ করিয়ে?"

ইমতিয়াজ হতভম্ব হয়ে বললো,"আমি কীভাবে জানবো এই নমুনা উনার সৃষ্টি?"

"এখন যা, ওর মন ভালো কর।"

"আমি কেনো?"

"তো কে? পাশের বাড়ির কালু ড্রাইভার এসে তোর বউয়ের মন ভালো করবে? কি এক মানুষরূপী গরু জন্ম দিয়েছো আঁখি।"

আঁখি বেগম মুখ কালো করে বললো,"হ্যা ভালো কিছু হলে উনার ছেলে আর খারাপ হলে আমার।"

কথা শেষ করে অন্ধকার মুখে নিজের ঘরে চলে যায় আঁখি।

মবিনুর দাঁতে দাঁত চেপে বললো,"মহিলা মানুষ দুনিয়ার ভেজাইল্লা। আমি যাই আমার বউয়ের রাগ ভাঙাতে। তুইও যা বাপ নিজেরটা নিজে বুঝে নে। জি লিয়ে আপকি জিন্দেগী।"

মবিনুর চলে যায়, ইমতিয়াজ হতাশ মুখে বোনদের দিকে তাকায়। তারাও পড়িমরি করে দৌড়ায়। ইমতিয়াজ নিজের চুল চেপে বসে পড়ে। কারা বিয়ে করে ভাই? কারা? আর জীবনেও বিয়ে করবে না সে। একটা করেই সে ত্যক্ত এবং বিরক্ত।

★

হাতে একটা বাটি নিয়ে ইমতিয়াজ ঘরে ঢোকে। অরনী উলটো দিক ফিরে ঘাড় গুঁজে আধশোয়া হয়ে আছে বিছানায়। ইমতিয়াজ ঈষৎ হেসে তার পাশে যেয়ে বসে। তার উপস্থিতি টের পেতেই অরনী উঠে বসে। চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই ইমতিয়াজ তার হাত চেপে ধরে।

"ছাড়ুন।"

"বসুন এখানে।"

"আমাকে তৈরি হতে হবে, কলেজে যাবো।"

"আমি নিয়ে যাবো, বসুন আগে।"

অরনী হাত মোচড়ামুচড়ি করেও লাভ হয়না। ইমতিয়াজ তাকে জোর করে কাছে বসায়। অরনীর সামনেই ইমতিয়াজ প্রায় পুরো বাটি খাবার শেষ করে। পুরোটা সময় অরনী ইমতিয়াজের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কোনোভাবে কি তার মুখের শিরাগুলো পরিবর্তিত হচ্ছে? রেখাগুলো জানাচ্ছে এই খাবার বিস্বাদ? না, বরং তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে খুব মজার কোনো খাবার খাচ্ছে। অরনী আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়। তাহলে তার রান্না খারাপ হয়নি খুব একটা। লোভ লেগে যায় তার নিজেরও।

বাটিতে সামান্য খাবার অবশিষ্ট থাকা অবস্থায় সে কেড়ে নেয় বাটিটা। ইমতিয়াজ কিছু বুঝে ওঠার আগেই অরনী সেখান থেকেই কিছুটা মুখে দেয়। সাথে সাথে তার চেহারা পালটে যায়। প্রচন্ড ঝালে জিহ্বা পুড়ে যাচ্ছে। বাটিটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে চিৎকার করে ওঠে সে। ইমতিয়াজ যেনো তৈরি-ই ছিলো। পানি এগিয়ে দেয় তার দিকে। এক বোতল পানি শেষ করে ফেলে অরনী। তবুও যেনো তার পুরো মুখ জ্বলতে থাকে। এতোটা বাজে রান্না করলো সে? তারচেয়েও বড় কথা তার সামনে বসে এই মানুষটা পুরোটা কীভাবে শেষ করলো? এই প্রথমবারের মতো অরনীর অপরাধবোধ হয়, লজ্জা লাগে ভীষণ।

"ঠিক আছেন এখন?"

অরনী মাথা নিচু করে থাকে।

"মাথা নিচু করে রাখার মতো কিছু হয়নি। অন্তত আপনি চেষ্টা করেছেন, আমি হলে এটুকুও পারতাম না।"

"একটা কথা জিজ্ঞেস করি?"

ইমতিয়াজ দুই হাত বুকে বেঁধে বললো,"করুন।"

"এই রান্না আমি বাদে আর কেউ করলে আপনি খেতেন?"

"সত্যটা শুনবেন?"

"হ্যা।"

"না খেতাম না।"

"তবে এখন খেলেন কেনো?"

ইমতিয়াজ শান্ত গলায় বললো,"শুনুন মিসেস হাওয়াই মিঠাই, সংসার জীবনটা আপনি যতোটা সহজ মনে করেন ততটা নয়। আবার কঠিনও নয়। এটাকে আপনি একটা এক্সপেরিমেন্ট বলতে পারেন। যে যতোটা ধৈর্য্য ধরতে পারে সে ততটাই সফল এখানে। স্ত্রী হলো যৌবন এবং বার্ধক্যের সঙ্গী। তাকে খুশি রাখতে পারাটা পুরুষ মানুষের একটি দায়িত্ব। কাপুরুষেরা এই দায়িত্ব পালন করেনা। আর আমি নিজেকে কখনোই একজন কাপুরুষের কাতারে ফেলতে চাইনা। আর হ্যা, আপনি মানুন বা না মানুন আপনি আমার স্ত্রী। যতদিন আপনি আমার কাছে থাকবেন আপনি নিশ্চিত থাকুন, আমি আমার এই দায়িত্বটুকু পালন করে যাবো, হাসিমুখেই করে যাবো।"

অরনীর শরীর কেমন শিরশির করে ওঠে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এই মুহুর্তে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকাতে পারবে না সে। কেনো পারবে না সেই উত্তর জানা নেই তার। ইদানীং অনেক প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছে না সে। এই উত্তরগুলো না পাওয়া পর্যন্ত শান্তি হচ্ছে না তার।

"আমি বাইরে অপেক্ষা করছি, আপনি তৈরি হয়ে নিন। আপনাকে বাইরে খাওয়াবো আজ। আমাদের এখানে একটা হোটেল আছে, দারুণ পরোটা বানায়। গরম ভাজি আর দুধচায়ের সাথে জমে যায়। চলবে নাকি?"

অরনী কি মনে করে ফিক করে হেসে দেয়। ইমতিয়াজ কিছুক্ষণ সেদিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকে বেরিয়ে যায়। সে বেরিয়ে যাওয়ার পরেও একা একাই অরনী হাসতে থাকে। ভালো কথা, হাওয়াই মিঠাই নামটা আজ খারাপ লাগছে না তার। বেশ ভালোই লাগছে নামটা, বেশ ভালো......

(চলবে......)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন