ফন্ট সাইজ:
থিম:
পরান ছোঁয়ার বাহানা

১৫তম পর্ব

লেখক: মিথিলা জামান নিভা

#পরাণ_ছোঁয়ার_বাহানা

পর্ব: ১৫

কলেজ থেকে ফিরে নিজের ঘরেই চুপচাপ বসে ছিলো অরনী। বাইরে ইলোরা, মীরা, ইরা সবাই মুড়িমাখা খাচ্ছিলো আর হাসাহাসি করছিলো। ওকে দেখেই মীরা মাথা নিচু করে নেয়। ইরা আর ইলোরা অনেকবার ওকে অনুরোধ করে ওদের সাথে বসে আড্ডা দেওয়ার জন্য। কিন্তু অরনীর ইচ্ছা থাকলেও মাথাব্যথার অযুহাত দিয়ে সেখান থেকে চলে যায়। প্রথমত ইলোরাকে সে সহ্য করতে পারছে না, একদমই না। কেনো পারছে না তার কারণ অজানা। কিন্তু এতো সুন্দর মেয়েটাকে কেনো যেনো অসম্ভব বিরক্ত লাগছে তার।

দ্বিতীয়ত মীরাকে দেখলেই ওর ব্যবহারের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। ইমতিয়াজকে সে এ কথা জানায়নি। কেনো জানাবে? ইমতিয়াজ কি তার নিজের মানুষ? যে সে কষ্ট পেলেই তাকে জানাতে হবে?

"আসবো?"

অরনী কিছুটা চমকে দরজার দিকে তাকায়। কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মীরা। অন্যদিনের কাঠিন্য নেই তার চোখেমুখে। বিরক্তভাবটাও নেই। যার বদলে মুখে একরাশ অপরাধবোধের ছায়া। মুখটা আষাঢ়ের মতো অন্ধকার হয়ে আছে।

অরনী উত্তর দেয়না। সে ভেবেছিলো উত্তর না দিলেও মীরা ঢুকে যাবে ঘরে। কিন্তু না, সে ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে। অরনীর অনুমতি না পেলে সে ঢুকবেই না ঘরে।

অরনী একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে বললো,"এসো।"

অরনী জানালার দিকে ঘুরে তাকায়। মেয়েটার মতিগতি বুঝতে পারছে না সে। অরনী এ বাড়িতে আসার পর থেকে শুধু হম্বিতম্বি দেখে আসছে মীরার। সবসময় কারো না কারো উপর রেগে থাকে, শুধু ইরার সাথে তার সম্পর্ক কিছুটা সহজ।

"আমি কি তোমার পাশে একটু বসতে পারি?"

অরনী ঝট করে মাথা ঘুরিয়ে মীরার দিকে তাকায়। মীরাকে আজ অপরিচিত লাগছে। যেনো মীরার রূপে ইরা!

অরনী এতোক্ষণে বুঝতে পেরেছে অরনীর অনুমতি ছাড়া মীরা বসবেও না। বাধ্য হয়ে সে বললো,"বসো।"

মীরা বসে। বসার ভঙ্গিতে জড়তা নেই কিন্তু শান্ত দীঘির মতো চুপচাপ হয়ে আছে সে।

অরনী কথা বলে না, সে বুঝতে পারছে মীরা হয়তো তাকে কিছু বলতে এসেছে। যেটা সে অনুমতি ছাড়াই বলবে।

"তোমাকে একটা কথা বলতে এসেছিলাম।"

"বলো।"

মীরা কিছুক্ষণ থেমে বললো,"আমি আসলে ভণিতা করতে পারিনা। যা বলার সরাসরি বলি। তোমার সাথে আমি গতদিন খুব খারাপ আচরণ করেছি। যা আমার একদম উচিত হয়নি। আমি তার জন্য তোমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। শুধু ওই ঘটনার জন্যই নয়, তুমি এ বাড়িতে আসার পর থেকেই আমি তোমার সাথে সহজ, স্বাভাবিক আচরণ করিনি। সবকিছুর জন্যই ক্ষমা চাচ্ছি। তুমি আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় ভাইজানের স্ত্রী। তোমাকে কষ্ট দেওয়া মানে আমার ভাইজানকেই কষ্ট দেওয়া। আমি তাকে কখনো কষ্ট দিতে চাইনা। পরবর্তীতে এমনটা আর হবে না।"

অরনী মোটামুটি হতভম্ব। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে মীরার দিকে। মীরা ঠিকই বলেছে, সে ভণিতা জানেনা। ক্ষমা চাওয়ায় সে যে ছোট হয়ে যায়নি বা অপমানিতও হয়নি তা বোঝা যাচ্ছে তার দৃষ্টিতে। বরং তাকে অনেকটা ভারমুক্ত মনে হচ্ছে এখন। যেনো সে অপেক্ষাতেই ছিলো এই মুহুর্তটার।

"তুমি কি আমাকে ক্ষমা করেছো?"

অরনী ধাতস্থ হয়ে ছোট্ট করে বললো,"করেছি।"

মীরা মৃদু হাসে। অসম্ভব সুন্দর হাসি তার, ইরার চেয়েও সুন্দর। অরনীর মেয়েটার উপর সীমাহীন রাগ থাকলেও এখন অদ্ভুত কোনো এক কারণে রাগ করতে পারছে না।

"এবার আসি আমি?"

এবার আর অরনীর অনুমতি নিতে হয়না তার। তড়িৎগতিতে উঠে দরজা পর্যন্ত চলে যায়।

অরনীও উঠে দাঁড়ায় সাথে সাথেই।

"এইযে শোনো।"

মীরা দাঁড়িয়ে যায়, উল্টোদিক ঘুরেই দাঁড়িয়ে থাকে।

"দরজাটা বন্ধ করে এদিকে এসো তো।"

মীরা বেশ অবাক হয়ে অরনীর দিকে ঘুরে তাকায়। অরনীর তীক্ষ্ণ চোখে মীরার দিকে তাকিয়ে।

মীরা কিছুক্ষণ কি যেনো ভেবে দরজাটা বন্ধ করে অরনীর দিকে এগিয়ে আসে। অরনী আলমারি খুলে একটা প্যাকেট বের করে মীরার দিকে বাড়িয়ে দেয়। মীরা জিজ্ঞাসু চোখে তাকায় তার দিকে।

"এটা ধরো।"

"এটা কি?"

"আমি এ বাড়িতে আসার সময় আমার বাবা তোমাদের সবার জন্য উপহার পাঠিয়েছিলো। কিন্তু প্রথম দিনেই তোমার ব্যবহার আমার ভালো লাগেনি। তাই সবাইকে দিলেও তোমারটা দিইনি। আর হ্যা, আমিও তোমার মতো ভণিতা জানিনা। যা হয়েছে তাই বলেছি।"

অরনীকে অবাক করে দিয়ে মীরা হেসে দেয়। জোর করে হাসি না, নির্মল সুন্দর হাসি। অরনী থতমত খেয়ে যায়, হাসির কিছু বলেছে কি সে?

মীরা খুব সহজভাবেই প্যাকেটটা নেয়। আপনমনে ওটা খোলে। একটা লাল-ঘিয়ে রঙা চুড়িদার দেখে মনটা ভালো হয়ে যায় তার। ভীষণ সুন্দর তো! আর এই রঙটাও যে তার খুব প্রিয়।

"বাহ!"

তার মুখাবয়ব অবলকন করছিলো অরনী সরু চোখে। বোঝাই যাচ্ছে খুব পছন্দ হয়েছে তার এটা।

"তোমার পছন্দ হয়েছে?"

মীরা গাঢ় গলায় বললো,"খুব।"

অরনীর হঠাৎ কষ্ট হয়। মেয়েগুলো কতো অল্পে খুশি হয়। অথচ তার বিয়ের আগে সে কতশত কেনাকাটা করতো, কখনো এতো খুশি হতো না সে।

"আমি এটা পরবো। খুব ভালো লেগেছে আমার। অনেক ধন্যবাদ তোমাকে।"

অরনী মুচকি হেসে বললো,"আমাকে নয়, ধন্যবাদটা আমার বাবাকে দিও। উনিই কিনেছেন।"

"কিন্তু আমার হাতে দিয়েছো তো তুমি। আপাতত ধন্যবাদটা তোমারই।"

অরনী চমৎকৃত হয়। এ বাড়ির ছেলেমেয়ে গুলো দারুণ গুছিয়ে কথা বলে। গুণটা তাদের মায়ের কাছ থেকে পেয়েছে। আঁখি বেগমের পড়াশোনা বেশি না হলেও বেশ গুছিয়ে কথা বলার গুণ আছে তার।

"তুমি বোধহয় আমাকে আরো কিছু বলতে এসেছিলে।"

মীরা কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও নিজেকে সামলে নেয় সাথে সাথে। নতুন ওড়নার উপর হাত বুলাতে বুলাতে বললো,"তুমি কীভাবে বুঝলে?"

অরনী ম্লান হেসে বললো,"আমি খুব বুদ্ধিমতী। মেধাবী না হতে পারি, পড়াশোনায় ভালো নই। তবে তার মানে আমাকে বোকা ভাবারও কারণ নেই।"

"তোমাকে বোকা ভাবিনি কখনোই।"

"তাহলে বলো কি বলতে এসেছিলে।"

মীরা শান্তভাবেই হেঁটে যেয়ে জানালার সামনে দাঁড়ায়। কি আশ্চর্য! এটা কি কামিনী ফুলের সময়? এতো ফুল ফুটেছে কেনো গাছটায়? সুগন্ধে ম ম করছে সে চারপাশটা। মীরা বুক ভরে শ্বাস নেয়, লম্বা শ্বাস।

★

জানালা দিয়ে ফুরফুর করে বাতাস ঢুকছে ঘরে, শীতল বাতাস। সেই সাথে কামিনীর মিষ্টি গন্ধ৷ সন্ধ্যা নেমেছে অনেক আগেই। অরনী টেবিলে বইখাতা নিয়ে বসেছে। কিন্তু আধা ঘন্টা বসে থাকার পরেও একটা শব্দও লিখতে পারেনি এখনো খাতায়। অবিরত পানি পড়ছে তার দুই চোখ বেয়ে। খাতা ভিজে যাচ্ছে কিন্তু কোনোদিকে হুঁশ নেই অরনীর। শুধু কেঁদেই যাচ্ছে। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে রেখেছে যেনো কেউ আসতে না পারে, কেউ তার কান্না দেখুক সে চায়না। এমন অনিয়ন্ত্রিত কান্না আগে কখনো আসেনি তার, কখনোই না।

মেয়েটা এতোটা কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছে? ভালোবাসাই কি তবে ভুল? না না সব ভালোবাসা ভুল না, ভুল মানুষকে ভালোবাসা ভুল।

ভালোবেসে রাতের অন্ধকারে যার সাথে পালিয়ে গেলো সেই অসভ্য ছেলেটাই কিনা ওকে বিক্রি করে দিলো কিছু নরপশুর কাছে? আর সারারাত ভর ওরা....

অরনী আবার কেঁপে উঠলো। ফুঁপিয়ে ওঠে নিজের অজান্তেই। অথচ এই মেয়েটাকে সে কতো ভুল ভেবেছিলো। অহংকারী, বদমেজাজি আরো কতো কি! এতোটা নারকীয় যন্ত্রণা সহ্য করেও যে মেয়েটা বেঁচে আছে এটাই কি যথেষ্ট না?

কি হতো মেয়েটার? যদি ভোরের কিছু আগে অরনীর বাবা ব্যবসার কাজ সেরে বাড়ি ফেরার পথে মাঝরাস্তায় দাঁড়ানো মাইক্রোবাসটার অস্বাভাবিকতা না দেখতো? সাথে সাথে পুলিশ ডেকে মীরাকে উদ্ধার না করতো? মীরা কি আদৌ বেঁচে থাকতো? বাঁচতে দিলো জানোয়ারগুলো ওকে? শিউরে ওঠে অরনী, আর কিছু ভাবতে পারেনা।

আবিদ সাহেবই মীরাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। অনেক কষ্টে মীরার পরিবারকে খুঁজে পায়, ইমতিয়াজকে খুঁজে পায়। আর সেই হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়েই ইমতিয়াজ চিৎকার করে কাঁদছিলো, আবিদ সাহেব তাকে স্বান্তনা দিচ্ছিলো। সেদিন ইমতিয়াজ আবিদের হাত ধরে কথা দিয়েছিলো, কোনোদিন যদি সুযোগ হয় আবিদের জন্য প্রাণটাও দিয়ে দিবে সে। আবিদ শুধু ছোট্ট করে হেসেছিলো সেদিন, কিচ্ছু বলেনি।

তবে আবিদের সাথে ইমতিয়াজ বাদে এ বাড়ির আর কারো দেখা হয়নি সেদিন। তারা এখনো জানেনা কে তাদের মেয়েকে বাঁচিয়েছিলো। সেদিনের সব কথা শুধু আবিদ আর ইমতিয়াজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

অরনী সোজা হয়ে বসে চেয়ারে। সে যে ইমতিয়াজের উপর আসলেই বোঝা। ইমতিয়াজ তাকে চায়নি, কখনোই চায়নি। শুধু তার কথা রাখার জন্য অরনীকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছে। এমন একটা জীবন ইমতিয়াজ তো চায়নি, না চেয়েছে এ বাড়ির লোক। একমাত্র ছেলের বউ তাদের, কতো প্রত্যাশাই না ছিলো। ইমতিয়াজ নিশ্চয়ই চেয়েছিলো একটা সুন্দর সংসার, স্ত্রী রূপী প্রেমিকা।

তার বাবা এভাবে সুযোগ নিলো? সে-ও যে এই পরিবারটাকে, ইমতিয়াজকে কষ্ট দিতে চায়না। সে ফেইল করার আগেই বাবা তাহলে সব ঠিক করেই রেখেছিলো? ফেইল শুধুমাত্র একটা বাহানা। অরনী হাতের কলম জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। বাবার বোঝা তো ছিলোই, সেই সাথে এখন ইমতিয়াজের উপরও একটা বোঝা। এতোটা বিশ্রী কেনো তার জীবনটা? কি অসহ্য!

★

বারান্দায় বসেই ইলোরাকে পড়াচ্ছে ইমতিয়াজ। কিছুক্ষণ আগেই ফিরেছে সে। কোনোরকমে অল্পকিছু খেয়েই বসে পড়েছে। মেয়েটার শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার আর বেশিদিন নেই। ইমতিয়াজ একদম সময় পায়না ওকে পড়ানোর। নিজের স্কুলের ক্লাস, টিউশন তারপর তো অন্য এক ব্যস্ততা...

নিজের ঘরে টেবিলে বসেই তাদের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত ঘষছে অরনী। রাগ করার কোনো কারণ নেই। তাদের মধ্যে প্রেমালাপও হচ্ছে না, অহেতুক হাসাহাসিও হচ্ছে না। তবুও অরনীর সহ্য হচ্ছে না। এই মেয়েটার সাধারণ স্বাভাবিক দৃষ্টিও কেমন কামাতুর লাগছে তার। অরনী দুই বার মুখ বাঁকায়।

বিদ্যুৎ নেই অনেকক্ষণ। মোমবাতির আলোয় পড়াশোনা চলছে। প্রচন্ড গরমে ঘামছে ইমতিয়াজ, ইলোরা এক হাত দিয়ে পাখা দিয়ে তাকে বাতাস করছে আর অঙ্ক বুঝছে। এই দৃশ্যটাই বিরক্তিকর লাগছে অরনীর। আবার বাতাস করার কি আছে?

আচমকাই চিৎকার করে ওঠে অরনী।

"এইযে শুনুন।"

ভীষণভাবে অবাক হয়ে ইমতিয়াজ আর ইলোরা তাকায় অরনীর দিকে। ইমতিয়াজের চোখ বড় বড় হয়ে যায়।

"আমাকে বলছেন?"

"হ্যা, এদিকে আসুন।"

"কিন্তু ইলুকে অঙ্কটা করাচ্ছি যে। একটু পর আসি?"

অরনীর তপ্ত শ্বাস ফেলতে থাকে জোরে জোরে। ইশ! আবার ঢং করে ইলু বলা হচ্ছে। ইলু কি হ্যা? ইলু কি? ইলোরা বলতে কি সমস্যা? এমন কি বড় নাম? তার নাম কি ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি?

ইলোরা মুখ টিপে বললো,"যান ইমতিয়াজ ভাই, নাহলে আবার দেখা গেলো রাতে ঘরে জায়গা হলো না। এই প্রচন্ড গরমে খালার ওই কাঠের ঘরে থাকতে পারবেন তো?"

"কি অদ্ভুত! ঘরে জায়গা হবে না কেনো?"

"ওসব বোঝার মতো ঘিলু আপনার মাথায় নেই। কোনো পুরুষের মাথাতেই নেই।"

"হ্যা তোদের মাথায় তো অনেক ঘিলু। ধুর কি বলি! তোদের মাথায় না, হাঁটুতে থাকে ঘিলু।"

ইলোরা হাই তুলে বই বন্ধ করে দেয়। চুলে খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে বললো,"এমনিতেও আজ আর পড়বো না। অনেক পড়েছি, আজ আমার ছুটি।"

ইমতিয়াজ বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায়। ইলোরা ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে দেয়। দেয়ালে হেলান দিয়ে গুণগুণ করে গান করে ওঠে,"ভেঙে মোর ঘরের চাবি, নিয়ে যাবি কে আমারে? ও বন্ধু আমার..."

ইমতিয়াজ ঘরে ঢুকতেই অরনীর চোখের দিকে তাকায়। অরনী সাথে সাথে দৃষ্টি নামিয়ে নেয়। এই লোকটার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে তার রাগের পারদ তরতর করে নেমে যাবে।

"কি হয়েছে ম্যাডাম, বলুন।"

অরনী শান্ত গলায় বললো,"আমিও অঙ্ক বুঝিনা, কই আমাকে তো বুঝান না এভাবে।"

ইমতিয়াজ নিঃশব্দে হেসে চেয়ার টেনে বসে অরনীর সামনে।

"এজন্য কি রাগ হয়েছে?"

"মোটেই না, এটা বুঝতে পারছি না। করিয়ে দিন। এরপর আবার আপনার ইলুর হাতপাখার বাতাস খেতে যান, কিচ্ছু বলবো না।"

ইমতিয়াজ মাথা নিচু করে হাসে, অরনী কঠিন চোখে তাকায় তার দিকে।

"হাসছেন কেনো? হাসি বন্ধ।"

"ঠিক আছে বন্ধ। তবে এই অঙ্কটা আমি গতকালই আপনাকে করে দিয়েছি। এইযে দেখুন, এখানে করাই আছে।"

অরনী ঢোক চাপে। বিশ্রীভাবে ধরা পড়ে যাওয়ায় নিজের উপর নিজেরই রাগ উঠছে। ইশ! বাড়াবাড়ি হয়ে গেলো। এখন এই লোকটা ভাববে ইলোরার কাছ থেকে সরিয়ে আনতে অরনী ভান করছে।

ভাবাভাবির কি আছে? এটা তো আসলেই ঠিক। ধুর!

"যে পুরোটাই আপনার, তাকে ডেকে আনার জন্য আপনার আবার বাহানা লাগে নাকি?"

অরনী ভয়াবহ ভাবে থমকে যায়।

"আপনি যা ভাবছেন তা নয় মোটেই। আর তাছাড়া..."

ইমতিয়াজ আচমকাই তার হাতটা আলতো করে চেপে ধরে। অরনী চমকে ওঠে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও হাত সরিয়ে আনার চেষ্টা করে। তবে ইমতিয়াজ শক্ত করে চেপে ধরে হাতটা আরো।

"আচ্ছা অরনী, আমি যদি অনেকদূর চলে যাই?"

"মানে? কতো দূর? কোথায় যাবেন আপনি?"

"অনেকটাই, যেখান থেকে চাইলেই আপনি এভাবে যখন তখন ডেকে আনতে পারবেন না।"

অরনীর হাত ঠান্ডা হয়ে আসে। মুখে স্বাভাবিকতা ধরে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে।

ইমতিয়াজ হঠাৎই হাতটা ছেড়ে দেয়।

"আরে! আমি আবার কি ভাবছি। আপনি তো এমনিতেও আর কিছুদিন পর এখান থেকে চলে যাবেন।"

অরনী ক্ষীণ গলায় বললো,"কিন্তু আপনি কোথায় যাবেন?"

ইমতিয়াজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কিছু বলেনা।

"হ্যা সে-ই তো, আমাকে কেনো বলবেন। আমি তো আপনার কাঁধে বোঝা। নেহাত বাবাকে কথা দিয়ে ফেলেছিলেন, তাই তো তার কাঁধের বোঝাকে নিজের কাঁধে উঠাতে হলো।"

ইমতিয়াজ থতমত খেয়ে যায় সহসাই।

অরনী জোরেসোরে একটা ফুঁ দিয়ে নিজের টেবিলের মোমবাতি বন্ধ করে দেয়। প্রচন্ড গরমের মধ্যেও কাঁথা দিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে শুয়ে পড়ে। ভেবেছিলো আবারও আয়োজন করে কাঁদবে সে, কারণ আজ সে কান্না বিলাশ পালন করবে।

কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও একটুও কাঁদতে পারেনা। পাথরের মূর্তির মতো শুয়ে থাকে। মনটা খচখচ করতে থাকে অজানা আশঙ্কায়। ইমতিয়াজ কোথায় যাবে? কতোদূর? 'আমার কি? আমি তো এমনিও চলে যাবো এখান থেকে।' শত চেষ্টা করেও এই চিন্তাটা মস্তিষ্কে ঠাঁই দিতে পারছে না।

এদিকে তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থম মেরে বসে আছে ইমতিয়াজ। এই কথা অরনী কীভাবে জানলো? তাকে কে জানিয়েছে? এখন এটা তাকে কে জানাবে যে অরনী ইমতিয়াজের কাঁধের বোঝা না। অরনী ইমতিয়াজের কাঁধের দায়িত্ব, মাথার তাজ আর বুকের বাঁ পাশের একমাত্র প্রেয়সী।

(চলবে.....)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন