#পরাণ_ছোঁয়ার_বাহানা
পর্ব: ১৬
কলেজে নির্বাচনী পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। আর খুব বেশি দিন নেই আসল পরীক্ষার। অরনী আজকাল সারাদিন পড়াশোনা করে ঘরে বসে। এমনকি তার খেতে যাওয়ারও সময় নেই। আঁখি বেগম তাকে খাইয়ে দিয়ে যায়। যতোবার পরম মমতায় তাকে খাইয়ে দেয় ততবার চোখ দু'টো আর্দ্র হয়ে যায় অরনীর। তার মা কখনো তাকে এভাবে খাইয়ে দেয়নি। এ বাড়িতে যে আদর আপ্যায়ন সে পায় তার বাড়িতে সে পায়নি। বাবা-মা কে ছেড়ে থাকার কোনো কষ্টই তাকে ছুঁতে পারেনি যেনো।
মীরা আর ইরা আজকাল তার খুব বেশি যত্ন করে। একটু পর পর ফল কেটে দিয়ে যায়, শরবত বানিয়ে দিয়ে যায়। অরনী সব কিছু ছেড়েছুড়ে এখানেই থেকে যেতে চায়।
কিন্তু না, ইমতিয়াজ তাকে একটা বারের জন্যেও আটকায়নি, আটকাবেও না। সে জানে এবার পাশ করলে তাকে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে। সে এটাও জানে সে এবার পাশ করবেই, শুধু পাশ না অনেক ভালো ফলাফলও করবে। কিন্তু এ বাড়ির সবাই তাকে আটকে রাখার চেষ্টা করলেও ইমতিয়াজ তাকে একটা বারের জন্যেও বলবে না, 'ঘরনী আপনি থেকে যান। এখান থেকে আমাক্র ছেড়ে চলে যাওয়ার কোনো অধিকার আপনার নেই।'
অরনীর মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে সে পরীক্ষার সময় কিছু না লিখে বসে থাকবে। সবকিছু সহজ এলেও সে একটা অক্ষরও লিখবে না। তাহলে তো আর সে ফেইল করবে না। অরনী বলেছিলো, পাশ করেই এ বাড়ি ছাড়বে সে। যদি পাশই না করে তাহলে তার নিজের কথাও রাখা হবে, আবার এখান থেকে চলেও যেতে হবে না।
কিন্তু না, পরক্ষণেই নিজের সিদ্ধান্ত পালটায় সে। কেনো থাকবে? ইমতিয়াজ কি একবারও বলেছে তাকে থাকতে? চেষ্টা করেছে আটকানোর? হয়তো সে সত্যিই চায় অরনী পাশ করে চলে যাক এখান থেকে। অরনী চোখের পানি মুছে আবার পড়তে বসে। নাহ, যেখানে অধিকারই নেই, সেখানে আর এক মুহুর্তও না।
আগামীকাল অরনীর অঙ্ক পরীক্ষা। যে অঙ্ককে সে যমের মতো ভয় পেতো, সেই অঙ্ক এখন তার সবচেয়ে প্রিয় বিষয়। সারাদিন করলেও যেনো বিরক্ত হয়না। একই অঙ্ক কতোবার করে শেষ করেছে, তাও মন ভরে না।
ইমতিয়াজ আজ কোচিং-এ যায়নি। স্কুল থেকে ফিরেই নিজের কাপড়চোপড় গুছাচ্ছে ব্যাগে। অরনী অঙ্ক করতে করতে মাঝে মাঝে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাচ্ছে তার দিকে। কেউ কোনো কথা বলছে না। অরনী উশখুশ করছে কিন্তু ইমতিয়াজ নির্বিকার। এই ঘরে যে সে বাদে আর কেউ আছে তা সে দেখতেই পাচ্ছে না যেনো।
বেশ কিছুক্ষণ এভাবে যাওয়ার পর অরনী গলা খাঁকারি দেয়।
"এইযে, এই..."
"হু।" ইমতিয়াজ কিছু কাগজপত্র দেখছে এখন মনোযোগ দিয়ে।
"আমরা কোথাও যাচ্ছি নাকি? কিন্তু আমার যে পরীক্ষা আছে কাল।"
ইমতিয়াজ এতোক্ষণে তাকায় অরনীর দিকে। মেয়েটা শুকিয়ে গেছে আগের চেয়ে। তবে তার চোখগুলো আগের মতোই দীপ্তিমান। একবার তাকালে সহসা চোখ ফিরিয়ে নেওয়া যায়না।
"হ্যা যাচ্ছি। তবে আপনি না, শুধু আমি।"
অরনী বই বন্ধ করে অবাক চোখে তাকায় ইমতিয়াজের দিকে। ইমতিয়াজ আবারও নিজের কাগজপত্রে মন দেয়।
"তার মানে? আমি একা থাকবো?"
"একা থাকবেন কেনো? বাড়ির সবাই থাকবে।"
অরনী উঠে দাঁড়ায়। ইমতিয়াজ কি মজা করছে তার সাথে? না তো! তার মুখে মজার কোনো চিহ্ন নেই। খুব মনোযোগ দিয়ে কাগজপত্রগুলো একটা ফাইলে নিয়ে ব্যাগে রেখে দেয় যত্ন করে। অরনীর বুকটা ধকধক করতে থাকে অজানা আশঙ্কায়।
"আমি একা থাকতে পারিনা। আমার ভয় করে।"
ইমতিয়াজ এতোক্ষণে হাসে অরনীর দিকে তাকিয়ে। অরনীর হঠাৎ ভীষণ অসহায় লাগে। মনে হচ্ছে এই ইমতিয়াজকে সে চিনেনা। যাকে সে চিনে এ সে নয়। যার উপরে সমস্ত অধিকার খাটানো যেতো, রাগ দেখানো যেতো, চিৎকার করা যেতো এ সে নয়।
ইমতিয়াজ এগিয়ে আসে, অরনীর মুখোমুখি দাঁড়ায়। কিছু অবাধ্য কোঁকড়া চুল অরনীর কপাল বেয়ে চোখ পর্যন্ত এসে নেমেছে। ইমতিয়াজ আস্তে করে চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দেয়। অরনী চোখ বন্ধ করে ফেলে সাথে সাথে। ইমতিয়াজের সামান্য স্পর্শ তাকে কিয়ৎক্ষণের জন্য উন্মাদ বানিয়ে দিয়েছে। মনে হচ্ছে ওই শীতল স্পর্শটার প্রয়োজন এখন তার, নাহলে তৃষ্ণায় মরেই যাবে। বস্তাপচা ইগো আর আত্মাভিমান তাকে চিৎকার করতে বাঁধা দিচ্ছে, সে পারছে না চিৎকার করে স্পর্শটা জাপটে রেখে দিতে নিজের কাছে।
"কিন্তু আপনাকে তো এখন থেকে একাই থাকতে হবে। আপনি চেয়েছিলেন তো তাই। আর কয়টা দিন-ই বা আছেন আমার কাছে?"
অরনী কিছুটা পিছিয়ে যায়। তার হাতের ধাক্কায় পাশে থাকা কাঁচের গ্লাস পড়ে যেতে গেলে ইমতিয়াজ খপ করে ধরে বসে।
"অরনী, কি হয়েছে? ঠিক আছেন?"
অরনী ভাসা ভাসা চোখে ইমতিয়াজের দিকে তাকায়। ইমতিয়াজের চিরচেনা সেই মাদকতায় ভরা প্রেমময় দৃষ্টিকে দখল করেছে একরাশ নির্লিপ্ততা। বড্ড অপরিচিত সেই দৃষ্টি।
"আমার যে পরীক্ষা কাল। আপনি না দেখিয়ে দিলে কীভাবে পারবো?"
ইমতিয়াজ ছোট্ট করে হেসে বললো,"বইয়ের একেকটা অঙ্ক আপনি এতোবার করে করেছেন যে বেশিরভাগ উত্তরই আপনার মুখস্থ হয়ে গেছে। তবুও আমি ইলোরাকে বলে যাবো। ও নিজেও অঙ্কে খুব ভালো। ও দেখিয়ে দিবে।"
ইলোরা মৌখিক পরীক্ষা দেওয়ার জন্য আবার এসেছে এখানে, কেন্দ্র এদিকেই পড়েছে।
অরনী অসহিষ্ণু হয়ে যায়। খাটের উপর বসে পড়ে পা ঝুলিয়ে। ইমতিয়াজ আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে যায়।
"কিন্তু আপনি কোথায় যাচ্ছেন?"
"জানার কি খুব দরকার?"
"অবশ্যই দরকার। আপনিই তো বলেন যতোদিন আমি এখানে আছি আমার সব দায়িত্ব আপনার। তাহলে আমারও অধিকার আছে জানার। আমি কিন্তু এখনো আপনার স্ত্রী।"
শেষ কথাটা একটু জোর দিয়ে বলে অরনী। ইমতিয়াজ মুহুর্তেই বরফের মতো জমে যায়। কথা আটকে যায় মুখে। কেউ যেনো ভিতর থেকে গলা টিপে রেখেছে তার।
"অরনী..."
"বলুন কোথায় যাচ্ছেন?"
ইমতিয়াজ একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে বললো,"চিন্তা নেই। আমি একেবারে চলে যাচ্ছি না এখনো। ঢাকায় যাচ্ছি একটা কাজে। কি কাজ দয়া করে জিজ্ঞাসা করবেন না। আস্তে আস্তে পরে জানবেন। মাত্র দুইদিনের জন্য যাচ্ছি, পরশুদিনই আবার ফিরে আসবো। একা থাকতে পারবেন না এই দুইদিন?"
অরনী জানে পারবে না, কিন্তু এই জীবন সে বেছে নিয়েছে। বিশ্রী একটা জিদ তার জীবনকে নরক বানিয়ে দিয়েছে। যে বাড়ি থেকে, যে মানুষটা থেকে সে মুক্তি চাইতো। আজ সেই বাড়িতে, সেই মানুষের কাছে আশ্রয় চাচ্ছে। কি অদ্ভুত না মানুষের মন? শরৎ-এর আকাশের চেয়েও অদ্ভুত।
"দুইদিন পর চলে আসবেন তো?"
ইমতিয়াজ মুচকি হেসে বললো,"যদি না মৃত্যুদূত এসে হাজির হয় রাস্তায়..."
অরনী ভয়ংকর রাগী চোখে তার দিকে তাকায়। পরক্ষণেই ঝড়ের বেগে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার সময় বিকট শব্দ করে দরজায়।
ইমতিয়াজ বেশ কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসে।
"আমার প্রিয় প্রেয়সী, আমার ঘরনী। আমি চাইনা আমি যে আগুনে পুড়েছি আপনি সেই আগুনে পুড়ুন। আপনি ভাবছেন আমি আপনাকে আটকাতে চাইনা। আমি কেনো আপনাকে বলছি না, এখান থেকে আপনার যাওয়া হবে না। কিন্তু আমি যে আপনাকে আটকাচ্ছি, প্রতিনিয়ত আমার সাথে। আপনি বুঝতে পারছেন না। স্ত্রীর প্রতি স্বামীর টান, সে তো সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত। এ ভালোবাসার টান চুম্বকের চেয়েও শক্তিশালী। আমি চাই আপনি ভাঙুন, আপনাকে আবার আমি গড়ে নিবো। আমার নিজের মতো করে।"
এরপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইমতিয়াজ খাটের উপর পা ভাঁজ করে শুয়ে পড়ে। সন্ধ্যা সাতটার বাস। সে জানেনা সে ভুল করছে নাকি ঠিক। স্বপ্নের এতো কাছাকাছি এসেও এতো কিসের দোটানা? কোথায় যেনো পুড়ছে, বোধহয় হৃ#পরাণ_ছোঁয়ার_বাহানা
পর্ব: ১৭
সারারাত ঘুম হয়নি অরনীর। বিছানায় এপাশ ওপাশ করেই রাতটা কেটে গেছে। ইমতিয়াজ ঘরে ছিলো না। বেশ কিছুদিন যাবৎ সে রাতে এই ঘরে থাকে না, আসলেও অনেক রাতে আসে। যখন অরনী ঘুমিয়ে যায়। কাঠ বোঝাই করা ঘরটা পরিষ্কার করে নিজের টেবিল আর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ওখানেই নিয়ে গেছে। অরনী জিজ্ঞাসা করলে বলে পড়াশোনা আছে। অরনী ভেবে পায়না এখন আবার কিসের পড়াশোনা এতো? রাত জেগে এতো পড়তেই বা হবে কেনো? সেই যে দুইদিনের জন্য ঢাকা গেলো, তারপর থেকেই এসব শুরু হয়েছে।
অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে বসে থাকে অরনী। আর তো মাত্র কয়টা দিন, এরপর তো সে চলেই যাবে এখান থেকে। পড়াশোনাটা তখন করলে হতো না? পরক্ষণেই নিজের আগের কথাগুলো মনে পড়ে। এক সময় সে-ই চাইতো না মানুষটা এ ঘরে থাকুক। আর এখন...
আজ অরনীর উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফল দিবে। অরনী জানে তার পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে, এটাও জানে খুব ভালো ফল না হলেও একেবারে খারাপ হবে না। তা-ও এতো খারাপ লাগছে কেনো তার? কি চাচ্ছে সে নিজেই জানেনা। সে তো এই দিনেরই অপেক্ষায় ছিলো।
চোখটা সামান্য একটু লেগে এসেছিলো। ফজরের আজান শুনে তন্দ্রা কেটে যায় আবারও। তাড়াতাড়ি করে ওযু করে নামাজে দাঁড়িয়েছে সে। এর আগে নামাজ কালাম সেভাবে করেনি অরনী, কেউ জোরও করেনি সেভাবে ওর বাড়িতে। এই বাড়ি আসার পর আঁখি বেগম আস্তে আস্তে শিখিয়েছে অরনীকে। বেশ কিছু সূরা শিখিয়েছে। প্রথম প্রথম অতোটা টান কাজ না করলেও আস্তে আস্তে নামাজ ভীষণ প্রিয় হয়ে উঠেছে তার। আজান শুনে বসে থাকতে পারেনা। ফজরেত নামাজটা শুধু বাদ হয়ে যায় রোজ, সকালে উঠতে পারেনা। তবে বাকি চারবার পড়ার চেষ্টা করে। আজ যখন ঘুমটা ভেঙেই গেছে তাহলে আর অসুবিধা কি!
অরনী ভেবেছিলো আজ মোনাজাতে বুঝি অনেক কিছু বলবে, অনেক কিছু চাইবে সে। কিন্তু না, মোনাজাতে একটা কথাও সে বলতে পারেনি। শুধু কেঁদেছে, অশ্রুতে ভেসেছে দু'গাল। কিন্তু মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হয়নি। শুধু নিঃশ্বাসটা আটকে এসেছে কিছুক্ষণ পর পর।
ইমতিয়াজের আজ একটু দেরি হয়ে গেছে, কাজটা গুছিয়েই মসজিদে ছুটেছিলো নামাজ পড়তে। সে নিজেও কিছু চাইতে পারেনি। বোবার মতো বসে ছিলো বেশ কিছুক্ষণ দুই হাত তুলে। তার এতো বছরের জীবনে সে কেঁদেছে হাতে গোণা দু'একবার। তার মা বলে ছোটবেলায় নাকি ইমতিয়াজ পড়ে যেয়ে ব্যথা পেলেও কাঁদতো না। চিৎকার করে কেঁদেছিলো মীরার ওই ঘটনার পর, হাসপাতালের বেডে ওকে দেখে। ইমতিয়াজ খুব করে চাচ্ছে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে। কিন্তু সেই অনিয়ন্ত্রিত কান্না তার বুকের ভিতর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসছে। ইমতিয়াজ তাড়াতাড়ি মোনাজাত শেষ করে ফেলে।
ঘরে ঢুকতেই এক অপার্থিব সৌন্দর্য তার চোখে পড়ে। যেনো সে এই পৃথিবীতে না, বেহেশতের কাছাকাছি কোথাও পৌঁছে গেছে। তার গোলাপি মেম পুতুলটা সাদা ওড়না জড়িয়ে জায়নামাজে বসে আছে মোনাজাত ধরে। মাঝে মাঝে হালকা ফোঁপানিতে শরীর কেঁপে উঠছে। ইমতিয়াজের অবাধ্য ইচ্ছাগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ইচ্ছা করে তার হাওয়াই মিঠাইয়ের কোমল কোলের মধ্যে মাথা দিয়ে শুয়ে থাকতে। সারারাতের ধকল, দুশ্চিন্তা, ক্লান্তি যেনো মিলিয়ে যেতো হাওয়ায়।
ইমতিয়াজের উপস্থিতি টের পেয়েই অরনী খুব সাবধানে চোখ মুছে ফেলে। উঠে দাঁড়িয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু তার ফর্সা গালে কান্নার সুস্পষ্ট ছাপ, গোলাপি আভা। ইমতিয়াজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার দিকে তাকিয়ে।
"কি দোয়া করলেন? যেনো খুব ভালো রেজাল্ট করে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে পারেন?"
অরনী সজল অসহায় চোখে ইমতিয়াজের দিকে তাকায়। ইমতিয়াজ সাথে সাথে চোখ ফিরিয়ে নেয়।
"হ্যা তাই।"
"তাহলে তো বলতে হয় আজই এই বাড়িতে আপনার শেষ দিন।"
অরনী অবাক হয়ে যায়। কতো অবলীলায় ইমতিয়াজ কথাগুলো বলছে। বাড়িতে একটা পোষা প্রাণী রাখলেও তো এতোদিনে তার জন্য মায়া জন্মায়। ইমতিয়াজের কি তা-ও জন্মায়নি? সবই নাটক ছিলো?
"আর যদি পাশ না করি? তবুও কি ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবেন আপনার বাড়ি থেকে?"
ইমতিয়াজ সুন্দর করে হেসে দেয়। ভোরের নরম আলোয় অসহ্যকর সুন্দর লাগে সেই হাসি অরনীর।
"পাশ আপনি করবেন। যদি না সবটা না লিখে আসেন। এমনিতে প্রশ্ন সব আপনার অনুকূলেই ছিলো।"
"না লিখে আসবো কেনো? যা যা পেরেছি লিখেছি, যা পারিনি লিখিনি।"
ইমতিয়াজ খাটে পা ঝুলিয়ে বসে, অরনী তখনও দাঁড়িয়ে। ইমতিয়াজ আলতো করে তার হাত ধরে পাশে বসায়। অরনী দাঁতে দাঁত চেপে ধরে রাখে।
"এরপরের জার্নিটা আরো কঠিন অরনী। আপনাকে আরো কষ্ট করতে হবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির লড়াই। আমি জানি আপনার বাবার অনেক টাকা। চাইলেই প্রাইভেটে ভর্তি হতে পারবেন। কিন্তু আমি তো আমার হাওয়াই মিঠাইকে চিনি। সে একবার জিদ করলে অসাধ্য সাধন করে ফেলতে পারে। এবারও পারবে সে। আমি তার পাশে হয়তো থাকবো না কিন্তু দূর থেকে সবসময় আপনার ভালো চাইবো।"
অরনী আর পারেনা, ঝরঝর করে কেঁদে দেয়। ইমতিয়াজ তাকে আটকায় না। সে জানে এটা যদি অরনীর আবেগ বা মোহ হয় এই কান্না বেশিদিন থাকবে না, সে ভুলে যাবে ইমতিয়াজকে, ভুলে যাবে এই ছোট্ট ভাঙা বাড়ির এক বছরের সব স্মৃতি। আর যদি সে সত্যিই ভাগ্য করে এই রাজকন্যার ভালোবাসা পেয়েই যায়, রাজকন্যা নিজেই তার নীড়ে ফিরে আসবে। কেউ আটকাতে পারবে না।
"কাঁদছেন কেনো অরনী? ঠিক এক বছর আগে আপনি যা চেয়েছিলেন তা পেতে যাচ্ছেন। আর যদি বলেন এই বাড়ির জন্য মন কেমন করবে তবে বলবো এটা আমার নয়, আপনারই বাড়ি। আপনার যখন খুশি এখানে আসবেন, থাকবেন। এ ঘর আপনাকে ছাড়া অপূর্ণ, এটা কি আপনি জানেন?"
অরনী উত্তর দেয়না, বিছানার চাদর দুই হাতে চেপে শুধু কেঁদেই যায় নিঃশব্দে। ইমতিয়াজ অরনীর মাথায় হাত রাখে। অরনীর কান্না বাড়ে, সেই সাথে ইমতিয়াজের ভোঁতা যন্ত্রণাও একই হারে বাড়ে। একটা কমলা রঙা ভোর কেটে যায় দু'টো মানুষের নীরব আহাজারিতে।
★
ঠিক দুপুর বারোটার কিছু পরেই ফলাফল আসে। ইমতিয়াজ নিজেই কলেজে চলে গিয়েছিলো। ফিরে আসে সুখবর নিয়ে। অরনী 'এ' পেয়েছে, পয়েন্ট ভালো। সবচেয়ে বড় কথা, সে অঙ্কে লেটার মার্ক পেয়েছে, যা অবিশ্বাস্য। এই অঙ্কের জন্যই কিনা দুই বার সে ফেইল করেছিলো!
আজ কেউ বাড়ির বাইরে যায়নি। ইলোরা, মীরা, ইরা সবাই অরনীকে জাপটে ধরে ছিলো। আঁখি বেগম ছিলো জায়নামাজে। মবিনুর রহমান শুধু অস্থির ভাবে পায়চারি করছিলো বারান্দায়। যেনো অরনীর না, তারই রেজাল্ট দিবে।
ইমতিয়াজ যখন সুখবর জানায় তখন ইলোরা, মীরা আর ইরার চিৎকারে কান পাতা দায় হয়ে ওঠে। তড়িঘড়ি করে আঁখি বেগম বারান্দায় ছুটে আসে। এসেই দেখতে পায় তার বাড়ির পুতুলের মতো বউটা ছোট্ট শিশুর মতো দুই হাতে মুখ ঢেকে কাঁদছে। শব্দ করেই কাঁদছে। সবাই চুপ করে যায়। ইমতিয়াজ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে উঠোনেই। অরনী কেনো কাঁদছে সে কারণ অজানা, এমনকি অরনীর নিজেরও জানা নেই। বাড়ির কেউ জানেনা অরনী এখন কি করবে, এক বছর আগের সেসব কথা কেউ মনে রাখেনি, মনে রাখতেও চায়নি। অরনী শুধু তাদের, এই বাড়ির এটাই শুধু জানে তারা। এর বাইরে আর কিছু জানার প্রয়োজন নেই। ইমতিয়াজ কি জানে অরনী কেনো কাঁদছে? জানে বোধহয়, ঘরনী বলে ডাকে তো, নাকি?
★
পরদিন ভোর পাঁচটায় কেউ ঘুম থেকে ওঠার আগেই অরনী কাউকে কিছু না বলে লাগেজ হাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। আবিদ সাহেব আগের দিন বিকেলেই স্ত্রীকে নিয়ে চলে এসেছিলো এখানে। তার সামনে অরনী কিছুই বলেনি। শুধু সাবিনা বলেছিলো গাড়ি পাঠাবে, অরনী না করে দিয়েছিলো। ভোর রাতে ইমতিয়াজ তার পড়া শেষ করে এসে ঘুমায় রোজ। অরনী আর দেরি করেনি। কাউকে বলার মতো অবস্থা তার ছিলো না৷ ওই মুখগুলোর কষ্ট সে দেখতে পারবে না। রাস্তায় মানুষজন ছিলো না খুব বেশি। কিছু ভোরের পাখি বোধহয় অবাক হয়ে দেখছিলো, শ্বেতশুভ্র জামা, পায়জামা, ওড়না পরা এক আদুরে ঘরনী ঠোঁট কামড়ে কাঁদতে কাঁদতে লাগেজ হাতে হাঁটছে নির্জন পিচঢালা রাস্তায়। তার চোখেমুখে কষ্ট ছিলো বটে, তারচেয়েও বেশি ছিলো অভিমান। আফসোস পাখিরা তাকে আটকাতে পারেনি.....
(চলবে.....)দয়টাই। দাউদাউ করে পুড়ছে কিন্তু ধোঁয়া উড়ছে না।
(চলবে.....)