#পরাণ_ছোঁয়ার_বাহানা
পর্ব: ১৭
সারারাত ঘুম হয়নি অরনীর। বিছানায় এপাশ ওপাশ করেই রাতটা কেটে গেছে। ইমতিয়াজ ঘরে ছিলো না। বেশ কিছুদিন যাবৎ সে রাতে এই ঘরে থাকে না, আসলেও অনেক রাতে আসে। যখন অরনী ঘুমিয়ে যায়। কাঠ বোঝাই করা ঘরটা পরিষ্কার করে নিজের টেবিল আর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ওখানেই নিয়ে গেছে। অরনী জিজ্ঞাসা করলে বলে পড়াশোনা আছে। অরনী ভেবে পায়না এখন আবার কিসের পড়াশোনা এতো? রাত জেগে এতো পড়তেই বা হবে কেনো? সেই যে দুইদিনের জন্য ঢাকা গেলো, তারপর থেকেই এসব শুরু হয়েছে।
অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে বসে থাকে অরনী। আর তো মাত্র কয়টা দিন, এরপর তো সে চলেই যাবে এখান থেকে। পড়াশোনাটা তখন করলে হতো না? পরক্ষণেই নিজের আগের কথাগুলো মনে পড়ে। এক সময় সে-ই চাইতো না মানুষটা এ ঘরে থাকুক। আর এখন...
আজ অরনীর উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফল দিবে। অরনী জানে তার পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে, এটাও জানে খুব ভালো ফল না হলেও একেবারে খারাপ হবে না। তা-ও এতো খারাপ লাগছে কেনো তার? কি চাচ্ছে সে নিজেই জানেনা। সে তো এই দিনেরই অপেক্ষায় ছিলো।
চোখটা সামান্য একটু লেগে এসেছিলো। ফজরের আজান শুনে তন্দ্রা কেটে যায় আবারও। তাড়াতাড়ি করে ওযু করে নামাজে দাঁড়িয়েছে সে। এর আগে নামাজ কালাম সেভাবে করেনি অরনী, কেউ জোরও করেনি সেভাবে ওর বাড়িতে। এই বাড়ি আসার পর আঁখি বেগম আস্তে আস্তে শিখিয়েছে অরনীকে। বেশ কিছু সূরা শিখিয়েছে। প্রথম প্রথম অতোটা টান কাজ না করলেও আস্তে আস্তে নামাজ ভীষণ প্রিয় হয়ে উঠেছে তার। আজান শুনে বসে থাকতে পারেনা। ফজরেত নামাজটা শুধু বাদ হয়ে যায় রোজ, সকালে উঠতে পারেনা। তবে বাকি চারবার পড়ার চেষ্টা করে। আজ যখন ঘুমটা ভেঙেই গেছে তাহলে আর অসুবিধা কি!
অরনী ভেবেছিলো আজ মোনাজাতে বুঝি অনেক কিছু বলবে, অনেক কিছু চাইবে সে। কিন্তু না, মোনাজাতে একটা কথাও সে বলতে পারেনি। শুধু কেঁদেছে, অশ্রুতে ভেসেছে দু'গাল। কিন্তু মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হয়নি। শুধু নিঃশ্বাসটা আটকে এসেছে কিছুক্ষণ পর পর।
ইমতিয়াজের আজ একটু দেরি হয়ে গেছে, কাজটা গুছিয়েই মসজিদে ছুটেছিলো নামাজ পড়তে। সে নিজেও কিছু চাইতে পারেনি। বোবার মতো বসে ছিলো বেশ কিছুক্ষণ দুই হাত তুলে। তার এতো বছরের জীবনে সে কেঁদেছে হাতে গোণা দু'একবার। তার মা বলে ছোটবেলায় নাকি ইমতিয়াজ পড়ে যেয়ে ব্যথা পেলেও কাঁদতো না। চিৎকার করে কেঁদেছিলো মীরার ওই ঘটনার পর, হাসপাতালের বেডে ওকে দেখে। ইমতিয়াজ খুব করে চাচ্ছে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে। কিন্তু সেই অনিয়ন্ত্রিত কান্না তার বুকের ভিতর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসছে। ইমতিয়াজ তাড়াতাড়ি মোনাজাত শেষ করে ফেলে।
ঘরে ঢুকতেই এক অপার্থিব সৌন্দর্য তার চোখে পড়ে। যেনো সে এই পৃথিবীতে না, বেহেশতের কাছাকাছি কোথাও পৌঁছে গেছে। তার গোলাপি মেম পুতুলটা সাদা ওড়না জড়িয়ে জায়নামাজে বসে আছে মোনাজাত ধরে। মাঝে মাঝে হালকা ফোঁপানিতে শরীর কেঁপে উঠছে। ইমতিয়াজের অবাধ্য ইচ্ছাগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ইচ্ছা করে তার হাওয়াই মিঠাইয়ের কোমল কোলের মধ্যে মাথা দিয়ে শুয়ে থাকতে। সারারাতের ধকল, দুশ্চিন্তা, ক্লান্তি যেনো মিলিয়ে যেতো হাওয়ায়।
ইমতিয়াজের উপস্থিতি টের পেয়েই অরনী খুব সাবধানে চোখ মুছে ফেলে। উঠে দাঁড়িয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু তার ফর্সা গালে কান্নার সুস্পষ্ট ছাপ, গোলাপি আভা। ইমতিয়াজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার দিকে তাকিয়ে।
"কি দোয়া করলেন? যেনো খুব ভালো রেজাল্ট করে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে পারেন?"
অরনী সজল অসহায় চোখে ইমতিয়াজের দিকে তাকায়। ইমতিয়াজ সাথে সাথে চোখ ফিরিয়ে নেয়।
"হ্যা তাই।"
"তাহলে তো বলতে হয় আজই এই বাড়িতে আপনার শেষ দিন।"
অরনী অবাক হয়ে যায়। কতো অবলীলায় ইমতিয়াজ কথাগুলো বলছে। বাড়িতে একটা পোষা প্রাণী রাখলেও তো এতোদিনে তার জন্য মায়া জন্মায়। ইমতিয়াজের কি তা-ও জন্মায়নি? সবই নাটক ছিলো?
"আর যদি পাশ না করি? তবুও কি ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবেন আপনার বাড়ি থেকে?"
ইমতিয়াজ সুন্দর করে হেসে দেয়। ভোরের নরম আলোয় অসহ্যকর সুন্দর লাগে সেই হাসি অরনীর।
"পাশ আপনি করবেন। যদি না সবটা না লিখে আসেন। এমনিতে প্রশ্ন সব আপনার অনুকূলেই ছিলো।"
"না লিখে আসবো কেনো? যা যা পেরেছি লিখেছি, যা পারিনি লিখিনি।"
ইমতিয়াজ খাটে পা ঝুলিয়ে বসে, অরনী তখনও দাঁড়িয়ে। ইমতিয়াজ আলতো করে তার হাত ধরে পাশে বসায়। অরনী দাঁতে দাঁত চেপে ধরে রাখে।
"এরপরের জার্নিটা আরো কঠিন অরনী। আপনাকে আরো কষ্ট করতে হবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির লড়াই। আমি জানি আপনার বাবার অনেক টাকা। চাইলেই প্রাইভেটে ভর্তি হতে পারবেন। কিন্তু আমি তো আমার হাওয়াই মিঠাইকে চিনি। সে একবার জিদ করলে অসাধ্য সাধন করে ফেলতে পারে। এবারও পারবে সে। আমি তার পাশে হয়তো থাকবো না কিন্তু দূর থেকে সবসময় আপনার ভালো চাইবো।"
অরনী আর পারেনা, ঝরঝর করে কেঁদে দেয়। ইমতিয়াজ তাকে আটকায় না। সে জানে এটা যদি অরনীর আবেগ বা মোহ হয় এই কান্না বেশিদিন থাকবে না, সে ভুলে যাবে ইমতিয়াজকে, ভুলে যাবে এই ছোট্ট ভাঙা বাড়ির এক বছরের সব স্মৃতি। আর যদি সে সত্যিই ভাগ্য করে এই রাজকন্যার ভালোবাসা পেয়েই যায়, রাজকন্যা নিজেই তার নীড়ে ফিরে আসবে। কেউ আটকাতে পারবে না।
"কাঁদছেন কেনো অরনী? ঠিক এক বছর আগে আপনি যা চেয়েছিলেন তা পেতে যাচ্ছেন। আর যদি বলেন এই বাড়ির জন্য মন কেমন করবে তবে বলবো এটা আমার নয়, আপনারই বাড়ি। আপনার যখন খুশি এখানে আসবেন, থাকবেন। এ ঘর আপনাকে ছাড়া অপূর্ণ, এটা কি আপনি জানেন?"
অরনী উত্তর দেয়না, বিছানার চাদর দুই হাতে চেপে শুধু কেঁদেই যায় নিঃশব্দে। ইমতিয়াজ অরনীর মাথায় হাত রাখে। অরনীর কান্না বাড়ে, সেই সাথে ইমতিয়াজের ভোঁতা যন্ত্রণাও একই হারে বাড়ে। একটা কমলা রঙা ভোর কেটে যায় দু'টো মানুষের নীরব আহাজারিতে।
★
ঠিক দুপুর বারোটার কিছু পরেই ফলাফল আসে। ইমতিয়াজ নিজেই কলেজে চলে গিয়েছিলো। ফিরে আসে সুখবর নিয়ে। অরনী 'এ' পেয়েছে, পয়েন্ট ভালো। সবচেয়ে বড় কথা, সে অঙ্কে লেটার মার্ক পেয়েছে, যা অবিশ্বাস্য। এই অঙ্কের জন্যই কিনা দুই বার সে ফেইল করেছিলো!
আজ কেউ বাড়ির বাইরে যায়নি। ইলোরা, মীরা, ইরা সবাই অরনীকে জাপটে ধরে ছিলো। আঁখি বেগম ছিলো জায়নামাজে। মবিনুর রহমান শুধু অস্থির ভাবে পায়চারি করছিলো বারান্দায়। যেনো অরনীর না, তারই রেজাল্ট দিবে।
ইমতিয়াজ যখন সুখবর জানায় তখন ইলোরা, মীরা আর ইরার চিৎকারে কান পাতা দায় হয়ে ওঠে। তড়িঘড়ি করে আঁখি বেগম বারান্দায় ছুটে আসে। এসেই দেখতে পায় তার বাড়ির পুতুলের মতো বউটা ছোট্ট শিশুর মতো দুই হাতে মুখ ঢেকে কাঁদছে। শব্দ করেই কাঁদছে। সবাই চুপ করে যায়। ইমতিয়াজ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে উঠোনেই। অরনী কেনো কাঁদছে সে কারণ অজানা, এমনকি অরনীর নিজেরও জানা নেই। বাড়ির কেউ জানেনা অরনী এখন কি করবে, এক বছর আগের সেসব কথা কেউ মনে রাখেনি, মনে রাখতেও চায়নি। অরনী শুধু তাদের, এই বাড়ির এটাই শুধু জানে তারা। এর বাইরে আর কিছু জানার প্রয়োজন নেই। ইমতিয়াজ কি জানে অরনী কেনো কাঁদছে? জানে বোধহয়, ঘরনী বলে ডাকে তো, নাকি?
★
পরদিন ভোর পাঁচটায় কেউ ঘুম থেকে ওঠার আগেই অরনী কাউকে কিছু না বলে লাগেজ হাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। আবিদ সাহেব আগের দিন বিকেলেই স্ত্রীকে নিয়ে চলে এসেছিলো এখানে। তার সামনে অরনী কিছুই বলেনি। শুধু সাবিনা বলেছিলো গাড়ি পাঠাবে, অরনী না করে দিয়েছিলো। ভোর রাতে ইমতিয়াজ তার পড়া শেষ করে এসে ঘুমায় রোজ। অরনী আর দেরি করেনি। কাউকে বলার মতো অবস্থা তার ছিলো না৷ ওই মুখগুলোর কষ্ট সে দেখতে পারবে না। রাস্তায় মানুষজন ছিলো না খুব বেশি। কিছু ভোরের পাখি বোধহয় অবাক হয়ে দেখছিলো, শ্বেতশুভ্র জামা, পায়জামা, ওড়না পরা এক আদুরে ঘরনী ঠোঁট কামড়ে কাঁদতে কাঁদতে লাগেজ হাতে হাঁটছে নির্জন পিচঢালা রাস্তায়। তার চোখেমুখে কষ্ট ছিলো বটে, তারচেয়েও বেশি ছিলো অভিমান। আফসোস পাখিরা তাকে আটকাতে পারেনি.....
(চলবে.....)