ফন্ট সাইজ:
থিম:
হেমন্তের ভেজা রঙ

৩য় পর্ব

লেখক: ইশরাত জাহান জেরিন

#হেমন্তের_ভিজে_রঙ

#পর্ব_৩

#ইশরাত_জাহান_জেরিন

কার্তিক পেরিয়ে পৌষের হাড়-কাঁপানো শীত এসে ভর করল পাঁচগাঁও গ্রামের বুক জুড়ে। ওপারে মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা ঠান্ডা উত্তুরে হাওয়া কংস নদীর জলকে যেন বরফের মতো হিম করে তুলেছে। ঘন কুয়াশায় সকাল ন’টা পর্যন্ত পশের খেত কিংবা ধানক্ষেতের পথ দেখা যায় না। জহিরের ভাঙা ঘরের বাশের টাটির ফাঁক গলে সেই কনকনে বাতাস রাতে সোজা এসে বিছানায় বিঁধে। একখানা পুরোনো কাঁথা ছাড়া জহিরের ঘরে গায়ে দেওয়ার মতো আর কিছু নেই। মেহেরজান সেই কাঁথাটি জহিরের গায়ে টেনে দেয়, আর নিজে শাড়ির আঁচল মুড়ি দিয়ে ঘরের এক কোণে চটের ওপর শুয়ে রাত কাটায়। তবে শীতের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে কার্তিক-পৌষের চরম আকাল। জহিরের বাপের আমলের সামান্য জমিটুকুতে গত বৈশাখে কংস নদীর তোড়ে আমন ধান ভেসে যাওয়ার পর থেকে তার হাঁড়ির অবস্থা সঙ্গিন। নতুন বোরো ধানের চারা রোপার কাজ মাত্র শুরু হয়েছে। মাঠে কামলা খাটলেও জোতদাররা পাওনা টাকা ঠিকমতো দিচ্ছে না। আজ সকালেও জহির যখন মাঠে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল, মেহেরজান এসে দরজায় চুপচাপ দাঁড়াল। তার চোখে এক বিষণ্ণ দীনতা।

“কী অইছে মেহের?" জহির মাথার গামছাটা কপালে পেঁচাতে পেঁচাতে শুধাল।

মেহেরজান নিচু গলায় বলল, “ঘরে চালের হাড়ি একদম ফাঁকা। কাল রাতে যে অল্প একটু খুদ আছিল, হেইডা দিয়া জাউ কইরা তো আপনারে দিলাম। আজকে পাতিলে ছাই ছাড়া আর কিচ্ছু নাই।"

জহির একটু থমকে দাঁড়াল। তার রোগা তামাটে মুখে দুশ্চিন্তার কোনো রেখা ফুটল না বটে, তবে তার গভীর চোখ দুটো আরও অন্ধকার হয়ে এল। সে বুকপকেট থেকে আধপোড়া একটা বিড়ি বের করে জ্বালল। তিতা ধোঁয়া ছেড়ে শান্ত কণ্ঠে বলল, “হাতে হাড়ের কড়ি একডাও নাই। মহাজনের বকেয়া সুদের লাইগ্যা গতকালও ঘাডে খাড়ায়া কথা শুনাইছে। তুমি ভাইাবো না, আমি আজ মহাজনের চালের আড়তে কামলা খাটুম। সাঁঝের বেলা চাল নিয়া ঘরে ফিরুম।"

মেহেরজান অপরাধীর মতো মুখ নিচু করে রইল। বাপের ঘরে বা অন্য কোথাও হলেও হয়তো সে দুটো চাল চেয়ে আনত, কিন্তু তার সেই উপায়ও নেই।

-

পাঁচগাঁও গ্রামের কংস নদীর ঘাটের পাশেই হাট বসে। সপ্তাহে দুদিন সেখানে লোকজনের ভিড় জমে। দুপুরের রোদে জহির আড়তে ভারী ধানের বস্তা পিঠে তুলে আড়তদারের গুদামে নিয়ে যাচ্ছিল। পিঠের ওপর ভারী বস্তা, শরীর বেয়ে ঝরঝর করে ঘাম ঝরছে। খালি গায়ে তার তামাটে পিঠের হাড়গুলো স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। তপ্ত রোদ আর কঠোর পরিশ্রমে তার রূক্ষ চেহারাটা আরও ধারালো আর পুরুষালি দেখাচ্ছে। এমন সময় হাটের পথের কোণে একটা শোরগোল শোনা গেল। পাশের গ্রামের মাতব্বরের বড় ছেলে মেহেরজানের প্রাক্তন স্বামী মোতাহের মাতব্বর গা গায়ে চাদর জড়িয়ে কয়েকটা চামচা নিয়ে হাটে এসেছে। মোতাহের লোকটা দেখতে ফর্সা হলেও অতিরিক্ত চর্বিজমে যাওয়া মোটা শরীর আর চোখের নিচে মদ-জুয়ার কুৎসিত ছাপ। আড়তের সামনে জহিরকে ধানের বস্তা কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মোতাহের পা থামাল। তার মুখে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত, অহংকারী হাসি।

"ওরে! ধানের বস্তা বইয়া কত টেহা পাস রে? শরিফানের মরনের পর তো শুনছিলাম খুব বিপদে আছিলি। তা শেষমেশ আমার ঘরের ছাড়ন দেয়া, তালাকপ্রাপ্তা কালা ছেড়ীডারে গলায় ঝুলাইলি?"

হাটের লোকজনের দৃষ্টি তাদের দিকে ঘুরে গেল। জহির ধানের বস্তাটা আড়তের মেঝেই ফেলে ধীরেসুছে নামাল। গামছা দিয়ে ঘাড়ের ঘাম মুছল। তার তামাটে চেহারায় কোনো রাগ বা উত্তেজনার ছাপ ফুটল না, কেবল চোখ দুটি এক অমোঘ কড়াকড়িতে রূপ নিল। মোতাহের হা-হা করে হেসে উঠে আরও কটু সুরে বলল, "যাউক গা, তোর মতো আকালি কৃষকের কপালে তো ওই কালা শ্যাওলা ছেড়ীই মানায়! দুই বছর আমার চাবুক আর লাঠির বারি খাইয়া পোড়া মেজাজ অইয়া আছে। অহন তোর ভাঙা ঘরে গিয়া কি সোয়ামীর আদর দেখায় নাকি?"

হাটের দু-একজন চামচা হেসে উঠল। জহির ধীরপায়ে সোজা মোতাহেরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। জহির মোতাহেরের চেয়ে এক মাথা লম্বা। তার রোগা, পিটানো শক্ত শরীর আর ক্ষুরধার মেটে কালো চেহারার দাপটের সামনে চর্বিওয়ালা মোতাহের হঠাৎ একটু যেন পিছু হটল। জহিরের চোখ দুটো প্রদীপের আলোর মতো জ্বলছিল। জহির কোনো চিল্লাচিল্লি করল না। খুব খাদে নামানো, ঠান্ডা ও বরফের মতো শক্ত গলায় বলল,

"মোতাহের সাব, গায়ের রঙের গরম আর বাপের টেহার অহংকার নিয়া চালিয়েন না। ঘরের মাইয়া মানুষরে যে পুরুষ লাঠি আর চাবুক দিয়া সোজা রাখতে চায়, হেইডা কোনো পুরুষ না হেইডা জ্যান্ত জানোয়ার। আমি কালা মানুষ, অভাবের ঘরে থাকি, কিন্তু নিজের বউরে সম্মান দিবার জানি। মেহের এখন আমার ঘরের লক্ষ্মী। আর একদিন যদি মেহেরজানের নাম নিয়া এমন কু-কথা আপনার মুখ দিয়ে বাইর অয়, তবে কংস নদীর এই কাদামাটিতে আপনার ওই অহংকারী মুখডা কেমনে পুড়তে অয় হেইডা এই জহির গাজী দেখাইয়া দিব।"

কথাগুলোর ভেতরে এমন এক ভয়াবহ পুরুষালি হুংকার ও স্থির প্রতিজ্ঞা ছিল যে, মোতাহেরের মুখের হাসি একমুহূর্তে মিলিয়ে গেল। আশেপাশের চোরের মতো চুপ করে যাওয়া মানুষদের সামনে মোতাহের যেন এক লহমায় ছোট হয়ে গেল। কিছু বলার সাহস না পেয়ে বিড়বিড় করে গালি দিতে দিতে সে হাটের দিকে চলে গেল।

-

সাঁঝের অন্ধকার নামার পর জহির ঘরে ফিরল। তার এক হাতে পাঁচ কেজি চালের একটা পোঁটলা, আর অন্য হাতে দুটো শুকনা মরিচ আর মেটে সরা। ঘরে ঢুকে দেখল, মেহেরজান প্রদীপের ম্লান আলোয় মেঝের মাটি লেপছিল। জহিরকে দেখে সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। জহিরের গম্ভীর আর নিঝুম মুখ দেখে মেহেরজানের বুকের ভেতর আবার পুরনো ভয়টা চড়চড় করে উঠল। সে ভাবল, হাটে বুঝি কিছু ঘটেছে, কিংবা চাল না পেয়ে জহির মেজাজ খারাপ করে এসেছে। "চাল আনছেন?" মেহেরজান কাঁপা গলায় শুধাল।

জহির চালের পোঁটলাটা দাওয়ার এক কোণে রাখল। তারপর প্রদীপের পাশে বসে বিড়ি ধরাল। "হুম, চাল আনছি। তুমি ভাত চড়াইয়া দাও।” জহির সহজ কণ্ঠে বলল।

মেহেরজান চালের পোঁটলাটা নিয়ে রান্নাঘরে গেল। কিন্তু তার মন মানছিল না। কিছুক্ষণ পর সে জহিরের সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। “ একটা কথা জিগাই?"

"কও।"

“আজ হাটে কি মাতব্বর বাড়ির কারও লগে আপনার দেখা হইছিল? ঘাডের কালু কাইল্যা আইসা কইয়া গেল আপনি নাকি হাটের মাঝখানে মাতব্বরের পোল্যার লগে তর্ক করছেন..." মেহেরজানের গলা থরথর করে কাঁপছিল। সে ভয়ে হাত দুটো শাড়ির আঁচলে লুকিয়ে ফেলল। “আমার লাইগ্যা কি আপনারে আবার মানুষের অপমান সহ্য করতে অইল ভাই? আমার কপালটাই..."

জহির বিড়ির ধোঁয়া ছেড়ে মেহেরজানের ভীতিগ্রস্ত মুখের দিকে তাকাল। “মেহের।” জহির থামাল তাকে। “অপমান আমি সহ্য করি নাই, অপমান হেই মোতাহের পাইয়া গেছে। যার মনের ভেতরে পশুপনা, হেই মানুষ ফর্সা অইলেও পশুর সমান। তোমার বাপের বাড়ির বা আগের সংসারের ওই বি*ষাক্ত অতীত আমার ভিটেয় টানবা না। তুমি এই ঘরের বউ, এই ভাঙা ঘরের সম্মান।"

মেহেরজান একদৃষ্টিতে জহিরের তামাটে মুখের দিকে চেয়ে রইল। তার চোখ জলে ভরে উঠল। যে অতীতের গঞ্জনা আর গায়ের রঙের খোঁটা তাকে প্রতিদিন তিল তিল করে মেরেছিল, সেই অতীতকে এই সাধারণ কৃষকটা এক তুড়িতে উড়িয়ে দিচ্ছে! খানিকক্ষণ চুপ থেকে মেহেরজান মাথা নিচু করে বলল, “আপনি আমারে এত মান দেন .. কিন্তু আমার তো কিচ্ছু নাই। আমি রূপহীন, গায়ের রঙ কালা। এমনকি আমি তো পড়াল্যাহাও জানি না... মোল্লা বাড়ির ছেড়ী অয়াও মক্তবে যাওয়ার সুযোগ পাই নাই। কোরআন শরীফের একটা হরফও চিনি না, খালি মনে মনে দুইডা কালেমা আর নামাজ জানি। আপনার কি আমারে খুব অযোগ্য মনে অয় না?”

জহির কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইল। বাইরের কনকনে উত্তুরে বাতাস দরজার টাটিতে আছড়ে পড়ছে। মেটে প্রদীপের আলোয় ঘরের ছায়ায় দুটি মানুষের রূপ ভেসে উঠেছে। জহির ধীরপায়ে মেহেরজানের কাছে এসে মেঝের ওপর বসল। সে খুব কাছে থেকে মেহেরজানের মায়াবী, বিষণ্ণ আর নিস্পাপ চোখের দিকে তাকাল। “মেহের।” জহির খুব কুণ্ঠিত কিন্তু গভীর মমতায় বলল, "কোরআন পড়তে পারো না, বিদ্যা নাই তাতে কী হইছে? বিদ্যা আর রূপ দিয়ে কি মানুষের ভেতরডা মাপা যায়? আমি তো বাংলা বইয়ের একটা অক্ষরও ঠিকমতো পড়তে পারি না। নিজের নামডা সই করতে গেলে আঙুল কাঁপে।"*

জহির নিজের তামাটে, কড়া পড়া শক্ত হাতটা বাড়াল। "এই দেখো আমার হাত। মেটে কাদায় খাটাইয়া আঙুলগুলার রূপ নষ্ট অইয়া গেছে। রঙ আমার আলকাতরার মতো। আমার ঘরে অভাব, পকেটে টাহা নাই। কিন্তু তুমি যে সরল মনে কালেমা পইড়া সিজদায় লুটাো, তোমার যে নিষ্পাপ মন দিয়ে এই অভাবের সংসারডারে আগলায়া রাখো হেইডা সোনার চেয়েও দামি।"

মেহেরজান চোখ তুলে জহিরের হাতের দিকে তাকাল। সেই তামাটে, মেটে কাদায় কড়া পড়া শক্ত হাত দুটোতে কোনো সোনার অলংকার পরানোর ক্ষমতা নেই, কিন্তু সেখানে আছে এক অপরিসীম সুরক্ষার আশ্বাস। মেহেরজান চট করে তার হাত দিয়ে জহিরের সেই রূক্ষ হাতটা চেপে ধরল। এই প্রথম মেহেরজান নিজ থেকে জহিরের হাত ছুঁল। তার হাতের বাঁধন ছিল ভয়ের নয়, ছিল এক গভীর নির্ভরতার। "আপনি নিজেরে আর কখনো ছোট ভাববেন না।” মেহেরজান ভেজা গলায় রুদ্ধশ্বাসে বলল। "ফর্সা রূপ আর বিদ্যার দাপট তো আগের ঘরে দেইখা আসছিলাম। কিন্তু মানুষ হিসেবে যে সম্মান আপনার এই ভাঙা মেটে ঘরে পাইছি, হেইডা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় রাজত্ব। আমার আর কোনো আফসোস নাই।"

প্রদীপের হলুদ আলোয় দুটি মানুষের চোখের কোণে জমে থাকা জল চকচক করে উঠল। জহির গাজী মেহেরজানের হাতটি তার শক্ত তামাটে মুঠোয় আরও একটু চেপে ধরল। পৌষের কনকনে রাতে কংস নদীর হিম হাওয়া মেটে ঘরের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু সেই ঘরের ভেতরের শীতল অন্ধকার আর ভয় একটু একটু করে উষ্ণ ভালোবাসার ভিজে রঙে ভরপুর হতে শুরু করেছিল।

-

পৌষ কেটে মাঘের শেষাশেখি এসে পাঁচগাঁও গ্রামের প্রকৃতি এক অদ্ভুত ও রুদ্র রূপ ধারণ করল। ওপারে মেঘালয় পাহাড়ের ওপরে যে ধূসর কুয়াশা জমে থাকত, তা হঠাৎ করেই কালচে মেঘের রূপ নিতে শুরু করেছে। হেমন্তের শান্ত ও বিষণ্ণ কংস নদী যেন রাতারাতি বদলে গেল। পাহাড়ি ঢলের পূর্বাভাস আর আকস্মিক চৈত্র-বৈশাখ আসার আগেই অকাল কালবৈশাখীর ঘনঘটা দেখা দিল আকাশে। গাছের পাতা ঝরে পড়া হিম বাতাস রূপ নিল এক চঞ্চল ও উন্মত্ত ঝড়ে। জহির গাজী তখনো গাঁয়ের পশের বিলের নিচু জমিতে খেটে চলেছে। বোরো ধানের চারাগুলো মাত্র মাটি ধরেছে, ঠিক এই সময়ে যদি জল উপচে পড়ে বা বাঁধ ভেঙে যায়, তবে আগামী পুরো বছরের ভাত বন্ধ হয়ে যাবে। তাই গ্রামের অন্য কৃষকদের সাথে জহিরও গত দুদিন ধরে নাওয়া-খাওয়া ভুলে কোদাল হাতে মাটির আল বাঁধতে ব্যস্ত। বৃষ্টি নামল মুষলধারে। মাঘের শেষদিকের সেই বৃষ্টি সাধারণ বৃষ্টি নয় একদম বরফগোলা ঠান্ডা জলের মাতম। বাতাসের তোড়ে কংস নদীর পানি ফুলে-ফেঁপে উঠে তীরের হিজল আর বটগাছগুলোকে আছড়ে ফেলতে লাগল। জহির গাজীর পরনে ছিল কেবল একটি ময়লা চট দিয়ে তৈরি কোঁছড় আর খাঁ খাঁ করা খোলা তামাটে শরীর। বৃষ্টির প্রতিটি ফোটা তার তামাটে পিঠে চাবুকের মতো এসে বিঁধছিল। শরীর একদম অবশ হয়ে আসছিল, কিন্তু জহির কোদাল থামায়নি। কাজের চেনা খাটুনি সে চেনে, কিন্তু শরীরের ভেতরের ক্লান্তি যে তাকে কখন জড়িয়ে ধরছে, তা সে খেয়াল করতে পারেনি। সাঁঝ নামার আগেই চারপাশ নিকষ কালো আঁধারে ঢেকে গেল।

পশের বিলের কাজ কোনোমতে শেষ করে জহির যখন কাদার ভেতর দিয়ে পা টেনে টেনে ঘরের পথে রওনা দিল, তখন তার পা দুটো সীসার মতো ভারী ঠেকছিল। মাথাটা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছে, বুকের ভেতর এক কড়া ও দমবন্ধ করা হাওয়া চেপে বসছিল। হাত থেকে কোদালটা যেন পড়ে যেতে চাচ্ছিল। তামাটে রূক্ষ মুখটা জ্বরে লাল হয়ে উঠেছে। জহির কোনোমতে মেটে ঘরের দাওয়ায় এসে পৌঁছাল।

দরজায় দাঁড়িয়ে মেহেরজান হ্যারিকেনের আলো নিয়ে ছটফট করে অপেক্ষা করছিল। জহিরের এই কাদাভরা, থরথর করে কাঁপতে থাকা শরীরটা দেখে তার বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তে হিম হয়ে গেল।

“শুনছেন!" মেহেরজান চিৎকার করে উঠল।

জহির দাওয়ায় পা দিতেই আর ভারসাম্য রাখতে পারল না। শক্ত, কাদার মতো পিটানো সেই রোগা পুরুষালি শরীরটা এক লহমায় দাওয়ার মাটির ওপর আছড়ে পড়ল।

মেহেরজান প্রদীপটা দাওয়ার এক কোণে রেখে তড়িঘড়ি করে জহিরের কাছে ছুটে গেল। জহিরকে স্পর্শ করতেই মেহেরজানের হাত যেন পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। সারা শরীরে জ্বলন্ত আগুনের মতো উত্তাপ। কপাল, বুক আর শক্ত হাত দুটো যেন তপ্ত লোহার ছ্যাঁকা দিচ্ছে। জহিরের চোখ দুটো রক্তজবার মতো লাল হয়ে বুজে এসেছে, ঠোঁট দুটো ঠান্ডায় আর তীব্র জ্বরের ঘোরে থরথর করে কাঁপছে। “মেহের... মেহের..." জহির বিড়বিড় করে অস্পষ্ট গলায় ডেকে উঠল। তার সেই শক্ত, খাদে নামানো দাপুটে গলা আজ যেন একদম ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

মেহেরজান নিজের সমস্ত ভয় আর দ্বিধা একপাশে সরিয়ে রাখল। যে মানুষকে সে সবসময় এক অটল পাহাড়ের মতো ছায়া দিতে দেখেছে, যে মানুষটার একটা কড়া কথায় মেটে ঘর নিঝুম হয়ে যায়, আজ সেই রোগা তামাটে পুরুষটা অসহায় শিশুর মতো মাটির ওপর লুটিয়ে পড়ে আছে! মেহেরজান জহিরের শরীরটা টেনেটুনে কোনোমতে ঘরের ভেতরের বাঁশের পাটিতে তুলল। হ্যারিকেনের সলতে বাড়িয়ে দিয়ে সে দেখল, জহিরের তামাটে কপালে ঘামের সাথে ঠান্ডা কাদা লেপ্টে আছে। তার বুকের খাঁচাটা দ্রুত গতিতে ওঠানামা করছে। মেহেরজান চটজলদি রান্নাঘর থেকে এক ঘটি ঠান্ডা পানি আর একটি পুরোনো পরিষ্কার সুতির কাপড়ের টুকরো নিয়ে এল। ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে তার নিজের শরীরও ভয়ে কাঁপছিল, কিন্তু এই মুহূর্তে জহিরকে সেবা করা ছাড়া তার আর কোনো খেয়াল রইল না। মেহেরজান পাটির পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। সে খুব সাবধানে, পরম মমতায় জহিরের ঘাম আর কাদা মাখা তামাটে মুখটা মুছে দিতে লাগল। কাপড়ের টুকরোটি ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে জহিরের কপালে আর তপ্ত বুকের ওপর রেখে দিতে লাগল সে। বাইরে তখন ঝড়ের উন্মাদনা। বাঁশের ঘরের টাটিগুলো ‘মড়মড়’ শব্দে কেঁপে উঠছিল, বাতাসের শনশন শব্দ কংস নদীর পাড় বেয়ে এসে ঘরের চালে আছড়ে পড়ছিল। কিন্তু ঘরের ভেতরে মেহেরজান একমনে, পরম আকুলতায় তার সোয়ামীর মাথার পাশে বসে রইল।

রাত যত বাড়তে লাগল, জহিরের জ্বরের বেগ তত তীব্র রূপ নিল। ১০৪ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাওয়া জ্বরের তাপে জহির বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে লাগল। তার অচৈতন্য মনের বন্ধ দুয়ার যেন হঠাৎ করে খুলে গেল। জহিরের অস্পষ্ট বিড়বিড়ানি এবার স্পষ্ট শব্দে রূপ নিতে লাগল। সে জ্বরের ঘোরে বিলাপ করতে শুরু করল, “"শরিফান... ও শরিফান! তোরে আমি একখান ভালা কাঁথা দিবার পারি নাই রে... একডা ডাক্তার আননের সাধ্য এই জহিরের আছিল না! অভাবের জ্বালায় তোরে আমি মাইরা ফেললাম..."

জহিরের চোখের কোণ বেয়ে ফোটা ফোটা তপ্ত জল গড়িয়ে তার কানের কাছে মেঝের মাটিতে পড়তে লাগল। সেই শক্ত, নিরাসক্ত পুরুষালি চোখে এমন কান্না মেহেরজান কোনোদিন দেখেনি। জহির থামল না। সে হাত দুটো শূন্যে বাড়িয়ে কাকে যেন ধরার চেষ্টা করতে করতে কাঁপাকাঁপা ভাঙা কণ্ঠে আবার বলতে লাগল, “মেহের... ও মেহের! আমারে ক্ষমা কইরা দাও... গায়ের রঙ কালা বইল্যা তোমারে ফিরায়া দিছিনু... আমি পাপী মানুষ! আমার এই খালি, ভাঙা ঘরের কোনো আলো নাই... তুমি আমারে ক্ষমা করো মেহের..."

কথাগুলো শুনে মেহেরজানের বুকের ভেতর যেন হাজারটা ছুঁচ একসাথে বিধতে লাগল। মেহেরজান বুঝতে পারল, এই লোকটা বাইরে থেকে যতই শক্ত আর গম্ভীর দেখাক না কেন, তার মেটে মনের গহীনে অতীতে ঘটে যাওয়া অন্যায় আর নিজের অভাবের জন্য এক গভীর অপরাধবোধ আর অনুশোচনার আগুন তিল তিল করে জ্বলছিল! প্রথম স্ত্রী শরিফানকে না বাঁচাতে পারার যন্ত্রণা আর চার বছর আগে মেহেরজানকে ফিরিয়ে দেওয়ার লজ্জা তাকে ভেতরে ভেতরে নিঃশেষ করে দিচ্ছিল। মেহেরজান আর ধরে রাখতে পারল না। তার নিজের চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়তে লাগল। সে জহিরের সেই জ্বলতে থাকা তামাটে কপালে নিজের কোমল হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। অপর হাত দিয়ে জহিরের কাঁপতে থাকা তামাটে আঙুলগুলো নিজ হাতের মুঠোয় পুরে নিল। মেহেরজান একদম জহিরের কানের কাছে মুখ নিয়ে নরম, ভেজা ও আকুল গলায় বলল, "কৈচ্ছি না আপনার কোনো পাপ নাই... আপনি নিজেরে আর কষ্ট দিয়েন না! বুবুর মরণ তো আল্লার হুকুম আছিল, আর আমারে আপনি ফিরায়া দেন নাই... আমার কপালই আমারে আপনার এই সোনার ভিটায় টাইনা আনছে। আমি আপনারে মন থাইকা মাফ কইরা দিছি ভাই, আমার কোনো ক্ষোভ নাই... কোনো গঞ্জনা নাই!"

কিন্তু জ্বরের ঘোরে জহির তখনো বিড়বিড় করছিল।

মেহেরজান পড়ালেখা জানে না, কোরআন শরীফের পাতা পড়তে জানে না। কিন্তু তার অকৃত্রিম ভালোবাসা আর পরম করুণাময়ের ওপর অগাধ বিশ্বাসই ছিল তার একমাত্র শক্তি। মেহেরজান অশ্রুসজল চোখে চোখ বন্ধ করল। মনে মনে কেবল তার মুখস্থ থাকা একমাত্র সহজ কালেমাটি বারবার আবৃত্তি করতে লাগল, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ…”

প্রতিবার কালেমা পড়ে সে জহিরের তপ্ত কপালে, বুকে আর চোখে মৃদু করে ফুঁ দিতে লাগল। আর ভিজানো কাপড়ের টুকরোটি দিয়ে তার সারা শরীর ধুয়ে দিতে লাগল। সমস্ত রাত ধরে চলল এই অলৌকিক এক যুদ্ধ একদিকে ঝড়ের গর্জন আর মহাব্যাধি, অন্যদিকে এক আলাভোলা, অশিক্ষিত নারীর নীরব প্রেম আর সেবার আশ্রয়।

--

ভোরের দিকে ঝড়ের দাপট কমতে শুরু করল। আকাশের কালচে মেঘগুলো কেটে গিয়ে এক হালকা ফাল্গুনের সুবাস মাখা মিঠে আলো ফুটতে শুরু করল কংস নদীর ওপর। জহিরের শরীরের উত্তাপ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। তার শ্বাস-প্রশ্বাস এখন অনেকটা শান্ত ও স্বাভাবিক। ঘামে তার পুরো শরীর ভিজে গেছে যে ঘাম শরীরের বিষাক্ত জ্বরকে ধুয়ে মুছে নিয়ে গেছে। জহির ধীরে ধীরে চোখের পাতা খুলল। তার মাথার ভেতরটা এখনো কিছুটা ঝিমঝিম করছে, কিন্তু জ্বরের সেই দহন আর নেই। সে চোখ মেলে তাক হতেই দেখল তার মাথার পাশে মেঝের ওপর বসেই কাত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে মেহেরজান।

মেহেরজানের সুতির শাড়ির আঁচলটা কিছুটা সরে গেছে, কপালে ক্লান্তির ছাপ, চোখের কোণে শুকিয়ে যাওয়া জলের দাগ। তার এক হাত এখনো পরম যত্নে জহিরের বুকের ওপর রাখা, আর অন্য হাত দিয়ে জহির গাজীর রূক্ষ তামাটে হাতটি শক্ত করে ধরে রাখা। জহির কিছুক্ষণ নিঃশব্দে মেহেরজানের সেই আলাভোলা, নিষ্পাপ মুখের দিকে চেয়ে রইল।

জহিরের মনের গহীনে চার বছর ধরে জমে থাকা অপরাধবোধের যে কালো পাথরটা চেপে বসেছিল, তা যেন আজকের এই ঝড়ের রাতে মেহেরজানের চোখের জলে আর সেবার পরশে একেবারে ধুয়ে মুছে ছাফ হয়ে গেছে। জহির অনুভব করল, তার জীবনের আসল নিরাময় কোনো কবিরাজ বা ডাক্তারের ওষুধে হয়নি হয়েছে এই রূপহীন, অশিক্ষিত কিন্তু হিরণ্ময় মনের মেয়েটির ছোঁয়ায়। জহির খুব সাবধানে, যাতে মেহেরজানের ঘুম না ভাঙে, নিজের তামাটে হাতটা মেহেরজানের মাথার ওপর রাখল। প্রদীপের নিভু নিভু আলো আর ভোরের মিষ্টি রোদের ম্লান ছায়ায় জহির গাজীর রুক্ষ মেটে অন্তরে যেন এক নতুন প্রাণের জোয়ার এল। সে মনে মনে বলল, ‘মাবুদ, আমার এই জীবনটারে তুমি মেহেরের ভালোবাসা দিয়ে একবারে পূর্ণ কইরা দিলা।’

বাইরে কংস নদীর শান্ত পানি ফাল্গুনের ভোরের আলোয় ঝিলমিল করে উঠতে লাগল।

চলবে.......?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন