#হেমন্তের_ভেজা_রঙ
#শেষ_পর্ব
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
মাঘের কালবৈশাখী রূপ নেওয়া সেই ঝোড়ো রাতের পর কংস নদীর পাড়ে প্রকৃতির রূপ যেন রাতারাতি বদলে গেল। ওপারে মেঘালয় পাহাড়ের ওপরে যে ধূসর কুয়াশা জমে থাকত, তা হঠাৎ করেই উধাও হয়ে ফাল্গুনের নরম, মিষ্টি রোদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে। প্রকৃতির বিষণ্ণতা কেটে গিয়ে এক অদ্ভুত সজীবতা নেমে এসেছে পুরো পাঁচগাঁও গ্রামে। কংস নদীর ম্লান শ্যাওলা রঙের জল আজ ভোরের মিষ্টি রোদে সোনা গলানো রঙের মতো ঝিলমিল করছে। গ্রামের চারপাশের নিচু পশের খেতগুলোতে যে বোরো ধানের নতুন সবুজ চারা লাগানো হয়েছিল, সেগুলো ভোরের বাতাসে আনন্দে দোল খাচ্ছে। জহির গাজীর মেটে ঘরের বাঁশের টাটির ফাঁক গলে ফাল্গুনের সেই সোনাঝরা মিঠে রোদ এসে পড়েছে মাটির মেঝের ওপর। জহির আজ অনেক সকালে বিছানায় উঠে বসল। সারা শরীরের পেশিতে গত কয়েক দিনের হাড়ভাঙা খাটুনি আর মারাত্মক জ্বরের যে ধকল ছিল, তা যেন ফাল্গুনের প্রথম বাতাসের ছোঁয়ায় উধাও হয়ে গেছে। তার রোগা, পিটানো তামাটে শরীরে আজ কোনো ক্লান্তি নেই। তার তামাটে চেহারার রূক্ষ রেখাগুলোর পেছনে যে চিরন্তন বিষণ্ণতা লেপ্টে থাকত, সেখানে ফুট উঠেছে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। মনের গহীনে চার বছর ধরে জমে থাকা অপরাধবোধ আর অনুশোচনার যে ভারী পাথরটা তার শ্বাস আটকে রাখত, ঝড়ের রাতে মেহেরজানের নিরবচ্ছিন্ন সেবা আর অকৃত্রিম ক্ষমার পরশে তা চিরতরে ধুয়েমুছে ছাফ হয়ে গেছে। দাওয়ায় এসে দাঁড়াতেই জহিরের চোখে পড়ল এক অপূর্ব দৃশ্য। ফাল্গুনের প্রথম ভোরের মিঠে রোদে মেহেরজান উঠান লেপছে। ঝরঝরে মেটে উঠানে গোবর আর মাটির পাতলা প্রলেপ দিয়ে সে এমন নিখুঁতভাবে বাঁশের ঝাঁটু চালাচ্ছে, যেন কোনো পটু শিল্পী ক্যানভাসে ছবি আঁকছে। আঁচলটা কোমরে শক্ত করে জড়ানো, তার কপালে জমে উঠেছে ফোটা ফোটা ঘাম। ভোরের রোদ এসে পড়েছে তার শ্যাওলা কালো কপালে ও গালে। মেহেরজানের চালচলন, কাজ করার ভঙ্গি আর নিপুণতার ভেতরে কোনো কৃত্রিম সাজগোজ নেই, কিন্তু সেখানে আছে এক অপরিসীম পবিত্রতা। জহির নিঃশব্দে দাওয়ার বাঁশের খুঁটিতে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। তার বুকপকেটে সস্তার বিড়ির প্যাকেটটা ছোঁয়া সত্ত্বেও আজ আর বিড়ি ধরাতে ইচ্ছা করল না। সে কেবল একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার ঘরের এই নতুন লক্ষ্মীটির দিকে। মেহেরজান ঝাঁট দেওয়া শেষ করে ঝুড়িটা উঠানের কোণে রাখল। হঠাৎ চোখ তুলে তাকাতেই জহিরকে দাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে থমকে দাঁড়াল।
আগের সেই ভয়, আতঙ্ক কিংবা অপরাধীর মতো গুটিয়ে যাওয়ার ভাবটা মেহেরজানের মধ্যে আর কোথাও নেই। তার শান্ত, মায়াবী চোখের কোণে ফুটে উঠল এক পরম তৃপ্তি আর ভালোবাসার মিষ্টি আলো। সে আঁচল দিয়ে কপালে জমে থাকা ঘামটুকু আলতো করে মুছে নিল।
"আজ এত সাক্কালবেল্যা উঠলেন যে? শরীরডা কি এখনো দুর্বল লাগে? ঘরে যান, আমি জাউ ভাত চড়াইতাছি।” মেহেরজান তার সহজ, নরম ও ভেজা গলায় শুধাল।
জহির ধীরপায়ে দাওয়ার সিঁড়ি বেয়ে উঠানে নেমে এল। মেহেরজানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে তার খাদে নামানো, গভীর ও দাপুটে কণ্ঠে বলল, “না মেহের, শরীরে আজ আর কোনো ব্যথাবেদনা নাই। তোমার ওই সারা রাতের পানি ঢালা, সেবা আর মনে কোনো ক্ষোভ না রাখা মাফ করে দেওয়া রূপডা আমার মনের ভেতরের সব অন্ধকার দূর কইরা দিছে। আজ কত বছর পর আমার বুকডা হালকা লাগতাছে, আমি ভাষায় বুঝাইবার পারুম না।"
মেহেরজান লজ্জায় নিচু মুখে আঁচলের খুঁট আঙুলে পেঁচাতে লাগল। মেঝের মাটির দিকে তাকিয়ে সে মৃদু হেসে বলল, "আপনি সুস্থ হইছেন, আমার কাছে হেইডাই পরম আল্লার রহমত। আর কোনো কিছু ভাবনের দরকার নাই।"
জহির নিজের কাঁধে গামছাটা শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে বলল, “আজ ফাল্গুনের প্রথম দিন, আজ হাটে বড় বড় ব্যাপারীরা আইব। জোতদারদের কাছ থাইকা পশের বিলে বাঁধ দেওয়ার পাওনা মজুরির সব টেহা আজ মিলব। আজ আমি মহাজনের আড়তে যামু। কার্তিক মাস থাইকা জমতে থাকা বকেয়া সুদের শেষ কড়িডা আজ শোধ কইরা দিমু। আমার ঘরের আকাল আজ থাইকা চিরতরে শেষ, মেহের।" মেহেরজান চোখ তুলে তাকাল। জহিরের সেই রূক্ষ, আলকাতরার মতো কুচকুচে কালো চেহারার ভেতর আজ আর কোনো অভাবের দীনতা নেই সেখানে ফুটে উঠেছে এক অটল পুরুষালি দাপট।
মেহেরজান মনে মনে বলল, ‘মাবুদ, এই মানুষটার এই মেটে মনের ঘরডারে তুমি চিরকাল এমনই আলোয় ভইরা রাইখো।’
-
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামার মুখে পাঁচগাঁওয়ের কংস নদীর চরে জমকালো হাট বসেছে। নদীর ঘাটে সার সার নৌকা বাঁধা, চরের ওপর শাকসবজি, ধান-চাল, আর হাটের কাপড়ের ধাড়ি বসেছে। ফাল্গুনের রোদ মিষ্টি হলেও হাটের বাতাসে ধুলো আর মানুষের গমগম শব্দে এক সরগরম পরিবেশ তৈরি হয়েছে। জহির গাজী তার তামাটে রোগা শরীর নিয়ে হাটের ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল মহাজনের চালের আড়তের দিকে। তার পরনে তালি দেওয়া সুতির পুরোনো শার্ট আর কাচা ধুতি, কিন্তু তার হাঁটার মধ্যে ছিল এক মাথা উঁচু করে চলার তেজ। আড়তে পৌঁছে জহির পকেট থেকে খাটুনির পর পাওয়া সমস্ত কড়কড়ে টাকা বের করল। মহাজন খাতা খুলে চশমার ওপর দিয়ে তাকাল।
“কী রে জহিরা? সব দেনা একলগে শোধ করবি?” মহাজন কিছুটা অবাক হয়ে বলল।
“হ মহাজন,"জহির গম্ভীর কণ্ঠে বলল। "আমার মেহনতের টেহা। কার্তিক মাসের আকালের এক কড়ি দেনাও আমি ঘাড়ে রাখুম না। হিসাব কইরা পুরা টেহা বুইঝা নেন আর আমার নাম খাতা থাইকা কাটেন।"
মহাজন টাকার নোটগুলো গুনে নিয়ে সন্তুষ্ট চিত্তে খাতায় লাল কালি দিয়ে দাগ টেনে দিল। চার বছরের দেনার দায় থেকে জহির গাজী আজ সম্পূর্ণ মুক্ত।
মহাজনের আড়ত থেকে বের হয়ে জহির যখন হাটের মাঝখান দিয়ে হাঁটছিল, তখন আবার তার মুখোমুখি হলো মাতব্বরের বড় ছেলে মোতাহের মাতব্বর।
মোতাহের গায়ে দামী চাদর জড়িয়ে কয়েকটা চেলাচামণ্ডা নিয়ে হাটের মিষ্টির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। জহিরকে দেখে সে আবার সেই পুরোনো অহংকারী ভঙ্গিতে হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু মোতাহেরের চোখের ভেতরে ছিল এক ধরনের দ্বিধা। ৩য় পর্বে জহিরের সেই ভয়ংকর হুংকার সে এখনো ভুলতে পারেনি। তবে পাশে চেলাচামণ্ডা থাকায় নিজের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে মোতাহের তড়িঘড়ি কটু সুরে বলে উঠল, “কী রে জহিরা! শুনলাম মহাজনের দেনা শোধ করছিস? ঘরে তো শরিফানের পর অহন সেই কালা ছেড়ী মেহেররে নিয়া আছিস। তা দেনা শোধ কইরা অহন কি কালা বউয়ের লাইগ্যা সোনার গহনা কিনবি নাকি?"
হাটের চারপাশের দু-একজন পথচারী থমকে দাঁড়াল।
জহির গাজী থামল। সে মোতাহেরের দিকে ধীরপায়ে এগিয়ে গেল। জহিরের রোগা, কাদার মতো শক্ত তামাটে শরীরটার প্রতিটা পেশি টানটান হয়ে উঠল। তার গায়ের কুচকুচে কালো রঙের ওপর ফাল্গুনের রোদ এসে পড়ে যেন এক অদ্ভুত ধাতব দীপ্তি ছড়াচ্ছিল। জহির মোতাহেরের থেকে মাত্র এক হাত দূরত্বে এসে দাঁড়াল। সোজা মোতাহেরের ভীরু চোখের দিকে নিজের ক্ষুরধার দৃষ্টি স্থির রেখে খুব খাদে নামানো, হিমশীতল কণ্ঠে বলল, "মোতাহের সাব, আপনি বাপের টেহায় সোনার গহনা পাইছেন, ফর্সা গায়ের রঙ পাইছেন, কিন্তু মানুষের মতো একটা মন পান নাই। মেহেরকে আপনি গায়ের রঙ আর যৌতুকের লাইগ্যা গালি দিয়া বের কইরা দিছিলেন। আর আজ হেই মেহের আমার ভাঙা ঘরের আলো। সোনার গহনা দিয়া মানুষের মন মাপা যায় না, সম্মান দিয়া মাপা যায়। আপনি টেহার গরম দেখান, আর আমি ঘাম জড়ানো মেহনতের দাপট দেখাই। আজ থাইকা যদি কংস নদীর এই চরে আর কোনোদিন মেহেরের নাম নিয়া কোনো বাজে কথা আপনার মুখ থাইকা বাইর অয়, তবে ওই ফর্সা মুখডা এই চরের মেটে কাদায় কেমনে ডলতে অয় হেইডা এই জহির গাজী সশরীরে দেখাইয়া দিব।"
জহিরের গলার আওয়াজে এমন এক অপ্রতিরোধ্য পুরুষালি প্রতিজ্ঞা আর সততার হুংকার ছিল যে, মোতাহেরের ফর্সা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তার পাশের চামচারাও ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। পুরো হাটের মানুষ যেন জহিরের এই সততা আর ক্ষুরধার ব্যক্তিত্বের সামনে মোতাহেরকে একদম তুচ্ছ আর ছোট হতে দেখল। মোতাহের আর একটা কথাও না বাড়িয়ে চাদরটা গায়ে জড়িয়ে দ্রুত ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল। জহির গাজী গামছা দিয়ে ঘাড়ের ঘাম মুছে নিয়ে ধীরপায়ে হাটের কাপড়পট্টির দিকে পা বাড়াল। তার বুকের ভেতর আজ কোনো ক্ষোভ নেই, আছে কেবল এক আপন মানুষকে রূপময় করে তোলার আত্মতৃপ্তি।
-
হাটের কাপড়পট্টিতে থরে থরে নানা রঙের সুতির ও রেশমি শাড়ি সাজানো ছিল। জহির কোনোদিন শাড়ির দোকানে পা দেয়নি। তার জীবনের শখ-আহ্লাদ বলতে ছিল বিড়ি খাওয়া আর তিন বেলা পেট ভরে বাসি বা গরম ভাত খাওয়া। কিন্তু আজ তার রূক্ষ মেটে অন্তরে এক তীব্র বাসনা জেগে উঠেছে যে মেয়েটি তার সমস্ত অভাব-অনটন, ভাঙা ঘর আর বিষণ্ণ অতীতকে আপন করে নিয়েছে, তার জন্য কিছু একটা নিয়ে যেতেই হবে। জহির কাপড়ের দোকানে ঢুকে চোখ ঘোরাতে লাগল। হঠাৎ একটা সুতির লাল-পাড় ধবধবে রক্তরাঙা শাড়ির ওপর তার নজর আটকে গেল। শাড়িটার জমিন সাধারণ, কিন্তু রক্তরাঙা পাড়টায় এক অনাবিল গ্রামীণ সৌন্দর্যের ছোঁয়া আছে।
"মহাজন, এই লাল-পাড় শাড়িডা দেন তো।” জহির পকেট থেকে টাকা বের করে বলল।
দোকানদার শাড়িটি ভাজ করতে করতে মুচকি হেসে বলল, “ বউয়ের লাইগ্যা নিচ্ছ নাকি জহির? বেশ মানাইবো কিন্তু!"
জহির কোনো উত্তর দিল না। খালি তার রূক্ষ, তামাটে ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক পরম তৃপ্তির হাসি।
শাড়িটা একটা পরিষ্কার কাগজের পোঁটলায় পুরে নিয়ে জহির যখন হাটের পথ ছেড়ে নদীর পার ধরে হাঁটা দিল, তখন সূর্য মেঘালয় পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ডুবতে বসেছে। ফাল্গুনের মিঠে লালচে রোদ কংস নদীর পানিতে ছড়িপাল তুলে ছড়িয়ে পড়েছে।
হঠাৎ নদীর চরের এক কোণে, শ্যাওলা মাখা মেটে মাটির ওপর জহিরের নজর থমকে গেল। সেখানে কংস নদীর ভিজে পলিমাটিতে সতেজ হয়ে ফুটে আছে একগুচ্ছ সাদা বুনো কলমি ফুল।
ফুলগুলোর কোনো দামি সুবাস নেই, কোনো জাঁকজমক নেই, কোনো ফর্সা-কালোর অহংকার নেই। কিন্তু সেই বুনো প্রকৃতির বুকে ফুলগুলো যেন পরম অবহেলা সত্ত্বেও এক অপার সৌন্দর্য ছড়িয়ে বিকশিত হয়ে আছে। জহির হাঁটু গেড়ে নদীর ভিজে মাটিতে বসল। সে পরম মমতায় তার কড়া পড়া তামাটে হাত দিয়ে সাদা বুনো কলমি ফুলগুলো ডালসহ তুলে নিল। তারপর শাড়ির কাগজের পোঁটলা আর ফুলগুলো একসাথে বুকে জড়িয়ে ধরে ধীরপায়ে তার মেটে ঘরের দিকে রওনা দিল। তার মনে হতে লাগল, পৃথিবীর সব উপহারের চেয়ে এই রক্তরাঙা সুতির শাড়ি আর বুনো কলমি ফুলই মেহেরজানের পবিত্র মনটার সাথে সবচেয়ে বেশি মানাবে।
-
সন্ধ্যা নামার পর পাঁচগাঁও গ্রাম অন্ধকারে নিঝুম হয়ে গেল। মেহেরজান দাওয়ায় একটি মেটে প্রদীপ জ্বালিয়ে সলতেটা উঁচিয়ে দিল। হলুদ প্রদীপের লালচে আলোয় ঘরের বাতাস মিটমিট করে জ্বলছিল। মেহেরজান প্রদীপের পাশে বসে জহিরের আসার অপেক্ষা করছিল। এমন সময় উঠানে জহিরের পরিচিত জুতার মচমচ শব্দ পাওয়া গেল। কংস নদীর ভিজে হাওয়া গায়ে মেখে জহির দাওয়ায় এসে দাঁড়াল।
“মেহের..." জহির নরম ও কুণ্ঠিত গলায় ডাকল।
মেহেরজান ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়িয়ে দাওয়ায় এল। জহির তার হাত থেকে শাড়ির মোড়ানো পোঁটলাটা আর কংস নদীর চরের সেই সতেজ সাদা বুনো কলমি ফুলগুলো মেহেরজানের সামনে বাড়িয়ে দিল।
মেহেরজান একমুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার বড় বড় চোখ দুটো প্রদীপের আলোয় বিষ্ময়ে আর চকচকে জলে ভরে উঠল।
“এগুলা... এগুলা কী আনছেন ভাই?" মেহেরজান কাঁপা কণ্ঠে শুধাল।
জহির মাটির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত কুণ্ঠাভরে বলল,
"আমার তো তোমারে সোনার অলঙ্কার বা দামি অলংকার দিবার মতো কোনো সাধ্য নাই মেহের। গায়ের রঙ আর রূপ দেইখা তো একদিন তোমারে চিনবার পারি নাই... কিন্তু আজ হাটের থাইকা আসার সময় কংস নদীর চরের এই সাদা বুনো ফুলগুলো দেইখ্যা মনে হইল এগুলার কোনো ফর্সা-কালা নাই, রূপের দাপট নাই, কিন্তু কেমন এক অনাড়ম্বর সুবাস! আর এই লাল-পাড় শাড়িডা অতি সামান্য সুতির শাড়ি... তোমারে পরাওনের বড় সাধ অইল।"
মেহেরজান প্রদীপের ম্লান আলোয় সেই বুনো ফুলগুলোর দিকে আর রক্তরাঙা সুতির শাড়িটার দিকে তাকাল। তার বুকের ভেতরটা এক প্রচণ্ড আবেগে তোলপাড় করে উঠল। তার অতীত জীবনের কথা মনে পড়ে গেল প্রথম স্বামীর ঘরে গায়ের রঙের গঞ্জনা, যৌতুকের জন্য সোনার গহনা না পাওয়ার খোঁটা আর দিনের পর দিন লাঠির আঘাত। আর আজ? এই অতি সামান্য, রোগা, আলকাতরার মতো কালো কৃষক পুরুষটি তার জন্য বাজার থেকে সুতির শাড়ি আর নদীর চর থেকে বুনো ফুল তুলে এনে পরম লজ্জায় তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে! মেহেরজানের চোখের কোণ বেয়ে অঝোর ধারায় জলের ফোটা গাল বেয়ে নিচে পড়তে লাগল। সে কোনো কথা না বলে ফুলগুলো আর শাড়িটা পরম আকুলতায় নিজের বুকের ভেতরে সজোরে চেপে ধরল। মেহেরজান অশ্রুসজল চোখে জহিরের দিকে তাকিয়ে রুদ্ধশ্বাসে বলল,
"যে মানুষডা আমারে মান-সম্মান দিতে জানে, মানুষ হিসাব সম্মান করে তার দেওয়া এই বুনো ফুল আর সুতির শাড়ি আমার কাছে সোনার থাইকাও দামী ভাই! আমার আর কোনো অলঙ্কারের শখ নাই... আমি এই ভালোবাসা পাইয়া ধন্য।"
মেহেরজান শাড়িটা আর ফুলগুলো নিয়ে ঘরের ভেতরে গেল। কিছুক্ষণ পর মেহেরজান যখন ঘরের ভেতরের বাঁশের টাটির আড়াল থেকে বের হয়ে দাওয়ায় প্রদীপের আলোয় এসে দাঁড়াল, জহির গাজীর নিঃশ্বাস যেন একমুহূর্তের জন্য আটকে গেল।
মেহেরজান তার পুরোনো ময়লা শাড়িটা বদলে সেই ধবধবে রক্তরাঙা সুতির শাড়িটি পরেছে। তার শ্যাওলা কালো কপালে কোনো টিকলি বা টিপ নেই, কিন্তু তার চুলের খোঁপায় জড়ানো রয়েছে কংস নদীর সেই সাদা বুনো কলমি ফুল। প্রদীপের মিটমিটে আলোয় মেহেরজানকে মনে হচ্ছিল এক অনন্য। যার মধ্যে বাহ্যিক রূপের অহংকার নেই, কিন্তু আছে ভালোবাসার পরম সৌন্দর্য। জহির চোখ ফেরাতে পারল না। সে কেবল মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
-
ফাল্গুনের রাত আরও গাঢ় হয়ে এল। আকাশে তারার মেলা বসেছে, আর ওপারে মেঘালয় পাহাড়ের কোল ঘেঁষে নেমে আসা ফাল্গুনের মিষ্টি হাওয়া কংস নদীর জল ছুঁয়ে পাঁচগাঁওয়ের মেটে ঘরগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে। জহির আর মেহেরজান দাওয়ার মেঝের ওপর পাশাপাশি বসল। তাদের মাঝখান থেকে অতীতের সেই গঞ্জনা, লজ্জা, ভয় আর ভীতিগ্রস্ত দূরত্ব আজ চিরতরে মিলিয়ে গেছে। জহির তার রোগা, পিটানো, রোদপোড়া তামাটে হাতটা মেহেরজানের দিকে বাড়িয়ে দিল। যে হাত মেটে কাদায় খেটে খাটুনির কড়ায় শক্ত হয়ে গেছে, যে হাত কোনোদিন কোনো ফালতু রূপ-সুতা বোনেনি সেই হাত আজ পরম মমতায় খুলে ধরা। মেহেরজান কোনো দ্বিধা বা ভয় ছাড়া নিজের কোমল হাতটি জহিরের সেই রূক্ষ তামাটে মুঠোর ভেতরে সঁপে দিল। জহির মেহেরজানের হাতটি শক্ত করে চেপে ধরল যে বাঁধন ভয়ের নয়, চিরকালের জন্য ছায়া হয়ে পাশে থাকার।
জহির মেহেরজানের তৃপ্ত চোখের দিকে তাকিয়ে ধীর, গম্ভীর ও ভেজা কণ্ঠে বলল,
"মেহের, আমি কোনো রাজপুত্তুর না, কোনো পরিপূর্ণ মানুষ না। আমার এই তামাটে গায় মেদ নাই, রূপ নাই, বিদ্যা নাই। আমার ঘরে অভাবের তাড়না আছিল, আমার জীবনে শরিফানকে না বাঁচাতে পারার আর তোমারে ফিরিয়ে দেওয়ার বড় দাগ আছিল। কিন্তু তুমি যে আমার এই খালি, ভাঙা ভিটায় আইসা আমার অপূর্ণ জীবনডারে সম্মান জানালা, আমারে মানুষ হিসাব আশ্রয় দিলা তার লাইগ্যা বুকের শেষ রক্তবিন্দু দিয়া তোমারে ভালোবেসে যাওয়া ছাড়া এই জহির গাজীর আর যে কিছুই করার নাই।"
মেহেরজান জহিরের কথাগুলো শুনে পরম নির্ভরতায় তার মাথাটি জহিরের তামাটে চওড়া কাঁধের ওপর রেখে দিল। মেহেরজান মৃদু, ফিসফিস করা গলায় বলল, "রূপ আর ফর্সা চামড়া দিয়া কোনোদিন সংসার অয় না ভাই, ভালোবাসা অয় না। ভালোবাসা অয় মান-সম্মান দিয়ে, মন দিয়ে। আপনার এই তামাটে রূক্ষ চেহারার ভেতরে যে বিশাল পাহাড়ের মতো ছায়াদার মানুষডা লুকিয়ে আছে, তার পাইয়া আমার জীবনের সব দুঃখ ধুইয়া মুছে ছাফ অইয়া গেছে। আমার আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নাই।"*
ঘরের এক কোণে ঝুলতে থাকা শরিফানের সেই পুরোনো সুতির শাড়িটিতে আজ আর কোনো যন্ত্রণার ছায়া নেই সেখানে যেন এই দুটি ভাঙা মানুষের ভালোবাসার ওপর নেমে এসেছে এক পরম নীরব আশীর্বাদ।কংস নদীর স্নিগ্ধ বাতাস পাঁচগাঁও গ্রামের ওপর দিয়ে অনন্তকালের নদীস্রোতের মতো বয়ে যেতে লাগল। জহির গাজী আর মেহেরজান দুই অতি সাধারণ, রূপহীন, সমাজের চোখে অপূর্ণ মানুষ পরস্পরের সম্মান, মমতা আর আত্মিক অনুরাগের অকৃত্রিম ‘ভিজে রঙে’ চিরদিনের মতো পূর্ণতা লাভ করল।
(সমাপ্ত)