ফন্ট সাইজ:
থিম:
আই ডিজার্ভ ভিলেন

পর্ব-৮

লেখক: ফারহানা ইসলাম

৮•

বনলতা কুঞ্জ :
রায়িন গ্যারেজে গাড়ি পার্ক করে ধীর পায়ে লিফটের দিকে অগ্রসর হলো। গাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরই দ্বিতীয় গাড়ি পাঠানো হয়েছিল, সেটি নিয়েই সে বনলতা কুঞ্জে ফিরে এসেছে। চারপাশে থমথমে নীরবতা। কেবল তার জুতোর শব্দ গ্যারেজের দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলছে।
লিফটে প্রবেশ করেই রায়িন গ্রাউন্ড ফ্লোরের বাটনে প্রায় দশ সেকেন্ড ধরে চাপ দিয়ে রাখল। সাথে সাথে লিফটের বাটনগুলোর উপরে লুকিয়ে থাকা একটি ডিজিটাল স্ক্রিন জ্বলে উঠল। কালো স্ক্রিনে লাল অক্ষরে ভেসে উঠল—
ENTER PASSWORD
রায়িন দ্রুত পাসকোর্ড ইনপুট করতেই লিফটের দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই লিফট নিচের দিকে নামতে শুরু করল। এটা সাধারণ লিফট নয়— বনলতা কুঞ্জের সিক্রেট আন্ডারগ্রাউন্ডে যাওয়ার একমাত্র পথ।
কয়েক সেকেন্ড পর লিফট থামতেই ভারী দরজা খুলে গেল। অন্ধকারাচ্ছন্ন আন্ডারগ্রাউন্ডে প্রবেশ করল রায়িন। চারপাশে সশস্ত্র গার্ড দাঁড়িয়ে। তাকে দেখামাত্র সবাই মাথা নিচু করে গ্রিট করল।
রায়িন কোনো উত্তর না দিয়ে সোজা এগিয়ে গেল চেয়ারের সাথে বাঁধা সেন্সলেস লোকটার দিকে। লোকটার পুরো শরীর জখমে ভরা। ঠোঁট ফেটে রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে। মনে হচ্ছে কয়েক ঘণ্টা ধরেই নির্যাতন চলছে।
একজন গার্ড এগিয়ে এসে মাথা নিচু করে বলল,
___কিং, এই লোকটা পুলিশের স্পাই। উত্তরা জোনের পুলিশ সুপার ওকে হায়ার করেছিল বনলতা কুঞ্জের উপর নজর রাখতে।
গত দুইদিন ধরেই লোকটা বনলতা কুঞ্জের আশেপাশে ঘুরছিল। কিন্তু এখানে থাকা সিক্রেট গার্ডদের চোখ ফাঁকি দেওয়া সহজ ছিল না। শেষ পর্যন্ত ধরা পড়তেই হয়েছে।
রায়িন ঠান্ডা চোখে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। যেন মানুষের দিকে নয়, একটা মৃত জিনিসের দিকে তাকিয়ে আছে।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে ধীর গলায় বলল,
___পুলিশ সুপারকে আমার আন্ডারগ্রাউন্ডে আতিথেয়তার জন্য নিয়ে আসা হোক।
তারপর কয়েক সেকেন্ড থেমে আবার বলল,
___আর হ্যাঁ, এটাকে কেটে টুকরো টুকরো করে তুরাগ নদীতে ভাসিয়ে দাও। কোন এভিডেন্স রাখবে না।
কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠে এতটাই স্বাভাবিকতা ছিল, যেন সে কাউকে চা বানানোর নির্দেশ দিচ্ছে।
রায়িন আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। তৎক্ষণাৎ প্রস্থান করে সোজা চলে গেল জাফির এন্টারপ্রাইজে। কারণ সেখানে এখনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল সাইন করা বাকি।
---
জাফির এন্টারপ্রাইজ :
অফিসে প্রবেশ করে ফারহানে সোফায় হেলান দিয়ে বসা অবস্থায় বলে উঠল,
___ফারহান, যোগ্য কাউকে পেলে,,??
ফারহান বিরক্ত মুখে টাই খুলতে খুলতে উত্তর দিল,
___নোপ। আমার এখন ইমিডিয়েট শাওয়ারের প্রয়োজন। আবার তিনটা থেকে ইন্টারভিউ নিব। এই ফাইলগুলোতে তোমার সিগনেচার প্রয়োজন।
সে টেবিলের উপর থাকা কয়েকটা ফাইল রায়িনের দিকে এগিয়ে দিল।
রায়িন ফাইলগুলো না পড়েই একে একে সিগনেচার করতে লাগল। কারণ ফারহানের প্রতি তার অঘট বিশ্বাস রয়েছে।
একটা রাজ্যের যেমন রাজার প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন একজন বিশ্বস্ত মন্ত্রীর। আর রায়িন জানে— ফারহান তার সেই মানুষ, যে চোখ বন্ধ করেও তার সাম্রাজ্য সামলাতে পারবে।
ফারহান আগে থেকেই প্রতিটা ফাইল চেক করেছিল। তাই রায়িনের কোনো দ্বিধা নেই।
সব ফাইল সাইন করা শেষ হলে তারা দুজন বনলতা কুঞ্জের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল।
---
বনলতা কুঞ্জ :
গ্যারেজে গাড়ি পার্ক করে রায়িন লিফটের দিকে পা বাড়াতেই হঠাৎ কারো সাথে ধাক্কা খেল।
ধাক্কা খেয়েই তার রাগ মাথায় উঠে গেল। চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই কঠোর হয়ে উঠল।
সে দাঁত চেপে বলল,
___হেই,, are you following me..?? সকালের ঘটনা কি ভুলে গেছো,,??
রায়িনের ধমকে মেয়েটার অন্তরাত্মা পর্যন্ত কেঁপে উঠল। ভয়ে সে কয়েক কদম পিছিয়ে যায়।
রায়িন আরও কিছু অকথ্য ভাষা বলতে যাবে, ঠিক তখনই ফারহান বলে উঠল,
___রায়িন, সি ইজ ইওর ওয়াইফ।
পুরো গ্যারেজ জুড়ে মুহূর্তেই পিনপতন নীরবতা নেমে এলো।
হ্যাঁ, সকালে রায়িন যে অঙ্গনাকে চড় মেরেছিল, সে আসলে মুসকান।
আজ ভার্সিটিতে যাওয়ার সময় মুসকান কোনো ক্যাব পাচ্ছিল না। তাই সে ভেবেছিল মেইন রোডে গেলে হয়তো একটা গাড়ি পাবে। সেই ভেবেই হাঁটতে শুরু করেছিল।
বিপত্তি ঘটে ৯ নম্বর সেক্টরের এক নম্বর রোডে। রাস্তার দুই পাশেই স্কুল-কলেজ, আর সামনে বিশাল হাসপাতাল। ফুটপাত ছোট ছোট শিক্ষার্থীতে ভরা ছিল। তাই মুসকান ফুটপাত ছেড়ে রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটছিল।
রাস্তার দুই পাশে সারি সারি এম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে ছিল। ঠিক তখনই রাস্তার মাঝে দাঁড়ানো একটা কালো গাড়ি দেখে কৌতূহলবশত ভেতরে তাকানোর চেষ্টা করেছিল সে।
কিন্তু অসাবধানতাবশত রাস্তার মাঝখানে পড়ে থাকা একটা ইটের টুকরোয় পা লেগে যায় তার।
মুহূর্তের মধ্যে ভারসাম্য হারিয়ে সামনে থাকা গাড়ি থেকে সদ্য বের হওয়া পুরুষটার গায়ে গিয়ে পড়ে সে।
আর তারপরই ঘটে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।
রায়িনের হাতের চড় খেয়ে মুসকান এতক্ষণ একটা পার্কে বসেছিল। কান্না করে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছিল। মনটা একটু হালকা হতেই বাসায় ফিরছিল সে। কিন্তু ভাগ্য যেন আজ তাকে শান্তি দিতে নারাজ।
আবারও মুখোমুখি হয়ে গেল সেই ভয়ংকর মানুষটার।
ফারহানের কথায় মুসকান আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। দ্রুত লিফটে উঠে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে চলে গেল।
মুসকান চলে যেতেই ফারহান ঠোঁট চেপে দুষ্টু হাসল। তারপর বলল,
___রায়িন, তার মানে মুসকানই সকালের মেয়েটা,,??
___ইয়েস।
রায়িন এক শব্দেই উত্তর দিল।
ফারহান মুখ বুঝে হাসছে। কারণ অফিসে যখন রায়িন ফাইলগুলো সাইন করছিল, তখনই তার নজর গিয়েছিল রায়িনের স্কাই ব্লু শার্টের বুকের বাঁ পাশে।
সেখানে স্পষ্ট পিংক কালারের লিপস্টিকের দাগ লেগে ছিল।
রায়িনও ফারহানের দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজের শার্টের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায়। তৎক্ষণাৎ একটা টিস্যু নিয়ে দাগটা মুছার চেষ্টা করে, কিন্তু তা উঠে না।
তখন বাধ্য হয়েই সে ফারহানকে সকালের পুরো ঘটনাটা বলেছিল।
---
বনলতা কুঞ্জ আন্ডারগ্রাউন্ড :
রায়িন এবং ফারহান আবার আন্ডারগ্রাউন্ডে প্রবেশ করল।
চেয়ারের সাথে বাঁধা অবস্থায় ছিল উত্তরা জোনের পুলিশ সুপার রোকন হাওলাদার।
রায়িন সাধারণত অকারণে কারো গায়ে হাত তোলে না। কিন্তু আজ তার মাথা প্রচণ্ড গরম।
মুসকানের ভেজা চোখ দুটো বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আর সেই অস্থির রাগ গিয়ে পড়ল রোকনের উপর।
কোনো প্রশ্ন ছাড়াই সে রোকনকে মারতে শুরু করল।
এক মিনিটের মধ্যেই চারপাশ রক্তাক্ত হয়ে উঠল। রক্তে ভিজে গেছে রায়িনের হাত। পুলিশ সুপারের মুখ কাপড় দিয়ে বাঁধা ছিল, তাই সে চিৎকার করলেও শব্দ বের হচ্ছিল না।
ফারহান রায়িনের অবস্থা বুঝতে পেরে দ্রুত তাকে থামাল।
___রায়িন, স্টপ। হি উইল বি ডাই। আগে এভিডেন্স কালেক্ট করতে দাও।
রায়িন কয়েক পা দূরে সরে গেল। বুক ওঠানামা করছে তার। রাগে চোখ রক্তবর্ণ হয়ে আছে।
সে পকেট থেকে “ট্রেজার লন্ডন” ব্র্যান্ডের একটা সিগারেট বের করে আগুন ধরাল। গভীরভাবে ধোঁয়া টেনে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল।
তার চোখের সামনে শুধু মুসকানের ছলছল চোখ দুটো ভাসছে।
ফারহান রোকনের মুখের কাপড় খুলে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
___ডেমন হান্টার গ্রুপের টিম লিডার কে,,?
রোকন কিছুক্ষণ চুপ থেকে কাঁপা গলায় বলল,
___আই... আই ডোন্ট নো হিম। আমার ফোনে শুধু একটা মেসেজ এসেছিল, বনলতা কুঞ্জের উপর নজর রাখানোর জন্য।
ফারহান রায়িনের দিকে তাকাল।
রায়িন ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,
___ফারহান, সেন্ড দ্যাট নাম্বার টু বিনা। টেল হার টু ফাইন্ড আউট দিস নাম্বারস কারেন্ট লোকেশন।
ফারহান সাথে সাথে কাজ শুরু করল।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর বিনার কাছ থেকে যে খবর এলো, তা শুনে দুজনই থমকে গেল।
প্রতি দশ সেকেন্ড অন্তর অন্তর নাম্বারটার লোকেশন চেঞ্জ হচ্ছে। শুধু এক দেশের ভেতর নয়, বিভিন্ন দেশের লোকেশন শো করছে।
রায়িন নিচু স্বরে হেসে উঠল।
___আমি তো তাকে ইঁদুর ভেবেছিলাম… কিন্তু শালা তো একটা ধূর্ত শিয়াল।
সে কয়েক সেকেন্ড থেমে শয়তানি হাসি দিয়ে বলল,
___নো প্রবলেম। দুইটা জিনিসই গর্তে লুকিয়ে থাকে। ওকে গর্ত থেকে টেনে বের করার দায়িত্ব আমার।
রায়িন হাতের সিগারেটের অবশিষ্ট অংশটা মাটিতে ফেলে জুতোর নিচে পিষতে পিষতে বলল,
___বয়েজ, আগামীকালের নিউজে যেন একটা নিউ হেডলাইন যোগ হয়।
সবাই চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
রায়িন ধীর গলায় বলল,
___হেডলাইনটি হলো— “উত্তরা জোনের পুলিশ সুপার মো. রোকন হাওলাদার ডিউটিরত অবস্থায় মাইনর এক্সিডেন্টে নিহত হন। গাড়ি চালানোর সময় বিপরীত পাশ থেকে আসা একটি মালবাহী ট্রাক তাকে চাপা দেয়।”
কথাটা শুনে রোকন অনবরত মাথা নাড়তে লাগল। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
___আমাকে ছেড়ে দেন… প্লিজ… আমাকে মারবেন না…
রায়িন তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে একটা ডেভিলিশ হাসি দিল।
___হ্যাপি জার্নি।
বনলতাকুঞ্জে ফারহানের জন্য রায়িনের অ্যাপার্টমেন্টে আলাদা একটি রুম বরাদ্দ ছিল। ফারহান যখনই বাংলাদেশে আসে, তখন সেই রুমটিই ব্যবহার করে।
শাওয়ার শেষ করে মুসকান ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে হেয়ার ড্রায়ারের সাহায্যে ভেজা চুল শুকাচ্ছিল। হঠাৎই আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে থমকে যায় সে। ধীরে ধীরে হাত তুলে নিজের গালে স্পর্শ করল। সেখানে স্পষ্ট হয়ে আছে রায়িনের পাঁচ আঙুলের লালচে দাগ।
মুসকান ঠোঁট ফুলিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল,
___সে আমাকে চিনত না,,?? কখনো দেখেনি,,?? হায়রে কপাল! মানুষ নতুন বউয়ের মুখ দেখে দামি দামি উপহার দেয়, আর আমার স্বামী আমাকে দেখেই পাঁচ আঙুলের সীলমোহর বসিয়ে দিয়েছে!
অভিমান মিশ্রিত কথাগুলো বলেই সে আবার চুল শুকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ঠিক তখনই রুমের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল রায়িন।
মুসকান তড়িঘড়ি করে হেয়ার ড্রায়ারটা নিচে রেখে নিজের ড্রেসের দিকে তাকাল। নাহ্, সব ঠিকই আছে। সাদা একরঙা জর্জেটের আনারকলির উপর শীতের কারণে গাঢ় ভেলভেট রঙের সোয়েটার জড়িয়ে নিয়েছে সে। তবুও অজানা এক অস্বস্তিতে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
রায়িন রুমে ঢুকেই থমকে গেল। চারপাশে এক মিষ্টি ঘ্রাণ ভেসে বেড়াচ্ছে। সেই একই ঘ্রাণ, যেটা সে প্রথম দিনও পেয়েছিল।
তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে গিয়ে আটকালো মুসকানের ভেজা চুলের উপর। হাটু ছাপিয়ে নেমে আসা কালো চুলগুলো যেন পানির ফোঁটায় ঝলমল করছে।
রায়িন নিজের অজান্তেই মনে মনে বলে উঠল,
___এই মিষ্টি ঘ্রাণের উৎস তাহলে এই মেয়েটার চুল,,??
তার গভীর দৃষ্টি মুসকানের উপর স্থির হয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর ঠোঁট নড়ে উঠল,
___রাপুনজেল...!
মুসকান ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
___কিছু বললেন,,??
রায়িনের ধ্যান ভাঙল। সে দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
___ইটস মাই রুম।
মুসকান ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল,
___ওহ্ সরি। আমি জানতাম না। আমি অন্য কোনো রুমে চলে যাচ্ছি।
___নো নিড।
___কিন্তু এখানে তো কোনো কাউচও নেই। আর এই শীতে নিচে ফ্লোরে ঘুমানোও সম্ভব না।
রায়িন বিরক্ত চোখে তাকিয়ে বলল,
___এই মেয়ে! রাত এখনো হয়নি। এত আগেই ঘুমের চিন্তা শুরু করে দিয়েছো,,??
তারপর পকেট থেকে একটা অয়েন্টমেন্ট বের করে মুসকানের দিকে বাড়িয়ে দিল।
___এটা লাগাও। তোমার গালের দাগ আর ব্যথা দুটোই কমে যাবে।
কথাটা বলেই আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে শাওয়ার নেওয়ার উদ্দেশ্যে বাথরুমে ঢুকে গেল সে।
মুসকান নিজের হাতে থাকা মলমটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ফেলল। গাল দুটো অকারণেই লাল হয়ে উঠেছে।
নারী ভালোবাসলে কতটা বেহায়া হতে পারে, সেটা হয়তো এই মুহূর্তে মুসকানকে না দেখলে বোঝা যেত না।
শাওয়ার শেষে রায়িন ও ফারহান দুজনেই ফরমাল ড্রেস পরে অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে যায়। মুসকান অনেক অনুরোধ করেছিল অন্তত খাবার খেয়ে যেতে। কিন্তু রায়িনের একটাই জবাব,
___আমি বাংলাদেশি খাবার খাই না।
মুসকানের মুখটা সঙ্গে সঙ্গে মলিন হয়ে যায়। সে নিচু স্বরে বিড়বিড় করে,
___হুমম... যেন বিদেশি রাজপুত্র!
---
বিকেল চারটা, জাফির এন্টারপ্রাইজ :
লাঞ্চ ব্রেকের পর থেকেই একের পর এক ইন্টারভিউ নিচ্ছে ফারহান। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কাউকেই তার যোগ্য মনে হয়নি। এত বড় একটা পোস্ট, সেখানে দক্ষ আর যোগ্য কাউকে ছাড়া দায়িত্ব হ্যান্ডওভার করা সম্ভব না।
বিরক্তি নিয়ে ফারহান ইন্টারভিউ রুম থেকে বের হয়ে করিডোর ধরে নিজের কেবিনের দিকে এগোচ্ছিল। একটা প্রয়োজনীয় ফাইল দরকার ছিল তার।
করিডোরের এক পাশে লিফট। ফারহান নিজের মতো হাঁটছিল। ঠিক তখনই ‘টিং’ শব্দ করে লিফটের দরজা খুলে যায়।
সেখান থেকে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে আসে এক রমণী। মেয়েটা হাতঘড়ির দিকে তাকাতে তাকাতে সামনের দিকে ছুটছিল। ডানে-বামে তাকানোরও সময় নেই তার।
আর পরের মুহূর্তেই—
ধাক্কা!
দুজনের মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। কোমল নারীদেহটা শক্তপোক্ত পুরুষালী শরীরের সাথে ধাক্কা খেয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। পড়ে যাওয়ার উপক্রম হতেই সে তড়িঘড়ি করে খামচে ধরে ফারহানের শার্ট।
ফারহান একদম স্থির। না সে মেয়েটাকে ধরল, না নিজে নড়ল।
কিন্তু মেয়েটার সমস্ত ভর গিয়ে পড়ে তার শার্টের উপর। ফলে সাথে সাথেই সাদা শার্টের ওপরের তিনটা বোতাম ছিঁড়ে মেঝেতে পড়ে যায়।
ফারহানের মুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে ওঠে।
সে বিরক্ত হয়ে এক ঝটকায় মেয়েটার হাত সরিয়ে দেয়। তাল সামলাতে না পেরে মেয়েটা এবার সত্যিই ফ্লোরে পড়ে যায়।
ফারহান কোনো ভ্রুক্ষেপ না করেই সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
আর মেঝেতে বসে থাকা মেয়েটা মুগ্ধ চোখে তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
মনে মনে বিড়বিড় করল,
___হাউ রুড... বাট হ্যান্ডসাম অলসো।
সে বসে বসেই ব্লাশ করতে থাকে। হঠাৎ কী মনে হতেই তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল।
___হলি শিট, সুহা! আই এম গেটিং লেট ফর ইন্টারভিউ!
তারপর আবার নিজেই বিড়বিড় করল,
___বাট একবার জবটা পেয়ে গেলে... এই চিকনা আমার!
বলেই আবার দৌড় লাগাল সুহা।
ওর নাম সুহা জায়েদার। উচ্চতা পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি। গায়ের রং ফর্সা, শরীরের গঠন চিকন। পানপাতার মতো মুখশ্রী, গোলাপের পাপড়ির ন্যায় ঠোঁট, আর কদম ফুলের মতো বড় বড় চোখ। হাসলে দুই গালে গভীর টোল পড়ে। সেই হাসি যে কাউকে মুহূর্তেই ঘায়েল করার জন্য যথেষ্ট।
বয়স পঁচিশ। সদ্য এমবিএ কমপ্লিট করেছে দারুণ রেজাল্ট নিয়ে।
আর একটা পরিচয়ও আছে—
সে সায়ান জায়েদারের ছোট বোন।
এখন প্রশ্ন হলো, এত বড়লোকের মেয়ে অন্যের কোম্পানিতে চাকরি করতে চায় কেন?
উত্তর একটাই—শখ।
তার ভাইয়ের মতোই আজব শখ তার।
কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর একজন অফিস স্টাফ এসে বলল,
___মিস জায়েদার, নেক্সট আপনার টার্ন।
সুহা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে ইন্টারভিউ রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
___মে আই কাম ইন, স্যার,,??
ফারহান এক নজর তাকিয়েই ঠান্ডা গলায় বলে উঠল,
___রিজেক্টেড। ইউ মে গো নাউ।
সুহা চোখ বড় বড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ল। অনুমতির অপেক্ষাও করল না। এক নিঃশ্বাসে বলা শুরু করল,
___স্যার, ইউ ক্যান’ট ডু দিস উইথ মি! আপনি আমার ইন্টারভিউ না নিয়েই আমাকে রিজেক্ট করতে পারেন না। সামান্য ভুলের জন্য কারো অধিকার কেড়ে নেওয়া ঠিক না। জানেন, এখানে পৌঁছাতে আমার কত কষ্ট হয়েছে?
সে একটানা বলতে থাকে।
___গতরাতে আপনারা সার্কুলার দিয়েছেন। আমি সেটা দেখেছি আজ সকালে। তখন আমি চট্টগ্রামে ছিলাম। তড়িঘড়ি করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিই। এয়ারপোর্টে গিয়ে দেখি সব ফ্লাইট বুকড। ভাগ্য ভালো, একজন টিকিট ক্যানসেল করেছিল। তারপর ফ্লাইট দুই ঘণ্টা ডিলে! ঢাকা এসে জ্যাম ঠেলে এখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দেরি হয়ে গেল। শেষে গাড়ি ছেড়ে দৌড়ে এখানে আসি। আর তখনই আপনার সাথে ধাক্কা লাগে।
সুহা এবার একটু থামল। তারপর শান্ত স্বরে বলল,
___সরি, স্যার।
ফারহান বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করল। তার মাথা ধরে যাচ্ছে। একটা মানুষ এত কথা কীভাবে বলতে পারে!
সে নিচু স্বরে বলল,
___সুকা। ( বিচ ইন রাশিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ) 
___নাহ্ স্যার, সুহা। সুহা জায়েদার। সাবজেক্ট বিজনেস এন্ড ম্যানেজমেন্ট। এই বছর এমবিএ কমপ্লিট করেছি।
বলেই ফাইলটা এগিয়ে দিল সে।
___মে আই সিট, স্যার,,??
___ইউ ক্যান।
ফারহান ফাইলের দিকে নজর বুলাতে লাগল। ধীরে ধীরে তার বিরক্তিও কিছুটা কমে এল।
___ইন্টারেস্টিং। ইউকে থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন। সেখানে জব অফারও পেয়েছেন। তাহলে সেই জবটা করেননি কেন?
সুহা মুচকি হেসে উত্তর দিল,
___স্যার, আমার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের টপ আর্নড কোম্পানিগুলোর একটায় কাজ করব। আর কোম্পানিটা হবে ফরেইন বেজড। সার্চ করতে গিয়েই জাফির এন্টারপ্রাইজ সম্পর্কে জানতে পারি। রাশিয়াতে মেইন অফিস, অথচ ওখানে সব বাঙালি কাজ করে—বিষয়টা আমার খুব ভালো লেগেছে।
ফারহান আরও কিছু প্রশ্ন করল।
সুহা প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর আত্মবিশ্বাসের সাথে সুন্দরভাবে গুছিয়ে দিল।
অবশেষে ফারহান ফাইলটা বন্ধ করে বলল,
___আচ্ছা, মিস জায়েদার। আপনি এখন যেতে পারেন। কোম্পানি থেকে আপনাকে ইনফর্ম করা হবে।
___থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার।
সুহা দরজার কাছে গিয়ে আবার পিছনে ঘুরে দাঁড়াল। ঠোঁটে দুষ্টু হাসি এনে বলল,
___স্যার... ইউ আর টু মাচ হ্যান্ডসাম।
ফারহান প্রথমবারের মতো ঠিকভাবে তাকাল মেয়েটার দিকে।
কালো রঙের লং আনারকলি, গলায় মাল্টিকালার ওড়না, ঠোঁটে হালকা ন্যুড লিপস্টিক। কানে সিলভার ইয়াররিং। মাঝখান সিঁথি করে ছেড়ে রাখা কোমর ছোঁয়া চুল। আর কপালের মাঝখানে ছোট্ট কালো টিপ।
মেয়েটার গালে টোল পড়া হাসিটা অদ্ভুতভাবে চোখে লেগে রইল তার।
সুহা দৌড়ে বেরিয়ে যেতেই ফারহানের নজর পড়ে নিজের সাদা শার্টে।
সেখানে হালকা রক্তের দাগ।
সুহা পড়ে যেতে গিয়ে যখন শার্ট আঁকড়ে ধরেছিল, তখন তার নখের আঁচড়ে কেটে গিয়েছিল জায়গাটা।
ফারহান কয়েক সেকেন্ড দাগটার দিকে তাকিয়ে থেকে হালকা হাসল।
তারপর খুব আস্তে বিড়বিড় করল,
___মিস বকবক। 
রাত প্রায় এগারোটা। চারদিকের নিস্তব্ধতা ভেদ করে বনলতা কুঞ্জে ফিরল রায়িন আর ফারহান। এ্যাপার্টমেন্টের ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করতেই ক্লান্ত ভঙ্গিতে কোট খুলতে খুলতে রায়িন বলল,
___শি ইজ ট্যালেন্টেড, ফারহান। ইউ মে সিলেক্ট হার।
ফারহান ভ্রু কুঁচকে জুতা খুলতে খুলতে উত্তর দিল,
___বাট রায়িন, মেয়েটা অতিরিক্ত কথা বলে।
রায়িন নির্লিপ্ত গলায় বলল,
___এটা মেয়েদের নেচার।
ঠিক তখনই তাদের কথার মাঝখানে বাম হাত ঢুকিয়ে মুসকান সামনে এসে দাঁড়াল। চোখ দুটো কুঁচকে রাগী গলায় বলল,
___মেয়েরা বেশি কথা বলে,,??
রায়িন এবার ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে হালকা বিদ্রুপ টেনে বলল,
___অন্য মানুষের কথার মধ্যে বাম হাত ঢোকানোটাও মেয়েদের আরেকটা বিশেষ গুণ।
কথাটা স্পষ্টভাবেই মুসকানকে মিন করে বলা। কিন্তু সে যেন কিছুতেই হার মানার মেয়ে নয়। নাকের আগা ফুলিয়ে রাগী ভঙ্গিতে তাদের সামনের সোফায় গিয়ে বসে পড়ল।
___মেয়েরা বেশি কথা বলে, হ্যাঁ,,?? আর কথার মধ্যে বাম হাত ঢুকায়,,?? প্রতিটা ঘরের মা একজন মেয়ে, বউ একজন মেয়ে, বোন একজন মেয়ে, কন্যা সন্তানও একজন মেয়ে। আর অফিসের ইমপ্লয়িদের মধ্যে পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন পার্সেন্টই মেয়ে। এইসব ইরিটেটিং মেয়েদের হাত থেকে বাঁচতে চাইলে ভেনাস বা মার্চে গিয়ে বাসা বানিয়ে থাকেন।
মুসকানের রাগী মুখ আর কথার স্টাইল দেখে ফারহান মৃদু হেসে ফেলল।
___রায়িন, ইউ আর রাইট। আমি ওই মেয়েটাকেই সিলেক্ট করছি। আমি তাকে মেইল পাঠিয়ে আসছি।
রায়িনও হয়তো হাসতে চেয়েছিল। কিন্তু তার অভিব্যক্তিহীন মুখে হাসিটা ঠিক মানায় না। তাই কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সোজা নিজের রুমে চলে গেল। ফারহানও তার পেছন পেছন রুমে চলে যায়।
মুসকান হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল। তারপর নিজের গালে হাত দিয়ে ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে বলল,
___যাদের জন্য এত কষ্ট করে রান্না করলাম, তারা ঘরে ঢুকেই আমাকে এভাবে অপমান করলো,,?
হতাশ ভঙ্গিতে মাথা দোলাল সে।
আজ সারাদিন ইউটিউব বাবাজীবনের সাহায্যে রায়িন আর ফারহানের জন্য রাশিয়ান খাবার রান্না করেছে মুসকান। রান্নাঘর এলোমেলো করে, কয়েকবার স্বাদ নষ্ট করে আবার নতুন করে বানিয়েছে। শুধুমাত্র একটা ছোট্ট প্রশংসার আশায়।
হঠাৎ ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টানার শব্দে তার দৃষ্টি সেদিকে গেল। সেখানে ফারহানকে বসে থাকতে দেখে মুসকানের মুখে সাথে সাথে হাসি ফুটে উঠল। দ্রুত গিয়ে খাবার সার্ভ করতে লাগল।
আজ সে রাশিয়ার বিখ্যাত সুপ Borscht, মিট ডাম্পলিংস আর Olivier Salad তৈরি করেছে।
ফারহান এক চামচ সুপ মুখে দিয়েই অবাক হয়ে গেল। চোখ বড় বড় করে বলল,
___আমি অনেক রেস্টুরেন্টে এই সুপ ট্রাই করেছি। ইভেন আমাদের মেনশনের কুকের হাতেরটাও অনেকবার খেয়েছি। বাট বিলিভ মি, এইটার ফ্লেভার, কালার, টেস্ট সবকিছুই আলাদা। তোমার হাতেরটা বেস্ট।
প্রশংসা শুনে মুসকানের মুখটা ঝলমল করে উঠল। সে মুচকি হেসে বলল,
___আমি আপনার ছোট বোনের মতো, আর আপনি আমাকে আপনি আপনি বলে সম্বোধন করছেন। আমাকে আপনার ছোট বোন ভাবতে পারেন না,,??
ফারহান কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুচকি হাসল। তারপর নরম গলায় বলল,
___ওকে ফাইন, তুমি করে বলবো। ঠিক বলেছ। আমার ছোট বোন নীলাঞ্জনা মির্জা তোমার বয়সী। আজ থেকে তুমিও আমার একটা বোন।
মুসকানের মনটা অকারণেই ভালো হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর ফারহান আবার জিজ্ঞাসা করল,
___তুমি খেয়েছ,,??
মুসকান চুপ করে রইল।
ফারহান ভ্রু তুলে আবার বলল,
___রায়িনের জন্য অপেক্ষা করছো,,?? তোমার কি মনে হয় ও তোমার অপেক্ষার মূল্য দিবে,,??
মুসকান ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
___আসলেই গোমড়ামুখো একটা। হাসতেই পারে না। মনে হয় আমার শাশুড়ি ওকে ছোটবেলায় মধুর বদলে কালমেঘ বা চিরতার নির্যাস খাইয়েছে।
ফারহান হেসে ফেলল।
___ও আগে এরকম ছিল না। লাস্ট পাঁচ বছর আগে ওকে ঠিকমতো হাসতে দেখেছিলাম।
মুসকান ব্যঙ্গভরা চোখে বলল,
___এই গোমড়ামুখো লোকটার সাথে আপনি থাকেন কিভাবে,,??
কিছুটা থেমে নাটকীয় ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
___হররেবল।
ফারহান এবার মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
___ও এমন ছিল না। পরিস্থিতি ওকে এমন বানিয়েছে।
মুসকান শান্ত গলায় বলল,
___মানুষ যখন নিজের কাছে নিজে হেরে যায়, তখন পরিস্থিতির দোষ দেয়।
কথাটা শুনে ফারহান কয়েক সেকেন্ড চুপ হয়ে গেল। তারপর ইচ্ছে করেই টপিক পাল্টে বলল,
___বাই দ্যা ওয়ে, হাউ ডিড ইউ নো ইটস রায়িন’স ফেভরেট ফুড,,??
মুসকান দুষ্টুমিভরা হাসি দিয়ে উত্তর দিল,
___সিক্স সেন্স। ভ্যাম্পায়ার কিংডমের কিং তো ব্লাড লাইক করবে এটা তো স্বাভাবিক।
তার কথায় দু’জনেই হেসে উঠল।
আসলে Borscht সুপটা বিটরুট আর মাটনের তৈরি। গাঢ় লাল রঙের জন্য দেখতে অনেকটা রক্তের মতো লাগে।
ফারহান আর মুসকানকে একসাথে এভাবে হাসতে দেখে দূর থেকে একজোড়া চোখে অদ্ভুত অস্বস্তি খেলে গেল।
রায়িন ধীর পায়ে ডাইনিং এরিয়ায় প্রবেশ করল। শার্টের স্লিভস কনুই পর্যন্ত গুটাতে গুটাতে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করল,
___ফারহান, রাশিয়ার পেন্ডিং ডিলগুলোর কি হলো,,??
ফারহান চপস্টিক দিয়ে মিট ডাম্পলিংস মুখে দিতে দিতে উত্তর দিল,
___শিন আজ রাশিয়া ফিরলে তারপর সেগুলো দেখা হবে।
রায়িনের গম্ভীর মুখ দেখে সে আবার বলল,
___ধীর আর বিনা ডিলগুলো হ্যান্ডেল করতে পারত। কিন্তু চাইনিজ কোম্পানিগুলোর সাথে ডিল শিনই তো করে।
রায়িন কোনো উত্তর দিল না।
তার দৃষ্টি বারবার মুসকানের দিকে চলে যাচ্ছে। ফারহানের সাথে মেয়েটার এত সহজ আর কমফোর্টেবল হাসি-ঠাট্টা তার ভেতরে অদ্ভুত এক অস্বস্তি তৈরি করছে। যেটার ব্যাখ্যা সে নিজেও জানে না।
ফারহান এবার রায়িনকে ডিনারের জন্য বলল।
রায়িন-আল-জাফির কারো রিকোয়েস্ট রক্ষা করার জন্য বাধ্য নয়। প্রথমে রাজি না হলেও মুসকানের অনুরোধে শেষমেশ চেয়ারে গিয়ে বসল সে। যেন সে মেয়েটার কথা ফেলতে পারল না। 
তবে পুরো খাবারের মধ্যে শুধু সুপটাই শেষ করল রায়িন। তারপর চুপচাপ উঠে নিজের রুমে চলে গেল।
মুসকানের মনটা আবার খারাপ হয়ে গেল। সে ভেবেছিল অন্তত একটা ছোট্ট কমপ্লিমেন্ট তো দিবে লোকটা। একটা “ভালো হয়েছে” বললেও কি খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যেত,,??
মুসকানের বেজার মুখ দেখে ফারহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
___রায়িন পুরো স্যুপটা ফিনিশ করেছে। তারমানে বোঝাই যাচ্ছে কতটা মজাদার হয়েছে। ওর থেকে কিছু আশা করোনা। দিনশেষে তোমার এক্সপেক্টেশন তোমাকেই কষ্ট দেবে।
কথাটা বলেই ফারহান নিজের রুমে চলে গেল।
ডাইনিং টেবিলে একা বসে রইল মুসকান। বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে আসছে।
লোকটা হার্টলেস হোক, তবুও তো সে তার হাজবেন্ড। প্রতিটা মেয়েরই নিজের পার্টনারকে নিয়ে ছোট ছোট স্বপ্ন থাকে। হয়তো সব স্বপ্ন সত্যি হয় না। তবুও আজ যদি রায়িন তার রান্না নিয়ে একটা শব্দেরও প্রশংসা করত, তাহলে কি দুনিয়ার নিয়ম বদলে যেত,,??
ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছে, ছেলেদের মনের রাস্তা নাকি পেট দিয়ে শুরু হয়। তাই তো আজ এত চেষ্টা। এত আয়োজন।
কিন্তু বোকা হরিণীটা জানেই না, পাথরের বুকে ফুল ফোটানো এত সহজ নয়।
তার মাথায় শুধু একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খেতে লাগল—
রায়িন কি কখনোই ভালোবাসবে না ওকে,,??
নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করতে করতে একসময় টেবিলের উপর মাথা রেখে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ল মুসকান। 
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব-৮ শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন