ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিদা-এ-জুলমাত

পর্ব-১

লেখক: ফারহানা ইসলাম

১•

রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা।
ওয়েস্টহেভেন সিটির প্রান্তে অবস্থিত পুরোনো শিল্পাঞ্চলটা এই সময়টায় একেবারেই জনমানবশূন্য হয়ে যায়। সারি সারি পরিত্যক্ত গুদামঘর, ভাঙাচোরা কনটেইনার আর আধভাঙা স্ট্রিটলাইটের নিচে পুরো এলাকাটা যেন অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতায় ডুবে থাকে। দূরে কোথাও কুকুরের ডাক ভেসে আসে, আর ঠান্ডা বাতাসে উড়ে যাওয়া শুকনো পাতার শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না।
সিনিয়র পুলিশ অফিসার আয়াজ রিজভি সারাদিনের কাজ শেষ করে থানা থেকে নিজের বাইকে বাড়ি ফিরছিল। গত কয়েকদিন ধরে টানা তদন্তে তার মাথাটা ভার হয়ে আছে।
ওয়েস্টহেভেনে একের পর এক তরুণীর মৃতদেহ উদ্ধার হচ্ছে। প্রতিটি লাশের অবস্থা ভয়াবহভাবে একই। শরীরজুড়ে অসংখ্য আঁচড়ের দাগ। রক্তের একফোঁটাও নেই। আর মৃতদেহগুলো অস্বাভাবিকভাবে ফ্যাকাশে... যেন শরীরের প্রতিটি বিন্দু রক্ত কেউ শুষে নিয়েছে। ফরেনসিক রিপোর্টে কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা নেই।
থানার অনেকেই ফিসফিস করে বলছে— "এটা মানুষের কাজ নয়।" কেউ বলছে এটা সুপার ন্যাচরাল পাওয়ারের কাজ।কেউ বলছে অশুভ আত্মা। আয়াজ এসব শুনে শুধু হাসে। সে অতিপ্রাকৃত ব্যাপারে বিশ্বাস করে না। তার কাছে প্রতিটি রহস্যের পেছনেই থাকে কোনো না কোনো যৌক্তিক, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
-------------
সে ড্রাইভ করছিল ঠিক তখনই...তার বাইকের হেডলাইটের আলো পড়ল রাস্তার একপাশে। একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আয়াজ ভ্রু কুঁচকে ব্রেক কষল।এত রাতে? এত নির্জন জায়গায় একটি একা মেয়ে?
আয়াজ বাইক স্ট্যান্ডে রেখে ধীরে ধীরে মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেল।
— এই মেয়ে...! এত রাতে এখানে কী করছ?
মেয়েটি ধীরে ধীরে তার দিকে ফিরে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্য আয়াজ স্থির হয়ে গেল। মেয়েটির মুখটা অস্বাভাবিকভাবে উজ্জ্বল। মনে হচ্ছিল না সে শুধু মেকআপ করেছে। বরং যেন তার ত্বকের ভেতর থেকেই নীলাভ আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে।
তার কোমর ছাড়িয়ে নামা গাঢ় নীল চুলগুলো বাতাসে দুলছে। প্রতিটি গোছা এমনভাবে ঝিলমিল করছে, যেন সূক্ষ্ম নীল ক্রিস্টাল দিয়ে তৈরি। তবু আয়াজ নিজের সন্দেহকে যুক্তি দিয়ে চাপা দিয়ে দিল।আজকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রেশার্স পার্টিতে কত রকম কস্টিউমই তো পরে। ব্লু হেয়ার, গ্লিটার মেকআপ... এগুলো নতুন কিছু নয়। হয়তো কোনো অনুষ্ঠানে গিয়েছিল। হয়তো পথ হারিয়ে ফেলেছে।
সে স্বাভাবিক গলায় বলল,
— তুমি কোন কলেজে পড়ো?... না, কলেজ না... মনে হচ্ছে ভার্সিটির ফ্রেশার। তাই তো?
মেয়েটি কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু স্থির দৃষ্টিতে আয়াজের দিকে তাকিয়ে রইল। তার সেই চোখজোড়া.. অদ্ভুত। মণিগুলোও যেন নীল আলোয় জ্বলছে। পরনে রাজকীয় নীল রঙের লম্বা গাউন। এত স্তরের কাপড় যে দেখলেই মনে হয় পোশাকটার ওজন বিশ কেজির কম নয়। তবুও তাকে দেখে মনে হচ্ছে না সে বিন্দুমাত্র ভার অনুভব করছে।
আয়াজ আবার বলল,
— কথা বলতে পারো না? তোমার নাম কী?
নীরবতা।
— বাসা কোথায়? চাইলে আমি পৌঁছে দিতে পারি। চিন্তা করো না... আমি পুলিশ।
সে পেছনে ঘুরে নিজের বাইকের দিকে ইশারা করল।
— ওই যে... আমার বাইক। চলো।
মাত্র এক সেকেন্ড। এক সেকেন্ডেরও কম। আয়াজ আবার সামনে তাকাতেই... মেয়েটি নেই। একেবারেই নেই। পুরো রাস্তা ফাঁকা। চারদিকে শুধু ঠান্ডা বাতাস বইছে। আয়াজ দ্রুত আশেপাশে তাকাল। গুদামঘরের আড়ালে, রাস্তার দুই পাশে, ভাঙা দেয়ালের পাশে, কোথাও কেউ নেই। তার বুকের ভেতর হালকা ঠান্ডা একটা অনুভূতি নেমে এল।অসম্ভব। একজন মানুষ এভাবে মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে না।
সে নিজের কপালে হাত বুলিয়ে হালকা হেসে বলল,
— হ্যালুসিনেশন। সারাদিনের চাপ মাথায় উঠে গেছে মনে হয়... আর কয়দিন এভাবে চললে সত্যিই পাগল হয়ে যাবি, আয়াজ।
বিষয়টা আর না ভেবে সে আবার বাইকে উঠে বসল।ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই দূরের অন্ধকারে কোথাও যেন খুব ক্ষীণ একটা নীল আলো ঝলসে উঠল... কিন্তু সেটা তার চোখ এড়িয়ে গেল। টানা কয়েকদিন ধরে একই কেস নিয়ে সে কাজ করছে। ঠিকমতো ঘুম নেই, খাওয়া নেই। এমন অবস্থায় চোখের ভুল হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
 
বাইকটা ধীরে ধীরে অন্ধকার রাস্তা ছেড়ে দূরে মিলিয়ে গেল। ঠিক তখনই... একটি ছোট্ট নীল প্রজাপতি কোথা থেকে উড়ে এসে নিঃশব্দে আয়াজের কাঁধে বসে পড়ল। প্রজাপতিটির ডানাগুলো সাধারণ ছিল না। তার ভেতর থেকে মৃদু নীলাভ আলো বের হচ্ছিল।আলোটা এতটাই ক্ষীণ যে বাইক চালাতে থাকা আয়াজ তা টেরই পেল না। প্রজাপতিটি যেন তাকে অনুসরণ করেই উড়ে চলল।
------
আয়াজ চলে যাওয়ার মিনিটক্ষানিক পর... গুদামঘরের সামনের অন্ধকারটা অস্বাভাবিকভাবে কেঁপে উঠল। মনে হলো ছায়াগুলো নিজেদের অবস্থান বদলে ফেলছে। ধীরে ধীরে সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে জ্বলে উঠল দুটো রক্তিম চোখ। একটি অবয়ব, এতক্ষণ সে সেখানেই ছিল। কিন্তু ইচ্ছা করেই নিজেকে আড়াল করে রেখেছিল। সে কিছুক্ষণ আয়াজ চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বিরক্তিতে গর্জে উঠল। গর্জনটা মানুষের ছিল না। কোনো পরিচিত বন্য প্রাণীরও নয়। চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই তার দেহ কুঁকড়ে যেতে লাগল। পরের মুহূর্তেই সেখানে আর কোনো মানুষসদৃশ অবয়ব রইল না। সে একটি বিশাল কালো কাকে পরিনত হলো। সে ডানা ঝাপটাল, তার চোখ দুটো এখনো আগুনের মতো লাল।
'কা... কা...!'
তীক্ষ্ণ স্বরে ডেকে সে রাতের আকাশে উড়ে গেল। কিন্তু যাওয়ার আগে ফিসফিস করে একটাই কথা বলল—
"আজও... ব্যর্থ..." "مرةً أخرى... فشلت"
  --------
আয়াজের ফ্ল্যাট (রাত প্রায় বারোটা) 
ফ্ল্যাটের সামনে বাইক থামিয়ে দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে দ্রুত পায়ের শব্দ ভেসে এল। দরজা খুলতেই...
__সিনিয়র!
চিৎকার করে কেভিন সরাসরি আয়াজের গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আয়াজ বিরক্তিতে বলে, 
__ধুর!
আকস্মিক ঘটনায় ভারসাম্য হারিয়ে দু'জনই ধপাস করে মেঝেতে পড়ে গেল। মাটিতে পড়েই আয়াজ বিরক্ত মুখে বলল,
— একদিন তোর জন্য আমার কোমর ভাঙবেই।
কেভিন নির্বিকার মুখে হেসে উঠল। আয়াজ উঠে জামার ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলল,
— যে কাজের জন্য তোকে এক ঘণ্টা আগে বাসায় পাঠিয়েছিলাম, সেটা করেছিস?
কেভিনের হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
— উম...
— রান্না করেছিস?
কেভিন মাথা চুলকাতে লাগল।
— অ্যাকচুয়ালি...সিনিয়র! একচুয়ালি আই ওয়াজ দেখিং হরার মুভি। মুভি ইজ এক ঘন্টা এগো ইন্ডিং। তারপর.....
আয়াজ ভ্রু তুলল।
— তারপর?
 __তারপর আই ওয়াজ ফিলিং ভয়। তাই আই ডোন্ট কুক।
 
আয়াজ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— মানে আজ আবারও আমাকে রান্না করতে হবে। 
কেভিন দাঁত বের করে হাসল।
— সরি... সিনিয়র।
আয়াজ আর কিছু বলল না। এ দৃশ্য তার কাছে নতুন নয়। প্রায় প্রতিদিনই তার বাসায় একই ঘটনা ঘটে।কেভিন প্রতিদিন আগে বাসায় ফিরে রান্না করবে তাই। সে বাসায় ফিরেই হরর মুভি চালায়। তারপর ভয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে থাকে... আর শেষ পর্যন্ত রান্নাটা আয়াজকেই করতে হয়।
আয়াজ একটু বিরক্ত মুখে বলল,
— মানলাম 'কাঞ্চনা' তোর ফেভারিট মুভি। তাই বলে সবসময় রাঘবের মতো অন্যের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে? একটা জিনিসই শুধু করিস না তা হলো, ডায়াপার পরে ঘুরে বেড়ানো। বাকি সবই তো হুবহু নকল করিস!
কেভিন দুষ্টুমি ভরা হাসি হেসে দাঁত বের করল।
— সিনিয়র! আপনি ডোন্ট হ্যাভ এনি গার্লফ্রেন্ড অর বউ। সো, ফর এখন... আই'ম দ্য একজন হু ক্যান ক্লেইম আপনার ল্যাপ!
কথাটা শুনে আয়াজ হেসে মাথা নাড়ল। কেভিনের এসব আজগুবি কথাবার্তা আর নাটকীয় আচরণে সে অনেক আগেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু... কেভিনের এই কথাগুলো যেন অন্য কারও একেবারেই ভালো লাগল না।
হঠাৎ করেই ফ্ল্যাটের বাতাস অস্বাভাবিক ভারী হয়ে উঠল। তাপমাত্রা যেন ধীরে ধীরে বাড়ছে। চারপাশে এমন এক চাপা উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ল, যেন অদৃশ্য কেউ নিজের রাগ সংবরণ করার চেষ্টা করছে।
------------
আয়াজ সোজা নিজের রুমে ঢুকে আলমারির সামনে দাঁড়াল। সারাদিনের ক্লান্তি যেন পুরো শরীরটাকে অবশ করে দিয়েছে। জ্যাকেটটা খুলে চেয়ারের ওপর ছুড়ে রেখে তোয়ালে হাতে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
পেছন থেকে কেভিন বলল,
— সিনিয়র...টুডে কুক না করে, ফ্রম বাইরে ডু অর্ডার।
আয়াজ না ফিরেই উত্তর দিল,
— ফ্রিজে ডিম আছে। দশ মিনিট পরে বের হচ্ছি। অমলেট আর নুডলস বানিয়ে ফেলব।
— ও... ওকে।
আয়াজ ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। বাইরে হঠাৎ আবার নীরবতা নেমে এল। কেভিন ধীরে ধীরে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কম্বলটা তুলে নিজের গায়ে জড়িয়ে নিয়ে ড্রয়িং রুমে চলে গেল।তার কেমন যেন লাগছে। মনে হচ্ছে... ফ্ল্যাটে তারা দু'জন ছাড়া আর কেউ আছে। সে জোরে জোরে মাথা নাড়ল।
__না না... সব মুভির প্রভাব।
ঠিক তখনই... তার কানে ভেসে এল খুব ক্ষীণ একটা আওয়াজ। কেউ যেন অনেক দূর থেকে ধীরে ধীরে কিছু পড়ছে। কেভিন কান খাড়া করল। আওয়াজটা পরিষ্কার নয়। কিন্তু ভাষাটা... আরবি। মনে হচ্ছিল কেউ অত্যন্ত ধীর কণ্ঠে কোনো আয়াত তিলাওয়াত করছে। তার বুকের ভেতর কেমন যেন ঠান্ডা একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল।
— সিনিয়র...?
সে ডাক দিল। ওয়াশরুম থেকে শুধু শাওয়ারের পানি পড়ার শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা গেল না। আরবির আওয়াজটা এবার আরও কাছে এল।কেভিনের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ... কেউ যেন সমস্ত শক্তি দিয়ে তার বাম গালে একটা চড় মারল। কেভিন কোনো কিছু বোঝার আগেই মেঝেতে পড়ে গেল। তার চোখ বিস্ফারিত। সে কাঁপতে কাঁপতে নিজের গালে হাত রাখল। ব্যথা... সে সত্যি ব্যথা পেয়েছে। এটা কল্পনা হতে পারে না। তার শ্বাস দ্রুত উঠানামা করছে। সে আতঙ্কিত চোখে চারদিকে তাকাল।
 কেউ নেই কিন্তু... তার স্পষ্ট মনে হচ্ছে কেউ একজন ঠিক তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। অদৃশ্য... তবুও উপস্থিত। ভয়ে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না কেভিন। সে প্রাণপণে দৌড়ে আয়াজের রুমের দিকে ছুটল।
---------
কেভিন প্রাণপণে দৌড়ে এসে আয়াজের রুমের সামনে দাঁড়াল।
__স... সিনিয়র!
কণ্ঠটা এতটাই কাঁপছিল যে শব্দগুলো ঠিকমতো বের হচ্ছিল না। ভেতর থেকে পানির শব্দ থেমে গেল।আয়াজ বিরক্ত গলায় বলল,
— এবার আবার কী হলো?
কেভিন ঠোঁট নাড়ল। কিন্তু শব্দ বের হলো না। সে কাঁপা হাতে করিডোরের দিকে ইশারা করল।
— ও... ওখানে... সামওয়ান...
আয়াজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— কেভিন, প্লিজ! আজকে আবর শুরু করিস না।
— সিনিয়র... আই'ম নট ডুইং মজা। সামওয়ান আমাকে...
ঠিক তখনই... তার কানে আবার সেই শব্দটা ভেসে এল। কেউ যেন খুব নিচু স্বরে আরবিতে কিছু পড়ছে।আগের চেয়েও স্পষ্ট, আগের চেয়েও কাছে।শব্দগুলো ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেগুলো শুনলেই বুকের ভেতর চাপা অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে।
তার নিঃশ্বাস আবার ভারী হয়ে উঠল। হাতের লোম দাঁড়িয়ে গেল। ধীরে ধীরে... সে মাথা ঘুরিয়ে ওয়াশরুমের দিকে তাকাল। আয়াজের রুমের ওয়াশরুমের শাওয়ার এরিয়াটা পুরোটা ফ্রস্টেড গ্লাসে ঘেরা। বাইরের আলোয় ভেতরে থাকা মানুষের শুধু ছায়া দেখা যায়।
কেভিনের চোখ প্রথমে আয়াজকে খুঁজে পেল। কিন্তু... পরের মুহূর্তেই তার নিঃশ্বাস আটকে গেল।আয়াজ একা নয়। তার ঠিক পেছনে... আরও একজন দাঁড়িয়ে আছে। একজন নারী।
যার দীর্ঘ চুল কোমর ছাড়িয়ে নেমে এসেছে। মাথা সামান্য কাত করা। তার শরীরের অবয়ব গ্লাসের ওপাশে অস্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে। ধীরে ধীরে... সে দু'হাত বাড়িয়ে আয়াজের কাঁধ স্পর্শ করল। তারপর আঙুলগুলো খুব ধীরে আয়াজের পিঠ বেয়ে নিচে নেমে এল। আয়াজের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। মনে হচ্ছে সে কিছুই টের পাচ্ছে না।কেভিনের ঠোঁট শুকিয়ে গেল।
সে কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিস করে বলল,
— সি... সিনিয়র... প... পেছনে...
কিন্তু শব্দটা তার গলার ভেতরেই আটকে গেল।নারীটি হঠাৎ থেমে গেল। ধীরে ধীরে... মাথাটা কেভিনের দিকেই ঘুরিয়ে দিল। যদিও গ্লাসের ওপাশ থেকে মুখ দেখা যাচ্ছিল না... তবু কেভিন স্পষ্ট অনুভব করল— ওটা তার দিকেই তাকিয়ে আছে।তার বুকের ভেতর যেন হৃৎপিণ্ডটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, কান ঝিমঝিম করতে শুরু করে। পরের মুহূর্তেই— মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল কেভিন।
----------
কয়েক মিনিট পর... আয়াজ শাওয়ার শেষ করে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বাইরে বেরিয়ে এল।ঘরে ঢুকেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
— কেভিন?
কোনো উত্তর নেই। সে এগিয়ে গিয়ে দেখল কেভিন বিছানার পাশে অচেতন হয়ে পড়ে আছে। সারা শরীর কাঁপছে। তার কপালে হাত দিতেই আয়াজের মুখের রঙ বদলে গেল। জ্বর, না প্রচণ্ড জ্বর। মনে হচ্ছে শরীর আগুনে পুড়ছে। আয়াজ আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। মোবাইল বের করে দ্রুত পরিচিত ডক্টরের নম্বরে কল দিল।
তার সমস্ত মনোযোগ তখন কেভিনের দিকেই।
তাই সে টেরই পেল না... রুমের সবচেয়ে অন্ধকার কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা ছায়ামূর্তিটা ধীরে ধীরে ফিসফিস করে কিছু বলছে। আরবি ভাষা। অস্পষ্ট, শীতল। কিন্তু সেই কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত হতাশা—
 "সে শুধু আমার" " إنها لي، ولي وحدي"
এই একই শব্দ পুরো ঘর জুড়ে বারবার শুধু প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ঘরের বাতাস হঠাৎ আরও ঠান্ডা হয়ে উঠল। কিন্তু আয়াজ কিছুই অনুভব করল না। তার কাছে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটা শুধু কেভিন।
কেভিন ছাড়া আয়াজের এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই। ছোটবেলা থেকেই দু'জন একটি অনাথ আশ্রমে একসঙ্গে বড় হয়েছে। দু'জনই অনাথ। একে অপর ছাড়া তাদের আপন বলতে আর কেউ নেই। প্রায় আধাঘণ্টার মধ্যেই ডাক্তার আয়াজের ফ্ল্যাটে পৌঁছে যান। কেভিনকে ভালোভাবে পরীক্ষা করে তিনি বললেন,
— মনে হচ্ছে কোনো কারণে ও খুব ভয় পেয়েছে। অতিরিক্ত ভয়ের কারণেই শরীরে এত দ্রুত জ্বর এসেছে। চিন্তার কিছু নেই। ওষুধগুলো নিয়মিত খাওয়াবে আর একটু যত্ন নেবে। আশা করি দু-এক দিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে যাবে।
ডাক্তারের কথা শুনেও আয়াজের ধাঁধা কাটল না।কেভিন হঠাৎ এমন কী দেখেছিল, যাতে এতটা ভয় পেয়ে গেল? সে তো পুরো সময় ফ্ল্যাটেই ছিল। অথচ এমন কিছু তার চোখে পড়েনি।
কেভিনকে একা রেখে বাইরে গিয়ে ওষুধ আনারও উপায় নেই। তাই সে অনলাইন ফার্মেসি থেকে ওষুধ অর্ডার করে দিল। ওয়েস্টহেভেন সিটিতে জরুরি ওষুধ আধাঘণ্টার মধ্যেই বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।ওষুধ আসতে কিছুটা সময় লাগবে ভেবে আয়াজ রান্নাঘরে ঢুকে কেভিনের জন্য কর্ন স্যুপ বানাতে শুরু করল।
---------
আজ সারাদিনের ক্লান্তিতে আয়াজের মাথাটা অস্বাভাবিক ভার লাগছিল। মনে হচ্ছিল যেন চোখ দুটোও ঠিকমতো খোলা রাখতে পারছে না।কোনোমতে স্যুপটা তৈরি করে সে ট্রে হাতে কেভিনের রুমের দিকে এগোল। কেভিনকে সে আগেই নিজের বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল। ভাবল, ওষুধ এসে গেলে তখনই তাকে জাগিয়ে খাইয়ে দেবে। ততক্ষণ অন্তত ছেলেটা একটু বিশ্রাম নিক।
ঠিক তখনই...করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আয়াজ নিজের বেডরুমের দিকে তাকাল। কী যেন একটা অস্বাভাবিক বিষয় তার নজরে এল। ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে এক মিষ্টি, অচেনা সুগন্ধ। সেই সঙ্গে দরজার নিচের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসছে মৃদু নীলাভ আলো। আয়াজ কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
__নীল আলো?
পরের মুহূর্তেই নিজের কপালে হাত রাখল সে। আজ সারাদিনের চাপ, ক্লান্তি আর মাথাব্যথার জন্যই হয়তো এসব অদ্ভুত লাগছে। নিজেকে যুক্তি দিয়ে শান্ত করে সে রান্নাঘরে ফিরে গেল। এক বাটি স্যুপ থেকে কয়েক চামচ খেয়ে মাথাব্যথার একটি ওষুধ খেল। ঠিক তখনই কলিং বেল বেজে উঠল। ওষুধ এসে গেছে।
------------
ডেলিভারি বয়ের কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে আয়াজ কেভিনের রুমে ঢুকল। সে আলতো করে কেভিনকে ডাকল,
— কেভিন... উঠ।
ছেলেটা কষ্ট করে চোখ খুলল। জ্বর এখনো কমেনি।আয়াজ ধীরে ধীরে কয়েক চামচ কর্ন স্যুপ খাইয়ে দিল। তারপর ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ খাওয়াল।ওষুধ খাওয়ানোর পর কেভিন আবার চোখ বন্ধ করে ফেলল। আয়াজ উঠে নিজের রুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই— হঠাৎ কেভিন তার কব্জি শক্ত করে চেপে ধরল, তার চোখ বন্ধ।
তবুও জ্বরের ঘোরে সে অস্পষ্ট গলায় বিড়বিড় করে বলল,
— ড... ডোন্ট গো... শি... শি ইজ টোটালি অবসেসড উইথ ইউ...
আয়াজ থমকে গেল। তারপর মৃদু হেসে আবার বিছানার পাশে বসে পড়ল। জ্বরের ঘোরে মানুষ কত কী-ই না বলে! আর কেভিন... যে ছেলেটা প্রতিদিন ভাঙা-ভাঙা ইংরেজি বলে, সে আজ প্রথমবার একটানা এত নিখুঁত একটা ইংরেজি বাক্য বলে ফেলল।
ভাবতেই আয়াজের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে কেভিনের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল।
__আজ ওকে একা রেখে যাওয়া ঠিক হবে না।
সে সিদ্ধান্ত নিল, আজ রাতটা কেভিনের রুমেই থাকবে।কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্লান্তিতে দু'জনেই ঘুমিয়ে পড়ল।
-------------
রাত আরও গভীর হলো। ফ্ল্যাটজুড়ে নেমে এল অস্বাভাবিক নীরবতা। হঠাৎ... অদৃশ্য কোনো কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে আরবিতে একটি বাক্য উচ্চারণ করতে শুরু করল। প্রথমে খুব আস্তে। তারপর বারবার... ক্রমশ রাগ আর অধিকারবোধে ভরে উঠতে লাগল সেই কণ্ঠ। 
 "إنها لي، ولي وحدي...."
 
"সে শুধু আমার, শুধু আমার!"
মনে হচ্ছিল, কেউ যেন তাসবিহর দানার মতো একই বাক্য অনবরত জপে চলেছে। আর প্রতিবার উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে পুরো ফ্ল্যাটের বাতাস আরও ভারী, আরও শীতল হয়ে উঠছিল।
চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব-১ শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন