ফন্ট সাইজ:
থিম:
স্নিগ্ধবিষ

71

লেখক: সানজিদা আক্তার মুন্নি
চারপাশ এখন নিঝুম। বাড়ির সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন, চারদিকে শুধু জোনাকির একটানা ডাক আর বহু দূরে ডাকতে থাকা কুকুরের আওয়াজ ভাসছে বাতাসে। বাড়িতে এসে ঘরে দরজার চেইনটা অতি সন্তর্পণে খোলে ওয়াসেম, একটুও শব্দ হতে দেয় না। পা টিপে টিপে ঘরে পা রাখে। ভেতরে ঢুকতেই বুকের ভেতরটা অজানা এক আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে। ঝড়ের আগে বাতাস ঠিক যেভাবে থমথমে রূপ নেয়, ওর মনও ঠিক একইভাবে কোনো অমঙ্গলের পূর্বাভাস পাচ্ছে।
ঘরের মূল বাতি নেভানো। টেবিল ল্যাম্পের অনুজ্জ্বল হলুদ আলোয় পুরো ঘরটা স্বপ্নের মতো ঝাপসা লাগছে। ওয়াসেম চারদিকে চোখ বোলায়। খাট শূন্য, জানালার পর্দার ওপর শুধুই চাঁদের আলোর প্রতিবিম্ব। তৃষ্ণা কোথাও নেই।
তৃষ্ণা কোথায়? প্রশ্নটা মাথায় আসতেই বুকটা আরও জোরে ধুকপুক করে ওঠে তার। সারা ঘর তন্নতন্ন করে খোঁজার পরও তাকে না পেয়ে, শেষ ভরসায় ওয়াসেম বারান্দার দিকে পা বাড়ায়। ওদিকের দরজাটা হাতে ধরতেই ওর আঙুলগুলো সামান্য কেঁপে ওঠে। কারণ অজানা হলেও, আজ এই দরজা খোলাটা ওর কাছে কোনো কঠিন পরীক্ষার খাতা খোলার সমতুল্য মনে হচ্ছে।
বারান্দায় দাঁড়াতেই ওর চোখে পড়ে সোফার ওপর গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে তৃষ্ণা। দুটো হাঁটু বুকের কাছে টেনে, এক হাত গালের নিচে ভাঁজ করে শুয়ে আছে। মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে নিজেকে গুটিয়ে যেভাবে ঘুমায়, ঠিক সেভাবেই। চাঁদের আলো এসে পড়েছে ওর মুখে। এই আলোয় তৃষ্ণার মুখটা পাথরের মূর্তির মতো নিষ্পলক আর শান্ত দেখাচ্ছে। তবে এই প্রশান্তির মাঝেই ওয়াসেম এক জমাট বাঁধা দূরত্ব অনুভব করে। ঘুমের ঘোরেও তৃষ্ণা ওকে নিজের জগতে প্রবেশের অধিকার দিচ্ছে না।
ওয়াসেম দীর্ঘক্ষণ ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে, ওর দৃষ্টি স্থির তৃষ্ণার ন্যায়। মেপে মেপে পা ফেলার মতো ধীরগতিতে এগিয়ে যায় সে ওর দিকে। সোফার সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে। দীর্ঘক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে তৃষ্ণার ঘুমন্ত মুখটার দিকে। তার চোখের পাতায় ভ্রূর প্রতিচ্ছবি, আধখোলা ঠোঁট, কপাল বেয়ে পড়ে থাকা একরাশ চুল, সবকিছু ও নিজের মনে গেঁথে রাখতে চাইছে। ওর মন সম্ভবত জানে, বহু কাল পর, সব হারানোর শেষে, শুধুই এই দৃশ্যটা ওর স্মৃতিতে ফিরে আসবে। কপালের ওপর থেকে চুলের গোছা সরিয়ে দিতে গিয়ে ওর হাত মাঝপথেই থেমে যায়। ছুঁলে যদি ঘুম ভেঙে যায়? স্পর্শ পেলে যদি তৃষ্ণা ফিরে তাকায়, আর ওর দৃষ্টি যদি হয় আজ সকালের মতো বরফজমাট?
অবশেষে সব ভয় সরিয়ে রেখে, একটি প্রদীপ ফুঁ দিলে নিভে যাওয়ার মতো সতর্কতায়, অতি সযত্নে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ায় তৃষ্ণার গালে। গালের উষ্ণতা ঠোঁটে লাগতেই ওয়াসেমের চোখের পাতা বুজে আসে। কথাগুলো মূলত নিজের কানে শোনানোর জন্যই ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, 'আর তো মাত্র কয়েকটা দিন, তৃষ্ণা! এরপর সব ছেড়ে তোকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাব। আমাদের সুন্দর একটা সংসার হবে, বাচ্চা হবে। আমি আর তুই শুধু নিজেদের মতো করে বাঁচব।'
কথাগুলো বলতে বলতেই ওর গলা বুজে আসে। সত্যিই কি এমনটা হবে? সত্যিই কি ও এসব ছেড়ে যেতে পারবে? নিজের মনের এই প্রশ্নের উত্তর ও দিতে চায় না। প্রশ্নটাকে জোরপূর্বক চাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই, তীব্র আবেগে তৃষ্ণার গালে গাঢ় চুম্বন এঁকে দেয়। এবার আর আলতো করে নয়, হারানোর ভয় মেশানো তীব্রতায়। এরপর দুহাতে পাঁজাকোলা করে তৃষ্ণাকে কোলে তুলে নেয়। ঘরের ভেতর এনে বিছানায় অতি সাবধানে শুইয়ে দেয়। ভঙ্গুর কোনো কাঁচের বস্তু একটু জোরে চাপ লাগলেই টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার মতো সতর্ক থাকে ওর প্রতিটি নড়াচড়া।
এরপর নিজেও শুয়ে পড়ে পাশে। তৃষ্ণার ড্রেসটা আলতো করে খুলে তার বুকের মাঝে মুখ গুঁজে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে তাকে। এত শক্ত করে ধরে, একটু আলগা করলেই হাওয়ায় মিশে যাওয়ার ভয় পাচ্ছে ও। এই স্পর্শে কোনো আদর নেই, এটি ডুবতে থাকা মানুষের শেষ ভাসমান কাঠখুঁটো আঁকড়ে বাঁচার মরিয়া চেষ্টা।
আচমকা ছোঁয়ায় তৃষ্ণার কাঁচা ঘুম ভেঙে যায়। ঘুমের রেশ কাটিয়ে উঠতে না পেরে অস্ফুট স্বরে গোঙিয়ে উঠে বলে, "কী করছেন? সরুন না।"
পরক্ষণেই ঘোর পুরোপুরি কেটে যেতেই ওর গোটা শরীরে আগুন জ্বলে ওঠে। অন্ধকারের মাঝেই চোখ দুটো বড় বড় হয়ে যায়। যে মানুষটা অন্য কাউকে বিয়ে করার কথা বলেছে, যার জন্য আরেকটা নারী এই বাড়িতে ঢোকার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে, তার স্পর্শ আজ তৃষ্ণার কাছে ভয়ানক বিষাক্ত ঠেকছে। তার গলা চিরে একটা প্রতিবাদ বেরিয়ে আসতে চাইলেও আটকে যায়। ওয়াসেম যদি রেগে গায়ে হাত তোলে? যদি বলে বসে, "তোকে বিয়ে করেছি, তোর শরীরের ওপর আমার পূর্ণ অধিকার আছে।" এই ভয়ে তৃষ্ণার গা গুলিয়ে আসতে থাকে, পা দুটো নিজের নিয়ন্ত্রণহীন মনে হতে থাকে।
একসময়ের বহু কাঙ্ক্ষিত আর মধুর স্পর্শগুলো আজ চামড়ায় পচন ধরানো এসিডের মতো জ্বালা ধরাচ্ছে। ওয়াসেমের খোঁচা খোঁচা দাড়ির ঘষা ওর গাল আর ঘাড় বেয়ে নামছে, উষ্ণ শ্বাস বুকে আছড়ে পড়ছে, আর তৃষ্ণা ভেতরে ভেতরে দহনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু বুদবুদ হয়ে উঠলেও গড়িয়ে পড়ে না। কান্নার জলও বাইরে আসতে ভয় পাচ্ছে। একটা টুঁ শব্দ না করে ও চোখ বুজে নিথর হয়ে পড়ে থাকে। শরীরটা বিছানায় পড়ে থাকলেও মনটা পুকুরপাড়ের কোনো অন্ধকার কোণে লুকিয়ে কাঁদছে।
কিছুক্ষণ পর ওয়াসেমও ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে। তবে ঘুমের ঘোরেও ওর হাতটা তৃষ্ণার শরীর থেকে সরে যায় না, স্পর্শ হারালে সব হারানোর ভয় কাজ করছে ওর অবচেতনে। অন্ধকার ঘরে তৃষ্ণা আরও দীর্ঘসময় জেগে থাকে, ওর স্থির দৃষ্টি আটকে থাকে সিলিংয়ের দিকে।
সকালের রোদ পর্দার ফাঁক গলে ঘরে উঁকি দিচ্ছে। ঘুম ভাঙার পর থেকেই ওয়াসেমের চোখ কিছু একটা খুঁজছে। ও চাইছে তৃষ্ণার মুখে একটা সহজ অভিব্যক্তি, একটা স্বাভাবিক শুভ সকাল শোনার প্রত্যাশা। অথচ তৃষ্ণা এমনভাবে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছে, দেখে মনে হয় ওর পাশে কেউ ছিলই না। ওয়াসেম গলা খাঁকারি দিয়ে বলে ওঠে, তৃষ্ণা, "খাবারটা টেবিলে দিয়ে আসিস তো। "
আসলে খাওয়াটা নিছক অজুহাত। ও খুঁজছে দুটো কথা বলার সুযোগ, একবার চোখ মেলানোর বাহানা। তৃষ্ণা নিজের জামাকাপড়ের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখেই কাঠখোট্টা স্বরে জবাব দেয়, আচ্ছা।
ওয়াসেম স্পষ্ট খেয়াল করে, ঘরের ভেতর তৃষ্ণার চোখ বিছানা, আয়না, দরজা সবদিকে ঘুরলেও ওর দিকে একবারও পড়ছে না। চোখাচোখি করার কোনো চেষ্টাই ওর মাঝে নেই। ওয়াসেমকে ঘরের মূল্যহীন কোনো আসবাবপত্রের সমতুল্য মনে করে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করছে সে। এই না তাকানোই ওয়াসেমের কাছে হাজারটা তিরস্কারের চেয়ে বড় আঘাত হয়ে বিঁধে। বুকের ভেতরটা অশান্তিতে ফেটে পড়তে চায়। একটা কথা বলার জন্য ও কেবল ঠোঁট জোড়া আলাদা করে, ঠিক তখনই তৃষ্ণা দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ওর সঙ্গে এক মুহূর্ত বেশি থাকাটাও তৃষ্ণার জন্য অসহ্য যন্ত্রণাদায়ক।
পেছনে খালি বিছানায় অশান্ত মন নিয়ে বসে থাকে ওয়াসেম। দুটো হাত মাথায় চেপে ধরে। ঠিকঠাক মতো কথাই তো বলা হলো না। একটু পর দরজায় খটকা লাগতেই মুখটা আশায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, কিন্তু ঘরে প্রবেশ করেন মা সিতুজা বেগম, হাতে খাবারের থালা। ওয়াসেমের মুখের উজ্জ্বলতা নিমিষেই নিভে যায়। কপাল কুঁচকে অসন্তুষ্ট গলায় প্রশ্ন করে, "মা, তুমি কেন? তৃষ্ণা কোথায়?"
ওয়াসেমের আশা ছিল তৃষ্ণাকে দিয়ে খাইয়ে নেবে, ওর সামনে বসে খাবে, ওর সাথে দুটো কথা বলবে। এখন সেই আশাটুকুও ভেঙে চুরমার। ওদিকে বিছানার ওপর রাখা ফোনটা ক্রমাগত কাঁপছে, তৌসির আর ইয়াদ সমানে কল করছে। চারপাশ থেকে তাড়া খেয়ে মাঝখানে ও একা বিপর্যস্ত।
সিতুজা বেগম ছেলের ওপর ভীষণ বিরক্ত। থালাটা টেবিলে কড়মড় করে রেখে কড়া গলায় বলেন, 'ও কাজ করছে, ও কেন আসবে? তোর তো আরেক বউ আছে!"
কথাটা সরাসরি না বললেও মায়ের ঘৃণা আর হতাশা মেশানো দৃষ্টি সব পরিষ্কার করে দেয়। ওয়াসেম মায়ের হাত থেকে প্লেটটা নিতে নিতে ছোট ছেলের মতো সাফাই গাওয়ার সুরে বলে, "আরে মা, তুমি তো জানোই সবটা। কাজটা শেষ হোক, আমি তৃষ্ণাকে সব বুঝিয়ে বলব। তুমি ওকে একটু বোঝাও না যে এসব নেহাতই মজা!"
কথাটা মাকে বোঝানোর চেয়ে নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার জন্যই বেশি শোনায় ও। সিতুজা বেগম দরজার কাছে গিয়ে থামেন, না ফিরেই কড়া ভাষায় জানিয়ে দেন, "তোর এই বোকামির জন্য তুই একদিন ভীষণ পস্তাবি, বলে দিলাম!"
মায়ের শেষ কথাটা কানে গেঁথে থাকে। ভীষণ পস্তাবি, শব্দগুলো কাঁটা হয়ে বুকে বিঁধে। তবে ওয়াসেম এটা আমলে নিতে চায় না, মাথা নাড়িয়ে ভাবনাটা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে। তড়িঘড়ি করে খাওয়া শেষ করে প্লেট হাতে সোজা রান্নাঘরে যায়। মূলত এটি তৃষ্ণাকে দেখার একটি বাহানা মাত্র। প্লেট রাখতে গিয়ে ওর সাথে দুটো কথা হয়ে যাবে, এই আশায় বুকটা ধুকপুক করছে।
তবে রান্নাঘরে গিয়ে দেখে তৃষ্ণা সেখানে নেই। চুলার আঁচ জ্বলছে, অথচ মানুষটা উধাও। কাজের মেয়ের কাছে শোনে, সে পুকুরঘাটে মাছ ধুতে গেছে। শোনা মাত্রই ওয়াসেমের মনে হয়, তৃষ্ণা ইচ্ছে করেই ওর হাতের নাগালের বাইরে সরে যাচ্ছে। ঘরে ও নিজে উপস্থিত, তাই তৃষ্ণা পুকুরে। মেয়েটা কি সত্যিই ওকে এড়িয়ে চলছে?
ঘর থেকে ফোনটা নিয়ে ওয়াসেম পুকুরের দিকে পা বাড়ায়। সকালের রোদে পুকুরের জল চকচক করছে, ঘাটের সিঁড়িগুলো কালো পাথরের মতো জলে ডুবে আছে। পাড়ে দাঁড়াতেই ওর চোখে পড়ে, তৃষ্ণা নিবিষ্ট মনে সিঁড়িতে বসে মাছ ধুচ্ছে। পায়ের কাছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মাছের আঁশ, ওড়নাড আঁচল বাঁধা, মেরুদণ্ড সোজা করে বসা ও পুরোপুরি নিজের জগতে আবদ্ধ। সেখানে ওয়াসেমের প্রবেশের কোনো পথ নেই। ওপর থেকেই ওয়াসেম গলা চড়িয়ে বলে ওঠে, "তৃষ্ণা, আমি বাইরে যাচ্ছি।"
তৃষ্ণা ফিরেও তাকায় না। মাছ ধোয়ার কাজ থামে না, হাতের নড়াচড়াও একই গতিতে চলমান। আগের মতোই নির্লিপ্ত স্বরে জবাব দেয়, "আচ্ছা।"
একটিমাত্র শব্দ, ঘাড় ঘোরানোর প্রয়োজনও বোধ করে না। তৃষ্ণার এই অবজ্ঞা ওয়াসেমের রাগ বাড়িয়ে দেয়। সত্যি বলতে এটি রাগ নয়, তীব্র এক অসহায়ত্ব, যেটিকে রাগের আবরণে ঢাকা ছাড়া ওর আর কোনো উপায় খোলা নেই। মানুষ যাকে সবচেয়ে কাছে চায়, তার নিরাসক্ত মুখের সামনে অহংকারই শেষ পোশাক হয়ে দাঁড়ায়। ও আবারও চেষ্টা করে জোর গলায় বলে, "তোর কিছু লাগবে?"
একই ভঙ্গিতে, মাছের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখেই তৃষ্ণার একঘেয়ে জবাব আসে, "না।"
ওয়াসেমের বুকের ভেতরটা কেমন ছিন্নভিন্ন হতে থাকে। শেষ চেষ্টার মতো মরিয়া হয়ে সে বলে ওঠে, "আমি কিন্তু আজ রাতে বাড়ি ফিরব না।"
কথাটা বলার পরই ও জিভ কামড়ায়। কেন বললাম? তবে ভেতরে ভেতরে একটা দুর্বল আশাও কাজ করছে। এই খবরে তৃষ্ণার মুখে সামান্য হলেও আলোড়ন ফুটবে, হাতের কাজ এক সেকেন্ডের জন্য হলেও থামবে, অন্তত একবার যেও না শব্দটা শোনা যাবে। কিছু অন্তত হোক, সামান্য একটা প্রতিক্রিয়া হোক!
একই যান্ত্রিক ও শুষ্ক উত্তর আসে, "আচ্ছা।"
এবার আর ওয়াসেম সহ্য করতে পারে না, ওর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। ও বুঝতে পারছে, উপর্যুপরি সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে। তৃষ্ণা ওর হাতের ফাঁক গলে বালির মতো ঝরে যাচ্ছে, আর যত মুঠো শক্ত করছে ততই বেশি ঝরছে। পরনের লুঙ্গিটা হালকা গুছিয়ে হাতের মুঠোয় নিয়ে সে তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যায়। সিঁড়ির প্রতিটি স্তরে নামার সাথে সাথে বাড়ছে ওর দমবন্ধ শ্বাস। তৃষ্ণা যেখানে বসা, ঠিক তার পেছনের সিঁড়িতে বসে পড়ে ও।
তৃষ্ণা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, আচমকা দুহাতে ওর গাল চেপে ধরে ওয়াসেম মুখটা নিজের দিকে ঘোরায়। তারপর ওয়াসেম তৃষ্ণার গালে, ঠোঁটে, কপালে পাগলের মতো চুমু খেতে থাকে। এটি আদরের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। হারানোর ভয়ে মরিয়া হয়ে ওঠা একরাশ দাবি, একবুক মিনতি। যেটুকু ভাষায় বলা হয়নি, সেটুকু স্পর্শে বুঝিয়ে দেওয়ার অসহায় চেষ্টা। চুম্বনের ফাঁকে ফাঁকে বুকফাটা সুরে ও বলে, "আমি গেলাম।"
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ওর গলা বুজে আসে। দাঁড়িয়ে পড়ে দ্রুত ঘাট ছেড়ে উঠে যায়। ফিরে তাকানোর সাহস হয় না, কারণ ও জানে, ফিরে তাকালে যে দৃশ্য দেখবে তা সহ্য করার ক্ষমতা ওর নেই।
তৃষ্ণা তীব্র বিরক্তি আর ঘৃণায় চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলে, অথচ সারাক্ষণ টুঁ শব্দটিও করে না। মুখ কুঁচকানোটা এমন, ঠিক পচা গন্ধ নাকে এলে মানুষ যেমনটা করে। ওয়াসেম ঘাট ছেড়ে চলে যেতেই তৃষ্ণা দ্রুত আঁজলা ভরে পুকুরের পানি তুলে নিজের মুখটা ঘষে ঘষে ধুয়ে ফেলে। একবার নয়, উপর্যুপরি তিনবার। ঘষার চোটে গাল লাল বর্ণ ধারণ করে। ওর মনে হচ্ছে এটা ওয়াসেমের ছোঁয়া নয়, একরাশ নোংরা কাদা লেগেছিল ওর মুখে। তৃষ্ণার চোখের পানি আর পুকুরের পানি অঞ্জলিতে একসাথে মিশে যায়। কোনটি অশ্রু আর কোনটি জল, তা হয়তো তৃষ্ণা নিজেও বুঝতে পারে না।
_
ঘড়ির কাঁটায় ঠিক দুপুর দুটো। খাওয়া-দাওয়া শেষে চারপাশের পরিবেশে একঘেয়ে এক স্থিরতা বিরাজ করছে। প্রশস্ত সোফায় তিনজন যে যার মতো জায়গা দখল করে আছে। সোফার একপাশে গা এলিয়ে বসে আছে ওয়াসেম। বাইরে থেকে তাকে শান্ত দেখালেও তার চোখের দৃষ্টিতে স্পষ্ট উসখুস ভাব। বারবার কপালে হাত ঘষছে সে, পরক্ষণেই শূন্য দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছে। মাথার ভেতর তার শুধুই তৃষ্ণার আনাগোনা। কী উপায়ে মেয়েটার রাগ ভাঙানো যায়, এমন ভাবনায় সে পুরোপুরি দিশেহারা।
সোফার অন্য প্রান্তে বসে আছে তৌসির। তার কোলে মাথা রেখে বেশ আয়েশ করে শুয়ে আছে ইয়াদ। তৌসিরের অবশ্য সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। সে তীক্ষ্ণ মনোযোগে নিজের ওষুধের কোম্পানির হিসেবের একগাদা কাগজ নিয়ে বসেছে। কলম হাতে হিসেব মেলাচ্ছে আর মাঝে মাঝে ভ্রু কুঁচকে কাগজের দিকে তাকিয়ে থাকছে। অন্যদিকে, ইয়াদের পুরো দুনিয়া এখন মোবাইল ফোনে আটকে আছে। পাবজিতে শত্রুদের ঘায়েল করতে তার আঙুলগুলো ফোনের পর্দার ওপর দ্রুত চলছে।
খেলতে খেলতেই হঠাৎ ইয়াদের চোখ পড়ে ওয়াসেমের চিন্তিত চেহারার দিকে। ভাইয়ের এমন ছটফটে অবস্থা দেখে সে আর চুপ থাকে না। ফোনের পর্দা থেকে চোখ না সরিয়েই, গেমের ভেতরেই শত্রুকে গুলি করতে করতে বেশ রসিকতার সুরে জিজ্ঞেস করে, "কী বড় ভাই, আপনার বাড়ির কী অবস্থা? মুখটা এমন আষাঢ় মাসের মেঘের মতো কালো করে বসে আছিস যে এনি প্রবলেম মাদারচুত?"
ইয়াদের প্রশ্নে ওয়াসেমের বিরক্তি আরও এক ধাপ বেড়ে যায়। এমনিতে বউয়ের টেনশনে তার মাথা খারাপ, তার ওপর এই ফোড়ন কাটা! সে একরাশ হতাশা নিয়ে ইয়াদের দিকে তাকিয়ে বড়সড় এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, "আরেহ, আর বলিস না! আমার অবস্থা খুব খারাপ। আমার বউ তো এখন আমার দিকে ফিরেও তাকায় না, সুন্দর করে দুটো কথাও বলে না। মনে হচ্ছে কোনো পাথরের দেয়ালের সাথে কথা বলছি! বড়ই এক ঝামেলার মধ্যে ফেঁসে গেছি রে।"
ওয়াসেমের কথা শুনে তৌসির আর হিসেবের কাগজে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। হাতের কলমটা একপাশে নামিয়ে রেখে সে শব্দ করে হেসে ওঠে। এরপর ওয়াসেমের দিকে তাকিয়ে বেশ ঝাঁঝালো গলায় বলে, "করো, আরো বেশি করে করো চুদনামি! বালপাকনামির একটা লিমিট থাকে, তুই তো তা পার করে ফেলছিস। তোরে কতবার নিষেধ করলাম, এই বোকাচুদামি টা করিস না! এখন বুঝো শ্লা বাইনচুদ বউ অবহেলা করলে কেমন লাগে। তোর বউ তো তাও শুধু কথা বলা বন্ধ করেছে, আমার বউ হলে তো এতক্ষণে আমাকে সোজা দয়ালের দরবারে পাঠিয়ে দিত! এই তো সেদিন, দ্বিতীয় বিয়ের একটু নাটক করায় যা কুরুক্ষেত্র বাঁধাল! জ্ঞানট্যান হারিয়ে একাকার অবস্থা।"
তৌসিরের কথা শেষ না হতেই ইয়াদ এবার গেমে মগ্ন থাকা অবস্থাতেই হো হো করে হেসে ওঠে। হাসির চোটে তৌসিরের কোলের ওপর তার মাথা নড়ে যায়। সে হাসতে হাসতেই বলে, "অতিরিক্ত পাকনামি করতে গেলে এমনই হয়! এখন আর এসব ভেবে লাভ নাই চুদি**র ভাই! এখন তুই সোজা ওর কাছে যা। গিয়ে একদম বউয়ের পা জড়িয়ে ধরে বসে থাক। আর ততক্ষণ পা ছাড়বি না, যতক্ষণ না তোর বউ নিজের মুখে বলছে, যান মাফ করে দিলাম!"
চলবে.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 71 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন