ফন্ট সাইজ:
থিম:
স্নিগ্ধবিষ

72

লেখক: সানজিদা আক্তার মুন্নি
{🚫 সতর্কীকরণ | Content Warning
এই গল্পে অশালীন ভাষা ও গালাগালির ব্যবহার রয়েছে, যা সকল পাঠকের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে।পাঠকদের নিজ বিবেচনায় পড়ার অনুরোধ করা হচ্ছে।}
বিকেল তিনটে বাজে। কেটে গেছে আরও দুটো দিন। সময়ের নির্মম চাকা থেমে থাকে না। আপন গতিতে ঘুরতেই থাকে। কারও কান্না কিংবা অপেক্ষার তোয়াক্কা সে করে না। আজ খলিলের মেয়ের সাথে ওয়াসেমের বিয়ের দিন, আর সম্ভবত খলিলের জীবনের শেষ দিন। কারণ খলিলের সব লোক এখন তৌসিরদের হাতের মুঠোয়।
ঘড়ির কাঁটায় তিনটে বাজতেই তৃষ্ণা নিজের সামান্য কিছু কাপড় গুছিয়ে পাটোয়ারী বাড়ি থেকে লুকিয়ে বেরিয়ে পড়ে। কাপড়গুলোর মধ্যে কোনো সোনার গয়না কিংবা মূল্যবান জিনিস নেই। রয়েছে শুধু ক'টা জরাজীর্ণ ড্রেস একটা সোয়েটার আর বুকের গহিনে চেপে রাখা অগুনতি ভাঙা স্বপ্ন। পরনে তার একটি কালো বোরকা, ভোরের আলোর মতোই নিষ্প্রাণ যা। মনে হচ্ছে তার ভেতরের জমাট আঁধারটাই বাইরে এসে গায়ে জড়িয়েছে। কালো এই বস্ত্রটা তার শোকের বাহন, যে শোক কাউকে দেখানোর সৌভাগ্যটুকুও তার নেই। হাতে থাকা সস্তা কাপড়ের ব্যাগটা সে বুকের সাথে শক্তভাবে চেপে ধরেছে। ভয় হচ্ছে, জীবনের শেষ সম্বলটুকুও কেউ কেড়ে নেবে। ব্যাগের ফিতেটা তার আঙুলে গেঁথে রয়েছে। এই ফিতেতেই আটকে আছে তার ভাসমান জীবন।
ওয়াসেম বর সেজে কিছুক্ষণ আগেই এই বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। গায়ে তার দামি শেরওয়ানি, গলায় ফুলের মালা, মাথায় টুপি। দেখলে মনে হবে আজই তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিন। কিন্তু এই বেশভূষার আড়ালে লুকিয়ে আছে নির্মম পরিকল্পনা। সে তৃষ্ণাকে নিজের পরিকল্পনার বিন্দুবিসর্গও জানায়নি। একেবারে শেষ মুহূর্তে জানাবে বলেই হয়তো এতকিছু গোপন রেখেছে। তার ভাবনায় কাজ করেছে, তৃষ্ণা এখন জেনে গেলে হয়তো বাধা হয়ে দাঁড়াবে। নতুবা মেয়েটার সামনে নিজেকে অপরাধী মনে হবে।
তবে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় ওয়াসেম শুধু একবার থমকে দাঁড়িয়ে তৃষ্ণার দিকে তাকিয়েছিল। ক্ষণিকের এক মুহূর্তের জন্য। মনে হচ্ছিল যুগপৎ সময় থমকে আছে। তার ঠোঁটের কোণে লেগে ছিল এক চিলতে রহস্যময় হাসি। হাসির অন্তরালে শত অকথিত কথা, শত ফাঁদ আর শত অভিশাপ একসাথে লুকিয়ে ছিল। হাসিতে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিও স্পষ্ট ছিল, আবার বিদায় নেওয়ার নিষ্ঠুরতাও প্রকট। তার দৃষ্টিতে কিছুক্ষণের জন্য সময়টাই থমকে গিয়েছিল। চারপাশের সব শব্দ, সব আনাগোনা মিলিয়ে গিয়েছিল। শুধু বাকি ছিল দুজনের চোখে চোখে পড়া এক অব্যক্ত সংলাপ।
তৃষ্ণাও দূর থেকে এক আকাশ অভিমান বুকে চেপে হাসির জবাবে মুচকি হেসেছিল। তবে তার হাসিতে কোনো প্রাণ ছিল না, ছিল শুধু হারানো মানুষের শেষ শুভেচ্ছা।
তৃষ্ণা আজ বেরিয়ে যাচ্ছে, কারণ সে ওয়াসেমের জীবনের কোনো কাঁটা হয়ে থাকতে চায় না। ভালোবাসা যদি থেকেও থাকে, সেটা তার একার বোঝা। সে ওই বোঝা অন্য কারোর কাঁধে চাপাতে রাজি নয়। জমানো কিছু টাকা সম্বল করে তার গন্তব্য এখন মুম্বাই। এক অজানা শহর, যেখানে কেউ তাকে চেনে না। যেখানে সে হয়তো নিজেকে নতুন করে গড়তে পারবে। চেনা শহর, চেনা রাস্তাঘাট পার হয়ে সে আন্দাজে পা বাড়াচ্ছে। প্রতিটি পদক্ষেপে পেছনে ফেলে যাচ্ছে গত দুটো বছরের শত অবহেলা, তাচ্ছিল্য আর একবিন্দু ভালোবাসা। যে ভালোবাসাটুকু সে মাটির নিচে লুকিয়ে রেখেছিল, আজ সেটুকুও গলিত পদতলে মিশিয়ে যাচ্ছে।
তৃষ্ণার পা আর এগোতে চাইছে না। প্রতিটি পদক্ষেপে মনে হচ্ছে কেউ পেছন থেকে টানছে তাকে। হয়তো স্মৃতির কোনো অলক্ষ্য হাত, নয়তো নিজের ভেতরের খণ্ডিত মন, যা এখনো বিশ্বাস করতে নারাজ যে সব শেষ। তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে, চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে। বিষের মতো গাল বেয়ে নামছে অশ্রু। গরম, নোনতা আর শব্দহীন তা। বুক ফেটে হু হু করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে তার, কিন্তু উপায় নেই। চারপাশে ভিড়, চারপাশে কৌতূহলী চোখ। এক ফোঁটা অস্বাভাবিক শব্দও তার সব গোপনীয়তা উন্মোচন করে দিতে পারে। সবকিছু ছেড়ে তাকে যেতেই হবে, এটাই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কান্নাটুকুও তাকে বুকের ভেতর চেপে রাখতে হচ্ছে। কাঁদার স্বাধীনতাটুকুও তার ভাগ্যে জুটছে না।
বিকেল পাঁচটা। খলিলের বিয়েবাড়ি এখন এক মৃত্যুপুরী। চারপাশে বইছে রক্তের বন্যা। যেখানে কিছুক্ষণ আগেও বাজছিল সানাই, উঠছিল আতিথেয়তার হাসি-খুশির শব্দ, আত্মীয়-স্বজনের মিষ্টি কথাবার্তা সেখানে এখন বিরাজ করছে মৃত্যুর গন্ধ আর রক্তের গরম বাষ্প। আনন্দের আলো নিভে গিয়ে জ্বলছে প্রতিশোধের আগুন। ভাঙা চেয়ার, উল্টে পড়া থালাবাসন আর মাটিতে লুটিয়ে থাকা নিথর শরীর। সব মিলে বাড়িটা এক ভীতিকর সমাধিক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বিয়ের সাজসজ্জা এখনো ঝুলছে দেয়ালে। ফুলের মালা, রঙিন কাগজের ফেস্টুন, অথচ তার নিচে শুয়ে আছে মৃতদেহ। উৎসব আর শোক একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে এক বীভৎস ছবির সৃষ্টি করেছে।
তৌসিররা তাদের নিজস্ব লোক দিয়ে খলিলের পরিবারের নারী সদস্যদের আগেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দিয়েছে। প্রতিশোধের এই আগুনে তারা নিরপরাধদের পোড়াতে চায়নি। তাদের হিসাব ছিল শুধু অপরাধীদের সাথে। এরপর শুরু হয়েছে ধ্বংসলীলা। খলিল, তার ভাই এবং ছেলেকে কুপিয়ে হত্যা করেছে তৌসির, ওয়াসেম আর ইয়াদ। খলিলের দাপট এখন আর আগের মতো নেই। নির্বাচনে হার, ব্যবসায় ধস আর পার্টনারশিপ শেষ হয়ে যাওয়ায় সে এমনিতেই দুর্বল। মূলোৎপাটিত এক প্রকাণ্ড বটগাছ, যার দেহ আছে কিন্তু শেকড় নেই। দাঁড়িয়ে আছে স্রেফ অভ্যাসের বশে। আর এই সুযোগেরই সদ্ব্যবহার করেছে তারা তিনজন। শিকারের দুর্বলতা টের পাওয়া তিন ক্ষুধার্ত শৃগাল, যারা বছরের পর বছর ধরে ঠিক এই দিনের জন্যই অপেক্ষা করে আসছিল।
খলিলের বাড়ির নারীদের তারা স্পর্শও করেনি, কারণ এই পরিবারের যাবতীয় পাপ করেছে এখানকার পুরুষেরা। তাই শেকড়সহ উপড়ে ফেলেছে সব। অতীত হত্যাকাণ্ডে জড়িত পুলিশ থেকে শুরু করে খলিলের সাঙ্গোপাঙ্গ, সবাইকে তারা একে একে খতম করেছে। মৃত্যুর ঠিক আগে রক্তাক্ত খলিল একটি কথাই বলেছিল,
"যদি জানতাম তোরা তিনজনই আমার মৃত্যুর কারণ হবি, তাহলে তোদের বাঁচিয়ে রাখতাম না।"
তার কণ্ঠে তখন আর ভয় ছিল না। ছিল শুধু অনুশোচনের এক নিদারুণ অনুভূতি। ক্ষমতার শেষ মুহূর্তে মানুষটা এটুকু বুঝতে পারল, যে ওয়াজেদ কে সে একদিন ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, ঠিক তার ধ্বংসস্তূপ থেকেই উঠে এসেছে আজকের মৃত্যুদূত। খলিলের ছিন্নভিন্ন লাশ এখন মাটিতে লুটিয়ে আছে। যে চোখ দুটো একসময় এলাকায় ভীতি ছড়াত, সেগুলো এখন স্থির, ফ্যাকাশে, অর্থহীন।
অতীতে খলিলরা যেভাবে তাদের পরিবারের হত্যাযজ্ঞ ধামাচাপা দিয়েছিল, আজও ঠিক একইভাবে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তারা ধামাচাপা দিল। ইতিহাস চক্রাকারে ঘুরে এসে একই স্থানে দাঁড়াল। পালটে গেল শুধু অভিনেতারা। বাকি রইল খলিলের ওইসব বিশ্বাসঘাতক অনুচরদের হত্যা করা, যাদের প্রতি বিন্দুমাত্র বিশ্বাস রাখা যায় না।
এত বছরের জমানো ক্ষোভ আজ রক্তস্নানে শান্ত হলো। তিন ভাইয়ের দায়িত্ব শেষ, প্রতিশোধ পূর্ণ হলো। তৌসির হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ে। তার হাতে এখনও রক্তমাখা অস্ত্র, আঙুলগুলো কাঁপছে, কিন্তু চোখে কোনো তৃপ্তি নেই। যে মুহূর্তের জন্য সে এতদিন বেঁচে ছিল, কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটি এসে গেছে। অথচ বুকের ভেতরটা ক্রমশ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে, চারপাশের সব রক্ত আর পাপ ধুয়ে মুছে দিতে চাইছে প্রকৃতি। বৃষ্টির ফোঁটা রক্তের সাথে মিশে মাটিতে লালচে ধারা তৈরি করেছে। পৃথিবী নিজেই আপন দাগ মুছতে চাইছে।
রক্তের স্রোতের ওপর ক্লান্ত শরীর এলিয়ে শুয়ে আছে ওয়াসেম। তার বুক ওঠানামা করছে ভারী শ্বাসে। খোলা চোখে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে, কিন্তু সে পলক ফেলছে না। আর একপাশে নিথর পাথরের মতো বসে আছে ইয়াদ। তার মুখে কোনো ভাব নেই। চোখে পড়ছে শুধু শক্ত চোয়াল আর ফাঁকা দৃষ্টি। তিনজনের চোখেই ভাসছে শৈশবের এক ভয়াল স্মৃতি। তৌসিরের চোখের সামনে মাইশার আগুনে পোড়া শরীরটা জীবন্ত হয়ে উঠছে। আগুনের শিখা, পোড়া গন্ধ, আর বোনের আর্তনাদ আজও কানে বাজছে। এত বছর পরেও পুরনো দৃশ্য তার পেছন ছাড়ছে না। ঘুমের মধ্যে, জাগরণের মধ্যে, সর্বত্র।
সে দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ডুকরে কেঁদে ওঠে। তার বুড়ো আঙুল দুটো দিয়ে চোখ মুছতে গিয়ে সে খেয়াল করে, চোখের জলের সাথে মিশে আছে তাজা রক্ত। তার শরীর থেকে এখন জল আর রক্ত একাকার হয়ে গেছে। বিড়বিড় করে বলে,
"সেদিন যদি আমার এত দাপট থাকত, তাহলে আজ আমরা সবাই একসাথে থাকতাম..."
পরক্ষণেই আসমানের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে ওঠে তৌসির। তার কণ্ঠ ভেঙে যায় বৃষ্টির শব্দের মাঝেও,
"আপু, তোরা দেখ! বাবা, দেখো! যারা তোমাদের মেরেছিল, আজ তাদের রক্তে আমরা গোসল করেছি। কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গেল... বড্ড বেশি দেরি করে ফেললাম!"
লোকে বলে পুরুষ নাকি কাঁদে না। অথচ এই তিনজন আজ ভেতর থেকে ভেঙে পড়ে কাঁদছে। যারা আজ শত্রুর রক্তে হাত রাঙিয়েছে, তারা এখন শিশুর মতো কাঁদছে। চোখের সামনে বোনের ধর্ষিত হওয়ার দুঃখে, বোনের পেট চিরে বাচ্চা বের করে নেওয়ার বীভৎসতায়, বাবার মৃত্যুর শোকে তারা ফুঁপিয়ে উঠছে। সারাটা জীবন তিলে তিলে ধুঁকে মরার যন্ত্রণা আর অবশেষে প্রতিশোধ পূর্ণ হওয়ার এক অবর্ণনীয় শূন্যতায় আজ তাদের অশ্রুর বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। বৃষ্টি, রক্ত আর চোখের জল। তিন ধারা এক হয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে মাটিতে। যাবতীয় পাপ, সমস্ত শোক আর প্রতিশোধ একসাথে ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে অজানা কোনো গন্তব্যে।
ওদিকের সমস্ত ঝামেলা অবশেষে মিটে গেছে। নিজেদের বিশ্বস্ত লোকজন আর পুলিশ কমিশনারকে ভালোমতো বুঝিয়ে-সুঝিয়ে, সব হিসাব-নিকাশ পাতিয়ে তিন ভাই ফিরে আসছে নিজেদের ভিলার পথে। গাড়ির জানালায় দাঁতের মতো বাজছে হাওয়া, কিন্তু তিনজনের মনের ভেতর এখনও গুঁড়ি গুঁড়ি ঘুরছে বিগত কয়েক ঘণ্টার উত্তপ্ত স্মৃতিগুলো। মাঝে মাঝে কারো চোখ জ্বালা করে উঠছে, আবার কেউ গাড়ির দরজায় মাথা হেলিয়ে অন্ধকার সড়কের দিকে চেয়ে রয়েছে ভোঁতা দৃষ্টিতে। মনে হচ্ছিল, ওই অন্ধকারের অতলেই তলিয়ে গেছে তাদের গেলো বহুকালের জীবন।
ভিলায় পৌঁছেই তারা সোজা চলে যায় পুকুরঘাটে। কোনো কথা নেই, কোনো দ্বিধা নেই তিনজনে একসাথে নেমে পড়ে পুকুরের হিম জলে। মনে হচ্ছে শুধু গা নয়, আত্মাটাও ধুয়ে ফেলতে চায় তারা। গায়ে লেগে থাকা শুকনো রক্তের দাগ, দেহের প্রতিটি রোমকূপে জমে থাকা ক্লেস এবং মনের অভ্যন্তরে পাথরের মতো শক্ত হয়ে থাকা দীর্ঘদিনের বিষাদ, সবকিছুই হয়তো এই জলের স্পর্শে গলে গলে ভেসে যাবে।
একে অপরের গা ঘষে দিচ্ছে তারা। এমন ভাবে, মনে হচ্ছে এই ঘষার সঙ্গে সঙ্গে মুছে যায় অতীতের প্রতিটি কালো অধ্যায়। মাঝে মাঝে চোখের জলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে পুকুরের জল, কেউ কারো দিকে তাকিয়ে দেখছে না। সবাই জানে, এই মুহূর্তে তিনজনের বুকের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ক্ষতবিক্ষত একেকটা মানুষ। পুকুরের জল ক্রমশ নিশ্চল হয়ে উঠছে, আর প্রশান্তির আয়নায় ওদের চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ভবিষ্যতের ছক।
সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে একে একে। ইয়াদ আর ওয়াসেম থাকবে একসাথেই এই নিয়ে আর কোনো দ্বন্দ্ব নেই। সমস্ত ঝামেলার পর্দা নেমে গেলে তারা পরিবার নিয়ে পাড়ি জমাবে সুইজারল্যান্ড কিংবা ইংল্যান্ডে। নতুন দেশ, নতুন বাতাস, নতুন ভোর। হয়তো সেখানে গিয়ে অতীতের দুঃস্বপ্নগুলো পিছু ছাড়বেই, হয়তো আর রাতের অন্ধকারে ঘুম ভেঙে চমকে ওঠার দিন থাকবে না। হয়তো একদিন সকালের চায়ে চুমুক দিতে দিতে মনে পড়বে ফেলে আসা জীবন, আর অতীত স্মৃতিটুকু বুক চিরে রক্ত ঝরাবে না।
কিন্তু তৌসিরের বেলায় সমীকরণটা এত সহজ নয়। ওর পায়ের নিচে বাংলাদেশের মাটি, দেশের টান যে এত প্রবল! ওখানেই তো রয়ে গেল তার গোটা একান্নবর্তী পরিবার ভাইবোনেরা, চাচা-চাচিরা, আপনজনের আড্ডা, কিশোর যৌবনের বিষাক্ত মিষ্টি গন্ধ। ছোটবেলার পরিচিত বাঁশঝাড়, সন্ধ্যাবেলার মাকে ডাকা স্বর, ঈদের নতুন জামা, এক রাত্রিতে এসব ফেলে সে পারবে তো দূরদেশে উড়ে যেতে?
গোসল পর্ব শেষ হতেই তিন ভাই রওনা হয় পাটোয়ারী বাড়ির উদ্দেশ্যে। মনে মনে ভাবছে, এবার পেটপুরে খাওয়া হবে, তারপর দীর্ঘায়িত একটা শান্তির ঘুম। এতদিন পর বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ এসেছে। বুকের চাপা একটা পাথর কিছুটা হলেও নড়ে উঠেছে।
গাড়িতে বসে ওয়াসেম মনে মনে ছক কষে। তৃষ্ণার অভিমান ভাঙতেই হবে, যে করেই হোক। আর যদি সে ব্যর্থ হয়? তাহলে তো ইয়াদ আছেই। ইয়াদ গিয়ে তৃষ্ণাকে সব খুলে বলবে ঠিক কী কারণে, কোন প্রয়োজনে এই নকল বিয়ের নাটক সাজাতে বাধ্য হয়েছিল তারা। সব শুনলে তৃষ্ণা বুঝবে, অবশ্যই বুঝবে। এতদিনের ভালোবাসা কি এত সামান্য ভুল বোঝায় কেঁচে যাবে? না, পারবে ভগ্নপ্রায় মনে মনে বারবার এই আশ্বাসটাই বলে চলেছে সে, নিজেকে বোঝাতে বোঝাতেই একটা বিধ্বস্ত দেয়ালে আঁকড়ে থাকতে চায়।
কিন্তু পাটোয়ারী বাড়ির সদর দরজায় পা রাখতেই ওদের সাজানো স্বপ্নের জগতে আচমকা বাজ পড়ে। সিতুজা আর ইব্রাহিম হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন ওদের সামনে। দুজনের মুখে আতঙ্কের ছাপ, চোখদুটো ফোলা, গলা শুকনো। ইব্রাহিমের কণ্ঠে চিন্তার ভার,
"তোদের এতবার ফোন দিলাম, ধরছিস না কেন?"
তিন ভাই কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে জবাব দেয়,
"আরে, আমরা তো গোসলে ছিলাম।"
তারপরই সিতুজার কম্পিত কণ্ঠস্বর গিয়ে পড়ে ওয়াসেমের কানে। তিনি বলেন,
"তৃষ্ণা চলে গেছে, ওয়াসেম! ওকে কোথাও পাচ্ছি না। ও নিজের বাপের বাড়িতেও যায়নি। তোর বাবার লোকেরা চারদিকে খুঁজতে বেরিয়েছে। শেষবার ওকে বাস স্টেশনের কাছাকাছি দেখা গেছে, কিন্তু কোনো বাসে উঠতে কেউ দেখেনি। আমার বড্ড ভয় করছে রে বাবা!"
কথাগুলো শোনামাত্র ওয়াসেমের সারা শরীর কেঁপে ওঠে। মনে হয় ওর কানের কাছেই বিস্ফোরণ ঘটেছে, নিভে গেছে কোকিলের গান, আঙিনার মাঝখানটা অতল কূপে পরিণত হলো এক পলকেই। বুকের ভেতর শুরু হয় প্রচণ্ড ধড়ফড়ানি, হৃদপিণ্ডটা সজোরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। দুই হাতে মাথা চেপে ধরে সে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে ওঠে ,
"কোথায় গেল ও? কেন চলে গেল?"
ইব্রাহিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
"তুই অন্য কাউকে বিয়ে করছিস ভেবে অভিমানে চলে যাচ্ছে ও। এখন বাস স্টেশনের আশেপাশে সবাই ওকে খুঁজছে। যে বাসগুলো ছেড়ে যাচ্ছে, সবগুলো তল্লাশি করা হচ্ছে। পুলিশও খোঁজ চালাচ্ছে।"
প্রতিটি শব্দ ভারী হাতুড়ির মতো নেমে পড়ে ওয়াসেমের মাথায়। ওর পায়ের তলা থেকে মুহূর্তেই মাটি সরে যায়। থরথর করে কাঁপতে থাকে পুরো শরীর। চোখের পলকেই ওলটপালট হয়ে যায় ওর যত্নে সাজানো গোটা দুনিয়াটা। ভিলা, পরিকল্পনা, সুইজারল্যান্ডের স্বপ্ন, তৃষ্ণার হাত ধরে হাঁটার কল্পনাগুলো, সবকিছু কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হতে থাকে। আর সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না।
"তোরা এখানে থাক, আমি আসছি।"
উন্মত্তের মতো কথাগুলো ছুড়ে দিয়েই সে ঝড়ের বেগে ছুটে বের হয়। কিন্তু তৌসির আর ইয়াদ ওকে একা ছাড়তে রাজি নয়, তারাও ডেকে যায় পিছু পিছু। ভাইয়ের ডাকে ফিরেও তাকায় না ওয়াসেম। ওর কানে তখন একটাই বাক্য গেঁথে আছে তৃষ্ণা চলে যাচ্ছে, তৃষ্ণা চলে যাচ্ছে...ওয়াসেমের ভেতরে এখন তীব্র আতঙ্ক। হাত-পা এতটাই কাঁপছে যে স্টিয়ারিং ধরার শক্তিটুকুও তার নেই। বাধ্য হয়ে তৌসিরই বসে ড্রাইভিং সিটে। ওয়াসেম দরজা আঁকড়ে বসে থাকে। মনে হয় নিজের হাত দুটোই তার নয়, পাশের সিটে পড়ে থাকা দুটো প্রাণহীন কাঠের টুকরো।
গাড়ি ছুটছে, আর ওয়াসেমের মনে পড়ছে, তার জীবনে যখনই কোনো বড় অঘটন ঘটে, তখনই প্রকৃতি রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। আজও ব্যতিক্রম হয় না। বাইরে নামছে তুমুল বৃষ্টি। আকাশ ভেঙে পড়ছে, অবিকল মহাজাগতিক সমস্ত বিষাদ একসাথে ঢলে পড়ছে ধরণীর বুকে। গাড়ির ওয়াইপার কাঁচ মুছে মুছে ক্লান্ত, কিন্তু বৃষ্টির তোড়ে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎ চমকে ওঠে, আর ওই নীলাভ আলোয় মুহূর্তের জন্য দেখা যায় ওয়াসেমের পাথর-ঠোঁট স্তব্ধ মুখখানা। তার চোখদুটো নিবদ্ধ অমানিশার কোনো অন্ধকূপে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াকে ডিঙিয়ে তারা ছুটে চলে বাস স্টেশনের দিকে।
সেখানে পৌঁছে তিনজনে ছুটে নামে গাড়ি থেকে। তন্নতন্ন করে খোঁজাখুঁজি শুরু হয় চারদিকে। প্রতিটি বাসের কিনারে, প্রতিটি জনশূন্য কোণায়, প্রতিটি অচেনা মুখের দিকে তাকিয়ে সন্ধান চলে। ঝোড়ো হাওয়ার ধাক্কায় পা ফসকে যায় কাদামাটিতে, কেউ কারো দিকে তাকানোরও সাহস পায় পণ্ডিত কারণ একে অপরের চোখে চোখ পড়লেই ভেঙে পড়বে সবার মনোবল।
আর ওয়াসেমের অবস্থা এখন উন্মাদপ্রায়। প্রবল বৃষ্টির মাঝে সম্পূর্ণ ভিজে সে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে যায়,
"তৃষ্ণা! তৃষ্ণা!!"
নামটা বৃষ্টির গর্জনে হারিয়ে যায়, আবার ফিরে আসে তারই বুকের ভেতর। প্রতিবার ডাকের পর একটু থেমে সে কান পেতে রয়। হয়তো কোথাও থেকে ভেসে আসবে একটা সাড়া, একটা খণ্ডিত স্বর,
"ওয়াসেম?"
কিন্তু ফিরে আসে না কিছুই, ফিরে আসে স্রেফ বৃষ্টির নিষ্ঠুর একটানা শব্দ আর নিজের বুকের ভেতর ভেঙে পড়ার আওয়াজ। ওর দু'চোখ বেয়ে অঝোরে গড়িয়ে পড়ে জল। কান্নার স্রোত মিশে যায় বৃষ্টির ধারার সঙ্গে। কোনটা চোখের জল, কোনটা মেঘের, তা বোঝার উপায় থাকে না।
আঁধার যে গাঢ় হচ্ছে, তা ওর টেরই থাকে না। আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকদের মধ্যে কেউ কেউ ফিসফিস করে,
"মানুষটা পাগল হয়ে যাচ্ছে নাকি?"
কিন্তু কে তাদের বোঝাবে, উন্মাদ হয়ে যাওয়ার জন্য ওয়াসেমের আজ আর কিছুই বাকি নেই।
তৌসির আর ইয়াদ দূর থেকে দেখছে ওকে। দুজনেরই চোখে জল, কিন্তু কেউ এগিয়ে যায় না। তারা বোঝে, এই মুহূর্তে ভাইয়ের বুকের ভেতর যে বিস্ফোরণ ঘটছে, তা থামানোর ক্ষমতা এই ব্রহ্মাণ্ডের কারো নেই।
।।।
তৃষ্ণাকে খুঁজতে খুঁজতে রাত আটটা বেজে যায়। কিন্তু ওয়াসেমের কাছে এই আটটা কোনো সময় নয় এটি এক অতল কুয়ার আঁধার, যেখানে প্রতিটা মিনিট তার বুকের ওপর পাথরের মতো চেপে বসে আছে। সময় আর এগোচ্ছে না, নড়ছে শুধু বুকের ভেতরের দাউদাউ জ্বলা আতঙ্ক। এক অদেখা দহন, যা ভেতর থেকে তাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে, অথচ বাইরে থেকে কেউ তার এক ফোঁটা উত্তাপও টের পাচ্ছে না।
চারপাশের জমাট বাঁধা অন্ধকার শুধু চোখের নয় তা মিশে গেছে তার শিরায় শিরায়। প্রতিটি অবয়বকে মনে হয় তৃষ্ণার চেহারা। একবার মনে হয় গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে তার তৃষ্ণা হাসছে, আবার পরমুহূর্তেই দৃষ্টির ভ্রম মিলিয়ে যায় আঁধারে। প্রতিটি হাওয়ার হিসহিস শব্দে মনে হয় কেউ কাঁদছে। দূরে, অনেক দূরে, এমন এক আর্তনাদ যার স্বর পৌঁছায়, কিন্তু উৎস পর্যন্ত পৌঁছানো যায় না।
বাস স্টেশনের ঠিক পেছনেই জরাজীর্ণ পরিত্যক্ত কোয়ার্টার। বহু বছর ধরে কেউ থাকে না সেখানে। ভাঙা জানালা, সরে যাওয়া দরজা, দেয়ালে শ্যাওলার সবুজ লেপ আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো এক পচা, স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। চারপাশ দেখে মনে হয়, এই বাড়িটা নিজেই অনেক আগে মরে গেছে, আর তার মৃতদেহটা এখনো পচছে ধীরে ধীরে।
ওয়াসেম জানে, এখানে তৃষ্ণাকে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবু তার অবুঝ মন মানতে চায় না। কারণ যে মানুষটি তার সবকিছু হারিয়েছে, তার কাছে যুক্তি-তর্কের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে নিছক পাগলামি। আর এই উন্মাদনাতেই সে ভগ্নপ্রায় কোয়ার্টারের ঘরগুলোর ভেতরে হন্যে হয়ে ঘুরতে থাকে একটার পর একটা ঘরে উঁকি দিতে থাকে, অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ায়, কাঁপা গলায় ডাকতে থাকে,
"তৃষ্ণা? তৃষ্ণা?"
কোনো সাড়া নেই। শুধু নিজের ডাকের প্রতিধ্বনি ফিরে এসে তাকে চিবিয়ে খাচ্ছে। চারপাশের দেয়ালগুলোও তার ডাকের দরিদ্রতা দেখে দয়া করে সেটি ফিরিয়ে দিচ্ছে, নিঃশব্দে বলছে,
'নাও, তোমার ডাক তোমার কাছেই রইল, এখানে আর কেউ নেই।'
হঠাৎ পিনপতন স্তব্ধতা চিরে একটা ক্ষীণ গোঙানির শব্দ ভেসে আসে। শব্দটা কানে যেতেই ওয়াসেমের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে। এক অজানা আতঙ্কে রক্ত হিম হয়ে আসে তার, শিরায় শিরায় বরফের স্রোত নেমে যায়। এই গোঙানি সে চেনে। পৃথিবীর সব শব্দের ভিড়েও সে এই শব্দটা আলাদা করতে পারে। কাঁপতে থাকা পায়ে, প্রতিটি পদক্ষেপে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে এরকম মনে হচ্ছে এভাবে একটা একটা করে ঘর পেরিয়ে, সে নির্দিষ্ট স্যাঁতসেঁতে ঘরটিতে পা রাখে।
ভেতরে পা রাখতেই ওয়াসেমের চারপাশের জগৎ মুহূর্তেই থমকে যায়।
মেঝের ধুলোয়, অন্ধকারের মাঝখানে পড়ে আছে তৃষ্ণা। প্রথম দেখায় মনে হয় এটি কোনো ছেঁড়া, ফেলে দেওয়া পুতুল, যার সাথে খেলতে খেলতে কেউ ক্লান্ত হয়ে চলে গেছে। কিন্তু না, এটি পুতুল নয়। এটি তার তৃষ্ণা। ওর শরীরটা আর কোনো শরীর নেই, এটি এক ছত্রখান হওয়ার জলজ্যান্ত ইতিহাস হয়ে গেছে।
কালো বোরখাটা, যা পরে সে পৃথিবীর সমস্ত চোখ থেকে নিজেকে লুকিয়ে বের হয়েছিল ঘর থেকে, যা তার গৌরব ছিল, তার ঢাল ছিল, তার লজ্জার শেষ সীমানা, আজ সেটি টুকরো টুকরো হয়ে শরীর থেকে আলগা হয়ে পড়ে আছে। নরপশুরা তার শুধু শরীর নয়, তার পর্দাও ছিঁড়ে ফেলেছে। বোরখার ছেঁড়া কাপড়ে এখনো লেগে আছে ধুলো আর জমাট বাঁধা রক্তের কালচে দাগ। মনে হচ্ছে কাপড়টাও নিজের ব্যর্থতায়, মালিকের সম্ভ্রম রক্ষা করতে না পারার লজ্জায় মরে গেছে তার সাথেই। তার কোমর থেকে কাঁধ পর্যন্ত ছিঁড়ে যাওয়া কাপড়ের টুকরোগুলো শরীরের সাথে শুকিয়ে গেঁথে গেছে রক্তে। মাথার ওড়নাটা পড়ে আছে দূরে এক কোণায়, হয়তো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সে ওটা ছেড়ে দিতে চায়নি। পেয়েছে মাটি, হারিয়েছে মাথা।
তার ঠোঁটের একদিক ফেটে গেছে, সেখানে জমাট বেঁধে আছে কালচে রক্ত। চোখের নিচে ফুলে উঠেছে শ্যাওলা-নীলচে কালশিটে। তার গলার দুপাশে আঙুলের ডগার কালো কালো দাগ। কেউ ঠিক মনে হচ্ছে ওর প্রাণটা চেপে ধরেছিল বারবার, আর তৃষ্ণা বারবার ফিরে আসছিল।
তার হাঁটু আর গোড়ালির চামড়া ঘষে উঠে গেছে মাটির সাথে। বোঝা যায় এখানে তাকে অনেক জোরে টেনে আনা হয়েছে। মেঝের ধুলোয় এখনো লেগে আছে টানাটানির দীর্ঘ দাগ, আর দাগের শেষ মাথায় পড়ে আছে খোলা চুলের এক গোছা, শেকড় থেকে ছিঁড়ে এসেছে যা। আর তার নিচের দিকটা ওয়াসেম আর তাকাতে পারছে না। নরপশুদের ছোবলে জায়গাটি হয়ে গেছে এক অবিরাম রক্তগঙ্গার উৎস। রক্ত এখনো, এই মুহূর্তেও, ফোঁটায় ফোঁটায় মাটির ভেতর হারিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে পৃথিবীটা নিজেই তার মেয়ের রক্ত পান করছে। স্যাঁতসেঁতে মেঝে রক্ত মিশে দাঁড়িয়েছে কালচে কাদা হয়ে। আর কাদার মাঝখানে পড়ে আছে তৃষ্ণা। তার মুখে রক্তের ফেনা জমে আছে ঠোঁটের কোণায়, ও হয়তো চিৎকার করতে চেয়েছিল অনেকবার, কিন্তু তার চিৎকারগুলো ফেনা হয়ে ফিরে এসেছে গলা থেকে।
পাগলের মতো ছুটে গিয়ে ওয়াসেম তাকে বুকের মাঝে টেনে নেয়। টেনে তোলার সাথে সাথে তার কাঁধের ওপর তৃষ্ণার মাথাটা যেভাবে ঝুলে পড়ে, ঢিলে, ভাঙা সুতোর পুতুলের মতো, তাতে মনে হচ্ছে ঘাড়ের হাড়টাও ঠিক নেই। ওয়াসেমের হাতের তালু ভিজে ওঠে গরম রক্তে, তৃষ্ণার রক্তে, তার ফুলের রক্তে। তৃষ্ণার শরীরটা এখনো একটু একটু উষ্ণ, কিন্তু উত্তাপটা হাতের মুঠোর ফাঁক দিয়ে নিঃশ্বাসের মতো বেরিয়ে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। ওয়াসেম ছেঁড়া বোরখার টুকরোগুলো টেনে তার শরীরের ওপর টানতে থাকে, ঢাকতে থাকে। যে কাপড়গুলোকে পশুরা ছিঁড়ে ফেলেছে, সেগুলো সে জোড়া লাগাতে থাকে মেয়েটার গায়ে। কান্নায় হাত কাঁপছে, কাপড় পিছলে যাচ্ছে, সে আবার টানছে। মনে হয় এই কাপড় টানাটাই পৃথিবীর শেষ কাজ।
ডুকরে কেঁদে ওঠে ওয়াসেম,
"ত...তোর সাথে কে করেছে এমন? জান, আমার দিকে তাকা, কিচ্ছু হবে না তোর!"
নিজের গলায় শোনা এই আশ্বাসটাই তার কানে মিথ্যে শোনায়। কিচ্ছু হবে না? এই অবস্থায়? এই রক্ত, এই ভাঙা শরীর, দীর্ঘশ্বাসের ফাঁকে ফাঁকে আটকে যাওয়া নিঃশ্বাস? তারা দুজনেই জানে, সব শেষ হয়ে গেছে। এই আশ্বাসটা আসলে তৃষ্ণার জন্য নয় এটি ওয়াসেমের নিজের জন্য। মরতে বসা মানুষ ঠিক যেভাবে শেষ নিঃশ্বাসের আগে একটা মিথ্যে স্বপ্ন দেখতে চায়।
ওয়াসেমকে দেখে তৃষ্ণার ঘোলাটে চোখ দুটো সামান্য কেঁপে ওঠে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে জল নয়, জমাট বাঁধা রক্ত।
সে হয়তো ভেবেছিল, মৃত্যুর আগে তার ভালোবাসার মানুষটাকে আর কোনোদিন দেখতে পাবে না। এই অন্ধকার ঘরে, এই ময়লা মেঝেতেই তার সব শেষ হয়ে যাবে। কেউ জানবেও ঘন কেউ খোঁজও নেবে না। এই নরকীয় বাস্তবতার মাঝেও তার বুকের একটা কোণায় জেগে ছিল একটি ছোট্ট, দুর্বল আশা মরতে মরতেও মেয়েটার মাথায় ঘুরছে শুধুই একটাই ছবি ওয়াসেমের হাতে অন্য কারো হাত, ওয়াসেমের জীবনে অন্য কারো নাম। মৃত্যু তার কাছ থেকে যা কেড়ে নিয়েছে, তার চেয়েও বড় আঘাত দিয়ে গেছে একটি ভুল বোঝাবুঝি। সে মরতে যাচ্ছে এই ভেবে যে, সে হেরে গেছে অন্য একজনের কাছে।
কথাগুলো শুনে ওয়াসেম হু হু করে কেঁদে ওঠে। তার কান্না আর কোনো সাধারণ কান্না নয় এটি এক আহত পশুর ডাক। বুক ফাটা আর্তনাদে বলে ওঠে সে,
"আমি কোনো বিয়ে করিনি ওসব মিথ্যে ছিল! ওসব অভিনয় ছিল রে! তুই কেন বেরিয়ে আসতে গেলি? কেন? কেন?"
কিন্তু এই সত্যিটা বলার এত দেরি কেন হলো? এই সত্যটা যদি সেদিন বলা হতো, একটা সুস্থ ও হাসিমুখী তৃষ্ণার সামনে, তাহলে আজ এই মেঝেতে রক্তগঙ্গা বইত না। সত্যি যখন সময়মতো বলা হয় না, তখন তা আর সত্যি থাকে না। তা হয়ে যায় তীক্ষ্ণ কাঁটা, যা সারাজীবন বুকে বিঁধে থাকে।তৃষ্ণার গলা দিয়ে এখন আর স্বর ফুটছে না। প্রতিটি শব্দ বের করতে তার শরীরের শেষ শক্তিগুলো ধাপে ধাপে নিভে যাচ্ছে। ঠিক একটি হারিকেনের শেষ আলোর মতো, যা জ্বলার জন্যই জ্বলছে, নিভে যাওয়ার জন্য নয়। তবু শেষ শক্তিটুকু সঞ্চয় করে সে ওয়াসেমের দিকে তাকায়। তার প্রতিটি শব্দে মিশে থাকে বুকভাঙা অভিমান। এমন অভিমান, যা একটি গোটা জীবনের জমানো ভালোবাসার শেষ হিসাব,
"আমার এই নিষ্টুর পরিণতির দায়ভার আপনার রইল, ওয়াসেম। এক বিন্দু ভালোবাসা কি আমার প্রাপ্য ছিল না? আমার আপনার সাথে একটা ছোট্ট সংসার কেন হলো না, ওয়াসেম?"
একটা সুন্দর সংসার। এই তিনটি শব্দের ভেতর তৃষ্ণার কতগুলো স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেল! ছোট্ট একটা ঘর, ভোরের আলোয় ওয়াসেমের চায়ের কাপ, বিকেলের অভিমান, রাতের গল্প। এমন স্বপ্ন যা দেখতে কোনো টাকা লাগে না, লাগে শুধু একটু ভালোবাসা। আর ওই সামান্য ভালোবাসাটুকুও সে পায়নি। পেয়েছে বদলে এই অন্ধকার ঘর, এই রক্ত, আর একাকী মৃত্যু।
পাগলের মতো প্রলাপ বকতে থাকে ওয়াসেম,
"কিচ্ছু হবে না তোর। তোর মৃত্যু হলে আমি কী নিয়ে বাঁচব? বল, আমি কী নিয়ে বাঁচব? তুই এত বুঝদার একটা মেয়ে, তুই আমার ভালোবাসা বুঝিস না? আমি তোকে কতটা ভালোবাসি! ভালোবাসি রে! তুই ওসব বলিস না, কিচ্ছু হবে না তোর!"
আমি তোকে কতটা ভালোবাসি এই কথাটা সে জীবনে কতবার বলার সুযোগ পেয়েছিল! ভোরে, দুপুরে, রাতে, হাসতে হাসতে, আদর করে, কোলাহলের মাঝে। কিন্তু সে বলেনি। সে লুকিয়েছে, ভান করেছে, পরীক্ষা নিয়েছে ভেবেছিল ভালোবাসা সস্তা করে দিলে দাম কমে যায়। আজ অন্তরের সবটুকু জমানো কথা বলছে সে, একটা মরতে বসা কানের কাছে, যে কান হয়তো আর শুনছেই না। এটাই কি ভালোবাসার ভাগ্য? যা বলার ছিল, তা হাসিমুখে বলতে হয়। কান্নার ভেতর দিয়ে বললে তা আর কানে পৌঁছায় না, পৌঁছায় সোজা কবরে।
তৃষ্ণা আবারো গোঙ্গিয়ে ওঠে বড্ড আক্ষেপ নিয়ে বলে,
"আমার উপসংহারটা এমন মর্মান্তিক কেন হলো, ওয়াসেম? আজীবন আমি একবিন্দু সুখের আশায় কাঙাল হয়ে রইলাম, অথচ আমার প্রাপ্তির শূন্য খাতায় শুধুই সবার দেওয়া বুকচেরা অবহেলা আর হাহাকার! হ্যাঁ, আমি মৃত্যু চেয়েছিলাম ঠিকই... কিন্তু এতটা নিষ্ঠুর আর যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু তো আমি কোনোদিন চাইনি। শেষ নিঃশ্বাস ফেলার আগে বড্ড জানতে ইচ্ছে করছে, কেন করলেন এমন? কীসের এত আক্রোশ ছিল আপনার? আমাকে তো একটুখানি ভালোবাসলেও পারতেন ওয়াসেম! আপনার এই পাষাণ হৃদয়ে আমার জন্য কি একবিন্দু মায়াও জন্মায়নি, ওয়াসেম? কেন একটু ভালোবাসলেন না এই কুকুর টা কে?"
কথাগুলো শুনে ওয়াসেম হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। ওয়াসেমের বুক ফেটে যাচ্ছে তার কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে। ওয়াসেম তৃষ্ণার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিতেই শিউরে ওঠে। পশুগুলো তার তৃষ্ণার আঙুলগুলো পর্যন্ত নির্দয়ভাবে ভেঙে দিয়েছে, একটা হাড়ও আস্ত নেই! আঙ্গুল গুলো ভেঙ্গে গেছে।দশটা আঙুল, দশটাই বেঁকে গেছে অস্বাভাবিক কোণে, ঠিক শুকনো ডালের মতো ভেঙে দেওয়া।
নরপশুদের নিষ্ঠুর থাবায় ক্ষতবিক্ষত তার বক্ষপিঞ্জর, যেখান থেকে চুঁইয়ে পড়ছে বিন্দু বিন্দু তাজা রক্ত। তৃষ্ণার বিধ্বস্ত, ক্ষতবিক্ষত হাতে চুমু খেয়ে ওয়াসেম চিৎকার করে কান্না করে ওঠে,
"আল্লাহ! তুমি এত বড় শাস্তি আমায় কীভাবে দিলে! আমার অপরাধের শাস্তি ওকে কেন দিলে আমায় দিলে না কেন!"
মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তে তৃষ্ণা শেষবারের মতো বলে। তার কণ্ঠস্বর এতটাই ক্ষীণ যে শুনতে পাওয়া যায় না তবু প্রতিটি শব্দ ওয়াসেমের বুকের ভেতর নেমে যায় আগুনের শলাকার মতো, যেখানে সেগুলো সারাজীবন জ্বলতে থাকবে, নেভার কোনো উপায় নেই,
"আমায় অবহেলা করার যে অপরাধ আপনি করেছেন, তার আজীবনের শাস্তি হিসেবে আমার এই বীভৎস মৃত্যুই আপনার প্রাপ্য।"
কথাটা শেষ করেই ওয়াসেমের বুকের ওপর চোখ বুজে নেয় তৃষ্ণার। মুহূর্ত আগেও যে শরীরটায় প্রাণের গোঙানি ছিল, যে ঠোঁট কাঁপছিল, যে চোখে শেষ আলোটা জ্বলছিল পরক্ষণেই তা হয়ে গেল একটি ভারী, হিমজমাট, নিথর পিণ্ড। ওয়াসেমের বুকের ওপর চেপে বসা ভারটা এখন আর কোনো মানবদেহের ভার নয় এটি তার কাছে একটি গোটা পৃথিবীর ভার, যা সে কোনোদিন নামাতে পারবে না। এই অবয়ব আর কোনোদিন "ওয়াসেম" বলে ডাকবে না। কোনোদিন অভিমান করবে না। কোনোদিন তার দিকে তাকাবে না। কোনোদিন হাসবে না।
আর এই না-গুলোই একে একে ওয়াসেমের বুকের ভেতর গেঁথে যেতে থাকে পেরেকের মতো। বাইরে এখন আকাশ ভেঙে তুমুল বৃষ্টি নেমেছে। প্রকৃতিও এই অন্যায়ের সাক্ষী হয়ে নিজের সব জল ঢেলে দিচ্ছে। আকাশ প্রচ্ছন্ন স্বরে বলছে, 'মানুষ, তোর চোখের জল শেষ হয়ে গেলে আমার জল দিয়ে কান্না করিস।' বৃষ্টির ফোঁটা ভাঙা জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ছে ঘরের ভেতর, তৃষ্ণার রক্তমাখা মুখ ধুয়ে দিচ্ছে ফোঁটায় ফোঁটায়। প্রকৃতি শেষবারের মতো হয়তো তৃষ্ণার মুখটা সযত্নে ধুয়ে দিয়ে চিরবিদায় জানাচ্ছে।
প্রকৃতির এই কান্নার মাঝেই পরিত্যক্ত কোয়ার্টারের স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে আজ হয়তো একসাথে দুটো সত্তার মৃত্যু হলো। একজনের শারীরিক মৃত্যু, আর অন্যজনের আত্মার। তৃষ্ণা মরেছে একবার কিন্তু ওয়াসেম মরবে এখন থেকে প্রতিদিন। ভোরে একবার, রাতে একবার, প্রতিটি নিঃশ্বাসে একবার করে।
ওয়াসেমের বুকের ভেতরটা ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। তার বুকফাটা চিৎকারে সে আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলছে।
তৃষ্ণার মুখের কাছে নিজের কান ঠেকিয়ে সে বারবার বলে চলেছে,
"একটা কথা বল... শুধু একটা কথা বল পাখি... আমি মিথ্যে বলিনি, আমি সত্যিই বিয়ে করিনি... তুই একবার শুনে যা... একবার... তুই।"
কিন্তু শেষমেশ তার হিসাবটাই ভুল প্রমাণিত হলো। মিথ্যে বিয়ে ছিল, মিথ্যে অভিনয় ছিল কিন্তু তৃষ্ণার চোখ বোজা মিথ্যে নয়। এটি এমন একটা ধ্রুব সত্য, যা আর কোনো ব্যাখ্যায়, কোনো প্রমাণে, কোনো ক্ষমা-প্রার্থনায় ফেরানো যাবে না। মৃত্যু হলো এমন এক বিচারক, যার আদালতে কোনো আপিল নেই, কোনো শুনানি নেই, কোনো দ্বিতীয় সুযোগ নেই।তার শিরায় শিরায় এখন শুধুই অনুশোচনার তীব্র দহন। কিন্তু বড় দেরি হয়ে গেছে। এই অবেলার অনুশোচনায় আজ আর কোনো লাভ নেই। অনুশোচনা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর জিনিস এটি আসে ঠিকই, কিন্তু আসে সবসময় দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে।সময় তার হিসেব চুকিয়ে অনেক দূর পেরিয়ে গেছে। আর কোনো এক ভোরে, এই পৃথিবীর অন্য কোনো শহরে হয়তো মানুষ নতুন সংসার পাতবে, নতুন স্বপ্ন দেখবে। কিন্তু ওয়াসেম জানে, তার কাছে আর কোনো ভোর নেই। তার ভোর আজ এই স্যাঁতসেঁতে মেঝেতেই চিরকালের জন্য অস্ত গেছে।
চলবে,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 72 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন