সময়ের ধর্মই বয়ে চলা, কারোর জন্য সে এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে না। শিকদার বাড়ির ইট-পাথরের উঁচু দেয়াল আর প্রশস্ত চত্বর জুড়েও সময়ের চাকা ঘুরে চলে গেছে অনেকটা পথ। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ ছয়টা মাস। তৌসির আর নাজহার মধ্যকার অতীতের তিক্ততা, রক্তক্ষরণ আর ঘৃণার পাহাড় আজ আর অবশিষ্ট নেই। পুরোনো দিনের ধুলো ঝেড়ে ফেলে ওদের সম্পর্কে এখন ভালোবাসার মৃদু বাতাস বইছে। তবুও কিছু ক্ষত সময়ের প্রলেপে শুকিয়ে গেলেও তার দাগ থেকে যায় বুকের ভেতরে। আজ তালহা ভাইয়ের মৃত্যুর ঠিক ছয় মাস পূর্ণ হলো। মৃত্যুর আগে উনার রেখে যাওয়া শেষ চিঠিটা পড়ে সেদিন বুক ফাটিয়ে কেঁদেছিল নাজহা। সাদা কাগজের ভাঁজে ভাঁজে জড়িয়ে থাকা তালহা ভাইয়ের না বলা কথাগুলো নাজহার কলিজাটা ছিঁড়েখুঁড়ে দিয়েছিল। আজও নিজের আলমারির গোপন লকারে ভাঁজ করে চিঠিটা ভীষণ যত্নে তুলে রেখেছে সে।
দুঃখের কালো মেঘ সরিয়ে শিকদার বাড়ির আকাশে এখন তিন টুকরো চাঁদের আলো ঝলমল করে। তুরাব, নাওয়াব আর তৌশি। তিন ভাইবোন দেখতে দেখতে এখন সাড়ে তেরো মাসের হয়ে গেছে। সাধারণ বাচ্চাদের তুলনায় ওরা তিনজনই একটু বেশি চঞ্চল আর ডানপিটে। মাত্র এগারো মাস বয়সেই তিনজন গুটিগুটি পায়ে হাঁটা শিখে ফেলেছিল। হাঁটা শেখার পর থেকেই নাজহার কোমরের ব্যথা আর পায়ের দৌড় বেড়ে গেছে। আর এখন তো কথাই নেই, সাড়ে তেরো মাসের এই তিন খুদে তুফানের দাপটে সারা শিকদার বাড়ি মুখরিত থাকে। একজনকে সোফায় বসালে আরেকজন টেবিলের নিচে ঢুকে পড়ে, তাকে টেনে বের করতে গেলে তৃতীয়জন সিঁড়ির দিকে দৌড় লাগায়। ওদের মুখে বুলিও ফুটেছে বেশ তাড়াতাড়ি। আধো আধো স্বরে ‘মামা’, ‘বাবা’, ‘দাদা’, ‘দে’ আর ভাঙা ভাঙা দু-একটা শব্দ ওদের কচি মুখ থেকে খইয়ের মতো ফোটে, যা শুনে বাড়ির সবার বুকটা জুড়িয়ে যায়। গোলগাল গাল আর বড় বড় চোখের তিনজন সত্যিই তিন টুকরো চাঁদের কণা হয়েছে, ওদের একসাথে দেখলেই চোখ আর মন দুটোই ভরে ওঠে।
এই ছয় মাসে জীবনের অনেক জট খুলে গেছে। তৌসির, ওয়াসেম আর ইয়াদ মিলে নাজহার সামনে অতীতের সব অন্ধকার পর্দা সরিয়ে দিয়েছে। তৌসির কেন নাজহার মাস্টারচাচ্চুকে খুন করতে বাধ্য হয়েছিল, কোন পরিস্থিতির শিকার হয়ে সে এতটা নিষ্ঠুর আর পাথর হয়ে উঠেছিল, আর বিবিজানের আড়ালে থাকা সমস্ত পৈশাচিক অত্যাচারের ইতিহাস, সবটাই নাজহাকে অকপটে খুলে বলেছে তৌসির। সবটা শোনার পর নাজহা তৌসিরকে পুরোপুরি মাফ করে দিয়েছে তা নয়, বুকের ভেতর অভিমানের রেশ রয়েই গেছে, কিন্তু বাস্তবতাকে সে ধীরে ধীরে মেনে নিয়েছে। পুরোনো ক্ষতগুলোকে পেছনে ফেলে তৌসিরের হাত ধরে আর সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে নতুন করে বাঁচা শুরু করেছে সে।
অন্যদিকে বিবিজানের অবস্থা এখন শোচনীয়। নিজের পাপের ফসল তাকে হাতেনাতে ভোগ করতে হচ্ছে। কথা মতো নির্দিষ্ট সময়ে বলি না দেওয়ার কারণে তারই পোষা জিনগুলো উল্টো তার ওপর চড়াও হয়েছিল, তার মানসিক ভারসাম্য পুরোপুরি তছনছ করে দিয়েছে। নিজের পাতা মরণফাঁদে নিজেই ধ্বংস হয়ে গেছেন একসময়ের দাপুটে এই নারী। মাঝখানে তো পরিস্থিতি এতটাই বীভৎস হয়ে উঠেছিল যে, নিজের শরীরের মাংস নিজেই দাঁত দিয়ে কামড়ে খেয়ে নিতেন তিনি। রক্তাক্ত ও ভয়াবহ দৃশ্যটা দেখলে যে কারোর গা শিউরে উঠত। পরবর্তীতে তওবা করিয়ে, বড় বড় ডাক্তার আর নামী কবিরাজ দেখিয়ে উনাকে কিছুটা শান্ত করা গেছে ঠিকই, কিন্তু আগের বিবিজান আর বেঁচে নেই। স্মৃতিশক্তি হারিয়ে সব ভুলে গেছেন, এখন তিনি পুরোপুরি উন্মাদ, এক কথায় বদ্ধ পাগল।
বিবিজানের এই করুণ পরিণতির পেছনে নাজহার নিজেরও হাত আছে। বিবিজানের অত্যাচারের কথা জানার পর নাজহা চুপ করে বসে থাকেনি, সে উনার ওপর হোয়াইট ম্যাজিক অর্থাৎ রূহানী আমল প্রয়োগ করেছে। মহান আল্লাহর পবিত্র এমন একটি নাম আছে, যা কোনো মজলুম ব্যক্তি কিংবা মজলুমের পক্ষ হয়ে অন্য কেউ টানা দশ হাজার বার পাঠ করলে জালেমের ওপর সরাসরি আল্লাহর গজব নেমে আসে। শর্ত একটাই, যার হয়ে এই বদদোয়া করা হচ্ছে, সেই মজলুম মানুষটিকে বিষয়টা জানতে হবে। তৌসিরের ওপর হওয়া ছোটবেলার অন্যায়ের বিচার চেয়ে তৌসিরের হয়েই নাজহা জায়নামাজে বসে পবিত্র নামটি জপে অভিশাপ দিয়েছিল, আর তৌসির নিজেও এই পুরো বিষয়টা জানত। রূহানী শক্তির প্রভাবেই বিবিজানের আজ এই জীবন্ত লাশের মতো দশা।
তৌসির তো চেয়েছিল এই পাপিষ্ঠ নারীকে পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দিতে, বাঁচিয়ে রাখার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার ছিল না। কিন্তু নাযেম চাচা আর নিজের বাবা মিনহাজ মামার অনুরোধের কারণে সে তাকে প্রাণে মারতে পারেনি। বিবিজানের সমস্ত কালো জগতের ভার এখন তৌসিরের কাঁধে এসে পড়েছে। বিবিজানের গড়ে তোলা এই পাপের সাম্রাজ্য, অস্ত্র পাচার, অর্গান পাচারের মতো ভয়ংকর সব অন্ধকার ব্যবসা এখন তৌসির একাই সামলায়। তবে সে আর এই রক্ত আর পাপের পথে থাকতে চায় না। তৌসির ধীরে ধীরে এই অন্ধকার জগতের সমস্ত সুতো কেটে ফেলছে, সব ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে নিজের হাত থেকে। তার ভেতরের হিংস্র পশুটাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে সে এখন নাজহা আর তার তিন সন্তানকে নিয়ে একটা নির্ভেজাল সুখের জীবন চায়। কিন্তু এত বড় একটা আন্ডারওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক রাতারাতি গুটিয়ে নেওয়া তো মুখের কথা নয়, সবকিছু পুরোপুরি থামাতে তার আরও কিছুটা সময় লাগবে।
উপর থেকে দেখলে মনে হয় সব ঠিক হয়ে গেছে, কিন্তু ভালো করে তাকালে বোঝা যায় কোথাও কিছু একটা আজও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। ওয়াসেম আর তৃষ্ণা এখানে এক মাস থাকার পর ইন্ডিয়া চলে গেছে। শিকদার বাড়ির আবহাওয়ায় আর সবার সাহচর্যে থেকে তৃষ্ণা আগের চেয়ে কিছুটা সুস্থ হয়েছে। ভয়ংকর মানসিক ট্রমাটা সে আপাতত কাটিয়ে উঠতে পেরেছে, শারীরিকভাবেও সে এখন বেশ ভালো আছে। কিন্তু ওয়াসেমের সাথে তার সম্পর্কের বরফ আজও গলেনি, দুজনের মধ্যকার দূরত্ব আর তিক্ততা আগের মতোই রয়ে গেছে। এর মাঝেই বাড়িতে একটা আনন্দের সানাই বেজেছে, রুদ্র আর সিমরানের বিয়েটা ধুমধাম করে সম্পন্ন হয়ে গেছে।
অতীতের পাতা উল্টে এবার বর্তমানে ফেরা যাক।
দুপুরের রোদের তেজ কমে বিকেলের আলোটা মিষ্টি হয়ে এসেছে। ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে তৌশি আর নাওয়াব সারা বাড়ি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। পায়ে রুপোর নূপুর পরা তৌশি হাঁটলেই রুমঝুম আওয়াজ ওঠে, আর তার পেছন পেছন নাওয়াব ছুটে চলে বোনের চুলের ঝুঁটি ধরার জন্য। চুলগুলো তার ভীষণ সুন্দর আহা কি যে সুন্দর এই তিনটা পুতুল। কিন্তু তাদের আরেক ভাই তুরাবের আজ কোনো সাড়াশব্দ নেই। প্রচণ্ড জ্বরে বাচ্চাটার শরীর পুড়ে যাচ্ছে, সে ঘরের বড় বিছানাটায় নিস্তেজ হয়ে ঘুমিয়ে আছে। হঠাৎ করে এই অসময়ে বাচ্চার জ্বর আসার কারণ কী? কারণ আর কেউ নয়, স্বয়ং তাদের গুণধর পিতা জাউরা তৌসির শিকদার। আজ দুপুরে নাজহা যোহরের নামাজে দাঁড়ানোর ফাঁকে তার চোখ এড়িয়ে তৌসির তিন বাচ্চাকে নিয়ে শিকদার বাড়ির পেছনের শানবাঁধানো পুকুরে নেমে গোসল করিয়েছে। বাপ-বেটাদের জলকেলি চলেছিল প্রায় আধঘণ্টা ধরে।
তারই ফলাফলস্বরূপ এখন ঘরের ভেতর রণক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তৌসির বেলকনির সোফায় একদম চুপটি করে বসে আছে, আর তার চারপাশে ফ্লোর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে ভাঙা কাঁচের টুকরো, ফুলদানি আর শো-পিস। এই ভাঙচুর আর কেউ করেনি, রাগের চোটে নাজহা নিজেই একটার পর একটা জিনিস আছড়ে ভেঙেছে। তুরাবের গায়ে হাত দিয়ে জ্বর দেখার পর থেকেই তার মাথায় রক্ত চড়ে গেছে। নাজহা ঘর থেকে গটগট করে হেঁটে বেলকনির দরজায় এসে দাঁড়ায়, তার হাতে ধরা প্লাস্টিকের ফিডারটা সজোরে সোফার পাশে ফ্লোরে ছুড়ে মারে। ফিডারটা মেঝেতে বাড়ি খেয়ে ছিটকে যায়, ভেতরে থাকা দুধটুকু মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে। নাজহা কোমরে হাত দিয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ওঠে, "কাণ্ডজ্ঞান নেই আপনার? বেহায়া, বেহেদাত পুরুষ একটা! কত করে আপনাকে সকাল থেকে বলেছিলাম বাচ্চাদের পুকুরে নিয়ে গোসল করাবেন না, ঠান্ডা লাগবে। তাও আমার কথা কানে না তুলে ঠিকই পুকুরে নামিয়েছেন! এখন একটার গায়ে জ্বর আসছে, তার মানে নিশ্চিত থাকেন বাকি দুইটারও আজ রাতের মধ্যে জ্বর আসবে। আপনার কী? আপনি তো কাজ আছে বলে শার্টের কলার উঁচিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান, আর সারাদিন এরা তিনজন মিলে আমার মগজটা চিবিয়ে খায়! আজ রাতে যদি এদের একটাও জ্বরের চোটে কাঁদে না, তাহলে আপনাকে আমি একদম 'আল্লাহ আল্লাহ' ডাকিয়ে ছাড়ব, দেখে নিয়েন!"
বাইরের দুনিয়ায় যার নামের ওপর বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খায়, যে তৌসিরের চোখের ইশারায় মানুষ খুন হয়ে যায়, সেই তৌসির শিকদার এখন বউয়ের ঝাড়ি খেয়ে ভেজা বিড়ালের মতো গুটিসুটি মেরে সোফায় বসে আছে। টু শব্দটি করার সাহস তার হচ্ছে না। সে খুব ভালো করেই জানে, এই মুহূর্তে মুখ ফুটে একটা শব্দ বললে নাজহার হাতের একটা মারও মাটিতে পড়বে না, সব তার পিঠেই ল্যান্ড করবে।
নাজহা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে পা দাপিয়ে নিচে চলে যায়। ড্রয়িংরুমে নেমে দেখে তৌসিরের মেঝো চাচা আর বাবার সাথে তৌশি আর নাওয়াব খেলছে। নাওয়াব দাদার চশমাটা টেনে খুলে নেওয়ার চেষ্টা করছে, আর তৌশি দাদির পানদানিটা উল্টে দিয়ে মেঝেতে বসে খিলখিল করে হাসছে। নাজহাকে এভাবে গম্ভীর মুখে ঝড়ের বেগে নিচে নামতে দেখে সিমরান এগিয়ে আসে। ওর কপালে চিন্তার ভাঁজ, সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, "কী হয়েছে ভাবি? মুখটা এমন ভার করে রেখেছ কেন? এত রেগে আছো কেন?"
নাজহা বুকের ভেতর জমে থাকা একরাশ বাতাস দীর্ঘশ্বাসের সাথে বাইরে বের করে দেয়। সিমরানের দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে বলে, "আর বলো না সিমরান! তোমার গুণধর ভাইকে সকাল থেকে কত করে বলেছি এদের আজ পুকুরে নিবেন না। তাও আমার কথা না শুনে তিনটাকে নিয়ে পুকুরের পানিতে ডুবিয়ে নিয়ে আসছেন। এখন তুরাবের উঠেছে ধুম জ্বর, বিছানায় পড়ে আছে। বাকি দুইটারও জ্বর উঠলে উপায় হবে কী বলো তো? এরা একেকটা অসুস্থ হলে তো পুরো বাড়ির মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে, কারোর চোখে আর ঘুম থাকে না।"
তৌসিরের মা রান্নাঘর থেকে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ড্রয়িংরুমে আসছিলেন। বউমার মুখে নাতির জ্বরের কথা শুনেই তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কাছে এসে বলেন, "হায় আল্লাহ, বলো কী। তাড়াতাড়ি এক বাটি সরিষার তেলে কয়েক কোয়া রসুন আর কালোজিরা ভালো করে ফুটিয়ে নেও তো। তেলটা উষ্ণ থাকতে থাকতেই তুরাবের পায়ের পাতায়, হাতের তালুতে আর বুকে-পিঠে ভালো করে ঘষে দেও মা। এই তৌসির ছেলেটার জ্বালায় আমি আর পারব না, কবে যে এর আক্কেল হবে! নিজে তিন বাচ্চার বাপ হয়েছে অথচ সবসময় ওর ভেতর বাচ্চামি ভর করে থাকে।"
শাশুড়ির কথা শুনে নাজহার রাগ আরও উসকে ওঠে। সে অভিমান আর ক্ষোভ মিশিয়ে বলে, "আম্মা, আপনি আপনার ছেলেকে ডেকে ভালো করে বুঝিয়ে বলুন তো! প্রতিদিন এরকম পাগলামি করলে তো সংসার চলবে না। আমার একেকটা দিন যায় চিল্লাতে চিল্লাতে, কখনো আপনার ছেলের পেছনে চিল্লাই তো কখনো উনার এই তিন বাঁদর বাচ্চাদের সাথে! আমার তো গলার রগ ছিঁড়ে যাওয়ার অবস্থা হয়।"
পাশেই সোফার পাশে গিয়ে তৌশির হাত থেকে সুপারি কেড়ে নিচ্ছিলেন তৌসিরের মেজো চাচী। নাজহার এই নাজেহাল অবস্থা দেখে তিনি মুখ টিপে হেসে বলেন, "আরে মা, এত রাগ করলে চলে? সংসারের আসল মজা তো এখানেই, এবার বোঝো ঠেলা! স্বামী আর সন্তানদের এই জ্বালাতন নিয়েই তো আসল সংসার। ওরা বড় হয়ে গেলে এই দিনগুলোর কথাই মনে করে হাসবে।"
চাচীর কথায় নাজহা আর কিছু না বলে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়। তেল-রসুনের ব্যবস্থা করে সে বাচ্চাদের জন্য গলিয়ে সবজি আর ডাল দিয়ে খিচুড়ি রান্না করে। বড় একটা বাটিতে গরম খিচুড়ি বেড়ে বাড়ির কাজের মেয়েটাকে ডেকে বলে, "এই শোন, বাটিটা সাবধানে উপরে আমার ঘরে রেখে আসো তো, আর সাথে তেলের বাটিটাও নিয়ে যাও। আমি বাচ্চাদের নিয়ে আসছি।"
কাজের মেয়েটা বাটি নিয়ে উপরে চলে গেলে নাজহা ড্রয়িংরুম থেকে নাওয়াব আর তৌশিকে দুই কাঁধে কোলে তুলে নেয়। নাওয়াব মায়ের কোলে উঠেই নাজহার চুলের খোঁপাটা টেনে খুলে দেয়, আর তৌশি মায়ের গলার চেইনটা মুখে পুরে চুষতে শুরু করে। সাড়ে তেরো মাসের দুটো হৃষ্টপুষ্ট বাচ্চাকে একসাথে কোলে নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় ওঠা চাট্টিখানি কথা নয়। হাঁপাতে হাঁপাতে নাজহা ঘরে ঢোকে, এর মধ্যেই কাজের মেয়েটা খিচুড়ির বাটি টেবিলে রেখে নিচে চলে গেছে।
নাজহা ঘরে ঢুকে বিছানার দিকে তাকাতেই চমকে ওঠে। বিছানা খালি! তৌসির কিংবা তুরাব কেউই ঘরের ভেতর নেই। নাজহার বুকটা ধক করে ওঠে। সে তড়িঘড়ি করে বেলকনির দরজার কাছে গিয়ে উঁকি দিতেই দেখে, তৌসির অসুস্থ তুরাবকে নিজের চওড়া কাঁধে ফেলে চুপচাপ এপাশ থেকে ওপাশে হাঁটছে, আর এক হাত দিয়ে স্নেহভরে ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তুরাব বাবার কাঁধে মুখ গুঁজে আধবোজা চোখে তাকিয়ে আছে।
মায়ের কোলে থাকা তৌশি আর নাওয়াব বেলকনিতে বাবার দেখা পেয়েই ছটফট শুরু করে দেয়। নাজহার কোল থেকে দুজনেই মাছের মতো পিছলে মেঝেতে নেমে পড়ে আর টলমল পায়ে বেলকনির দিকে দৌড়ে যায়। নাজহা আঁতকে উঠে ওদের পেছন পেছন ছোটে, কারণ একটু আগেই সে বেলকনিতে কাঁচের জিনিস আর ফিডার ভেঙে রেখে গেছে, বাচ্চাদের কচি পায়ে ভাঙা কাঁচ-টাচ গেঁথে যেতে পারে! কিন্তু বেলকনিতে পা রাখতেই নাজহা থমকে দাঁড়ায়। পুরো বেলকনির মেঝে একদম ঝকঝকে পরিষ্কার, এমনকি ফিডারের দুধটুকুও মুছে ফেলা হয়েছে। সে নিচে থাকার এইটুকু সময়ের মধ্যেই তৌসির নিজে ঝাড়ু দিয়ে সব ভাঙা কাঁচ আর আবর্জনা পরিষ্কার করে ফেলেছে, যাতে তার বাচ্চাদের কিংবা বউয়ের পায়ে কোনো আঘাত না লাগে।
এদিকে নাওয়াব আর তৌশি দৌড়ে গিয়ে তৌসিরের দুই পা জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে। তৌসিরের লুঙ্গির কাপড় খামচে ধরে নিচ থেকে ছোট্ট মুখ দুটো উপরের দিকে তুলে আধো স্বরে বায়না ধরে, "ব-ব-বাবা... কোলে! কোলে!"
তৌসিরের কাঁধে জ্বরে কাতর তুরাব। সে অসহায় ভঙ্গিতে একবার নাজহার মুখের দিকে তাকায়, তো আরেকবার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা তৌশি আর নাওয়াবের দিকে তাকায়। একসাথে তিনজনকে সে কীভাবে সামলাবে বুঝতে পারছে না। তার এই করুণ অবস্থা দেখে নাজহার রাগটা নিমেষেই গলে জল হয়ে যায়। সে এগিয়ে এসে তৌসিরের কাঁধ থেকে সাবধানে তুরাবকে নিজের কোলে তুলে নেয়। তারপর তৌসিরের দিকে তাকিয়ে কৃত্রিম গম্ভীর স্বরে বলে, "নিন, এবার ওদের দুজনকে কোলে নিন। নয়তো আপনার মেয়ে এখন একাই চিৎকার করে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে নেবে।"
নাজহার অনুমতি পেয়ে তৌসিরের মুখে হাসি ফোটে। সে নিচু হয়ে নাওয়াব আর তৌশিকে দুই হাতে কোলে তুলে নিয়ে সোফায় বসে পড়ে। বাচ্চাদের কপালে কপাল ঠেকিয়ে হেসে বলে, "এই তো, বাবা কোলে নিছে তো আমার সোনা পাখিদের!"
বাবার কোল পেয়েই তৌশি আর নাওয়াবের আদর উথলে ওঠে। দুজনে মিলে তৌসিরের দুই গালে আর নাকে ফোকলা দাঁতে চুমু খেতে শুরু করে। ওদের কচি মুখের লালায় তৌসিরের পুরো মুখ ভিজে একাকার হয়ে যায়, অথচ তৌসিরের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, সে চোখ বন্ধ করে সন্তানদের এই ভেজা আদরটুকু উপভোগ করছে।
পাশে দাঁড়িয়ে নাজহা নিজের কোলে থাকা তুরাবের দিকে তাকায়। বাড়ির সবচেয়ে দুরন্ত, চঞ্চল ছেলেটা আজ জ্বরের চোটে একদম শান্ত হয়ে মায়ের কাঁধে মাথা ফেলে রেখেছে। সর্দি আর তাপের কারণে বাচ্চাটার নাক আর গাল দুটো পাকা টমেটোর মতো লাল হয়ে গেছে, বাবার মতো পাওয়া নীলচে চোখ জোড়াও জ্বরের ঘোরে লালচে হয়ে ছলছল করছে। দৃশ্যটা দেখেই নাজহার মায়ের মনটা হু হু করে ওঠে। সে নিজের হাতের ওড়নার আঁচল দিয়ে খুব আলতো করে তুরাবের ভেজা নাকটা মুছে দেয়। ছেলের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে আদুরে গলায় বলে, "চলো বাবা, আমরা এখন ঘরে গিয়ে একটু খাবার খাবো, কেমন?”
এই বলে নাজহা তুরাবকে কোলে নিয়ে বেলকনি থেকে ঘরের ভেতর চলে আসে। বিছানায় হেলান দিয়ে বসে সে নিজের বুকের কাপড় সরিয়ে তুরাবের মুখে দুধ তুলে দেয়। বাচ্চাটার শরীর খারাপ, এই অবস্থায় সে কিছুতেই খিচুড়ি মুখে তুলবে না, মায়ের দুধটুকুই তার একমাত্র ভরসা। তুরাবকে খাওয়াতে খাওয়াতেই নাজহা বেলকনির দিকে মুখ ফিরিয়ে তৌসিরকে আওয়াজ দেয়, "এই যে শুনছেন, ওদের দুজনকে এবার ঘরের ভেতর নিয়ে আসুন। টেবিলে খিচুড়ি রাখা আছে, ওদের খাইয়ে দিন।"
ডাক শুনেই তৌসির বাধ্য স্বামীর মতো নাওয়াব আর তৌশিকে বগলদাবা করে ঘরে নিয়ে আসে। টেবিল থেকে খিচুড়ির বাটিটা হাতে তুলে নেয়। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে সাথে সাথেই। তুরাবকে মায়ের বুকে দুধ খেতে দেখে নাওয়াব আর তৌশিও গোঁ ধরে বসে। তৌসির চামচে করে খিচুড়ি ওদের মুখের সামনে ধরতেই দুজনে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। তারা এখন কিছুতেই খিচুড়ি খাবে না, ভাইয়ের মতো তারাও মায়ের বুকের দুধ খাবে।
তৌসির পড়ে যায় মহা বিপদে। সে দুজনকে বিছানার একপাশে বসিয়ে হাতে খিচুড়ির বাটি নিয়ে ওদের ভোলানোর চেষ্টা করে। চামচটা ওদের মুখের কাছে নাড়াতে নাড়াতে মজার ছলে বলে, "খেয়ে নে মা-বাপরা আমার! তুরাবের তো জ্বর, ও দুধ খাক। আইজ তো দেখতাছি আমার নিজের কপালেই কিছু জুটবো না, তোদের মা তোদেরকে আর কী দিবে! হাঁ করো, আজ তোদের সাথে তোদের বাবাও খিচুড়ি খাবে।"
বাবার কথার ভঙ্গি দেখে তৌশি মজা পেয়ে যায়। সে তৌসিরের হাতের চামচ থেকে এক মুখ খিচুড়ি নেয় ঠিকই, কিন্তু সেটা না গিলে দুষ্টুমি করে মুখের ভেতর বাতাস ভরে সজোরে 'ফুঁউউ' করে দেয়। সাথে সাথে মুখের সব খিচুড়ি ছিটে গিয়ে সোজা তৌসিরের মুখে, নাকে আর চাপদাড়িতে লেপ্টে যায়। বাবার মুখের এই হাল দেখে তৌশি নিজের দুই হাত তালি দিয়ে খিলখিল করে হেসে ওঠে।
বোনকে এমন মজার খেলা খেলতে দেখে ভাই নাওয়াবই বা পিছিয়ে থাকবে কেন? সে এক ধাপ এগিয়ে সরাসরি তৌসিরের হাতের খিচুড়ির বাটির ভেতর নিজের ছোট্ট হাতটা ডুবিয়ে দেয়। এক মুঠো মাখানো খিচুড়ি তুলে নিয়ে তৌসিরের দুই গালে কাদার মতো লেপে দেয়, তারপর বোনের সাথে তাল মিলিয়ে সেও খিলখিল করে হেসে বিছানায় গড়াগড়ি খায়। বাচ্চাদের এই বাঁদরামি দেখে রাগ করার বদলে তৌসির নিজেও হো হো করে প্রাণখোলা হাসিতে ফেটে পড়ে।
বিছানার অন্য পাশ থেকে তৌসিরের খিচুড়ি মাখা ভূতের মতো চেহারা আর ধবধবে সাদা বিছানার চাদরের বারোটা বাজার দৃশ্য দেখে নাজহার চোখ কপালে ওঠে। সে কটমট করে তৌসিরের দিকে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলে, "আপনার মনে হয় আজ সত্যি সত্যি আমার হাতে জুতাপেটা হওয়ার শখ জেগেছে, তাই না? খাওয়াতে বলেছি নাকি বাচ্চাদের সাথে নিয়ে খিচুড়ি দিয়ে হোলি খেলতে বলেছি?"
বউয়ের ধমক খেয়ে তৌসির গালে লেগে থাকা খিচুড়ি হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছতে মুছতে মৃদু হাসে। নাজহার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে ফিসফিস করে বলে, "দূর ছিনাল, সবসময় এমনে কস ক্যান? এখানে আমি কী করব বল? আমি তো খাওয়াতেই গেছিলাম, ওদেরই তো যত সমস্যা!”
তৌসিরের মুখে গালিটা আর অসহায় আত্মসমর্পণ দেখে নাজহা নিজের ঠোঁটে চলে আসা হাসিটা ঢাকতে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। তুরাব ততক্ষণে দুধ খেতে খেতে আবার চোখ বুজে ফেলেছে। নাজহা তুরাবকে আলতো করে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বাটি থেকে রসুনের তেল নেয়। তুরাবের ছোট্ট পায়ের পাতায় আর বুকে তেল মালিশ করতে করতে তৌসিরকে নির্দেশ দেয়, "এভাবে খিচুড়ি মাখা ভূত হয়ে বসে না থেকে ওয়াশরুমে গিয়ে মুখটা ধুয়ে আসুন। আর আসার সময় তোয়ালে ভিজিয়ে আনবেন, এই দুই শয়তানের হাত-মুখ মুছিয়ে দিতে হবে।"
তৌসির বাধ্য ছেলের মতো উঠে ওয়াশরুমে যায়। মুখ ধুয়ে ভেজা তোয়ালে নিয়ে এসে সে নাওয়াব আর তওশির হাত-মুখ মুছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু ওরা কি আর স্থির থাকে! তোয়ালে নিয়ে টানাটানি শুরু করে দেয়। শেষে নাজহা নিজেই এগিয়ে এসে কড়া চোখে তাকাতেই দুই ভাইবোন সুড়সুড় করে মায়ের হাত থেকে অবশিষ্ট খিচুড়িটুকু খেয়ে নেয়। বাবার সামনে যত দুষ্টুমি, মায়ের এক ধমকেই তারা সোজা।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে শিকদার বাড়িতে। তুরাবের জ্বরটা প্যারাসিটামল সিরাপ দেওয়ার পর একটু কমেছিল, কিন্তু মাগরিবের আজানের পর থেকেই নাজহার সকালের আশঙ্কা সত্যি হতে শুরু করে। এতক্ষণ যে নাওয়াব আর তৌশি সারা ঘর মাথায় তুলে নাচছিল, হঠাৎ করেই তাদের চঞ্চলতা কমে আসে। নাওয়াব মেঝেতে বসে খেলনা গাড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎ করেই ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। আর তৌশি সোফার কুশন আঁকড়ে ধরে ঘ্যানঘ্যান শুরু করে।
নাজহা তুরাবের কপালে জলপট্টি দিচ্ছিল। ওদের কান্নার ধরন দেখেই নাজহার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। সে তড়িঘড়ি করে উঠে গিয়ে নাওয়াব আর তৌশির গলায় আর কপালে হাত দেয়। সাথে সাথে নাজহার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে যায়। দুজনের শরীরই তপ্ত তাওয়ার মতো গরম হয়ে উঠছে! পুকুরের পানির আসল কারিশমা এবার তিনজনের ওপরেই সমানভাবে ফলতে শুরু করেছে।
ঠিক এই সময়েই তৌসির নিচ থেকে উপরে আসে। তার হাতে বাচ্চাদের জন্য কেনা নতুন কয়েকটা খেলনা আর চকলেট। কিন্তু ঘরে ঢুকেই সে পরিবেশের গম্ভীরতা টের পায়। নাজহা মেঝেতে বসে দুই হাঁটুর মাঝখানে নাওয়াব আর তৌশিকে ধরে রেখেছে, আর অগ্নিদৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। তৌসিরের হাতের খেলনার প্যাকেটটা আপনাআপনিই পেছনে চলে যায়। সে শুকনো ঢোঁক গিলে আস্তে করে জিজ্ঞেস করে, "কী হইছে নাজহা? ওরা দুইজন অমন করতাছে ক্যান?"
নাজহা কোনো উত্তর না দিয়ে তৌসিরের কাছে এগিয়ে আসে। তৌসির ভেবেছিল এবার বুঝি চড়টাই খেতে হবে। কিন্তু নাজহা তৌসিরের ডান হাতটা টেনে নিয়ে নাওয়াব আর তৌশির কপালে ছুঁইয়ে দেয়। বাচ্চাদের শরীরের তাপ হাতের তালুতে লাগতেই তৌসিরের মুখের রঙ ফ্যাকাসে হয়ে যায়। সে আমতা আমতা করে বলে, "ইয়ে মানে... একটু গরম লাগতাছে মনে হয়। এসিটা বাড়াইয়া দেই?”
নাজহা দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে ওঠে, "এসি বাড়াবেন না, আজ আপনাকে আমি ফ্রিজের ভেতর ঢুকিয়ে বরফ বানাব! সকালে কী বলেছিলাম আমি? বলেছিলাম না একটার উঠলে বাকি দুইটারও উঠবে? এখন তিনটারই একসাথে জ্বর এসেছে। যান, নিচে গিয়ে আম্মাকে বলুন তিন বাটি জলপট্টি আর বরফ পাঠাতে। আর আপনি আজ সারা রাত এক পা-ও এই ঘর থেকে বের হবেন না। আজ আপনার খবর আছে আমার হাতে!"
তৌসির আর কথা বাড়ানোর সাহস পায় না। হাতের খেলনাগুলো টেবিলের ওপর রেখে এক দৌড়ে নিচে চলে যায় মায়ের কাছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তৌসিরের মা, মেজো চাচী আর সিমরান মিলে জলপট্টি, থার্মোমিটার আর ওষুধের বাক্স নিয়ে হাজির হন। তিনটি দুধের বাচ্চা একসাথে অসুস্থ হওয়ায় পুরো বাড়িতেই একটা উদ্বেগ ও ব্যস্ততা নেমে আসে। দাদি আর ফুপি মিলে তুরাব আর নাওয়াবের মাথায় জলপট্টি দিতে বসেন, কিন্তু তিন নম্বর জন অর্থাৎ তৌশি কিছুতেই কপালে ভেজা কাপড় দেবে না। সে তার বাবার কোলে উঠে তৌসিরের শার্টের কলার শক্ত করে খামচে ধরে চিৎকার করে কাঁদছে। মেয়ের একটাই কথা, বাবা ছাড়া সে কারোর কাছে যাবে না।
রাত যত বাড়ে, শিকদার বাড়ির সুনসান ভাব ভেঙে তৌসির আর নাজহার ঘরের ভেতর যুদ্ধ তত বাড়তে থাকে। ঘড়ির কাঁটায় রাত এগারোটা বাজে। বাড়ির সবাই যার যার ঘরে চলে গেছে, কারণ নাজহা কাউকেই রাতে কষ্ট দিতে চায়নি। এখন ঘরের ভেতর তৌসির, নাজহা আর তাদের তিন অসুস্থ ছানা।
তুরাবের জ্বরটা একশো দুই ডিগ্রি ছুঁয়েছে। সে বিছানার একপাশে শুয়ে জ্বরের ঘোরে কুঁকড়ে যাচ্ছে আর থেমে থেমে ‘মামা... মামা’ বলে কাঁদছে। অন্যদিকে নাওয়াব আর তৌশি দুজনেই জোঁকের মতো তৌসিরের গায়ে লেপ্টে আছে। তৌসিরকে সোফায় বসতেও দিচ্ছে না তারা। তৌসির একটু বসলেই দুজনে একসাথে গলা ফাটিয়ে চিৎকার শুরু করে। বাধ্য হয়ে তৌসির তার দুই কাঁধে দুই বাচ্চাকে ঝুলিয়ে ঘরের এমাথা থেকে ওমাথা প্যারেড করার মতো হাঁটছে।
হাঁটতে হাঁটতে তৌসিরের পায়ের পেশিতে টান ধরে গেছে। পিঠের মেরুদণ্ডটা ব্যথায় টনটন করছে। একেকটা বাচ্চার ওজনও তো কম নয়, দশ-এগারো কেজি করে হবে। দুজনকে একসাথে নিয়ে টানা দুই ঘণ্টা হাঁটা মানে জিমের ডাম্বেল তোলার চেয়েও কঠিন শাস্তি। তার ওপর নাওয়াব একটু পর পর জ্বরের অস্থিরতায় তৌসিরের কাঁধে কামড় বসিয়ে দিচ্ছে, আর তৌশি তার ছোট্ট হাত দিয়ে বাবার দাড়িগুলো টেনে ছিঁড়ে ফেলার উপক্রম করছে।
চলবে....