ফন্ট সাইজ:
থিম:
স্নিগ্ধবিষ

76

লেখক: সানজিদা আক্তার মুন্নি
{🚫 সতর্কীকরণ | Content Warning
এই গল্পে অশালীন ভাষা ও গালাগালির ব্যবহার রয়েছে, যা সকল পাঠকের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে।পাঠকদের নিজ বিবেচনায় পড়ার অনুরোধ করা হচ্ছে।}
মানুষের জীবনে দুর্দশা ঠিক কোন পথে, কোন রূপ ধরে হানা দেয়, তা আগে থেকে কেউ আঁচ করতে পারে না। আজকের সকালটাও অন্য সব দিনের মতোই শুরু হয়। সকালের পুরোটা সময় নাজহার বেশ শান্তিতেই কাটে। পুব দিকের জানালা গলে ভোরের আলো ঘরের ভেতর প্রবেশ করছে। বিছানাজুড়ে তাদের তিন অবুঝ সন্তানের আধো আধো কলরব। তারা নিজেদের মতো করে হামাগুড়ি দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কচি হাত-পা অনবরত ছোড়াছুড়ির ফলে বিছানার চাদর এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তাদের ছোট ছোট ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়ছে লালা। পুরো ঘরটা বাচ্চাদের এমন প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে আছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে বেবি পাউডার আর দুধের মিষ্টি গন্ধ। এক প্রশান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে চারদিকে। সংসারের চিরচেনা ব্যস্ততার মাঝে নাজহা বাচ্চাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তৌসির নিজের গোসল করে এসে কাপড় পরতে পরতে বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে। সবকিছু মিলিয়ে এতটুকু সময় কোনো অশনিসংকেত মেলে না।
হঠাৎ বেজে ওঠে মোবাইল ফোনটা। রিংটোনের তীক্ষ্ণ শব্দে বাচ্চারাও মুহূর্তের জন্য চমকে তাকায়। কলটা নাজহার ফোনে নয়, আসছে তৌসিরের ফোনে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখেই তৌসিরের কপালের ভাঁজ প্রগাঢ় হয়ে ওঠে। কল রিসিভ করার পর ওপাশ থেকে ভেসে আসা কথাগুলো তৌসিরকে মুহূর্তেই পাথর করে দেয়। তার মুখের রক্ত সরে গিয়ে সম্পূর্ণ বিবর্ণ হয়ে ওঠে চামড়া। চোখ দুটো স্থির হয়ে যায়। হাতের মুঠোয় ফোনটা জমে থাকে। শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি অস্বাভাবিকভাবে কমে আসে। তালুকদার বাড়ি থেকে জরুরি তলব আসছে। কারণটা শিউরে ওঠার মতো, সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য। তালহা ভাই আর নেই। পৃথিবীর তাবৎ মায়া ত্যাগ করে তিনি চিরতরে চলে গেছেন।
খবরটা শোনার পর তৌসির কয়েক মুহূর্ত নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শূন্য, স্থির চোখে সে ঘরের ভেতর নাজহার দিকে তাকায়। নাজহা এমতাবস্থায় দুধের শিশুদের সামলানো আর তাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার কাজে ব্যস্ত। তিন বাচ্চার একজন খিলখিল করে হাসছে, আরেকজন মায়ের ওড়নার আঁচল ধরে টানছে, তৃতীয়জন নিজের পায়ের আঙুল মুখে পুরে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তৌসির ঢোক গিলে নিজের ভেতরের তোলপাড় সামলায়। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, বর্তমান মুহূর্তে খবরটা নাজহাকে জানানো যাবে না। সে বিষয়টা সযত্নে নিজের ভেতর চেপে রাখে। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, আকস্মিক মৃত্যুসংবাদ নাজহার নাজুক মানসিক অবস্থার ওপর কী ভয়াবহ আঘাত হানে। নাজহা এমনিতেই খুব আবেগপ্রবণ তালহা ভাই কে নিয়ে। অতীতের ক্ষতগুলো এখনো পুরোপুরি শুকায়নি।
তৌসির নাজহাকে যেমন তেমন করে বুঝিয়ে তালুকদার বাড়িতে যাওয়ার জন্য রাজি করে। কিছুক্ষণের মাঝেই বিবিজান গাড়ি আনান তিনি বিষয়টা জেনে দেরি করেননি আর তাড়াতাড়ি যেতে বলেছেন তালুকদার বাড়িতে। তড়িঘড়ি করে তিনজনকে প্রস্তুত করে নাজহা। আকস্মিক যাত্রার কারণ তার কাছে এখনো অস্পষ্ট। তৌসির শুধু জানায়, একটু দরকার আছে, দ্রুত বের হতে হবে। নিজের তিন সন্তান আর নাজহাকে নিয়ে গাড়িতে ওঠে তৌসির। গাড়ির ভেতরে এক থমথমে, অস্বস্তিকর নিঝুম অবস্থা বিরাজ করছে। পেছনের সিটে বেবি ক্যারিয়ারে থাকা অবুঝ বাচ্চাগুলো নিজেদের খেয়ালে ছোট্ট হাত-পা নাড়ছে। মুখের ভেতর কচি আঙুল পুরে আধো আধো আওয়াজ করছে তারা। তাদের নিষ্পাপ হাসি আর কলরব গাড়ির ভেতরের গুমোট পরিবেশটাকে কিছুটা হালকা করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু নাজহার ভেতরে এক অজানা, তীব্র অস্থিরতা তোলপাড় করছে। তার বুকের বাঁ পাশটা অনবরত ধড়ফড় করছে, তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। সে বারবার উদ্বিগ্ন চোখে তৌসিরের দিকে তাকাচ্ছে। তৌসিরের মুখের রেখাগুলো অস্বাভাবিক রকমের কঠিন।
তৌসিরের চোয়াল পাথরের মতো শক্ত, দৃষ্টি সামনের পিচঢালা রাস্তায় নিবদ্ধ। তার হাতের মুঠোয় স্টিয়ারিং হুইলটা এতটাই শক্ত করে ধরা, হাতের শিরাগুলো ফুলে ওঠে, আঙুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে থাকে। গাড়ির কাচ দিয়ে বাইরের দৃশ্যগুলো দ্রুত পেছনে সরে যাচ্ছে। নাজহা নিজের ভেতরের ছটফটানি আর ধরে রাখতে না পেরে অস্থির কণ্ঠে চিৎকার করে ওঠে, "কী হয়েছে কী? কিছু তো বলুন তো। নাটক করছেন কেন? আমরা হঠাৎ এভাবে কেন যাচ্ছি? তালুকদার বাড়িতে কি কিছু হয়েছে?"
তৌসির কোনো উত্তর দেয় না। সে একবার আড়চোখে নাজহার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকায়, এরপরই আবার দ্রুত দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় সামনের রাস্তায়। তার অচেনা, গম্ভীর কাঠিন্য নাজহার বুকের ভেতর প্রচণ্ড ভয় ধরিয়ে দেয়। তৌসিরের একখানা হাত দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরে নাজহা।
গাড়ি এসে থামে তালুকদার বাড়ির প্রকাণ্ড কালো লোহার গেটের সামনে। দরজা খুলে মাটিতে পা রাখে নাজহা। পেছন থেকে বাড়ির পরিচারিকারা এগিয়ে এসে ভিড় এড়াতে বাচ্চা তিনটিকে সযত্নে কোলে তুলে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে। বাড়ির ভেতরের দৃশ্য চোখে পড়তেই নাজহার বুকের রক্ত হিম হয়ে আসে। প্রতিদিনের কোলাহলমুখর, প্রাণবন্ত বাড়িটা আজ এক নিস্পন্দ মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়ে আছে। বাতাসে ভাসছে কর্পূর, গোলাপজল, ধূপ আর আগরবাতির ভারী, দমবন্ধ করা গন্ধ। বাড়ির বিস্তীর্ণ উঠোন জুড়ে সাদা পোশাক পরা অসংখ্য মানুষের ভিড়, অথচ কোথাও টু শব্দটি নেই। উপস্থিত সবার মুখে এক তীব্র বিষণ্ণতার কালো আভা। সবার দৃষ্টি নিচের দিকে নিবদ্ধ।
উঠোনের ঠিক একপাশে রাখা একটি বাঁশের খাটিয়া, তার ওপর সাদা কাফনের কাপড়ে ঢাকা একটি নিথর, স্পন্দহীন দেহ। লাশের মাথার কাছে বসে আছে নাজহার হাফেজ ভাই ভাতিজারা, তারা সুর করে কুরআন তিলাওয়াত করছে। দৃশ্যটা চোখে পড়া মাত্রই নাজহার পুরো শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়, একটা তীব্র ধাক্কা লাগে তার অস্তিত্বে। তার পা দুটো মাটির সাথে শিকড়ের মতো জমে যায়। চারপাশের মানুষজনের উপস্থিতি, কুরআন তিলাওয়াতের মৃদু ধ্বনি, চাপা গুঞ্জন, দূর থেকে ভেসে আসা শিশুদের কান্নার রোল, সবকিছু তার শ্রবণেন্দ্রিয় থেকে মুহূর্তেই মুছে যাচ্ছে। তার কানের ভেতর ভোঁ ভোঁ শব্দ হতে থাকে। তার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দেয়। এবং একটু পর সে স্পষ্ট বুঝতে পারে, তালহা ভাই আর নেই। মানুষটা সব অভিমানের ঊর্ধ্বে উঠে চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছেন।
বসার ঘরের এক অন্ধকার কোণে, ঠান্ডা দেয়ালের পিলারে মাথা ঠেকিয়ে নিষ্প্রাণ পুতুলের মতো বসে আছে নাজহা। গায়ের কালো বোরখাটা খোলার কথাও তার স্মরণে নেই। মাথার হিজাবটা আলগা হয়ে এলোমেলো হয়ে আছে। ঘামে ভেজা অবাধ্য চুলগুলো ছড়িয়ে পড়ছে তার ফ্যাকাশে মুখের ওপর। চারপাশের মানুষের চাপা ফিসফিসানি, ভারী দীর্ঘশ্বাস আর থেমে থেমে ওঠা কান্নার আওয়াজ তার কানে ভেসে আসছে। একসময় তালহা ভাইয়ের জন্য নাজহার পাগলামির কথা বাড়ির কারোই অজানা নয়। বাড়ির প্রতিটি ইট-পাথর, প্রতিটি কোণ সাক্ষী হয়ে আছে নাজহার পুরোনো, তীব্র অনুভূতির। আজ মানুষটার এমন আকস্মিক চিরবিদায় নাজহার দুই চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরাচ্ছে। তার মনস্তত্ত্বে বারবার একটাই অনুশোচনা হাতুড়ির মতো আঘাত করছে, তালহা ভাইয়ের অকাল মৃত্যুর জন্য সে নিজেই সম্পূর্ণ দায়ী। তার জন্যই তো উনাকে বিষ দেওয়া হয়েছিল।
স্মৃতির পাতায় বারবার ভেসে ওঠে, মানুষটা দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থতায় ভুগছেন। বাড়িতে খবর নিলে প্রতিবারই সবাই সত্যটা লুকিয়ে জানায় তিনি সুস্থ আছেন। তবুও মন না মানায় একবার নিজের ফোন থেকে কল দিয়েছিল নাজহা। তার খুব জানতে ইচ্ছে করেছিল, মানুষটার শরীরে বিষের প্রভাব পুরোপুরি কেটেছে কি না। ওপাশ থেকে ফোনটা বাজতে থাকলেও তিনি আর রিসিভ করেননি। বাকহীন উপেক্ষা আর অপমানে নাজহাও আর নিজ থেকে দ্বিতীয়বার যোগাযোগ করেনি। ঠিক এমন মুহূর্তে তার ভেতরে একটা তীব্র অভিমান আর একরোখা জেদ কাজ করেছিল। তার ধারণা হয়, দূরে থাকলে হয়তো মানুষটা ভালো আছেন।
আজ জেদটাই ঘুণপোকার মতো তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে, রক্তাক্ত করছে। তালহা ভাইকে নিজের করে পাওয়ার কোনো আক্ষেপ এখন আর তার অবশিষ্ট নেই। তার জীবনে এখন তৌসিরের মতো একজন মানুষ আছে, তিন সন্তানকে ঘিরে তার নিজস্ব একটা ভরাট সংসার আছে। তার চাওয়া তো একটাই ছিল, মানুষটা বেঁচে থাকুক, ভালো থাকুক। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে থাকুক, সুস্থভাবে নিঃশ্বাস নিক। অথচ আজ তিনি সব ধরাছোঁয়ার বাইরে, মাটির নিচে চলে যাওয়ার অপেক্ষায়। তীব্র অপরাধবোধ নাজহার ভেতরটাকে দুমড়েমুচড়ে একাকার করে দিচ্ছে। সে কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারছে না।
বুকের ভেতর জমে ওঠা অসহ্য যন্ত্রণা আর অপরাধবোধে নাজহা নিজের দাঁত দিয়ে দেয়ালের পিলারের কোণ চেপে ধরে রাখে। সে শব্দ করে কাঁদতে পারছে না, সে এভাবে সবার সামনে কাঁদতে চায়ও না। সে এখন তৌসিরের বিবাহিত স্ত্রী, তিনটি দুধের শিশুর মা। অথচ একসময়ের প্রগাঢ় ভালোবাসার মানুষ, ভীষণ শ্রদ্ধার মানুষটার আকস্মিক মৃত্যুশোক সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। ভেতরে ভেতরে গুমরে মরা হাহাকার, বুকের খাঁচায় আটকে থাকা না-বলা কথাগুলোর ভার আর অতিরিক্ত মানসিক চাপে হঠাৎ নাজহার শরীরের রক্তচাপ বেড়ে যায়। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই তার নাক বেয়ে গলগল করে তাজা রক্ত ঝরতে শুরু করে। পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে তার। হাত-পায়ের পেশিতে প্রচণ্ড খিল ধরে আসছে, আঙুলগুলো বাঁকা হয়ে শক্ত হয়ে যাচ্ছে। সে অনুভব করছে তার বুক ভরে শ্বাস নিতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, চারপাশের বাতাস ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। ফুসফুস পর্যাপ্ত অক্সিজেন পাচ্ছে না।
এতক্ষণ ভিড়ের মাঝে হন্যে হয়ে নাজহাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে তৌসির। সে খুব ভালো করেই জানে, এমন পরিস্থিতিতে নাজহার মানসিক ও শারীরিক অবস্থা কতটা নাজুক হতে পারে। নাজহার অতীত, তার ভেতরের রক্তক্ষরণ, তার অনুভূতির প্রাবল্য, সবই তৌসিরের নখদর্পণে। হঠাৎ একজনের ইশারায় বসার ঘরের অন্ধকার কোণে নাজহাকে দেখতে পেয়েই উন্মাদের মতো ছুটে আসে সে। নাজহার সামনে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসতেই তৌসিরের বুকটা আতঙ্কে কেঁপে ওঠে। নাজহার নাক বেয়ে গাঢ় লাল রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, ঠোঁট আর চিবুক ছুঁয়ে রক্ত ভিজিয়ে দিচ্ছে তার কালো বোরখার জমিন।
হাত-পায়ে খিল ধরে মৃগীরোগীর মতো থরথর করে কাঁপছে সে। তৌসিরকে নিজের সামনে দেখামাত্রই নাজহা অথৈ জলে ডুবন্ত মানুষের মতো কাঁপা, বাঁকা হয়ে যাওয়া হাতে তার শার্টের কলার খামচে ধরে। অন্য হাতে নিজের নাকের রক্ত মুছতে গিয়ে পুরো মুখে রক্ত মাখিয়ে ফেলে। যন্ত্রণায় কুঁচকে যাওয়া মুখে, আটকে আসা শ্বাসে অস্ফুট স্বরে আকুতি জানায়, "একটু পানি, আমাকে একটু পানি দিন।"
এক মুহূর্ত দেরি না করে এক টানে নাজহাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেয় তৌসির। নিজের প্রশস্ত বুকে অর্ধাঙ্গিনীকে শক্ত করে আগলে রেখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট চাচ্চুকে উদ্দেশ্য করে ব্যাকুল, আতঙ্কিত কণ্ঠে চিৎকার করে ওঠে, "পানি নিয়ে আসো! তাড়াতাড়ি পানি নিয়ে আসো!"
তৌসিরের চিৎকারে নাজহার এক চাচী তড়িঘড়ি করে এক গ্লাস পানি নিয়ে ছুটে আসেন। কাঁপতে থাকা নাজহাকে নিজ হাতে ধরে অল্প অল্প করে পানি খাইয়ে দেয় তৌসির। এরপর পকেট থেকে টিস্যু বের করে সযত্নে তার মুখের আর নাকের তাজা রক্ত মুছে দেয়। এমতাবস্থায় বাড়ির অনেকেই নাজহার করুণ অবস্থায় চারপাশে ভিড় জমাচ্ছে। উপস্থিত সবার চোখেমুখে প্রচণ্ড উদ্বেগ আর আতঙ্ক ফুটে উঠছে। তৌসির কারো বাঁকা চোখের কিংবা ফিসফিসানির তোয়াক্কা না করে নাজহাকে একটানে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নেয়। পাশের লম্বা সোফায় সযত্নে বসিয়ে দেয়। নাজহা কোনোমতে নিজেকে সামলে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করে। সে চারপাশের মানুষদের বোঝাতে চাইছে সে ভেঙে পড়েনি, সে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আছে। রক্তমাখা ফ্যাকাশে মুখ আর থরথর করে কাঁপা ঠোঁটে সে অস্ফুট স্বরে বারবার আওড়াতে থাকে, "আ, আম, আমি ঠিক আছি, আমি ঠিক আছি।"
তৌসির গ্লাস থেকে নিজের হাতের তালুতে সামান্য ঠান্ডা পানি নিয়ে নাজহার মাথার তালুতে আর কপালে আলতো করে বুলিয়ে দিচ্ছে। তার কণ্ঠস্বর শান্ত, নিবিড়। সে নাজহার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, "কান্না চেপে রেখো না। কাঁদো। ভেতরে কষ্ট আটকে রাখলে আরও সমস্যা হবে। নিজের মন হালকা করো।"
নাজহা ছলছল, রক্তাভ চোখে তৌসিরের মুখের দিকে তাকায়। তার মনের ভেতর এক তীব্র দ্বিধা, এক ভয়ানক অপরাধবোধের ঝড় তোলপাড় করছে। সে কি মানুষটার সাথে অন্যায় করছে? নিজের বৈধ স্বামীর সামনে বসে নিজের জীবনের প্রথম প্রিয় পুরুষের মৃত্যুতে এভাবে রক্ত ঝরিয়ে কাঁদছে সে! মানুষটা তাকে কতটা ভালোবাসে, তার অতীত জেনেও তাকে কতটা সম্মানে আর যত্নে আগলে রাখে, তা নাজহার চেয়ে ভালো আর কে জানে! তৌসিরের শান্ত, স্থির চোখের দিকে তাকাতেই নাজহার দুই চোখ ছাপিয়ে বাঁধভাঙা কান্না আসে। তৌসিরের দৃষ্টিতে কোনো অভিযোগ নেই, বিন্দুমাত্র রাগ কিংবা ঈর্ষা নেই, আছে এক প্রকাণ্ড সমুদ্রের মতো নিঃশর্ত আশ্রয় ।
তৌসির নাজহার সামনে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে তার হাত দুটো নিজের মুঠোয় নেয়। এরপর আর নিজের ভেতরের বাঁধ ভেঙে যাওয়া কান্নাকে রুখতে পারে না নাজহা। দুই হাতে সোফার কভার শক্ত করে খামচে ধরে বুক ফাটিয়ে হু হু করে কেঁদে ওঠে সে। চারপাশের পুরো পৃথিবীটা তার কাছে এখন বিষাক্ত, অসহ্য মনে হচ্ছে। তার আর্তনাদ ভরা কান্নার রোল ঘরের গুমোট পরিবেশকে আরও ভারী, আরও শোকাতুর করে তোলে।
তৌসির তাকে এতটুকুও বাধা দিচ্ছে না, ঘরভর্তি মানুষের সামনেই কোনো দ্বিধা ছাড়া তাকে নিজের বুকের ভেতর টেনে নেয়। উপস্থিত সমস্ত আত্মীয়স্বজনের সামনেই নিজের বিধ্বস্ত, শোকাতুর স্ত্রীকে প্রগাঢ় নির্ভরতায় দুই বাহুতে ঢালের মতো আগলে রাখে। তার মাথার ওপর চিবুক রেখে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে, "কাঁদো, মন ভরে কাঁদো। আমি আছি তো। তোমার কোনো ভয় নেই।"
তৌসিরের প্রশস্ত বুকে মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে নাজহা নিজের ভেতর মিলিয়ে যাচ্ছে। তার মনে হয় চারপাশের সবকিছু চিরতরে শেষ হয়ে গেছে, নিভে যায় সব আলো। হাহাকার ভরা শূন্যতা নিয়ে সে কী করবে, কোথায় যাবে, কিছুই সে আর বুঝতে পারছে না। তীব্র শোকের ঘন অন্ধকারে ডুবে যেতে যেতে সে একটাই সত্য অনুভব করছে, তার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়া পৃথিবীতে তৌসির নামের মানুষটা এক অবিচল পাহাড়ের মতো তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সকল ঝড়-ঝাপটা থেকে তাকে রক্ষা করার জন্য এক মজবুত প্রাচীর হয়ে তৌসির তাকে আগলে রেখেছে।
।।
বিকেলের রোদে আজ কোনো তেজ নেই। জানালার কাচ গলে একটুকরো নিষ্প্রভ আলো মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছে, যাতে বিন্দুমাত্র উত্তাপ অবশিষ্ট নেই। দেয়ালঘড়ির কাঁটায় এখন ঠিক তিনটে বাজে। চারপাশের বাতাসে এক ভারী, দমবন্ধ করা শোকের আবহ ভাসছে। বসার ঘর থেকে থেমে থেমে কান্নার রোল ভেসে আসছে। বাড়ির মানুষের এই বিলাপের পুরোটাই মেকি। দু-একজন মানুষ ছাড়া প্রকাণ্ড এই বাড়িতে তালহা ভাইয়ের চিরবিদায়ে কারও হৃদয়েই কোনো শূন্যতা তৈরি হয়নি। লোকদেখানো এই আহাজারি নাজহার কানে বিষাক্ত শেলের ন্যায় বিঁধতে থাকে।
কিছুক্ষণ আগেই তালহা ভাইকে দাফন করার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী নাজহার পক্ষে তালহা ভাইয়ের মুখখানি শেষবারের মতো দেখাও সম্ভব হয় না। নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! এক বুক হাহাকার নিয়ে নাজহা ভাবে, যাকে নাজহা নিজের সমস্ত সত্তা দিয়ে এতটা ভালোবাসত, সেই তালহা ভাইয়ের নিথর দেহটা, তার বন্ধ চোখের পাতা দুটো শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখার সাধ্য তার হলো না। নিয়মের বেড়াজালে আটকে তাকে নিঃশব্দে অশ্রু বিসর্জন দিতে হচ্ছে।
নাজহা ধীর, কম্পিত পায়ে তালহা ভাইয়ের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়। তার পা দুটো শরীরের ভার বইতে অস্বীকৃতি জানায়। তার প্রতিটি পদক্ষেপে বুকের ভেতরটা তীক্ষ্ণ ছুরির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে। দরজার হিমেল হাতলটায় স্পর্শ করতেই তার সারা শরীরে এক হিম স্রোত বয়ে যায়। নিজেকে টেনেহিঁচড়ে সে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে।
কক্ষের ভেতরটায় গুমোট, বদ্ধ একটা গন্ধ জমে আছে। মনে হচ্ছে বহুদিন জানালাগুলো খোলা হয়নি। বাতাসে একধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। চারপাশে তালহা ভাইয়ের চেনা সুবাস, পুরোনো বইয়ের ঘ্রাণ আর এক বুক চাপা দীর্ঘশ্বাস মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। নাজহার মনে হয়, এই ঘরের প্রতিটি কোণে তালহা ভাইয়ের অস্তিত্ব আজও শ্বাস নিচ্ছে। অথচ মানুষটা আর কোনোদিন এই চৌকাঠ মাড়াবেন না।
বিছানার ঠিক পাশেই মেঝেতে অযত্নে পড়ে আছে তালহা ভাইয়ের প্রিয় গিটার। বাদ্যযন্ত্রটার দিকে নজর পড়তেই নাজহার কলিজাটা যন্ত্রণায় তীব্রভাবে মোচড় দিয়ে ওঠে। কত শত বিকেল, কত বিনিদ্র রাত এই গিটারের তারে সুর তুলে তালহা ভাই তাকে গান শুনিয়েছেন! উনার সুরেলা আঙুলগুলো আর কোনোদিন এই তারগুলোতে আঘাত করবে না। গিটারটা আজ পুরোপুরি বোবা হয়ে পড়ে আছে, ঠিক তার মালিকের মতোই।
নাজহা পা টেনে টেনে পড়ার টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়। চারপাশটায় একবার চোখ বুলাতেই বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। তার অন্তরটা দাউদাউ করে পুড়ছে। হৃদয়ের এই তীব্র তোলপাড় সামলে সে ঠিক বুঝতে পারে না তার এখন কী করা উচিত। সে কি চিৎকার করে কাঁদবে? নাকি এই শূন্য কক্ষের প্রতিটি জিনিস ছুঁয়ে ছুঁয়ে তালহা ভাইয়ের স্মৃতিগুলো হাতড়ে বেড়াবে?
হঠাৎ তার দৃষ্টি আটকে যায় টেবিলের এক কোণে থাকা একটা বইয়ের ভাঁজে রাখা বাদামি রঙের খামের ওপর। নাজহা আলতো হাতে বইটা তুলে নেয়। হুমায়ূন আহমেদের লেখা ‘কোথাও কেউ নেই’। তালহা ভাইয়ের ভীষণ প্রিয় একটি উপন্যাস। বইয়ের নামটাই আজ নাজহার জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মুহূর্তে সত্যি সত্যিই তার কোথাও কেউ নেই।
বইয়ের ভেতর থেকে সে খামটা বের করে আনে। খামের ওপর গোটা গোটা অক্ষরে লেখা রয়েছে, 'নাজহা'।
নিজের নাম দেখেই নাজহার দুই চোখ ছাপিয়ে অঝোরে জল নামতে শুরু করে। নাজহার হাত দুটো থরথর করে কাঁপতে থাকে। কম্পিত আঙুলেই সে ধীরে ধীরে খামের মুখ খোলে। একেকটি পলক শতাব্দীর চেয়েও দীর্ঘ বলে অনুভূত হয়। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে ভাঁজ করা লম্বা একটি চিঠি। চোখের কোণে জমে থাকা নোনাজলটুকু হাতের উল্টোপিঠে মুছে নাজহা চিঠির ভাঁজ খোলে। সাদা কাগজের বুকে কালো কালিতে ফুটে ওঠা তালহা ভাইয়ের শেষ কথাগুলো নাজহার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠতে থাকে।
প্রিয় নাজহা,
জানি না এই জীর্ণ, বিবর্ণ কাগজের টুকরোটা কোনোদিন তোর আঙুলের ছোঁয়া পাবে কি না। হয়তো আমার নিথর দেহটা মাটির নিচে চাপা পড়ার পর, অযত্নে পড়ে থাকা এই চিঠিটাও ধুলোর সাথে মিশে যাবে। তবুও নিয়তির কোনো এক নিষ্ঠুর বাঁকে কেউ যদি অনুগ্রহ করে এই ভাঁজ করা কাগজটা তোর হাতে তুলে দেয়, তবে সংসারের হাজারো ব্যস্ততার ফাঁকে একটুখানি সময় করে পড়িস। এক মৃতপ্রায় মানুষের শেষ হাহাকারটুকু তোর চোখের তারায় একটুখানি জায়গা পাক।
নাজহা রে, আমার শরীরটা আজকাল বড্ড বেঈমানি করছে। ভেতরের মানুষটা তো তোর হাত ছুটে যাওয়ার দিনই মরে কাঠ হয়ে গিয়েছিল, এখন বাইরের এই রক্ত ও মাংসের খোলসটাও পচতে শুরু করেছে। হাতের আর পায়ের আঙুলগুলোতে দগদগে ঘা হয়েছে, চামড়া ভেদ করে রক্ত আর পুঁজের গন্ধে ঘরের বাতাসটা ভারী হয়ে থাকে। মরচে ধরা লোহার মতো বিষের প্রকোপ আষ্টেপৃষ্টে চেপে ধরেছে আমার শিরা ও উপশিরা, কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে হাড়ের মজ্জা। টেবিলের ওপরেই সারি সারি অ্যান্টিবায়োটিকের পাতা অবহেলায় পড়ে আছে। ছুঁয়েও দেখি না। কী হবে তেতো বড়িগুলো গিলে? ঢোক গিলতে গেলেই তো গলার ভেতরের ক্ষতটায় তীব্র এক আগুন জ্বলে ওঠে, মনে হয় কেউ বুঝি কণ্ঠনালীতে কাঁচের টুকরো গুঁজে দিয়েছে। তার চেয়েও বড় কথা, কার জন্য বাঁচব বল? আমার যে আর এক মুহূর্তও এই নরকযন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে ইচ্ছে করে না। কাল রাতে একরাশ ঘৃণা নিয়ে সমস্ত ওষুধ জানালা দিয়ে অন্ধকারে ছুড়ে ফেলে দিয়েছি। মায়াহীন এই পৃথিবী ছেড়ে তো একদিন শূন্য হাতে চলে যেতেই হবে, তবে আমি নাহয় একটু আগেই বিদায় নিলাম!
রাতগুলো এখন পাহাড়ের মতো ভারী আর অনন্তকালের মতো দীর্ঘ মনে হয়। জানালার বাইরে পুরো পৃথিবী ঘুমে তলিয়ে গেলে, আমি যন্ত্রণায় নীল হয়ে বিছানার চাদর খামচে ধরে পড়ে থাকি। দুই চোখের পাতা এক করতে পারি না, নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে একাকী ছটফট করি। বুকের পাঁজরগুলোর নিচে দমবন্ধ করা এক হাহাকার। একেকটা নিঃশ্বাস নিতে গেলে মনে হয় ফুসফুসটা ছিঁড়েখুঁড়ে যাচ্ছে। তবুও এই নিঃসঙ্গ প্রহরে, বুকের ধুকপুকানিটা চিরতরে থেমে যাওয়ার আগে হঠাৎ খুব ইচ্ছে হলো তোর সাথে একটু কথা বলি। মানুষের জীবনেরই যেখানে কোনো ভরসা নেই, সেখানে মৃত্যু তো যেকোনো মুহূর্তেই দরজায় কড়া নাড়তে পারে। আর বিশ্বাস কর, হিমশীতল মৃত্যুর পায়ের আওয়াজ আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি।
কেমন আছিস তুই, নাজহা? আমার সমস্ত প্রার্থনা, জায়নামাজে বসে ফেলা প্রতিটা ফোঁটা চোখের জলের একটাই চাওয়া, তুই যেন খুব ভালো থাকিস। তুই এখন তিন সন্তানের মা। সংসারের নিষ্পেষণে আর দায়িত্বের চাপে হয়তো তুইও মাঝেমধ্যে হাঁপিয়ে উঠিস, একটু কষ্টেও থাকিস হয়তো। তবুও আমি জানি, আমার নাজহা তো হার মানার মেয়ে নয়, ঠিক আপন হাতে সবটা গুছিয়ে নেবে। তুই আমাকে ভুলে নিজের সংসারে মন দিয়েছিস, অন্য এক মানুষের নামের সাথে নিজের নাম জড়িয়ে নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করছিস। এটুকু ভাবলেই আমার পচে যাওয়া বুকের ভেতরটা অসীম প্রশান্তিতে ভরে যায়। তোকে নিজের করে পাইনি বলে আজ আর স্রষ্টার কাছে আমার কোনো নালিশ নেই রে। তুই অন্যের ঘরে, অন্যের আসমানেই নাহয় রাণীর মতো সুখে থাক। আমি আমার ক্ষয়ে যাওয়া হাত দুটো তুলে সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করি, আমার ফুরিয়ে আসা আয়ুটুকুও তিনি তোর নিষ্পাপ সন্তানদের কপালে লিখে দিন।
তুই তো একটা ফুটফুটে পরীর মতো মেয়ের মা হয়েছিস, তাই না? শুনেছি তোর মেয়েটা ঠিক তোরই মতো ভীষণ মিষ্টি আর নীলচে চোখের হয়েছে। তোর মেয়ের কচি মুখটার কথা কল্পনা করলেই বুকের বাঁ পাশটায় এক অসহ্য যন্ত্রণা মোচড় দিয়ে ওঠে। কলিজাটা ছিঁড়েখুঁড়ে যায় এই ভেবে যে, এই নিষ্পাপ মুখটার বাবা আমি হতে পারলাম না! তার ছোট্ট হাতের আঙুল ধরে তাকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হলো না। তবে যাওয়ার আগে তোকে একটা করুণ অনুরোধ করে যাই, তোর আদরের মেয়েটাকে কখনো আমার মতো কোনো বেকার, ব্যর্থ আর ভবঘুরে ছেলের ত্রিসীমানায় যেতে দিস না। তাকে খুব যত্ন করে, কোনো এক অভিজাত ঘরে রাজপুত্রের হাতে ওকে তুলে দিস। তোর মতো তাকেও যেন কোনো অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাস আর গ্লানি আজীবন বয়ে বেড়াতে না হয়।
নাজহা রে, আমার হাত আর পাগুলো বড্ড কাঁপছে। আঙুলের ঘা থেকে চুঁইয়ে পড়া রক্তে কলমটা ভিজে যাচ্ছে, আর শক্ত করে ধরে রাখতে পারছি না। চোখের দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে, নিজের অশ্রুতে কাগজের অক্ষরগুলোই লেপ্টে যাচ্ছে। কী লিখছি তাও ঠিকমতো ঠাহর করতে পারছি না। যাওয়ার আগে তোকে বুকভরা কৃতজ্ঞতা জানিয়ে যাই। আমার মতো এক সর্বহারা, অযোগ্য, সমাজচ্যুত মানুষকে তুই তোর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টাতে যেভাবে বুকে আগলে রেখেছিলি, করুণা করে হলেও যেটুকু ভালোবাসা ভিক্ষা দিয়েছিলি, আমার অভিশপ্ত এই ক্ষুদ্র জীবনে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তুই আমার হলি না। একবুক আক্ষেপ আর অতৃপ্ত তৃষ্ণা নিয়েই নাহয় চিরঘুমে ডুব দেব।
আর হ্যাঁ, তোর কাছে এই ভিখিরির একটা শেষ আবদার রইল। যেদিন বাতাসে ভেসে আসবে আমি আর নেই, পৃথিবীর বুক থেকে আমার নামটা চিরতরে মুছে গেছে, সেদিন শত ব্যস্ততার মাঝেও একটুখানি সময় করে ছুটে আসিস। সংসারের তাড়াহুড়োয় এই হতভাগার নিষ্প্রাণ মুখটা দেখতে ভুলিস না। জীবিত অবস্থায় তো আর এই পোড়া মুখটা তোর সামনে নিয়ে যাওয়ার সাহস কিংবা যোগ্যতা কোনোটাই আমার ছিল না। যেদিন সব দায় ফুরোবে, লোকে আমাকে সাদা কাফনে মুড়িয়ে খাটিয়ায় শুইয়ে রাখবে, সেদিন দূর থেকে হলেও শেষবারের মতো একটাবার আমায় দেখে যাস। লোকে হয়তো দেখবে আমার প্রাণহীন দেহ, কিন্তু তুই দেখবি, কাফনের সাদা কাপড়ের নিচেও তোর জন্য অপেক্ষা করে থাকা এক চির-অভাগার তৃষ্ণার্ত চোখ।
আসবি তো রে, নাজহা? শেষবার... একটাবার?
ইতি,
তোর তালহা ভাই
৮.১০.২৭
অর্থাৎ এই চিঠি গত মাসের লেখা।
চলবে,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 76 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন