১•
জিয়া আর ইয়াশ—দুজনের জন্ম একই দিনে, একই মাসে। পৃথিবীর আলো দেখার মধ্যেও ব্যবধান মাত্র দুই-এক ঘণ্টার। ছোটবেলা থেকেই তাই পরিবারে সবাই তাদের যমজের মতোই দেখত। যদিও রক্তের সম্পর্কে তারা মামাতো ফুপাতো ভাই-বোন, তবুও একসঙ্গে বড় হওয়ার কারণে তাদের স্মৃতির ভাণ্ডারে জড়িয়ে আছে অসংখ্য শৈশবের গল্প।
সময় যেন ডানা মেলে উড়ে গেছে। দেখতে দেখতে আবারও এসে গেছে এপ্রিল মাস। আর মাত্র কয়েকটা দিন পর, ৫ই এপ্রিল, তারা দুজনেই পা দেবে জীবনের বিশতম বছরে। সদ্য উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে তারা এখন নতুন এক অধ্যায়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে—বিশ্ববিদ্যালয় জীবন।
ইয়াশের স্থায়ী বাড়ি বাংলাদেশের বরিশাল বিভাগে।কিন্তু সে এখনো বাংলাদেশের মুখ দেখেনি। কারন তার এখন স্থায়ী ঠিকানা দক্ষিণ কোরিয়ার সমুদ্রঘেরা শহর বুসানে। আর তার নানাবাড়ি রাজধানী সিউলে। ছোটবেলা থেকেই সিউল ইউনিভার্সিটিতে পড়ার স্বপ্ন বুকে লালন করেছে সে। তাই ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাওয়ার পর এক মুহূর্তও দেরি করেনি। সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোটা সময় নানাবাড়িতেই থাকবে। এতে পরিবারের সঙ্গও পাওয়া যাবে, আবার নিজের স্বপ্নও পূরণ হবে।
কিন্তু এই সিদ্ধান্তে একজন মানুষ একেবারেই খুশি নয়—জিয়া।
ছোটবেলা থেকেই জিয়ার স্বভাব ছিল একটু আলাদা। আধুনিক, স্টাইলিশ এবং নিজের ইমেজ নিয়ে ভীষণ সচেতন। অন্যদিকে ইয়াশ ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। শান্ত, ভদ্র, বইপড়ুয়া, সাদাসিধে পোশাক আর চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা—সব মিলিয়ে তাকে দেখলে গ্রামের সহজ-সরল কোনো ছেলের কথাই মনে পরে।
জিয়ার চোখে ইয়াশ ছিল একেবারে 'ক্ষেত-টাইপ'। তাই ছোটবেলা থেকেই ওকে বিশেষ একটা সহ্য করতে পারত না। সুযোগ পেলেই খোঁচা দিত, মজা করত কিংবা ওর সাদাসিধে স্বভাব নিয়ে বিদ্রুপ করত। আর ইয়াশ? সে কখনোই পাল্টা কিছু বলত না। কেবল মৃদু হেসে সবকিছু এড়িয়ে যেত। আর যদি একেবারেই সহ্য না করতে পারতো তাহলে কান্না করে দিতো
কিছু পারিবারিক জটিলতার কারণে ইয়াশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে কয়েকদিন দেরি হয়ে যায়। ইতোমধ্যে জিয়া সিউল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে নিয়মিত ক্লাসও শুরু করে দিয়েছে। জিয়ার রানিং বয়ফ্রেন্ড লি ডং কি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যায়নরত রয়েছে। সে বিশ্ববিদ্যালয়ে জিয়াদের দুই ব্যাচ সিনিয়র হওয়ায় ক্যাম্পাসে তার যথেষ্ট পরিচিতি ও প্রভাব ছিল।
অবশেষে যেদিন ইয়াশ সিউলে পৌঁছাল, সেদিন মি. কিম হা-ইউন ( জিয়ার দাদা এবং ইয়াশের নানা) নিজে তাকে নিয়ে সিউল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করিয়ে দিলেন । সেই দিন থেকেই ইয়াশের নতুন জীবনের পথচলা শুরু হলো।
ঠিক সেই সময়ে পরিবারের আরেকটি সুখবরও ঘিরে রেখেছিল সবাইকে।
বিশ্বখ্যাত একটি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে যোগ দিতে মি. কিম সিওন ( জিয়ার বাবা) এবং তার প্রাণপ্রিয় স্ত্রী মিসেস নাদিয়া ( জিয়ার মা) গিয়েছিলেন ভালোবাসার শহর প্যারিসে। দীর্ঘ পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে সেখানে মি. কিম সিওনের হাতে তুলে দেওয়া হয় একটি অত্যন্ত সম্মানজনক আন্তর্জাতিক পুরস্কার।
জীবনের এমন গর্বের মুহূর্তে তিনি একা থাকতে চাননি। যিনি প্রতিটি সংগ্রামে তার ছায়াসঙ্গী ছিলেন, সেই প্রিয়তমা স্ত্রী যেন তার পাশে থাকেন—এই ইচ্ছাতেই তিনি নাদিয়াকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন।
পুরো সাত দিন বিদেশে কাটানোর পর আজ অবশেষে তারা ফিরেছেন নিজেদের দেশ, নিজেদের আপন ঠিকানায়।
দীর্ঘ বিমানযাত্রার ক্লান্তি তখনও পুরোপুরি কাটেনি। বাড়ির প্রধান দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই পরিচিত ঘরের উষ্ণ গন্ধ তাদের স্বাগত জানাল। কিন্তু সেই শান্ত অনুভূতি মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মিলিয়ে গেল।
ড্রয়িংরুমের দিক থেকে ভেসে আসছে উচ্চস্বরে তর্ক-বিতর্কের শব্দ। একজন চিৎকার করছে, আরেকজন তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। শব্দগুলো এতটাই তীব্র ছিল যে পুরো বাড়ির পরিবেশ যেন অস্বস্তিতে ভারী হয়ে উঠেছিল।
মি. কিম সিওন এবং মিসেস নাদিয়া একে অপরের দিকে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালেন। মাত্র সাত দিনের অনুপস্থিতিতেই এমন কী ঘটল, যার কারণে বাড়ির পরিবেশ এভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে?
কোনো কথা না বলে দুজন দ্রুত পা বাড়ালেন ড্রয়িংরুমের দিকে... ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল এক বিশৃঙ্খল দৃশ্য।
পুরো ঘরজুড়ে টানটান উত্তেজনা। বাতাস যেন ভারী হয়ে আছে রাগ, অভিমান আর অস্বস্তিতে। সবাই উপস্থিত থাকলেও কেউ যেন ঠিক কীভাবে পরিস্থিতি সামলাবে, বুঝে উঠতে পারছে না।
ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে জিয়া। রাগে তার পুরো মুখ লাল হয়ে গেছে। বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে, চোখ দুটো ক্রোধে জ্বলছে। হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে সে নিজের দাদা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলছে—
__দাদা ভাই, তুমি আমার সাথে এটা কীভাবে করলে,,?? তুমি কি বুঝো না, ভার্সিটিতে আমার একটা রিপুটেশন আছে,,?? সেখানে আমার কত বড় ফ্রেন্ড সার্কেল আছে। আমি ওদের সামনে মুখ দেখাব কীভাবে,,?? আমার কথা তুমি একবারও কীভাবে না ভেবে থাকতে পারলে,,??
তার কণ্ঠে ছিল তীব্র ক্ষোভ, অভিমান আর নিজের সামাজিক অবস্থান হারানোর ভয়। ঠিক তখনই বজ্রকণ্ঠে ভেসে এল আরেকটি গলা।
__কি হচ্ছে এখানে,,??
হঠাৎ বাবার কণ্ঠ শুনে পুরো ঘর মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবার দৃষ্টি ঘুরে গেল দরজার দিকে।
সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন মি. কিম সিওন। দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি তখনও চোখেমুখে স্পষ্ট, কিন্তু মেয়ের এমন ব্যবহার দেখে তার মুখ কঠোর হয়ে উঠেছে। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন মিসেস নাদিয়া। তিনিও বিস্ময়ে পুরো দৃশ্যটা পর্যবেক্ষণ করছেন।
মি. কিম সিওন ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে এগিয়ে এসে গম্ভীর গলায় বললেন—
__জিয়া, তুমি তোমার দাদা ভাইয়ের ওপর এত চিৎকার করছ কেন,,?? তোমার দাদা ভাই এমন কী করেছে, যার জন্য তুমি ভার্সিটিতে মুখ দেখাতে পারবে না,,??
কথাটা বলেই তার চোখ পড়ল সোফার এক কোণে।সেখানে মাথা নিচু করে বসে আছে ইয়াশ।
ছেলেটার চোখ দুটো কান্নায় ফুলে লাল হয়ে গেছে। অনবরত হেঁচকি তুলে কাঁদছে সে। এক হাতে চোখের পানি মুছছে, অন্য হাতে বারবার নাক টানছে। মুখে কোনো প্রতিবাদের ভাষা নেই, নেই নিজের পক্ষে কিছু বলার চেষ্টাও। যেন সব দোষ নীরবে নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছে।
এই দৃশ্যটা দেখে মি. কিম সিওনের মনটা নরম হয়ে গেল। ইয়াশকে তিনি ছোটবেলা থেকেই নিজের ছেলের মতোই ভালোবাসতেন। ছেলেটার শান্ত, ভদ্র আর বিনয়ী স্বভাব সবসময়ই তার মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।
তিনি ধীরে ধীরে ইয়াশের সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসলেন। স্নেহভরে তার মাথায় হাত রেখে কোমল কণ্ঠে বললেন—
__কি হয়েছে, বাবা,,?? তুমি কাঁদছো কেন,,??
ইয়াশ মুখ খুলে কিছু বলার আগেই জিয়া বিরক্ত হয়ে দ্রুত বলে উঠল—
__বাপি, ও-ই তো সব নষ্টের মূল। তোমার বাবা তোমার আদরের ভাতিজাকে আমার ভার্সিটিতে ভর্তি করিয়েছে। সেটাও মেনে নিয়েছি। কিন্তু এখন নাকি এই ইয়াশের সাথে আমাকে এক গাড়িতে করে যাতায়াত করতে হবে,,??
কথাগুলো বলতে বলতে বিরক্তিতে মুখ ঘুরিয়ে নিল সে। মি. কিম সিওনের কপালে ভাঁজ পড়ল। তিনি শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় প্রশ্ন করলেন—
__সো হোয়াট,,?? ওর সাথে এক গাড়িতে গেলে তোমার কী হবে,,??
জিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে, মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বলল—
__ওর মতো বলদ, চার-চোখওয়ালা বাঁদরের সাথে এক গাড়ি থেকে নামলে আমার ফ্রেন্ডরা আমাকে নিয়ে মজা করবে,,।
কথাটা শেষ হতেই পুরো ঘরে এক মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এল। ইয়াশ মাথাটা আরও নিচু করে ফেলল। বুকের ভেতরটা যেন কেউ মুঠো করে চেপে ধরেছে। অপমানের কাঁটা গিয়ে বিঁধল তার নরম মনে। কিন্তু তবুও সে একটাও শব্দ করল না।
মি. কিম সিওনের চোখ-মুখ মুহূর্তেই কঠোর হয়ে উঠল। মেয়ের এমন অহংকারী কথাবার্তায় তিনি স্পষ্ট বিরক্ত হলেন।
তিনি গম্ভীর স্বরে বললেন—
__জিয়া, আমাদের বাসায় তিনটা গাড়ি আছে। একটা জুন ব্যবহার করে, একটা আমি ব্যবহার করি। আর অন্যটা,,?? তোমরা যখন একই জায়গায় যাচ্ছো, তখন এক গাড়িতে গেলে সমস্যা কোথায়,,??
জিয়া অসন্তুষ্ট মুখে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল—
__বাপি, তুমি বিষয়টা বুঝছো না,,।
এবার মি. কিম সিওনের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। তিনি আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর কণ্ঠে বলে উঠলেন—
__জিয়া। আমি যা বলেছি, সেটাই শেষ কথা। তোমরা একই গাড়িতে যাবে।
মি. কিম সিওনের কণ্ঠে এমন দৃঢ়তা ছিল যে, উপস্থিত সবাই বুঝে গেল—এই সিদ্ধান্ত আর পরিবর্তন হওয়ার নয়। ঘরের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে উঠল। কেউ কোনো কথা বলছে না। শুধু ইয়াশের চাপা কান্নার শব্দটাই যেন নিস্তব্ধতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছিল।
হঠাৎ ইয়াশ কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠল—
__না... না, মামা। আমি ক্যাব বুক করে চলে যাবো। তুমি জিয়াকে বকো না।
কথাটা বলার সময়ও তার দৃষ্টি নিচের দিকেই ছিল। নিজের অপমানের চেয়ে জিয়ার বকা খাওয়াটাই যেন তাকে বেশি কষ্ট দিচ্ছিল। এতক্ষণ ধরে যে মেয়েটা তাকে একের পর এক অপমান করে গেছে, তার বিরুদ্ধেও একটা অভিযোগ পর্যন্ত করল না সে।
ইয়াশের কথা শুনে জিয়া যেন সুযোগ পেয়ে গেল। ঠোঁটের কোণে হালকা বিজয়ী হাসি ফুটিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল—
__বাপি, তোমার আদরের ভাতিজাই তো বলছে সে চলে যেতে পারবে।
কথাটা শেষ হতে না হতেই মি. কিম সিওনের ধৈর্যের বাঁধ পুরোপুরি ভেঙে গেল।
তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জিয়ার দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠলেন—
__শাট আপ, জিয়া! আমি এক কথা বারবার রিপিট করব না। সোজা গিয়ে গাড়িতে বসো।
বাবার এমন রাগী রূপ খুব কমই দেখেছে জিয়া। সে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। ঠোঁট কামড়ে বিরক্ত মুখে বাবার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর জোরে পা ফেলে, মুখ ফুলিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।
জিয়া চলে যাওয়ার পরই মি. কিম সিওনের মুখের কঠোরতা অনেকটাই নরম হয়ে এল। তিনি ইয়াশের দিকে এগিয়ে এসে তার কাঁধে আলতো করে হাত রাখলেন। কণ্ঠে ফিরে এল সেই চিরচেনা স্নেহ।
__ইয়াশ বাবা, তুমিও গিয়ে গাড়িতে বসো। আর হ্যাঁ, জিয়া যদি কিছু বলে, তাহলে আমাকে বলবে। সবকিছু একা একা সহ্য করবে না।
ইয়াশ মৃদু মাথা নাড়ল।
চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে সবার দিকে ভদ্রভাবে মাথা ঝুঁকিয়ে সালাম জানিয়ে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ছেলেটা চলে যেতেই ড্রয়িংরুমে আবার নীরবতা নেমে এল।
মিসেস নাদিয়া ধীরে ধীরে স্বামীর পাশে এসে দাঁড়ালেন। তার মুখে ছিল একরাশ অসহায়ত্ব।
মি. কিম সিওনের কাঁধে আলতো হাত রেখে তিনি নরম গলায় বললেন—
__মেয়েটাকে না বকলে হতো না,,??
মি. কিম সিওন এক মুহূর্তও দেরি না করে উত্তর দিলেন—
__নাহ্, হতো না।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর দূরে দরজার দিকে তাকিয়ে, যেখানে একটু আগেই ইয়াশ বেরিয়ে গেছে, চিন্তামগ্ন কণ্ঠে বললেন—
__ছেলেটা কত ভদ্র দেখলে...? এত অপমান করার পরও জিয়ার নামে একটা অভিযোগ পর্যন্ত করল না। আমি ভাবছি... যদি এই ভদ্র ছেলেটার সঙ্গে আমার পাগলী মেয়েটার বিয়ে দিতে পারতাম...!
কথাটা শুনে পাশে বসে থাকা মি. কিম হা-ইউন হালকা হেসে মাথা নাড়লেন।
__তুই এসব কী ভাবছিস, বাবা,,? তোর ওই দস্যি মেয়েটার সঙ্গে যদি আমার ভদ্র নাতিটার বিয়ে হয়, তাহলে তোর মেয়ে আমার নাতিটার জীবনটাই শেষ করে ফেলবে।
তার কথা শুনে ঘরের কয়েকজনের মুখে চাপা হাসি ফুটে উঠলেও মি. কিম সিওন নিজের মতেই অটল রইলেন। তিনি শান্ত গলায় বললেন—
__সারাজীবন তো জিয়া এমন থাকবে না। মানুষ সময়ের সঙ্গে বদলায়। আমার বিশ্বাস, একদিন না একদিন ও ঠিকই ভালো হয়ে যাবে।
মিসেস নাদিয়া ধীরে ধীরে সোফায় বসে পড়লেন। দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ রইলেন। তারপর চিন্তিত কণ্ঠে বললেন—
__তোমরা সবাই শুধু নিজেদের দিকটাই ভাবছো। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা তো কেউ ভাবছো না...
তিনি একটু থেমে সবার দিকে তাকালেন।
__ওরা কি একে অপরকে সহ্য করতে পারবে...? জিয়া বা ইয়াশ—কেউ কি কখনো এমন বিয়েতে রাজি হবে...?
মিসেস নাদিয়ার প্রশ্নের পর পুরো ড্রয়িংরুম যেন আবারও নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কেউ সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর দিতে পারল না।
কারণ কথাটা অস্বীকার করার উপায় ছিল না। জিয়া আর ইয়াশ একে অপরকে দেখলেই যেন আগুন আর ঘিয়ের মতো জ্বলে ওঠে। একজনের উপস্থিতি অন্যজনের বিরক্তির কারণ। এমন দুই মানুষকে এক ছাদের নিচে, এক সম্পর্কে কল্পনা করাটাও যেন অসম্ভব।
ঠিক সেই সময় করিডোরের দিক থেকে ভেসে এল একটি পরিচিত নারীকণ্ঠ।
__ওদের বিয়ের বয়স হোক আগে। এখন যার আগে বিয়ে করার দরকার, তার কথা ভাবো। ছেলেটা ব্যবসা করতে করতে পুরোই শেষ হয়ে গেল।
কথাটা বলতে বলতেই ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলেন মিসেস কিম হারিন ( জিয়ার দাদি)।
তার চোখেমুখে ছিল বাড়ির বড় ছেলেকে নিয়ে একরাশ চিন্তার ছাপ। মি. কিম সিওন হালকা হেসে বললেন—
__ঠিকই তো। জুন কোথায়? ওকে তো দেখছি না।
মিসেস কিম হারিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় বসে উত্তর দিলেন—
__সকালে ঘুম থেকে উঠেই ব্যবসার কাজে বেরিয়ে গেছে।
কথাটা শুনেই মিসেস নাদিয়ার মুখে আবার উদ্বেগের ছায়া নেমে এল। তিনি তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করলেন—
__ছেলেটা আজও বুঝি না খেয়েই বের হয়েছে...?
মিসেস কিম হারিন অসহায়ভাবে মাথা নাড়লেন।
__হ্যাঁ। কতবার বললাম, আগে নাস্তা করে যা। কিন্তু একটাও কথা শুনল না। বলল, জরুরি মিটিং আছে। দেরি করা যাবে না।
শ্বাশুড়ির মুখে ছেলের কথা শুনে মিসেস নাদিয়ার বুকটা হু-হু করে উঠল। তিনি হালকা রাগ মেশানো অভিমানী গলায় বললেন—
__আজকে জুন বাসায় আসুক। কতবার বলেছিলাম, আমি প্যারিসে যাব না। কিন্তু ছেলেটাই আমাকে জোর করে পাঠাল। বলল, "মা, তুমি চিন্তা করো না। আমি সব সামলে নিতে পারব। নিজের, বোনের, দাদা-দাদির—সবার খেয়াল রাখব।"
কথাগুলো বলতে বলতে তার চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠল মাতৃত্বের কোমল উদ্বেগ।
__কিন্তু নিজের খেয়ালটাই তো রাখে না...
মিসেস কিম হারিন মৃদু হেসে নাতির পক্ষ নিয়ে বললেন—
__না গো, বউমা। সত্যি বলতে এই সাতটা দিন ছেলেটা আমাদের একটুও কষ্ট পেতে দেয়নি। সময়মতো ওষুধ থেকে শুরু করে সবকিছুরই খেয়াল রেখেছে। আজ শুধু ওই জরুরি মিটিংটার জন্যই এত ভোরে বেরিয়ে গেছে।
তবুও নাদিয়ার চিন্তা কমলো না।
__তাই বলে না খেয়ে বের হবে...?
স্ত্রীর চোখেমুখে উদ্বেগ স্পষ্ট বুঝতে পারলেন মি. কিম সিওন। তিনি এগিয়ে এসে আলতো করে নাদিয়ার হাতটা নিজের হাতে নিলেন। ঠোঁটের কোণে আশ্বাসের হাসি ফুটিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন—
__ও অফিস ক্যান্টিন থেকে কিছু খেয়ে নেবে। তুমি এত চিন্তা করো না।
একটু থেমে আবার কোমল স্বরে বললেন—
__এসো। অনেকটা পথ জার্নি করে এসেছ। খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে তোমাকে। আগে একটু বিশ্রাম নাও।
নাদিয়া আর কিছু বললেন না। স্বামীর সঙ্গে ধীর পায়ে নিজেদের বেডরুমের দিকে চলে গেলেন। তাদের চলে যাওয়ার পর ড্রয়িংরুমে শুধু রইলেন মি. কিম হা-ইউন আর মিসেস কিম হারিন।
মি. কিম হা-ইউন স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন—
__দেখেছো, প্রিয়তমা...? দেখতে দেখতে কতগুলো বছর পার হয়ে গেল!
মিসেস কিম হারিনের ঠোঁটেও ফুটে উঠল তৃপ্তির হাসি। তিনি ধীর কণ্ঠে বললেন—
__হ্যাঁ... একসময় আমরা নিজেদের এমন একটা পরিবারের স্বপ্ন দেখতাম। তারপর ধীরে ধীরে আমাদের ছেলে-মেয়েদের বড় হতে দেখলাম। এখন নাতি-নাতনিদের জীবন দেখছি। সময় সত্যিই কত দ্রুত চলে গেল! সাথে আমাদের স্বপ্নগুলো পূরণ হয়ে গেল!
মি. কিম হা-ইউন চিন্তামগ্ন গলায় বললেন—
__তবুও সিওনের কথাটা আমার বারবার মনে হচ্ছে। জিয়া আর ইয়াশ যদি কোনোদিন একে অপরকে বুঝতে শিখত... তাহলে হয়তো খুব সুন্দর একটা জুটি হতে পারত।
কিন্তু এই কথার উত্তর আর কেউ দিল না। হয়তো ভবিষ্যৎই একদিন এর উত্তর দেবে...
---
অন্যদিকে...
সকালের ব্যস্ত শহর সিউল।
চওড়া রাস্তা জুড়ে একের পর এক গাড়ি ছুটে চলছে। উঁচু উঁচু ভবনের কাঁচের দেয়ালে সকালের সূর্যের আলো ঝিকমিক করছে। সেই ব্যস্ত রাস্তায় একটি কালো গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে সিউল ইউনিভার্সিটির দিকে।
স্টিয়ারিংয়ের পেছনে বসে আছে ইয়াশ। দুই হাত শক্ত করে স্টিয়ারিং ধরে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে সে। মুখে কোনো বিরক্তি নেই, নেই কোনো অভিযোগের ছাপ। যেন কিছুক্ষণ আগের অপমানগুলো মন থেকে জোর করেই সরিয়ে দিয়েছে।
আর জিয়া?
সে সামনের সিটে তো দূরের কথা, ইচ্ছে করেই গাড়ির একদম পেছনের সিটে বসেছে। তার কাছে ইয়াশের পাশের সিটে বসাটাও যেন নিজের সম্মানের বিরুদ্ধে।
মুখটা জানালার দিকে ফিরিয়ে রেখেছে সে। চোখে দামি সানগ্লাস, কানে ইয়ারবাড। পুরো শরীরী ভাষায় একটাই বার্তা— "আই ডোন'ট নো হু দ্য হেল ইজ হি এবন্ড আই ডোন্ট কেয়ার এবাউট হিম"
ছোটবেলা থেকেই জিয়া নিজেকে সবসময় সবার থেকে আলাদা ভাবতে ভালোবাসে। ফ্যাশন, স্টাইল, জনপ্রিয়তা—সবকিছুতেই সে সবার নজরের কেন্দ্রবিন্দু হতে চায়।
তার কাছে ইয়াশ একজন অতিরিক্ত সাধারণ ছেলে। সাদাসিধে পোশাক, চোখে চশমা, ভদ্র স্বভাব—এসবকে সে আধুনিকতার সঙ্গে কখনোই মেলাতে পারে না।
আর তাই একই গাড়িতে বসে থাকাটুকুও তার কাছে ভীষণ অস্বস্তিকর মনে হয়। গাড়ির ভেতরে নেমে আসে অদ্ভুত এক নীরবতা... একজন কথা বলতে চায় না। আরেকজন কথা বললেও যে উত্তর পাবে না, সেটা খুব ভালো করেই জানে।
জিয়ার জীবনে প্রেম এসেছে বহুবার। তার সৌন্দর্য, আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিত্ব, ফ্যাশন সেন্স আর বিশ্ববিদ্যালয়ে জনপ্রিয়তার কারণে অসংখ্য ছেলে তাকে পছন্দ করত। অনেকেই তার প্রেমে পড়েছে, অনেকেই তাকে নিজের জীবনের অংশ বানাতে চেয়েছে।
আর জিয়াও সম্পর্কে জড়িয়েছে... তবে কোনো সম্পর্কই বেশিদিন টেকেনি। ছয় মাস—এটাই ছিল তার দীর্ঘতম সম্পর্কের সময়কাল। কারণটা কখনো ভালোবাসার অভাব ছিল না।
বরং ভালোবাসা সম্পর্কে জিয়ার ধারণাটাই ছিল সবার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তার কাছে ভালোবাসা মানে ছিল বিশ্বাস, সম্মান, মানসিক বন্ধন আর একে অপরকে নিঃস্বার্থভাবে বোঝা।
তার বিশ্বাস ছিল—
একটি সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর ভিত্তি হলো দুজন মানুষের আত্মিক সংযোগ। দুটি হৃদয় যখন একে অপরকে বুঝতে শেখে, তখনই সেই সম্পর্ক সত্যিকার অর্থে পূর্ণতা পায়।
শারীরিক স্পর্শ?
সেটা তার কাছে কখনোই ভালোবাসার প্রমাণ ছিল না। বরং জিয়ার মনে হতো, সম্পর্কের শুরুতেই যদি কেউ বারবার ছোঁয়ার অজুহাত খোঁজে, তাহলে সে মানুষটা হয়তো জিয়াকে নয়, তার বাহ্যিক সৌন্দর্যকেই বেশি ভালোবাসে।
এই কারণেই যখনই কোনো বয়ফ্রেন্ড সীমা অতিক্রম করে তাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করেছে, জিয়া এক মুহূর্ত দেরি না করে সম্পর্কের ইতি টেনেছে।
অনেকেই তাকে অহংকারী বলেছে। কেউ বলেছে অতিরিক্ত রক্ষণশীল। আবার কেউ বলেছে, সে নাকি কখনোই কাউকে সত্যিকারের ভালোবাসেনি। কিন্তু এসব কথায় জিয়ার কখনো কিছু যায়-আসে না।
তার কাছে নিজের আত্মসম্মান আর ব্যক্তিগত সীমারেখাই ছিল সবার আগে। তাই আজ পর্যন্ত তার কোনো সম্পর্কই ছয় মাসের বেশি টেকেনি। এভাবেই নীরবতার মধ্যেই গাড়িটা এসে থামল সিউল ইউনিভার্সিটির বিশাল প্রধান ফটকের সামনে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস তখন শিক্ষার্থীদের কোলাহলে মুখর। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে, কেউ হাতে কফির কাপ নিয়ে ক্লাসের দিকে হাঁটছে, আবার কেউ তাড়াহুড়ো করে ডিপার্টমেন্টের দিকে ছুটছে।
গাড়ি পুরোপুরি থামার আগেই জিয়া নিজের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিল। ইয়াশ কিছু বলার আগেই সে দ্রুত দরজা খুলে নেমে পড়ল। একবারের জন্যও পেছনে ফিরে তাকাল না।
তার একটাই চিন্তা—
কোনোভাবেই যেন বন্ধুরা তাকে ইয়াশের সঙ্গে একই গাড়ি থেকে নামতে না দেখে।
দ্রুত পায়ে, প্রায় হনহন করে সে ক্যাম্পাস পেরিয়ে নিজের ক্লাসরুমের দিকে চলে গেল। গাড়ির ভেতরে কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ বসে রইল ইয়াশ। জানালার বাইরে মিলিয়ে যেতে থাকা জিয়ার পেছনের অবয়বটার দিকে একবার তাকাল।
তারপর নিজের মনে খুব আস্তে করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানত, জিয়া তাকে পছন্দ করে না। তবুও সে কখনোই চায়নি, তার কারণে জিয়ার কোনো অস্বস্তি হোক।
নিজেকে সামলে নিয়ে ইয়াশ ধীরে ধীরে গাড়িটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার পার্কিং এলাকায় নিয়ে গিয়ে সুন্দরভাবে পার্ক করল।
ইঞ্জিন বন্ধ করে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। আজ তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিন। স্বাভাবিকভাবেই বুকের ভেতর হালকা উত্তেজনা আর অজানা এক শঙ্কা কাজ করছে।
সে নিজের শার্টটা ঠিক করে নিল, চশমার ফ্রেমটা আলতো করে সোজা করল, তারপর ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল।
নতুন পরিবেশ... নতুন মানুষ... নতুন একটা অধ্যায়ের শুরু। ক্যাম্পাসের চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে মৃদু হাসল ইয়াশ। এরপর সোজা টিচার্স রুমের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন তাদের ক্লাস টিচার। ভদ্রভাবে মাথা নত করে সালাম জানাতেই শিক্ষক স্নেহের হাসি দিয়ে বললেন—
__চলো, তোমাকে আজ সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।
ইয়াশ নীরবে মাথা নাড়ল।
এরপর শিক্ষকের সঙ্গে পাশাপাশি হেঁটে সে ক্লাসরুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। দরজার ওপাশে অপেক্ষা করছে তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম পরিচয়... আর অজান্তেই, সেই দরজার ভেতরেই শুরু হতে যাচ্ছে তার জীবনের এক সম্পূর্ণ নতুন গল্প।
চলবে....