ফন্ট সাইজ:
থিম:
ইফ আই লুজ ইউ

পর্ব-২

লেখক: ফারহানা ইসলাম

২•

ক্লাসরুমের দরজাটা ধীরে ধীরে খুলতেই ভেতরে চলতে থাকা কোলাহল মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
সবার আগে ভেতরে প্রবেশ করলেন প্রফেসর। তার ঠিক পেছনেই শান্ত, ভদ্র ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে ইয়াশ। কাঁধে কালো ব্যাকপ্যাক, পরনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ইউনিভার্সিটির ইউনিফর্ম, চোখে পরিচিত কালো ফ্রেমের চশমা। মুখে হালকা স্নায়ুচাপ থাকলেও চোখে ছিল আত্মবিশ্বাসের ছাপ।
প্রফেসরকে দেখামাত্র পুরো ক্লাস একসঙ্গে দাঁড়িয়ে গেল।
__গুড মর্নিং, প্রফেসর।
প্রফেসর হালকা হাসলেন।
__গুড মর্নিং। সিট ডাউন।
সবাই আবার নিজেদের আসনে বসে পড়ল।
প্রফেসর একবার পুরো ক্লাসের দিকে তাকিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াশের কাঁধে আলতো করে হাত রাখলেন।
হালকা হাসিমুখে বললেন—
__স্টুডেন্টস,,!! মিট ইওর নিউ ক্লাসমেট। হি ইজ ইয়াশফি শাহারিয়ার মাহদী। ও আজ থেকে তোমাদের সাথেই পড়বে। হি ইজ এ ভেরি ট্যালেন্টেড গাই।
নতুন ছাত্রকে দেখে ক্লাসের অনেকেই কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে রইল। কেউ ফিসফিস করে কথা বলছে, কেউ আবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার দেখে নিচ্ছে ছেলেটাকে।
প্রফেসর যেন হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই মুচকি হেসে ক্লাসের এক কোণে বসে থাকা জিয়ার দিকে তাকালেন।
__বাই দ্য ওয়ে... হি ইজ জিয়া'স কাজিন।
কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জিয়ার মুখের রঙ বদলে গেল। গত কয়েক মিনিট ধরে সে মনে মনে শুধু একটাই প্রার্থনা করছিল—
"প্লিজ... প্লিজ... শুধু এই কথাটা যেন স্যার না বলেন!"
কিন্তু ভাগ্য যেন আজ তার একেবারেই সহায় হলো না। যেটা হওয়ার ভয় সে এতক্ষণ করছিল, সেটাই হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ক্লাসের দৃষ্টি ঘুরে গেল জিয়ার দিকে।
জিয়ার ভেতরে ভেতরে যেন আগুন জ্বলে উঠল। ওর কাছে নিজের জনপ্রিয়তা আর ইমেজটাই সবকিছু।
ও কোনোভাবেই চাইছিল না, এই অতিরিক্ত সাদাসিধে, আনস্মার্ট ছেলেটার সঙ্গে তার পারিবারিক সম্পর্কের কথা পুরো ক্লাস জেনে যাক। কিন্তু এখন আর কিছুই করার নেই। একটা কথাতেই সব ফাঁস হয়ে গেছে।
ক্লাসের পেছনের সারিতে বসে থাকা জিয়ার গ্যাংয়ের পাঁচজন সদস্য একসঙ্গে অবাক হয়ে তাকাল ইয়াশের দিকে। পার্ক বোরা, লি না-বি, লি মিনজে আর মিন তাইজুন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এদের দলটাই সবচেয়ে জনপ্রিয়, সবচেয়ে বেয়াড়া আর সবচেয়ে আলোচিত। বন্ধুত্বের জন্য সবাই একে অপরের পাশে থাকলেও প্রেমকে তারা কখনোই খুব সিরিয়াসভাবে নেয় না।
আজ একজনের সঙ্গে রিলেশন, কাল আরেকজনের সঙ্গে ব্রেকআপ—এসব যেন তাদের কাছে একেবারেই স্বাভাবিক ব্যাপার।
তবে বন্ধুত্ব?
সেটার জন্য ওরা যে কারও সঙ্গে লড়ে যেতে পারে।
ইয়াশের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পর সবাই একসঙ্গে জিয়াকে প্রশ্ন করল—
__এটা তোর কাজিন, জিয়া,,?
জিয়া বিরক্তিতে ঠোঁট কামড়ে ধরল। তারপর অনিচ্ছাসত্ত্বেও ভাবলেশহীন গলায় উত্তর দিল—
__ইয়েস। আমার ফুফাতো প্লাস মামাতো ভাই।
কথাটা বলার সময় তার গলায় কোনো উষ্ণতা ছিল না। বরং মনে হচ্ছিল, এই পরিচয়টা দিতে হচ্ছে বলেই সে বিরক্ত। বোরা এবার মাথা কাত করে ইয়াশকে কয়েক সেকেন্ড ভালো করে পর্যবেক্ষণ করল।
তারপর দুষ্টু হেসে ফিসফিস করে বলল—
__মালটা সুন্দর আছে। শুধু একটু বেশি ডিসেন্ট আর ইনোসেন্ট। কিন্তু এই সুইট মালটাকে যদি ঠিকমতো গেট-আপ করানো যায়, তাহলে পুরাই আগুন লাগবে ক্যাম্পাসে।
কথাটা শুনে পাশেই বসা না-বি হেসে ফেলল। তার স্বভাবে সবচেয়ে শান্ত, তাও সে ঠোঁট চেপে হাসি লুকানোর চেষ্টা করল।
ওদের বন্ধুত্বটাই এমন... একজন শুরু করলে বাকিরা আর থামতে জানে না। বোরার কথা শেষ হতেই না-বি মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।
__হ্যাঁ, তা ঠিক বলেছিস। কিন্তু এই ভদ্রদের অভদ্র বানানোটা এতটাও সহজ না। দেখছিস না, আমার সো-কল্ড বয়ফ্রেন্ড পার্ক সিওজুনকে এখনো আমি অভদ্র বানাতে পারলাম না।
কথাটা বলেই সে চোখ উল্টে বিরক্তির অভিনয় করল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই ঠোঁটের কোণে নরম একটা হাসি ফুটে উঠল।
__বাট... আমার কুচুপুটার সঙ্গে প্রেম করতে ভালোই লাগে। আমাকে অনেক ভয় পায় যে।
না-বির কথায় পুরো দলটা হেসে উঠল।
পার্ক সিওজুন হলো তাদের দুই ব্যাচ সিনিয়র। শুধু সিনিয়রই নয়, পুরো ডিপার্টমেন্টের ব্যাচ টপার। শান্ত, ভদ্র, মেধাবী আর অত্যন্ত দায়িত্বশীল একজন ছেলে।
জিয়া আর তার গ্যাংয়ের যত প্র্যাকটিক্যাল, ল্যাব রিপোর্ট আর কঠিন অ্যাসাইনমেন্ট—সবকিছুর বড় একটা অংশই শেষ পর্যন্ত গিয়ে পরে সিওজুনের কাঁধে।
আর সেটাই ছিল না-বির সঙ্গে তার সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সুবিধা। অবশ্য সিওজুন এসব বুঝত না, তা নয়। তবুও না-বির একটা অনুরোধও সে কখনো ফিরিয়ে দিতে পারত না।
বোরা মজা করে দুই হাত গুটিয়ে বলল—
__তোর ওই সুইট বয়ফ্রেন্ডটার ওপর অনেক প্রেসার পড়ে আমাদের সবার অ্যাসাইনমেন্ট করতে গিয়ে। তাই ভাবছি, ওর একটু প্রেসার কমাই।
এই বলে সে আবার ইয়াশের দিকে তাকাল। চোখে দুষ্টুমিভরা ঝিলিক।
__এই বানিটাকে যদি আমি পটাতে পারি, তাহলে তো অর্ধেক কাজই সহজ হয়ে যাবে।
জিয়া বিরক্ত হয়ে কপাল কুঁচকাল।
__শাট আপ, গাইজ। তোর কী মনে হয়, বোরা? এই ভোদাইটা রিলেশন করবে? নো চান্স। এত বছরে আমি কখনো দেখিনি যে ও কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছে।
বোরা ভ্রু নাচিয়ে বলল—
__তাহলে আমি একটা চান্স নিয়ে দেখি?
জিয়া এবার আড়চোখে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল—
__তোর না মুবিন আছে?
কথাটা শুনতেই বোরা নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
__সেটাও কথা। সু মুবিন ইজ এ রিচ পারসন। তার শপিং মল আছে, ব্র্যান্ডেড কার কালেকশন আছে, পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় বাড়ি আছে। আর তোর কাজিন তো বেকার।
বোরার শেষ কথাটা শুনে জিয়ার মুখের ভাব পাল্টে গেল। ইয়াশকে সে যতই অপছন্দ করুক, নিজের পরিবারের সম্মান নিয়ে কেউ কথা বলুক—এটা সে কখনোই মেনে নিতে পারে না।
রাগ সামলে দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
__এক্সকিউজ মি। আমার আঙ্কেল একজন ডাক্তার। তোরা কোরিয়ার নাম্বার ওয়ান ডাক্তার মি. নাভিদ শাহারিয়ারের নাম শুনিসনি? উনি প্রতিবছর কোরিয়ার নাম্বার ওয়ান সার্জান ডাক্তারের অ্যাওয়ার্ড পান। দেশে-বিদেশে তাদের নিজস্ব অনেকগুলো হাসপাতাল আছে। তারা অনেক রিচ।
কথাটা শেষ করে সে বিরক্তিতে ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ল। তারপর নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল—
__না জানি, এই ছাগলটা কার মতো হয়েছে! সবসময় এইভাবে খ্যাতের মতো থাকে। হাবা একটা!
বোরার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
__উফ... সো রিচ!!
জিয়া মুখ ভেংচি দিয়ে বলল—
__লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। যেটা আছে, সেটা নিয়ে হ্যাপি থাক।
বোরা হেসে হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করল।
__ওকে, ওকে। টপিক চেঞ্জ।
তারপর চোখ টিপে জিজ্ঞেস করল—
__বাই দ্য ওয়ে... তোর বয়ফ্রেন্ডের কী অবস্থা, জিয়া?
প্রশ্নটা শুনেই জিয়ার মুখ মুহূর্তে বিরক্তিতে কুঁচকে গেল।
সে দাঁত চেপে বলল—
__শালার কথাই বলিস না। ইদানীং বেশি লাফাইতেছে। তার নাকি হাগ লাগবো। ভাবতাছি ব্রেকআপ করে ফেলব।
কথাটা শুনে না-বি হো হো করে হেসে উঠল।
__হ্যাঁ, করে ফেল। গতবছর তিনটার সঙ্গে রিলেশন করছোস, তিনটার সঙ্গেই ব্রেকআপ করছোস। এই বছরের ব্রেকআপের হালখাতাটা না হয় ওকে দিয়েই শুরু কর।
জিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল—
__করব খুব তাড়াতাড়ি। বাল! একটা মনের মতো ছেলেও পাই না।
ঠিক তখনই পাশে বসে থাকা মিনজে নাটকীয় ভঙ্গিতে নিজের বুকে হাত রেখে বলল—
__সামনে এত সুন্দর সুন্দর ছেলে থাকতে তুই বাইরে ছেলে খুঁজোস। আমাকে কি তোর চোখে পড়ে না?
কথাটা শুনে জিয়া সঙ্গে সঙ্গে রাগের অভিনয় করে উঠে দাঁড়াল।
__শালা, দাঁড়া! এখনই তোর গার্লফ্রেন্ডকে কল দিতাছি।
মিনজে সঙ্গে সঙ্গে দুই কানে হাত দিয়ে অসহায় মুখে বলে উঠল—
__না... না... না... তুই তো আমার খালার পেটের আপন বইন লাগস!
ওর কথা শুনে তাইজুন হেসে কুটিকুটি হয়ে গেল।
__শালা লুচ্চা!
মুহূর্তেই পুরো দলটা হাসিতে ফেটে পড়ল। তাদের প্রাণখোলা হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল পুরো ক্লাসরুমে।
ঠিক তখনই—
ঠাস!
প্রফেসর টেবিলের ওপর বইটা জোরে চাপড়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন—
__সাইলেন্স!
এক নিমিষেই পুরো ক্লাস চুপ হয়ে গেল। প্রফেসর এবার ইয়াশের দিকে তাকিয়ে বললেন—
__ইয়াশ, তুমি চা ইয়ে-রিনের পাশে গিয়ে বসো।
চা ইয়ে-রিন—এই ক্লাসের টপার। অত্যন্ত মেধাবী, শান্ত স্বভাবের একজন ছাত্রী। আর তিনি কেমিস্ট্রি প্রফেসর মিস চা ইউ-নার ছোট বোন।
ইয়াশ ভদ্রভাবে মাথা নত করে ইয়ে-রিনের পাশে গিয়ে বসে পড়ল।
তার বসে পড়ার পর প্রফেসর আবার বললেন—
__ইয়াশ, আজ থেকে ইয়ে-রিন তোমার ডেস্কমেট। তবে তুমি যদি ভবিষ্যতে তোমার ডেস্ক চেঞ্জ করতে চাও, তাহলে আমাকে বলতে পারো।
ইয়াশ ভদ্র হাসি দিয়ে মাথা নেড়ে উত্তর দিল—
__ইটস ওকে, প্রফেসর।
এই দৃশ্যটা দূর থেকে দেখছিল জিয়া। তার পাশেই বসে থাকা বোরা কনুই দিয়ে খোঁচা মেরে ফিসফিস করে বলল—
__কিরে, জিয়া? তুই না বললি, এ ছেলে কোনো মেয়ের দিকে তাকায় না? এখন তো দেখছি ইয়ে-রিনের ডেস্কমেট হয়ে দিব্যি বসে গেছে। এটাই ছেলেদের ক্যারেক্টার।
বোরার কথায় জিয়ার ভেতরের আগুন যেন আরও দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। সে দাঁত চেপে ইয়াশের দিকে তাকিয়ে রইল। এই মুহূর্তে যদি ক্লাসরুমে এত মানুষ না থাকত...
তাহলে হয়তো সত্যিই গিয়ে ইয়াশকে লাথি মেরে বের করে দিত।
রাগে তার মনে হচ্ছিল— এই ছেলেটাকে এখনই মাটির নিচে জীবন্ত কবর দিয়ে দেয়! আর সামনের বেঞ্চে বসে থাকা ইয়াশ... সে কিছুই জানে না।
সে শুধু নতুন ক্লাস, নতুন বই আর নতুন জীবনের শুরু নিয়ে শান্তভাবে প্রফেসরের লেকচার শুনে যাচ্ছে।
 সময় গড়িয়ে দুপুর হয়ে এলো।
একটার পর একটা ক্লাস শেষ হতে হতে অবশেষে শেষ ক্লাসের ঘণ্টাও বেজে উঠল।
প্রফেসর ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতেই মুহূর্তের মধ্যে পুরো ক্লাসরুম কোলাহলে ভরে গেল। কেউ ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠেছে, আবার কেউ করিডোরে দাঁড়িয়ে পরের দিনের পরিকল্পনা করছে।
অন্যদিকে, ইয়াশ ধীরস্থির ভঙ্গিতে নিজের বই-খাতা গুছিয়ে নিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে তার প্রথম দিন শেষ হয়েছে। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ—সবকিছুই এখনো তার কাছে অচেনা। তবুও সে মনে মনে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে সে নিচে নেমে এল। পার্কিং লট থেকে গাড়ি বের করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল গেটের একটু পাশেই দাঁড় করিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
মামার কথা সে অমান্য করতে চায় না। জিয়া যতই তাকে অপছন্দ করুক, তাকে নিয়েই আজ বাড়ি ফিরতে হবে।
গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে সে শান্তভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের দিকে তাকিয়ে রইল।
---
এদিকে...
জিয়া নিজের গ্যাংয়ের সঙ্গে হাসতে হাসতে করিডোর দিয়ে বেরিয়ে আসছে। বোরা, না-বি, মিনজে আর তাইজুন—সবাই মিলে এমনভাবে আড্ডায় মেতে আছে যে সময়ের দিকেও কারও খেয়াল নেই।
ঠিক তখনই—
একটি লম্বা ছায়া এসে জিয়ার সামনে দাঁড়াল।
হাঁটার গতি থামিয়ে জিয়া বিরক্ত চোখে সামনে তাকাল।
লি ডং কি।
তার বর্তমান বয়ফ্রেন্ড।
কিন্তু আজ তার মুখের অভিব্যক্তি অন্য দিনের মতো ছিল না। চোয়াল শক্ত, চোখ দুটো রাগ আর অস্থিরতায় ভরা। কোনো রকম ভূমিকা না করেই সে এক ঝটকায় জিয়ার ডান কব্জিটা শক্ত করে ধরে ফেলল।
ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে আশেপাশে থাকা সবাই কয়েক সেকেন্ডের জন্য হতভম্ব হয়ে গেল। জিয়া সঙ্গে সঙ্গে বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে তার হাতের দিকে তাকাল।
ডং কি গম্ভীর গলায় বলল—
__আই হ্যাভ সাম টক উইথ ইউ।
তার কণ্ঠে ছিল জোর করার স্পষ্ট ইঙ্গিত। কিন্তু জিয়া এমন মানুষ নয়, যে কারও চাপে মাথা নত করবে। সে ঠান্ডা দৃষ্টিতে ডং কির চোখের দিকে তাকাল।
পরের মুহূর্তেই জোরে একটা ঝটকা দিয়ে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল। কব্জিতে লাল দাগ পড়ে গেলেও তার মুখে বিন্দুমাত্র কষ্টের ছাপ নেই। বরং চোখে ফুটে উঠেছে বিরক্তি।
শীতল, অনুভূতিহীন কণ্ঠে সে বলল—
__আমার কোনো কথা নেই। সো, লিভ মাই পাথ।
কিন্তু ডং কি নড়ল না। বরং আরও এক পা সামনে এগিয়ে এল। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থী কৌতূহলী দৃষ্টিতে দৃশ্যটা দেখতে শুরু করেছে।
ডং কি নিচু গলায় বলল—
__নো। তোমাকে আজকে শুনতেই হবে। আমি তোমার বিএফ। সো, হাগ, কিস—ইট'স সুড বি নরমাল ফর আস।
কথাটা শেষ হতেই জিয়ার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল। সেই চোখে এবার স্পষ্ট ঘৃণা আর কঠোরতা।
সে ধীরে ধীরে, প্রতিটি শব্দে জোর দিয়ে বলল—
__নেভার। আই হেইট ফিজিকাল টাচ। আর হ্যাঁ, তোমার যদি এসবের ডিমান্ড থাকে, তাহলে লেট'স ব্রেক আপ।
কথাটা শুনে ডং কির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে স্পষ্টই বুঝতে পারল, জিয়া মজা করছে না। সে দ্রুত এক ধাপ এগিয়ে এসে তাড়াহুড়ো করে বলল—
__আমি ব্রেকআপ করতে চাই না। আই লাভ ইউ। সো, আই ওয়ানা মেক লাভ উইথ ইউ।
ডং কির শেষ কথাটা শুনেই জিয়ার ভেতরে জমে থাকা বিরক্তি চরমে পৌঁছে গেল। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে তাচ্ছিল্যের একটি শীতল হাসি ফুটে উঠল। সে কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে ডং কির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বরফশীতল কণ্ঠে, একটুও দ্বিধা না করে বলে উঠল—
__ফা*ক ইওর লাভ। ব্রেক আপ। ডোন্ট শো মি ইওর ফেস এগেইন।
কথাগুলো বলে সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। ডং কির পাশ কাটিয়ে মাথা উঁচু করে সামনে হাঁটতে শুরু করল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল দৃঢ়তা আর নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি অটল বিশ্বাস।
আর পেছনে দাঁড়িয়ে রইল ডং কি... সম্পূর্ণ স্তব্ধ।
সে হয়তো এখনো বিশ্বাসই করতে পারছে না— মাত্র কয়েকটি বাক্যেই তার সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটে গেল।
জিয়া চোখের আড়াল হতেই করিডোরের ভিড়ের মাঝে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল ডং কি। কয়েক সেকেন্ড আগেও তার মুখে ছিল অসহায়ত্বের ছাপ। কিন্তু জিয়ার চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই মুখোশটা ধীরে ধীরে খুলে যেতে লাগল।
তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিকৃত, শয়তানি হাসি। সে ধীরে ধীরে ডান হাত তুলে আঙুল দিয়ে নিজের কপাল বুলিয়ে নিল। চোখ দুটো অস্বাভাবিকভাবে চিকচিক করছে।
নিচু স্বরে, যেন নিজেকেই কথা দিচ্ছে, সে বিড়বিড় করে বলল—
__জিয়া... তোমাকে আমি কোনোভাবেই হাতছাড়া করব না। আমার ফ্রেন্ডদের সঙ্গে লাগানো শর্তে আমি হারতে পারি না। ভালোবেসে না পেলে... অন্যভাবে তোমাকে নিজের করতে বাধ্য করব। শেষ পর্যন্ত তোমাকে আমার বেড পার্টনার হতেই হবে।
কথাটা বলেই সে ঠোঁট বাঁকিয়ে অদ্ভুতভাবে হেসে উঠল। তার সেই হাসিতে ভালোবাসার কোনো ছাপ ছিল না... ছিল শুধু অধিকারবোধ, বিকৃত মানসিকতা আর এক ভয়ংকর জেদের ইঙ্গিত।
---
অন্যদিকে...
জিয়া নিজের বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ধীর পায়ে পার্কিং লটের দিকে এগিয়ে গেল। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে ইয়াশ। সে আগের মতোই শান্তভাবে গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে জিয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল।
জিয়া এসে কোনো কথা না বলেই দরজা খুলে গাড়ির ভেতরে বসে পড়ল। ইয়াশও কিছু জিজ্ঞেস না করে নিঃশব্দে ড্রাইভিং সিটে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। গাড়ি ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট ছেড়ে ব্যস্ত সড়কে উঠে এলো।
এখন গাড়ির ভেতরের নীরবতাটা অন্য সময়ের চেয়ে অনেক ভারী। সাধারণত জিয়ার মেজাজ সবসময়ই একটু চড়া থাকে। কখনো রাগ, কখনো বকবক—গাড়ির ভেতরটা একেবারে সরগরম করে রাখে।
কিন্তু আজ... সে সম্পূর্ণ চুপ।
জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি আর হতাশার ছাপ। ইয়াশ কয়েকবার আড়চোখে তাকাল।
শেষ পর্যন্ত সাহস সঞ্চয় করে নরম গলায় বলল—
__কিছু কি হয়েছে তোর? মুড অফ?
জিয়া কয়েক মুহূর্ত কোনো উত্তর দিল না। বাইরে দ্রুত পেছনে পড়ে থাকা শহরের দিকে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—
__তোরা ছেলেরা সব ক্যারেক্টারলেস। শালারা শুধু মেয়েদের দেহের পাগল। রিলেশনের দুদিন যেতে না যেতেই শুরু করে দেয়, "বেবি, আই ওয়ানা হাগ ইউ। মে আই কিস ইউ? লেট'স গো ফর রুম ডেট।"
তার কণ্ঠে জমে থাকা বিরক্তিটা এবার স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে আবার বলল—
__আরে ভাই, ইমোশন বলতে তো একটা কিছু আছে। যখন আমি বিপরীত পক্ষের ভালোবাসাটা সত্যি সত্যি ফিল করতে পারব, তখন তো আমি নিজ থেকেই আদর করব।
ইয়াশ মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনছিল। সে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল—
__ওই ছেলেটা বুঝি তোর বিএফ?
জিয়া নির্বিকার গলায় উত্তর দিল—
__হ্যাঁ, এক্স বিএফ। ১৪৩ নম্বর বিএফ। ভাবতেছি, আর প্রেম-ট্রেম করব না।
ইয়াশ ঠোঁটের কোণে দুষ্টু একটা হাসি টেনে বলল—
__মাত্র ১৪৩টা? আরও ৫৭টা বাকি আছে।
জিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
__কিসের?
ইয়াশ মুখ চেপে হেসে উত্তর দিল—
__ডাবল সেঞ্চুরির।
নিজের কথাতেই সে ফিক করে হেসে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে জিয়া চোখ রাঙিয়ে বলল—
__তুই কিন্তু আমার হাতে মার খাবি। তাছাড়া তোর বিচার আছে। ইয়াশ অবাক হয়ে বলল—
__কিসের বিচার?
জিয়া নাক ফুলিয়ে বলল—
__তুই ইয়ে-রিনের ডেস্ক পার্টনার হয়েছিস কেন?
ইয়াশ মুখ বাঁকিয়ে বলল—
__এনি প্রবলেম?
জিয়া গলায় জোর দিয়ে বলল—
__হ্যাঁ। ইয়ে-রিন একটা মেয়ে। সেটাই সবচেয়ে বড় প্রবলেম। আগামীকাল ভার্সিটিতে গিয়ে প্রফেসরকে তোর ডেস্ক চেঞ্জ করে দিতে বলবি।
কথাটা শুনে ইয়াশের মুখটা একেবারে ছোট হয়ে গেল। সে অসহায় গলায় বলল—
__কিন্তু মেয়েটা তো ক্লাস টপার। ওর সঙ্গে বসলে আমার পড়াশোনায় অনেক হেল্প হবে।
জিয়া এবার কঠিন গলায় বলে উঠল—
__ইয়াশ!! তুই ভালো করেই জানিস, আমি কথা রিপিট করা পছন্দ করি না।
জিয়ার কণ্ঠের কঠোরতা শুনে ইয়াশ আর কোনো তর্ক করল না।সে চুপচাপ মাথা নাড়ল।
__ওকে... আমি কালকেই বলব।
আর মনে মনে বলল,
__মামার ডায়লগের কপিবাজ।
---
পরদিন...
ক্লাস শুরু হতেই প্রফেসর দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করলেন। আজ তার মুখে আলাদা রকম উত্তেজনা।উপস্থিতি নেওয়ারও আগে তিনি ঘোষণা দিলেন—
নতুন একটি প্রজেক্ট শুরু হচ্ছে। আর এই প্রজেক্টে যার যার বর্তমান ডেস্কমেট, সে-ই হবে তার পার্টনার।
পুরো দশ দিন একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
ঘোষণাটা এত হঠাৎ এলো যে ইয়াশ নিজের ডেস্ক বদলানোর কথা বলার সুযোগই পেল না। সে শুধু হতাশ চোখে একবার জিয়ার দিকে তাকাল।
অন্যদিকে, জিয়ার মুখ মুহূর্তেই গোমড়া হয়ে গেল।পুরো ক্লাসজুড়ে সে আর একবারও ইয়াশের দিকে তাকাল না।
---
বাড়ি ফেরার সময়...
গাড়ির ভেতরে আবারও নেমে এলো নীরবতা। জিয়া ঠোঁট ফুলিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে বসে আছে।
তার মুখ দেখে ইয়াশ বুঝে গেল—সে এখনও ভীষণ রেগে আছে। সে অসহায় গলায় বলল—
__সরি রে... প্রফেসর তো আমাকে কোনো কথাই বলার সুযোগ দিল না। প্রজেক্টটা শেষ হোক, তারপর আমি যা করার করব। প্লিজ, এতদিন একটু টাইম দে। প্লিজ, একটু বোঝার চেষ্টা কর।
জিয়া সঙ্গে সঙ্গে বড় বড় চোখ করে তাকাল।
__কীহ্! প্রজেক্ট শেষ হতে দশ দিন লাগবে। আর তুই এই দশ দিন ওর সঙ্গে বসবি? ইম্পসিবল!!
জিয়ার রণমূর্তি দেখে ইয়াশ সত্যিই ভয় পেয়ে গেল।তার চোখ ভিজে উঠল। কাঁপা কণ্ঠে সে বলল—
__প্লিজ... আমার হাতে তো কিছুই নেই। একটু দয়া কর আমার ওপর। শুধু দশটা দিনই তো।
বলতে বলতেই নাক টানতে লাগল। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে এক মিনিটের মধ্যেই কান্নায় তার নাক-মুখ লাল হয়ে গেল।
এই দৃশ্য দেখে জিয়া বিরক্ত মুখে চোখ উল্টাল।
__ওকে, ঢং বাদ দে। তুই এই কয়দিন বসতে পারবি ওর সঙ্গে। বাট আই হ্যাভ এ কন্ডিশন।
ইয়াশ এক সেকেন্ডও দেরি না করে বলে উঠল—
__হোয়াটএভার ইউ ওয়ান্ট।
জিয়া আঙুল তুলে কড়া গলায় বলল—
__তুই ইয়ে-রিনের সঙ্গে হাসাহাসি আর কথা বলা তো দূরের কথা, ওর দিকে তাকাতেও পারবি না।
ইয়াশ নাক মুছতে মুছতেই দ্রুত মাথা নাড়ল।
__ওকে... আই প্রমিস।
এভাবেই দিনগুলো কাটতে লাগল। জিয়া নিজেও বুঝতে পারছিল না, ইয়াশের ব্যাপারে সে এতটা অধিকারবোধ কেন অনুভব করে।
আর ইয়াশও বুঝতে পারছিল না, কেন সে জিয়ার প্রতিটা কথাই কোনো প্রতিবাদ ছাড়াই মেনে নেয়।হয়তো এই সম্পর্কটার নাম তখনও কেউ জানত না...
কিন্তু অদৃশ্য একটা টান তাদের দুজনকে নিঃশব্দে বেঁধে রাখতে শুরু করেছিল। অবশেষে ঠিক দশ দিন পর প্রজেক্ট শেষ হলো।
ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই ইয়াশ নিজের বই-খাতা নিয়ে উঠে দাঁড়াল। সে প্রতিশ্রুতি রেখেছে। নিঃশব্দে গিয়ে ক্লাসের অন্য পাশে বসে থাকা এক ছেলের পাশে নিজের নতুন জায়গা করে নিল।
দূর থেকে সেটা দেখে জিয়ার মুখে অজান্তেই হালকা তৃপ্তির ছাপ ফুটে উঠল। যদিও সে সেটা কারও সামনে প্রকাশ করল না।
---
সময়ের চাকা থেমে থাকে না। দেখতে দেখতে কেটে গেল পুরো আড়াই মাস। আজ সিউল ইউনিভার্সিটিতে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
সকালের পুরো ক্যাম্পাসটাই যেন অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠেছে। রঙিন ব্যানার, সাজসজ্জা, স্টেজের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি, শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে।
মিসেস নাদিয়া জন্মসূত্রে একজন বাঙালি। উচ্চশিক্ষার জন্য বহু বছর আগে তিনি কোরিয়ায় এসেছিলেন। সেখানেই পরিচয় হয়েছিল মি. কিম সিওনের সঙ্গে।
পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব... বন্ধুত্ব থেকে গভীর ভালোবাসা... আর সেই ভালোবাসাই একসময় পরিণতি পেয়েছিল বিয়েতে।
চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব-২ শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন