১০•
জিয়া কথাটি বলেই এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আচমকাই ইয়াশ-এর ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।সেটা যেন সেখানে উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষের জন্যই সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে গেল।
চারপাশের সব শব্দ, রিসেপশনের কোলাহল, মানুষের হাসি, দূরে বাজতে থাকা মিউজিক—সবকিছু যেন এক নিমিষে স্তব্ধ হয়ে গেল। হালকা বাতাসে সাকুরা ফুলের কয়েকটি পাপড়ি ভেসে এসে তাদের দুজনের মাঝখানে পড়ল।
ইয়াশ সম্পূর্ণ স্থির হয়ে গেল। এতটাই আকস্মিক ছিল ঘটনাটা যে তার মস্তিষ্ক যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য কাজ করাই বন্ধ করে দিল। বিস্ময়ে তার চোখ বড় হয়ে উঠল। শরীরটাও যেন অবশ হয়ে গেল। সে বুঝতেই পারছিল না ঠিক কী ঘটল।
আর জিয়া... এই প্রথমবার নিজের হৃদয়ের সব কথা কোনো শব্দ ছাড়াই বলে দিল সে। চুমুটা দীর্ঘ ছিল না। কিন্তু সেই ছোট্ট মুহূর্তটার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ভালোবাসা, অভিমান, কষ্ট, হারানোর ভয় আর শেষ বিদায়ের অসহায়তা।
জিয়া ধীরে ধীরে ঠোঁট সরিয়ে নিল। তার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসছিল। মুখটা অস্বাভাবিক রকম ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কয়েকদিন ঠিকমতো না খাওয়া, অসুস্থ শরীর, অতিরিক্ত মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে তার শরীর আর নিজের ভার বহন করতে পারছিল না।
আকস্মিক ঘটনায় ইয়াশ পুরোপুরি হতবাক হয়ে গেল। কী বলবে? কী করবে? কীভাবে এই চুমুর প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটাই বুঝে ওঠার আগেই জিয়ার পুরো শরীর নিস্তেজ হয়ে এল। পরের মুহূর্তেই জিয়া সামনের দিকে ঢলে পড়তে লাগল।
__জিয়া!
ভয়ে চিৎকার করে উঠল ইয়াশ। সে এক সেকেন্ডও দেরি না করে দু'হাত বাড়িয়ে জিয়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যদি একটুখানি দেরি হতো, তাহলে জিয়া সোজা মাটিতে পড়ে যেত। জিয়ার নিস্তেজ শরীরটা নিজের বুকে আগলে নিতেই ইয়াশ অনুভব করল—মেয়েটার শরীর বরফের মতো ঠান্ডা।
তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। কাঁপা কাঁপা হাতে সে জিয়ার গালে আলতো চাপড় দিতে লাগল। ভয়ে তার পুরো শরীর কাঁপছিল। কাঁপা কণ্ঠে সে বারবার বলতে লাগল,
__জিয়া! জান আমার! কী হলো তোর? জান... চোখ খোল। মাই ফেইরি... আই অনলি লাভ ইউ। জান! শুধু তোকে ভালোবাসি আমি। আর কাউকে না। জিয়া!
কথাগুলো বলতে বলতেই তার গলা ধরে এল। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু আর আটকে রাখতে পারল না সে। এক ফোঁটা... দুই ফোঁটা... তারপর টপটপ করে চোখের পানি পড়তে লাগল জিয়ার মুখের ওপর।
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন অতিথিও অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। একটু আগেও যেখানে আনন্দের পরিবেশ ছিল, সেখানে এখন অদ্ভুত এক উৎকণ্ঠা নেমে এসেছে। ইয়াশকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে ইয়ে-রিন দ্রুত এগিয়ে এসে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করল।
সে জিয়ার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
__ইয়াশ! ওর শরীর অনেক দুর্বল লাগছে। হয়তো দুর্বলতার কারণেই সেন্সলেস হয়ে গেছে। তুমি ওকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যাও।
ইয়াশ যেন তখনও বাস্তবে ফিরতে পারছিল না। তার চোখ বেয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়ছে। সে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছে নাক টেনে বলল,
__ইয়েস... ইউ আর রাইট।
আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সে জিয়াকে কোলে তুলে নিল। এমনভাবে বুকে আগলে রাখল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা তার হাতের মধ্যে। তার দ্রুত হাঁটার শব্দ করিডোরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
বাড়ির বড়রা তখন সবাই বিয়ের বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কেউ অতিথিদের রিসিভ করছেন, কেউ স্টেজে, কেউ ছবি তুলতে ব্যস্ত। তাই ইয়াশ দ্রুত জিয়ার বড় বোন সানাকে ডেকে আনে।
সানা দৌড়ে এসে ছোট বোনের অবস্থা দেখে মুহূর্তেই সিরিয়াস হয়ে গেল। পেশায় ডাক্তার হওয়ায় আবেগকে একপাশে রেখে সে দ্রুত জিয়ার পালস, ব্লাড প্রেসার, শ্বাস-প্রশ্বাস সব পরীক্ষা করতে শুরু করল। কয়েক মিনিট ভালোভাবে পরীক্ষা করার পর সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর ইয়াশ-এর দিকে তাকিয়ে বলল,
__চিন্তার কিছু নেই। অতিরিক্ত দুর্বলতার কারণেই ও জ্ঞান হারিয়েছে।
সে ইয়াশকে পাশের মেডিকেল স্টোর থেকে কিছু ওষুধ আর স্যালাইন নিয়ে আসতে বলল। কথা শেষ হওয়ার আগেই ইয়াশ দৌড়ে বেরিয়ে গেল। মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই হাঁপাতে হাঁপাতে সবকিছু নিয়ে ফিরে এল। তার কপাল ঘামে ভিজে গেছে। শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত উঠানামা করছে। সানা এক মুহূর্ত নষ্ট না করে জিয়ার হাতে স্যালাইন পুশ করে দিল।
ওষুধগুলো পাশে রেখে সে ইয়াশকে কিছু নির্দেশনাও দিয়ে দিল—কখন কী দিতে হবে, কীভাবে খেয়াল রাখতে হবে। জিয়ার অসুস্থতার খবর বাড়ির অন্য কাউকে জানানো হলো না। সবাই জেনে গেলে অযথা চিন্তায় পড়বে, তাই ছোটরাই বিষয়টা নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখল।
রাত যত গভীর হতে লাগল, কিম ম্যানশনের কোলাহলও ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে এল। একসময় রিসেপশনের শেষ অতিথিও বিদায় নিল। পুরো বাড়ি ঘুমিয়ে পড়লেও একজন মানুষের চোখে সেদিন ঘুমের ছিটেফোঁটাও ছিল না। সারারাত ইয়াশ এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বন্ধ করতে পারল না।
চাতক পাখির মতো জিয়ার মাথার পাশে বসে রইল।মাঝেমধ্যে আলতো করে কপালে হাত রেখে জ্বর দেখল। আবার কখনো তার শ্বাস-প্রশ্বাস ঠিক আছে কি না তা নিশ্চিত হলো। কখনো নিঃশব্দে তার এলোমেলো চুলগুলো কানের পাশে গুছিয়ে দিল।আবার কখনো জিয়ার ঠান্ডা হাতটা নিজের দুই হাতের মধ্যে নিয়ে বসে রইল।
মেয়েটার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে বলল,
"এত কষ্ট একা একা কেন সহ্য করলি, জিয়া...?"
কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় তখন জিয়া ছিল না। জানালার বাইরে ধীরে ধীরে রাতের অন্ধকার ফিকে হতে শুরু করল। পূর্ব আকাশে সূর্যের প্রথম আলো ফুটতেই ইয়াশ শেষবারের মতো জিয়ার দিকে তাকাল। তারপর খুব আস্তে করে কম্বলটা ঠিক করে দিয়ে, যেন কারও ঘুম না ভাঙে, নিঃশব্দে নিজের রুমে ফিরে গেল।
এর কিছুক্ষণ পর... জিয়ার চোখের পাতাগুলো ধীরে ধীরে কেঁপে উঠল। মাথার ভেতরটা যেন প্রচণ্ড ভারী লাগছিল। পুরো শরীর অবশ হয়ে আছে। হাত-পায়ে একটুও শক্তি নেই। চোখ খুলতেই সিলিংয়ের দিকে কিছুক্ষণ ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে। যেন বুঝে ওঠার চেষ্টা করছে—সে কোথায় আছে।
ধীরে ধীরে আশপাশে চোখ বুলিয়ে বুঝতে পারল, সে নিজের রুমেই শুয়ে আছে। বিছানার পাশের ছোট টেবিলে কয়েকটা ওষুধ, এক গ্লাস পানি আর ব্যবহৃত স্যালাইনের সেট পড়ে আছে। স্যালাইনটা কিছুক্ষণ আগেই খোলা হয়েছে, সেটা দেখে বোঝাই যাচ্ছে।
জিয়া একবার নিজের হাতের দিকে তাকাল। ক্যানুলা লাগানোর ছোট্ট দাগটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তবে বিষয়টা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাল না। কে তাকে রুমে এনে রেখেছে বা কে কী ভাবল—এসব নিয়ে জিয়ার কখনোই বিশেষ মাথাব্যথা ছিল না।
তবে শরীরটা সত্যিই খুব খারাপ লাগছিল। দুর্বলতায় হাত-পা পর্যন্ত কাঁপছিল। তারপরও কোনো কিছুকে গুরুত্ব না দিয়ে সে একটি ক্যাব বুক করে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল। ভাইয়ের বিয়ে শেষ হয়েছে মাত্র। আজ তার ভার্সিটিতে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। কিন্তু বাড়িতে থাকলে ইয়াশ-এর মুখোমুখি হতে হবে। আর সেই পরিস্থিতি এড়াতেই সে ভার্সিটিতে চলে গেল।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সময়ও তার শরীরটা কয়েকবার টলে উঠল। তবুও কারও সাহায্য নিল না।কিম ম্যানশনের গেটের বাইরে এসে চুপচাপ ক্যাবে উঠে বসল। ড্রাইভার গন্তব্য জিজ্ঞেস করতেই ছোট্ট করে বলল,
__সিউল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
গাড়িটা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল। জানালার বাইরে ছুটে চলা শহরটাকে নির্বিকার চোখে দেখছিল জিয়া। আজ প্রথমবার তার মনে হলো— একই শহরে থেকেও একজন মানুষ থেকে হাজার মাইল দূরে চলে যাওয়া যায়।
ভার্সিটির আর মাত্র চার মাস বাকি।
জিয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে—এই চার মাস সে ক্যাবে করেই যাতায়াত করবে। ইয়াশ-এর সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ রাখবে না। কথা বলবে না, চোখেও চোখ রাখবে না। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তার বুকটা ভীষণ কেঁপে উঠছিল।
কারণ সে জানত... এটা যতটা সহজ মুখে বলা যায়, বাস্তবে ঠিক ততটাই কঠিন। একই বাড়িতে থাকা... একই ডাইনিং টেবিলে বসা... একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া... প্রতিদিন একে অপরকে সামনে দেখা... এসবের মাঝেও একজন মানুষকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা কি আদৌ সম্ভব?
তবুও জিয়া নিজের জন্য নতুন একটি রুটিন তৈরি করে ফেলল। প্রতিদিন সকালে ভার্সিটিতে যাওয়া... বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া... রাতে লেট নাইট পার্টি করা... তারপর মাতাল অবস্থায় বাড়ি ফেরা।
বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, আগের সেই দুষ্টু, বেপরোয়া জিয়াই ফিরে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে... এটা ছিল নিজেকে ব্যস্ত রাখার একটা ব্যর্থ চেষ্টা। যতক্ষণ মানুষে মানুষে ঘেরা থাকত, ততক্ষণ সে ভালো থাকার অভিনয় করতে পারত।
কিন্তু একা হলেই... বারবার মনে পড়ত একটা মানুষকে। জিয়ার ধারণা, সে ইয়াশকে ইগনোর করছে, তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু মেয়েটা জানে না... প্রতিদিন গভীর রাতে যখন সে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বাড়ি ফেরে, তখন একমাত্র ইয়াশই নিঃশব্দে তার যত্ন নেয়।
মাতাল অবস্থায় জিয়ার সব অদ্ভুত আচরণ, বায়না আর পাগলামি হাসিমুখে সহ্য করে সে। কখনো জিয়া ঘুমের ঘোরে ইয়াশ-এর জামা আঁকড়ে ধরে বলত,
"যাস না..."
আবার পরের সকালেই কিছুই মনে থাকত না তার।আর ইয়াশ... সে শুধু মৃদু হেসে প্রতিরাতের মতোই জিয়ার গায়ে কম্বলটা টেনে দিয়ে নিঃশব্দে রুম থেকে বেরিয়ে যেত।
বাড়ির সবাই জিয়ার এই পরিবর্তনের কারণ জানে। কেন মেয়েটা এতটা বদলে গেছে, সেটাও তাদের অজানা নয়। তবুও কেউ কিছু বলত না। কারণ তারা জানে, কিছু সম্পর্কের জট খুলতে সময়ের প্রয়োজন হয়।
সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। ঘড়ির কাঁটা কিংবা সমুদ্রের ঢেউ—দুটোই নিজের নিয়মে এগিয়ে চলে। দেখতে দেখতেই চারটি মাস কেটে গেল। শেষ হয়ে গেল ওদের ভার্সিটির ফাইনাল এক্সামও। জিয়ার পুরো ফ্রেন্ড সার্কেলের প্রায় সবারই বিয়ে হয়ে গেছে।
শুধু নাবি বাকি ছিল। অবশেষে নাবির বিয়ের দিনও ঠিক হয়ে গেল। সিওজুনের সঙ্গেই তার বিয়ে। খবরটা শোনার পর পুরো ফ্রেন্ড সার্কেল আবারও আনন্দে মেতে উঠল। গ্রুপ চ্যাটে শুরু হয়ে গেল প্ল্যানিং, শপিং, সাজসজ্জা আর অসংখ্য হাসি-ঠাট্টা।
নাবির একটাই আবদার ছিল—বিয়ের সময় অন্তত তিন দিন জিয়াকে তার বাড়িতে থাকতে হবে।
সে জিয়ার দুই হাত ধরে অভিমানী গলায় বলেছিল,
__দেখ, এটা কিন্তু কোনো রিকোয়েস্ট না। এটা আমার অর্ডার। আমার বিয়েতে তুই পুরো তিন দিন আমার সঙ্গে থাকবি। একটা মিনিটের জন্যও পালাতে পারবি না।
বন্ধুর এমন আবদারে জিয়া না করতে পারল না। মৃদু হেসে শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিল। বিয়েতে ইয়াশকেও নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল। কিন্তু নিমন্ত্রণের কথা শুনেই জিয়ার হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে শান্ত গলায় জানিয়ে দিল,
__ইয়াশ গেলে আমি যাব না।
কথাটা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বলেছিল সে। কিন্তু তার কণ্ঠের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কষ্টটা নাবির চোখ এড়ায়নি। শেষ পর্যন্ত... ইয়াশ নিজের ইচ্ছাতেই বিয়েতে যায়নি। হয়তো সে বুঝেছিল, তার না যাওয়াতেই জিয়া একটু স্বস্তিতে থাকবে।
তিন দিনের হাসি-আড্ডা, হ্যাংআউট আর বন্ধুর বিয়ের আনন্দ শেষ করে জিয়া যখন বাড়ি ফিরল, তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আকাশে তখন সূর্য ডুবে গিয়েছে। পশ্চিম দিগন্তে শেষ আলোটুকু ম্লান হয়ে আসছে। সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে ধীর পায়ে কিম ম্যানশনের ভেতরে প্রবেশ করল জিয়া।
তার মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। তবুও বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো তিনটা দিনের স্মৃতি মনে পড়তেই ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু সেই হাসিটাও বেশিক্ষণ টিকল না।
ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই জিয়া দেখল, পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে কোনো একটি বিষয় নিয়ে গভীর আলোচনা করছে। পরিবেশটা অন্য দিনের মতো স্বাভাবিক নয়। সবার মুখেই এক ধরনের গুরুত্বের ছাপ।
মি. সিউন সাহেব বলছিলেন,
__আর দেরি করতে চাইছি না। তোমরা কী বলো?
মি. নাভিদ শাহারিয়ার সম্মতি জানিয়ে বললেন,
__হিউং! আপনি ঠিকই বলছেন। বিয়েটা অনেক ধুমধাম করেই হবে।
মি. সিউন সাহেব গর্বের হাসি দিয়ে বললেন,
__হ্যাঁ! আমার ছোট মেয়ে... আমার প্রিন্সেসের বিয়ে বলে কথা।
"বিয়ে..."
শব্দটা কানে যেতেই জিয়া থমকে দাঁড়াল। ভ্রু কুঁচকে একবার সবার মুখের দিকে তাকাল সে। তারপর ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এসে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
__বাপি! তুমি কার বিয়ের কথা বলছ?
মি. সিউন সাহেব মেয়েকে দেখে স্নেহভরা হাসি হাসলেন।
__প্রিন্সেস, তুমি চলে এসেছ? কেমন এনজয় করলে বিয়ে?
জিয়া বাবার পাশে বসে ব্যাগটা সোফার পাশে রেখে বলল,
__অনেক এনজয় করেছি। কিন্তু তুমি কথা ঘুরিও না। কার বিয়ের কথা বলছ তোমরা?
মি. সিউন সাহেবের হাসি আরও চওড়া হয়ে গেল।তিনি স্নেহভরে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
__তোমার! আমরা সবাই মিলে একটা ছেলে পছন্দ করেছি। ছেলেটাকে দেখবে?
কথাটা শুনে জিয়া যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য সম্পূর্ণ নিশ্চুপ হয়ে গেল। তার মুখের হাসিটুকুও ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। সে যেন ঠিক বিশ্বাসই করতে পারছিল না, এত দ্রুত তার বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা হয়েছে। অবচেতন মনটা একটাই মানুষকে খুঁজতে লাগল।
নিজের বিয়ের কথা শুনে জিয়া সবার আগে তাকাল সোফার অপর পাশে বসে থাকা ইয়াশের দিকে। ইয়াশ শান্ত হয়ে বসে আছে। তার ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি। সেই হাসিটুকুই যেন জিয়ার বুকের ভেতর জমে থাকা পুরোনো ক্ষতগুলোকে আবার নতুন করে রক্তাক্ত করে দিল।
তার মনে হলো—
"আমার বিয়ের কথা শুনে... ওর মুখে হাসি?"
মুহূর্তের মধ্যে বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল।অভিমান, কষ্ট আর অপূর্ণ ভালোবাসা একসঙ্গে এসে তাকে গ্রাস করল। সে মনে মনে তিক্ত হেসে উঠল।
"বোকা মেয়ে... এতদিন যাকে ভুলতে পারলি না, সে তো তোকে ছাড়াই ভালো আছে।"
নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে নিল সে। মুখে কোনো কষ্টের ছাপ প্রকাশ হতে দিল না। নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে শান্ত গলায় বলল,
__না। আমার ছেলেকে দেখার প্রয়োজন নেই। আমি জানি, তোমরা সবাই আমার জন্য ভালোই চয়েস করেছ। কিন্তু যাই করো, তাড়াতাড়ি করো। আমি বিয়েটা যত দ্রুত সম্ভব করতে চাই।
কথাগুলো বলার সময় তার গলাটা যতই শান্ত শোনাক না কেন, বুকের ভেতরে তখন তীব্র ঝড় বইছিল। ঘরে উপস্থিত সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। মেয়েটার এত সহজে রাজি হয়ে যাওয়াটা যেন কারও কাছেই স্বাভাবিক লাগছিল না।
মি. সিউন সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন,
__জিয়া! এত তাড়াহুড়ো করার কী আছে? তুমি সবার ছোট। তোমার বিয়েতে সবাই আনন্দ করবে। ধীরে-সুস্থে হোক না।
বাবার কণ্ঠে স্পষ্ট মায়া আর উদ্বেগ ছিল। তিনি ভেবেছিলেন, মেয়ে হয়তো লজ্জা পাবে, হয়তো ছেলেকে আগে দেখতে চাইবে। কিন্তু এমন উত্তর... তিনি একেবারেই আশা করেননি। জিয়া ধীরে ধীরে বাবার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। চোখ দুটো অদ্ভুত রকম শান্ত। কিন্তু সেই শান্ত চোখের গভীরে জমে ছিল অসংখ্য না বলা কান্না। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে বলল,
__তোমরা যদি চাও আমি বিয়ে করি, তাহলে এক সপ্তাহের মধ্যে বিয়ের আয়োজন করো। আর হ্যাঁ, বিয়েটা বাংলাদেশে হবে, বাংলাদেশের কালচারে হবে। আমরা দুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশে রওনা দেব। আমি এখন রুমে যাচ্ছি।
কথাগুলো বলার পর সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। কারও মুখের দিকে দ্বিতীয়বার তাকানোর সাহসও হলো না তার। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। একবারও ইয়াশের দিকে তাকাল না। কারণ সে জানত... আর একবার যদি তাকায়, তাহলে হয়তো নিজের চোখের জল আর লুকিয়ে রাখতে পারবে না।কথা শেষ করেই সে সোজা নিজের রুমে চলে গেল।সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার সময় তার পদক্ষেপগুলো ধীর হয়ে আসছিল। রুমের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা পুরো ড্রয়িংরুমে অদ্ভুত এক নীরবতা ছড়িয়ে দিল।
জিয়ার এমন আচরণে পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।কেউ কোনো কথা বলছিল না। মি. সিউন সাহেব অসহায় গলায় বললেন,
__কী হলো এটা? মেয়েটা এমন করল কেন?
তার কণ্ঠে ছিল একজন বাবার অসহায়ত্ব। তিনি বুঝতেই পারছিলেন না, কয়েক মিনিটের মধ্যে মেয়েটার আচরণ এতটা বদলে গেল কেন। সবার মুখে তখন চিন্তার ছাপ। কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেও একজন মানুষকে অদ্ভুত শান্ত দেখাচ্ছিল। সে হলো... ইয়াশ।
সে ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি নিয়ে মি. সিউন সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল,
__মামা... তুমি এসব বুঝবে না।
তার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস ছিল।
যেন সে জানে—জিয়া কেন এমন আচরণ করেছে।তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
__মাই ডিয়ার অল ফ্যামিলি মেম্বারস, তোমাদের কাছে আমার একটা রিকোয়েস্ট। জিয়া যেহেতু জানতে চায় না ওর কার সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে, প্লিজ... তোমরা কেউ ওকে বলবে না।
কথাটা শুনে সবাই আবার অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। মিসেস নাদিয়া চিন্তিত হয়ে বললেন,
__পরে যদি রাগারাগি করে? চিৎকার-চেঁচামেচি করে?
ইয়াশ মুচকি হেসে মাথা নাড়ল। তার চোখে তখন দুষ্টুমির হালকা ঝিলিক। সে হেসে বলল,
__মাই ডিয়ার ফুপি, তুমি তোমার মেয়ের চিন্তা বাদ দিয়ে নিজের দিকে খেয়াল দাও। এত চিন্তা করলে তোমার সুন্দর চেহারাটাই নষ্ট হয়ে যাবে। আর তোমার মেয়ে কিছুই করবে না।
কথাটা শুনে ঘরের ভারী পরিবেশের মধ্যেও কয়েকজনের মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু ইয়াশের চোখের গভীরে তখন অন্যরকম এক অপেক্ষা লুকিয়ে ছিল।
সে খুব ভালো করেই জানত, জিয়া এখন রাগে, অভিমানে আর ভুল বোঝাবুঝির দেয়াল তুলে রেখেছে। তাই এখন তাকে কিছু বুঝিয়ে লাভ নেই। সময়ই সবকিছুর উত্তর দেবে। ইয়াশ এবার মি. সিউন সাহেবের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
__মামা, ও যেমন বলেছে ঠিক তেমনটাই করো। বাকি সব আমার ওপর ছেড়ে দাও। দেখবে, বিয়েতে তোমার মেয়েই সবচেয়ে বেশি খুশি হবে।
কথাটা শুনে সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।এত আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথাগুলো বলছে কেন? কী এমন পরিকল্পনা করেছে সে? কেউই কিছু বুঝতে পারল না।
মি. সিউন সাহেব কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বললেন,
__কিন্তু... বাংলাদেশ?
ইয়াশ দুষ্টু হেসে সোফায় হেলান দিয়ে বসল। তার ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। তারপর খুব শান্ত স্বরে বলল,
__আই নো, তুমি কী ভাবছ। আর ঠিক সেই কারণেই তোমার মেয়ে বাংলাদেশে বিয়ে করতে চেয়েছে। বাট ডোন্ট ওয়ারি। আমি আগে থেকেই জানতাম এমন কিছু হবে।
কথাটা শুনে মি. নাভিদ শাহারিয়ারও ছেলের দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকালেন। ছেলেটা যেন অনেক আগেই সব হিসাব করে রেখেছে। আসলে জিয়া চেয়েছিল, ইয়াশ যেন তার বিয়েতে উপস্থিত থাকতে না পারে। ইয়াশের বাংলাদেশের ভিসা প্রসেসিংয়ে কিছু সমস্যা চলছিল। কিন্তু জিয়া জানত না, ইয়াশ ইতোমধ্যেই এম্বাসির সঙ্গে কথা বলে সেই সমস্যাগুলোর সমাধান করে ফেলেছে।
হয়তো বাংলাদেশে পৌঁছাতে তার দু-এক দিন দেরি হবে, কিন্তু সে যে আসবেই—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ইয়াশ মনে মনে মুচকি হেসে ভাবল,
"তুই যতই পালানোর চেষ্টা করিস না কেন, শেষ পর্যন্ত আমার কাছেই ধরা দিবি, মাই ফেইরি..."
অবশ্য কথাগুলো শুধু তার মনেই রয়ে গেল। মুখে সে কিছুই প্রকাশ করল না। এদিকে... উপরে নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করেই বিছানায় বসে পড়ল জিয়া। মুখে যতই শক্ত থাকার অভিনয় করুক না কেন, বুকের ভেতরটা তখন প্রচণ্ড ব্যথায় মোচড় দিচ্ছিল।
সে ধীরে ধীরে মাথাটা বিছানার হেডবোর্ডে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল। ইয়াশের সেই হাসিমুখটা বারবার ভেসে উঠছে চোখের সামনে।
"আমার বিয়ের কথা শুনে ও এত খুশি কেন?"
"একবারও আমাকে আটকানোর চেষ্টা করল না..."
"একবারও বলল না—বিয়ে করিস না..."
ভাবতে ভাবতেই তার চোখ বেয়ে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সেই কান্নার শব্দ শোনার মতো কেউ ছিল না। জিয়া নিজের সিদ্ধান্ত থেকে এক চুলও সরে দাঁড়াল না। দুদিন পর কিম পরিবারের সবাই বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। সকাল থেকেই পুরো কিম ম্যানশন ছিল ব্যস্ততায় ভরা।
লাগেজ গুছানো, টিকিট চেক করা, সবার পাসপোর্ট ঠিক আছে কি না দেখা—চারদিকে ছোটাছুটি লেগেই ছিল। এক এক করে সবাই গাড়িতে উঠে বসল। বিদায়ের আগে বাড়ির স্টাফদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দিয়ে দেওয়া হলো। শেষ পর্যন্ত সবাই এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। শুধু... ইয়াশ কোরিয়াতেই থেকে গেল।
বিদায়ের সময়ও সে আগের মতোই হেসে সবার সঙ্গে কথা বলল। কিন্তু জিয়ার সঙ্গে তার একবারের জন্যও চোখাচোখি হলো না। হয়তো... দুজনের কেউই সেই সাহসটা খুঁজে পায়নি।
কথায় আছে, যার বিয়ে তার খবর নেই, পাড়া-পড়শির ঘুম নেই। এখন ঠিক সেই অবস্থাই হয়েছে জিয়ার। রাগ আর অভিমানের বশে বিয়েতে রাজি হলেও, সত্যিটা হলো—সে ইয়াশের মুখোমুখি হতে চায় না। তাই বাংলাদেশে বিয়ে করার সিদ্ধান্তটাও সে ইচ্ছে করেই নিয়েছে।
তার বিশ্বাস ছিল— ইয়াশ ভিসার সমস্যার কারণে সময়মতো বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারবে না। আর সেটাই হবে তার জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তি। সে অন্তত শেষবারের মতোও ইয়াশকে দেখতে হবে না। সে জানত না...ভাগ্য তার জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু লিখে রেখেছে।
বাংলাদেশে এসেও জিয়া নিজেকে প্রায় ঘরবন্দি করে রাখল। চারপাশে তখন বিয়ের উৎসবের আমেজ।আত্মীয়-স্বজনের আনাগোনা, একের পর এক শপিং, গয়না বাছাই, মেহেদি, হলুদের প্রস্তুতি, নিমন্ত্রণপত্র, ক্যাটারিং—সবকিছু নিয়েই পুরো বাড়ি ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল।
সকালে কেউ না কেউ তার রুমের দরজায় নক করত। কেউ বলত,
—"চলো শপিংয়ে যাই।"
কেউ বলত,
—"জিয়া, গয়নাগুলো একবার ট্রাই করে দেখো।"
আবার কেউ এসে নতুন শাড়ি খুলে দেখাত। কিন্তু প্রতিবারই জিয়ার উত্তর একই থাকত।
__তোমরা করে ফেলো। আমার কিছু দেখা লাগবে না।
তার কণ্ঠে না ছিল উত্তেজনা, না ছিল আগ্রহ। শুধু একরাশ ক্লান্তি। দিনের বেশিরভাগ সময়ই সে নিজের রুমের জানালার পাশে বসে কাটিয়ে দিত। কখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। কখনো নিঃশব্দে বৃষ্টির শব্দ শুনত। আবার কখনো নিজের অজান্তেই মোবাইলের গ্যালারিতে চলে যেত।
স্ক্রিনে ভেসে উঠত পরিচিত একটা মুখ... ইয়াশ।কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে আবার ফোনটা বন্ধ করে দিত। নিজেকেই জোর করে বোঝানোর চেষ্টা করত—
"আর কয়েকটা দিন... তারপর সব শেষ।"
দেখতে দেখতেই বিয়ের দিন চলে এল। সকাল থেকেই পুরো বাড়ি উৎসবের রঙে রঙিন। উঠোনজুড়ে রঙিন আলোকসজ্জা। চারদিকে গাঁদা, রজনীগন্ধা আর গোলাপের ফুলের সাজ।
বাড়ির প্রতিটি কোণে আত্মীয়দের কোলাহল। কেউ ছবি তুলছে। কেউ কনেকে নিয়ে গল্প করছে। কেউ আবার রান্নাঘরে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত।
মেকআপ আর্টিস্ট, ফটোগ্রাফার, ভিডিওগ্রাফার—সব মিলিয়ে বাড়িটা যেন ছোট্ট একটা উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে... বিয়ের মঞ্চে কনে সেজে বসে আছে জিয়া। জীবনে প্রথমবার এত ভারী বাঙালি সাজ পরেছে সে। তার পরনে গাঢ় লাল বেনারসি। সোনালি জরির সূক্ষ্ম নকশায় পুরো শাড়িটা ঝলমল করছে।গলাভর্তি ভারী গয়না। কপালে টিকলি। নাকে নথ।চুলভর্তি ফুলের সাজ। তার ওপর ভারী মেকআপ।
যে কেউ তাকে দেখলে বলবে— আজ যেন সত্যিই কোনো রাজকন্যা। কিন্তু... এই রাজকন্যার চোখে আজ কোনো স্বপ্ন নেই।আয়নার সামনে বসে থাকা নিজের প্রতিচ্ছবির দিকেও সে একবার তাকানোর প্রয়োজন অনুভব করল না।
এমনিতেই মন ভীষণ খারাপ। তার ওপর এই সাজগোজ যেন আরও অসহ্য লাগছে। ভারী অলংকারগুলোর ওজনের চেয়েও যেন বুকের ভেতরের কষ্টটা অনেক বেশি ভারী লাগছিল। কিন্তু এখন আর কিছু বলার উপায় নেই।
আজ জিয়ার ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। সে চেয়েছিল ইয়াশের থেকে দূরে সরে যেতে... শেষবারের মতোও তাকে না দেখতে। সত্যিই... ইয়াশ আসেনি। এই বিশ্বাসটাই তাকে অদ্ভুত এক শূন্যতা আর কষ্টে ভরিয়ে দিল।
মেয়েটার দেহটা এখানে থাকলেও... মনটা যেন বহু দূরে কোথাও পড়ে আছে। তার হৃদয়ের প্রতিটি কোণে আজও শুধু একজন মানুষেরই নাম প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—ইয়াশ।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে ভেসে এল হৈচৈ আর কোলাহলের শব্দ। কারও উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ শোনা গেল,
__পাত্রপক্ষ চলে এসেছে! সবাই নিচে আসুন!
মুহূর্তের মধ্যেই পুরো বাড়ি যেন আরও সরগরম হয়ে উঠল। ছোটরা দৌড়াদৌড়ি করছে, বড়রা অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত। বাড়ির সামনে একের পর এক গাড়ি এসে থামছে। আতশবাজির শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠছে। দূরে সানাইয়ের সুর ভেসে আসছে। সবাই যার যার মতো আনন্দে মেতে উঠলেও...
একটা মানুষ যেন ধীরে ধীরে নিজের ভেতরেই ভেঙে পড়ছিল। পাত্রপক্ষ এসে গেছে শুনতেই জিয়ার বুকের ভেতরটা বর্ষার কালো মেঘে ঢেকে গেল। তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসতে লাগল। মনে হচ্ছিল, বুকের ভেতর কেউ যেন শ্বাসরোধ করে ধরে আছে।
চোখ বন্ধ করলেই মনে হচ্ছে অশ্রু গড়িয়ে পড়বে। তাই সে জোর করেই নিজেকে সামলে রাখল। নিজের দুই হাত শক্ত করে মুঠো করে নিল। নখগুলো হাতের তালুতে বসে গেলেও সে টের পেল না।
শুধু একটাই কথা নিজেকে বারবার বলছিল—
"কাঁদবি না... আজ অন্তত কাঁদবি না।"
কিছুক্ষণ পর কয়েকজন আত্মীয়া এসে তাকে ধীরে ধীরে বিয়ের মঞ্চে নিয়ে গেল। চারদিকের অসংখ্য আলো তার চোখে এসে লাগছিল। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একটার পর একটা জ্বলছে। সবাই হাসছে।
কেউ বলছে,
—"মাশাআল্লাহ, কনেটা কত সুন্দর!"
আবার কেউ বলছে,
—"একেবারে রাজকন্যা লাগছে।"
কিন্তু এই প্রশংসার কোনো শব্দই যেন জিয়ার কানে পৌঁছাচ্ছিল না। সে শুধু মাথা নিচু করে বসে রইল।অবশেষে সেই মুহূর্ত চলে এল... যখন তাকে "কবুল" বলতে হবে।
জিয়া ধীরে ধীরে একবার আড়চোখে নিজের হবু স্বামীর দিকে তাকাল। মুখের বেশিরভাগ অংশ সাদা রুমাল দিয়ে ঢাকা। চোখে কালো সানগ্লাস। পরিপাটি কালো শেরওয়ানি। হাতে দামি ঘড়ি। স্টাইলিশ হেয়ারকাট। দেখে মনে হচ্ছে, ছেলেটা যথেষ্ট স্টাইলিশ।
জিয়া কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে আবার চোখ নামিয়ে নিল। তার জানারও কোনো ইচ্ছে নেই। আজ থেকে এই মানুষটাই তার স্বামী হবে... এই সত্যিটা মেনে নেওয়াই তার কাছে যথেষ্ট কঠিন। এখন নিজের পরিবারের সম্মানের জন্য হলেও তাকে "কবুল" বলতে হবে।
কাজি সাহেব শান্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন। ঘরের সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে। জিয়া চোখ বন্ধ করে ফেলল। চোখ বন্ধ করতেই আবার ভেসে উঠল সেই চিরচেনা মুখটা।
বুকের ভেতরটা অসহ্য যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল।ঠোঁট কাঁপছিল। তবুও... সে এক নিঃশ্বাসে তিনবার কবুল বলে ফেলল। শব্দগুলো মুখ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার আটকে রাখা চোখের পানিও আর বাধা মানল না। গাল বেয়ে টপটপ করে অশ্রু ঝরতে লাগল।
জিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। এদিকে তার স্বামীও তিনবার কবুল বলে ফেলেছে। এখন তারা স্বামী-স্ত্রী। চারপাশে সবাই "আলহামদুলিল্লাহ" বলে দোয়া করতে লাগল।
আত্মীয়-স্বজন একে অপরকে অভিনন্দন জানাচ্ছে।কেউ মিষ্টি খাওয়াচ্ছে। কেউ ছবি তুলছে। শুধু... নববধূর কান্না যেন সেই আনন্দের মাঝেও অদ্ভুত এক বিষণ্নতার ছায়া ফেলে দিল।
সবাই মিলে জিয়াকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল। মিসেস হারিন এগিয়ে এসে নাতনিকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন,
__এই পাগলি, আজ তো কাঁদার দিন না। আজ তো আমার প্রিন্সেসের নতুন জীবনের শুরু।
মিসেস অরিনও জিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
__এত কান্না করলে কিন্তু মেকআপ সব নষ্ট হয়ে যাবে।
চারপাশে উপস্থিত আত্মীয়-স্বজনও একের পর এক জিয়াকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু কেউ জানত না, এই কান্না শুধু বিয়ের আবেগের জন্য নয়... নিজের ভালোবাসাকে হারানোর যন্ত্রণায় ভেঙে পড়েছে সে।
কিছুক্ষণ পর বাড়ির বড়রা বললেন,
__আচ্ছা, এবার আয়নায় মুখ দেখার অনুষ্ঠানটা শুরু করা যাক।
একজন খালা রূপার ফ্রেমে বাঁধানো বড় আয়নাটা এনে সামনে রাখলেন। সবাই উৎসুক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল নতুন বর-কনের প্রথম একসঙ্গে মুখ দেখার মুহূর্তটা দেখবে বলে।
কিন্তু ঠিক তখনই... জিয়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।চোখ দুটো কান্নায় ফুলে লাল হয়ে গেছে। সে একবারও নিজের পাশে বসে থাকা মানুষটার দিকে তাকাল না।
শান্ত অথচ ক্লান্ত গলায় বলল,
__বিয়ে তো হয়ে গেছে। এখন আবার এসব রিচুয়াল করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি খুব ক্লান্ত লাগছে। আমি আমার রুমে যাচ্ছি।
কথাটা শুনে সবাই এক মুহূর্তের জন্য অবাক হয়ে গেল। মিসেস নাদিয়া তাড়াতাড়ি বললেন,
__মা, এভাবে যায় না। এটা আমাদের একটা সুন্দর রীতি।
মি. সিউন সাহেবও নরম গলায় বললেন,
__প্রিন্সেস, আর পাঁচ মিনিট থাকো। তারপর বিশ্রাম নেবে।
কিন্তু জিয়া মাথা নাড়ল।
__আই'ম সরি, বাপি। আমার সত্যিই ভালো লাগছে না।
সবাই জিয়াকে থামাতে নিলে, ঠিক তখনই... তার নববিবাহিত স্বামী ধীরে ধীরে হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে দিল। গভীর অথচ শান্ত কণ্ঠে বলল,
__প্লিজ... ওকে যেতে দিন।
কথাটা এতটাই ভদ্রভাবে বলল যে কেউ আর আপত্তি করতে পারল না। বরের কথা শুনে সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। মি. নাভিদ শাহারিয়ার মৃদু হেসে বললেন,
__ঠিক আছে। মেয়েটা অনেক ক্লান্ত। ওকে বিশ্রাম নিতে দাও।
জিয়া আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। ভারী লেহেঙ্গাটা সামলে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমে উঠে গেল। রুমের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করতেই যেন এতক্ষণ ধরে শক্ত করে আটকে রাখা অনুভূতিগুলো একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়ে বেরিয়ে এল।
সে ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ল। দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল,
__কেন, ইয়াশ...? কেন একবারও আমাকে থামালি না? আমি তো তোর থেকে অনেক দূরে চলে গেলাম...
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার বুকের গভীর থেকে। তারপর নিজের গলার ভারী নেকলেসটা খুলে বিছানার ওপর ছুড়ে ফেলল। মনে হচ্ছিল, এই ভারী গয়নাগুলোর মতোই তার বুকের ভেতরেও হাজার টন ওজন জমে আছে।
এদিকে বাইরে পুরো বাড়ি আনন্দে মুখর। আর সেই একই বাড়ির একটি বন্ধ রুমের ভেতরে... একটি মেয়ে নিজের ভাঙা হৃদয়ের টুকরোগুলো জোড়া লাগানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে। অনেকক্ষণ কান্নার পর ক্লান্তিতে তার চোখ দুটো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে এল। কাঁদতে কাঁদতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে... সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
সন্ধ্যা পেরিয়ে ধীরে ধীরে রাত নেমে এসেছে। বাইরে এখনো বিয়ে বাড়ির আনন্দ থামেনি। ড্রয়িংরুমে আত্মীয়-স্বজনের হাসির শব্দ ভেসে আসছে। কোথাও কেউ গল্প করছে, কোথাও আবার নতুন বরকে নিয়ে মজা চলছে। দূর থেকে ভেসে আসছে হালকা গানের সুর।
কিন্তু সেই সব কোলাহলের কোনো কিছুই যেন জিয়ার রুম পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছিল না। রুমের ভেতরে শুধু নীরবতা। অন্ধকার ঘরে জানালার ফাঁক গলে পূর্ণিমার ম্লান আলো বিছানার এক কোণে এসে পড়েছে। বিছানার ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ভারী গয়নাগুলো। কপালের টিকলি, চুড়ি, নেকলেস—সবকিছু যেন সাক্ষী হয়ে আছে কিছুক্ষণ আগের সেই কান্নার।
জিয়ার চোখ পুরোপুরি না খুললেও তার কান ছিল সজাগ। হঠাৎ... রুমের দরজা ধীরে ধীরে খোলার শব্দ কানে আসতেই সে চমকে উঠল। অর্ধঘুম ভাঙা চোখে ধীরে ধীরে উঠে বসল। রুমের লাইট এখনো বন্ধ। তাই চারপাশটা আধো অন্ধকারে ঢাকা।
তবুও সে বুঝতে পারল, কেউ একজন রুমে ঢুকেছে।আর সেই মানুষটা কে, সেটা বুঝতে তার একটুও সময় লাগল না। কারণ... বাসর রাতে তার স্বামী ছাড়া অন্য কোনো পুরুষ এই রুমে আসার প্রশ্নই ওঠে না।জিয়ার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে ধুকপুক করতে শুরু করল। সে অজান্তেই নিজের দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরল।
রুমে ঢুকে লোকটা খুব ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে এল। তার পদচারণার শব্দটুকুও ছিল অদ্ভুত শান্ত।কয়েক মুহূর্ত পর সে এসে জিয়ার ঠিক পাশেই বসল।অন্ধকারে দুজনের মাঝখানে নেমে এল এক অস্বস্তিকর নীরবতা। জিয়া ঢোক গিলল। সে জানত, এই মানুষটার সঙ্গে তার নতুন জীবন শুরু হওয়ার কথা।
কিন্তু...সে তো সেই মানুষটাকে ভালোবাসেই না। তার হৃদয়ে আজও অন্য একজনের নাম লেখা। সেই অপরাধবোধেই যেন বুকটা ভারী হয়ে উঠল। সে চাইল না, এই মানুষটা কোনো মিথ্যা আশায় থাকুক।তাই তাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই জিয়া ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল,
__অ্যাট ফার্স্ট, আই'ম সরি। আপনার লাইফটা নষ্ট করার আমার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু আমি এখন কোনো সম্পর্ক গড়ার জন্য প্রস্তুত নই। আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি। তার সুখের জন্যই তার জীবন থেকে দূরে সরে আসতে আপনাকে বিয়ে করেছি। প্লিজ... আমাকে মাফ করে দেবেন।
কথাগুলো বলতে বলতে তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।চোখের কোণে আবারও পানি জমতে শুরু করল।সে মাথাটা নিচু করে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।তারপর খুব ধীরে আবার বলল,
__আমাকে একটা সাহায্য করবেন? বাবা আমাদের হানিমুনের জন্য ব্যাংককের টিকিট বুক করেছেন। আমরা ব্যাংককে পৌঁছানোর পর আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দেবেন, প্লিজ। তারপর আপনি আপনার পথে, আমি আমার পথে চলে যাব। প্লিজ... এতটুকু হেল্প করবেন।
চলবে....