ফন্ট সাইজ:
থিম:
আব্রাহাম সিকান্দার মির্জা

১৩তম পর্ব

লেখক: কামরুল ইসলাম মাহিন

#আব্রাহাম_সিকান্দার_মির্জা

#কামরুল_ইসলাম_মাহিন
#পর্বঃ১৩
​.
সেই নারী হিল জুতো বাজিয়ে ধীর পায়ে কনফারেন্স রুমের ভেতরে হেঁটে আসতেই সেখানে উপস্থিত প্রতিটি মানুষের নজর গিয়ে পড়ল তার ওপর। তার প্রতিটা পদক্ষেপ যেন মেপে মেপে ফেলা, এক চুল এদিক-ওদিক হওয়ার জো নেই। কুচকুচে কালো রঙের পা পর্যন্ত চাপা সেই ওয়েস্টার্ন ফরমাল ড্রেসে তার শরীরের নিখুঁত অবয়ব ফুটে উঠেছে, যা একই সাথে পেশাদারিত্ব এবং এক অদ্ভুত মাদকতার সৃষ্টি করেছে। পিঠ পর্যন্ত ছড়ানো সোজা সিল্কি চুলগুলো মৃদু বাতাসে দুলছে, আর সামনের অবাধ্য কয়েকটা গোছা তার তীক্ষ্ণ চোখের ওপর এসে পড়ছে। তার মুখের অবয়বে কোনো জড়তা নেই, বরং এক অনমনীয় আত্মবিশ্বাস আর আভিজাত্য লেপ্টে আছে। ঠোঁটের কোণে ঝুলছে এক তাচ্ছিল্যের মৃদু হাসি, যা কনফারেন্স রুমে উপস্থিত বাঘা বাঘা পুরুষদের বুক কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সে যেন কোনো ডিল সাইন করতে আসেনি, এসেছে পুরো সাম্রাজ্যটা নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিতে। ​রুমে উপস্থিত প্রতিটি মানুষের চোখ তখন চাতক পাখির মতো তার দিকে আটকে। আব্রাহামের সেই বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ চোখের মণি জোড়া এক পলক দেখেই স্থির হয়ে গেল। তার চিনতে বিন্দুমাত্র সময় লাগল না, কে এই নারী! শুধু আব্রাহামই নয়, রহমান খানের পাশের চেয়ারে বসা ধূর্ত রিদম এহসানের চোখ দুটোও মূহূর্তে কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। আরিয়ান খানও নিজের বসার ভঙ্গি বদলে সোজা হয়ে বসল, তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। রহমান খানের মতো মানুষটার মুখেও এক লহমায় বিষাদের ছায়া নেমে এলো।
​এ হলো পূর্বের মাফিয়া জর্জের একমাত্র মেয়ে, জারা ইস্কান্দার! মাফিয়া ওয়ার্ল্ডের আরও একটি ধূর্ত, পরিচিত এবং অত্যন্ত ভয়ঙ্কর নাম। যার রূপের আগুনে যেমন পুরুষ কুপোকাত হয়, তেমনি তার বুদ্ধির ছটায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের বড় বড় রাজত্ব ধুলোয় মিশে যায়। সেই জারা ইস্কান্দার এবার পাকাপাকিভাবে বাংলাদেশে ফিরেছে। ​আব্রাহামের মাথার ভেতর চট করে একটা হিসেব খেলে গেল। এই কনফারেন্স রুমের ভেতরে এখন আন্ডারওয়ার্ল্ডের আসল কিংপিনরা এক ছাদের নিচে বসে আছে। আব্রাহাম মির্জা নিজে মাফিয়া ওয়ার্ল্ডের বর্তমান ‘জর্জ’, জারা ইস্কান্দার পূর্বের জর্জের উত্তরসূরি, আর ধূর্ত রিদম এহসান এবং আরিয়ান খান। এরা প্রত্যেকেই এত বছর যাবত লন্ডনে বসে নিজেদের মাফিয়া জগত এবং অন্ধকার সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছে। আর রহমান খান দেশে বসে সুদূর লন্ডন থেকে নিজের ছেলে আরিয়ানকে পুতুলের মতো চালনা করেছে। ​কিন্তু হঠাৎ করে কী এমন হলো যে আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই ভয়ঙ্কর খেলোয়াড়রা একে একে সবাই দেশে ফিরছে? আব্রাহাম নিজে ফিরেছিল রহমান খানকে একটা উচিত শিক্ষা দিতে, তাকে মাঝপথে ঠেকাতে। আর সেই চালের অংশ হিসেবেই সে রহমান খানের একমাত্র মেয়ে ইশতিকে নিজের জালে জড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু নিয়তির কী অদ্ভুত পরিহাস! ইশতিকে নিজের দাবার ঘুঁটি বানাতে গিয়ে আব্রাহাম নিজেই আজ তার প্রেমের জালে পুরোপুরি আটকে পড়েছে। তার ‘স্পাইসি চিলি’ এখন তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আর অধিকার।
​আব্রাহামের নিজের ফেরার কারণ স্পষ্ট, কিন্তু রিদম এহসান কেন দেশে ফিরল? আর এখন আবার এই জারা ইস্কান্দার! পুরো বিষয়টা আব্রাহামের মতো তুখোড় মাফিয়া জর্জের মাথায়ও চট করে ধরে ফেলল হয়তো। এদের সবার উদ্দেশ্য হয়তো শুধু মাফিয়া জর্জকে টেনে নিচে নামানো। ​আব্রাহাম তার সেই চেনা, গভীর তীক্ষ্ণদৃষ্টি মেলে সোফায় হেলান দিয়ে বসল। তার সেই তীক্ষ্ণ চোখ দুটো এক চুলও নড়ল না জারা ইস্কান্দারের ওপর থেকে। সে দেখতে চায়, এই নতুন চালের শেষ কোথায়।
ঠাণ্ডা মাথায় চাল চালা আর শত্রুকে নিঃশব্দে শেষ করা, এসব জারার পুরনো অভ্যাস। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে কনফারেন্স টেবিলের একদম প্রধান খালি চেয়ারটা টেনে বসল।
​বসার সাথেই জারা তার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো সোজাসুজি তুলে ধরল আব্রাহামের দিকে।
​মূহূর্তেই রুমের ভেতরের আবহাওয়া থমকে গেল। আব্রাহামের সেই গভীর তীক্ষ্ণদৃষ্টির সাথে জারার জ্বলন্ত আগুনের মতো চোখের মণি জোড়া সজোরে ধাক্কা খেল। দুজনের চোখাচোখি যেন এক অলিখিত যুদ্ধ। কোনো শব্দ হলো না, অথচ এক চরম হুমকি আদান-প্রদান হয়ে গেল।​টেবিলের অন্যপাশে বসা রিদম আর রহমান খান একে অপরের দিকে তাকাল। তারা জানে, জারা আব্রাহামের পতন চায়। কিন্তু জারা তাদেরও বন্ধু নয়। এই ভয়ঙ্করী নারী নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কিচ্ছু বোঝে না। আজ আব্রাহামকে মারতে গিয়ে কাল যে সে তাদের দিকেই বন্দুক তাক করবে না, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। আর এটাই হলো তাদের বড় চিন্তার কারণ।
​এখানে উপস্থিত বাকি সাধারণ ব্যবসায়ীরা কিছু না বুঝলেও, আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই চার কিংপিন একে অপরের চোখের ভাষা ঠিকই পড়তে পারছিল। ​নীরবতা ভেঙে জারা টেবিলের ওপর দুই হাত লক করে হালকা সামনের দিকে ঝুঁকে বসল। তার কণ্ঠস্বর ধারালো।
​“লন্ডনের আবহাওয়াটা বড্ড বেশি ঠাণ্ডা, মিস্টার রহমান খান। তাই ভাবলাম একটু নিজের ডেরায় ফিরি।” জারা সরাসরি রহমান খানের দিকে তাকিয়ে কথাটি ছুড়ে দিলেও তার চোখ জোড়া আটকে রইল আব্রাহামের মুখে।​রহমান খান একটু কৃত্রিম হেসে বললেন, “তা অবশ্য ঠিক। তবে এই প্রজেক্টে আপনার হঠাৎ...”
​“যেখানে শিকারের গন্ধ থাকে, সেখানে জারা ইস্কান্দার থাকবেই,” জারা এবার সরাসরি আব্রাহামের চোখে চোখ রাখল, “বিশেষ করে... শিকারটা যখন খুব চেনা আর পুরনো হয়।”
​আব্রাহাম সোফায় আরও আরাম করে হেলান দিয়ে বসল। তার গলার স্বর গম্ভীর আর মারাত্মক শান্ত। ​“বাঘের ডেরায় পা রাখার সাহসটা এখনো কমেনি দেখছি।” আব্রাহামের কথায় স্পষ্ট উপহাস। ​জারা ঠোঁট কামড়ে একটা রূঢ় হাসি হাসল, “বাঘের ডেরা? ডেরা বদলাতে সময় লাগে না, আব্রাহাম মির্জা। বিশেষ করে যখন বাঘ বুড়ো হয়ে যায়।”
​“বাঘ বুড়ো হলেও নখ কাটে না। থাবাটা ঠিকই দেয়, পাতা উল্টে দেখো” আব্রাহাম এক হাত দিয়ে তার শার্টের কলারটা একটু ঠিক করে নিল। ​জারা তার ফাইলটা টেবিলের মাঝখানে স্লাইড করে ছুড়ে দিল। অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল, “পাতা ওল্টানো শেষ, মির্জা।”
তারপর তারা নিজেদের কথার মাধ্যমে আক্রমণ করা বন্ধ করলো। ​কনফারেন্সের কাজ শুরু হলো সেখানে। বেশ কিছুক্ষণ মিটিং সম্পন্ন করে ডিলটা জিতে নিল জারা। পুরো রুমে একটা কানাঘুষা শুরু হয়ে গেল যে, মির্জা সাম্রাজ্যকে এক তুড়িতে হারিয়ে দিল এই নারী। রহমান খান আর রিদমের মুখে তখন চাপা এক হাসি। ​আব্রাহাম টেবিলের দিকে তাকিয়ে এক সেকেন্ড চুপ রইল। তারপর তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই চিরচেনা, ধারালো তাচ্ছিল্যের বাঁকা হাসি। সে হালকা একটু শব্দ করে হাসল।
​সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে জারাকে উদ্দেশ্য করে নিচু, গমগমে স্বরে বলল, “এসব ছোটখাটো উচ্ছিষ্ট জিতে যদি তোমাদের এত খুশি হয়, তবে তাই সই, জারা। খেলনা দিয়ে বাচ্চাদের কিছুক্ষণ ভুলিয়ে রাখাই ভালো। তবে মনে রেখো... আসল যুদ্ধটা এখনো শুরুই হয়নি।”
​কথাটা শেষ করেই আব্রাহাম আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। জারা, রিদম আর রহমান খানকে এক বুক চাপা অস্বস্তিতে ফেলে রেখে ধীর পায়ে কনফারেন্স রুম থেকে বেরিয়ে গেল সে।
_______________________
রাত তখন সাড়ে দশটা ছুঁইছুঁই। শহরের ব্যস্ত পিচঢালা পথ ধরে তীব্র গতিতে ছুটে চলেছে আব্রাহামের কালো রঙের কারটি। তার এক হাত স্টিয়ারিং হুইলে, আর অন্য হাতের আঙুলগুলো অবিন্যস্তভাবে ড্যাশবোর্ডে তাল মেলাচ্ছে।​বাইরের ল্যাম্পপোস্টের আলোর ঝলকানি তার চোখে-মুখে এসে পড়ছে। বাইরে থেকে তাকে শান্ত মনে হলেও, তার ধারালো মাথার ভেতর এখন হাজারটা হিসেব-নিকেশ চলছে।
​জারা ইস্কান্দার দেশে ফিরেছে। শুধু ফিরেইনি, সকালের মিটিংয়ে এসে বড়সড় একটা ডিলও বাগিয়ে নিয়েছে। জারা, রিদম আর রহমান খান, তিন বোকা মনে মনে ভাবছে তারা বুঝি আব্রাহাম মির্জাকে এক তুড়িতে হারিয়ে দিল! কিন্তু তারা এটা জানে না যে, আব্রাহাম আজ ইচ্ছে করেই ডিলটা তাদের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। জারা দেশে ফিরে নিশ্চয়ই বড় কোনো খেলা খেলতে এসেছে। আর তার সেই চালের শুরুটা ঠিক কীভাবে হতে পারে, জারার আসল উদ্দেশ্যটা কী, শুধু সেটাই পরখ করার জন্য আব্রাহাম আজ চুপ ছিল।
​ভাবতেই আব্রাহামের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। গাড়ির স্তব্ধতার মাঝেই সে নিচু স্বরে একা একাই হেসে উঠল।
​“এজন্যই তোরা সাধারণ মাফিয়া... আর আমি ‘জর্জ’! ধূর্ততায় আব্রাহাম মির্জার ব্লক করে দিবি তোরা? সেটা করতে তোদের এখনো অনেক জন্ম লাগবে বাস্টার্ড।”
​তবে হাসিটা মিলিয়ে যেতেই এক অদ্ভুত ক্লান্তি ভর করল তার ওপর। সকালের সেই ধকল, আন্ডারওয়ার্ল্ডের দাবার ঘুঁটি চালনা, আর এখন জারার এই নতুন উপদ্রব, সব মিলিয়ে মাথাটা জ্যাম হয়ে আছে। এখন তার মাইন্ড ফ্রেশ করা দরকার। আর এই মুহূর্তে তার মন ভালো করার, তাকে শান্তি দেওয়ার চাবিকাঠি এই পুরো দুনিয়ায় মাত্র একটিই।
​তার ‘স্পাইসি চিলি’... তার অফিশিয়াল ওয়াইফি, মেহজাবিন ইশতি!
​ইশতির নামটা মনে আসতেই আব্রাহামের চোখের সেই বিষাক্ত তীক্ষ্ণদৃষ্টি মুহূর্তের মধ্যে নরম হয়ে এলো। ঠোঁটের কোণের সেই ধারালো হাসিটা এবার এক গভীর, মাদকতাভরা হাসিতে রূপ নিল। সকাল থেকে মেয়েটার কোনো খোঁজ নেওয়া হয়নি। কাল রাতের সেই অবাধ্য চুমু আর আজ সকালের ফোনের পর মেয়েটা নিশ্চয়ই রাগে ফুসছে। ​গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিল আব্রাহাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার গাড়ি এসে থামল খান বাড়ির ঠিক সামনের রাস্তাটার ওপাশে। এই রাস্তার একপাশে বিশাল খান বাড়ি, আর ঠিক উল্টো পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তাদের নিজেদের মির্জা হাউস। ​খান বাড়ির দিকে তাকিয়ে আব্রাহাম গাড়ি থেকে নেমে এলো। পকেটে হাত দিয়ে একটা সিগারেট বের করে লাইটার দিয়ে জ্বালিয়ে নিল সে। ধোঁয়ার একটা দীর্ঘ কুন্ডলী বাতাসে ভাসিয়ে দিয়ে, গাড়ির বডিতে ব্যাকসাইড হেলান দিয়ে আরাম করে দাঁড়াল। তার এক হাতে জ্বলন্ত সিগারেট, আর অন্য হাতে ফোন।
​স্ক্রিনে ‘স্পাইসি চিলি’ নামটা জ্বলজ্বল করছে। আব্রাহাম কল বাটন প্রেস করে কানে ধরল।
​পুরো রিং হয়ে কলটা কেটে গেল, ওপাশ থেকে কেউ ধরল না। আব্রাহাম দ্বিতীয়বার ট্রাই করল। এবারও একই অবস্থা। ইশতি ইচ্ছে করেই কলটা কাটছে বা ধরছে না, সেটা বুঝতে আব্রাহামের বাকি রইল না। ​তৃতীয়বারে যখন আবার কলটা গেল, একদম শেষ মুহূর্তে ওপাশ থেকে কলটা রিসিভ হলো। তবে কোনো শব্দ এলো না, এক গভীর নীরবতা। ​ইশতির এই অবাধ্যতা আর জেদ এবার আব্রাহামের ভেতরের পুরুষালি অহংকারে গিয়ে লাগল। সিগারেটটা নিচে ফেলে জুতো দিয়ে পিষে, কিছুটা রাগী আর গমগমে কণ্ঠে সে সরাসরি বলল,
​“কল ধরছিলে না কেন?”
ইশতি ফোনের ওপাশ থেকে বেশ চিবিয়ে চিবিয়েজবাব দিল, “ইচ্ছে ছিল না ধরার।”
​তার মুখে এমন সটান উত্তর শুনে আব্রাহাম রাগল না। বরং তার ঠোঁটের কোণের বাঁকা ধূর্ত হাসি ফুটে উঠলো।নিস্তব্ধতায় ইশতির গলার ওই চিবিয়ে চিবিয়ে বলা কথাগুলো তার কানে যেন অমৃতের মতো লাগল। সে গলার স্বর একদম নিচু করে, এক অদ্ভুত রোমান্টিক আর নেশালো সুরে বলল,
​“বউদের কি বরের ওপর এত অভিমান করতে আছে, স্পাইসি চিলি? সারাটা দিন একটা বারও আমার কথা মনে পড়েনি?”
​ইশতি ওপাশে বিছানায় বসে রাগে দাঁত কিড়মিড় করে উঠল। এই লোকটার এই অসভ্য টাইপের কথাবার্তা সে একদম সহ্য করতে পারে না। সে কঠিন গলায় বলল, “আপনার কথা মনে করার মতো ফালতু সময় আমার নেই, মিস্টার আব্রাহাম মির্জা! আর শুনুন, আমাকে বারবার ‘বউ’ ‘বউ’ বলে ডাকবেন না তো!”
​“ডাকব না?” আব্রাহাম একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, যা ফোনের ওপার থেকে ইশতির কান অব্দি পৌঁছে তাকে কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। সে গভীর সুরে আওড়াল, “কাবিননামায় ওই ১০ কোটি টাকার নিচে তোমার ওই সুন্দর হাতের সইটা কিন্তু এখনো জ্বলজ্বল করছে, ওয়াইফি। মুখে অস্বীকার করলেই কি আর এই আব্রাহামের বুক থেকে তোমার অধিকার মুছে যাবে?”
​ইশতি এবার বিছানা ছেড়ে ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়াল। রাগে তার ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। সে ফিসফিসিয়ে বলল, “আপনাকে তো আগেই বলেছি, ওটা জাস্ট একটা চুক্তি ছিল!”
​“চুক্তি তো তুমি করেছ কিউটি, আমি তো বিয়ে করেছি।” আব্রাহামের গলার ধারালো রোমান্টিকতা এবার যেন আরও গাঢ় হলো, “আজ সারাদিন অফিসের ওই খাটাসগুলোর মুখ দেখতে দেখতে মাথাটা জ্যাম হয়ে ছিল। এখন শুধু তোমার ওই ফর্সা নরম ঘাড়ের সুবাস আর ওই অবাধ্য ঠোঁট দুটোর স্বাদ পেতে মন চাইছে। উফ! কাল রাতের ওই ছোয়া এখনো আমার ঠোঁটে লেগে আছে, ইশতি...”
​আব্রাহামের এত খোলামেলা আর তীব্র আকর্ষণে ভরা কথাবার্তা শুনে ইশতির পুরো শরীরে যেন কারেন্টের শক লাগল। কাল রাতের সেই তৃষ্ণার্ত চুমুগুলোর কথা মনে পড়তেই তার বুকটা দড়ফড় করে কাঁপতে শুরু করল। সে লজ্জায় আর রাগে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে বলল, “আপনি একটা আস্ত অসভ্য, নির্লজ্জ লোক! আমি ফোন রাখছি!”
​“ফোন কাটলে কিন্তু এবার আমি সোজা দেয়াল টপকে তোমার ঘরে ঢুকে পড়ব, মেহজাবিন!” আব্রাহামের গলার সুর এবার হালকা গম্ভীর কিন্তু চরম রসালো শোনাল, “তখন কিন্তু ওই ফর্সা গালে কামড় বসিয়ে আমার স্পাইসি চিলির ঝাল মিটিয়ে দেব, আটকানোর সাধ্য থাকবে না।”
​ইশতি থতমত খেয়ে গেল। সে জানে এই লোকটা যা বলে, তা করার ক্ষমতা রাখে। সে ভয়ে আর বিরক্তিতে বলল, “কী চান আপনি বলুন তো?”
​আব্রাহাম এবার গাড়ি থেকে কিছুটা সরে এসে খান বাড়ির দোতলার ওই বন্ধ জানালার দিকে তাকাল। তার চোখ জোড়ায় তখন এক চরম তৃষ্ণা আর অধিকারের খেলা। সে একদম নিচু, অথচ আদেশের সুরে বলল,
​“ব্যালকনিতে এসে নিচে তাকাও। আমি তোমার বাড়ির ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ফোনটা কানেই রাখো, আর এক্ষুনি বাইরে এসো।”
ইশতি এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। লোকটা তার বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে আছে? তাও এই রাতে! সে কি সত্যি পাগল হয়ে গেল, নাকি তাকে স্রেফ ভয় দেখাচ্ছে?
​নিজের মনের সংশয় দূর করতে ইশতি ফোনটা কানে রেখেই ধীর পায়ে এগিয়ে গেল তার ঘরের সাথে থাকা ব্যালকনিটার দিকে। দরজার লকটা আলতো করে খুলে সে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল। রাতের মৃদু ঠাণ্ডা বাতাস তার মুখের ওপর এসে আছড়ে পড়ল। সে চোখ দুটো নামিয়ে সোজা তাকাল রাস্তার ওপাশে। ​ল্যাম্পপোস্টের আলোর আবছা আলো-ছায়ার মাঝে ঠিকই চেনা গেল সেই দীর্ঘ, সুঠাম অবয়বটাকে। কালো রঙের সেই কারটার সাথে হেলান দিয়ে এক হাত পকেটে পুরে দাঁড়িয়ে আছে আব্রাহাম সিকান্দার মির্জা। অন্য হাতে তার ফোনটা কানের সাথে ঠেকানো। ওপর থেকে আব্রাহামের সেই চওড়া বুক আর উন্মুক্ত কলারের শার্টটা এই মৃদু আলোতেও এক তীব্র পুরুষালি মাদকতা ছড়াচ্ছে। ইশতি ব্যালকনিতে আসতেই আব্রাহাম মাথা তুলে ওপরের দিকে তাকাল। দুজনের চোখাচোখি হলো। আব্রাহামের ঠোঁটের কোণে মুহূর্তেই ফুটে উঠল সেই চিরচেনা, ধারালো অথচ তীব্র ভালোবাসায় ভরা বাঁকা হাসিটা।
​ফোন লাইনে আব্রাহামের নিচু, গমগমে কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “দেখলে তো, তোমার এই বরটা এক ফোঁটাও মিথ্যে বলে না, কিউটি। ওপর থেকে আমার বাঘিনীটাকে বড্ড মায়াবী লাগছে।”
​ইশতি নিজেকে সামলে নিয়ে ফোনের ওপাশ থেকে ফিসফিসিয়ে রাগী গলায় বলল, “আপনার সাহস তো কম না! এই রাতে আমাদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছেন? ভাইয়া বা বাবা যদি কোনোভাবে দেখে ফেলে, তবে কিন্তু একটা তুলকালাম হয়ে যাবে। এক্ষুনি এখান থেকে যান!”
​আব্রাহাম একটু নিচু স্বরে হাসল। সেই হাসির শব্দে ইশতির বুকের ভেতরটা আবার কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
​“আরেহ! শ্বশুরবাড়ি আসার জন্য আবার সাহসের কী আছে, ওয়াইফি? আর আরিয়ানের কথা বলছ? ও তো এখন কাজ নিয়েই ব্যস্ত। তুমি শুধু শুধু ভয় পাচ্ছ,” আব্রাহাম গাড়ি থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে খান বাড়ির মেইন গেটের দিকে দু-পা এগিয়ে এলো, “ভয় পাচ্ছ নাকি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার? যে নিচে এলে এই পুরুষটার বুকের খাঁচায় নিজেকে সঁপে দেবে?”
​“নিজের ওপর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস থাকা ভালো না, মিস্টার মির্জা!” ইশতি ব্যালকনির রেলিংটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল, “আমি নিচে আসব না। আপনি যান এখান থেকে।”
​“আসবে না?” আব্রাহাম তার গলার স্বর এবার আরও একটু গভীরে নামিয়ে আনল, যা ইশতির কান দিয়ে ঢুকে সরাসরি তার হৃদপিণ্ডে গিয়ে আঘাত করল, “তাহলে কি আমিই ওপরে আসব, ওয়াইফি? ওই পাইপ বেয়ে তোমার ব্যালকনি অব্দি পৌঁছাতে আমার ঠিক মিনিট দুই এক সময় লাগবে। তারপর কিন্তু এই মাঝরাতে তোমার ওই নরম বিছানায় তোমাকে কোলে তুলে নিয়ে কাল রাতের বাকি থাকা হিসাবটা চুকিয়ে নেব। ভেবে নাও, কোনটা বেশি সেফ হবে তোমার জন্য?”
​আব্রাহামের এই চরম রসালো আর রূঢ় ধমকিতে ইশতি পুরোপুরি ভড়কে গেল। সে খুব ভালো করেই জানে,এর পক্ষে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়া কোনো ব্যাপারই না। আর একবার যদি সে ঘরে ঢুকে পড়ে, তবে কী কেলেঙ্কারীটাই না ঘটবে! ​ইশতি রাগে আর লজ্জায় নিজের নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরল। তার ফর্সা গাল দুটো তখন লাল টমেটোর মতো হয়ে উঠেছে।
​“আপনি... আপনি একটা আস্ত জংলি! ঠিক আছে, আমি আসছি। ওখানেই দাঁড়ান, একদম ওপরে আসার চেষ্টা করবেন না!”
​ইশতি আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা না করে খট করে ফোনটা কেটে দিল। ওপাশে আব্রাহাম ফোনটা পকেটে রেখে নিজের চওড়া বুকে হাত দিয়ে নিচু স্বরে হা হা করে হেসে উঠল। তার ‘স্পাইসি চিলি’কে কীভাবে বশ করতে হয়, তা সে খুব ভালো করেই জানে।
​ইশতি তাড়াহুড়ো করে ব্যালকনি থেকে ঘরের ভেতরে এলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ওড়নাটা একটু ঠিক করে নিল। বুকটা তার তখনো দড়ফড় দড়ফড় করে কাঁপছে। এক অদ্ভুত উত্তেজনা আর চাপা ভয় কাজ করছে তার মনে। সে ধীর পায়ে ঘরের দরজা খুলে, বাড়ির বাকিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে একদম বিড়ালের মতো নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। ​মেইন গেটের ছোট পকেট ডোরটা আলতো করে খুলে রাস্তার পিচঢালা পথে পা রাখল। 
​ইশতি ধীর পায়ে হেঁটে রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা আব্রাহামের ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার দু-চোখে তখনো জেদ আর রাগের আগুন। ​আব্রাহাম এক চুলও নড়ল না। সে তার সেই গভীর, তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি মেলে শান্তভাবে পরখ করতে লাগল তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে। রাতের এই আবছা আলোয় ইশতিকে যেন কোনো এক পরীর মতো লাগছিল।
​“বলুন, কী বলতে চান? সকাল সকাল ফোন করে মাথা খেলেন, আবার এই মাঝরাতে এসে কেন জ্বালাচ্ছেন?” 
ইশতি দুই হাত বুকের ওপর ক্রস করে দাঁড়িয়ে ঝাড়ি মেরে বলল কথাটি। ​আব্রাহাম কোনো কথা বলল না। সে শুধু এক কদম এগিয়ে ইশতির একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। দুজনের মাঝে এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির দূরত্ব। আব্রাহামের শরীরের সেই চেনা তীব্র পারফিউমের গন্ধ আর গায়ের তপ্ত উষ্ণতা এক নিমেষে গ্রাস করে নিল ইশতিকে। ইশতি অস্বস্তিতে পড়ে এক কদম পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু তার আগেই আব্রাহাম খপ করে ইশতির একটা নরম হাত নিজের শক্ত, পেশিবহুল হাতের মুঠোয় পুরে নিল!
​তার স্পর্শে ইশতির সারা শরীরে যেন এক মরণ কামড় দিয়ে উঠল।
​“ছাড়ুন! কী করছেন কী এসব রাস্তায় দাঁড়িয়ে?” 
​“উঁহু, ছাড়ার জন্য তো হাতটা ধরিনি, মিসেস আব্রাহাম মির্জা,” আব্রাহাম ইশতির হাতটা আরও একটু জোরে চেপে ধরে তাকে নিজের বুকের একদম কাছে টেনে আনল। তার সেই গভীর, নেশালো চোখ দুটো ইশতির কাঁপতে থাকা ঠোঁটের ওপর স্থির হলো। সে নিচু, মাদকতাভরা স্বরে ফিসফিস করে বলল, “আজ সারাদিন অনেক যুদ্ধ গেছে মাথার ওপর দিয়ে। এখন শুধু এই বরের একটুখানি শান্তি চাই। তোমার ওই অবাধ্য ঠোঁটের একটুখানি ছোঁয়া কি পেতে পারি না, ওয়াইফি?”
ইশতি সাথে সাথে নিজের মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে বেশ কঠিন গলায় বলল, “না, পেতে পারেন না!”
​আব্রাহাম তার ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা, ধারালো বাঁকা হাসিটা আবার ফুটে উঠল। সে খুব ভালো করেই জানে, তার এই ‘স্পাইসি চিলি’ এত সহজে ধরা দেওয়ার পাত্রী নয়। আর আব্রাহাম মির্জা মুখে যতই রসালো বা রূঢ় কথা বলুক না কেন, নিজের স্ত্রীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে জোর খাটানোর মতো পুরুষ সে কোনোদিনই নয়। ভালোবাসায় তীব্র অধিকার সে অবশ্যই দেখাবে, কিন্তু জোর জবরদস্তি তার ডিকশনারিতে নেই।
​আব্রাহাম আর একটা শব্দও মুখ থেকে উচ্চারণ করল না। সে শুধু তার সেই গভীর, তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি মেলে ইশতির ফর্সা মুখের দিকে আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার সেই চাতক পাখির মতো চাউনিতে এক অদ্ভুত মায়া আর তীব্র টান লেপ্টে ছিল। ​ইশতি যখন তার এই নীরবতার মানে বুঝতে না পেরে চোখ তুলে তাকাল, ঠিক তখনই আব্রাহাম আলতো করে নিজের মাথাটা নিচু করল। অত্যন্ত পরম ভালোবাসায় সে ইশতির কপালে নিজের ঠোঁট দুটো ছুঁইয়ে দিল। এক দীর্ঘ, তপ্ত চুমু আঁকল সে তার কিউটির কপালে।
​আচমকা এই কপালে দেওয়া গভীর চুমুর স্পর্শে ইশতি যেন এক লহমায় পাথর হয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল, সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল। কাল রাতের ঘাড়ে সেই তৃষ্ণার্ত ঠোঁটের ছোঁয়ার চেয়ে এই কপালের চুমুটা যেন তার মনের একদম গভীরে গিয়ে আঘাত করল। ​চুমুটা শেষ করে আব্রাহাম ইশতির হাতটা ছাড়ল না। বরং আরও শক্ত করে চেপে ধরে তাকে টেনে নিয়ে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। ইশতি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আব্রাহাম গাড়ির ড্রাইভিং সিটের পাশের দরজাটা খুলে তাকে এক প্রকার জোর করেই ভেতরে বসিয়ে দিল। তারপর নিজে দ্রুত ঘুরে এসে ড্রাইভিং সিটে বসে ধুম করে দরজা বন্ধ করে দিল।
​এক পলকে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিল আব্রাহাম। কারটি এক তীব্র গর্জন ছেড়ে রাস্তার পিচঢালা পথ ধরে সামনের দিকে ছুটে চলল। ​হঠাৎ এই পুরো ঘটনায় ইশতি পুরোপুরি ভড়কে গেল। সে তড়িঘড়ি করে সিটের ওপর সোজা হয়ে বসে আব্রাহামের দিকে তাকিয়ে বেশ চিৎকার করেই জিজ্ঞাসা করল,
​“এ কী! কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায় এখন?”
​আব্রাহাম স্টিয়ারিং হুইলে এক হাত রেখে, অন্য হাত দিয়ে নিজের শার্টের ওপরের বোতামটা আরও একটু আলগা করল। কিছুটা গরম লাগছিল তার। তারপর ইশতির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে তার সেই চিরচেনা মাদকতাভরা, নিচু আর রসালো গলায় বলল,
​“তোমায় নিয়ে প্রেম করতে যাচ্ছি, ওয়াইফি!”
#চলবে........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন