#এক_প্রহর
#পর্ব_২
#ঈশিতা_ইশা
...
নাকিব এক সেখানে মূহুর্ত না দাঁড়িয়ে স্কুলের বিল্ডিং এ চলে যায়।নাকিবের যাওয়ার পানে তোহফা তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করে লোকটা কে। গতদিন সে নাকিবের চেহারা দেখেনি তাই চিনতে পারছে না।
'আরে তুমি সেই মেয়ে না গতদিন দেখা হয়েছিলো? কি জানি নাম? যাহ্ ভুলে গেছি!',হাসান মনে করার চেষ্টা করে বলে।
'আমি তোহফা। গতকালকে দু'বার আপনি আমাকে সাহায্য করেছিলেন।',তোহফা হেসে হাসানকে বলে।
'হ্যা এবার মনে পড়েছে। তো তোহফা তুমি এখানে কি করছো? ',হাসান প্রশ্ন করে।
'আমি এখানে শিক্ষক। আপনারা এখানে?'
'মুশতাক ভাই ডেকেছে তাই এসেছি। আমার সাথে যাকে দেখলা সে মুশতাক ভাইয়ের ছোট ভাই। আমি গেলাম পরে কথা হবে আর এই নাও তোমাদের বল খেলা কন্টিনিউ করো।'
তোহফার হাতে বল দিয়ে হাসান চলে যায়। বলটা হাতে নিয়ে ঘুরাতে ঘুরাতে মাঠের দিকে চলে যায় তোহফা।
মুশতাক জামাল উদ্দিনকে কিছু বলছিলো তখনই নাকিব প্রধান শিক্ষকের অফিসে প্রবেশ কর। একটা চেয়ার টেনে পা তুলে মুশতাকের সামনে বসে।
নাকিবের এহেন কান্ডে মুশতাক রেগে গেলেও চুপ করে মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
হাসান হাঁপাতে হাঁপাতে এসে নাকিবের পিছনে দাঁড়ায়।
'এমপি সাহেব বলেন কেনো এখানে ডেকেছেন? আমার কাজ আছে বের হতে হবে সময় কম।',নাকিব বলে।
'এটা বাসা না ভুলে যাস না নাকিব। প্রবেশ করার আগে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করিস না?',মুশতাক চোখমুখ শক্ত করে নাকিবকে বলে।
'এখন কি জ্ঞান দিতে আমাকে ডেকেছেন? কিছু বলার থাকলে বলেন না হলে চলে যাচ্ছি।',নাকিব চেয়ারে হেলান দিয়ে বলে।
'তোরে ডেকেছি দরকারি কাজে। আমি এখন একটা অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে যাবো তুইও সাথে যাবি। তোরেও নিয়ে যেতে বলছে। আমার মোটেও ইচ্ছা ছিলো না তোরে নেওয়ার কিন্তু দলের বড় নেতাদের কথা ফেলতে পারি না।',মুশতাক কথাগুলো বলে নাকিবের দিকে তাকায়।
'সামান্য এই কারনে আমার ঘুম না ভাঙালেও হতো। অনুষ্ঠানে আপনি যান আমার অন্য কাজ আছে।',কথাটা বলে নাকিব বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়।
'বাবা বলছে তুই না গেলে তুলে নিয়ে যেতে। এখন কি করবি কর। অনুষ্ঠান শেষে আমার আবার মিটিং আছে। আর মিস্টার জামাল আপনাকে যেটা বলেছি ঐ কথাই রইলো আসি আজকে।',চেয়ার থেকে উঠে মুশতাক হাঁটা দেয়।
'স্যার একটু মিষ্টি মুখ করে যান।',জামাল উদ্দিন বলে।
'মিষ্টি তো খাবো যদি আপনি আমার কথা মতো কাজটা করতে পারেন। কাজটা না হলে আপনার কথা তো রাখবো না উল্টো হিতে বিপরীত হবে এটাও জেনে রাখেন।',কথাগুলো বলে মুশতাক অফিস থেকে বেরিয়ে যায়।
'ভাই কি করবেন এখন?',হাসান নাকিবকে জিজ্ঞেস করে।
'জানিস না?',কথাটা বলে নাকিব হাসানের দিকে তাকায়।
'আরে বলতে হবে না চলেন চলেন।',হাসি দিয়ে হাসান বলে।
মুশতাক রুম থেকে বেরিয়ে আশেপাশে তাকালে তার নজর যায় ব্যাট হাতে নিয়ে স্ট্যাম্পর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তোহফার দিকে। তার বুঝতে সমস্যা হয় না তোহফা বাচ্চাদের সাথে ক্রিকেট খেলছিলো।
মুশতাককে দেখে সবাই চুপ করে খেলা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। তোহফা ব্যাটটা ধরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুশতাক হঠাৎ হাঁটার রাস্তা বদল করে মাঠের দাঁড়িয়ে থাকা তোহফার দিকে এগিয়ে আসে।
'খেলা বন্ধ করলেন কেনো? আপনারা নিজেদের খেলা কন্টিনিউ করেন সমস্যা নেই। কখনো কোনো দরকার হলে আমাকে নিরদ্বিধায় কল দিয়েন। আশা করি আমাদের আবারো দেখা হবে।',তোহফাকে কথাগুলো বলে মুশতাক আবসার শেখ হাঁটা দেয়।
তোহফা মুশতাকের কথার আগামাথা না বুঝলেও সে কিঞ্চিৎ অবাক হয় এমন ব্যবহারে।
দূর থেকে হাসান এসব দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। নাকিবের এসব বিষয়ে বিন্দু মাত্র মাথা ব্যথা নেই সে ফোন বের করে ক্যান্ডি ক্রাশ খেলছে আর হাঁটছে।
'আপনার ভাইয়ের মতিগতি ঠিক লাগছে না আমার কাছে।',হাসান নাকিবকে বলে।
'তুই নিজের চিন্তা কর অন্যের চিন্তা বাদ দিয়ে। চল দেরি হচ্ছে আজকে অনেক কাজ আছে।',নাকিব আগের ন্যায় গেম খেলতে খেলতে বলে।
হাসান কোনো কথা না বলে গাড়ির দিকে দ্রুত হেঁটে যায়। নাকিবও এসে গাড়িতে উঠে। একে একে গাড়িগুলো স্টার্ট দিলে চলতে শুরু করে।
তোহফা হাতের ব্যাটটা বাচ্চাদের কাছে দিয়ে প্রধান শিক্ষকের অফিসের দিকে যায় যেখানে বাকি শিক্ষকরাও গিয়েছে।
'স্যার আপনি আমাদের ডেকেছেন?',তোহফা প্রধান শিক্ষকের অফিসে প্রবেশ করে প্রশ্ন করে জামাল উদ্দিনকে।
'আরে তোহফা আসো আসো। সবাইকে মিষ্টি খাওয়ানো হবে খুশির সংবাদ হলো মুশতাক স্যার সব খরচ নিজে বহন করবে। আমাদের স্কুলের উন্নয়নে যত টাকা লাগে সে দিবে।',জামাল উদ্দিন হেঁসে কথাগুলো বলে।
'যাক শেষমেশ তাহলে স্কুলটার উন্নয়ন হবে।',তোহফা হেসে বলে।
'আপনারা সবাই টিচার্স রুমে যান মিষ্টি আর আপনাদের জন্য সামান্য খাবারের ব্যবস্থা করেছি সেটা খেয়ে বাসায় যাবেন।',জামাল উদ্দিন সকলের উদ্দেশ্যে বলে।
জামাল উদ্দিনের কথায় সকলে হাঁটা দেয় সাথে তোহফাও যেতে নেয়।
'আরে তোহফা তোমার সাথে আমার কথা আছে তুমি থাকো।',জামাল উদ্দিন তোহফাকে বাঁধা দিয়ে বলে।
তোহফা কিছু না বলে দাঁড়ায়। একে একে সকল শিক্ষকরা অফিস ত্যাগ করে চলে গেলে পুরো অফিস খালি হয়ে যায়।
'দেখো তোহফা এমপি সাহেব কিন্তু অনেক বড় মনের মানুষ। একটু অনুরোধ করাতে সে আমাদের স্কুলের উন্নয়নে এক বাক্যে টাকা দিতে রাজি হয়ে গেলো এমন মানুষ আজকাল পাওয়া দুষ্কর। এমপি সাহেবের তো অনেক টাকা শুনলাম সামনে নির্বাচন আশা করি আবারো সে এমপি হবে।',জামাল উদ্দিন রসিয়ে রসিয়ে কথাগুলো বলে।
'জি স্যার বুঝতে পেরেছি। আপনি এইগুলো বলার জন্য আমাকে থাকতে বলেছেন?',তোহফা প্রশ্ন করে।
'আরে না বলছিলাম তুমি একা মেয়ে তোমার অভিভাবক কেউ নেই এই মূহুর্তে আমিই বলা যায় তোমার অভিভাবক। এমপি সাহেব তো বিয়ের জন্য মেয়ে দেখছেন উনি বললো তোমাকে ওনার পছন্দ হয়েছে।'
'মানে? স্পষ্ট করে বলুন কি বলতে চাচ্ছেন।'
'এমপি স্যার তোমাকে বিয়ে করতে চায়। ওনার সাথে বিয়ে হলে তোমার জীবন পাল্টে যাবে। এতো কষ্টে তোমাকে দিন যাপন করতে হবে না।'
জামাল উদ্দিনের কথা শুনে তোহফা বিস্ময়ে তাকায়।
'এসব কি বলছেন স্যার কোথায় আমি আর কোথায় সে। আর বিয়ের বিষয়ে আমার কোনো চিন্তা ভাবনা নেই এসব নিয়ে পরে ভাববো।'
'তুমি বিষয়টা নিয়ে ভেবে দেখো এমন পাত্র হাত ছাড়া করলে পস্তাবা।'
'আপাততঃ আমার উত্তর না। বিয়ে নিয়ে আমি এখন ভাবছি না ভবিষ্যতে দেখা যাবে। এখন আমি টিচার্স রুমে গেলাম পরে কথা হবে আপনার সাথে।',কথাটা বলে তোহফা অফিস থেকে বেরিয়ে যায়।
জামাল উদ্দিন টিস্যু দিয়ে কপালের ঘাম মুছে নেয়। তোহফা রাজি না হলে মুশতাক যে কোনো টাকাই স্কুলের উন্নয়নে দিবে না সেটা সে স্পষ্ট জানিয়ে গেছে। এখন কীভাবে তোহফাকে রাজি করাবে এটাই জামাল উদ্দিন বুঝতে পারছে না।
..
বিশাল এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে সামনে নির্বাচন উপলক্ষে। দলের সকল নেতা কর্মীরা এসেছে। মুশতাক সকলের সাথে হেঁসে কুশল বিনিময় করছে। তবে মুশতাকের একটা জিনিস বিরক্ত লাগছে সেটা হলো নাকিবকে দেখে সবাই মুশতাককে কম এটেনশন দিচ্ছে।
'আরে ভাই কেমন আছেন? কতদিন পর দেখা।',মুশতাক বলে।
'এই তো ভাঙা হাত পা নিয়ে বেঁচে আছি। তোমার তো অবস্থা ভালোই দেখতেছি।',লোকটা বলে।
'আমার আর কি চলতেছে।',মুশতাক জবাব দেয়।
'আরে এটা তোমার ছোট ভাই নাকিব না? কি অবস্থা নাকিব তোমার যেই সংখ্যক ভক্ত দেখলাম সামনের নির্বাচনে তুমি দাঁড়ালে তোমাকে সবাই ভোট দিবে।',লোকটা মুশতাককে উপেক্ষা করে নাকিবকে জড়িয়ে ধরে বলে।
'তেমন কিছু না ভাই সবই আপনাদের দোয়া।',নাকিব হেঁসে বলে।
মুশতাক বিরক্ত হয়ে নিজের আসনে গিয়ে বসে। নাকিবকে আনার কারনে সবাই তাকে ছেড়ে নাকিবকে এভাবে বুকে টেনে নিচ্ছে এটা সে মানতে পারছে না।
রাগ সংযত করে মুশতাক চুপ করে বসে থাকে। অনুষ্ঠান শুরু হলে একে একে সকলকে স্টেজে বক্তব্য দিতে ডাকে। মুশতাককে এক সময় ডাকা হয় সে গিয়ে নিজের বক্তব্য দেয়। মুশতাকের বক্তব্য শেষ হতেই নাকিবের নাম ঘোষণা করা হয় বক্তব্য দেওয়ার জন্য। নাকিবের নাম শুনে মুশতাক অবিশ্বাস চোখে তাকায়।
নাকিব স্টেজে উঠতেই সকলে তাকে উৎসাহ দিতে শুরু করে। নাকিবের বক্তব্য শেষ হতেই করতালি দিয়ে সকলে জানান দেয় তাদের কাছে ভালো লেগেছে। সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষ করে স্টেজ থেকে নামে সে।
পুরো অনুষ্ঠান টিভিতে লাইভ দেখানো হচ্ছে। নাকিবের বক্তব্যের অংশ টুকু তার সাপোর্টে থাকা ছেলেরা নিয়ে বিভিন্ন পেজে আপলোড করতে থাকে।
মুশতাককে কেউ তেমন পাত্তা দিচ্ছে না বিষয়টাতে রেগে অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পূর্বেই সে সেখান থেকে বেরিয়ে যায়।
কারো চোখে বিষয়টা না পড়লেও নাকিবের চোখ এড়ায় না। সে মুখে বিদ্রুপের হাসি রেখে মুশতাকের যাওয়ার পানে তাকায়।
..
দু'টো মিটিং শেষ করে গাড়িতে উঠে বসেছে মুশতাক। একটা সিগারেট বের করে জ্বালিয়ে ধোঁয়া উড়াতে শুরু করে গাড়ির মধ্যেই।
'স্যার গাড়ির উইন্ডো খুলে দেই? ',মুশতাকের ম্যানেজার সমনের সিট থেকে জিজ্ঞেস করে।
'মেজাজটা অনেক খারাপ আছে বাড়তি কথা বলবা সোজা গাড়ি থেকে ফেলে দিবো।'
মুশতাকের কথা শুনে তার ম্যানেজার ভয়ে ঢোক গিলে। মুশতাক সকলের সামনে হাসি খুশি দেখালেও ব্যক্তিগত ভাবে সে যে প্রচন্ড বদমেজাজি এটা তার আশেপাশের মানুষরা ছাড়া বাহিরের লোক জানে না।
'ঐ মেয়েটাকে কল লাগাও জলদি।'
'কোন মেয়েটা স্যার?'
'ঐ যে সকালে স্কুলে দেখেছিলাম বিয়ের কথা বলে এসেছি।'
'ওহ ঐ মেয়েটা? মেয়েটার নাম তোহফা। আচ্ছা কল দিচ্ছি।'
'নাম যাই হোক তাতে কিছু যায় আসে না কল লাগাও ওর সাথে কথা বলি।'
মুশতাকের কথা মতো তার ম্যানেজার তোহফার নাম্বারে কল দেয়। জামাল উদ্দিনের কাছ থেকে সে নাম্বার নিয়ে রেখেছিলো।
তোহফা টিউশনে ছিলো তখনই তার ফোন বেজে উঠে। অপরিচিত নাম্বার দেখে প্রথমে কল রিসিভ করে না সে। কল বাজতে বাজতে কেটে যায় এরপর আবারো কল আসে তোহফা ভাবতে ভাবতে কলটা রিসিভ করে।
'হ্যালো আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?',তোহফা জিজ্ঞেস করে।
'ওয়ালাইকুমুস সালাম। আমি মুশতাক বলছি চিনতে পেরেছো?'
'হ্যা স্যার চিনবো না কেনো। হঠাৎ আমাকে কল দিলেন কোনো প্রয়োজন? '
'তোমাকে প্রয়োজন তাই কল দিলাম। কালকে সকালে আমার অফিসে আসবা ঠিক সকাল দশটায়। দেরি যাতে না হয় মনে রেখো। দেরির বিষয়টা আমি মোটেও পছন্দ করি না।'
'কিন্তু স্যার আমার স্কুলে ক্লাস নিতে হবে আমি ঐ সময়টা ফ্রি না। আপনার কিছু বলার থাকলে ফোনে বলুন আমি শুনছি।'
'যা বলার কালকে সামনাসামনি বলবো। আশা করি ঠিক সময়ে তুমি চলে আসবা। এখন আমি ব্যস্ত আছি কল রাখলাম।'
কথাগুলো বলে মুশতাক কল কেটে দেয়। তোহফার বুঝতে অসুবিধা হয় না মুশতাক তাকে কি বলতে ডাকছে। সে জামাল উদ্দিনকে কল লাগায় বিস্তারিত জানাতে।
কল কাটার পর ফোনটা ম্যানেজারকে ফেরত দেয় মুশতাক।
'স্যার একটা প্রশ্ন করি যদি কিছু মনে না করেন?',ভয়ে ভয়ে ম্যানেজার জিজ্ঞেস করে।
'হুম করো।'
'এতো সুন্দরী আর ধনী মেয়ে থাকতে আপনি তোহফার মতো এমন একটা মেয়েকে বিয়ে করতে চাইছেন কোনো স্পেশাল কারণ আছে?'
'ঐসব ধনী সুন্দরীদের এক টানে বিছানায় নিয়ে যেতে পারি। এসব মেয়ে আমার বিছানার সঙ্গী হওয়ার যোগ্য এর বেশি না। বিয়ে করার কোনো ইচ্ছেই আমার ছিলো না কিন্তু বয়স তো আঁটকে থাকবে না আর মায়েরও একজন বউমা প্রয়োজন তাই ভাবলাম বিয়ে করবো। তোহফার মতো সহজ সরল মেয়েকে বিয়ে করলে কোনো চিন্তাই থাকবে না। বাহিরে সুন্দরীদের সাথে বেড শেয়ার করবো আর ঘরের বউকে আঁটকে রাখবো যার কাজ হবে স্বামীর সেবা করা। আজকালকার দিনে এমন এতিম মেয়ে পাওয়া দুষ্কর। ওরে বিয়ে করলে আমি আরো বেশি মানুষের সহানুভূতি পাবো আর সামনে নির্বাচন বুঝতেই পারছো।'
'জি স্যার এবার বুঝলাম সব।'
'আজকে তো আর কোনো কাজ নেই চলো তাহলে সুন্দরীদের নিবাসে যাই। রাতটা সেখানেই আনন্দ করে কাটাবো।'
মুশতাকের কথা শুনে তার ম্যানেজার বিশ্রী একটা হাসি দেয়। ড্রাইভারও কথা মতো গাড়ি ঘুরায়।
..
রাতে মেসে ফিরে তোহফা চিন্তিত হয়ে বিছানায় বসে থাকে। জামাল উদ্দিনকে কল দেওয়ার পর সে বলেছে দেখা করতে যেতে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আগামীকালকে সকালে দেখা করতে যেতে হবে।
'কি হলো কিছু ভাবছো?'
তোহফার ধ্যান ভাঙে আয়শার ডাকে।
'না আন্টি তেমন কিছু না। আপনি কিছু বলবেন? আসুন বসেন এখানে।',তোহফা হাসি দিয়ে আয়শাকে বলে।
'তোমাকে দেখে কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত লাগতেছে তাই তো আসলাম কথা বলতে। অন্য দিন তুমি আমার রুমে গিয়ে গল্প করো আজকে আসলা না যে?'
'আসলে আন্টি আজকে একটু ক্লান্ত লাগছে তাই আর কি যাওয়া হয়নি। আপনি এসেছেন এখন বসে গল্প শুরু করি।'
আয়শা এসে তোহফার পাশে বসে। দু'জনে খোশগল্পে মেতে উঠে।
ঘন্টা খানেক পর আয়শা চলে গেলে রাতের খাবার খেয়ে তোহফা ঘুমায়।
....
পরেরদিন সকাল বেলা তোহফা রেডি হয়ে মুশতাকের অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। অফিস দূরে হওয়াতে রিকশায় চড়ে তোহফা এসেছে। রিকশা থেমে নেমে ভাড়া মিটিয়ে অফিসের বিল্ডিং এ ঢুকে। বিল্ডিং এর ভেতরে ঢুকে তোহফার অস্বস্তি হতে থাকে আশেপাশে সব ছেলেদের দেখে। সবাই অদ্ভুত দৃষ্টিতে তোহফার দিকে তাকাচ্ছে।
'এক্সকিউজ মি ম্যাম আপনি কাউকে খুঁজছেন?',এক ছেলে তোহফাকে প্রশ্ন করে।
'আসলে মুশতাক স্যার আমাকে আসতে বলেছে।',তোহফা আমতা আমতা করে উত্তর দেয়।
ছেলেটা তেহফার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নেয়।
'আপনি পঞ্চম তলায় চলে যান স্যার সেখানেই আছে।',ছেলেটা বলে।
তোহফা মাথা নাড়িয়ে লিফটের দিকে যায়। লিফট আসলে তোহফা উঠে চার নাম্বার বোতাম চাপে। লিফটের দরজা বন্ধ হওয়ার পূর্বে তড়িঘড়ি করে কেউ লিফটে প্রবেশ করে।
'কাউকে আসতে দেখলে লিফট আঁটকে রাখতে হয় জানো না? স্টুপিড মেয়ে।',তোহফাকে ধমকের সুরে বলে নাকিব।
হুট করে নাকিবের ধমকে তোহফা মৃদু কেঁপে উঠে।
'আমি আসলে খেয়াল করিনি আপনাকে।',তোহফা ধীর গলায় জবাব দেয় যা নাকিবের কান অবধি পৌঁছেছে কিনা অজানা রইলো।
নাকিক তোহফার দিকে না তাকিয়ে লিফটের দরজার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। চতুর্থ তলায় এসে লিফটের দরজা খুললে সে বেরিয়ে যায়। নাকিব যেতেই তোহফা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
পঞ্চম তলায় এসে তোহফা কচ্ছপের গতিতে এগুতে থাকে। তোহফাকে দেখে মুশতাকের ম্যানেজার এগিয়ে আসে।
'ম্যাম স্যার ঐ রুমে আছে আপনি জলদি যান ওনার আবার মিটিং আছে পরে ওনাকে পাবেন না।',মুশতাকের ম্যানেজার বলে।
মাথা নাড়িয়ে রুমের দিকে তোহফা যায়। রুমে প্রবেশ করে দেখে মুশতাক মনোযোগ দিয়ে ফোনে কিছু দেখছে।
'আসবো?'
তোহফার গলার স্বর শুনে মুশতাক মুখ তুলে তাকায়। ফোনটা লক করে পকেটে রাখে।
'আরে আসো আসো অনেকক্ষণ ধরে তোমার অপেক্ষা করছিলাম। দশটা বলেছিলাম তুমি তো দশটা বিশে আসলা।',হাসি দিয়ে মুশতাক বলে।
'আসলে মেইন রোডে জ্যাম তো তাই..।'
'থাক বুঝেছি বলতে হবে না আর। এখানে এসে বসো আমার হাতে সময় অনেক কম। কথাগুলো বলে আমি আমার বের হবো।'
মুশতাকের কথায় তোহফা এসে তার সামনের চেয়ারে বসে।
'কিছু খাবা? চা, কফি কিংবা অন্য কিছু?',মুশতাক জিজ্ঞেস করে।
'জি না স্যার কিছু খাবো না আপনি বলুন কি বলতে চাচ্ছেন।',তোহফা না সূচক জবাব দেয়।
'দেখো ভনিতা না করে সরাসরি বলি আমার তোমাকে পছন্দ হয়েছে। এ কথাটা আমি জামাল উদ্দিনকে বলেছি সে নিশ্চয়ই তোমাকে জানিয়েছে? মূলত আমি এতোদিন ধরে তোমার মতোই কাউকে স্ত্রী হিসেবে চাচ্ছিলাম। তুমি বিয়েতে রাজি হলে আমরা জলদি বিয়ে করে নিবো।'
'কিন্তু আপনি তো আমার বিষয়ে জানেন না কিছুই। আমার পরিবারের কেউ নেই আর এমন একজন মেয়েকে কেনো বিয়ে করবেন?'
'আমি সব জেনেই তোমাকে বিয়ে করতে চাই। আজকাল যুগে তোমার মতো এতো নম্র ভদ্র মেয়ে পাওয়া দুষ্কর। এমন মেয়েকে স্ত্রী হিসেবে পেলে আমার আর কিছু চাই না।'
'আমি আসলে এই মূহুর্তে বিয়ে করতে চাই না।'
'দেখো তোহফা আমাকে দুইদিনের সময় দিলাম তুমি আমাকে ভেবে জানাও। যদি রাজি না হও তোমার ও ক্ষতি সাথে স্কুলেরও ক্ষতি।'
'মানে? বুঝলাম না কি বলছেন আপনি।'
'তুমি বিয়েতে রাজি না হলে স্কুলের জন্য কোনো টাকা আমি দিবো না। একদিক দিয়ে তুমি আমার সাথে বিয়েতে রাজি হবে অন্য দিক দিয়ে আমিও টাকা দিবো স্কুলের উন্নয়নে।'
মুশতাকের কথা শুনে তোহফা অবাক হয়ে যায়।
'এসব কি বলছেন আপনি? স্কুলে টাকা দেওয়ার সাথে বিয়ের কি সম্পর্ক? '
'ভালো ভাবে বলেছি বিয়ে করতে এতে তোমারই লাভ। আমার ইচ্ছে নেই তোমাকে এক রাতের সঙ্গী করার তাই বিয়ে করতে চাচ্ছি এখন তুমি বাকিটা ভেবে দেখো।'
তোহফা কিছু না বলে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়।
'আমি আসছি পরে আপনাকে জানাবো।',কথাটা বলে রুম থেকে তোহফা বেরিয়ে যায়।
ভয়ে তার হাত পা কাঁপছে। রুম থেকে বেরিয়ে সোজা লিফটের দিকে যায়। মুশতাকের এমন রুপ সে দেখবে ভাবতে পারেনি।
লিফটে ঢুকে বুকে হাত দিয়ে হাঁপাতে থাকে। চার তলায় এসে লিফটটা থেমে যায়। লিফটের দরজা খোলার পর নাকিব লিফটে প্রবেশ করে। সে প্রবেশ করে এমন ভান করে যেনো তোহফাকে দেখতেই পায়নি।
লিফট চলতে শুরু করে হঠাৎ লিফট দ্বিতীয় তলায় এসে আঁটকে যায়। তোহফা চিৎকার করে ছুটে এসে লিফটের দরজায় অনবরত আঘাত করতে থাকে।
'এই মেয়ে কি করছো এটা? লিফট আঁটকে গেছে তুমি এভাবে আঘাত করলে খুলবে নাকি?',তোহফাকে আবারো ধমক দিয়ে বলে নাকিব।
'আমি অন্ধকারে ভয় পাই অনেক। এভাবে বদ্ধ জায়গায় আঁটকে থাকলে ভয়ে মরেই যাবো।',তোহফা জবাব দেয়।
'চুপ করে দাঁড়াও আমি কল দিচ্ছি ওরা এসে আমাদের উদ্ধার করবে।',কথাটা বলে ফোন বের করে কাউকে কল দেয় নাকিব।
লিফটের ভেতরে নেটওয়ার্কের সমস্যা থাকায় ঠিক মতো কথা বলতে পারে না। বিরক্ত হয়ে কল কেটে লিফটের ইমারজেন্সী বোতাম চাপ দেয় নাকিব। পাশ ফিরে লিফটের মৃদু আলোতে ভয়ে জবুথবু হয়ে থাকা তোহফার দিকে তাকায়। নাকিবের এক হাত দূরে তোহফা চোখ বন্ধ করে এক পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া দুরুদ পড়ছে।
...
(চলবে..)