ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক প্রহর

৩য় পর্ব

লেখক: সোহাগী আক্তার
#এক_প্রহর 
#পর্ব_৩
#ঈশিতা_ইশা
...
কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে এক চোখ খুলে তোহফা সামনে থাকা নাকিবের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করে। নাকিব ফোন হাতে নিয়ে কাউকে বারবার কল দিচ্ছে কিন্তু নেটওয়ার্ক না থাকায় কল বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। নাকিবের হাতে একটা ফাইল রয়েছে সেটা দিয়ে ক্রমাগত নিজেকে বাতাস করছে। পাঞ্জাবির বোতামে হাত রাখে খোলার জন্য তখনই পাশ ফিরে নাকিব তোহফার দিকে তাকায় সাথে সাথে তোহফা চোখ বন্ধ করে ফেলে। হুট করে তোহফার মনে ভয় বাসা বাঁধে। 
নাকিব তো মুশতাকের ভাই তাহলে তার চরিত্রও নিশ্চয়ই ঐরকমই হবে। এমন কথা মাথা আসতেই তোহফা চোখ খুলে ভীতু দৃষ্টিতে তাকায়। তোহফা চোখ খুলতেই নাকিব নিজের দৃষ্টি সরিয়ে পাঞ্জাবির প্রথম বোতাম দুটো খুলে ফেলে।
প্রায় দশ মিনিট পর হঠাৎ লিফট আবারো চলতে শুরু করে। লিফট চলতেই তোহফা নিজের জান ফিরে পায়।
নিচতলায় এসে লিফট থামতেই নাকিব বেরিয়ে একটা ছেলেকে চিৎকার করে ডাক। নাকিবের ডাকে ছেলেটা দৌড়ে আসে। তোহফা ভয়ে ভয়ে ধীর পায়ে লিফট থেকে বের হয়।
'লিফট পনেরো মিনিটের মতো আঁটকে ছিলো কেনো?',নাকিব ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করে।
'ভাই কারেন্ট চলে গেছিলো আর জেনারেটর হঠাৎ কাজ করতেছে না তাই লিফট আঁটকে গেছিলো।',ছেলেটা জবাব দেয়।
ছেলেটার কাছ থেকে জবাব পেয়ে নাকিব আর কিছু না বলে সোজা হাঁটা দেয়। তোহফা ছোট ছোট কদম ফেলে বের হওয়ার জন্য পা বাড়ায়। দু'টো ছেলে এসে তোহফার পথ আঁটকায়।
'আপু ভাইকে মজা দেওয়া হলে আমাদেরকে দিয়েন। ভাইয়ের মতো অতো টাকা দিতে পারবো না তবে সুখ কিন্তু দিবো অনেক।'
ছেলেগুলোর মুখ থেকে এমন কথা শুনে তোহফা অবিশ্বাস্য চোখে তাকায়।
'নাকিব ভাইকেও মনে হয় লিফটে মজা দিছে দেখলি না পাঞ্জাবির বোতাম খোলা ছিলো।'
তোহফা কারো কোনো কথার জবাব না দিয়ে দ্রুত হেঁটে বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে যায়। তার চোখে অশ্রুরা এসে হানা দিয়েছে।
ছেলে দুটো লোভাতুর দৃষ্টিতে তোহফার যাওয়ার পানে তাকায়।
'কি দেখছিস এভাবে?',মুশতাকের ম্যানেজার প্রশ্ন করে ছেলে দুটোকে।
'আরে ভাই যে আজকে মাইয়াটারে আনলো একটু আগে ঐইটারে দেখতেছিলাম। ভাই তো নিজে যেই মেয়ের সাথে শোয় তার সাথে কাউরে শুইতে দেয় না তবে এই মাইয়াটারে এক রাত যদি পাইতাম! ভাইয়ের হইলো আমাদের জন্য একটু রিকুয়েষ্ট কইরেন যাতে মেয়েটারে এক রাতের জন্য আমাদের কাছে দেয়।'
'আমার সামনে বলছিস তাই বেঁচে গেলি ভাইয়ের সামনে বললে তোর আর বাঁচা লাগবে না। এমনিতেই ভাই পছন্দ করে না তার পছন্দ করা মেয়ের দিকে অন্য কেউ নজর দেক সেখানে এই মেয়েরে তো বউ বানাবে তারে নিয়ে তোরা এমন ভাবতেছিস শুনলে জানে মেরে দিবে।'
ম্যানেজারের কথায় ছেলে দু'টো ঢোক গিলে।
'ভাইকে এসব বইলেন না আমাদের ভুল হয়ে গেছে।'
'যা নিজেদের কাজে ভাই এখনই নামবে।'
ম্যানেজারের কথায় ছেলে দু'টো চলে যায়। 
একটু পর মুশতাক লিফটে করে নামে। নেমেই ম্যানেজারকে নিয়ে দ্রুত গাড়িতে উঠে রওনা দেয় মিটিং এ উপস্থিত হতে।
..
রিকশায় চড়ে তোহফা ভয়ে গুটিয়ে থাকে। মুশতাক আর ছেলেগুলোর বলা কথাগুলো তার কানে বাজছে। তার মতো ভীতু মেয়ের সাহস হয়নি মুশতাকের কথার প্রতিবাদ করার। তার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে হয়তো মুশতাককে চড় বসিয়ে সেখান থেকে আসতো। রিকশা এসে থামে স্কুলের সামনে। তোহফা রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে স্কুলে প্রবেশ করে।
প্রধান শিক্ষকের অফিসে সোজা যায়। জামাল উদ্দিন নিজের আসনে বসে ফোনে কারো সাথে কথা বলছিলো। তোহফা অফিসে প্রবেশ করে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। জামাল উদ্দিন চোখ তুলে তোহফার দিকে তাকায়।
'জি স্যার আমি দেখতেছি চিন্তা করবেন না। হ্যা ও এসেছে আমি কথা বলে জানাচ্ছি।',ফোন কানে জামাল উদ্দিন বলে।
অপরপাশের ব্যক্তিটা কি বলে জানা নেই তোহফার অবশ্য সেটা জানতেও চায় না। কল কেটে জামাল উদ্দিন তোহফার দিকে তাকায়।
'তুমি নাকি মুশতাক স্যারের অফিস থেকে বের হয়ে আসছো তাড়াহুড়ো করে? উনি ভালো মানুষ তাই তোমাকে কিছু বলেনি অন্য কেউ হলে জোর করতো।',জামাল উদ্দিন তোহফাকে বলে।
'আসলে স্যার আমার ভয় হচ্ছিলো তাই বেরিয়ে এসেছি। আমি ওনাকে বিয়ে করতে পারবে না বলে দিয়েন।',তোহফা বলে।
'দেখো তোহফা তোমার এই হ্যা না কথার উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। ছোট্ট এই স্কুলটাতে অনেক নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়ে পড়তে আসে কিন্তু আমরা তাদের তেমন সুযোগ সুবিধা দিতে পারি না। সরকারি স্কুলের কথা তো জানোই সেখানের পরিবেশ নিয়ে বলার কিছু নেই। আমাদের স্কুলের পরিবেশটা একটু ভালো হওয়াতে সবাই এখানে পড়তে চায় আমিও চেষ্টা করি যাদের আর্থিক সমস্যা তাদের বিনা বেতনে পড়াতে কিন্তু এই বিনা বেতনের চক্করে তোমাদের বেতন দিতেই আমি হিমশিম খাই। স্কুলটা উন্নত হলে ভালো পরিবারের ছেলেমেয়েরাও পড়তে আসবে আবার নিম্নবিত্তরাও সুযোগ সুবিধা পাবে। এই সব কিছুই সম্ভব মুশতাক স্যার টাকা দিলে আর সে টাকা দিবে তুমি যদি বিয়েতে হ্যা বলো।'
জামাল উদ্দিনের কথা শুনে তোহফা মাথা নিচু করে ফেলে।
'কিন্তু স্যার সে তো বাহিরে এক ভেতরে আরেক। তার কথাবার্তা আমার একদমই ভালো লাগেনি। সে তার ক্ষমতা দেখিয়ে এভাবে জোর কাউকে করতে পারে না।'
'উনি চাইলে এক্ষুণি তোমাকে তুলে নিয়ে যেতে পারে কিন্তু তোমার ভাগ্য ভালো সে তোমাকে সম্মান দিয়ে বউ করতে চাচ্ছে।'
'কি বলছেন স্যার! উনি এতো নিচ!'
'দেখো তোহফা কথায় কথা বাড়ে তুমি রাজি হয়ে যাও এতে তোমারও মঙ্গল আমাদেরও মঙ্গল। তুমি যদি আমাদের সাহায্য না করো তাহলে স্কুলের চাকরিটাও আর তোমার থাকবে না।'
'স্যার এভাবে আমাকে চাকরি থেকে বের করে দিবেন? আপনি জানেন আমি একা মানুষ চাকরি হারালে আমার কষ্ট হবে।'
'তুমি একা তাই তো বলছি রাজি হয়ে যাও ভালো থাকবা। আমাদের তো পরিবার আছে তোমার জন্য আমরা নিজেদের পরিবারে কোনো রকম রিস্ক নিবো না।'
জামাল উদ্দিনের কথা শুনে তোহফা ছলছল নয়নে তাকায়।
'যাও ক্লাসে বাচ্চারা অপেক্ষা করছে। তোমার সিদ্ধান্ত যদি না হয় তাহলে কালকে থেকে স্কুলে আসবা না।',জামাল উদ্দিন কঠিন গলায় তোহফাকে বলে।
মাথা নিচে করে তোহফা অফিস থেকে বেরিয়ে যায়। বাহিরে বেরিয়ে দেখে অন্যান্য শিক্ষক শিক্ষিকারা এতক্ষণ আড়ি পেতে সব শুনছিলো। তোহফা বের হতেই সবাই অদ্ভুত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়। তোহফা চুপচাপ ক্লাসে চলে যায় বাচ্চাদের পড়াতে।
..
ফাইল হাতে নিয়ে নাকিব তার বাবার সামনে বসে আছে। নাকিবের পাশে হাসান দাঁড়ানো। নাকিবের বাবা নাসিরুদ্দিন শেখ ফোনে গতকালকে অনুষ্ঠানে নাকিবের দেওয়া বক্তব্য দেখছে। ভিডিওটা দেখা শেষ হতেই নাকিবকে ফোন ফেরত দেয় নাসিরুদ্দিন শেখ। নাকিব ফোনটা নিয়ে হাসানের হাতে দেয়।
'ভাই ভিডিওতে প্রায় দশ মিলিয়ন ভিউজ হয়েছে সাথে তিন মিলিয়ন লাইক, নয় লক্ষ কমেন্ট আর পাঁচ লক্ষ শেয়ার।',হাসান নাকিবকে বলে।
'সামান্য সোশ্যাল মিডিয়াতে তোমার কিছু সাপোর্টার হওয়াতে তুমি নির্বাচনে দাঁড়াতে চাচ্ছো? তুমি তো জানোই রাজনীতি আর সাধারণ জনপ্রিয়তা দুটো দুই জিনিস। নেতা হতে হলে তেমন ব্যক্তিত্ব থাকতে হয় যেটা তোমার মধ্যে নেই।',নাসিরুদ্দিন শেখ নাকিবকে বলে।
'এলাকায় গিয়ে নাকিব আর এমপির নাম বললে কার জনপ্রিয়তা কেমন সেটা নিজ চোখে দেখলে আপনার সব ধারণা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে। এমপি আজকাল যা শুরু করছে এতে নির্বাচনে তাকে হারানো কোনো বিষয়ই না। মানুষ কাজ দেখে ভোট দেয় আর আমি সাধারণ মানুষ হিসেবে তাদের জন্য কাজ করেছি এখন ভোট চাইলে সেটাও তারা দিবে।',নাকিব জবাব দেয়।
'মুশতাক এই এমপির চেয়ারে পরপর দুইবার বসেছে। প্রায় বিশ বছর ধরে সে রাজনীতির সাথে যুক্ত। তোমার কি মনে হয় তুমি ওকে হারাতে পারবা তাও তোমার নিজের ভাইকে? একটা অনুষ্ঠানে সামান্য বক্তব্য দিয়েই তোমার পা মাটিতে পড়ে না আর এমপি হলে তো..'
'এমপি হলে কি করবো সেটা তখনই দেখবেন আপাততঃ আপনাকে পাশে চাই। বড় ছেলেকে নির্বাচনে যেভাবে সাপোর্ট করেন এবার মেজ ছেলেকে সেভাবে সাপোর্ট করবেন তাহলেই হবে।'
'দেখো নাকিব আমি চাই তুমিও মুশতাকের মতো ভালো একজন নেতা হও তবে নিজের ভাইয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে মাঠে নামবা এটা কীভাবে মেনে নেই বলো বাবা? শুধু শুধু নিজেদের মধ্যে অশান্তি করে কি লাভ? তুমি বরং অন্য কোনো পদের জন্য দাঁড়াও।'
'আপনাদের দল থেকেই আমাকে বলছে নির্বাচন করতে। বড় বড় নেতারা আমাকে কল দিয়ে বলছে তারা পাশে আছে আমি যেনো নির্বাচনে দাঁড়াই। হার জিত পরের বিষয় চেষ্টা করতে তো সমস্যা নেই।'
'ঠিক আছে আমার আর এ বিষয়ে তাহলে কোনো মতামত নেই। আমি দুই ছেলেকেই সাপোর্ট করবো। তোমরা এখন বড় হয়ে গেছো যেটা ভালো মনে হয় করো।'
নাসিরুদ্দিন কথাগুলো বলে বসা থেকে উঠে বেরিয়ে যায়।
নাসিরুদ্দিন যেতেই নাকিব পায়ের উপর পা তুলে বসে। হাসান ফোন বের করে পেজে সকলের মেসেজ চেক করতে থাকে।
'আপনার নামে একটা পেজ খুললাম গতদিনে এর মধ্যে এক লক্ষ ফলোয়ার হয়ে গেছে আর পেজের ইনবক্সে মানুষের মেসেজে ভরে গেছে।',হাসান নাকিবকে বলে।
'বাহ্! তুই তো আমার থেকেও ফাস্ট। এসব রাখ এখন পোলাপান গুলাকে আস্তে আস্তে জড়ো কর। কালকে আমরা যাবো টিকিট নিতে।',নাকিব হাসানকে বলে।
'জি ভাই চিন্তা করবেন না এক ডাক দিলে আপনার সব পোলাপান হাজির হবে। আশা করি আপনার এতো বছরের পরিশ্রম বৃথা যাবে না।'
'সেটা তো সময়ই বলবে।'
'এখন তো অফিস থেকে বের হবেন না? বিকালে আমরা নেতার সাথে দেখা করতে যাবেন তাহলে তখন আপনাকে আমি পিক করে নিবো এখন আমি হাতের কাজ গুলো সেরে আসি।'
নাকিব কথার কোনো জবাব দেয় না, হাসান অফিস থেকে বেরিয়ে যায়।এই অফিসটা নাকিবের বাবার। নাসিরুদ্দিন শেখ গার্মেন্টসের ব্যবসা করেন সাথে রাজনৈতিক দলের লোকদের সাথে তার উঠা বসা রয়েছে। যদিও এক সময় তিনি এমপি ছিলেন এখন তার বড় ছেলে এমপি তারপরও দলের নেতারা কোনো দরকারে তাকেই আগে খোঁজে। 
নাকিব চেয়ারে মাথা এলিয়ে নানান ভাবনায় ডুবে যায়।
..
তোহফা টিউশনে বসে গালে হাত দিয়ে ভাবছে কি করবে। হুট করে এমন এক বাজে পরিস্থিতিতে পরবে কখনো স্বপ্নেও ভাবেনি। ঘড়িতে সময় দেখে নেয় রাত আটটা বাজে। পেটের খিদেটা বেড়ে যাওয়াতে তোহফা চোখমুখে অন্ধকার দেখছে। আজকে মেসে গিয়ে দুপুরে খাওয়ার সময় পায়নি সোজা টিউশনে চলে এসেছে যাতে দেরি না হয়।
স্টুডেন্টের লেখা শেষ হলে অংক গুলো চেক করে ছুটি দিয়ে বেরিয়ে যায়। বেশি রাত হয়নি তাই শর্টকাট গলির রাস্তা দিয়ে সে হেঁটে ফিরছে। মেইন রাস্তা দিয়ে গেলে সময় লাগবে বেশি সেইজন্যই ভেতরের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে।
তোহফার ফেরার পথে এক কলেজ পরে রাস্তায়। এই মূহুর্তে তোহফা সেই কলেজের কাছাকাছি চলে এসেছে। দূর থেকে চেঁচামেচি শুনে সে ভড়কে যায়। একদল পোলাপান তার পাশ দিয়ে ছুটে সামনে যেতে থাকে। তোহফা ভয়ে দৌড় দেয়, দৌড়ে কলেজের প্রধান গেট দিয়ে ঢুকে আশেপাশে তাকায়। আশেপাশে মানুষ দেখে পিছনে ঘুরে তাকায় দেখার জন্য কি হচ্ছে। পিছন ফিরে দেখে দুই দলের পোলাপান মারামারি করছে। কারো হাতে লাঠি, কারো হাতে হকিস্টিক, কারো হাতে ছুরি। এসব দেখে ভয়ে ঢোক গিলে কলেজের করিডরে দৌড় দেয়। কিছু পোলাপান কলেজের মাঠে ঢুকে সেখানে থাকা ছেলেদের মারছে। তোহফা কোনোদিকে না তাকিয়ে দৌড়াচ্ছে। এক সময় রাস্তা না পেয়ে সিঁড়ি বেয়ে দ্বিতীয় তারপর তৃতীয় তলায় উঠে। হুট করে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। চারিদিকের আলো নিভে যায়। হঠাৎ করেই এলাকার কারেন্ট চলে গেছে।
'এই মেয়ে কে তুমি? এই রাতের বেলা গেঞ্জামের মধ্যে কি করতেছো?'
পুরুষের গম্ভীর গলা শুনে তোহফা মুখ তুলে তাকায়।
ফোনের টর্চের আলোতে তোহফার মুখটা নাকিবের কাছে স্পষ্ট হয়।
'আরে তোহফা তুমি এখানে কি করতেছো?',হাসান তোহফাকে প্রশ্ন করে।
'আমি আসলে যাচ্ছিলাম তারপরই কি হলো বুঝলাম না।',ভয়ে এলোমেলো ভাবে বলতে থাকে তোহফা।
'আচ্ছা উঠো।'
হাসান তোহফার হাত ধরে তাকে ফ্লোর থেকে তুলে।
'ভাই ওরা এদিকে আসতেছে। এখন আপনার বের হওয়া অসম্ভব। আপনি এক রুমে চুপ করে বসেন আমি বাকিটা দেখতেছি।',হাসান নাকিবকে তাড়া দিয়ে বলে।
'তুইও আড়াল হ ওরা তোকে একা পেলে সুযোগ নিবে।',নাকিব হাসানকে বলে।
'আপনি জলদি যান আসতেছে ওরা আর তোহফাকে সাথে নেন।',হাসান তাড়া দিয়ে বলে।
নাকিব দ্রুত হেঁটে যায়। 
'তোহফা তুমি ভাইয়ের সাথে যাও নিরাপদে থাকবা। যাও জলদি।'
হাসানের কথায় তোহফা কিছু না ভেবে নাকিবের পিছন পিছন যায়।
 তৃতীয় তলায় শেষের ক্লাস রুমটার তালা খোলা ছিলো সেটায় নাকিব প্রবেশ করে তোহফার ভয়ে ভয়ে নাকিবের সাথে রুমটায় প্রবেশ করে। রুমে প্রবেশ করেই দরজা লাগানোর শব্দে কেঁপে উঠে তোহফা। পুরো অন্ধকার রুমে শুধু দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ বিদ্যমান। নাকিব ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে পুরো ক্লাস রুমটায় চোখ বুলায়।
কিছুক্ষণ পর জুতার শব্দ পেয়ে নাকিব নিজের ফোনের টর্চ বন্ধ করে দেয়। মূহুর্তেই রুমটা আবারো অন্ধকার হয়ে যায়।
'টর্চ বন্ধ করলেন কেনো? অন্ধকারে.. ',তোহফা কথা শেষ করার পূর্বেই নাকিব তার মুখ চেপে ধরে।
নাকিব তোহফার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলো তাই অন্ধকারে তোহফাকে হাতের কাছে পেতে অসুবিধা হয়নি।
'চুপ স্টুপিড মেয়ে। একটা শব্দ করলে তোমাকে আমিই মেরে ফেলবো।',চাপা গলায় দাঁতে দাঁত চেপে নাকিব তোহফাকে বলে।
তোহফা চুপ করে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে।
পোলাপান সব এসে পুরো করিডরে কাউকে দেখতে পায় না। এই রুমটার যে তালা খোলা অন্ধকারে বিষয়টা তারা খেয়াল করেনি। 
'ঐ ছাদে গিয়ে দেখ তো কেউ আছে কিনা। ওদের কলিজা কত আমাগো এলাকায় ঢুকে আমগো পোলাপানরে পিটায় আজকে একটারেও ছাড়ুম না।',দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলোর মধ্যে এক ছেলে বলে।
'হ ভাই দেখতেছি একটারেও ছাড়ুম না। যেইটারে পামু ধোলাই দিমু।', আরেকটা ছেলে সায় দিয়ে বলে।
ছেলেটার কথায় বাকিরা দ্রুত কদম ফেলে সিঁড়ির দিকে যায়। ছেলেটার ফোন বেজে উঠলে বের করে রিসিভ করে।
'জি বস আমরা ওদের এলাকায় আছি। আমার মনে হয় এই হামলা আর কেউ না এমপির লোকেরা করছে। অন্য কারো সাহস হইবো না আপনার লগে ঝামেলা করার।',ছেলেটা ফোনের অপরপাশের ব্যক্তিকে বলে।
এগুলো শুনে লোকটাও কিছু একটা বলে।
'আপনে চিন্তা করবেন না আমি সব দেখতাছি।',কথাটা বলে কল কেটে দেয় ছেলেটা।
ফোন হাতে নিয়ে এগিয়ে যায় সামনে।
ক্লাস রুমে থাকা নাকিব এতক্ষণ সব চুপ করে শুনছিলো। দরজার বাহির থেকে কারো শব্দ না পেরে বুঝে সবাই চলে গেছে। তোহফার মুখ থেকে হাত সরিয়ে দূরে সরে দাঁড়ায়। নাকিব সরতেই তোহফা দূরে সরে যায় এরফলে অন্ধকারে বেঞ্চে ধাক্কা খেয়ে পায়ে পিঠে আঘাত পায়। শব্দ পেয়ে নাকিব ফোনের টর্চ জ্বালায়। 
আলোতে দেখে বাম পায়ের আঙুল হাত দিয়ে চেপে তোহফা ফ্লোরে বসে আছে। 
'তুমি একটা ঝামেলা। এক সেকেন্ড একটু চুপ থাকতে পারো না? যতবার তোমার সাথে দেখা হলো ততবারই দেখতেছি একটা করে ঝামেলা হচ্ছে। এই মেয়ে তুমি কি ঝামেলার বস্তা? নিজে ঝামেলায় জড়াচ্ছো সাথে আমাকে জড়াচ্ছো। তোমার কারণে আমি এই অন্ধকার রুমে বসে আছি যদি তোমার সাথে দেখা না হতো এতক্ষণে পিছনের রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে যেতাম।'
নাকিবের কথা শুনে তোহফার চোখে অশ্রু এসে হানা দেয়।
'আশ্চর্য কাঁদছো কেনো? একে তো তুমি ঝামেলার বস্তা তার উপর কান্নাকাটি করে যদি এখানে নদী বানিয়ে ফেলো তাহলে তো মানুষ অন্য কিছু মনে করবে। কান্না থামাও।'
নাকিবের চাপা ধমকে তোহফা চুপ হয়ে যায়।
ফোন হাতে নিয়ে হাসানকে কল দেয় নাকিব।
'কিরে তোর কতক্ষণ লাগবে? সব ঠিক আছে?',নাকিব জিজ্ঞেস করে হাসানকে।
'আমি তো ভাই বের হলাম কলেজ থেকে এখন ব্যবস্থা করতেছি একটু অপেক্ষা করেন আর মেয়েটার খেয়াল রাখবেন।'
হাসানের কথার প্রেক্ষিতে নাকিব কিছু বলতে নিলে কলটা কেটে যায়। ফোন হাতে নিয়ে কল দিতে নিলে দেখে ফোন বন্ধ হয়ে গেছে। হতাশ চোখে ফোনটা মুঠোবন্দি করে ফেলে। সকালে ফোনে চার্জ দেয়নি যার দরুন এই বিপদের মূহুর্তে ফোনটা বেঈমানী করলো।
'এই মেয়ে ঝামেলার বস্তা তোমার কাছে ফোন আছে? থাকলে জলদি দাও।',নাকিব তোহফাকে বলে।
'আছে কিন্তু.. '
'কিন্তু আবার কি? জলদি দাও হাসানকে কল দিবো।'
'ফোনে ব্যালেন্স নেই।'
তোহফার মুখে এমন কথা শুনে নাকিবের চেহারার ভাবমূর্তি পরিবর্তন হয় যা অন্ধকারে তোহফা দেখতে পায় না।
'আমি এবার দুইশো পারসেন্ট শিওর তুমি একটা ঝামেলার বস্তা। এখান থেকে বের হওয়ার পর আমার সামনে আর জীবনেও পরবা না তাহলে তোমার খবর আছে।'
কথাগুলো বলে নাকিব আশেপাশের দেয়াল স্পর্শ করে জানালা খোঁজার চেষ্টা করে। নাকিবের পায়ের শব্দে তোহফা ভয় পায়।
'আপনি এদিক ওদিক হাঁটছেন কেনো?',তোহফা ভিতু স্বরে জিজ্ঞেস করে।
'তোমাকে গিলে ফেলবো তাই খুঁজতেছি স্টুপিড।',নাকিব রাগী স্বরে বলে।
তোহফা ফোন বের করে টর্চ জ্বালায়। টর্চের আলো পরতেই রুমের জানালা খুজেঁ পায়। দেরি না করে জানালা খুলে দাঁড়ায় নাকিব।
তোহফা এতক্ষণে বুঝতে পারে নাকিব তার দিকে এগিয়ে আসছিলো না জানালা খুঁজছিলো। পুরাতন কাঠের জানালা হওয়াতে অন্ধকারে খুঁজে পায়নি। পুরো আকাশ অন্ধকার তার সাথে এলাকাতে কারেন্ট না থাকায় এলাকাও অন্ধকারে আচ্ছন্ন।
তোহফা ফ্লোরে বসে চুপ করে নাকিবের দিকে তাকিয়ে আছে তার শুধু মনে হচ্ছে নাকিব যে কোনো সময় তার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু তোহফাকে অবাক করে দিয়ে নাকিব জানালার কাছেই দাঁড়িয়ে রইলো একবারো তার দিকে ফিরলো না। 
প্রায় আধা ঘন্টা পর নাকিব ক্লাসের দরজাটা খুলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে মাঠে উঁকি দিয়ে দেখে পুলিশ এসে বাহিরের মারামারি থামাচ্ছে।
'এই ঝামেলার বস্তা বাসায় ফিরতে চাইলে জলদি আসো না হলে এখানেই থাকো।',তোহফাকে কথাটা বলে নাকিব দ্রুত গতিতে হাঁটতে থাকে।
তোহফা কোনো ভাবে উঠে পায়ের আঙুলের ব্যথা নিয়েই নাকিবের পিছন পিছন যেতে থাকে। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার পর নাকিব আশেপাশে দেখে তারপর কলেজের পিছনের দিকে যায়।
'আরে ভাই এসে পরছেন আমি আপনাকে আনতে যাচ্ছিলাম। তোহফাকে আনছেন না?',হাসান নাকিবকে বলে।
নাকিব দ্রুত নেমে এসেছে আর তোহফা তার গতির সাথে পাল্লা দিয়ে পারেনি তাই তো নাকিব নামার একটু পর সে নেমে আসে।
'ভাই এই যে আমি।',হাঁপাতে হাঁপাতে তোহফা বলে।
'তোরে পরে দেখে নিবো আগে বের হই সামনে পুলিশ আছে।',নাকিব হাসানকে বলে।
নাকিব হাঁটা শুরু করে হাসানও তার সাথে সাথে তাল মেলায়। তোহফাও দু'জনের পিছন পিছন আসে।
কলেজ থেকে বের হলেই নাকিবের গাড়ি দেখা যায়। কোনো দিকে না তাকিয়ে নাকিব গাড়িতে উঠে বসে।
'তোহফা উঠো তোমাকে পৌঁছে দেই।',হাসান তোহফাকে বলে।
'না ভাই আমি যেতে পারবো।',তোহফা জবাব দেয়।
'দেখো এখন তর্ক করার সময় না। জলদি উঠো।'
হাসানের কথায় তোহফা ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে। হাসান গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দেয়। 
তোহফার মেসের রাস্তা হাসানের জানা তাই পুরো রাস্তায় চুপ করে গাড়ি চালিয়েছে সে। মেসের বিল্ডিং এর নিচে এসে গাড়ি থামতেই তোহফা সিট বেল্ট খুলে বের হওয়ার জন্য। 
'তোহফা শুনো আজকে আমাদের দু'জনকে কলেজের বিল্ডিং এ দেখছো এটা ভুলে যাও। তুমি যে সেখানে ছিলা সেটাও ভুলে যাও। এতক্ষণ যা ঘটেছে এই এক ঘন্টায় কিছুই মনে রাখবা না। বুঝছো?',হাসান তোহফাকে বলে।
'জি ভাইয়া বুঝেছি এখন আমি আসি।',তোহফা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়িয়ে গাড়ি থেকে নেমে যায়।
'কাজ হয়েছে হাসান?',তোহফা নামতেই নাকিব প্রশ্ন করে।
'আবার জিগায়! ভাই যেভাবে বলছেন সেভাবেই সব করা শেষ।',হাসান পিছনে ঘুরে নাকিবের দিকে তাকিয়ে হেঁসে বলে।
নাকিবের চেহারার মুখভঙ্গির কোনো পরিবর্তন নেই সে যেনো গভীর ভাবনায় মত্ত। 
...
চলবে..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন