#আমার_প্রিয়_সর্বনাশ °|০২|°
#সুমাইয়া_খাতুন
{যেহেতু কলকাতার আঞ্চলিক ভাষায় লেখা মনে হতে পারে বানান ভুল}
[এই গল্পের চরিত্র, সংলাপ ও দৃশ্য কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ]
সকাল হলো কিছুক্ষন আগে তবে বৃষ্টির এখনও ঘুম ভাঙেনি।হিসাবের কাজ ছোটো হলেও ভীষণ কঠিন একটু ভুল হলেই সব শেষ। আর যত চিন্তা, যত ক্লান্তি ততো ঘুম তাই আজকেও উঠতে দেরি হচ্ছে। ইহান পিটপিট করে চোখ খুলে তাকালো।উঠে ঘড়িতে দেখলো সাড়ে আটটা বেজে গেছে। ঘড়ি দেখা সে তার মায়ের কাছ থেকে শিখেছে।
চমকে গেলো সে এতো দেরি হয়ে গেলো?আর দেরি করলে তো স্কুল যাওয়াই হবে না। সে বৃষ্টির কাছে যেয়ে আসতে আসতে ডেকে তুলতে শুরু করলো
"মা..ওমা..উঠোনা দেরি হয়ে যাবে যে তোমার কাজে যেতে"
বৃষ্টির ঘুমটা ভীষণ হালকা যতই গভীর ঘুমে থাকুক ঠিক একটু আওয়াজ করলেই ঘুম ছেড়ে যায়।আসতে আসতে চোখ খুলে তাকালো চোখ কচলাতে কচলাতে ঘুম মেশানো কণ্ঠে বললো
"হুম উঠে গেছি বাবা"
তারপর ইহানকে নিজের কাছে শুইয়ে দিলো তারপর তার মাথাতে স্নেহের হাত বুলিয়ে দিতে শুরু করলো অনেক্ষন কিছু একটা চিন্তা করে ধীর ভাবে জিজ্ঞাসা করলো
"ইহান"
"হুম"
"তোমার কখনো তোমার বাবার কাছে যেতে মন চাইনি?"
ইহান কিছু না ভাবেই উত্তর দিলো
"একবারো না"
বৃষ্টি এমন উত্তর ইহানের থেকে আশা করেনি। সে ভেবেছিলো হয়তো আর পাঁচটা বাচ্ছার মতো ইহানেরও তার বাবার কথা মনে পরে তার বাবার কাছে যেতে মন চায়। কিন্তু সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়ে ভীষণ অবাক হলো।
"তোমার বাবার কথা তোমার মনে পরে না? বাবার কাছে যেতে ইচ্ছা করে না?"
"আমি তো তোমার কাছ থেকেই শিখেছি মা,যেটা নেই সেটা নিয়ে আফসোস করে লাভ নেই বরঞ্চ যেটা আছে সেটা নিয়ে খুশি থাকো, আমি আমার মাকে নিয়েই ভীষণ খুশি আছি, শুধু তুমি আমাকে কখনো ছেড়ে যেও না মা, তুমি ছাড়া যে আমার জীবন মূল্যহীন"
বৃষ্টি অবাক হয়ে ইহানের দিকে তাকিয়ে রইলো। তার চোখ ঝাঁপসা হয়ে গেলো হয়তো জমে থাকা অশ্রুর জন্য না সে ইহানের সামনে কাঁদবে না সে কোনো দিন ইহানের সামনে কাঁদেনি আজকেও কাঁদবে না। বৃষ্টির বুকটা গর্বে এবং ভালো লাগায় ভেসে গেলে, জীবনে আর কি চাই? তার সব কষ্ট সার্থক তার সব ত্যাগ সার্থক। পৃথিবীতে তাকেও এতটা কেউ ভালোবাসে? মা আর সন্তানের সম্পর্ক বুঝি এমন হয়?
বৃষ্টি ইহানের কপালে টুপ্ করে একটা চুমু খেলো।কিছুক্ষন অমন করে পরে থেকেই নিজের তিক্ত অতীত মনে করতে লাগলো কত না কষ্ট সহ্য করেছে কত অত্যাচার মুখ বুঝে সহ্য করেছে তবে আজকে সব শোধ সেদিন যা সিধান্ত নিয়েছিলো আজকে সেটা সঠিক বলে গণ্য হলো।
ইহান ভীষণ মা ভক্ত সারাদিন মায়ের পেছনে পেছনে ঘুরঘুর করে একটা সময় বৃষ্টিকে একা ছাড়ে না। শুধু মাত্র স্কুল গেলে বৃষ্টির থেকে আলাদা থাকে নয়তো না, তাই জন্যে সেও ভীষণ ইন্ট্রোভার্ট কারো সাথে মিশতে পারে না আর তার কোনো বন্ধু নেই শুধু একটাই ভালো বন্ধু আছে সেটা হলো তার মা সে হলো বৃষ্টি, বৃষ্টি প্রিয়া।
ইহান ছুটে বাথরুমে চলে গেলো বৃষ্টি একই ভাবি শুয়ে রইলো আজ যে তার ভীষণ আনন্দ হচ্ছে এই আনন্দ সবার কাছে ভালো লাগবে না কারো কারো কাছে ন্যাকামি এবং অতিরিক্ত লাগবে তবে যারা মাতৃত্বের স্বাদ জানে তার মর্ম জানে তারাই বুঝবে এর ওজন ঠিক কতখানি জীবনেতে।
দুজনে মা ছেলে তৈরী হয়ে গেলো একসঙ্গে।বৃষ্টিকে দেখেলেই যেনো অন্বেষার টেপ রেডিয়ো বেজে ওঠে। বৃষ্টির চাইলেই অন্য জায়গায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে শান্তিতে ইহানকে বড়ো করতে পারবে কিন্তু সে আর কিছু ত্যাগ করতে চায়না, এটা তার দাদুর বাড়ি মানে সে এটার উত্তরাধিকারী এর অধিকার সে ছাড়বে না কারণ সে আর কিছুই ত্যাগ করবে না ত্যাগ করতে করতে তার অর্ধেক জীবন শেষ।
আগে ইহানকে স্কুলে ছেড়ে দিয়ে তারপর নিজে বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে দাঁড়ালো। কিছুক্ষন পর বাস এসে থামলো বাস স্টপে তারপরেই সে তাতে উঠে বসলো। আজকে বাসে একটু ভিড় কম, যাক!গায়ে পড়ার মতো লোক আজকে নেই।
দোকানে যেয়ে বসতেই একজন জানালো আজকে দোকানে মালিক অনেক আগেই চলে এসেছে বৃষ্টি বুঝে গেলো আজকে আর তার রক্ষে নেই মালিকের থেকে।ভয়ে ভয়ে চেয়ারে বসে অল্প জলে নিজের গলাটা ভিজিয়ে নিলো আগন্তু ঝড়ের মুখোমুখি হতে।কিছুক্ষন পর মালিক সেখানে উপস্থিত হয়ে এলো তার মুখ দেখেই মনে হচ্ছে সে এখানে কথা শোনাতে আসছে।
"যদি সময় মতো না আসতে পারো তাহলে বলে দাও আমি অন্যজনকে রেখে দিবো কাজে"
বৃষ্টি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো এই মাত্র জল খাওয়া সত্ত্বেও গলাটা ভয়ে শুকিয়ে গেলো।হাতের ভাজে শাড়ির আঁচল শক্ত করে ধরলো।
"তোমার দায়িত্ব বলে কোনো জিনিষ নেই? তুমি তো ভালো করেই জানো একটু দেরি হওয়া মানে কত ক্ষতি তারপরেও?"
বৃষ্টি এবার তোতলাতে তোতলাতে বলতে শুরু করলো
"আসলে,তুমি তো জানোই ট্রাফিক কত জ্যাম থাকে?আমি তো ইচ্ছা করে দেরি করে আসিনা"
বৃষ্টির কথা শেষ হতেই মালিক যেনো হুঙ্কার দিয়ে উঠলো তেজি গলায় বললো
"ট্রাফিক জ্যাম? নাটক শিখাও? আমার মতো ভালো মানুষ আর আছে এই কলকাতায়? শুধু মাত্র তোমার ঐ পাঁচ বছরের ছেলেটার জন্য তোমাকে সহ্য করছি আর যায় হোক অন্য ছেনার পাপ তো নিজের ঘাড়ে নিতে পারিনা?"
বলেই সেখান থেকে চলে গেলো। বৃষ্টি নিজে জায়গায় বসলো।একটা বাচ্ছা মানুষ করতে গেলে কত কি শুনতে হয় কত কি সহ্য করতে হয়, নিজের আত্মসম্মান ত্যাগ করে এই কাজটাতে দাঁত কামড়ে পরে আছে বৃষ্টি শুধু মাত্র ইহানের পড়াশোনা এবং বাকি খরচ চালানোর জন্য। আহামরি মাইনেও পায়না তবে যতটুকু পাই ভালোয় চলে যায় তবুও এমন করে কথা শোনা সত্ত্বেও ছেড়ে যেতে পারছে না।
কিছুক্ষন বসে থেকে বৃষ্টি বাকি কাজ গুলো করা শুরু করলো। দোকানের বাকি সদস্যরাও উপস্থিত ছিলো সেই সময়ে কিন্তু তাঁদের মধ্যে কোনো হেলদোলই নেই কেননা সবাই অভ্যস্ত তারা মালিকের এমন আচরণে।
কাজ শেষ করতে করতে বৃষ্টির ভালোই দেরি হয়ে গেলো।তাড়াহুড়ো করে নিজের সমস্ত জিনিষ ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলো তারপর কাঁধে ব্যাগ নিয়ে রাস্তায় নেমে হাঁটা ধরলো। আজকে অনেকটা বেশি দেরি হয়ে গেছে বাস পাবে তো? আবার তাকে ইহানকে স্কুল থেকে আনতে যেতে হবে, স্কুল ছুটি হয়ে গেলে ছেলেটাকে একাই অপেক্ষা করতে হবে রাস্তায় বসে। ভীষণ চিন্তা হতে শুরু করলো তার।
বাসের জন্য অনেক্ষন অপেক্ষা করেও বাস না পেয়ে শেষমেশ তাকে রিক্সা নিতে হলো বাড়ি ফেরার জন্য। হালকা কালচে আভা নেমেছে চারিদিকে সন্ধ্যা হতে আরেকটু বাকি। চিন্তা আরো বৃদ্ধি পেলো, বৃষ্টির ভীষণ চিন্তা হচ্ছে একা একটা বাচ্ছা কিভাবে রাস্তায় সন্ধ্যায় বসে থাকতে পারবে? বুকের ভেতর যেনো ঘূর্ণি ঝড় উঠেছে চিন্তার।রিক্সাতে আসতে গেলে ডবল ভাড়া লাগবে কিন্তু ইহানের চিন্তাতে কোনো তোয়াক্কায় করলো না সে যায় হোক করে তাকে ইহানের স্কুলে পৌঁছাতে হবে।
রিক্সাটা বৃষ্টি স্কুলের কাছে নিয়ে যেয়ে থামালো তারপর নেমে ভাড়াটা মিটিয়ে দিলো।স্কুলের সামনে এসে দেখলো স্কুল বন্ধ তারপর আশেপাশে খুঁজে দেখলো ইহান নেই, আশ্চর্য!! এমনতো আগে কোনোদিন হয়নি ইহান কোনোদিন একা বাড়ি ফেরেনি।মনটা কেমন ভারী হয়ে গেলো চিন্তাতে ভীষণ দুশ্চিন্তা হতে শুরু করলো। ভেতর থেকে মায়ের মন কেঁদে উঠলো সন্তানের চিন্তায়।
আশেপাশের লোককে জিজ্ঞাসা করেও কোনো খোঁজ পেলোনা ইহানের, ভয়েতে দুশ্চিন্তাতে হাপিয়ে উঠলো তার এক মাত্র বেঁচে থাকার কারণই হলো ইহান, আজ যদি ইহানের কিছু হয়ে যায়? কি হবে? সে কি করবে? সে থাকবে কিভাবে? না না একি ভাবনা? এমন ভাবনা চিন্তা মাথাতেও আনা যাবে না রাস্তার ফুটপাতে ধপ করে বসে পড়লো সে ভীষণ বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে তাকে।
কিছুক্ষন বসে বসে ভাবতে ভাবতে হটাৎ খেয়াল আসলো তার একবার বাড়িতে ফিরে দেখতে যদি ইহান কারো সঙ্গে হলেও বাড়ি চলে যায়? সন্ধ্যা পুরোপুরি নেমে গেছে অন্ধকারও হয়ে গেছে একবার বাড়ি যেয়েই দেখা যায় তার মনে কেনো জানি বলছে বাড়ি যেতে।
আসতে আসতে কাঁধের ব্যাগ শক্ত করে বাড়ির দিকে পা বাড়ালো বৃষ্টি মুখটা র ক্ত শুন্য ফ্যাকাসে লাগছে।বাড়ি আসতেই সে দেখলো লোহার গেটের বাইরে বসার জায়গায় ইহান ঠেক দিয়ে স্কুল ড্রেসে বসে আছে খুবই ক্লান্ত লাগছে মুখটা তার। বৃষ্টির জানে জান এলো যেনো ভেতরের সব ভার নিমেষেই হালকা হয়ে গেলো।
বৃষ্টি এক প্রকার ছুটেই এলো ইহানের কাছে এসেই ইহানকে চুম্মা দিতে শুরু করলো গালে তারপর ইহানকে জিজ্ঞাসা করলো হাটু মুরে বসা অবস্থাতাতেই
"একা একা বাড়ি এসেছিস কেনো বাবা? তুই জানিসনা মেন রাস্তায় কত গাড়ি চলে, তোকে তো আমি স্কুলে অপেক্ষা করতে বলেছি তুই জানিস আমি কত ভয় পেয়েছি?"
ইহান কিছুই বুঝলো না বৃষ্টির এমন পাগলামির কারণ।
"সন্ধে হয়ে গেছিলো মা, আমি আর কত অপেক্ষা করতাম?ওখানে আমার ভয় লাগছিলো তাই এখানে বসে তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম"
"রাস্তায় অনেক ট্রাফিক থাকে আজকাল তাই আসতে যেতে ভীষণ দেরি হয়, তুই এবার থেকে আমার দেরি হলে ঐ সামনে মিষ্টি দোকানে বসে থাকবি আমি তোকে নিয়ে আসবো"
বৃষ্টি উঠে দাঁড়ালো ইহানের হাত ধরে বাড়ির গেট খুলে ভেতরে ঢুকলো। ইহান বৃষ্টিকে ছাড়া এক মুহূর্তও এই বাড়িতে থাকতে চায়না অন্বেষা আর অরিন্দমের জন্য তাই বাইরেই অপেক্ষা করছিলো। ইহান কিছু একটা ব্যাপারে কিছুক্ষন চিন্তা ভাবনা করলো তারপর অবুঝের মতো মুখ করে বললো
"কিন্তু মা মিষ্টি দোকানে তো অনেক খাবার থাকবে আর আমার খাবার দেখেলেই তো খিদে লাগে আমি নিজেকে কিভাবে অতো সুস্বাদু খাবার খাওয়া থেকে আটকাবো?"
বৃষ্টি শব্দ করে হাসলো এমন করে হাসতে তাকে খুবই কম দেখা যায় বৃষ্টির হাসাতে ইহান বোধ হয় একটু লজ্জা পেলো।বৃষ্টি ইহানের হাত ধরে সিঁড়িতে উঠতে উঠতে বললো
"আচ্ছা এবার থেকে আমি দোকানদার কে বলে দিয়ে যাবো তুমি যখন ওখানে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করবে তোমার যা খেতে ইচ্ছা করছে সে যেনো তোমাকে দেয়"
ইহান এবার খুব সিরিয়াস ভাব নিয়ে বললো
"কিন্তু মা আমি তো ওখানে খেলে আমার আর খিদেই থাকবে না, তুমি তো আমাকে ছাড়া বাড়িতে খাওনা তাহলে তোমার কি হবে? না আমি ওখানে খাবো না যায় হোক করে নিজেকে ঠিকই সামলে নিবো, ইহান সেন সব পারে"
কথাগুলো খুবই চিন্তিত এবং সিরিয়াস হয়েই বললো। ইহানের প্রতিটা কথাতে তার বুঝদার রুপ দেখা যায় সে বাচ্ছা হলেও বড়োদের মতো চিন্তা করে তার মাকে নিয়ে, সব সময় খেয়াল রাখে তার মায়ের সমস্ত সমস্যা তার মায়ের কথা তার স্বপ্ন বড়ো হয়ে তার মাকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেয়ে বড়ো একটা বাড়ি করে থাকবে যেখানে কোনো কষ্টই তার মাকে ছুতে পর্যন্ত পারবে না কারণ সে দেখে এসেছে তার মা তার জন্য অনেক কষ্ট করেছে অনেক রাত লুকিয়ে কেঁদেছে সবার আড়ালে।
#চলবে....
{বি:দ্র :- আমি কোনোদিন এমন করে কোনো পর্ব উৎসর্গ করিনি তবে আমার এই প্রথম উৎসর্গ করা পর্ব আমি উৎসর্গ করলাম সেই সকাল মাকে যারা একাই সন্তান মানুষ করেন এবং একাই তার সমস্ত দেখা শোনা করেন এবং তাকে মানুষের মতো মানুষ করেন তিক্ত সমাজের সাথে লড়াই করে }
— বৈশাখী 🪔
২৯.০৬.২৬