ফন্ট সাইজ:
থিম:
ইশ্কনামাহ

২য় পর্ব

লেখক: মিথিলা মাশরেকা
ইশ্কনামাহ্ 
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা  
পর্ব:২
– দাদীজান? দাদীজান? স্বর্নকার আইয়া পরছে! 
বেয়ারার উচ্চস্বরে দ্বিতল বাড়িটার সাথে গোটা হুসনতগরও যেন ঝমঝমিয়ে উঠলো। সবুজঢাকা অঞ্চলের সুবিশাল এক অংশ জুড়ে বাড়িটা। তবে এ বাড়িকে শুধু বাড়ি বললে ভুল হবে। সজ্জা আর উজ্জ্বল রঙ মিলিয়ে এ এক রাজবাড়ীই বটে। বাড়িটির প্রতিষ্ঠাকাল আঠারোশো শতক। অথচ এখনে তার গঠনে পুরোনো হওয়ার নামগন্ধ নেই। প্রত্ন-নান্দনিক, দুইয়ের সাথে তাল মিলিয়ে ক্রমশ রুপ যেন বাড়ছে তার। একুশ শতকের আধুনিকতা পৌছে গেছে বাড়ির প্রতিটা কোনে কোনে। বাড়ির সীমানা শুরু হয় ঝকঝকে মুল ফটক দিয়ে। ফটকের পাশের নেমপ্লেটে ইটালিক হরফে খোদাই করা, “Rehnewaaz's” সামনের বড় অংশ জুড়ে বাগান, পেছনের পাড়বাধানো চারকোনা পুকুর। ভেতরে ঢুকলে বড়বড় পিলার, কারুকাজবিশিষ্ট রেলিং, ঝাড়বাতি, রাজকীয় পর্দা, বৃহৎ ড্রয়িংরুম, একসাথে জনা কুড়ি মানুষ বসে খাওয়ার মতো খাবার টেবিল, ভারী আসবাবে ভরপুর বহুসংখ্যক কামরা, সবমিলিয়ে দর্শকের চোখ ধাধিয়ে দেয় এ রাজমহল। 
নিচতলা থেকে আসা আওয়াজ শুনে হাতের কুরআন শরিফ বন্ধ করলেন সুলতানা বেগম। মেঝে অবদি বড় জানালাটা দিয়ে মোলায়েম পর্দা ভেদ করে দিনের আলো তার ঘরে আসছে। বেয়ারার গলা শুনে কুরআন শরিফের নির্দিষ্ট আয়াতে পড়া থামালেন তিনি। চুমু দিয়ে যথাস্থানে রাখলেন সেটা। অতঃপর ডানহাতে হাটার লাঠিটা ধরে পা বাড়ালেন ঘরের বাইরে। সুলতানা বেগমকে ঘর থেকে বেরোতে দেখেই করিডোর থেকে একজন মাঝবয়সী মহিলা এগিয়ে আসে। সত্তরের বেশি বয়সী বৃদ্ধার সার্বক্ষনিক সঙ্গী সে। পরনে মলিন শাড়ি, মাথায় ঘোমটা। সে এসে সুলতানা বেগমের পাশে মাথা নিচু করে হাটতে থাকে। আস্তেকরে বলে ওঠে,
– আপনারে রোশনী মা বারবার ওপরনিচ করতে মানা করছে আম্মা।
সুলতানা বেগম থামলেন না। লাঠির ভরে হাটতে হাটতে, হেসে বললেন,
– হাডাহাডি করলে শরীল ভালো থাকে আলেয়া। আর রোশনীর কথা কি কমু কও। সে নার্স হইছে, আমার সব কাজই তার দোষ লাগবো। এহন তুমি আনপড় হইয়াও কি ওর দলে যোগ দিবা নাকি?
আলেয়া চুপ করে যায়। বংশপরম্পরায় হুসনতগরের ভালোমন্দ সবটা রেহনেওয়াজ'রাই সামলে আসছে। দুস্থের পাশে দাড়ানো থেকে শুরু করে কেউ অন্যায় করলে তার আইন অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা করা, এলাকায় ঘটা সবদিক সবরকমভাবে সামলে হুসনতগরে শান্তি বহাল রেখেছে এই পরিবার। এজন্য এলাকায় এ পরিবারের গুরুত্ব আলাদাই। আর সেই রেহনেওয়াজ পরিবারের বয়জেষ্ঠ্য মানুষটা সুলতানা বেগম। স্বাভাবিকভাবেই, এখানকার ছোটবড় সবাই তাকে মান্য করে। সুলতানা বেগম সিড়ি বেয়ে নামতে নামতে কয়েকজনের নাম ধরে ডাকতে থাকেন। বিভিন্ন দিক থেকে একাধারে বেরিয়ে আসে মোটামুটি বেশ কয়েকজন। নিচতলার রান্নাঘর আর খাবারঘর থেকে আসা মহিলা চারজনের পরনে মলিন শাড়ি। বাকি দুজনের বেশভূষা সম্ভ্রান্ত। একজন সুলতানা বেগমের ছোটমেয়ে, হোসনেয়ারা। আরেকজনের নাম তনয়া। সে এ বাড়ির বউ। সুলতানা বেগমের ছোট ছেলের স্ত্রী। হেশেল সামলাতে গিয়ে অল্পবিস্তর ঘেমে উঠেছে দুজনেই। সুলতানা বেগম সোফায় বসা স্বর্নকারের দিকে এগোলেন। এরইমাঝে চুড়ি-গয়নার ঝুমঝুম আওয়াজ তুলে ওপরতলা থেকে নেমে আসে সুলতানা বেগমের বড় মেয়ে। হানিফা বেগম। তার পাশে এক মহিলার হাতে পানের বাটা, আরেকহাতে ছোট্ট পাখা নাড়িয়ে বাতাসও করছে সে। স্বর্নকারকে দেখে হানিফা বেগম বললেন,
– কি ব্যপার? মহলে হঠাৎ স্বর্নকার?
– স্বর্নকার ক্যান আসে হানিফা? গয়নার আজোড়া দিতে ডাকছি।
সুলতানা বেগম সোফায় বসতে বসতে জবাব দিলেন। মায়ের কথায় হানিফা বেগমের মন ছোট হয়ে যায়। সেখানো আরো একবার হানা দেয়, প্রেমের বিয়েটা তার জীবনের অভিশাপ ছিল। বাবার ঘরে রাজকন্যা হয়ে মানুষ হওয়া তিনি স্বামীর ঘরের সামান্যতম দারিদ্র্য মানতে পারেননি। স্বামীসহ দুই ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে চলে এসেছিলেন মায়ের কাছে। এখনো রয়ে গেছেন এখানেই। হানিফা ছোটবোনের দিকে তাকালেন। তার পরনে সফেদ কারুকাজহীন শাড়ি, চেহারায় প্রাণোচ্ছল হাসি। হোসনেয়ারার বিয়েটা মায়ের পছন্দেই হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের অনেকগুলো বছর পর হুট করে তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেন। মেয়ের এমন অপমান মানতে পারেননি সুলতানা বেগম। যেহেতু বিয়েটা তিনি নিজে দেখেশুনে দিয়েছিলেন, তাই ছোটমেয়েকে জোর করতে চেয়েছিলেন তিনি। হয়নি। হোসনেয়ারা মানিয়ে গেছে এভাবেই। একমাত্র মেয়ে রোশনীকে নিয়ে দুদিন সতীনের সংসার, তো দুদিন মায়ের সংসার। এভাবেই চলে যাচ্ছে দিন। আঁচলে গলা মুছতে মুছতে মায়ের দিকে এগোলো হোসনেয়ারা। সোফার হাতলে বসে বলল,
– কার জন্য গয়না বানাবে মা?
– আমি যহন এই বাড়িতে আসি, তোমার দাদী আমার জন্য গয়না কইরা রাখছিল। আমিও আমার দুই ছেলের বউয়ের জন্য রাখছিলাম। তনয়াও এককালে ওর ছেলেবউয়ের জন্য গয়না গড়াইবো। এহন বড়বউ নাই। তাই বইলা কি তার ছেলের বউ শাশুড়ীর হাতের গয়না পাইব না? এই বাড়ির সবগুলা মাইয়ার পছন্দে আমি নাতবউয়ের জন্য গয়না আজোড়া দিমু। এজন্যই ডাকছি স্বর্নকাররে। তোমরা এইহানেই বহো!
হাত নাড়িয়ে সাথের দুজনকে চলে যেতে ইশারা করলেন হানিফা বেগম। চলে যায় তারা। সুলতানা বেগম বাকিসব সহকারী মহিলাদের দিকে তাকাতেই তারাও মাথা নুইয়ে চলে যায়। তিনি এবার ছোট ছেলের বউয়ের দিকে তাকালেন। তনয়া বেগমের পরনে বাঙাল ভাজের শাড়ী, নাকে নথ। মাথায় ঘোমটা তুলে রাখা অল্পবয়স্ক এই মহিলা খুবই চঞ্চল চটপটে স্বভাবের। সুলতানা বেগম বললেন,
– রোশনী, মৌটুসী আর আনিকা কোথায় ছোটবউ?
– মা, রোশনী বোধহয় ছাদে। আর মৌটুসী, আনিকা. . .
জবাব দিতে দিতে থেমে যায় তনয়া। আড়চোখে তাকালো হানিফা বেগমের দিকে। সেটা সুলতানা বেগমের চোখ এড়ালো না। তিনি কিছু বলতে যাবেন, তখনই বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে আরো দুই নারী। গয়নার আওয়াজ শুনে সেদিকে তাকালো প্রত্যেকে। দুজনের হাতে ব্যাগ। একজনের পরনে ভারী কারুকাজবিশিষ্ট জর্জেটের গাঢ় নীল শাড়ী, আরেকজনের পরণে ভারী সালোয়ার কামিজ। শাড়ী পরিহিত রমনী চোখের রোদচশমা খুলে সুলতানা বেগমকে সালাম দিলো। সুলতানা বেগম সালামের উত্তর নিয়ে বললেন,
– কই গেছিলা মৌটুসী? 
– একটু শহরে গিয়েছিলাম দাদীজান। শপিংয়ে। 
সৌজন্যে হাসার চেষ্টা করে, জবাব দিলো মৌটুসী। সম্পর্কে সে সুলতানা বেগমের নাতবউ। হানিফা বেগমের একমাত্র ছেলের বউ। সুলতানা বেগম ওকে আর কিছু বললেন না। পাশে দাড়ানো মেয়েটাকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বললেন,
– কোনহানে?
আনিকা বিরক্ত হলেও প্রকাশ করলো না। ওউ জানে, যতোযাই হোক, ও এই জবাবদিহিতা এড়ানোর ক্ষমতা রাখে না। কিছু বলতে যাবে, মাঝখান থেকে হানিফা বেগম বলে উঠলেন,
– আমার মেয়ে, ছেলেরবউ একটু কেনাকাটা করতে গিয়েছিলো মা। কোনো অসামাজিক কাজে যায়নি যে তুমি ওদের এভাবে জেরা করবে। 
সুলতানা বেগম একনজর মেয়েকে দেখলেন। অতঃপর মৌটুসী, আনিকাকে বললেন ঠিকঠাক হয়ে দ্রুত নিচে আসার জন্য। ওরা যে যার ঘরে চলে যায়। আলেয়ার সপ্তাদশী মেয়ে রেবেকা ওড়নায় কয়েকটা ছোটছোট পেয়ারা নিয়ে সিড়ির দিকে যাচ্ছিল। খপ করে মেয়ের হাত ধরে ফেলে আলেয়া। এটা ওদের কাজের জায়গা। এখানে মেয়ের এমন সাচ্ছন্দ্য চলাফেরা ওর পছন্দ না। মায়ের এমন ব্যবহারে রেবেকা চুপসে যায়। সুলতানা বেগম সেটা লক্ষ করলেন। আলেয়াকে বললেন,
– ওরে ধরছো ক্যান?
– ইয়ে মানে আম্মা. . .
– হাত ছাড়ো ওর। 
আলেয়া মেয়ের হাত ছেড়ে দিলো। সুলতানা বেগম রেবেকাকে বললেন,
– তুমি কই যাইতেছিলা?
– ছাদে দাদীজান। রোশনী বুবুর কাছে।
– আচ্ছা যাও। জলদি ছাদে গিয়া বুবুরে কইবা, আমি তারে নিচে ডাকছি। আরো কইবা, পরশুর আকাশ যদি ভালো থাহে, তাইলে হের এতোদিনের আকাশ দেহার কাল শেষ হইব। বুঝছো কি কইবা?
রেবেকা চকচকে চোখে চাইলো। মাথা নেড়ে সম্মতি বোঝালেন সুলতানা বেগম। একসাথে বসে হেসে ফেলে তনয়া বেগম আর হোসনেয়ারা৷ কেবল হাসি নেই হানিফা বেগমের চেহারায়। রেবেকা ছুটতে ছুটতে চলে আসে ছাদে। ছাদের এককোনে লাগানো গোলাপী বাগানবিলাস দেয়াল বেয়ে নিচে নেমে গেছে। সেদিকের রেলিংজুড়ে গোলাপী ফুলের আস্তরন। সে প্রান্তে উল্টোপাশ হয়ে দাড়ানো এক রমনী। পরনে হালকা গোলাপী রঙের লম্বা ফতুয়া, কালো খয়েরীর মোটা বর্ডারবিশিষ্ট স্কার্ট, ওড়না শাড়ির আঁচলের মতো করে পেচিয়ে কাধে তোলা। রমনী মোবাইলে আকাশের ছবি তুলছিল। রেবেকা এগিয়ে গিয়ে বলল,
– তুমি এতো আকাশের ছবি কেন তুলো রোশনী বুবু?
– হয়তো আমি না দেখা সত্ত্বেও যে আকাশ প্রতিমুহূর্ত আমার পৃথিবী দেখছে, তাকে মুঠোবন্দি করার চেষ্টা করি। 
জবাব দিয়ে পাশ ফেরে রোশনী। উজ্জ্বল রোদে ঝিকমিকিয়ে ওঠে ওর কপালে থাকা ছোট্ট পাথরের টিপটা। রেবেকার চেহারায় হাসি ফোটে। খুব ছোট থেকেই রেহনেওয়াজ বাড়িতে যাতায়াত ওর। আর যতোদুর মনে পরে, রোশনীর চোখজোড়ায় ও তবে থেকে অপেক্ষাই দেখে এসেছে। নার্সিং পড়া শেষ করেও রোশনী নিজের ক্যারিয়ারের পরোয়া করে নি। করেছে তো কেবল করেছে, ওর অপেক্ষার পরোয়া। রোশনী রেবেকার ওড়না থেকে একটা পেয়ারা নিলো। তাতে এক কামড় বসাতেই রেবেকা বলল,
– দাদীজান তোমারে নিচে যাইতে কইছে।
– কেন?
– স্বর্নকার ডাকছে। তার নাতবউয়ের জন্য গয়নার আজোড়া দিতে ।
– নাতির বাড়ি ফেরার নামগন্ধ নেই, আর সে বসেছে নাতবউয়ের গয়না বানাতে!
– ও হ! দাদীজান কইছে, আকাশ যদি ভালো থাহে, তাইলে তোমার আকাশ দেহা পরশু শেষ হইব।
তৎক্ষনাৎ পেছন ফেরে রোশনী। খুশিতে ঝকঝক করে ওঠে ওর চোখজোড়া। রেবেকাও মিটমিটিয়ে হাসছে। ওর হাসিটা দেখে রোশনী আস্তেধীরে আবারো পেছন ফিরল। সময় নিয়ে, আকাশের দিকে তাকিয়ে ভরাট কন্ঠে বলল,
– আড়ি? নাকি সন্ধি? অভিমান? নাকি প্রেম? আমার অপেক্ষা নামক মিষ্টি যন্ত্রণার ইতি ঘটানোর দায়ে তোকে কি সাজা দেওয়া উচিত সায়র?
•
– উপকূলবর্তী অঞ্চলের জায়গাটা ডুরেস গভর্নরের। জায়গাটা নিজের নামে দলিল করতে স্থানীয় সরকারকে টাকা খাইয়েছেন মিস্টার ফর্ক?
সুস্পষ্ট ইংরেজীতে, দীপ্ত কন্ঠে কথাগুলো বলে ফর্কের উত্তরের অপেক্ষা করতে থাকে সায়র। ওর সামনে বসা চোখ ধাঁধানো হাসিমুখের অধিকারী চুপসে গেছে হুট করে। হচকিত হয়ে ফর্ক আশপাশের সবার মুখ দেখে নিলো একবার। সায়রের সে শীতল দৃষ্টি দেখে, জোরপূর্বক হেসে ইংরেজীতেই বলল,
– ক্ কিসব বলছো তুমি এসআর? জমিটা গভর্নরের হতে যাবে কেন? ওটাতো আমার. . .
ফর্ককে শেষ করতে দেয়না সায়র। কাধের পাশে ডান হাত বাড়ালো ও। তখনই ওর পেছনে দাড়ানো একজন একটা ফাইল দিলো ওর হাতে। সায়র ফাইলটা ঘুরিয়ে টেবিলে ঠেলা দিয়ে ফর্কের দিকে এগিয়ে দিলো। থুতনির কাছে ডানহাত নিয়ে, মাথা দুলিয়ে ফর্ককে ইশারা করলো ওটা পড়ার জন্য। তারপর লতিফ আকবরের দিকে ঘুরে বসে বলল, 
– আপনার পছন্দের তারিফ করতে হয় আকবর সাহেব। জায়গাটা আমারও বেশ পছন্দ হয়েছে। যাইহোক! আজকে আপনি জমিটা কিনতে পারলেন না তো কি? দেখবেন, আজকেই জমিটা রয়েলসের হয়ে যাবে। কথা দিচ্ছি আপনাকে।
লতিফ আকবর চুপচাপ বসে ছিলেন। সায়রের কথায় রাগে পায়ের তলা গরম হয়ে যায় তার। সায়র বুঝল লোক মনেমনে ফুঁসছে। ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটলো ওর। সেইসাথে রাগ বাড়ে লতিফ আকবরের। সায়র এবার আস্তেকরে বলল, 
– আপনি বোধহয় রাগ করছেন মিস্টার আকবর। কিন্তু কেন? দেশে উপার্জন করা সুদঘুষের টাকা, বিদেশে ইনভেস্ট করার প্রক্রিয়া ঠিকঠাকমতো চলছে না? 
লতিফ আকবরের আর সহ্য হলো না। ল্যাপটপের ব্যাগটা নিয়ে তৎক্ষনাৎ দাড়িয়ে গেল সে। হনহনিয়ে বেরিয়ে যায় রেস্ট্রুরেন্ট থেকে। চলে যায় তার সাথের দুজনও। সায়র পুনরায় আয়েশে বসল। এদিকে ফর্কের ভেতরে চাপা রাগ। না চাইতেও ফাইলটা পড়তে হয়েছে তাকে। পুরোটা পড়ে একপ্রকার ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো ফর্ক। ফাইলটা টেবিলে ছুড়ে মেরে বলল,
– এখানে আমার বাড়ি, দোকান সব জমিকেই দখলকৃত বলা হয়েছে কেম? আমি কোথাও দখলদারী করিনি! জমিগুলো আমারই!
সায়রের সাথের একজন ফাইলটা হাতে নিলো। আর সায়র মনোযোগ দিয়ে ফর্কের উত্তেজনা দেখল। দু দন্ড সময় নিয়ে বলল,
– আপনি এখনো বলতে চাইছেন জমিগুলো আপনার? 
– আমারই! 
ফর্কের তেজী জবাব শুনে সায়রের যেন অস্বস্তি হয়। গলার টাইটা ঢিল দিলো ও। তারপর টেবিলে দু হাতের কনুই ঠেকিয়ে, এগিয়ে বসলো কিছুটা। ঠান্ডা আওয়াজে বলল,
– আওয়াজ, নামিয়ে ফর্ক। তোমার গলার জোরের চেয়ে আমার কাগজের জোরটা বেশি। এই ফাইল কোর্টে পৌছালে, ওই জমিগুলো কোনোদিনও তোমার হবে না। উল্টো তুমি জমিদখল আইনের আওতায় সাজাভোগী হবে। আশাকরি বুঝছ তুমি আমি কি বুঝাতে চাইছি?
ফর্কের চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়। নকল কাগজ নিয়েও কেউ এতোটা জোর গলায় কথা বলতে পারে, সে বিষয়ে জানা ছিলো না তার। অথচ সায়র নির্লিপ্ত। চেহারায় এবার একটু হাসি ফুটিয়ে বলল, 
– আর এমনটাই যে হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত থাকো। কেননা এর সবটা, আমি নিশ্চিত করব। এসআর!
– কি চাও?
দাঁতে দাঁত চেপে সোজা কথায় আসে ফর্ক। বিশ্বজয়ের হাসি ফোটে সায়রের চেহারায়। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়িয়ে গেল ও। শার্টের হাতার দিকের বোতামটা ঠিকঠাকমতো লাগাতে লাগাতে বলল,
– আপাতত আমার তোমার উপকূলীয় জমিটাই শুধু দরকার। আর কি দরকার, সেটা সময় আসলে জানিয়ে দেবো। আমার হাতে সময় নেই। ওদের সাথে ডিল করো। Good day.
কাটকাট গলায় বলা শেষ করে, বাহাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে হাটা লাগায় সায়র। ওর সাথে চলে আসে ওর সাথের চারজন। বাকি দুজন রয়ে যায় ফর্কের সাথে। জমি বিক্রির কাগজপত্র হাতে করে বসে রেস্ট্রুরেন্টের কাচের দেয়ালের ওপারে তাকালো ফর্ক। ফোন দেখতে দেখতে সায়র রেহনেওয়াজ গাড়ির দিকে এগোচ্ছে। ওর পেছনপেছন হেটে যাচ্ছে চারজন। কালচে নীল ফেরারী এফ টু ফিফটি গাড়িটার কাছে যেতেই একজন গাড়ির দরজা খুলে দিলো। ফর্ক আবারো অবাক হয়। এমন রাজকীয় চলনের একটা ছেলে হঠাৎ তাকে কেন ধমকে গেল? তার সাথে এসআরের কিসের বোঝাপরা, হিসাবে আসে না তার। কিছুসময় যাবত চিন্তা ভাবনা করলো, সায়রের ধমকি থেকে জমিগুলো বাচানো যায়। কিন্তু কোনো উপায় পেল না ফর্ক। দলিলে সাইন করে দিলো বাধ্য শিশুর মতো।
সায়র গাড়িতে না বসে সামনে গিয়ে ড্রাইভারকে ইশারা করলো কিছু একটা। ড্রাইভার বেরিয়ে এসে গাড়ির চাবি ধরিয়ে দেয় ওর হাতে। সায়র নিজেই ড্রাইভিং সিটে বসে যায়। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে, কানে গোঁজা এয়ারবাডে ধীরস্থির ভঙিতে বলল,
– I'm done here. পরশুর ফ্লাইট ক্যান্সেল করিয়ে কালকের টিকিটের ব্যবস্থা করুন। আমি কালই বিডিতে ফিরছি।
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন