ফন্ট সাইজ:
থিম:
ইশ্কনামাহ

৫ম পর্ব

লেখক: মিথিলা মাশরেকা
#ইশ্কনামাহ্ 
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা 
৫.
– আমার ছেলে একটু শৌখিন। মেয়েদের সাথে বন্ধুত্ব করা, ওঠবস করা, মজমস্তি করা, এটা রিদমের ন্যাচার। And I think it's totally okay. ওরমতো হ্যান্ডসাম, রিচ, সেলিব্রিটিকে এসবই মানায়। তাই ওর তোমার প্রতি কোনো ঝোঁক থাকলে, সেটাতে আমি ভুল কিছু দেখছি না স্রোত। 
স্থির হয়ে বসে রইল স্রোত। টু শব্দটাও করলো না ওর সামনে বসা ভদ্রমহিলার কথায়। ভদ্রমহিলা একদফা ওর পাশে বসে চিকেন ললি খেতে থাকা শেউতিকে দেখে নিলো। অতঃপর বলল,
– আমি এটাও জানি, মিডলক্লাস মেয়েরা টাকাপয়সার লোভে, একটু বিলাসবহুল জীবনের আশায় বড়লোক ছেলেদেরকে প্রেমের জালে ফাঁসায়। এটাও ওদের স্বভাব। একারণে আমার তোমার এগেইনিস্টে কোনো এলিগেশনস্ নেই। So I'm coming straight to the point. কি করলে তুমি আমার ছেলেকে ছাড়বে? 
এবার আর প্রশ্ন না, তীর এসেছিল। আর সেটা বরাবর স্রোতের আত্মসম্মানে আঘাত করেছিল। রাগে স্রোতের শরীরজুড়ে উষ্ণ রক্তস্রোত বয়ে যায় যেন। তবুও ধৈর্য্য ধরে রাখল স্রোত। যথেষ্ট শান্তশিষ্ট ভঙিতে বলল,
– আপনার আরকিছু বলার আছে?
ভদ্রমহিলা ঘাড় খানিকটা কাৎ করে স্রোতের চেয়ে রইলেন। স্রোত বুঝল সামনেজনের বলা শেষ। মোবাইলের স্ক্রিন অন করে একবার সময়টা দেখে নিলো ও। তারপর সামনের ভদ্রমহিলার দিকে দৃষ্টি স্থির করে বলল,
– গত তিনমাস হলো আপনি যে আমাকে ফলো করছেন, তা আমি জানতাম। আর আপনি যে রিদমের মা, খুব সহজেই আমার এটুকোও জানা হয়ে গিয়েছিল। আমি আশা করেছিলাম আমাকে আপনার মুখোমুখি হতে হবে। তাই গাড়ি নিয়ে একাডেমির সামনে দাড়িয়ে যাওয়ায় আমি টু শব্দটা করেও আপনাকে মানা করিনি। আপনার একবাক্যে সোজা চলে এসেছি আপনার সাথে। 
– ওহো। তারমানে তুমি. . .
– Don't interrupt please. এতক্ষণ আপনি বলেছেন, আমি শুনেছি। এবার আমি আপনার কথারই জবাব দেবো। এবং আপনি তা শুনতে বাধ্য। চুপ থেকে কো অপারেট করুন প্লিজ।
ভদ্রমহিলা থেমে গেলেন। তার চাওনি কিছুটা এলোমেলো লাগছিল। যেন স্রোতের এমন স্বর তিনি আশা করেননি। স্রোত বলল,
– প্রথমত, আপনার ছেলের স্বভাব আপনার চোখে ঠিক নাকি ভুল, সেটাতে আমার কিছু যায় আসে না। এজন্য আপনার জাহির করা স্বীকারোক্তিকে আমি ধর্তব্য বলেই মনে করছি না। আর দ্বিতীয়ত, এই মিডলক্লাস মেয়েটা আপনার ছেলেকে ফাঁসায় নি। আপনার ছেলেই টাইমপাসের জন্য তার পিছনে ঘুরছে। এবং সেটা আমার জন্য খুবই অস্বস্তিকর, অপমানজনক। So mam, I'm also coming straight to the point. কি করলে আপনার ছেলে আমার পিছু ছাড়বে? 
মহিলা ভাষাহীন হয়ে বসে রইলেন। আরকোনো কথা বেরোলো না তার মুখ দিয়ে। স্রোত নির্বিকারভাবে বসে ছিক। শেউতিকে খাওয়া শেষ করে টিস্যু নিতে দেখে ওয়েটারকে ডাক লাগায় ও। সে এসে বিল দিয়ে যেতেই পার্স থেকে ভদ্রমহিলার অর্ডার করা স্যুপ, শেউতির ললি আর নিজের না খাওয়া কফির দামটা দিয়ে দিলো। তারপর ব্যাগ কাধে নিয়ে আরেকহাতে শেউতির হাত ধরে উঠে দাড়ালো। রিদমের মায়ের যেন আত্মসম্মানে আঘাত লাগে। মহিলাও এবার ক্রোধ নিয়ে দাড়িয়ে গেলেন। সেইসাথে মনের আসল কথাটাই বলে উঠলেন,
– মানে তুমি রিদমকে ছাড়ছ না?
– মানে আমি আপনার ছেলেকে ধরে নেই।
বলে দিয়ে শেউতিকে নিয়ে রেস্ট্রুরেন্ট থেকে দ্রুতপদে বেরিয়ে আসলো স্রোত। রিকশায় করে সোজা পৌছালো বাসায়৷ ডোরবেল শুনে একপ্রকার ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন পারিজা বেগম। প্রথমে শেউতি হেলতেদুলতে ঘরে ঢোকে। পারিজা বেগম দেখলেন ওর পেছনে তার মেয়েও আছে। ক্লান্ত পায়ে ঘরে ঢোকে স্রোত। দেয়ালঘড়িতে দেখল, সন্ধ্যে সাতটা বাজছে। বাকিসব মায়ের মতো রাত করে বাড়ি ফেরার দায়ে মেয়েকে বলতে শুরু করলেন পারিজা বেগম। কিন্তু স্রোত কোনোদিক ভ্রুক্ষেপ না করে সোজা নিজের ঘরে হাটা দিলো। ঘরে এসে কাধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে, পা ঝুলিয়ে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পরলো। পলকহীন মাথার ওপর স্থির ফ্যানটা দেখতে লাগলো। এরমাঝে শেউতিও এসে একইভাবে ওর পাশে শুয়ে পরে। পারিজা বেগম এবার ঘরে এসে বলতে লাগলেন,
– স্রোত? বড় হয়েছ তুমি। এভাবে রাত করে কে বাড়ি ফেরে বলো? টেনশন হয়না আমার? কোনোকিছুর চিন্তা করো না! একাডেমি শেষ হয় চারটার মধ্যে। অথচ তুমি বাসায় ঢুকছ. . .
– সরি মা। আর হবেনা।
– আর হবেনা? এটা তই কতো তম বারের মতো বলছিস, তুইই বল!
. . . 
– আমি তোর সাথে কথা বলছি স্রোত! আমাকে বল আর কতো দিন এভাবে আমাকে টেনশনে রাখবি? হুটহাট বাসায় ফিরতে লেইট করিস, কল রিসিভ করিস না। আর এদিকে তোর চিন্তায় আমি পাগল হয়ে যাই।
স্রোত এবারও জবাব দিলো না। চোখ বন্ধ করে কপালের ওপর হাত রাখলো। এরমাঝে কণিকা আসলো ঘরে৷ মাকে ইশারায় বুঝিয়ে পাঠিয়ে দিলো। তারপর বিছানার নিচে বসে গিয়ে শেউতির মোজা খুলতে লাগলো। পারিজা বেগম মেয়ের কাজকর্মে যতোটাই উত্তেজিত হন, ততটাই শান্ত থাকে কণিকা। এখনো তেমনই শান্তশিষ্টভাবে বলল,
– রিদমও কল করেছিল। 
– নাম নিও না ওর। 
– আবার কি করেছে?
– কি করেছে? রিদম মামা আজকেও আমাকে চকলেট দিয়েছে। আবার অবিশ্বাস করে বাইকে বেধেও রেখেছে!
শেউতি জবাব দেয়। এমনভাবে, যেন দুনিয়ার সর্বোচ্চ অন্যায়টা রিদম ওর সাথেই করেছে। মেয়ের জবাব শুনে কণিকা আফসোসে মাথা দুলালো। শেউতিকে তুলে বসিয়ে, ওর চুলের বিনুনি খুলতে খুলতে বলল,
– এই ছেলেটা. . .
– আমার অলরেডি মাথাব্যথা করছে আপু। তুমি আর বাড়িও না প্লিজ।
– না চেঞ্জ করেছিস, না ফ্রেশ হয়েছিস। মাথাব্যথা করবে না তো কি করবে? 
– আম্মু প্লিজ! রেস্ট নিতে দাও তো! চেঞ্জফেন্জের কথা বলেবলে প্যারা দিও না! 
কণিকা শেউতির চুলে টান লাগালো। অনেকবেশি কথা বলে মেয়েটা। আর সবই স্রোতের সঙ্গের ফল। মা হয়েও কণিকা কিছু বলতে পারেনা। কারন তাতে পারিজা বেগম স্রোতকে আরো কথা শোনানোর সুযোগ পেয়ে যাবে। এরমাঝে আবার ডোরবেল বাজে। ভ্রুকুচকে বাইরে তাকালো কণিকা। শেউতিকে ছেড়ে ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে বলল,
– আমি দুমিনিটে আসছি। এসে যদি দেখি তোরা দুটো তখনো ওমন চিতল মাছের মতো চিৎ হয়ে পরে আছিস, দুটোকেই আজ বাসা-ছাড়া করব। এই বলে রাখলাম।  
রুমের বাইরে আসতেই পা থামে কণিকার। আর চেহারায় হাসি ফোটে তৎক্ষনাৎ। পেছনে তাকিয়ে ও উচুস্বরে বলল,
– স্রোত? মামা এসেছে!
কপাল থেকে হাত সরায় স্রোত। উঠে বসলো তৎক্ষনাৎ। এই দু শব্দেই যেন মন ভালো হয়ে গেছে ওর। ওড়নাটা কাধে নিয়ে স্রোত হাসিমুখে হাটা লাগালো বাইরে। শেউতিও হাটা লাগালো ওর সাথে। বদরুল হক দরজার সামনে দাড়িয়ে পারিজা বেগম আর কণিকার সাথে কথা বলছিলেন। স্রোত এসে সোজা তার বুকে মাথা ঠেকালো। বদরুল হক হেসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
– এইযে আমার আরেকটা মা! কেমন আছিস তুই?
– তুমি আসায় সর্বোচ্চ ভালো আছি। তোমার শরীর কেমন সেটা বলো। 
– আর শরীর! এই চলে কোনোরকমে!
– নানাভাই নানাভাই! তুমি কেমন আছো?
শেউতি ছুটে এসে কোলে উঠল নানার। ওকে কোলে করে সোফায় এসে বসলেন বদরুল হক। কথা শুরু হয়ে যায় তার, স্রোত আর শেউতির। ওদের হাসাহাসিতে কলকল করতে থাকে ছোট্ট ড্রয়িংরুমটা। পারিজা বেগম জানেন, এই আড্ডা শেষ হবার না। বদরুল হক এখান থেকে আগামী দুইঘন্টা হাতমুখ ধোয়ার জন্যও যাবেন না। একইকথা কণিকাও জানতো। তাই টুকিটাকি কথা শেষে ওরা মা মেয়ে মিলে রাতের খাবার তৈরীতে ব্যস্ত হয়ে যায়। কিছুসময় পরই কল আসে কণিকার ফোনে। নম্বরটা দেখে একটু হতাশই হলো ও। কল রিসিভ করে, ওপাশের কথা শুনে ডাক লাগালো ছোটবোনকে,
– স্রোত?
– হুম?
– এদিকে আয়।
– কেন?
– কথা বল। কল এসেছে তোর।
মামার সাথে আড্ডায় মশগুল স্রোত আচমকাই স্থির হলো। যেন ও বুঝে গেছে, কলদাতা কে। তবুও শান্ত আওয়াজে শুধাল,
– কে?
– রিদম। 
চেহারায় এবার রাগ ফুটে ওঠে স্রোতের। ধপ করে সোফা থেকে উঠে গিয়ে কণিকার হাত থেকে ফোন রীতিমতো কেড়ে নিলো ও। কল কেটে দিয়ে, বন্ধ করে ফেলল ফোনটা। কণিকা মামার দিক তাকিয়ে বেশ বুঝল, তিনি সবটাই টের পেয়েছেন। পরিস্থিতি সামলাতে জোরালো হাসার চেষ্টা করলো ও। কিন্তু লাভ হলো না। বদরুল হক বললেন,
– এ ছেলেটা এখনো শুধরায়নি?
– অনেক বলেছি মামা। 
কণিকার মলিন জবাব। বদরুল হকের চেহারায় চিন্তার রেশ দেখা যায়। রাগ নিয়েই স্রোত এসে বসে গেল সোফায়। বদরুল হক ওকে জিজ্ঞেস করলেন,
– তুমি অনুমতি দিলে আমি শেষবারের মতো রিদমের সাথে কথা বলতে চাই, ওকে সাবধান করতে চাই। 
স্রোত মামার দিকে তাকালো। বুঝলো না কি জবাব দেবে। তবে এটা ঠিকই বুঝলো, আজ রিদমের মা ওকে যা কিছু বলেছে, তাতে ওর জীবনে রিদমের কোনো জায়গা থাকতে পারে না। সম্পর্কটাকে সুন্দর করা ত দুর, ওর পক্ষে এখন এই বন্ধুত্বকেও লালন করা কঠিন। বা সহজ করে বললে, সম্ভব না।
•
রেহনেওয়াজ মহলের ছাদে মরিচ, পাপড় আর আচারভর্তি বোয়াম রাখা। সারাদিনের রোদে শুকানো হয়ে গেছে ওগুলো। তুলবে বলে কাজ করছে রেবেকা আর দুজন মহিলা সহকারী। তাদের একজন মরিচ জড়ো করছে, আরেকজন রেবেকার সাথে পাপড় বড় খানচায় তুলছে। মরিচগুলোর পাশেই পরে আছে তিনচারটে রঙবেরঙের ঘুড়ি। আর ছাদের একপার্শ্বের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাড়িয়ে আছে রোশনী। ঘাড় ঘুরিয়ে দৃষ্টি নিচের বাগানে স্থির রেখেছে সে। নিচে হানিফা বেগমের ছেলে আলমাসের সাথে সাথে সায়র ব্যাডমিন্টন খেলছে। তার পরনে একটা পেস্ট রঙের টিশার্ট, ধূসর রঙের প্যান্টের নিচু অল্পটুকো ভাজ দেওয়া, পায়ে চপ্পল। ছাদ থেকে সায়রের পেছনদিকটা দেখা যায়। ঠোঁটে মুচকি হাসি ঝুলিয়ে রোশনী একদৃষ্টিতে সেদিকেই তাকিয়ে আছে। শেষ বিকেলের রোদ আর এই স্নিগ্ধ মানুষটা, বহুবছর পর এ দুইয়ের সমন্বয়। সারাদিনে সায়রের সাথে সেভাবে কথা হয়নি রোশনীর। ওইতো সকাল–দুপুর দুবেলা খাবার সময়, আর সুলতানা বেগমের ঘরে ও সায়রকে দেখেছিল। 
সায়র সপ্তমবারের মতো কর্ক জালের ওপারে ফেলে বিজয়ের হাসি হাসলো। আলমাস হাঁপাচ্ছিল। র‍্যাকেট ঘাসের ওপর ফেলে, হাটুতে দুহাত ঠেঁকিয়ে উবু হলো ও। বড়বড় দম ফেলে বলল,
– কি ব্যপার সায়র? এতো পটু কিকরে? পড়াশোনা আর ব্যবসার পাশাপাশি তেরোবছর ব্যাডমিন্টন ট্রেনিংও নিয়েছিস নাকি? 
– তোমার ভাই অল ইন ওয়ান আলমাস ভাইয়া।
চোখ টিপে দিয়ে র‍্যাকেট ঘোরাতে থাকে সায়র। আলমাস হেসে পা ছড়িয়ে বসে গেলো ঘাসের মাঝে। পায়জামার ভাজ নামাতে থাকে ও। সায়র ঘাসে পরে থাকা কর্ক তুললো। ঠিল তখনই একটা ঘুড়ি নাটাইসমেত এসে সামনে পরলো ওর। সায়র ভ্রু কুঁচকে ঘুড়ির দিকে তাকালো। ওর কানে আসে,
– Hello Mr all in one? আপনার নিজের মুখে গাওয়া গুণ আমি মানলাম না! 
পেছন ফিরে সায়র ছাদের দিকে তাকালো। সেখানে রোশনী একহাতে ঘুড়ি আর নাটাই ধরে আরেকহাত কোমড়ে রেখে দাড়িয়ে আছে। সায়র উচু গলায় বলল,
– সেটা তোর সমস্যা। তাতে আমার গুন এতোটুকোও কমবে না। 
– পারলে আমার ঘুড়ি কেটে দেখা। তাহলে মানবো তুই সত্যিই গুনী!
– তুই ঘুড়ি ওড়াতে জানিস?
– আজোবদি রোশনীর ঘুড়ি হুসনতগরের কেউ কাটতে পারেনি। চাইলে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারিস।
ঔদার্যে বলে দিয়ে রেবেকাকে নিয়ে নিজের ঘুড়িটা আকাশে ওড়ালো রোশনী। অভিজ্ঞতা থাকায় ও বেশ ভালোমতোই সুতলি সামলাচ্ছিল। কিন্তু তবুও মিনিটখানেকের মাথায়ই আরেকটা ঘুড়িতে ওর ঘুড়ি কাটা পরে। ঘুরতে ঘুরতে ঘুড়িটা নিচে গিয়ে পরলো। রেলিং অবদি এসে, রোশনী প্রসারিত চোখে নিচে তাকালো। নাটাই ছিল আলমাসের হাতে। আর ঘুড়ি সায়র ওড়াচ্ছিল। রোশনীর ঘুড়িটা সায়রের ঘুড়িতেই কেটেছে। সায়র হুইস্টলিং করে, হাতের ইশারায় রোশনীকে ‘Down’ বুঝাল। তারপর জয়ের হেসে মহলের ভেতরে চলে গেল। আলমাসও ভেতরে চলে যায়। এতোক্ষন মিথ্যে রাগ দেখালেও রোশনী এবার হেসে ফেলল। রেবেকা পাশ থেকে বলল,
– এয় তো সব পারে দেহি!
– এজন্যই ও সায়র। ওকে বিট করা বা ম্যাচ করার মতো ইহজগতে আর দুটো নেই।
দুহাতে নিজেকে জড়িয়ে হাটা লাগায় রোশনী। নিচে এসে দেখে সায়র হাতমুখ ধুয়ে ডাইনিংয়ে বসে মোবাইল দেখছে। বিশজন বসার মতো সুবিশাল ডাইনিং টেবিলে শুধু ও বসা। হানিফা বেগম, নয়ন আর কবির রেহনেওয়াজ ড্রয়িংয়ে বসে। আলমাসও হাতমুখ ধুয়ে এসে বসে যায় সেখানে। একজন পুরুষ সহকারী এসে চা দিয়ে যায় ওদেরকে। হোসনেয়ারা একটা বাটি হাতে রান্নাঘর থেকে ডাইনিংয়ে আসলো। সায়রকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
– তোর জন্য ক্ষীর বানিয়েছি। দেখতো কেমন।
ফোন সরিয়ে, একটা হাসির সাথে খাওয়া শুরু করে সায়র। রোশনী গুটিগুটি পায়ে এগোচ্ছিল। এরইমাঝে তনয়া এসে ওকে আটকায়। ওর হাতে একটা ট্রে ধরিয়ে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
– এটা তুমি গিয়ে দিয়ে আসো ওকে! যাও!
– কেন মামী? আমি কেন সার্ভ করবো বাবুমশাইকে? সে আজ আমার ঘুড়ি কেটেছে! এই হুসনতগর কেন, হোস্টেলেও কেউ আমার ঘুড়ি কাটতে পারতো না। অথচ তোমার ছেলে আসতে না আসতেই আমার ঘুড়ি কেটে দিলো! আর সেই আমিই ওকে লাচ্ছি সার্ভ করব? কদাপি না!
কাটকাট জবাব দিয়েছিল রোশনী। তনয়ার কাজে মনেমনে খুশি হলেও মুখে তা প্রকাশ করলো না। নিজেকে সামলে ট্রে টা তনয়ার হাতে ফেরত দিলো ও। তনয়া পেরে না উঠে মাথা নাড়লো। একটা দম ফেলে নিজেই গিয়ে গ্লাসটা সায়রকে এগিয়ে দিলো। এরইমাঝে সুলতানা বেগম এসে ডাইনিংয়ে বসলেন। মৌটুসী, আনিকাও আসলো। কবির রেহনেওয়াজ চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন,
– বিদেশে তো রয়েল'স প্রতিষ্ঠিত। তোমার এখন দেশীয় এস্টেটগুলো দেখেশুনে নিজের দায়িত্ব বুঝে নেওয়া উচিত সায়র। 
– ছেলেটা কাল আসলো। আজই তোর ওকে কাজে তুলে দিতে হবে ভাইজান?
– দায়িত্ব বুঝে নিতেই এসেছি ফুপুমনি। 
সায়র হোসনেয়ারাকে থামিয়ে দেয়। আর ওর জবাবে নয়ন শক্ত চোখে চেয়ে রয়। সেটা আরকারো চোখে না পরলেও হানিফা বেগমের চোখে পরে। নিজের ছেলের দিকে তাকালেন তিনি। আলমাসের চেহারায় নয়নের মতো রাগ, জেদ কিছুই নেই। রেহনেওয়াজ পরিবারের সম্পত্তির হকদার তো সেও। এ বিশাল রাজত্বে তার ছেলেরও পাওনা আছে। এতোগুলো বছর হলো আলমাস কবির রেহনেওয়াজের সাথে রয়েলসের হিসাবপত্র দেখাশোনা করেছে। সায়র তো বিদেশ ছিল। দেশের কতোটুকোই বা করতে পেরেছে ও? কবির রেহনেওয়াজ পুনরায় বললেন,
– কোথথেকে শুরু করবে?
– দুটো আবাসিক, একটা হোটেল, একটা শপিং কমপ্লেক্স; মানে এক রাজধানীতেই রয়েলসের চারটে ঘাটি। আগে ওদিকটা দেখে আসি, তারপর বাদবাকিগুলো দেখা যাবে। 
– কবে যাচ্ছিস তাহলে রাজধানীতে?
আলমাসের প্রশ্নে দু সেকেন্ড সময় নেয় সায়র। মৌটুসী সে সময়টা আলমাসের দিকে তাকিয়ে রইল। হানিফা বেগমের মতো ওরও ইচ্ছে করে, স্বামীকে রেহনেওয়াজের সম্পত্তির অধিপতি হিসেবে দেখতে। কিন্তু আলমাসের সেদিকে বিন্দুমাত্রও ভ্রূক্ষেপ নেই। এরইমাঝে সায়র কি ভেবে বলে ওঠে,
– কালই।
রোশনীর মন নিমিষেই খারাপ হয়ে যায়। কিছুটা অবাক চোখে সায়রের দিকে তাকালো সবাই। সে ক্ষীর খাওয়ায় মনোযোগী। পরপরই সবাই তাকালো সুলতানা বেগমের দিকে। তিনি আস্তেকরে মাথা নেড়ে বুঝালেন, সায়র যা চাইছে, যেভাবে চাইছে, তাই করুক। খুশিমনে চাইলেন নাতির দিকে। এ পরিবারের কেউ কোনোদিনও ভাবেনি, বাবা-মাকে হারিয়ে পাথর হয়ে বিদেশ পাড়ি দেওয়া ছেলেটা কোনোদিন এতো বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ত্ব নিয়ে ফিরবে। বিদেশে থাকতেও সবদিক মাথায় ছিলো তার। সুলতানা বেগমের গর্ববোধ হলো। সায়র যেখানে, যেভাবেই বড় হয়ে থাক না কেন, ওর মানুষ হওয়ায় খুঁত নেই। বাবা, দাদাজানের একদম সঠিক মিশ্রণ সে। রেহনেওয়াজ-রয়েলসের সুযোগ্য উত্তরাধিকার, সায়র রেহনেওয়াজ। 
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন