ফন্ট সাইজ:
থিম:
ইশ্কনামাহ

৪র্থ পর্ব

লেখক: মিথিলা মাশরেকা

#ইশ্কনামাহ্ 

লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা  
৪.
রাস্তার উচু ধারটায় বসে রিদম মোবাইল ঘাটছে, আর শেউতি একাডেমির গেটে ওর বাইকে বসে মনের সুখে চকলেট খাচ্ছে। ও ক্লাস শেষ করে বাইরে এসেছে দশমিনিট হলো। যদিও তার ক্লাস শেষে স্রোতের কাছে যাওয়ার কথা। কিন্তু চকলেটের কথা বলে রিদম ওকে বাইরে আসতে বলেছে। যাতে ওকে দেখার অযুহাতে রিদম থেকে যেতে পারে। রিদমের গানের ক্লাস, আনুসাঙ্গিক কাজ শেষ হয়ে গেছে আরো আধঘন্টা আগে। এতোক্ষণ বসে থাকার দরুণ বিরক্ত হয়ে উঠে দাড়ালো ও। মোবাইল পকেটে পুরে, বাইকের আয়না ওপরতলার জানালার দিকে বাকিয়ে উঁকিঝুঁকি দিয়ে কিছু একটা দেখার চেষ্টা চালালো। কিন্তু তেমন কিছু না পেয়ে শেউতিকে বলল,
– তোর মনির আজকে 3-B তে লাস্ট ক্লাস না?
- হু। কিন্তু আমি আসার সময় মনিকে গ্রাউন্ড ফ্লোরে 1-C তে দেখেছি।
শেউতি চকলেট খেতে খেতে জবাব দেয়। অবাক হয় রিদম। নিজেরটা না জানলেও, স্রোতের ক্লাসরুটিন ওর মুখস্ত। এখন স্রোতের তিনতলাতেই ক্লাস নেওয়ার কথা। রাগারাগি করবে বলে ও আর ওপরতলায় যায়নি। অথচ স্রোত নাকি নিচতলায়। কি ভেবে শেউতির জুতোর ফিতা খুলল রিদম। তারপর সেটা বাইকের নিচদিকের কোনো একঅংশে গিট দিয়ে বলল,
– তুই এখানেই বস। আমি দেখি তোর মনিকে নিয়ে আসি।
শেউতি কানেই তুলল না ওর কথা। নাইবা জুতোর ফিতা নিয়ে প্রতিক্রিয়া করলো। রিদম ওকে ভরসা না করলেও, ও অনেক সৎ একটা মেয়ে। ওকে বেধে না গেলেও একচুলও নড়তো না ও। যেহেতু ওকে এখন চকলেট দেওয়া হয়েছে। রিদম সবে গেট দিয়ে একাডেমিতে ঢুকবে, ঠিক তখনই স্রোত বাইরে বেরিয়ে আসে। একপলক রিদমকে দেখে সোজা গিয়ে শেউতির সামনে দাড়ায়। শক্তকন্ঠে বলে,
– তোকে ক্লাসশেষে আমার ওখানে যেতে বলেছিলাম না?
– কিন্তু রিদম মামা তো চকলেট কিনে দিলো। আমাকে বাইকের সাথে বেধেও রেখেছে দেখো!
কপাল চাপড়ালো রিদম। ওর জীবনের অর্ধেক সুখ, শেউতি ওর কোনো না কোনোভাবে উপকার করবে। বাকি অর্ধেক কষ্ট, ওই শেউতিই পরের সেকেন্ডে ওর সে সুখ ধূলিসাৎ করে দেবে। স্রোত শীতলচোখে চাইতেই ফোকলা একটা হাসি দিয়ে শেউতির দিকে এগোলো রিদম। ওর জুতোর ফিতে বাইক থেকে খুলে দিয়ে, ওকে নামাতে নামাতে বলল,
– ইয়ে, আমার তাড়া আছে স্রোত। তোরা খালা-ভাগ্নি রিকশা করে বাসায় চলে যা কেমন? আমি আসি রে।
স্রোত জবাব দিলো না। তবুও রিদম বুঝলো, ভেতরে-ভেতরে প্রচুর রাগ হচ্ছে ওর। স্রোতকে আরেকটু স্বাভাবিক করতে ফোন বের করে একহাতে কানে ধরলো ও। বাইক স্টার্ট দিতে দিতে, জোরেজোরে বলতে শুরু করলো,
– হ্যাঁ? হ্যাঁ জান! আসছি আমি! এইত্তো বেরিয়ে গেছি একাডেমি থেকে! হ্যাঁ জান? না না! তোমার জন্য বেরোচ্ছি! আজ কোনো প্রোগ্রাম নেই আমার! আমি বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়েই তোমার সাথে দেখা করতে বেরোচ্ছি ওকে? ওকে জান! ওকে টাটা! লাভ ইউ টু!
রিদম কান থেকে ফোন নামায়। তারপর শেউতি, স্রোত উভয়কে বাই বলে দ্রুততার সাথে চলে যায় ওখান থেকে। একটা শ্বাস ফেলে স্রোত রিকশা ডাক লাগাতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই একটা জমকালো প্রাইভেট কার মৃদুবেগে এসে ওর সামনে থামে। না চাইতেও স্রোত চকিত হয় হলো৷ ব্যাকসিটে বসা ব্যক্তিটি গাড়ির দরজা খুলে দিলো। শান্ত ভঙিতে বলল,
– উঠে এসো। কথা আছে তোমার সাথে। 
কিছু বিষয় থেকে আমরা যতো পালাতে চাই, সেগুলো ততোবেশি তাড়া করে আমাদের। তাই এই তাড়া নিয়ে বাঁচার চেয়ে সেগুলোর মুখোমুখি হওয়া ভালো। স্রোতও এমনটাই মনোস্থির করে নেয়। কথা না বাড়িয়ে একহাতে কাধের ব্যাগটা টেনে, আরেকহাতে শেউতির হাত ধরলো ও। তারপর গাড়ির ব্যাকসিটে চড়ে বসলো চুপচাপ।
•
সন্ধ্যের আবছা আধারে রেহনেওয়াজ মহল। ঘরে পাতা আকৃতির হলুদাভ বাতিটা জ্বলছে। রোশনী পালঙ্কে বসে উলের কুশন বুনছে। ওর পাশে বসা সুলতানা বেগম তসবি পড়ছেন আর রোশনীকে দেখছেন। ফর্সা গরনের এই মেয়েটার সবটাই হোসনেয়ারার মতো। মনটাও তার মায়ের মতোই নরম, নির্ভেজাল। যতোটুকো সময় ও এ বাড়িতে থাকে, মায়ের মতোই চেষ্টা করে নানির বাড়ির সবাইকে মানিয়ে গুছিয়ে চলার। রোশনী কুশন বুনতে মনোযোগী থেকেই বলল,
– কি ব্যাপার নানীজান? এতো মনোযোগ দিয়ে কি দেখছ? 
– ভাবতেছি আমার রোশনীটা এতো ভালো ক্যান? এ যুগেও এমন গুণী মাইয়া হয় নাকি? 
রোশনী মুচকি হাসে। পরপরই গলা ঝেরে বলে,
– দেখো দেখো! এমন গুণী মেয়েকে আবার চিরতরে নিজের কাছে রেখে দেওয়ার চিন্তাভাবনা কোরো না। আমি কিন্তু তোমার ওই কাড়িকাড়ি গয়নার লোভে পরে থেকে যেতে রাজি হচ্ছি না! 
– আমার কাছে গয়নার চাইতেও আরো লোভনীয় জিনিস আছে রোশনী। তুই তো বাস্তবে না দেইখাই তার মাঝে ডুইবা আছোস। সামনাসামনি দেখলেপরে লোভ সামলাইতে পারবি তো?
সুলতানা বেগমের টিপ্পনীতে রোশনীর গাল লাল হয়ে ওঠে। হেসে ফেললেন সুলতানা বেগম। বিদেশ যাওয়ার পর থেকে শুরু করে এখনো অবদি, এ তেরো বছরে রোশনী একবারের জন্যও সায়রের মুখোমুখি হয়নি। সায়র বারতিনেক খুবই স্বল্প সময়ের জন্য দেশে এসেছিল। কিন্তু তখনো পড়াশোনাসহ নানান অযুহাতে ও হুসনতগর আসে নি। অথচ সুলতানা বেগম জানেন, এই মেয়ে আজীবন ঠিকই সায়রের অপেক্ষা করে গেছে। রেহনেওয়াজ পরিবারের বউদের বাইরে কাজ করে মানুষের সেবা করার অনুমতি নেই। একারণে রোশনী নার্স হয়ে কখনো কোথাও ছিল না। তবে হুসনতগরের যে কেউ কাটাছেড়া নিয়ে রেহনেওয়াজ মহলে আসলে ও ঠিকি নিজের দায় পালন করে। আর এতে অনুমতি কম, আদেশ বেশি ছিলো। আর সেটাও স্বয়ং সুলতানা বেগমের। 
দরজায় আওয়াজ শুনে রোশনী স্বাভাবিক হয়। 'আসো' বলে অনুমতি দিলেন সুলতানা বেগম। আলেয়া মাথার ওড়না ঠিকঠাক করতে করতে ভেতরে ঢুকল। হাপাতে হাঁপাতে, অস্থিরচিত্ত্বে বলল,
– ছোটবাবা হুসনতগর আইয়া পরছে আম্মা!
হুড়মুড়িয়ে বিছানা থেকে নেমে দাড়ায় রোশনী। পালঙ্কের কোনে থাকা হাতলে দুহাতে আঁকড়ে ধরে, অবিশ্বাসী চোখে চেয়ে রয় আলেয়ার দিকে। একই অবিশ্বাস, বিস্ময় সুলতানা বেগমের চোখেও। তিনি বলে উঠলেন,
– কি কইতাছো? সায়র হুসনতগর পৌছাইছে? এহন?
– জ্ জ্বী আম্মা! আ্ আপনে জলদি নিচে চলেন!
– কিন্তু ওর তো কাল আওনের কথা!
সুলতানা বেগম এটুকো বলে আর দেরি করলেন না। হাতের লাঠিটা নিয়ে হাটা লাগালেন তিনি। আলেয়া তাকে ধরে বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে। এদিকে রোশনী যেন দিশেহারা হয়ে যায়। অবুঝের মতো ডানেবামে তাকালো ও। মনটা বড্ড দ্বিমুখী আচরন করছে। একবার বলছে, সায়র থেকে পালা! আরেকবার বলছে, চল সায়রের বুকে হুমড়ে পর! অথচ এই দুইয়ের কোনোটাই ওর পক্ষে করা সম্ভব না। কম্পিত পায়ে করিডোর অবদি আসলো রোশনী। রেলিং ধরে নিচতলায় তাকালো। কালো প্যান্টে ইন করা সাদা শার্ট পরিহিত সে সুউচ্চ মানব আদতেই ছিল সবার আগে চোখে পরার মতো। আর এই মানবকে ও তেরো বছর পর চোখের সামনে দেখছিল। রোশনীর বুকের ভেতরের সব অভিযোগেরা যেন একসাথে জমাট বেধে যায়। চোখ ভরে উঠে। আস্তেধীরে একহাতে পিলার আঁকড়ে ধরে, তাতে মাথা ঠেকালো ও। দীর্ঘ অপেক্ষার পরিণয়কে চোখের সামনে দেখার সুখ ক্রমশ ওর অভিযোগকে গলিয়ে দিতে থাকে। সায়র সুলতানা বেগমের ডানহাত ধরে চুমু দিয়ে তা দু চোখে ছোঁয়ালো। দুহাতে তার হাত মুঠো করে নিয়ে বলল,
– কেমন আছো দাদীজান?
জবাব না দিয়ে সুলতানা বেগম নাতির বুকে ঝাপিয়ে পরলেন। দুহাতে তাকে আগলে নিয়ে আশপাশে তাকালো সায়র। হানিফা বেগমের দিকে চোখ পরতেই বলল,
– কেমন আছেন ফুপুআম্মা?
– ভালো। তুই কেমন আছিস?
সায়র মৃদ্যু হেসে ঘাড় দুলালো। পাশেই তনয়া, হোসনেয়ারা দাড়ানো ছিল। সায়র সুলতানা বেগমকে জড়িয়ে রেখেই বলল,
– তোমরা কেমন আছো ছোটমা? ফুপুমনি?
ছোটের কোণের জল মুছে মাথা দুলায় হোসনেয়ারা। হাসিমুখে কুশল বুঝায় তনয়াও। সুলতানা বেগম এবারে সায়রের বুক থেকে মুখ তুললেন। চোখ মুছতে মুছতে বললেন,
– কাল আসার কথা ছিল তোর। 
– একটু বেশিই মিস করছিলাম তোমাকে। তাই আজই চলে এসেছি।
সুলতানা বেগম লাঠির হাতল দিয়ে খোঁচা লাগালেন সায়রের পেটে। সায়র হেসে ফেলল। তারপর তনয়া বেগমকে বললো,
– চাচাজান কোথায় ছোটমা?
– সে একটু গন্জে গেছে। কল করেছি। এক্ষুনি চলে আসবে।
– আলমাস কোথায় ফুপুআম্মা? 
– আমরা এ বাড়িতেই আছি সায়র। কোথায় যাবো বলো? আমাদের তো আর যাওয়ার জায়গা নেই তাইনা?
প্রশ্নটা হানিফা বেগমকে করলেও জবাবটা সায়র মৌটুসীর থেকে পেয়েছিল। ওর কথায় অপ্রসন্ন হয় হানিফা বেগম বাদে বাকিসব। ব্যস প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তন হয়না সায়রের। ও ঠোটের হাসিটা বহাল রেখে বলল,
– জায়গা এমনিএমনি হয় না ভাবী। জায়গা করে নিতে হয়। 
সায়রের জবাব পছন্দ হয়না মৌটুসীর। তবুও জোর করে ঠোঁটের হাসিটা বহাল রাখে ও। এরইমাঝে পুরুষকন্ঠে শোনা যায়,
– সবার কথা জিজ্ঞেস করলে, আমাদের খোঁজ করলে না সায়র ভাইয়া?
সায়র পাশে তাকায়। সিড়ির পাশে হানিফার মেয়ে আনিকা আর তনয়ার একমাত্র ছেলে নয়ন দাড়ানো। দুজনেই অদ্ভুতভাবে হাসছে। সায়র বর্ধিত হেসে বলল,
– তেরোবছরে তোরা কখনো আমার খোঁজ করেছিস?
আনিকা, নয়নের চেহারার হাসিটা গায়ব হয়ে যায়। সায়রের সাথে ছেলের এমন কথার ভঙিমা তনয়া বেগমের নিজেরও পছন্দ না। তিনি আর তার স্বামী, দুজনে মিলে অনেক বুঝিয়েছেন নয়নকে। কিন্তু সে হয়েছে একগুঁয়ে। নিজে যা বুঝবে, তাই। সায়র সুলতানা বেগমকে বলল,
– তো ম্যাডাম, অনুমতি দিন? আমি ঘরে যাই?
– তুমি কিছু ভুলে যাচ্ছো না সায়র?
ফট করে বলে উঠলেন তনয়া বেগম। হানিফা বেগম, মৌটুসী, আনিকা, নয়ন বিদ্রুপ করে নিশব্দে হাসলো। আর সায়র না বুঝে তাকিয়ে রইলো তনয়া বেগমের দিকে। তিনি নোয়ানো স্বরে পুনরায় বললেন,
– কিছু ভুলে যাচ্ছো না?
– কিসের কথা বলছো ছোটমা?
সায়রের উল্টো প্রশ্নে থেমে গেলেন তনয়া বেগম। একপলক ওপরতলায় পিলারের পাশে দাড়ানো রোশনীর দিকে তাকালেন তিনি। রোশনী মাথা নেড়ে তাকে কিছু বলতে না করছে সে। সুলতানা বেগম সবে কিছু বলতে উদ্যত হবেন, হোসনেয়ারা বলে উঠলেন,
– কিছুনা সায়র। তুই ঘরে যা। বিশ্রামের দরকার তোর। আমি শরবত করে পাঠাচ্ছি।
মাথা নেড়ে সম্মতি বোঝালো সায়র। হানিফা বেগম মৌটুসীকে নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন। আলেয়া আর হোসনেয়ারা চলে যায় রান্নাঘরে। সোফায় বসে মোবাইলে মত্ত্ব রইলো আনিকা, নয়ন। শার্টের হাতা ঠিক করতে করতে সায়র পা বাড়ায় ওপরতলায়। ওর পেছনপেছন ট্রলি নিয়ে এগোয় দুজন বেয়ারা। নিজের ঘরে ঢুকে সায়র আগে আশপাশ তাকিয়ে দেখলো। শুরু থেকেই রেহনেওয়াজ পরিবারের সবকিছুতে আভিজাত্য। খালি পরে থাকা সত্ত্বেও এ ঘরের কিচ্ছুটি বদলায়নি। ও যেভাবে ছেড়েছিল, সেভাবেই ঘরটা সাজিয়ে রাখা। ছোট্ট করে হেসে এবার কাবার্ডের দিকে এগিয়ে গেল ও। টিশার্ট, ট্রাউজার বের করে ওয়াশরুমের দিকে এগোচ্ছিল, ম্যাসেজ টোন শুনে সেগুলো আবারো বিছানায় রাখল সায়র। ফোন হাতে নিয়ে ম্যাসেজ চেক করতে লাগলো। এরইমাঝে দরজায় আঙুল টোকানোর কানে আসে ওর। সায়র দৃষ্টি, মনোযোগ উভয়ই মোবাইলে রেখে বলল,
– ইয়েস?
– শরবত।
– টেবিলে রেখে যান।
চোখজোড়া আরেকদফায় ছলছল করে ওঠে রোশনীর। আসার পর সায়র একবারের জন্যও ওর কথা বললো না। এখন ও যখন নিজে সায়রের ঘরে এসেছে, সে একটাবার চোখ তুলে তাকালোও না ওর দিকে। রোশনী ঘরে ঢোকে। টেবিলের ওপর শরবতের গ্লাস রেখে চেয়ে রয় সায়রের দিকে। হৃদয়ে থাকা প্রেমটাকে একটু দমিয়ে রাখতে ও সায়রের সামনাসামনি হতো না। এমনকি তার ছবি অবদি দেখতো না। সে হিসেবে সায়রকে ও তেরো বছর পর দেখছে। আর এতোগুলো বছরের ব্যবধানে সে আরোবেশি অপূর্ব মানব হয়ে ফিরেছে। তেরো বছর আগে দেশ ছেড়ে যাওয়া ওর চেনাজানা সায়র আজ গরন, উচ্চতা, বলিষ্ঠ দেহ, এলোমেলো চুল সবের সমন্বয়ে যেকোনো নারীর স্বপ্নের পুরুষ হবার যোগ্যতা রাখে। রোশনী নিজের দৃষ্টিকে সংবরণের চেষ্টা করে একবার অন্যদিক ফিরল। কিন্তু ওর চোখ হয়তো বাধ মানলো না। পুনরায় সায়রের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
– কেমন আছিস?
কন্ঠ শুনে মনোযোগ কেটে যায় সায়রের। পেছন ফিরে রোশনীকে দেখে মুহুর্ত দুইয়ের জন্য থেমে রয় ও। ভ্রু জোড়া কুচকে বলল,
– Excuse me? আপনি কে?
রোশনীর গালজোড়া অভিমানে ফুলে ওঠে। মায়ের পর ও যাকে সবচেয়ে আপন মেনেছে, তার কাছে অপরিচিত হয়ে ওঠার একরাশ অভিযোগ নিয়ে ও চেয়ে রয় সায়রের দিকে। যদিও ওর অপরিচিত হওয়ার কারণ ও নিজেই তৈরী করে দিয়েছে। তবুও! একটুখানি সময় নিয়ে সামনের মুখশ্রী মনে করার চেষ্টা করলো সায়র। রোশনীর নিরবতা, চোখের অভিমান লক্ষ্য করে কিছুটা সন্দিহান স্বরে বলল,
– রোশনী?
মুহুর্তেই ঝলমলিয়ে ওঠে রোশনীর চোখমুখ। সায়রের এই একটা ডাক যেন ওর কয়েকজনমের তৃষ্ণা মিটিয়েছে। সায়র বুঝে গেল, ওর অনুমান সঠিক। মোবাইল বিছানায় ছুড়ে হাসলো ও। ড্রেসিংটেবিলের সামনে গিয়ে হাতের ঘড়ি খুলতে খুলতে বলল,
– ইয়ার! কতো বড় হয়ে গেছিস তুই! চিনতেই পারিনি! 
– মনে আছে তোর আমার কথা?
সায়রের হাত থামে। আয়নার ভেতরে রোশনীর প্রতিবিম্বের দিকে একপলক তাকালো ও। মৃদ্যু হেসে, পুনরায় নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে বলল,
– তুই যোগাযোগ না করলেও তোর খবর আমার কাছে ঠিকই পৌছেছে ডিয়ার ফুপাতো বোন। কয়েকমাস আগেই তো দাদীজান বলল, তোর নাকি নার্সিং শেষ। 
– আমি এতোবছর কেন তোর সাথে যোগাযোগ করিনি, জানতে ইচ্ছে করেনি তোর সায়র?
রোশনী এগিয়ে এসে কাবার্ড ধরে দাড়ায়। সেখানে মাথা ঠেকিয়ে চেয়ে রয় ব্যস্ত মানুষটার দিকে। কল্পনা করে, সে যদি জানতো, রোশনী দুরুত্বের অভিমানে তার সাথে যোগাযোগ করেনি, তাহলে কি সে সব পড়াশোনা, ব্যবসা-বানিজ্য ছেড়েছুড়ে ওর কাছে চলে আসতো? যদি জানে যোগাযোগ না করলেও এতোগুলো দিন রোশনী কেবল তারই অপেক্ষা করেছে, তাহলে কি সে অপেক্ষার আগে আগে ইতি ঘটাতো? যদি জানে, তার প্রতি রোশনীর কতোশতো অভিযোগ, তবে কি সে ওকে আগলে নিয়ে সে অভিযোগ মেটাতো? সায়র বিছানা থেকে জামাকাপড় হাতে নিলো। তারপর রোশনীর দিক ফিরে বলল,
– বুঝেছিলাম তুই পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। তাই আর বাড়াইনি। তাছাড়া আমি নিজেও পড়াশোনা আর রয়েলস নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। এনিওয়েজ! পুরোনো কথা ছাড়! এখন কি খবর তোর? 
– আমার আর খবর! চলছে একরকম!
– ফ্রেশ হয়ে এসে কথা বলি। 
রোশনী মাথা দুলায়। সায়র ওয়াশরুমের দিকে হাটা লাগাচ্ছিল। গোছানোর উদ্দেশ্যে রোশনী সবে ওর ট্রলিতে হাত দিতে যাবে, কানে আসে,
– ওগুলো থাক। আমি নিজেরটা নিজে করতে জানি। 
রোশনী থামে। ওর মনে পরে যায়, সায়র বরাবরই নিজেরটা নিজে করতে পছন্দ করে। তাই ট্রলি ছেড়ে সরে আসলো ও। বেডসাইড ড্রয়ারটা বরাবর সায়রের একটা ছবির ফ্রেম। তার কাচে এবার রোশনীর প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হয়। কপালের সামনের চুলে আঙুল গুজে, মাথা নিচু করে তোলা ছবিটা সায়রের কিশোর বয়সের। একটু ভাবওয়ালা, একটু স্টাইলিস্ট ছেলেটা তখনও যতটা সুদর্শন ছিল, এখনো তার ভাব একইরকম। রোশনী আরো এগিয়ে আসে। মেঝেতে বসে, আরো ভালোমতোন ছবিটা দেখে নিয়ে বলে,
– জনাব Same to same-ই আছে। খুবএকটা পরিবর্তন হয়নি। ব্যস কাঁধটা একটু চওড়া হয়েছে, এই যা।
– নার্স তুই। দর্জি না। চোখ দিয়ে আমার কাঁধের মাপজোখ দেওয়া বন্ধ কর। 
সায়রের গলা শুনতেই রোশনীর কান গরম হয়ে যায়। তৎক্ষনাৎ পেছন ফিরলো ও। অথচ সায়র নিস্প্রভ। তোয়ালে নিয়ে আবারো ওয়াশরুমের দিকে রওনা হয়েছে সে লোক। তার ভঙ্গিমা গুরুত্বহীন, ভ্রুক্ষেপহীন। 
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন