ফন্ট সাইজ:
থিম:
স্বরলিপিতে তুমি

১ম পর্ব

লেখক: জাবিন ফোরকান

পিনপতন নীরবতা।

বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের দর্শক ধারণ ক্ষমতা প্রায় ৩৬ হাজার। তবুও কোথাও তিল ধারণটুকুরও জায়গা অবশিষ্ট নেই। অথচ রাত্রির মায়াজালে ঘেরা জায়গাজুড়ে বিচরণ করা হাজার হাজার মানুষের মাঝেও বিন্দুমাত্র ধ্বনির অস্তিত্ব নেই। তাদের সমস্ত অস্তিত্বই যেন বিলীন মাইক্রোফোনে প্রতিধ্বনিত হয়ে চলা ঐন্দ্রজালিক এক কণ্ঠের মাঝে।

- আমাদের জীবনটা বড়ই নাটকীয় তাইনা? যেন সুনিপুণ চিন্তায় গড়া একেকটি প্লট, এবং মোড়ে মোড়ে প্লট টুইস্ট। এই জীবনজুড়ে হঠাৎ করে এমন সব মানুষের আগমন ঘটে, যাদের অস্তিত্ব আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায় সুখসাগরের সীমানায়। ঠিক যে মুহূর্তে ভাবি, বুঝি সবটা হাসিল করে ফেললাম, তখনি বৈশাখের মেলায় কেনার জন্য বায়না ধরা হাওয়াই মিঠাইয়ের মতই উবে যায় তাদের অস্তিত্ব। যেন কোনোকালে সেখানে ছিলো না সে, অথচ তার রেশ রয়ে যায় গোটা জীবনজুড়ে........

কণ্ঠটি সুমধুর। তার কথার ভাঁজজুড়ে যেন সুরের বিচরণ। সুধার মতন। একবার শুনলে অন্তর সম্মোহিত হয়ে পড়ে, শুনতে ইচ্ছা হয় বারংবার। তাইতো শব্দরা আজ পরাজিত হয়েছে বিরাট কনসার্টের দর্শকসারিতে। হাজার হাজার অস্তিত্ব মগ্ন ওই একটি মানুষের বাচনভঙ্গির মায়ায়। গোটা স্টেডিয়ামকে এমন নিশ্চুপতায় ঢেকে ফেলার ক্ষমতা খুব কম শিল্পীরই রয়েছে। তার মধ্যে..... সেও একজন।

দ্যা ডুম—

নিরাপত্তা বাহিনীর দল সাদা পোশাকে দর্শকদের মাঝে এবং আশেপাশে অবস্থান করছে। অদূর থেকে ভেসে আসছে স্টেডিয়ামের পাশের সড়কপথের যানবাহনের শব্দগুচ্ছ। ইতিউতি ঘোরাফেরা করছে ড্রোন ক্যামেরার দল। স্টেডিয়ামের মাঝ বরাবর স্থাপিত বিশাল স্টেজে নীলচে আলোর খেলা। বিশাল এল ই ডি স্ক্রিনে নজরে আসছে গোটা দৃশ্য ভালোভাবেই।

ড্রামসেটের আড়ালে ড্রামারকে রীতিমত চোখেই পড়ছে না। একপাশে সেক্সোফোন, অপরদিকে পিয়ানো এবং প্যাড। গোটা ব্যান্ড ব্যস্ত তাদের সুরেলা ধারা বিলিয়ে দিতে। এত এত আয়োজন, অথচ সকলের দৃষ্টি আঁকড়ে রেখেছে ওই একটিমাত্র মানুষই, জাদুকরী যার অনন্য কন্ঠস্বর। স্টেজের মাঝ বরাবর দন্ডায়মান সুঠাম অবয়বটি, অঙ্গে জড়ানো কালো ট্যাঙ্ক টপ এবং কার্গো জিন্স। নীলচে আভার মাঝে তার পেশীবহুল বাহু এবং ঘাড়ের কাছে ঘামের ফোঁটা চিকচিক করছে। কালো বাদামীর মিশেলে কেশরাশি লেপ্টে রয়েছে কপালজুড়ে। কিছুক্ষণ আগে র*ক্ত গরম করা পারফরম্যান্সের ফল। কাঁধে ঝোলানো টকটকে লাল ইলেকট্রিক গিটার, মুখে সংযুক্ত মাইক্রোফোন। মারবেলের মতন জ্বলজ্বলে নয়ন মেলে সে চেয়ে আছে দর্শকসারির উদ্দেশ্যে।

- শেষ গানটি, আমাদের জীবনের সেই সকল মানুষগুলোর জন্য,যারা হয়ত আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু রেখে গিয়েছে তাদের প্রেরণা - ভালোবাসা এই অন্তরজুড়ে....

নিজের বুকের বাম পাশে নির্দেশ করলো সে, হাসলো সামান্য। গোটা স্টেডিয়াম মুগ্ধ চেয়ে রইলো, প্রাণভরে লক্ষ্য করলো তার প্রতিটি ক্রিয়া। তারপরই ঐন্দ্রজালিক নীরবতা ভেদ করে বেজে উঠলো পিয়ানোর মন মাতানো সুর, যাতে যোগদান করলো বেস গিটারের ধ্বনি। সে এক হৃদয়কাড়া অনুভব। যাতে যোগদান করলো জাদুকর স্বয়ং, তেজস্বী - স্মিত কর্কশ কন্ঠজুড়ে খেলে গেলো শব্দ - সুরের মায়াজাল।

“— তোমার মাঝে দেখেছি শুধুই

চাওয়া না পাওয়ার ঝলক

আমার একলা মনের হারিয়ে ফেলা

একটি ঝরা পালক —”

কণ্ঠটি ভীষণ শক্তিশালী, যাতে রক মিউজিকই বি*স্ফোরিত হয়ে অভ্যস্থ। অথচ এই শীতল সঙ্গীতের পরতে পরতে সেই কন্ঠ যেন বিলিয়ে যাচ্ছে অসীম অনুভূতি। স্টেডিয়ামের প্রত্যেকের হাতে হাতে জ্বলে উঠলো ফ্ল্যাশলাইট। মুহূর্তমাঝে গোটা দর্শকসারি পরিণত হলো এক আকাশে, যাতে প্রজ্জ্বলিত অগুনতি নক্ষত্রের মেলা। মায়াবী এই রাত্রি, আরোও মায়াবী তার গীতধ্বনি। কন্ঠস্বর এবার বাজনার সঙ্গে সঙ্গে চড়া হলো, ড্রামারের হাতের স্টিকের ক্রমাগত তালের সঙ্গে সঙ্গত করলো।

“— চাঁদের ছায়ায় অলীক মায়ায়

দুলছে তারা দুলুক

গন্তব্যহীন এই যাচ্ছে জীবন

থামলে থামার থামুক —”

এবার যোগদান করলো হাজার হাজার মানুষের উৎফুল্ল ধ্বনি, সমুদ্রের ঢেউয়ের মতন, আজ সবকিছু মিলেমিশে একাকার, এক নিশ্চুপতার গর্জন। তুঙ্গে উঠলো সুর, কাঁপলো ভূমি, জোরালো সম্মিলিত আবাহনে,

“—তুমি~ আমি~ উন্মাদনার ঝোঁক~

~নোলক~

ছন্নছাড়া আমি

আমার স্বরলিপিতে তুমি—”

এ যেন সাক্ষাৎ এক স্বর্গদৃশ্য। সুরের নেশায় মাতোয়ারা শব্দধারা বাঁধ ভেঙেছে সকল অনুভূতির। স্টেডিয়ামের বাইরে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা বাহনগুলোর মানুষ, হেঁটে চলা পথচারীসকলও বারে বারে ফিরে ফিরে তাকালো। আকাশজুড়ে মনোরম আতশবাজি, সঙ্গে হাজারো কন্ঠে সুধার ভেলা। জ্বলজ্বলে অ্যাডভারটাইজমেন্ট বোর্ডটি স্পষ্ট নজরে আসছে,

“ দ্যা ডুম — শেহবাগ দোহা ”

সত্যিকার অর্থেই পৃথিবীখ্যাত শেহবাগ দোহা স্বয়ং এই আয়োজনের কারিগর, বর্তমানে তা স্পষ্ট।

⁠º⁠ ⁠

º

º⁠ ⁠

স্টেডিয়ামের বহির্গমন পথ আজ লোকে লোকারণ্য। কোথাও যেন তিল ধারণের ঠাঁইটুকুও নেই। ইলেক্ট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য সবচেয়ে বেশি। দেশের এমন কোনো বিনোদন ডেস্ক অবশিষ্ট নেই যার অধীনস্থ কোনো খবর সংগ্রাহক আজ এখানে আসেনি। উপরন্তু উৎসাহী জনগণের ভীড় তো রয়েছেই।বেশ কয়েকজনের হাতে প্ল্যাকার্ড শোভা পাচ্ছে। যাতে গোটা গোটা ভৌতিক অক্ষরে খচিত,

“ দ্যা ডুম —”

কিছুক্ষণ আগেই কনসার্ট শেষ হয়েছে। বর্তমানে সকলে অপেক্ষমাণ তাদের কৌতূহলী এবং উৎসাহী দৃষ্টির প্রশান্তির উদ্দেশ্যে। বাকরুদ্ধ কয়েক মুহূর্ত। তারপরই সকলের অতি অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অপর পাশে দেখা মিললো কাঙ্ক্ষিত সত্তাটির। এক লহমায় হাজারো ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একত্রে জ্বলে উঠলো।

ঘ্যাচাং ঘ্যাচাং!

মুহুর্মুহু। এতটাই চোখ ধাঁধানো ঔজ্জ্বল্য তাতে যে দৃষ্টি মেলে রাখা দায়। রাতের মাঝেও যেন উগ্র দিনের আলো। তবে অপরপ্রান্তের মানুষগুলোর তাতে খুব বেশি সমস্যা হচ্ছেনা। কারণ তারা এসবে অভ্যস্থ। কালো পোশাকধারী বেশ কয়েকজন বলয় তৈরী করে পাশাপাশি চলছে, মধ্যখানে আবদ্ধ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি, যার জন্য অপেক্ষা গোটা দেশের তারুণ্যের। বিশালাকৃতির একটি ঢোলা কালো হুডি পরিধানে, মুখে মাস্ক, চোখে কমলাভ সানগ্লাস। পায়ের ভারী বুটজোড়া তিন ইঞ্চির সোলের হওয়ায় অন্যান্যদের তুলনায় তাকে বেশ লম্বা দেখাচ্ছে। ভীড়ের মাঝে তার অবয়বটি দৃষ্টিগোচরে আসতেই চিৎকারে ফেটে পড়লো চারপাশ।

“ ডুম...দ্যা ডুম!”

“ শেহবাগ দোহা....শেহবাগ দোহা...! ”

সমস্বরে উল্লাসধ্বনি উঠতেই থমকে গেলো দোহা, ক্ষণিকের জন্য। আপনমনে হাসলো। আজ কত বছর বাদে দেশের মানুষগুলোকে এভাবে কাছ থেকে দেখলো? দশ? হবে হয়তো। এতটা উষ্ণভাবে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হবে সে কল্পনাও করেনি। যদিও বা জগতের সামনে সে এক বিখ্যাত অস্তিত্ব বটে, তবে এই দেশে সবকিছু তো আর জগতের নিয়মে চলেনা। দিন পাল্টেছে। মনে মনে ভাবলো সে।

বাইরের পথে পৌঁছানোর আগেই সাংবাদিকদের দল মাছের ঘেরের মতন ঘিরে ধরলো দোহাকে। কলকল কন্ঠে একের পর এক প্রশ্ন, তার মুখ থেকে একটি শব্দও যেন তাদের লাখ টাকার ব্যবসার সমতুল্য। নিরাপত্তা বাহিনীও উৎসাহী জনগণ এবং সাংবাদিকদের সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।

- ডুম....বাংলাদেশে স্বাগতম।

- আপনার এই যাত্রা কেমন ছিলো? নিজের দেশে ফিরে কেমন লাগছে যদি বলতেন।

- আজকের কনসার্ট এবং ফ্যানদের অংশগ্রহণ আপনার কেমন লেগেছে?

- দর্শক আপনার কথা খুব করে শুনতে চায় ডুম। যদি আপনার ফ্যানদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতেন!

একের পর এক প্রশ্নবাণ জর্জরিত করে তুললো দোহাকে। সকলের মিলিত কন্ঠস্বরে প্রশ্ন বুঝে ওঠাও দায়। বাহুতে নিজস্ব ম্যানেজার আর্থারের জোরালো টান অনুভব করলেও দোহা থমকালো, অন্তিম মুহূর্তে একটি মাইক্রোফোন বাগড়ে ধরে মাস্ক নামিয়ে বিড়বিড় করলো,

- আই লাভ বাংলাদেশ। থ্যাংক ইউ ফর হ্যাভিং মি হেয়ার অ্যান্ড থ্যাঙ্কস টু মাই ফ্যানস হু সাপোর্টেড মি দিস মাচ।

এইটুকুই যেন যথেষ্ট ছিলো। উত্তেজনার চিৎকারে উদ্ভাসিত হলো চারপাশ। সকলের হুড়োহুড়িসম অবস্থার মাঝে নিরাপত্তা বাহিনী বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো। এবার আর অবাধ্য হওয়া সম্ভব হলোনা। বের হওয়ার পথে একটি মেয়ের প্ল্যাকার্ডে অটোগ্রাফ দেয়ার পরপরই দোহাকে মার্সিডিজে চেপে বসতে হলো।

রাজধানীর সড়ক বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে গাড়ি। প্যাসেঞ্জার সিটে হেলান দিয়ে নিজের সানগ্লাস এবং হুডির টুপি খুলে নিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললো দোহা। পাশেই তার ম্যানেজার আর্থার বসে আছে, নিজের হাতের আইপ্যাডজুড়ে হাতের আঙ্গুলসমূহ বুলিয়ে কিছু একটা করে চলেছে। দোহা কিছুক্ষণ ছেলেটাকে দেখলো, তারপর দৃষ্টি ফিরিয়ে নিজের ফোন বের করলো। ডাটা অন করতেই ব্যান্ড গ্রুপের মেসেজ ভেসে উঠলো স্ক্রিনে,

গ্যাবি: জাস্ট ওয়াচড ইওর কনসার্ট, ইউ ব্লাস্টেড ম্যান।

লিডার নিকি: ইওর বেঙ্গলি সাউন্ডস এথিরিয়েল, গড!

গ্যাবি: আই হোপ আই ওয়াজ দেয়ার, বিহাইন্ড দ্যা ড্রামস.... :⁠-⁠)

দোহা মুচকি হাসলো, ফিরতি মেসেজে টাইপ করলো,

লি ’ল দোহা: মিস ইউ গাইজ। লাভ ইউ।

লিডার নিকি: টেইক কেয়ার লি ’ল ওয়ান, অ্যান্ড বি ব্যাক সুন।

দোহার ঠোঁটজুড়ে হাসি বিস্তৃত হলো, দ্রুতই আঙুল চালিয়ে আরো কিছু টেক্সট পাঠালো সে। তারপর ফোন বন্ধ করে সিটে হেলান দিয়ে এক তৃপ্তির প্রশ্বাস টানলো।

“ সাইরেনস প্লেয়ার ”— পৃথিবীখ্যাত একটি মিউজিক্যাল ব্যান্ড। তারা নিজেদের রক এবং পপ জনরার সঙ্গীতের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। বর্তমানে বিলবোর্ডের বেশ ভালো কিছু স্থান তাদের গানের দখলে রয়েছে। শেহবাগ দোহা এই ব্যান্ডের লিড ভোকালিস্ট। যে নিজের শক্তিশালী এবং ঐন্দ্রজালিক কন্ঠস্বরের জন্য পরিচিত “দ্যা ডুম” বা বিপর্যয় হিসাবে। এই তকমা ফ্যানদের তরফ থেকেই দেয়া।

নিজের ব্যান্ড বাদে ট্যুরের অভিজ্ঞতা তার নেই বললেই চলে। নানান দেশে, নানান শহরে কনসার্ট সবসময় তারা দলবদ্ধভাবেই করে থাকে। তবে ইদানিংকালে কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। তারা ব্যক্তিগত পর্যায়েও কিছু সঙ্গীত নিয়ে চর্চা আরম্ভ করেছে। সম্প্রতি দোহা নিজের একক সঙ্গীত অ্যালবাম রিলিজের ঘোষণা দিলে সকলের আগ্রহ তুঙ্গে উঠে যায়। তার সর্বপ্রথম প্রকাশিত বাংলা গান, “স্বরলিপিতে তুমি ” দ্রুতই বিভিন্ন মিউজিক্যাল রেকর্ডে জায়গা করে নিতে থাকে। এতটা প্রত্যাশা দোহার ছিলোনা। নিজের সংস্কৃতির প্রতি টান থেকেই ক্ষমতার মধ্যে কিছু একটা করতে চেয়েছিল সে, তবে তার প্রভাব যে এতটা প্রখরভাবে মানুষের উপর পড়বে এবং সকলের মুখে মুখে এই গান ছড়িয়ে যাবে সে প্রভাবশালী একজন সংগীতশিল্পী হয়েও কল্পনা করেনি।এই অপ্রত্যাশিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই রীতিমত ভুলতে বসা মাতৃভূমির কোলে ফিরে আসা দোহার।

মার্সিডিজ গাড়িটি কোনো এক তকতকে পাঁচ তারকা হোটেলের পার্কিং লটের বদলে এসে থামলো সাধারণ রংচটা একটি দোতলা বিল্ডিংয়ের সামনে। গভীর রাত হওয়ায় গোটা অঞ্চল ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু থেকে থেকে অদূর থেকে চৌকিদারের বাঁশির আওয়াজ ভেসে আসছে। সে নির্জনতায় গাড়ি থেকে বাইরে পা রাখলো দোহা। হুডি খুলে ফেলেছে, ঝুলিয়ে নিয়েছে কাঁধে। বাইরে নেমেই সর্বপ্রথম দুবাহু মাথার উপরে টেনে কিছুক্ষণ ম্যাজম্যাজে হয়ে আসা শরীরের মাংসপেশী ঠিকঠাক করলো। তারপর সামনে এগোলো। বিনা কথায় আর্থারও অনুসরণ করলো তাকে, হাতে লেদার ব্যাগ। গাড়িটি মৃদু ইঞ্জিনের গর্জন তুলে প্রস্থান করলো তাদের নামিয়ে দিয়ে।

সরু সিঁড়ি বেয়ে দুজনে উঠে গেলো দুইতলায়। আর্থার নিজের পকেট থেকে চাবি বের করে দোহার হাতে দিলো। পুরানো কাঠের দরজায় ঝোলানো তালায় সেই চাবি ঢুকিয়ে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো তারা। ঢুকেই কাউচের উপর এলিয়ে পড়লো আর্থার। গুঙিয়ে উঠে ভাঙা ভাঙা বাংলায় বিড়বিড় করলো,

- এত ক্লান্ত আমার কোনোদিন লাগেনি। আহ, একটা এসির অভাববোধ করছি। কি গরম!

হাসলো দোহা, পরনের ট্যাঙ্ক টপটি টেনে খুলে চেয়ারে ঝোলানো তোয়ালে তুলে ঘাড়ে জড়ালো।

- তোকে তো বলেছিলামই তুই হোটেলের স্যুইটে থাক। তুই নাছোড়বান্দার মতন আমার সাথে এলি কেনো?

- হ্যাঁ, তোর মতন একটা কোহিনূরকে এই অবহেলার কুঠুরিতে একলা ফেলে রাখি, তাইনা? তারপর রাতে চোর এসে চুরি করে নিয়ে গেলে কি হতো? শুনেছি এই এলাকায় চুরির উৎপাত আছে বেশ।

এবার শব্দ করে হাসলো দোহা, মাথা ঝাঁকিয়ে ভেতরের রুমের লাগেজ থেকে নিজের টি শার্ট এবং ট্রাউজার বের করে নিলো। আর্থার রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ফরমাল প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে তার কাজ দেখলো। তারপর বললো,

- একটা কথা জিজ্ঞেস করি?

- হুম?

- এত জায়গা থাকতে তুই এই বাড়িতেই থাকার জেদ ধরেছিলি কেনো?

থমকালো দোহা, ক্ষণিকের জন্য তার চেহারায় নিদারুণ এক অভিব্যক্তি ফুটলো, যা দ্রুতই স্মিত হাসির মাঝে আড়াল করে নিলো সে। ফিরে তাকালো, আর্থারের দিকে চেয়ে বিড়বিড় করলো,

- বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে আমি এই ঘরটিকেই নিজের বাড়ি হিসাবে চিনেছিলাম, তাই হয়তো।

তোয়ালে কাঁধে তুলে দ্রুতই বাথরুমে আড়াল হয়ে গেলো দোহা। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকলো আর্থার। কিছুক্ষণ পরই বাথরুম থেকে শাওয়ারের শব্দ ভেসে আসতে শুনলো সে। তার সঙ্গে দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ। উল্টো ঘুরে সদর দরজা খুলতেই বাইরে কাচুমাচু ভঙ্গিতে দাঁড়ানো এক মেয়েকে দেখা গেলো। নীলচে সালোয়ার কামিজ পরনে, ওড়নার খুঁট বিনা কারণেই চিবিয়ে চলেছে। আর্থারকে কাজল টানা ডাগর ডাগর নয়নে পর্যবেক্ষণ করে সে অযথাই মুচকি হেসে ক্ষীণ রমণীসুলভ কন্ঠে জানালো,

- দাদু খেতে ডাকছেন। খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে।

- জ্বি, আসছি।

বলার পরেও মেয়েটা ভেতরের দিকে উঁকি দিলো। তার দৃষ্টি লক্ষ্য করে তাকালো আর্থারও। অতঃপর বাঁকা হেসে বুকে দুবাহু বেঁধে শুধালো,

- দোহাকে খুঁজছো?

মেয়েটার গাল দুটো পাকা টমেটোর মতন টুকটুকে হয়ে উঠলো। ব্লাশ ব্যবহার করেছে, স্পষ্ট বোঝা যায়। নিজের হাসি চেপে আর্থার বিড়বিড় করলো,

- গোসল করছে। দেখতে ইচ্ছুক?

হাত তুলে তাকে ভেতরে স্বাগতম জানালো আর্থার, অভিজাত পুরুষদের ভঙ্গিতে মাথা নুইয়ে। মেয়েটি তাতে লজ্জায় একশা,

- যাহ দুষ্টু! কিসব কথা বলে! ছিঃ!

বলেই সে উল্টো ঘুরে সিঁড়ি টপকে লাফিয়ে নেমে আড়াল হয়ে গেলো নিচতলায়। তখনো সিঁড়িঘরে প্রতিধ্বনিত হয়ে চললো তীক্ষ্ণ মেয়েলী হাসির শব্দ। আর্থার বিস্তর হাসি হেসে দরজা আটকে ভেতরের রুমে এলো। দোহা তখনো বাথরুমে, তাই সে নিজের পোশাক পাল্টে সিল্কের স্লিপিং পাজামা গায়ে জড়ালো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলগুলোতে আঙুল চালিয়ে ঠিকঠাক করে নিতে থাকলো।

টিং!

নোটিফিকেশনের শব্দে ফিরে তাকাতেই বিছানার উপর দোহার ফোন লক্ষ্য করলো আর্থার। স্ক্রিনে মেসেজ ভেসে উঠেছে। হাতে নিয়ে দেখতেই বুঝলো, একটা ই- মেইল।

“ সেন্ট পিটার্সবার্গ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ অ্যাকসেপ্টস ইওর ভিজিটেশন রিকোয়েস্ট—”

অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো আর্থার। যদিও পুরোটা ই মেইল পড়া সম্ভব নয়, উচিৎও নয় তবুও কেমন যেন অন্তর খচখচ করে উঠলো তার। সাধারণত দোহা যা করে, সবসময় তাকে জানিয়েই করে। ম্যানেজারের থেকে অধিক একজন বন্ধু হিসাবে। তাছাড়া তার মতন ভি আই পি মানুষের আদতেই ব্যক্তিগতভাবে কিছু করাটা ঝুঁকির ব্যাপার। কিন্তু এই স্কুলের ব্যাপারটা কি হলো? ভেবে আপাতত কোনো উত্তর পেলনা আর্থার।

—চলবে—

#স্বরলিপিতে_তুমি

#জাবিন_ফোরকান

#সূচনাপর্ব

কভার ক্রেডিট: Nafisa Kamal চুম্মেশ্বরী মেয়ে একটা।😘

[ অবশেষে নতুন যাত্রা শুরু করেই ফেললাম। সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ সবসময় আমার পাশে থাকার জন্য, আমাকে ভালোবাসার জন্য। দোয়া করবেন, যেন এগিয়ে যেতে পারি আপনাদের প্রেরণায়।

প্রতিবার তো দারুণ দারুণ থ্রিলার লিখি, তাই এই গল্পটা হবে একটু সাদামাটা। হয়ত বা, কিংবা নয়। আমার মনমর্জির উপর নির্ভর করছে। আসলে ঠান্ডা ধাঁচের একটা গল্প লিখে মন শান্ত রেখে আকল্পনিত সাজাতে চাইছি। তবে হ্যাঁ, টানটান উত্তেজনাকর থ্রিলিং ভাইব না পেলেও আমি বরাবরের মতোই একটা মেসেজ তুলে ধরার চেষ্টা করবো গল্পের মধ্য দিয়ে।

ভালোবাসা নিবেন সবাই।🌻🌻🌻]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন