#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা২
পর্ব ২: [ প্রোপোজাল ]
━━━━━━━━━━━━━
আলুর ভর্তা, ডিমভাজা, গরম ভাত, ঘন ডাল। সঙ্গে গোটা কয়েক শুকনো মরিচ এবং লেবুর ফালি। দোহার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে পৃথিবীতে এর থেকে সুস্বাদু আর কোনো খাবার হয়না। ডান হাতে সবকিছু মিশিয়ে তাতে মরিচের টুকরো ডলে লাল লাল করে মুখে পুরছে সে। এদিকে গরম ভাত কনকনে ঠাণ্ডা হওয়ার অপেক্ষায় এখনো তাকিয়ে আছে আর্থার।
রাজিয়া খন্দকার একপাশের চেয়ারে বসে মোটা ফ্রেমের চশমার আড়াল থেকে পর্যবেক্ষণ করছেন দৃশ্যটি। মিষ্টি একটি হাসি ফুটে আছে বৃদ্ধার শুকিয়ে কালচে হয়ে আসা ঠোঁটজুড়ে। কুচকে আসা চামড়া আবৃত হাতে তিনি আরো এক চামচ ডাল তুলে দিলেন দোহার প্লেটে। সাগ্রহে তা গ্রহণ করলো বিশ্বখ্যাত শিল্পী। আর্থার ফ্যালফ্যাল করে চেয়েই আছে, ঠিক কোনদিক থেকে ডিমভাজি ধরবে কিংবা ডাল মেশালে তা আঙুলের ফাঁক বেয়ে গড়িয়ে পড়বে এই ভয়ে সে এখনো খাওয়া শুরুই করতে পারছেনা। তার ইতস্ততবোধ লক্ষ্য করে রাজিয়া মৃদু হেসে ডাক ছুঁড়লেন,
- ওই মর্জিনা, একটা চামচ আর কাটাচামচ নিয়ে আয় দেখি মা।
দ্রুতই ডাইন ইন রুমে আগমন ঘটলো গোলাপী কামিজ জড়ানো মর্জিনার। আর্থারের প্লেটের পাশে সে চামচগুলো রাখলো।
- থ্যাংক ইউ!
ছোট্ট করে উচ্চারণ করে দ্রুতই চামচে ডিমভাজা কেটে মুখে দিলো আর্থার। ক্ষুধায় পেট রীতিমত কুঁকড়ে এসেছিলো তার। তার উপর দোহার তৃপ্তির খাওয়া দেখে দেখে তা লক্ষগুণে বেড়ে গিয়েছে। হাসলেন রাজিয়া, বিড়বিড় করে বললেন,
- বাবা তোমার যদি ভিন্ন কিছু খেতে মনে হয় বলবে কিন্তু। ঐসব পিৎজা, বার্গার, পাস্তা আমি বানাতে পারিনা বাপু। তুমি চাইলে অর্ডার করে আনিয়ে দেয়া যাবে। আজকাল অনলাইন অর্ডারের প্রচলন খুব বেড়েছে।
- না না, থ্যাঙ্কস, আই অ্যাম ফাইন। ইটস ডেলিশিয়াস।
মুখের খাবারটুকু গিলে মাথা দোলালো দোহা।
- ও ঠিক বলেছে দাদু। দেশে ওসব দুঃস্থদের খাবার খেতে আসিনি।
চোখ পাঁকালো আর্থার, তাতে বাঁকা হেসে তাতে ভেংচি কেটে পুনরায় খাবারে মনোনিবেশ করলো দোহা।
- খুব পাখনা গজিয়েছে তোর। একবার লিভারপুলে ফিরি, তারপর যদি নিক্সের কাছে নালিশ না করেছি তবে আমার নামও আর্থার ওয়েস্টউড নয়!
বাক্যটি আর্থার সম্পূর্ণ ইংরেজি ব্রিটিশ উচ্চারণে বলায় একমাত্র দোহা বাদে আর কেউই এর অর্থ উদঘাটনে সক্ষম হলোনা। ভ্রু নাচিয়ে তৎক্ষণাৎ দোহা পাল্টা ব্যাঙ্গ করলো,
- আর্থার দ্যা পশ্চিমের কাঠ।
নিজের টাইটেল “ওয়েস্ট-উডের ” ব্যাঙ্গকীর্তি শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে আর্থার হুংকার দিতে যাচ্ছিলো কিন্তু রাজিয়া খন্দকারের হাত উত্তোলনে থমকে গেলো।
- তোমরা দুটো ভাইতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করার আগে খাবারটুকু খেয়ে নাও বাপু, ওটুকু যেন বিফলে না যায়। এই মর্জিনা, দোহাকে কিছুটা ভাত দে তো।
- জ্বি!
অত্যন্ত উৎফুল্ল ভঙ্গিতে রীতিমত নেচে নেচে দোহার চেয়ারের কাছে হাজির হলো মর্জিনা, কাঁচের গামলা থেকে এক চামচ ভাত তুলে দোহার প্লেটে তুলে দিলো সাগ্রহে। বিনা চাওয়ায় পানিও ঢেলে দিলো গ্লাসে, এগিয়ে দিলো মুখের কাছে। তার আগ্রহী কর্মকান্ডে মৃদু হাসলো দোহা,
- ধন্যবাদ বেব।
টকটকে হলো মর্জিনার উভয় গাল, আবারো বোঝা গেলো, ভীষণ পরিমাণে ব্লাশ ব্যবহার করেছে সে। আর্থার ঠোঁটে ঠোঁট চেপে নিলো, হাসির দমক নিয়ন্ত্রণ করলো।
বেব—শব্দটা দোহা বেখেয়ালেই বলে থাকে, বিশেষ করে ইংল্যান্ডে এমন সম্বোধন খুবই স্বাভাবিক এবং প্রচলিত। দীর্ঘদিন বাইরের সংস্কৃতির সংস্পর্শে থেকে তার নিজের বৈশিষ্ট্যেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। এতে অস্বীকার করার কিছুই নেই। তাকে এখন অন্তর থেকে পুরোদস্তুর বাংলাদেশী বলা সম্ভব নয়। তবে ব্যাপারটা যে মর্জিনার উপর প্রথম জীবনে ফোটা প্রেমের রং বেরঙের লাড্ডুতে পরিণত হয়েছে তা বেচারা বুঝতে আপাতত অপারগ।
খাওয়া দাওয়া শেষে পায়েসটুকুও হাজীর হলো মর্জিনার দৌলতে। কটকটে লাল নেইলপলিশ দেয়া নখ দেখিয়ে দেখিয়ে সে পরিবেশন করলো খাবার। মুখজুড়ে লালিমা স্পষ্ট, যেন বিবাহিত নতুন বউ। মেয়েটা বড়ই সরল, নিজেকে কিছুতেই লুকিয়ে রাখতে পারেনা। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন রাজিয়া, ছেলেগুলো ঘুমাতে গেলেই তাকে সাবধান করবেন।
বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়ানোর মতন দুঃসাহস করবার আগেই পিছিয়ে আসা ভালো। দুইদিনের আবেগে গা ভাসালে জীবনটাই না বৃথা হয়ে যায় তার। দোহা আজ থাকবে, আগামীকাল থাকবে, কিন্তু পরশুদিন যখন থাকবে না তখন কি হবে?
মর্জিনার বেড়ে দেয়া পায়েস খেতে খেতে দোহা আর্থারের সঙ্গে কিছু খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলাপ করছিলো। তার মাঝেই রাজিয়া কন্ঠ পরিষ্কার করে সাবধানী কন্ঠে শুধালেন,
- তোমার বাবা মায়ের সাথে দেখা হয়েছে?
স্তব্ধ হয়ে গেলো দোহা। চামচটিতে চেপে বসলো তার আঙ্গুল,যদিও অভিব্যক্তিতে কোনো ধরনের পরিবর্তন এলোনা। চুপচাপ কয়েক চামচ পায়েস মুখে দিলো সে, রাজিয়া বিস্তর ভুল করে ফেলেছেন এমনভাবে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে বসলেন,
- বলছিলাম আগামীকাল একটু কাচ্চি বিরিয়ানী করে দেবো? সঙ্গে মর্জিনার স্পেশাল মহব্বতের শরবত, দারুণ বানায় কিন্তু মেয়েটা আমার, আর....
- হয়নি।
দোহার গম্ভীর কণ্ঠে থমকে গেলো সকলে। সবার বিস্মিত এবং উদ্বিগ্ন দৃষ্টির তার উপর স্থাপিত হলেও সে ধীরেসুস্থে পায়েস শেষ করে বাটিটা টেবিলে রেখে দিয়ে দ্বিতীয় দফায় বললো,
- আমার কোনোকালে বাবা মা ছিলো বলে মনে পড়ছেনা।
এটুকুই। উঠে দাঁড়ালো দোহা। সবার হতবিহ্বল বাকরুদ্ধ অবয়বে দৃষ্টি বিলিয়ে মুচকি হাসলো, যেন সবকিছু স্বাভাবিক রয়েছে।
- পায়েসটা দারুণ হয়েছে বেব। আর কালকের মহব্বতের শরবতের অপেক্ষায় থাকলাম। আসছি রাজিয়া দাদু, গুডনাইট।
বেরিয়ে গেলো দোহা, সদর দরজা খুলে সটান সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলো দোতলায়। নিস্তব্ধতা ভর করলো ঘরজুড়ে। আর্থার কেন যেন নিজের অবশিষ্ট থাকা পায়েসটুকুতে আর মন বসাতে পারলোনা। রাজিয়া খন্দকারের চিন্তিত এবং ব্যথিত মুখাবয়বে তাকিয়েও সে নিজেকে কিছুতেই জিজ্ঞেস করায় উদ্বুদ্ধ করতে পারলোনা। মনের ভেতর খচখচ করছে। মনে হচ্ছে, যেন কিছু রহস্য তার কাছে অজানা থাকাই ভালো। যেমন, দোহার অতীত জীবনের রহস্য। কিভাবে পৌঁছেছিলো সে ইংল্যান্ড অবধি? সেই সত্যতা যেদিন আর্থার উদঘাটন করবে, সেদিনই হয়ত ছেলেটির প্রকৃত বন্ধু হতে পারবে সে।
রুচি উঠে যাওয়ায় আর্থার চুপচাপ ঘরে চলে এলো। দুটো বেডরুম আছে, একটা সে নিজে এবং অন্যটা দোহা ব্যবহার করে। নিজের বেডরুমের দিকে যাওয়ার পথেই থমকালো সে, পিছিয়ে গিয়ে উঁকি দিলো দোহার বেডরুমে। রুমের বাইরে ছোট্ট বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা, পরনে ঢোলা টি শার্ট আর থ্রি কোয়ার্টার শর্টস। রেলিংয়ে হেলান দিয়ে অদূরে তাকিয়ে আছে, আঙুলে ঝুলছে আধখাওয়া সিগারেট। দোহা কদাচিৎ ধূমপান করে থাকে, ব্যান্ডমেটদের সাথে কিংবা কোনো অস্থিরতায় থাকলে। বর্তমানে সে একাকী রয়েছে। তবে অস্থিরতার কারণ কি? একটু আগের ঘটা সামান্য ঘটনা?
- গুডনাইট দোহা।
আর্থারের ছোট কণ্ঠের বিপরীতে সামান্য মাথা কাত করলো দোহা, তারপরই পুনরায় নিজের জগতে ফিরে গিয়ে ঠোঁটে সিগারেট চেপে বিড়বিড় করলো,
- গুডনাইট।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
অতিরিক্ত চাবি দিয়ে খুবই ধীরে ধীরে দরজা খুলে বাড়ির ভেতরে পা রাখতেই নাফিসার সব আশা ভরসায় পানি ঢেলে দিয়ে জ্বলে উঠলো লিভিং রুমের লাইট। স্তব্ধ হয়ে উনিশবর্ষী কিশোরী আবিষ্কার করলো তার চিকিৎসক মা হাসপাতালের অ্যাপ্রোন পরিহিত অবস্থায়ই সোফায় বসে আছেন। সুদর্শনা মধ্যবয়স্কা রমণীর মুখ থমথমে এবং ক্লান্তও বটে। মেয়ের দিকে রাগের থেকে বেশি আফসোস এবং দুশ্চিন্তার ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছেন।
- বেবি! তোমাকে নিয়ে কি আমি একটুও শান্তি পাবোনা?
নাফিসা মুখ কাচুমাচু করে দোষীর ভঙ্গিতে দ্রুতই মায়ের হাঁটুতে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুখ গুঁজে দিলো। বিড়ালছানার মতন মুখ করে করুণা আদায়ের চেষ্টায় বললো,
- প্লীজ মাম্মি প্লীজ, ইটস দোহা' স কনসার্ট! ইউ নো হাউ মাচ আই লাভ সাইরেনস? হাউ ক্যান আই মিস? আর তাছাড়া আমি একা যাইনি বিশ্বাস করো, অনিমারা সবাই ছিলো,ইউ ক্যান কল টু কনফার্ম।
সত্যি সত্যি নিজের ফোন বের করতেই রমণী তার হাত চেপে ধরলেন। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
- কতবার বলেছি বেবি, এভাবে পাগলামি করতে নেই। তুমি এখন বড় হচ্ছো, এত ভালো একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক শুরু করতে যাচ্ছো, তোমাকে এখন এসব বাচ্চামি মানায়?
ঠোঁট ফুলিয়ে নাফিসা মায়ের কোমর পেঁচিয়ে কোলে মাথা রেখে বিড়বিড় করলো,
- তুমি আর পাপ্পাই তো বলো, আমি তোমাদের সেই ছোট্ট নাফিসা।
- হ্যাঁ ঠিক আছে, কিন্তু... তার অর্থ তো এই নয় যে তুমি হুটহাট কাউকে না জানিয়ে কোথাও চলে যাবে এবং এত রাত করে ফিরবে। তুমি জানো? আমার সার্জারি ছিলো, কতটা চিন্তায় ছিলাম যখন তোমার ফোন বন্ধ পেয়েছে বলেছে পাপ্পা? যদিও আজকের কনসার্টের কথা শুনে তখনি বুঝে নিয়েছিলাম কোথায় গিয়েছ। তবুও বেবি, বলে যাওয়া দরকার ছিলো।
- সরি মাম্মি। এক্সট্রিমলি সরি। এরপর থেকে সবসময় বলে যাবো, দরকার হয় ড্রাইভার আংকেলকে বগলদাবা করে সঙ্গে নিয়ে যাবো, প্লীজ তুমি এবারের মতন রাগ করোনা প্লীজ!
মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু হাসলেন মা, নাফিসা সবসময়ই জানে ঠিক কিভাবে তাকে বশ করতে হয়। মেয়েটার উপর রাগ করা দুষ্কর।
- আচ্ছা, কিন্তু ওয়াদা করো আর কক্ষনো এমন হবেনা।
- হবেনা মাম্মি, প্রমিজ!
হাসলেন তিনি, নাফিসার কপালে চুমু ছুঁইয়ে দিলেন। আদরটুকু সাগ্রহে গ্রহণ করে নাফিসা বিড়বিড় করলো,
- আর মাম্মি, আরেকটা কথা।
- হুম?
- প্লীজ পাপ্পাকে বলো, যেকোনোভাবে হোক শেহবাগ দোহার ফ্যানমিট প্রোগ্রামের রেজিস্ট্রেশন করে দিতে। আই ওয়ানা মিট হিম সো ব্যাড মাম্মি....প্লীজ!
খিলখিল করে হাসলেন রমণী, জানেন, মেয়েটি তার ওই এক শিল্পীর জন্য কতখানি পাগল। কোনোকালেই সন্তানের কোনো শখ অপূর্ণ রাখেননি তিনি আর তার স্বামী।
- ওকে বেবি, আমি তোমার পাপ্পার সাথে কথা বলবো। যাও, এখন ফ্রেশ হয়ে ঘুমাও। অনেক রাত হয়েছে।
- ইয়ে! বেস্ট মাম্মি!
মাকে জোরালোভাবে আলিঙ্গন করে খুশিতে এক প্রকার নাচতে নাচতেই সিঁড়ি বেয়ে ডুপ্লেক্স ভবনটির দুইতলায় উঠে গেলো নাফিসা। মেয়ের উৎফুল্ল অবয়বে চেয়ে থাকলেন রমণী।
- ছন্নছাড়া আমি....আমার স্বরলিপিতে তুমি....
গুণগুণ করতে করতে নিজের ঘরে ঢুকলো নাফিসা। বিস্তৃত এক আধুনিক রুম। লেটেস্ট হ্যান্ডব্যাগ এডিশন থেকে শুরু করে আইফোন সিক্সটিন ম্যাক্স প্রযুক্তি, কমতি নেই কোনোকিছুর। বাবা একজন বিরাট ব্যবসায়ী হওয়ার সুবিধার্থে সোনার চামচ মুখে নিয়েই বড় হওয়া নাফিসার। অভাব কি না জানলেও অভাবীদের প্রতি তার সহমর্মিতা ব্যাপক।
অফহোয়াইট বর্ণের রুমের দেয়ালজুড়ে তার প্রিয় মুভি এবং সিরিজের পোস্টার, সঙ্গে অভিনেতা অভিনেত্রীদের ছবি, পছন্দের স্ট্যারি নাইট পেইন্টিং সহ অনেক কিছু। তবে সবথেকে অধিক যেটি রয়েছে সেটি হলো শেহবাগ দোহার প্রতিচ্ছবি।পারফিউমের বিজ্ঞাপন থেকে আরম্ভ করে ছোট্ট কোনো আর্টিকেলের পেপার কাটিং, সবকিছুই সযত্নে সংরক্ষণে রেখেছে নাফিসা। আজকের কনসার্টের হ্যান্ডব্যান্ড এবং আয়োজকদের পক্ষ থেকে পাওয়া ছোট্ট গিফট প্যাকেটটা টেবিলে রেখেই সে ধপাস করে বিছানায় আছড়ে পড়লো। পা নাড়তে নাড়তে চেয়ে থাকলো একেবারে সামনেই দেয়ালে টাঙ্গানো বড় পোস্টারে। গতবছর নিউইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিন পোস্টারে ফিচার হয়েছিলো সাইরেনস প্লেয়ার। সেটারই বিশালাকৃতির পোস্টার দেয়ালজুড়ে। চারজন হাস্যোজ্জ্বল মেম্বারদের মধ্যে একজনের উপরেই দৃষ্টি আবদ্ধ নাফিসার। কোলে ধবধবে সাদা ইলেকট্রিক গিটার নিয়ে পা ছড়িয়ে ভাবগম্ভীর ভঙ্গিতে বসে থাকা শেহবাগ দোহার ছবি থেকে সে দৃষ্টিই ফেরাতে পারছেনা। এমন নয় যে সে ব্যাপক পরিমাণে সুদর্শন, তবে পাশ্চাত্যের মিশেলে বাঙালিত্বের ছোঁয়া তার পুরুষালী সৌন্দর্য্যকে করে তুলেছে অনন্য। মৃদু হাসলো নাফিসা,
- তুমি....আমি..... উন্মাদনার ঝোঁক, নোলক~
আপনমনে গাইতে গাইতে হঠাৎ থমকে গেলো নাফিসা। মাথা কাত করলো, পোস্টারের উদ্দেশ্যে গভীরভাবে চেয়ে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
- নোলক কে মশাই? আপনার অতীত জীবনের প্রেয়সী নয়তো? সে যাই হোক, দেখবেন, আপনার অন্তরে আমার জায়গাটুকু যেন আজীবন বজায় থাকে।
পোস্টারের শেহবাগ দোহা ওই একই ভঙ্গিতে সুগভীর দৃষ্টিতে নিজের প্রতিচ্ছবি বিলিয়ে গেলো নাফিসার দৃষ্টি এবং লাজমাখা হাসির মাঝে।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
সেন্ট পিটার্সবার্গ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
বনানী অঞ্চলে অবস্থিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি আজও বিখ্যাত নিজেদের আধুনিক - বিজ্ঞাননির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা এবং ভালো ফলাফলের জন্য। এটি বোর্ডিং প্রতিষ্ঠান, খুব জরুরী অবস্থা ব্যতিত শিক্ষার্থীদের নিজস্ব ডরমেটরিতে থেকেই পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে হয়। তাই অভিজাত শ্রেণী এবং রাজধানীতে কর্মরত বিদেশী কর্মীদের পরিবারের শিশুদের জন্য এটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান।
এই মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানটির বিশাল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে দোহা। পরনে ওভারসাইজড হুডি এবং জিন্স। মাথায় সানক্যাপ, মুখে মাস্ক। চোখ অবধি সানগ্লাসে ঢেকে নিয়েছে। জিন্সের পকেটে দুহাত গুঁজে স্থির তাকিয়ে আছে সামনে। কলেজ বিল্ডিংটি দেখছে প্রাণভরে। কিছুক্ষন বাদেই সে ছোট পকেটগেট খুলে ভেতরে ঢুকলো। দুইপাশে চারজন নিরাপত্তাকর্মী থাকলেও কেউই তাকে বাঁধা দিলোনা। কারণ এই ব্যক্তির আগমনের তথ্য তাদের পূর্বেই দেয়া হয়েছে, এবং বলা হয়েছে যেন তাকে কোনোপ্রকার বিরক্ত করা না হয়।
দোহা ধীরে ধীরে ভেতরে এগিয়ে গেলো। গতকালই ঈদুল আযহার ছুটি আরম্ভ হয়েছে। তাই কেউই স্কুল কিংবা ডরমেটরিতে নেই বললেই চলে। পড়ন্ত গোধূলিলগ্ন। ইচ্ছাকৃতভাবে এমন সময় বেছে নিয়েছে দোহা। ধীর পদক্ষেপ তার লম্বা করিডোরজুড়ে এগিয়ে গেলো। প্রতিটি ক্লাসরুম, প্রতিটি বেঞ্চ যেন আজও ঠিক সেদিনের মতোই রয়েছে। বদলেছে রং এবং চাকচিক্য। রয়ে গিয়েছে হাজারো স্মৃতি, দেয়ালে দেয়ালে। রোমন্থনের আবেশে অন্তর শীতল হয়ে উঠলো দোহার। এগিয়ে চললো যেন ক্রমশ, নিজের অতীতের দিকে। যে অতীত তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ডরমেটরির রিসিপশনে এসে থামলো সে। চারিদিকে পিনপতন নীরবতা। এগিয়ে যেতেই পায়ের কেডসের ভারী ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হলো দেয়ালজুড়ে। ক্রমশ এগোলো দোহা, যেন স্মৃতির সুড়ঙ্গে প্রবেশ করলো পায়ে পায়ে। অবশেষে দেখা মিললো স্থানটির, যেখানে সূত্রপাত, যেখানে সমাপ্তি। ডরমেটরির হলরুম। যেখানে বিকাল হলে চায়ের কাপে চুমুকে চুমুকে আড্ডা জমতো সকলের। বুকটা ধরে এলো দোহার, নিদারুণ এক টান অনুভব করলো। সোফাগুলো আজও ঠিক একইভাবে রয়েছে, বদলেছে কুশন এবং কভার। তবে মাঝখানে এখনো সেই বৈশাখে কর্তৃপক্ষের থেকে হাজার অনুনয় বিনয় করে দেয়া আলপনাটি জ্বলজ্বল করছে। বোধ হয় বছর বছর যত্ন নিয়ে জেল্লাদার রাখা হয়েছে। আর ওই আলপনার মাঝেই........
এক ঝটকায় যেন সকল স্মৃতি পঙ্গপালের দলের মতন আছড়ে পড়লো দোহার মানসপটে। হারিয়ে ফেললো সে নিজেকে সম্পূর্ণ ওই রোমন্থনের জগতে। নিমজ্জিত হলো জীবনের এক অভিশপ্ত অথচ শ্রেষ্ঠতম অধ্যায়ে।
যখন সে পৃথিবীখ্যাত গায়ক শেহবাগ দোহা ছিলো না।
ছিলো এক সাধারণ বাংলাদেশী কিশোর.....
দোহা ইসলাম।
✿✿✿━━━━━━━━━━━━━━━━✿✿✿
সাল ২০১২, ১৭ ই জুন।
সেন্ট পিটার্সবার্গের কলেজ ডরমেটরি সেকশন আজ ভীষণ উত্তেজিত। গোটা হলজুড়ে যেন টর্নেডো খেলে যাচ্ছে। সকল ছেলেমেয়েদের মাথায় হাত, মুখে হাত অবস্থা। বিস্ময়ে সকলের নয়ন প্রসারিত। বাকরুদ্ধ এক মুহুর্ত। এপ্রিলের পয়লা বৈশাখে আলপনা দেয়া মেঝের মাঝে এক হাঁটু গেড়ে বসে আছে গোটা কলেজের কুখ্যাত বিখ্যাত সুনামি দোহা। তার “সুনামি” নামকরণের পিছনে অবশ্য একটা কাহিনী রয়েছে, তবে সেটা আপাতত মুখ্য বিষয় নয়।
আসল বিষয় হলো সে এক হাতে টকটকে লাল গোলাপ বাড়িয়ে প্রোপোজ করছে একটি মেয়েকে। এক মিনিট? মেয়ে? উহু উহু, ওটাকে একটা ঢোল বলাই শ্রেয়। কুটিকুটি হেসে অনেকে হিংসাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দৃশ্যে। আলুথালু গড়নের কিশোরী মেয়েটি হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার সামনে নতজানু হওয়া দোহার দিকে। হালকা ফোলা ফোলা গালজুড়ে তার লালিমা মিশ্রিত, ব্যাঙ্স কাট চুলের গুচ্ছ এদিক সেদিক ছড়িয়ে আছে। ঢোলা ফ্রক এবং ট্রাউজারে ভুঁড়ি আড়ালে থাকলেও দৈহিক ভারিক্কি গড়নে ওজন স্পষ্ট। ষাট কেজি ছাড়াবে নিশ্চয়ই।
দোহার মতন একটা ছেলে কিভাবে কলেজের সেরা ইন্ট্রোভার্ট তকমা পাওয়া ঢোলের পাল্লায় পড়লো? কেউ ভেবে পাচ্ছেনা।
কারো নজরে অবশ্য কিছু যায় আসেনা কলেজের সুনামির। সে নিজের হাতটি আরো খানিক তুলে ধরলো। মুচকি হাসলো মেয়েটির উদ্দেশ্যে, তার প্রসারিত নয়নে তাকিয়ে ঘোষণা করলো,
- আই লাইক ইউ, আমারা। উইল ইউ বি মাই গার্ল?
স্তব্ধ তাকিয়ে রইলো সকলে। কারো মাঝে কোনরকম প্রতিক্রিয়া করবার বোধটুকুও আর অবশিষ্ট নেই।
—চলবে—
কভার প্রেজেন্টার: Arjhum Kotha 🫣🫶🏻