#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৩৩
পর্ব ৩৩: [ অতীতের মুখোমুখি ]
━━━━━━━━━━━━━━━━━━
চেলসির নাম শুনলেই সর্বপ্রথম ভেসে উঠে “চেলসি ক্লাব”এর প্রতিচ্ছবি। ইংলিশ ফুটবল ক্লাব জায়েন্টটির উৎপত্তি এই শহর থেকেই। লন্ডনের অন্যতম বিখ্যাত এবং অভিজাত এলাকা এটি। বহু তারকা এবং নামধারী ব্যক্তিত্বের বসবাস থেমস নদীর পাড়ে অবস্থিত জায়গাটিতে। সড়কপথ পাথুরে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ইতিউতি স্ট্রিট লাইটের ধারে পার্ক করে রাখা ল্যাম্বরগিনি কিংবা রোলস্ রয়েসের মতন গাড়ি। মোড়ে মোড়ে ভিন্টেজ বুকস্টোর এবং শপিং প্লেসের বহর। ঐতিহ্যবাহী বহু স্থাপত্যে ভরপুর চারিপাশ। মানুষগুলোও শান্তশিষ্ট, প্রফুল্ল এবং নিজেদের জীবন নিয়েই ব্যস্ত।
থেমস নদীর পাড়ের দৃশ্য ভয়াবহ রকমের সুন্দর। পেন্টহাউসটির সুসজ্জিত ট্যারেস থেকে স্পষ্টত দেখা যায় নদীপাড়ের জনজীবন। বিশেষ করে গোধূলী লগ্নে দিগন্তে জুড়ে অস্তমিত সূর্যের যে প্রতিফলন নদীর বুকে পরে, তা নিতান্তই স্বর্গীয় দৃশ্য। প্রথমবার দোহা সেই মায়াবী গোধূলীর ছায়া দেখেই এই জায়গাটা পছন্দ করেছিলো। গ্যাবি এবং নিকোলাস উভয়েই নাইটসব্রীজে থাকলেও সে বেছে নিয়েছে চেলসিকে, এই শান্ত বিকালগুলোর জন্য।
এই যেমন বর্তমানে ট্যারেসের সোফায় বসে উষ্ণ গরম কফির মগ হাতে দোহা উপভোগ করছে গোধূলীকে। কোলের উপর রাখা একটি ডায়েরি, তাতে কলমের খোঁচা দিয়ে সে নতুন গান লিখবার চেষ্টায় আছে। তবে মাথায় কিছুতেই শব্দগুলো সাজিয়ে উঠতে পারছেনা। তাই কিছুটা বিরক্তই সে। তার বিরক্তির মাঝেই ট্যারেসে পায়ে পায়ে প্রবেশ করলো খয়েরী ইউনিফর্ম পরনে একজন মেয়ে। এর নাম রাচেল। তার দুজন মেইডের একজন। যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দোহা নিজের পেন্টাহাউসের ব্যবস্থাপনায় চুক্তিবদ্ধ তাদের তরফ থেকে রাচেল আর আরেকজন মেয়ের এখানে কাজ করা। সেই হিসাবে দুইজন মেইড এবং একজন প্রাইভেট শেফ আছে দোহার। বেশিরভাগ সময় সে বাড়িতে থাকেনা। যখন থাকে তখন প্রাইভেট শেফ আসে রান্নাবান্নার কাজের জন্য। অন্য সময় রাচেল এবং আরেকজন সবকিছুর দেখাশোনা করে।
রাচেল ট্যারেসের গাছগুলোতে সযত্নে পানি দিচ্ছে। দোহা মেয়েটাকে একনজর দেখলো। আগাগোড়া ব্রিটিশ রমণী। ঝাড়ুর মতন উস্কখুস্ক বাদামী চুল। যা এই মুহূর্তে বেশ কষ্টে গুছিয়ে খোঁপায় বেঁধে রেখেছে সে।
- রাচেল?
ডাক শুনে মাথা কাত করে উঠে দাঁড়ালো মেয়েটি।
- জ্বি স্যার?
- রাতে আর্থার আসবে। শেফকে বলে দিও। আমি স্টুডিওতে যাচ্ছি।
নিচতলায় হোম স্টুডিও এবং জিম উভয়ই আছে। স্টুডিওতে যাবে বললেও মাঝপথে দোহার শরীর কেমন ম্যাজম্যাজ করে উঠলো। ক্লান্ত লাগছে। বাংলাদেশ ট্যুর থেকে ফেরত আসার পরপরই একসাথে হাজারটা কাজ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। এক মাসও পার হয়নি ঠিকঠাক। এর মধ্যে নতুন অ্যালবাম প্ল্যানিং, প্র্যাকটিস, প্যারিস ইভেন্টে অংশ নেয়া, নতুন দুটো প্রজেক্টের কাজ, রিয়ালিটি টিভি শো এর শ্যু*টিং ইত্যাদি করতে করতে তার চিড়ে চ্যাপ্টা অবস্থা। অবশেষে দুটো দিন একটু শান্তি পেয়েছে। তাও পরবর্তীতে হাড়খাটুনির বদৌলতে।
নিজের বেডরুমে ঢুকতে ঢুকতে দোহা মাথা দোলালো। একটি নিঃশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করলো,
- হাহ! দিস ইয ইওর লাইফ নাউ শেহবাগ।
পরনের সোয়েটশার্ট খুলে আর কিছু গায়ে জড়াতে ইচ্ছা হলোনা। ঐভাবেই লাফিয়ে পড়লো সে নরম গদির উপর। ব্ল্যাংকেট শরীরে জড়িয়ে চোখ বুঁজতেই গোধূলীর আলো আঁধারি মায়ায় ঘুম আসতে দেরী হলোনা। কতক্ষন যাবৎ সে স্বস্তির এক স্বপ্নপুরীতে আবদ্ধ ছিলো হিসাব নেই। ঘুম ভাঙলো আর্থারের চাপড়ে।
- ডিনার করার প্ল্যান আছে নাকি অভুক্ত থাকার ইচ্ছা আছে?
- উম...হুম...
গুঙিয়ে উঠলো দোহা। আর্থারের হাত ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বালিশে মুখ গুঁজলো। নিজের কোমরে দুহাত চেপে আর্থার ঠোঁট কামড়ে বললো,
- তুই কি চাস তোর উপর জনসিনা পাওয়ার মুভ অ্যাপ্লাই করি এখন?
- ফা*ক অফ!
ঘুমের মধ্যেই মিনমিন করলো দোহা। আর্থার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। তারপর আপনমনে হেসে আশেপাশে তাকালো। দোহার বেডরুমে এসেছে সে হাতে গোণা কয়েকবার। কারণ দোহা নিজেই নিজের বাড়িতে একটানা খুব বেশিদিনের জন্য থাকতে পারেনা। তবে যতবারই আর্থার এখানে এসেছে একটা স্থানে তার দৃষ্টি আটকেছে। বেডরুমের একপাশে ক্লোজেটের স্থান। সারি সারি কাঁচের বক্সের মতন দেয়ালে আটকানো। তাতে গুছিয়ে রাখা বস্তুগুলো আর্থারকে বরাবর আকর্ষণ করে। সে পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে দেখতে লাগলো। গ্লাস ক্লোজেটজুড়ে সাজানো বিভিন্ন ধরণের হেয়ারপিন। বড়, ছোট, মাঝারি, আধুনিক, ভিনটেজ কোনোকিছু বাকি নেই। মনে হচ্ছে এক টুকরো ব্রিটিশ মিউজিয়াম তুলে দেয়ালে সেঁটে দেয়া হয়েছে। আর্থার বেশ মনোযোগ দিয়ে জিনিসগুলো দেখতে লাগলো। একদম মাঝখানে থাকা নীলাভ বর্ণের চুলের কাটার মতন দেখতে জিনিসটা সে একপ্রকার সাহস করেই হাতে তুলে নিলো। ময়ূরের আদলে তৈরী বস্তুটার একপাশে ঝুলন্ত একটি রত্ন। অত্যন্ত সূক্ষ্ম হাতের কাজ। ভারও তাই বেশ। দোহা ততক্ষণে আধঘুম চোখে মুখ ঘষতে ঘষতে বিছানায় উঠে বসেছে। আর্থারকে দেখে সে সটান বিছানা থেকে লাফিয়ে পড়লো। ছুটে গিয়ে ছেলেটার হাত থেকে বস্তুটা একপ্রকার কেড়ে নিলো। ভ্রু কুঁচকে ক্রোধান্বিত দৃষ্টিতে তাকাতেই আর্থার দুহাত তুলে সমর্পণের ভঙ্গিতে বললো,
- চিল ম্যান চিল, খেয়ে ফেলবো না!
- তুই খেতেও পারিস, ভরসা নেই।
থতমত খেয়ে গেলো আর্থার। তারপরই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। দোহাও পাল্টা খানিক হেসে হেয়ারপিনটা সযত্নে কাঁচের ভেতর ঢুকিয়ে রাখলো।
- বাট ভাই, জিনিসটা কি?
আর্থারের প্রশ্নে দোহা জানালো,
- চাইনিজ ডাইসেন্ট্রির হেরিটেজ। আমাকে আমার বন্ধু গিফট করেছে। প্রাচীন চায়নাতে হেয়ারপিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ অর্থ বহন করতো।
- হেরিটেজ? দ্যাটস... ওয়ান হেল অব আ গিফট! কিন্তু, তুই হেয়ারপিন দিয়ে কি করবি? এইযে এতগুলো খুঁজে খুঁজে জমিয়েছিস, গড নোস হাউ মাচ দে কস্ট! তুই কি চুল লম্বা করার প্ল্যানে আছিস গ্যাবির মতন?
দোহা জবাব দিলোনা, শুধু মৃদু একটু হাসলো। আর্থার তাতে দেয়ালে হেলান দিয়ে ভ্রু দুলিয়ে বললো,
- নাকি এসব তোর....ফিউচার ওয়াইফের জন্য হুম?
সহসাই স্তব্ধ হলো দোহা। তার দৃষ্টি জ্বলজ্বল করে উঠলো অব্যক্ত অনুভূতিতে। গালজুড়ে ভেসে উঠলো অতি ক্ষীণ লালিমার ছোঁয়া। আর্থার তার লজ্জাবোধে ভীষণ লজ্জা পেলো। টেনে টেনে বললো,
- আই সি....কিন্তু মিস্টার শেহবাগ....বিয়ে পর্যন্ত পৌঁছাতে হলে আগে কিছু শুরু করতে হবে ডোন্ট ইউ থিঙ্ক?
দোহা কটমট করে তাকাতেই আর্থার খিলখিল করে হেসে উঠলো।
- শোন লিটল বয়, রিলেশনশিপের অনেকগুলো স্তর আছে। কোর্টিং, ডেটিং, এঙ্গেজমেন্ট তারপর গিয়ে বিয়ে। তোর বয়স ত্রিশ ছুঁয়ে যাচ্ছে অথচ তুই এখনো কোর্টিং স্টেজ ছুঁতে পারলিনা, ম্যারেজ তো....
- শাট আপ আর্থার!
- ইভেন গ্যাবিরও ফিয়নসে আছে ম্যান! তুই কি ছিঁড়ছিস? নাকি তোর পাগলা ভক্তদের ভয়ে আছিস? অবশ্য আমিও থাকতাম। বেচারারা তোর রিলেশনশিপের খবরে আন্দোলন শুরু করলেও করতে পারে।
সটান আর্থারের কলার চেপে ধরলো দোহা, দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
- তুই এখন যা করছিস তাকে আমাদের দেশে ঘটকগিরি করা বলে। যদি সবার বদদোয়া লেগে যেতো তাহলে ঘটকদের জীবনের আয়ু হতো সবচেয়ে কম। বুঝেছিস? সো ডোন্ট ট্রাই টু বি দ্যা ঘটক অব মাই লাইফ!
প্রথমটায় আর্থার অবাক চেয়ে থাকলো, পরক্ষণেই খিলখিল করে হেসে উঠলো। দোহা তাকে ভেংচি কেটে সরে এলো। টি শার্ট তুলে বাথরুমে ঢুকে গেলো। কিছুক্ষণ বাদেই বাইরে থেকে আর্থারের কন্ঠ ভেসে এলো,
- আমি নিচে ডিনার টেবিলে আছি তাড়াতাড়ি আয়। ব্যান্ড সাজেশন্স আর ইনভেস্টমেন্ট ডিসকাস করার আছে। স্কেজিউলটাও দেখে নিবি এই মাসের।
- উম!
গুঙিয়ে সম্মতি জানালো দোহা। আর্থার নিচে নেমে গেলো। সে মুখে পানির ঝাঁপটা দিয়ে টিস্যু দিয়ে মুছে নিতে নিতে পাশের কাউন্টারে রাখা ফোন ভাইব্রেট করে উঠলো। দোহা সেটি হাতে নিতেই দেখলো ব্যান্ড গ্রুপে মেসেজ এসেছে।
লিডার নিকি: বি আর্লি টুমরোও। গনা ইন্ট্রিডিউস সামওয়ান।
গ্যাবি: গার্লফ্রেন্ড?
লি’ ল দোহা: ক্যাথরিন ভাবী শুনলে তোকে আস্ত রাখবেনা গ্যাব!
লিডার নিকি: আমাদের নতুন সং রাইটার ড্যাম বয়’য!
গ্যাবি: হাহাহা। এক্সাইটেড।
দোহা আর দেখতে পারলোনা। নিকি আর গ্যাবি চ্যাটিং জারি রাখলেও তাকে ফোন রেখে ফ্রেশ হয়ে দ্রুতই নিচে নামতে হলো। আর্থারের সঙ্গে মিটিং শেষে স্টুডিওতে কাজে বসতে হবে।
。
。
。
পরদিন।
সাইরেনস প্লেয়ারের প্র্যাকটিসরুমের দেয়ালজুড়ে “দ্যা বিটলস” ব্যান্ডটির বড়সড় একটা পোস্টার সাঁটানো। তার নিচে নিজেদের কিছু ছবি, স্টিকার। এক কোণায় ড্রামসেট। অন্যপাশের দেয়ালজুড়ে সারি সারি গিটার। দুটো এই মুহূর্তে এলিয়ে পড়ে আছে মেঝের উপর। ড্রামসের স্টিক গড়াগড়ি খাচ্ছে এদিক সেদিক। একপাশে অ্যালকোহলের ফ্রিজার ও সোফাসেট। মাইক্রোফোন, হেডফোন, সাউন্ড সিস্টেম এবং ইলেকট্রনিক সাউন্ড ডিভাইসের কোনো কমতি নেই। এই মুহূর্তে ইলেকট্রিক কি বোর্ডের উপর ঝুঁকে আছে ওয়াল্টার। সাইরেনস প্লেয়ারের চতুর্থ সদস্য, যে খুব কমই লাইমলাইটে আসতে পছন্দ করে। তার অস্তিত্ব অনেকটা ছায়ার মতন। যার প্রভাব ব্যাপক হলেও চোখে দেখা যায় খুব কম। দোহার সঙ্গে ওয়াল্টারের বয়সের পার্থক্য এক বছরমাত্র। ব্যান্ডের সবার মধ্যে বয়সে সবথেকে বড় সদস্য নিকোলাস, ছত্রিশ বছর বয়স তার। অপরদিকে সর্বকনিষ্ঠ দোহা। তাই তাকে লি ’ল দোহা উপাধি দেয়া হয়েছে।
দোহা গিটার কোলে বসে আঙুলে ব্যান্ডেজ পেঁচিয়ে নিচ্ছে, ওয়াল্টার তাকে নতুন একটা সুর তুলে দেখাচ্ছে সোলো পিসের অংশবিশেষ হিসাবে। এর মধ্যেই হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকলো গ্যাবি।
- শেহবাগ! ইউ পাংক!
গোটা প্র্যাকটিস রুম তার হুংকারে কেঁপে উঠলো। দোহা মাথা তুলে তাকাতেই গ্যাবি দৌঁড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো তার উপর। গড়াগড়ি খেলো মেঝেতে। ওয়াল্টার খুবই অবিচলিত ভঙ্গিতে নিজের কাজ জারি রেখে জিজ্ঞেস করলো,
- আবার কি হয়েছে? প্লীজ বলিস না ও আবারও ইন্সটাগ্রামে উল্টাপাল্টা ছবি আপলোড দিয়েছে।
- একদম ঠিক!
গ্যাবি চেঁচিয়ে উঠলো। কপালে হাত ঠেকিয়ে নিঃশ্বাস ফেললো ওয়াল্টার। দোহাকে হাঁটু দিয়ে মেঝেতে ঠেসে রেখে গ্যাবি নিজের পকেট থেকে ফোন বের করে ওয়াল্টারকে দেখালো। এক ঘন্টা আগের পোস্ট, ইতোমধ্যেই দুই মিলিয়ন লাইক ছাড়িয়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে স্টুডিওতে বসে আছে দোহা, ভিক্টোরি সাইন হাতে। দাঁতের ঝলক দেখিয়ে হাসছে। পাশে গ্যাবি, যে অন্যপাশে থাকা নিকির সঙ্গে কথা বলছে। মাথা ঘুরিয়েছিলো বলে তার মুখটা পুরোই ঝাপসা হয়ে গিয়েছে, নিকির চেহারায় উপরের লাইটের আলো অস্বাভাবিকভাবে পরে দেখাচ্ছে এলিয়েনের মতন। অপরদিকে ওয়াল্টার অর্ধেক ফ্রেমের বাইরে।
- দেখ কি করেছে ব্যাটা! আমার হ্যান্ডসাম মুখটা পুরোই ঝাপসা করে দিয়েছে!
- ওটা ব্লার অ্যাস্থেটিক!
ঠাস করে দোহার গালে চাপড় বসালো গ্যাবি, খিলখিল করে হেসে উঠলো সে। ওয়াল্টার মাথা দুলিয়ে পরাজিত ভঙ্গিতে বললো,
- ও ছবি আপলোড দেয়ার সময় আশেপাশের মানুষের অবস্থা দেখে না, নিজে ঠিক থাকলেই হলো।
- সেলফিশ কোথাকার। পঁয়তাল্লিশ মিলিয়ন ফলোয়ারের অ্যাকাউন্ট ভাই একটু তো খেয়াল কর!
দোহা ফ্লোরে উঠে বসে চিবুক চাপতে চাপতে জানালো,
- আমার ব্রো তোর মতন একশো ছবি তুলে চোদ্দশ ফিল্টার বসানোর সময় নেই। তাছাড়া, ওটাতেই আমাকে সবথেকে সুন্দর দেখাচ্ছে।
তেঁতে উঠলো গ্যাবি, দোহা স্পষ্টত তাকে খুঁচিয়ে রাগানোর চেষ্টায় আছে বুঝে বেচারা চিৎকার করলো,
- তুই একটা বেয়াদব বেয়াল্লিশ!
হেসে উঠলো দোহা। পুনরায় ঠিকঠাক হয়ে বসে গিটার তুলে নিলো। আরো ঝগড়া এড়াতে তাড়াতাড়ি কানে হেডফোন লাগিয়ে গিটারের স্ট্রিংয়ে মনোযোগ দিলো। গ্যাবিও ফুঁসতে ফুঁসতে শেষমেষ ওয়াল্টারের কাছে গিয়ে বসলো।
ঠিক কতক্ষন সকলে মিলে প্র্যাকটিস করছিলো হিসাব নেই। প্র্যাকটিস রুমের দরজা খুলে যেতেই আনমনে একে একে নিজেদের কাজে সামান্য বিরতি দিয়ে ফিরে তাকালো সবাই। দরজায় দাঁড়ানো নিকোলাস। পরনে হাতছাড়া ঢোলা একটা টি শার্ট, খানিকটা বাস্কেটবল জার্সির মতন দেখতে। সঙ্গে শর্টস। গলায় ঝুলছে একটা সিলভার চেইন। ভীষণ উৎফুল্ল চেহারায় তাকিয়ে আছে সে। ঠোঁটজুড়ে বিস্তৃত হাসি।
- মিসড ড্যাডি, বয়য?
- হেহ, সার্কাসের শং এসে গেছে।
গ্যাবির মন্তব্যে অন্যান্য সময় নিকি পায়ে পা বাঁধিয়ে ঝগড়া শুরু করলেও আজ করলোনা। বরং দ্বিগুণ হাসলো। ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেলো নিকি একা নয়। তার অনুসরণে পিছনে আরো একজন রয়েছে। একমাত্র দোহা বাদে সকলে প্রসারিত দৃষ্টি মেলে দেখলো মানুষটিকে, দোহা তখনো ব্যস্ত গিটার নিয়ে। কানে হেডফোন থাকায় সে খেয়াল করেনি নিকি কিংবা অন্য কারো আগমন।
এক রমণী। শারীরিক গঠন বেশ ভারী। ওজন আশি - নব্বইয়ের মধ্যে কিছু হবে হয়তো। আলুথালু শরীর, প্রশস্ত বুক এবং কোমর। মুখটা তুলনামূলক ছোট এবং গোলগাল। উজ্জ্বল ফর্সা ত্বকের মাঝে প্রাকৃতিক লালিমার ছোঁয়া। পরনে একটা ঢোলা ম্যাক্সি গাউন, তাতে ফ্লোরাল প্রিন্ট। অনন্য এক মুখশ্রী, শারীরিক গঠনের সাথে যা মানিয়েছে দারুণভাবে। নাকে চিকচিক করছে ছোট্ট একটি নথ, উজ্জ্বল পাথরের। পাতলা ঠোঁটজুড়ে অমায়িক উষ্ণ হাসি। সবথেকে চমকপ্রদ ব্যাপার তার কেশরাশি। লালচে ওয়াইন রেড বর্ণের মসৃণ চুল তার কাঁধ বেয়ে নেমে গিয়েছে একেবারে কোমরের নিচে। ভুঁড়ি হয়ত আছে কিন্তু বোঝা যাচ্ছেনা পোশাকের উপরে। ডাগর ডাগর আঁখি মেলে তাকিয়ে আছে অতি উৎসাহে। তার গোটা অবয়বে অজান্তেই দৃষ্টি বুলিয়ে আনলো সবাই, রানওয়ের প্লাস সাইজ মডেলদের কথা মনে পড়ে মেয়েটির স্নিগ্ধ অবয়ব দেখলেই।
নিকি গলা খাঁকারি দিয়ে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করলো।
- সো গাইয, মিট আওয়ার নিউ সং রাইটার ফর দ্যা নেক্সট অ্যালবাম.....
নিকির প্রফুল্ল আওয়াজ এবং দুই হাতের স্বাগতমের ভঙ্গিমায় সবাই ভীষণ উৎসাহী নয়নে তাকালো। কান থেকে হেডফোন খুলে দোহা উঁকি দিলো হাসিমুখে। তবে তার সেই হাসি ম্রিয়মাণ হয়ে গেলো সম্পূর্ণ, থমকে গেলো হৃদস্পন্দন, বিলীন হলো গোটা জগৎ।
এগিয়ে এলো অস্তিত্বটি, মায়াবী হাসিমাখা অধর তার। দুহাত তুলে সকলের উদ্দেশ্যে সম্ভাষণ প্রকাশ করে মোলায়েম কণ্ঠটি বলে উঠলো,
- দ্যা নেইম ইয আমারা খান, ইউ ক্যান কল মি আমারা। ফাইনালি মেট ইউ অল সাইরেনস!
- শিট!
একসাথে হেসে উঠে হাততালি দিয়ে উঠলো গ্যাবি এবং ওয়াল্টার, স্বাগতম জানালো। একমাত্র দোহা নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো, যেন জড়বস্তুতে পরিণত হয়েছে সে।
স্বপ্ন দেখছে সে? ভয়ংকর রকমের সুন্দর স্বপ্ন?
অবাধ্য নয়নজোড়া তার ভীষণ বেহায়া হয়ে ঘুরপাক খেলো আমারার গোটা অবয়বে। লেপ্টে গেলো গভীর দৃষ্টি ওই প্রশস্ত শরীরে, ছুঁয়ে গেলো ওই দীঘল মসৃণ রঙিন চুলের বাহারকে, গেঁথে গেলো পাতলা ঠোঁটের গোলাপ আবরণে, নাকের ডগায় দ্যুতি ছড়ানো ছোট্ট অলংকারে, অতঃপর জমে গেলো ডাগর আঁখিমাঝে। অন্তর চিৎকার করে উঠলো। অনুভূতিরা আছড়ে মুখ থুবড়ে পড়লো। সমস্ত অন্তরাত্মা বিদ্রোহ ঘোষণা করলো।
কোনো স্বপ্ন নয়।
এ তার আমারা! সত্যিই আমারা!
তার ভালোবাসার নোলক!
যার বিরহে প্রতিদিন দগ্ধ হয় দোহার অন্তর, আজ সেই তার মুখোমুখি।
অনুভূতি কেমন? বর্ণনাযোগ্য নয়। দোহার বুকে ওঠা টালমাটাল বৈশাখীর ঝড় সবকিছুকে যেন তছনছ করে দিলো। কেঁপে উঠলো শরীর তার থরথর করে। চোখ ঠিকরে এলো অশ্রু। অবাধ্য জোরে সবটা চেপে রাখলো সে দারুণভাবে। চেয়েই থাকলো, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো তার প্রেমকে। এতগুলো বছর পেরিয়ে যাকে দেখছে, সে আদতেই তার নোলক তো? ছুঁয়ে দিলে আবার কর্পূরের মতন উবে যাবে না তো? যদি যায়? কি হবে? চেপে এলো দোহার বুক।
দোহার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া কারো দৃষ্টি এড়ালোনা। সকলেই একে অপরের মাঝে নীরব দৃষ্টি বিনিময় করলো। ওয়াল্টার পাশ থেকে হাত বাড়িয়ে সম্মোহিত হয়ে যাওয়া দোহার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো,
- ইউ অলরাইট ব্রো?
দোহা যেন সম্বিৎ ফিরে পেলো। তীব্রভাবে মাথা ঝাঁকালো। তারপরই কাউকে কোনরকম ব্যাখ্যা না দিয়ে সশব্দে গিটারটা মেঝেতে ফেলে উঠে দাঁড়ালো। হেডফোন টেনে খুলে ছুঁড়ে দিলো দূরে। লম্বা কয়েক পদক্ষেপে দূরত্ব ঘুচিয়ে এসে থামলো বরাবর আমারার সামনে। মুখোমুখি হলো ভালোবাসার, আরো একবার। নিঃশ্বাস প্রশ্বাস দ্রুততর হয়ে উঠলো, দুচোখ ভরে এলো টলটলে অশ্রু। আমারার গভীর নয়নজোড়া তার দিকে অব্যক্ত এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
- আ....আমারা...
ভাঙা কন্ঠে ধ্বনিত হলো আবেগের আখ্যান। গ্যাবি, ওয়াল্টার নিজেদের জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। কি হচ্ছে কেউ বুঝতে পারছেনা। নিকিও একপাশে দাঁড়িয়ে স্থির তাকিয়ে আছে। দোহার দুহাত কাঁপলো। হিতাহিত জ্ঞানশূণ্য হয়ে পড়েছে সে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কম্পিত হাতের আঙ্গুল তুলে সে ছুঁয়ে দিলো আমারার গাল, যেন নিশ্চিত হলো এ কোনো স্বপ্ন নয়। আমারা তাকে বাঁধা দিলোনা, কৌতূহলী এক দৃষ্টিতে দেখলো শুধু। দোহার ঠোঁট কিশলয়ের মতন তিরতির করে কেঁপে উঠলো, ভাঙা ক্ষীণ কন্ঠে ফিসফিস করলো,
- মাই প্রিন্সেস....
মনে হলো আমারার শরীরে বুঝি তড়িৎ খেলে গেলো। সে ভীষণ এক আগ্রহ নিয়ে দেখলো দোহাকে, ভ্রুজোড়া কুঁচকে এলো মনোযোগে। দোহা শক্ত একটি ঢোক গিলে কিছু বলতে যাচ্ছিলো, কিন্তু তখনি রমণীর প্রশ্নটি তার বুকে বি*দ্ধ হলো ধা*রালো তীরের ফলা হয়ে।
- হ্যাভ উই মেট বিফোর?
আমারার চোখজোড়া সুস্থির, কৌতূহলী। তাতে ঝুলছে প্রশ্ন। দোহা সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে গেলো। মনে হলো কিছু একটা ফালাফালা হয়ে গিয়েছে তার ভেতরে। শীতল আতঙ্কের স্রোত খেলে গেলো শিরদাঁড়া বেয়ে তার।
- তুমি....আমাকে চেনো না?
বাংলায় জিজ্ঞেস করলো দোহা, যার দরুণ বাকিরা বুঝতে পারলোনা কিছুই। শুধু আমারা বুঝলো। সে দ্বিগুণ কৌতূহলোদ্দীপক হয়ে জানালো,
- শেহবাগ দোহাকে কে না চেনে? কিন্তু....
- কিন্তু?
- যদিও আমাদের আগে কখনো দেখা হয়নি, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আপনাকে আমি আগেও দেখেছি!
ভূ - কম্পন। বিরাট এক ধ্বস। গুঁড়িয়ে গেলো গোটা পৃথিবী। শক্তিশালী জলোচ্ছ্বাস ভাসিয়ে নিলো জগৎকে। থমকে গেলো ধরিত্রী, ঘূর্ণন বন্ধ হলো। স্থবির হলো মহাকাল। থেমে গেলো সময়।
দোহার হাতটি ঝুলে পড়লো। এক ফোঁটা অশ্রু তার নয়ন বেয়ে গড়িয়ে নামলো। সিক্ত পথ সৃষ্টি করে নেমে গেলো একেবারে চিবুক পেরিয়ে গ্রীবায়। বিষাদে ঘোলাটে হয়ে গেলো দৃষ্টি। অনুভব ছিন্নভিন্ন করে দিলো আপন অস্তিত্ব।
আমারা ভুলে গিয়েছে।
আমারা সত্যিই দোহাকে ভুলে গিয়েছে!
কিভাবে সম্ভব?
জানা নেই।
দোহার চাওয়া পূরণ হয়েছে।
আমারা তাকে সম্পূর্ণভাবে ভুলে গিয়েছে।
আমারার স্মৃতির পাতায় “দোহা ” নামক কোনো অধ্যায়ের অস্তিত্ব নেই।
—( প্রথম পরিচ্ছেদের সমাপ্তি )—
Amara and Doha's love story or tragic story continues.............