#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৩২
পর্ব ৩২: [ ব্যাক টু ইংল্যান্ড ]
━━━━━━━━━━━━━━━━
“ তোমাকে মনে করার আজ ৩৭০০ তম দিন। উহু, সত্যি বলতে আমার গোটা জনমই বিলীন তোমার স্মরণে। কিন্তু তোমাকে দেখিনা আজ প্রায় চারটা হাজার দিন পেরিয়ে গেলো। পৃথিবী কতবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে ফেললো, চাঁদ কতবার গ্রহণের ছায়ায় উধাও হলো, নদী কতবার জোয়ার ভাটার জলোচ্ছ্বাসে ভাসলো, বসন্ত কতবার পৃথিবীর বুকে ফুলেল ছাপ ফেলে গেলো ; অথচ আমি একটাবারও তোমার দেখা পেলাম না। এতই অভাগা জন্ম আমার?
সত্যি জানো কি? আমি আসলে অভাগা নই। আমি হলাম ভীতু। কাপুরুষ। তাই হয়ত হারিয়ে ফেলার পর তোমার খোঁজ করিনি। তোমার পবিত্রতম মুখে ঘৃণা নামক অনুভূতিটা আমি নিজের উদ্দেশ্যে দেখার চেয়ে নাহয় আপনাকে ধ্বংস করবো। ঘৃণার বীজ আমিই তোমার অন্তরে সযত্নে পুঁতে দিয়েছি। এখন আর ফল আমাকে বড্ড পোড়ায়। তুমি ঠিকই বলেছিলে। আমি কাপুরুষ - ভীতু একটা মানুষ। যার নিজের কর্মফলকে মোকাবেলা করার শক্তি নেই।
কিন্তু তবুও যখন এই দেশটার বুকে পা রাখলাম, স্মৃতির প্রজাপতিরা আমাকে তাড়া করে বেড়ালো। এ যেন তাদের দূর্বার আন্দোলন, অনুভূতিকে খুঁজে নেয়ার। মানুষের হৃদয় বড়ই আজব কারখানা। চির অধরা জেনেও পিপাসার্ত পথিকের মতন ছুটে গেলাম শেষ আশাটুকুর উদ্দেশ্যে। তখনি আমার কর্মফল আমাকে জানিয়ে দিলো, তোমাকে আমি সত্যিকারেই হারিয়ে ফেলেছি। আর কোনোদিন খুঁজে পাবোনা। এটা আজ নয়ত কাল যে হওয়ারই ছিলো, তবুও কেনো সইতে পারছিনা দহনের ব্যথা? কি জাদু করেছ তুমি আমার অন্তরে যে আমি হাজার হাজার দিন পেরিয়েও একটাবারও তোমায় ভুলে থাকতে পারিনি! এ তোমার অভিশাপ নাকি আশীর্বাদ?
অভিশাপই হয়ত, আর কখনো তোমাকে না পাওয়ার অভিশাপ। তোমার বিরহের অনলে দগ্ধ হওয়ার অভিশাপ। এই অভিশাপ আমি মাথা পেতে নিলাম।
সহস্র রজনী তুমি হীনা
আমি পথিক দিকহারা।
কোন কূলে ভিড়ালে তরী?
দেখব তোমায় পরান ভরি।
তুমি অধরা দুয়ার বদ্ধ,
আমার অন্তরের পিপাসা নিষিদ্ধ।
এই ইহকালের সমাপ্তির আগে তোমায় শুধু একটাবার দেখার পিপাসা কি কোনোদিন মিটবে.....নোলক আমার?
হয়ত না। আর কোনোদিন না।
তোমার জয়, আমার হার।
তবুও বেহায়ার মতন বলি,
.....নোলক দোহার।
ইতি,
তোমার কেউ না। ”
দমকা হাওয়ায় কাগজের উপরে কয়েকটি শুকনো পাতা এসে পড়লো। দোহার কলম থামলো। মুখ তুলে সে তাকালো উপরে। তার নিজের হাতে রোপিত গাছটি আজ মাঝারি বৃক্ষে রূপান্তরিত হয়েছে। ঝরিয়ে যাচ্ছে নিজের শুকনো বাদামী পাতা, বর্ষণের মতন। দোহা পাতাটি ফেলে দিলোনা। বরং কাগজের ভাঁজে নতুন ঠিকানা দিয়ে সেটিকে আবদ্ধ করে ফেললো খোলা চিঠির ঘরে। কোমল নয়ন তার বয়ে এসে থামলো উঁচু ভূমির উপর। গাছটি তার পাশেই দন্ডায়মান। সঙ্গে একটি কবরফলক। মলিন অক্ষর খচিত। দোহা ভূমিতে বসেই তাকিয়ে রইলো নিষ্পলক।
অনিক রহমান।
মৃত্যুসাল: ১ নভেম্বর ২০১৪।
━━━━━━━━━━━━━━━
বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম।
গোটা গ্যালারি কানায় কানায় পরিপূর্ণ। উপচে পড়া ভীড় এবং দর্শকদের উৎসাহ সামাল দিতে বিশেষভাবে নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনীকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। শেহবাগ দোহার বাংলাদেশে অন্তিম কনসার্ট আজ। উত্তেজনা - উৎসাহ এবং উদ্দীপনা তাই ব্যাপক। যারা এই কনসার্টে সশরীরে উপস্থিত থাকার ভাগ্য অর্জন করতে পারেনি তাদের অনেকেরই ভীড় স্টেডিয়ামের বাইরে। প্ল্যাকার্ড হাতে সকল ভক্তদের উৎসাহী চিৎকারে ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে চারপাশ। রাজধানী এমনিতেও জ্যামে ভুগে চলে। আজকের জ্যাম আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টেডিয়ামের পাশের সড়কজুড়ে গাড়ী আটকে আছে। দর্শকদের অতিরিক্ত উপস্থিতি সুচারু ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও সবকিছু জটিল করে তুলছে। তবে অদ্ভূত হলেও সত্য কারো তেমন ক্ষোভ নেই। স্টেডিয়ামের ভেতরে হওয়া পারফরম্যান্সের শব্দ ভেসে আসছে বাইরেও। ছোট ছোট এল ই ডি স্ক্রীনে ভেতরের দৃশ্য বাইরের মানুষদের জন্যও দেখানো হচ্ছে। নিজ নিজ গাড়ীর ভেতর অপেক্ষায় থেকেও সময়টা অদ্ভুতভাবে উপভোগ করছে সবাই। শেহবাগ দোহার কনসার্ট বলে কথা! এই দেশের গর্ব এবং অহংকারে পরিণত হয়েছে ছেলেটি। দেশের নাম উন্মোচন করেছে বিশ্বের দরবারে।
স্টেডিয়ামের ভেতরের দৃশ্য স্বর্গীয়। প্রত্যেকের হাতে হাতে মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট। স্টেজের উপর থাকা স্বপ্নের পুরুষটির গায়কীর সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে দুলে চলেছে তা এদিক সেদিক। যেন অসীম আকাশে দোল খাচ্ছে নক্ষত্রের দল। ড্রোন ক্যামেরাগুলো ইতিউতি ঘোরাফেরা করছে পাখির মতন। দৃশ্যগুলো ফ্রেমবন্দী হচ্ছে দারুণভাবে। গিটারের ঝংকার, ড্রামসের তাল এবং পিয়ানোর সুর সকলকে ক্রমশ ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে অন্য জগতে।
স্টেজের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে আছে দোহা। স্নিগ্ধ কন্ঠে গাইতে গাইতে জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে দেখে যাচ্ছে গ্যালারিভর্তি ভক্তদের। স্ট্যান্ডিং সেকশনে থাকা ছেলেমেয়েগুলো তার গানের তালে তালে দুলতে দুলতে নিজেরাও গলা মেলাচ্ছে। দোহার বুকের ভেতরটা উষ্ণ হয়ে উঠলো। আবেগে ভাসলো গোটা অস্তিত্ব। আর কয়েক বছর আগেও এমন দৃশ্য ছিলো তার স্বপ্নের মতন। ইংল্যান্ড গিয়েই সবটা পানির মতন সোজা হয়ে যায়নি তার জন্য। বরং সুদীর্ঘ আরেক সংগ্রামের অধ্যায় অপেক্ষারত ছিলো তার সাধারণ এক ছেলে থেকে শেহবাগ দোহা হয়ে ওঠার গল্পে। সেই সংগ্রামের কাহিনী নাহয় আস্তে ধীরে স্মরণ করা যাবে পরে।
বাজনা ম্রিয়মাণ হয়ে এলো। দোহা শেষ গানটি পরিবেশনার আগে বোতল থেকে খানিকটা পানি পান করে নিলো। অধীর আগ্রহ সবার। দোহা মাইক্রোফোন মুখে তুললো, মৃদু হেসে বললো,
- এবার....
- স্বরলিপিতে তুমি!
তার বলতে হলোনা। হাজার হাজার দর্শকের কন্ঠ একসাথে ঘোষণা করে দিলো। উল্লাসে ফেটে পড়লো চারপাশ। এত গুঞ্জনে মুহূর্তের জন্য সাউন্ড সিস্টেমের শব্দও ফিকে হয়ে গেলো। দোহা একগাল হাসলো। ঘামে ভেজা চুলে আঙুল বুলিয়ে পিছনে ফিরে সঙ্গীদের ইশারা করলো। প্রথমে বেজে উঠলো পিয়ানোর সুর। তারপরই দোহার অভিজ্ঞ এবং শক্তিশালী আঙুলে উঠলো গিটারের ঝড়। দ্বিতীয় দফায় চিৎকারে ভরে উঠলো চারপাশ।
- শেহবাগ দোহা! শেহবাগ দোহা!
- দ্যা ডুম!
মন্ত্রের মতন জপতে থাকলো সকলে। অদ্ভুত সুরে উঠলো ভক্তদের গুণগান। দোহা মাইক্রোফোনে নিজের অনবদ্য অভিনব কন্ঠস্বরে গেয়ে উঠলো,
“ তোমারই মাঝে দেখেছি শুধুই
চাওয়া না পাওয়ার ঝলক....”
আলুথালু শরীরের এক কিশোরী। নিষ্পাপ ডাগর ডাগর চাহুনি আর একঝাঁক বিশ্বাসের বাণী। দুহাত বাড়িয়ে ভালোবাসা বিলিয়ে আগমন ঘটেছিলো তার।
“ আমার একলা মনের হারিয়ে ফেলা
একটি ঝরা পালক ”
সেই কিশোরী, তার শুভ্রতা, তার নিষ্পাপতাকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ঠেলে দেয়া হয়েছিল বারংবার, দূরে, বহু দূরে। ভালোবাসার বিনিময়ে তার ভাগ্যে জুটেছিলো বিশ্বাসঘাতকতা।
“ চাঁদের ছায়ায় অলীক মায়ায়
দুলছে তারা দুলুক ”
অনুভূতির জোয়ার কিশোরের হৃদয়েও এসেছিলো। ভীষণভাবে। ভালোবাসার রং তাকে ছেয়ে গিয়েছিলো দারুণভাবে। কিন্তু ততদিনে কিশোরী যে তার পর হয়ে গিয়েছে! গ্রহণ হবে কি এই নিষিদ্ধ অনুভূতি?
“ গন্তব্যহীন এই যাচ্ছে জীবন
থামলে থামার থামুক....”
কিশোর তাকে হারিয়ে ফেললো। নিজের দোষে। নিজের হাতে দূরে ঠেলে দিলো সে ভালোবাসাকে। নিষ্ঠুর কাপুরুষের মতন। দুটি সত্তার বাঁধন ছিঁড়ে গেলো। মুক্ত হয়ে গেলো আলুথালু কিশোরী। নিজের সবটুকু ভালোবাসার উষ্ণতা ছিনিয়ে সে হারিয়ে গেলো। সেই যে গেলো, আর এলোনা। কিশোরের জীবন হয়ে পড়লো উদ্দেশ্যহীন। ভাঙা নৌকা, উত্তাল নদীতে বয়ে চলার গন্তব্যহীন যাত্রা। জয়, পরাজয়, থামা, চলা কোনোকিছুরই আর কোনো পরোয়া নেই।
রোমন্থনের স্মৃতিগুলো আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেললো দোহার অন্তরকে। চেপে ফেললো অনুভূতিদের, দারুণ কষ্টে। ভগ্ন হৃদয় সহস্রবারের মতন খানখান হলো।
অসহনীয় উপলব্ধি— দোহা হারিয়ে ফেলেছে। সত্যিই নিজের জীবনের সবকিছু হারিয়ে ফেলেছে। তার গোটা পৃথিবী রিক্ত - শূণ্য। সব থেকেও তার কাছে আজ কিছুই নেই। কিচ্ছু না।
- তুমি~ আমি~ উন্মা.... দনার... ঝোঁ.....!
ক্রন্দন।
ফোঁপানোর শব্দ।
গোটা বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের হাজারো দর্শকের তীব্র গুঞ্জন, চিৎকার, উৎসাহী গর্জন সবকিছু মিলিয়ে গেলো যখন মাইক্রোফোনে সুরেলা কণ্ঠের বিপরীতে ভগ্নতা প্রকাশ পেলো। সকলকে জমিয়ে দিলো ওই ধ্বনি, অন্তরকে নাড়িয়ে দিলো।
প্রথমবারের মতন কনসার্ট স্টেজের এল ই ডি স্ক্রীনে সকলে নিজেদের স্বপ্ন— দ্যা ডুমের চোখে অশ্রু দেখলো।
দোহা কাদঁছে। ট্যাঙ্ক টপ এবং শার্ট জড়ানো অঙ্গ তার কিঞ্চিৎ কাঁপছে। টানা টানা নয়নমাঝের অশ্রু গাল গড়িয়ে নেমে ঠোঁটযুগলকে সিক্ত করে তুলছে। গোটা জগৎ থমকে যেতে অবিশ্বাস্য দৃশ্যটুকু যথেষ্ট।
মিউজিক নিজের ধারায় বয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু দোহা গাইতে পারছেনা। হাত পা ছেড়ে আসছে তার। মাইক্রোফোন ধরা হাতের পিঠ সে ঠোঁটে চেপে ধরে ফুঁপিয়ে যাচ্ছে। জীবনে এতটা কষ্ট, এতটা অসহায়ত্ব শেষ কখন অনুভব করেছে সে নিজেও মনে করতে পারছেনা। ব্যাকস্টেজে আর্থার এবং ম্যানেজমেন্ট টিমের সবাই হতবিহ্বল, দর্শক হতবাক। এ কেমন ইতিহাস লিখিত হচ্ছে শেহবাগ দোহার অন্তিম কনসার্টের দিনে?
নাক টেনে দোহা মাইক্রোফোনে ভাঙা কন্ঠে বলার চেষ্টা করলো,
- আই....অ্যাম সরি। ছন্নছাড়া আমি....আমার স্বরলিপিতে.....তুমি...
গাইতে চাইলেও গলা কেঁপে উঠলো ভীষণভাবে। দোহা শেষ করতে পারলোনা। হাঁটু ভেঙে এলো তার, স্টেজের উপরেই উবু হয়ে বসে পড়লো। হাজার হাজার দর্শক একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলো। উহু, চিৎকার নয়, হাহাকার।
- শেহবাগ দোহা!
- দ্যা ডুম! হোয়াট হ্যাপেন্ড?
মুহুর্মুহু প্রশ্নবাণে চারদিক অস্থির হয়ে উঠলো। দোহা অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে রইলো গ্যালারির দিকে, যেন আবছায়ার মতন দেখলো প্রতিটি ব্যথিত মুখকে। অতঃপর কম্পিত হাতে দ্বিতীয় দফায় মাইক্রোফোন মুখে তুলে মিনমিন করলো,
- ডোন্ট ওয়ারি।
একটি শক্ত ঢোক গিললো দোহা, দূর আকাশের দিকে তাকালো জ্বলজ্বলে আর্দ্র নয়নে। তার সুগভীর কন্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো গোটা স্টেডিয়ামজুড়ে।
- আই জাস্ট রিয়ালাইজড....আই....লস্ট.... ফরএভার!
নৈঃশব্দ্য।
দোহার নাক কুঁচকে এলো, ভ্রুজোড়া আবর্তিত হলো তীব্র কষ্টের অনুভূতিতে।
- এই বুকফাটা আক্ষেপের বোঝা আমি জনমভর বইবো কেমন করে?
অদৃশ্য সত্তার উদ্দেশ্যে রাখা প্রশ্নটির অর্থ কয়জন অনুভব করলো, দোহা জানেনা। সে শুধু এটুকু জানে,
আজ জিতে গিয়েও হেরে গিয়েছে সে।
- নো! তুমি হেরে যাওনি! আমরা আছি।
- শেহবাগ দোহা ইয নট জাস্ট আ নেইম, ইটস আওয়ার ইমোশন!
- হেরে গেলেও উঠে দাঁড়াও, আরো একবার, তোমাকে পারতেই হবে!
- দ্যা ডুম ক্যান নট লুয!
মুহুর্মুহু চিৎকার ভেসে আসতে থাকলো গ্যালারি থেকে। দোহা এবং ব্যাকস্টেজে গোটা ম্যানেজমেন্ট টিম স্তব্ধ তাকিয়ে রইলো। দোলা দিয়ে উঠলো প্রেরণারা দোহার অন্তরে। জীবন তাকে শূণ্য করে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু রেখে গিয়েছে প্রেরণাদের। এই রিক্ত জীবন থেমে থাকবেনা। জীবনের অর্থই এগিয়ে চলা।
দোহা উঠে দাঁড়ালো। ঢোক গিলে কৃতজ্ঞতা এবং মুগ্ধতার দৃষ্টিতে দেখলো ভক্তদের। তারপর মাইক্রোফোনে কান্নামিশ্রিত হাসির সঙ্গে বললো,
- লাভ ইউ মাই হোপস। একটা কথা মনে রেখো। জীবনে যা তুমি খুব করে চাও, তা কখনো হারিয়ে যেতে দিওনা। প্রয়োজন হলে লড়াই করো, সংগ্রাম করো, আঘাত পাও, ভেঙে যাও, তবুও আগলে রাখো। হাজার ঝড়ঝাপ্টা এলেও প্রিয় কিছুকে ধরে রাখো এমনভাবে, ঠিক যেমনভাবে শিকড় ধরে রাখে বৃক্ষের অস্তিত্বকে। হারিয়ে যেতে দিওনা, কখনো না। কারণ একবার হারিয়ে গেলে, তুমি আর কখনোই খুঁজে পাবেনা। খুঁজে নেয়ার প্রতিজ্ঞা অন্তরের ধূসর মরীচিকা। খুব করে চাওয়াকে ফিরিয়ে দিলে তা পরিণত হয় চির অধরায়। তাই ফিরিয়ে দেয়ার কিংবা হারিয়ে ফেলার ভুল কোনোদিন করোনা, কোনোদিন না।
একটু থামলো দোহা, তার কন্ঠে ধ্বনিত হলো,
- বিদায় বাংলাদেশ।
নিস্তব্ধপুরী গোটা স্টেডিয়াম। প্রতিটি বক্তব্য একদম হৃদয়ে গেঁথে গিয়েছে প্রত্যেকের। সেই নিস্তব্ধতা ভেদ করেই দোহার বিখ্যাত কর্কশ ভাঙা কন্ঠস্বর তুঙ্গে উঠলো সুরের তালে,
- তুমি, আমি, উন্মাদনার ঝোঁক....নোলক~
নতুন এক ইতিহাস লিখিত হলো আজ শেহবাগ দোহার অনন্যসাধারণ কনসার্টের পাতায়।
。
。
。
রাত বারোটা পঁয়তাল্লিশ মিনিট।
গাড়ী অপেক্ষা করছে বিল্ডিংয়ের সামনে। আর্থার দরজায় হেলান দিয়ে নিজের আইপ্যাড মনোযোগ দিয়ে দেখছে। গোটা ইন্টারনেটে এখন ভাইরাল শেহবাগ দোহার কনসার্টের ক্লিপ, বিশেষ করে তার কান্নার মুহূর্তটুকু। মন্তব্য, রিউমার, অনুমান ইত্যাদির জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে একেকটি পোস্ট। সাইরেনস প্লেয়ার - ব্যান্ডের ভক্তরা ভীষণ আবেগী হয়ে পড়েছে, সঙ্গীতপ্রেমী মানুষজন অনুভূতিসম্পন্ন মন্তব্য করছে। কেউ কেউ তো ধরেই নিয়েছে হয়ত দোহার কাছের কোনো একজন হারিয়ে গিয়েছে। এক কথায় আলোচনা তুঙ্গে। এসব নিয়ে অফিশিয়ালি কিছুই বলা হবেনা। তবুও আর্থার নজর রাখার কাজ রাখছে, যেন অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি না হয়ে যায় কোনো ব্যাপারে। দোহার সঙ্গে সে কথা বলার চেষ্টা করেছে হঠাৎ এই ইমোশনাল ব্রেকডাউনের ব্যাপারে। কিন্তু ছেলেটা কনসার্টের পর থেকে একদমই চুপসে গিয়েছে। তাই তাকে চাপ দেয়নি সে।
দোহা এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে বিল্ডিংয়ের গেইটের সামনে। মুখোমুখি রাজিয়া এবং মর্জিনা। বেচারী মর্জিনার ব্লাশ মাখা চেহারা মুষড়ে পড়েছে। কাজল টানা চোখে অশ্রু ভরে আসার কারণে লেপ্টে যাচ্ছে। দোহা খানিকটা শূণ্য চোখেই রাজিয়াকে দেখলো। তারপর সামান্য ঝুঁকে তার পা ছুঁয়ে সালাম করে বললো,
- আসলাম তাহলে দাদু। দোয়া করবেন।
- দোয়া করি সবসময়। অনেক ভালো থাকো। সফল তো হয়েছোই নিজ পরিশ্রমে, আরো সফল হও এই কামনা।
দোহা মাথা দোলালো, তাকালো মর্জিনার দিকে। মেয়েটা একটুর জন্য কাঁদছেনা। মুচকি হাসলো দোহা, মৃদু আঁচে জানালো,
- গুডবাই। ভালো থেকো বেইব, কেমন?
- আপনি আর আসবেন না?
মর্জিনার শিশুসুলভ প্রশ্নে দোহা কাঁধ উঁচু করলো,
- ইচ্ছা নেই। তবে যদি ভাগ্য চায়, অবশ্যই। ভালো থেকো। দাদুর যত্ন নিও।
উল্টো ঘুরে গেলো দোহা গাড়ির দিকে। মর্জিনা ওড়না মুখে চেপে ফুঁপিয়ে উঠতে নিলো, পাশ থেকে রাজিয়া তার হাত চেপে তীব্র ইশারায় চুপ থাকতে বললেন। দোহাকে গাড়ির কাছে এগিয়ে আসতে দেখে আর্থার দরজা খুলে দাঁড়ালো।
- রেডি টু গেট ইন?
- হুম।
যে মুহূর্তে দোহা গাড়ির ভেতরে পা রাখতে নেবে ওই মুহূর্তেই সে হঠাৎ থমকে গেলো। আর্থার ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
- কি হয়েছে?
দোহা জবাব দিলোনা। তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো। একপাশ ফিরে সে গলির আঁধার প্রান্তের দিকে উঁকি দিলো। হাত তুলে আর্থারকে থামতে বলে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো সে ঐদিকে। বাকিরা শুধু অবাক চেয়ে দেখলো। কিছুই বুঝতে পারলোনা যতক্ষণ না আঁধার ঠেলে বেরিয়ে এলো এক ছায়ামূর্তি। দোহা থমকে দাঁড়িয়ে সতর্ক নজরে দেখতে লাগলো। কালো বোরখা পরনে এক রমণী। নিকাবের অন্তরাল থেকে জ্বলজ্বলে দুটি চোখ চেয়ে আছে, ওই দৃষ্টি দোহার খুব চেনা। বুকের ভেতর বরফ জমানো এক অনুভূতি জেঁকে বসলো। ভাঙা গলায় বহু বছর পর ডাকলো,
- আপু?
দুই চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরতে আরম্ভ করলো। নিকাবটি উত্তোলিত হলো। ফিকে আলোর প্রতিফলনে দেখা মিললো মলিন মুখটির। জৌলুস হারিয়ে সৌন্দর্য্য বিলীন হয়েছে। শ্যামলা রোদে পোড়া বর্ণ, পরিশ্রান্ত দূর্বল চাহুনি। বয়স অতটা না হলেও মনে হচ্ছে মধ্যবয়স যেন পেরিয়ে গিয়েছে। বোরখার কারণে শারীরিক অবয়ব বোঝা না গেলেও দোহা দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে টের পেলো দূর্বলতা। একটি ঢোক গিললো সে আনমনে। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দিয়া।
- কেমন আছিস ভাইয়া?
কণ্ঠটি এতটা ক্ষীণ শোনালো যে দোহার শুনতে বেশ বেগ পোহাতে হলো। সুতীব্র মনোবাসনা হলো তার। ঝাঁপিয়ে পরে বুকের মাঝে মানুষটিকে আলিঙ্গন করে নিতে। কিন্তু পারলোনা। ভেতর থেকে কিছু একটা চরম বাঁধা দিলো। দোহা দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো, তাকালো একপাশে। দিয়া তার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে ফ্যাকাশে মুখে একটু হাসার চেষ্টা করলো।
- অভিমান করেছিস?
জবাব নেই। দোহার দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ হলো। দিয়া মাথা নত করে ফেললো। মিনমিন করে জানালো,
- আমি জানি, তোর কাছে ক্ষমা চাওয়ার কিংবা তোকে দেখা দেয়ার মুখও আমার নেই। তবুও নিজেকে আটকাতে পারিনি বিশ্বাস কর। চলে যাওয়ার আগে, শুধু শেষ একবার তোর মুখটা দেখতে চেয়েছিলাম। পেরেছি। আমার জীবন স্বার্থক।
দোহা দ্বিতীয়বার ঢোক গিললো। কন্ঠে ঢেউ খেলিয়ে অনুভূতিটুকু নেমে গেলো গভীরে। দিয়া সিক্ত নয়নে খানিকটা দুঃসাহস করেই দুহাত তুলে দোহার মুখটা আলতো করে স্পর্শ করতে চাইলো। ছেলেটা বেশ লম্বা হয়েছে, দিয়া নাগাল পেতে একটু বেগই পোহাচ্ছে। আনমনে দোহা ঝুঁকে এলো। দিয়ার আঙুল ছুঁয়ে গেলো তার দুই গাল। চোখ বুঁজে অনুভব করলো সে আবেশটুকু। দিয়া কান্নামিশ্রিত কন্ঠে ব্যক্ত করলো,
- তুই করে দেখিয়েছিস। তুই তোর স্বপ্ন পূরণ করে সবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিস। আ ’ম সো প্রাউড অব ইউ ভাইয়া!
দোহা চোখ খুললোনা। অশ্রুপাতের ঝুঁকি আছে। দিয়া প্রাণভরে তাকে দেখলো। কতটা বদলে গিয়েছে তার প্রিয় ছোট ভাইটা! সে আর সেই ছোট্টটি নেই। তাকে এক নামে চেনে গোটা দুনিয়া। নিজেকে এমন উচ্চতায় সে প্রতিষ্ঠিত করেছে যে সেই উচ্চতাকে টপকানোর দুঃসাহস কারো অন্তরে কোনোদিনও হবেনা।
দোহা ইসলাম বিলীন হয়েছে। জন্ম নিয়েছে শেহবাগ দোহা। আর এই শেহবাগ দোহা দূর্বল কিশোরটি নয়। আত্মপ্রতিষ্ঠিত সৌষ্ঠব পুরুষ।
আজ শায়লা বেঁচে থাকলে তার চাইতে অধিক খুশি কেউ হতনা। দোহার সঙ্গীতের যাত্রাই তো মায়ের হাত ধরে।
দিয়ার মধ্যে দারুণ অপরাধবোধ হলো। দোহাকে এভাবে দেখার কিংবা ছোঁয়ার অধিকার তার আর নেই। সে নিজের ভাইকে রক্ষা করতে পারেনি। কুলাঙ্গারের মতন দূরে ঠেলে দিয়েছে। মুহূর্তেই হাত সরিয়ে সে সরে দাঁড়ালো কয়েক পা।
- পৃথিবীর সব ভালোটুকু তোর ভাগ্যে তুলে দিল খোদা। সবটুকু সফলতা তোর উপর ঝরে পড়ুক। আনন্দ, হাসি, উপভোগ এবং পরিপূর্ণতায় কাটুক তোর জীবন। দোয়া রইলো ভাইয়া। ভালো থাকিস।
সহসাই নিকাব মুখে জড়িয়ে উল্টো ঘুরে গেলো দিয়া। আর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়। সে কয়েক পা এগোতেই পিছন থেকে দোহার কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
- তুমি কি রুস্তম শেখকে বিয়ে করেছ?
জমে গেলো দিয়া। হাতের তালুতে নখর আঁকড়ে বসলো তার। ফিরে তাকালোনা। জবাবও দিলোনা। দ্রুত হেঁটে আঁধারমাঝে আড়াল হয়ে গেলো। দোহা তাকে আটকালো না। শুধু চেয়ে দেখলো। প্রগাঢ় অভিমানটুকু তাকে এগোতে দিলোনা।
কিছুক্ষণ বাদে দোহা গাড়ির কাছে ফিরে এলো। চিন্তিত আর্থার উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
- উনি কে ছিলেন?
দোহা জবাব দিলোনা। গাড়িতে চেপে বসলো। সশব্দে আটকে দিলো দরজা। আর্থার কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে থেকে পরক্ষণে তার পাশের সিটে উঠে বসলো। গাড়ি চলতে শুরু করলো সড়ক বেয়ে, এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। মিনিট দশেকের অদ্ভুতুড়ে নীরবতা ভেদ করে অবশেষে ধ্বনিত হলো দোহার কন্ঠ,
- আর্থার?
জানালা থেকে মুখ ফিরিয়ে দোহার দিকে তাকালো তার ম্যানেজার।
- হুম?
- আমাদের টিম যারা বাংলাদেশে কাজ করছে তাদের কন্ট্যাক্ট কর। কোনো ইনফরম্যান্ট ঠিক করে দিতে বল। আই নিড সাম পার্সোনাল ইনফো।
আর্থারের ভ্রু কুঁচকে এলো।
- তুই কি করতে চাইছিস?
- কারো উপর নজর রাখতে চাইছি। টেল দ্যাম আই উইল পে দ্যা ইনফরম্যান্ট হ্যান্ডসামলি।
এটুকুই। দোহা আর কিছু বললোনা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। রাতের সড়ক বেয়ে ধীরে ধীরে সুদূরে মিলিয়ে গেলো তাদের গাড়ি। দোহার বুকে চেপে বসলো ভীষণ এক চাপ।
আরো একবার জন্মভূমি ছেড়ে তার বর্তমান জগতে পাড়ি জমানো। অতীতের দুয়ারে পড়লো তালা। উন্মুক্ত হলো বর্তমানের দরজা।
━━━━━━━━━━━━━━━
ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী লিভারপুল শহর থেকে উঠে আসা সাইরেনস প্লেয়ার ব্যান্ডের। ইতিহাসবিখ্যাত “ দ্যা বিটলস ” এর সঙ্গে এইদিক থেকে বেশ মিল পাওয়া যায় তাদের। বর্তমানে শুধু লিভারপুল নয়, তাদের প্রভাব ছড়িয়ে গিয়েছে গোটা বিশ্বজুড়ে। গ্ল্যামারের শহর লন্ডন। ব্যস্ততম, বিখ্যাত, ঐতিহ্যে ঠাসা আরেক শহর। লন্ডনের কোভেন্ট গার্ডেনের এক স্ট্রীট ক্যাফেজুড়ে অতিবাহিত হচ্ছে প্রতিদিনকার মতনই সময়। পথচারীরা হাসতে হাসতে চলাচল করছে। বন্ধুর দল কিংবা কপোত কপোতী টেবিলে গল্পগুজব করতে করতে চুমুক দিচ্ছে কফির কাপে। উষ্ণতায় মোড়ানো এক প্রফুল্ল পরিবেশ। তবে সকলের অজান্তে ক্যাফেটিতে আজ চলছে ভিন্ন কিছু।
ক্যাফের চারদিকজুড়ে বসানো আছে হিডেন ক্যামেরা। কাস্টমারের ভঙ্গিতে কিছু মানুষ বসে আছে, নজর রাখছে চারপাশে। সকলেই একটি জনপ্রিয় বিনোদনমূলক টিভি শো এর টিম মেম্বার। ক্যাফের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে আছে সাইরেনস প্লেয়ারের ড্রামার। গ্যাব্রিয়েল মুরোয়ও। সংক্ষেপে গ্যাবি। পরিধানে ক্যাফের কর্মীদের ইউনিফর্ম, মুখে মাস্ক। সুগঠিত পেটানো শরীর, কাঁধ এবং বাহু বেশ ফোলানো।ঘন কালোর মাঝে নীলচে ছোঁয়ায় রাঙানো চুলগুলো ছোট্ট একটা পনিটেইল করে বাঁধা মাথার পিছনে। ক্যাপ অবশ্য সেটি ঢেকে রেখেছে সে বর্তমানে। চোখে সাধারণত চশমা না পড়লেও আজ পড়ানো হয়েছে ছদ্মবেশ ধারণের জন্য। বিনোদনমূলক এক শো এর গোপন শ্যু*টিং চলছে। সেলিব্রিটিদের সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশ ধারণ করিয়ে কার্যকলাপ উপস্থাপনের ট্রেন্ড সকলে পছন্দ করে।
গ্যাবি কাস্টমারদের সঙ্গে হাসিখুশি আচরণই করছে। এখনো অবধি কেউই তাকে চিনতে পারেনি। সফলতা। আশেপাশের গোপনে লুকানো মাইক্রোফোন এবং ক্যামেরা সবকিছুতেই দৃশ্যসমূহ রেকর্ড হচ্ছে।
কফির অর্ডার নিয়ে গ্যাবি কিচেনে গিয়ে উঁকি দিলো। আড়ালে এসে মাস্ক সামান্য নামিয়ে এক চিলতে হেসে বলে উঠলো,
- হেই ব্রো! টু ল্যাটে, ওয়ান এসপ্রেসো।
মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে থাকা দোহা তার কথায় শুধু মাথা নাড়লো। সে ব্যস্ত মিল্ক ফোম দিয়ে কফির কাপে ডিজাইন করতে। পিছন থেকে উঁকি দিলো গ্যাবি, প্রফুল্ল আওয়াজে বললো,
- কিভাবে পারিস ভাই? তোর হাতের কাজকর্ম দেখলে আমি চিৎপটাং হয়ে যাই।
খিলখিল করে হাসলো দোহা। তারপর মাস্ক নামিয়ে ভ্রু নাচিয়ে উত্তর করলো,
- আই হ্যাভ মোর দ্যান ফাইভ ইয়ার অব এক্সপেরিয়েন্স!
নতুন দুটো মগ হাতে নিয়ে দোহার কাঁধে ধাক্কা দিয়ে গ্যাবি কাউন্টারে ফিরে এলো। অপেক্ষারত কাস্টমারদের বিদায় করলো। ডিং করে ক্যাফের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো আরো একজন। গ্যাবির দৃষ্টি পড়লো তার উপর। লোকটি হয়ত মধ্যবয়স্ক হবে, উচ্চতায় ছ ফুটের কাছাকাছি। পরনে ঢোলা একটি শার্ট, আইভোরি ফরমাল প্যান্ট। চোখে গোল ফ্রেমের একটা চশমা। কপালে ছড়িয়ে আছে সুন্দরভাবে জেল দিয়ে সেট করা একগুচ্ছ চুল। ধারালো মুখে লেপ্টানো অমায়িক হাসি। কাউন্টারে এসে সে ঝুঁকে জানালো,
- ওয়ান অ্যামন্ড মিল্ক কফি অ্যান্ড ওয়ান বোবা মিল্ক টি প্লীজ।
অর্ডার টুকে গ্যাবি কিচেনে দিয়ে ফিরে এসে দেখলো লোকটি একপাশে সাজানো ডেজার্ট কেসের দিকে ঝুঁকে আছে। কানে ফোন চাপা, আদুরে কন্ঠে জিজ্ঞেস করছে ওপাশের মানুষটিকে,
- হুইচ ফ্রেভার ইউ ওয়ান্ট বার্ড? হুম....ব্ল্যাক ফরেস্ট? রেড ভেলভেট? একটাও না? তাহলে ম্যাকারন আনবো? লিল বার্ড, তুমি কি মশকরা করছো বাবাইয়ের সাথে?
মৃদু হাসির শব্দ, ওপাশ থেকে কিছু নিশ্চয়ই বলা হয়েছে। লোকটি এবার হেসে নিজের চশমা ঠিকঠাক করে উঠে দাঁড়ালো,
- ওকে ফাইন, জাফা কেক। খুশি এবার? হাহা....বাবাই লাভস ইউ টু বার্ড, আমি এক্ষুণি আসছি।
ফোন কেটে সে হাসিমুখে কাউন্টারে ফিরে এলো,
- ফাইভ বক্স অব জাফা কেক প্লীজ।
গ্যাবি তার অর্ডারকৃত কফি এবং জাফা কেক গুছিয়ে দিয়ে বিল করে দিয়ে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো,
- আপনি এশিয়ান?
লোকটি হাসি ধরে রেখেই টাকা দিতে দিতে জবাব দিলো,
- হুম।
- আপনি বাংলায় কথা বলছিলেন রাইট?
- রাইট!
মাস্কের আড়ালে গ্যাবি এবং লোকটি উভয়ে হাসলো। খরিদ করা জিনিসপত্র নিয়ে লোকটি যেভাবে এসেছিলো সেভাবেই ক্যাফের দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো। আড়াল হয়ে গেলো বাইরের ভীড়ের মাঝে। ঠিক তখনি কিচেনের দিক থেকে উঁকি দিলো দোহার মুখ। মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো,
- কাজ ভালো চলছে মিস্টার গ্যাবি?
ফিরে তাকালো গ্যাবি। ভ্রু দুলিয়ে জানালো,
- খুব ভালো। এইমাত্র তোর এক স্বদেশীকে দেখলাম মনে হয়। হ্যান্ডসাম লাইক হেল ম্যান!
দোহা বিস্তর হাসলো, জবাব দিলো,
- লন্ডনে বাংলাদেশীর অভাব নেই। বাট হ্যান্ডসাম.... দ্যাটস গুড কামিং ফ্রম ইউ গ্যাবি।
দুইজনই একে অপরের দিকে চেয়ে হেসে ফেললো। ক্যামেরাগুলো তাদের খুনসুঁটির মুহূর্তগুলো ধারণ করতে থাকলো সুচারুরূপে।
—চলবে—