ফন্ট সাইজ:
থিম:
যতনে রাখিব তারে

১ম পর্ব

লেখক: সুরাইয়া জান্নাত সুমী

"আমি তোমাকে ভালোবাসি নিশাত ভাই।আমাকে এভাবে ধোকা দিয়ো না, দোহায় লাগে তোমার।দেখো,মনে হচ্ছে এই বুঝি আমার হৃদয়টা বের হয়ে আসলো।আমি ভয় পাচ্ছি নিশাত ভাই।আমার কথাটা শোনো,আমি তোমাকে প্রমিজ করছি তোমার সব কথা শুনবো।তুমি শুধু আমার হয়ে থাকো।"

মেহরিমার কথা শুনে নিশাত রাগে লাল হয়ে গেল।কোনো কিছু না ভেবেই মেহরিমার গালে ঠাস করে চড় লাগিয়ে দিল।মেহরিমার ফর্সা গালটা সঙ্গে সঙ্গে লাল আভায় ছেয়ে গেল শক্তপোক্ত হাতের চড় খেয়ে।নিশাত রুঢ় কণ্ঠে বলল,

"তোর লজ্জা করে নারে মেহরিমা?বারবার বললাম,এখন আর আমার তোকে ভালো লাগে না। তবুও একই কথা পুনরায় বলতে তোর লজ্জা করে না?আমি অবাক হয়ে যাই তোর মত নির্লজ্জকে দেখে।তুই কি জানিস তুই কতটা ব্যাক্তিত্বহীণ মেয়ে?"

মেহরিমার চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে।ব্যথাটা গালে না লেগে বুকে লেগেছে যে।মেহরিমা হেচকি তুলে বলল,

"ভালোবাসা অন্ধ নিশাত ভাই।তাই নিজের ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিতে হলো।"

"চাচ্চুকে বললেই একদম ঠিক হয়ে যাবি।তোর মত মেয়েদেরকে আমার দেখতেই ইচ্ছা করে না।আমার সামনে আসবি না আর লজ্জা থাকলে।"

মেহরিমা চোখের জল মুছে নিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বলল,"তাহলে এতদিন মিথ্যে ভালোবাসার নাটক করলে কেন নিশাত ভাই?তোমার থেকে এমনটা আশা করিনি আমি।শেষমেশ তুমি ধোঁকাবাজ হয়ে ধরা দিলে তাই তো?"

এই বলে মেহরিমা ছাদ থেকে দৌড়ে নেমে যায়।

নিশাত চেয়ে থাকে মেহরিমার যাওয়ার পানে বিরক্ত চোখে।তার হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে যায়।সে মেহরিমাকে বলেছে,তাকে আর ভালে লাগে না নিশাতের।নিশাত ছাদ থেকে নেমে নিজের রুমে চলে যায়।তার আর এইসব ভালো লাগছে না।

মেহরিমা রুমে এসে কান্না করতে করতে বিছানায় মাথা এলিয়ে দেয়।তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে যে।যাকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসলো তাকেই আজ অন্য কারো সাথে ফোনে প্রেমালাপ করতে শুনে মেহরিমা নিজেকে আটকাতে পারেনি।তার একটা বছর নিশাত কেড়ে নিয়েছে।সে ভুল পাত্রে তার ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছে। এতে দুঃখ ছাড়া যে সে আর কিছুই পেল না। হারালো নিজের আত্মসংযম। মেহরিমা আর কিছু ভেবে পায় না। সে কি করবে এখন? কিভাবে এই কষ্ট থেকে মুক্তি মিলবে তার?তার যে কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে।সে বাঁচতে পারবে না এভাবে।আর কিছু না ভেবে মেহরিমা উঠে বসে ডয়ার থেকে ঘুমের ওষুধ বের করে।একটা পাতায় যতগুলো ওষুধ থাকে সব খেয়ে বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে পড়ে সে।এ যন্ত্রণা আর সে নিতে পারবে না।এর থেকে মৃত্যু অধিক উত্তম মনে হলো মেহরিমার কাছে।

চৌধুরী পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য মেহরিমা চৌধুরী। মেহরিমাদের যৌথ পরিবার।

নাহিদ চৌধুরী পরিবারের বড় সদস্য। তার স্ত্রীর নাম জয়ন্তী বেগম।তাদের তিন সন্তান,নিশাত চৌধুরী,মাহির চৌধুরী এবং শানায়া চৌধুরী। নাহিদ চৌধুরীর মেজো ভাই জাহিদ চৌধুরী,সে আজও বিয়ে নামক বন্ধনে আবদ্ধ হয়নি।নাহিদ চৌধুরী আর জাহিদ চৌধুরীর ছোট ভাই সাজিদ চৌধুরী। সাজিদ চৌধুরীর এক মেয়ে ও এক ছেলে, মেহরিমা চৌধুরী এবং সায়ান চৌধুরী।সায়ানের বয়স ২৩ বছর আর মেহরিমার বয়স আঠারো।আঠারো বছরের মেহরিমা ভালোবাসে তার কাজিন ২৬বছরের নিশাতকে।

মেহরিমা যখন থেকে বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই নিশাতের প্রতি তার ভালো লাগা।এই ভালো লাগা কখন যে ভালোবাসায় রুপ নিল সেটা মেহরিমা বুঝতেই পারল না।

মেহরিমা নিশাতকে তার মনের কথা বলার আগেই নিশাত নিজেই তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল।ভলেবাসার মানুষটার থেকে প্রেমের প্রস্তাব পেয়ে মেহরিমা নিজেও একধাপ এগিয়ে সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল।

আর এখন সেই মানুষটার থেকেই এমন ধোকা সে মেনে নিতে পারেনি।

জীবনে বাবা মার থেকে কটু বাক্য না শোনা মেয়েটা আজকে নিশাতের থাপ্পর মিনে নিতে পারল না।তাই হয়তো এই অঘটন ঘটালো বা কষ্টটা এতই বেশি পেয়েছে যে তা সহ্য করতে অক্ষম প্রমাণিত করলো নিজেকে।

মেহরিমার মা সায়ন্তী বেগম মেহরিমার চুলে তেল দিয়ে দিবেন।তাই তিনি তেলের বাটি হাতে মেয়ের রুমে আসেন।মেহরিমাকে এই অসময়ে শুয়ে থাকতে দেখে সায়ন্তী বেগম কপাল কুচকালেন।মেয়েটা তার আর ভালো হলো না।সময়ে অসময়ে ঘুমিয়ে পড়ে।সায়ন্তী বেগম তেলের বাটি বেডসাইড টেবিলে রেখে বিছানায় উঠে বসেন মেয়ের কাছে।তারপর মেহরিমাকে ডাকতে শুরু করেন।কোনো সারা শব্দ না করায় সায়ন্তী বেগম উপুর হয়ে শুয়ে থাকা মেহরিমাকে ভালোভাবে কাত করে দেন।তার বুকটা ছলাৎ করে উঠলো মেয়ের এই করুণ মুখশ্রী দেখে।মেহরিমাকে তিনি অনবরত ডাকতে শুরু করেন।সায়ন্তী বেগম চিৎকার করে সবাইকে ডাকতে শুরু করেন।মেয়ের এই অবস্থা দেখে তিনি কান্না শুরু করেন।সায়ন্তী বেগমের চিৎকার শুনে সবাই জলদি চলে আসে মেহরিমার রুমে।সায়ান দৌড়ে এসে বোনকে দেখে কোলে তুলে নিল।অবস্থা গুরুতর,মেহরিমার শ্বাসপ্রশ্বাস ধীর গতিতে চলছে।সায়ন্তী বেগমকে ধরে তোলেন জয়ন্তী বেগম।সায়ানের পিছু পিছু তারা ছোটেন।সায়ান দ্রুত মেহরিমাকে কোলে করে বাহিরে থাকা তাদের গাড়িতে পিছনের ছিটে বসিয়ে দেয়।তারপর সায়ন্তী বেগমকে বলেন,

"মা তারাতাড়ি আসো,বনুর অবস্থা গুরুতর। বড়আম্মু তুমি চলো আমাদের সাথে।"

কথাটা বলেই আর একমুহূর্ত না দাড়িয়ে সায়ান গাড়ি স্টার্ট দেয়।শেষমুহুর্তে শানায়া আর মাহির এসে বসে গাড়িতে,তারাও যাবে।

----------------------

"ডক্টর, এখন কেমন আছে আমার বোন?"

ওটি থেকে বের হওয়া ডাক্তারকে সায়ান কথাটা জিজ্ঞেস করতেই তিনি বলেন,

"এতটুকু মেয়ে এমনটা কি করে করতে পারে?আর কিছুক্ষণ দেড়ি হলেই প্রাণনাশ হতে পারত।আপনারা এতটা কেয়ারলেস কি করে হতে পারেন।এখন আশংকামুক্ত তবে জ্ঞান ফিরতে সময় লাগবে।আপনারা কিছুক্ষণ পর দেখা করতে পারবেন।"

ডক্টর কথাটা বলে চলে যায়।সায়ান মাথা নিচু করে নেয়।মেহরিমা এমন কিছু করবে সেটা তাদের ধারণার বাহিরে ছিল।কি এমন কষ্ট তার ছোট বোনটার যে এইরকম পদক্ষেপ নিতে হলো।মেহরিমার মা, বড়আম্মু, মাহির আর শানায়া একটা বেঞ্চে বসে আছেন।মেহরিমার সু*ই*সাইড করার কথা শুনে তার বাবা,বড়আব্বু আর মেজআব্বু চলে এসেছেন সাথে নিশাত ও।নিশাত বাহিরে যাওয়ার পর একথা শুনে তার মেজাজ খারাপ হয়েছিল। তবে বাড়ির লোকদের কথা ভেবে সে এসেছে এখানে।আর যাই হোক তার বাবাকে সে ভীষণ ভয় পায়।বোনের এই অবস্থা আর সে আসেনি এখানে এটা শুনলে বাবা নির্ঘাত চড়াবেন ধরে।

মেহরিমার জ্ঞান ফিরলে তার বাবা আর বড় আব্বু ভেতরে যান।

মেহরিমার গলা কেমন যেন অবশ হয়ে আছে। সে কথা বলতে পারছে না।সাজিদ মেয়ের কাছে এসে বসে।নাহিদ তার অপর পাশে গিয়ে বসে।মেহরিমা তার প্রিয় দুজন মানুষকে পেয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে।

মেয়ের কান্না দেখে তারা বিচলিত হোন।সাজিদ মেয়ের ছোট মুখখানি দু'হাতের আজলায় নিয়ে বলে,

"এমনটা কেন করলে আম্মু?তোমার কোনো ইচ্ছা তো আমরা কখনো অপূর্ণ রাখিনি।তবে এমন কাজ কিভাবে করতে পারলে তুমি।আমাদের কথা একবারও কি তোমার মনে আসেনি?আল্লাহ না করুক যদি কিছু হয়ে যেত?তবে মেয়ে হারানোর শোকে একজন বাবা নির্ঘাত পাগল হয়ে যেত।"

নাহিদ চৌধুরীর অতি আদরের ভাতিজি মেহরিমা। ছোট থেকে নিজের মেয়ের মত মানুষ করেছেন।মায়ের মত দেখতে হওয়ায় মেহরিমা তার কাছে একটু বেশিই আদর পেয়েছে।আর আজ সেই ভাতিজির এমন অবস্থা দেখে তার কঠোর মন ও হু হু করে উঠল।

সে ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল,

"এমনটা না করে একবার বড় আব্বুকে বললেই পারতে আম্মু। তোমার কোনো ইচ্ছা অপূর্ণ থাকবে না।আমি নিজে কালকেই তোমাদের বিয়ের ব্যবস্থা করব।আমার বড় ছেলের বউ শুধুমাত্র আমার মেহরিমা মা'ই হবে।"

মেহরিমা নাহিদ চৌধুরীর এক হাত জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে।যে মানুষটার থেকে ধোকা পেল তাকে কি বিয়ে করা আদোও উচিত? এই কথা মেহরিমার মাথাতে আসলো।পরক্ষণেই ভাবলো,নিশাত যদি ভালো হয়ে তাকে বিয়ে করতে রাজি হয় তবে সেও মাফ করে দিবে।এ মুহুর্তে নিশাত ছাড়া তার মাথায় যেন আর কিছুই আসছে না।

মেহরিমা ঘুমের ওষুধ খাওয়ার আগে একটা চিঠি লিখেছিল।যেখানে তার অপূর্ণ ভালোবাসার কথা সে লিখেছে।বিরহ সইতে না পেরে মেহরিমা আত্য*হ*ত্যার পথ বেছে নিয়েছে সে কথা সে গোটা গোটা অক্ষরে প্রকাশ করেছিল চিঠি লেখার মাধ্যমে।

সে চিঠি পড়ে বাড়ির লোকেদের আর বুঝতে বাকি থাকে না ঘটনা কি।

--

মেহরিমা এখন মোটামুটি সুস্থ হওয়ায় তাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে।

সায়ান বোনের পাশে বসে তার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে।দুষ্টুমি মাখা কন্ঠে সে মেহরিমাকে শুধালো,

"তা আমার বোনটা যে আমার থেকে একধাপ এগিয়ে এটা জানতে আমার এত সময় লাগলো কেন রে।বুঝতেই পারিনি আমার বনুর বিবাহের বয়াস হয়ে গিয়েছে।"

মেহরিমা ভাইয়ের কথা শুনে মুখ কাচুমাচু করে বলল,

"ভাইয়া তুমিও মজা নিচ্ছো?এভাবে বলো না তো।লজ্জা পাই তো।কালকে আমার বিদায় হয়ে যাবে সে দুঃখে তোমার এখন থেকেই কান্না করে সমুদ্রকেও ডুবিয়ে দেওয়া উচিত। "

"আসছে আমার বিদায় নিতে! ভাবতেই আমার ঘুম উধাও হয়ে যাচ্ছে।তোর মত পেত্নীর মুখ আমাকে সারাজীবন দেখতে হবে।আর তোর রুমটাও দখল দেওয়া হবে না।ইশ ভাড়ি দুক্কু পেলাম রে।"

সায়ানের ব্যাঙ্গাত্বক স্বরে বলা কথাগুলো শুনে মেহরিমা রেগে সায়ানের মুখে বালিশ ছুড়ে মা*রে।তবে শ*রীর দূর্বল হওয়ায় তা সায়ানের কাছেও পৌছুতে পারেনি।সায়ান ইতিমধ্যে বিছানা থেকে নেমে রুমের বাহিরে চলে যায়।

মেহরিমা বালিশে মাথা এলিয়ে দেয়।তখন নিশাত রুমে এসে মেহরিমার সামনে বিছানার এক পাশে দাড়ায়।মেহরিমা কারো উপস্থিতি টের পেয়ে চোখ মেলে তাকায়।নিশাতকে দেখে সে ধীরে উঠে বসে বলে,

"কিছু বলবে নিশাত ভাই?"

নিশাত বিছানার এক কিনারায় বসে মেহরিমাকে বলে,

"আমার এমনটা করা উচিত হয়নি রে মেহরিমা।আমাকে প্লিজ তুই মাফ করে দিস।কথা দিচ্ছি তোকে বিয়ের পরে সুখে রাখবো।দুঃখ তোর ধারেকাছেও আসতে পারবে না।কালকে কিন্তু লাল শাড়ীতে তোকে দেখতে চাই।আমার বউ হওয়ার জন্য সাজবি তো?"

মেহরিমার খুশিতে চোখে জল চিকচিক করে ওঠে।

সে মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়।প্রফুল্ল কন্ঠে বলে,

"শুধু তোমারি জন্য সাজবো নিশাত ভাই।তোমার বউ হওয়ার যে আমার খুব তারাহুরো।তোমার নামের সাথে নিজের নামটা জুরে গেলে শান্তি আমার দোরগোড়ায় নিশাত ভাই।"

নিশাত মেহরিমার মাথায় হাত বুলাতে নিলে মেহরিমা নিশাতকে বলে,

"বিয়েটা হোক আগে।তারপর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ো।সাদা শেরওয়ানি পড়বে তো নিশাত ভাই?"

"হুম অবশ্যই পড়বো।হবু বউয়ের কথা না রেখে উপায় নেই যে।কালকে এমনভাবে রেডি হয়ে তোর সামনে আসব যেন তুই দেখেই চমকে যাস।অপেক্ষা কর শুধুমাত্র আর কিছু প্রহর।"

চলবে,,,,

#যতনে_রাখিব_তারে

#সূচনা_পর্ব

#লেখনিতে_সুরাইয়া_জান্নাত_সুমী

[কেমন হয়েছে সূচনা পর্ব বলবেন কিন্তু!আর পরবর্তী পর্ব পড়তে আমার পেইজটি ফলো করে রাখুন।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন