ফন্ট সাইজ:
থিম:
যতনে রাখিব তারে

২য় পর্ব

লেখক: সুরাইয়া জান্নাত সুমী

#যতনে_রাখিব_তারে

#পর্ব_২

#লেখনিতে_সুরাইয়া_জান্নাত_সুমী

(কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)

চৌধুরি বাড়ির সকলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সকালে বর কনের গায়ে একটু হলুদ ছোয়াবেন।তাই মেহরিমাকে হলুদ শাড়ী পড়িয়ে দিচ্ছেন জয়ন্তী বেগম।শাড়ী পড়ানোর মাঝখানে মেহরিমার গায়ে হাত লাগলেই সে খিলখিল করে হেসে উঠছে।জয়ন্তী বেগম এবারে বিরক্ত হয়ে বললেন,

"একটু শান্তভাবে দাড়িয়ে থাকতে পারিস না?শাড়ী টা পড়াতে দে মা।দেড়ি হয়ে যাবে নাহলে।এত কাতুকুতু থাকলে হয় বল?"

মেহরিমা হাসতে হাসতেই বলল,

"আচ্ছা বড় আম্মু পড়িয়ে দাও এবার। আর হাসবো না প্রমিজ।"

মেহরিমা তবুও তার গায়ে হাত লাগলেই হেসে দিচ্ছে।জয়ন্তী বেগমকে বেশ কসরত করে মেহরিমাকে শাড়ী পড়াতে হলো।

শানায়া সিম্পল একটা হলুদ গাউন পড়েছে।সে তারাহুরো করে মেহরিমার কাছে এসে বলল,

"মাশাআল্লাহ ,অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে তোকে।আর সাজতে হবে না।জলদি ছাদে চল।সবাই অপেক্ষা করছে।মেহমানরাও আসা শুরু করেছে।এগারোটা বেজে গিয়েছে অলরেডি।"

মেহরিমা ঠোঁটে লিপস্টিক টা দিয়ে নিয়ে বলল,

"আচ্ছা চলো তাহলে,আমি একদম রেডি।তোমাকেও খুব সুন্দর দেখাচ্ছে আপু।মিনহাজ ভাই দেখলে একদম টাশকি খেয়ে যাবে।"

শানায়া সতর্কতার সাথে বলল,

"আরেহ বোন ধীরে বল।কেও শুনলে আমার পিঠের ছাল তুলে নিবে।"

শানায়া মেহরিমাকে নিয়ে রুম থেকে বের হয় ছাদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। শানায়া আগে আগে ছাদে চলে যায়।মেহরিমাকে তার শাড়ী সামলিয়ে হাঁটতে হচ্ছে।মাথা নিচু করে শাড়ীর কুচির দিকে মনযোগ দিয়ে হাটার কারণে অঘটন ঘটে যায়।মেহরিমার কারো সাথে ধাক্কা লেগে দু পা পিছিয়ে যায় সে।মেহরিমা তার কপাল ডলে মাথা উচু করে তাকায়।তার সামনে থাকা ব্যক্তিটা মার্জিত ভাবে বলল,

"দোষটা আপনারই ছিল।একটু দেখে হাটবেন দয়া করে।তা নাহলে প্রতিনিয়ত এভাবে ধাক্কায় খেয়ে যাবেন।তা আপনি চুন্নি না পাত্রী?"

মেহরিমা ভ্রু কুঁচকে তাকায় লোকটির দিকে।তার কথার জবাবে বলে,

"সে আমি যা হই না কেন।আমি নাহয় দেখে হাঁটিনি।তা আপনার চোখ কোথায় ছিল।আর আপনাকে তো চিনলাম না।"

তাহসিন সিকদার একটু লজ্জা পেল বোধহয়। বিয়ের কনে তার আত্মীয়দের চিনতে পারছে না।অবশ্য চেনার কথাও না।সে নিজেই তো মেহরিমার সাজগোজ দেখে অনুমান করেছে মাত্র, যে মেহরিমা বিয়ের কনে।

তাহসিন মুচকি হেসে মেহরিমাকে বলল,

"আমি নাহিদ আংকেলের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে।আমরা গ্রামে থাকি তাই চিনবেন না আপনি।

মায়ের সাথে শহরে একটা কাজে আসা হয়েছে।আর নাহিদ আংকেলের সাথে হঠাৎ দেখা হলো।উনি ধরে বেধে নিয়ে আসলেন এখানে আপনাদের বিয়ের ভোজ খাওয়ার জন্য।"

মেহরিমা তাহসিনকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত অবলোকন করল।লোকটা চেক শার্ট পরেছে।আর জিন্সের প্যান্ট।লোকটার মধ্যে দেখার মত তেমন বিশেষ কিছু মেহরিমার চোখে পরল না।তেমন সুঠাম দেহীর অধিকারীও না আবার একেবারে ফিনফিনে চিকন ও না।লম্বা হওয়ায় মনে হচ্ছে চিকন।তবে শ্যাম বর্ণের তাহসিনকে দেখতে খারাপ লাগলো না মেহরিমার কাছে।

তাহসিন কপাল কুচকে নেয়।মেহরিমাকে নিজের দিকে একনজরে তাকিয়ে থাকতে দেখে।মেহরিমা হঠাৎ নিজের গালে থাপ্পড় দিয়ে বলল,

"ধ্যাত তাতে আমার কি।নিশাত ভাই বেশি সুন্দর। "

এটা বলেই মেহরিমা শাড়ীর কুচি উচু করে ধরে হন হন করে ছাদে চলে যায়।

তাহসিন কপাল কুচকে নেয়।এই মেয়ে তাকে নিশাতের সাথে তুলনা করছে?তার কাছে ব্যাপারটা অপমানজনক লাগলো।

তাহসিন সেখানে আর না দাড়িয়ে তার মায়ের কাছে চলে আসে।রুমটাতে রুহানি বেগম বিশ্রাম নিচ্ছেন।

তাহসিন মাকে বিরক্ত না করে তার ব্যাগ থেকে একটা শপিং ব্যাগ বের করে।ব্যাগটাতে ঠায় পাওয়া লাল টুকটুকে শাড়িটি বের করে তাহসিন হাতে নেয়।শাড়ি টায় হাত বুলিয়ে একনজরে তাকিয়ে থাকে সে।তাহসিনের মা রুহানি বেগম মুচকি হেসে ছেলেকে বলেন,

"কিরে বাপ,শাড়িটা এভাবে ধরে আছিস যে?রাতেই তো বাড়িতে যাওয়ার জন্য রওয়ানা হবো।কালকে নাহয় প্রীতি মাকে দিয়ে আসিস।এখন রাখ দেখি।তোর নিজেরই তো নজর লেগে যাবে দেখছি।"

তাহসিন ব্যতিব্যস্ত হয়ে তার মাকে বলে,

"এমন কথা বলো না মা।নিজের জিনিসে আবার কারো নিজেরই নজর লাগে নাকি?প্রীতি অপেক্ষা করে আছে আমার জন্য।এই লাল শাড়িটাতে ওকে অপরূপা লাগবে দেখতে দেখো।"

রুহানি ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

তার ছেলেটা প্রীতি বলতে পাগল।মেয়েটাকে তার ছেলেটা বড্ড ভালোবাসে।

----

মেহরিমার পাশে নিশাত বসে আছে। বাড়ির লোকজন আত্মীয়রা একে একে সকলে এসে তাদের হলুদ ছুইয়ে যাচ্ছে।মেহরিমা নিশাতকে ফিসফিস করে বলে,

"আর কত হলুদ লাগাবে নিশাত ভাই বলো তো।এত হলুদ লাগালে তো পরে ভালো দেখা যাবে না আমাকে।এখন সবাইকে একটু নিষেধ করে দাও যাতে আর হলুদ না লাগায়।"

নিশাত সামনে থাকা বাটি থেকে হলুদ তুলে নিয়ে মেহরিমার সারা গালে ইচ্ছামত মাখিয়ে দেয়।

মেহরিমা মুখ ফুলিয়ে নিশাতকে বলে,

"কি করলে এটা ?এখন আমাকে ভুতের মত দেখা যাচ্ছে।তুমি একটা যাচ্ছে তাই।"

নিশাত বিরক্ত সহকারে বলে,

"তোর সাথে না আমার প্রেম টা ঠিক জমেনি একারণে বুঝলি তো।তোকে বিয়ে করার পর সংসার যে কেমন হবে এক আল্লাহ জানে।"

মেহরিমার মনটা অভিমানে টইটম্বুর হয়ে গেল।নিশাত সেখান থেকে উঠে সবাইকে বলল,তার ভালো লাগছে না তাই সে এখন রুমে গিয়ে গোসল করে নিবে।

তাহসিন ছাদের এক কর্ণারে রেলিংয়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছে।সে নিশাতকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করল।মেয়েটা নিশাতকে বেশি সুন্দর বলেছিল তার থেকে।তাহসিনের চোখে নিশাতের সাদা চামড়া ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না।

মাহির দৌড়ে তাহসিনের কাছে এসে বলল,

"তাহসিন ভাই চলো ওদিকে মজা হচ্ছে অনেক।এখানে দাড়িয়ে আছো কেন?"

"না,না মাহির আমি এখানেই ঠিক আছি।আমার হৈ-হুল্লোড় পছন্দ না।তোমরা আনন্দ করো"

তাহসিনকে জোরাজুরি করেও মাহির বেশ পাত্তা না পেয়ে সেখান থেকে চলে যায়।

মেহরিমা মন খারাপ ভুলে সবার সাথে আনন্দে মেতে ওঠে।আর কিছু প্রহর তারপরেই তো নিশাত তার হয়ে যাবে।সে নাহয় একটু মানিয়ে নিল এভাবেই।

-----

পার্লার থেকে সাজাতে এসেছে মেহরিমাকে।মেহরিমা অবিশ্বাস নিয়ে পার্লার থেকে আসা মেয়েগুলোকে আগে অন্যদের সাজিয়ে দিতে বলেছে।সে আগে দেখবে তারা কেমন সাজায় তারপর সে সাজবে।যখন দেখলো ভালোই সাজাচ্ছে তখন শানায়ার অর্ধেক সাজানো হতে না হতেই সে তাকে সরিয়ে নিজে সাজতে বসে গেছে।শানায়া হতাশার শ্বাস ফেলে।এই মেয়েটাকে নিয়ে আর পারা গেল না।

লাল টুকটুকে বেনারসি পড়ে কনের সাজে মেহরিমাকে আগের থেকে আরও বেশি সুন্দরী দেখাচ্ছে।

মেয়ের এমন রুপ দেখে সায়ন্তী বেগম মেহরিমার কানের পিছনে নজর টিকা লাগিয়ে দেন।

তার চোখ জলে টইটম্বুর করছে।

মেহরিমা মায়ের চোখে জল দেখে হাসতে হাসতে বলল,

"এত ইমোশনাল হয়ে সেন্টি খাওয়ার কিছু নেই মা।কোথাও যাচ্ছি না তো আমি।দেখেছো তো আমার বুদ্ধি? তোমাদের সাথে সারাজীবন থাকার জন্যই তো তোমাদের ছেলেকে বিয়ে করছি।"

সায়ন্তী বেগমের কান্না চোখে আসার আগেই মেহরিমার কথা শুনে তা আবার ভেতরে ঢুকে গেল।

সায়ান মেহরিমার রুমের দরজার কাছে এসে বলল,

"হেই লেডিস!আমি কি আসতে পারি?"

শানায়া নাকচ করে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,

"লেডিসদের মাঝখানে হাফ লেডিসদের কোনো জায়গা নেই।"

সায়ান রাগান্বিত স্বরে বলল,

"তবে রে, একবার রুমে থেকে বের হ।তারপর তোকে দেখাচ্ছি আমি কি।"

আবারও সায়ান চেচিয়ে এবার মেহরিমাকে বলল,

"আর শোন তোকে সবাই সুন্দর দেখাচ্ছে বলে মিথ্যে স্বান্তনা দিচ্ছে।তা নাহলে কেঁদে ভাসাবি। তবে এই সত্যবাদী বান্দার থেকে শোন।তোকে তেঁতুল গাছে থাকা পেত্নীর মত দেখা যাচ্ছে।"

এই বলে সায়ান সেখান থেকে প্রস্থান নেয়।মেহরিমা সায়ন্তী বেগমকে মুখ ফুলিয়ে বলল,

"তোমার ছেলে যে আস্ত একটা রামগরুড়ের ছানা হয়েছে সেটা কি জানো?"

সায়ন্তী বেগম মেহরিমাকে ধমক লাগায়।মেহরিমা মনে মনে বলল,ধূর শা*লা,সত্য কথার ভাত নাই।

তখন জয়ন্তী বেগম এসে সবাইকে তারাতাড়ি বাড়ির বাহিরে করা স্টেজে যেতে বলে।

সকলে আরেক ধাপ তারাহুরো করে নিজেদের সাজগোজ শেষ করে।মেহরিমা নিজেকে আয়নায় খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে। নিজেই নিজেকে আয়নায় দেখে নিয়ে মুখে মাশাআল্লাহ আওড়াল।

-------

বিয়ের কনে স্টেজে বসে আছে।অথচ বর এখনো লাপাত্তা। নাহিদ চৌধুরী ক্রমাগত কল দিয়ে চলেছেন নিশাতের ফোনে।তবে এবারেও বিশেষ লাভ হলো না।নিশাতের নাম্বার বারবার বন্ধ দেখাচ্ছে।সাজিদ চৌধুরীর চিন্তায় ঘাম ছুটে যাওয়ার মত অবস্থা। মেয়েকে নিয়ে এখন তার মনে ভয় হচ্ছে। জাহিদ চৌধুরী তাকে বারবার স্বান্তনা দিয়ে বলছে,নিশাত চলে আসবে তারা যেন বেশি চিন্তা না করে।

তবে মেহরিমার অপেক্ষার প্রহর শেষ করে নিশাতের দেখা আর মিলল না।

মেহরিমার হাত পা কাপছে ক্রমাগত। শরীর ঘামে ভিজে গেছে অতিরিক্ত চিন্তায়।

সায়ান বোনের পাশে বসে আছে।মেহরিমা কাপা কাপা গলায় বলল,

"ভাইয়া?ভাইয়া নিশাত ভাই আসছে না কেন এখনো?আমার খুব ভয় করছে।নিশাত ভাইকে ছাড়া আমি বাঁচবো না বলে দিচ্ছি।আমি কিন্তু কিছু একটা করে বসব।"

সায়ান মেহরিমার মাথা তার কাধে নিয়ে বলে,

"এমন বলে না বনু।নিশাত ভাই নিশ্চয়ই আসবে দেখিস।হয়তো কোনো কাজে আটকে গেছে তাই আসতে দেরি হচ্ছে।কোথায় যে গেল!"

মেহরিমার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। ভয়ে তার হার্টবিট বেড়ে যায়।তার মনে ভয় ঢোকে।যার জন্য একটু হলে মরতে বসেছিল। তাকে কি আদোও পাওয়া হবে?নাকি হারাতে হবে নিজের মানসম্মান।

সবাইকে অবাক করে দিয়ে বর বেশে নিশাত স্টেজের সম্মুখে এসে হাজির হয়।সকলকে নিরব হতে দেখে মেহরিমা চোখ মেলে তাকায়। ভাইয়ের কাধ থেকে মাথা সরিয়ে উঠে দাড়ায়।সে স্তব্ধ হয়ে যায় তার সম্মুখে থাকা দৃশ্য দেখে।

নিশাত তো মেহরিমার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সাদা শেরওয়ানি গায়ে জরিয়ে এসেছে।তবে সে একা আসেনি।বধূ বেসে একটি মেয়ে তার হাত ধরে দাড়িয়ে আছে।

মেহরিমা দৌড়ে নিশাতের সামনে চলে আসে।তবে নিশাতকে কিছু না বলে আচমকা সে তার পাশে থাকা মেয়েটির গালে চড় বসিয়ে দেয়।

রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে সে মেয়েটির কাধ দু হাতে ঝাকি দিয়ে বলে,

"এটায় ছিল তবে আমাকে এড়িয়ে যাওয়ার কারণ।বেস্টফ্রেন্ড টেগ লাগিয়ে পিঠ পিছে শত্রুতার সিলটা তবে মেরেই নিলি।ওয়াহ,কি দৃশ্য দেখার সুযোগ করে দিলি আমাকে।তোর কি একটুও বুক কাঁপল না তৃপ্তি? কি করে করলি এটা তুই?"

মেহরিমা তৃপ্তিকে জোরে ধাক্কা দেয়।তৃপ্তি দু পা পিছিয়ে যায়।নিশাত হিসহিসিয়ে এবার মেহরিমাকে বলে,

"দূরে যা মেহরিমা।ওর গায়ে একদম টাচ করবি না।বউ হয় ও আমার।বিয়ে করেছি ওকে আমি।"

মেহরিমা এবার কান্না করে দিয়ে বলে,

"তবে লাল শাড়ি পড়ে বউ সাজতে বলেছিলে কেন আমাকে বলো?"

চলবে,,,,,,

[আসসালামু আলাইকুম সকলকে। আজকের পর্ব কেমন লাগলো সবার?কমেন্ট করে বলবেন কিন্তু।তাহলে বুঝতে পারব লেখনি কেমন হচ্ছে।ভুলত্রুটি দেখলে অবশ্যই দেখিয়ে দেওয়ার অনুরোধ রইলো। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন