#যতনে_রাখিব_তারে
#পর্ব_৪
#লেখনিতে_সুরাইয়া_জান্নাত_সুমী
(কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)
"মা,তুমি তো জানোই আমি প্রীতিকে ভালোবাসি। ও অপেক্ষা করছে আমার জন্য।আমি কি করে ওকে ঠকাবো বলো?আমি কোনো ভাবেই এ বিয়ে করতে পারব না।এই বিষয়ে আর কোনো কথা শুনতে চাই না আমি।"
তাহসিনের মুখে না বোধক কথা শুনে রুহানি বেগম ক্ষুব্ধ হোন।তিনি তাহসিনকে এতক্ষণ যাবত বোঝালেন,যেন মেহরিমাকে সে বিয়ে করে।তবে ছেলের দিক থেকে ফলাফল শূন্য দেখে তিনি হতাশ হলেন।তাহসিনকে আবারও বোঝালেন,
"আমি কি তোর খারাপ চাই বল তো?তুই মেহরিমাকে বিয়ে করবি আর প্রীতিকে ওর বাবা মা অন্য কোথাও বিয়ে দিবেন ব্যাস হিসাব চুকে গেল।"
তাহসিনের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে।সে কি করে তার মাকে বোঝাবে,প্রীতির কাছেই তার মন তালাবদ্ধ হয়ে পড়ে আছে।সেখানে অন্য কারোও প্রবেশ নিষিদ্ধ।সে অধৈর্য হয়ে বলে,
"চলো মা বাড়িতে চলো।আর এক মিনিট ও এই দোযখে থাকতে হবে না।আমার দম বন্ধ লাগছে।"
তাহসিনের হাত থেকে রুহানি নিজের হাত ছাড়িয়ে বলে,
"যদি যেতেই হয় তাহলে মেহরিমাকে ঘরের বউ করে তবেই যাবো।তা নাহলে এই বাড়ি থেকে কাধে করে আমার মৃত লাশ নিয়ে যাবি।"
তাহসিন করুণ সুরে মা বলে ডাকে,
"এমন কথা বলো না মা।তুমি ছাড়া আর কে আছে আমাকে বোঝার বলো?আমাকে জীবন্ত লাশে পরিণত করো না মা।"
"আল্লাহর কসম তাহসিন,আমার কথা মেনে না নিলে তোকে তোর মায়ের লাশ বহন করতে হবে।"
"একটা মেয়ের জন্য তুমি আমাকে একা করে চলে যেতে চাইছো মা?কি জাদু করেছে ওই মেয়ে তোমাকে বলো, বলো?"
"শেষবার বলছি আমার কথা শুনবি না?"
"তোমার এই কথা আমি রাখতে পারব না।আমাকে মাফ করো।অনেক নাটক হয়েছে এবার চলো বাড়িতে যাবো আমরা।"
রুহানি বেগম তাহসিনকে সেখানে রেখেই বেরিয়ে যান।তাহসিন ভাবলো মা হয়তো মেনে নিয়েছে তার কথা।তবে তাকে মিথ্যা প্রমাণ করে রুহানি বেগম রান্নাঘর থেকে হাতে করে বটি নিয়ে এসেছেন।তাহসিন কপাল কুচকে তাকায় তার মায়ের দিকে।রুহানি বেগম নিজের গলায় বটি ধরলে তাহসিন এগিয়ে আসতে চায়।তবে তাহসিনকে থামিয়ে দিয়ে রুহানি বেগম বলেন,
"তোর কাছে যদি আমার থেকে ওই মেয়েটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়,তাহলে এখনি চলে যা এখান থেকে।"
তাহসিন বিপাকে পড়ে যায়।তার চোখে জলরাশি চিকচিক করে দেখা দেয়।বুক থেকে কান্নারা দলা পেকে ধরে।অসহ্য যন্ত্রণা বোধ হচ্ছে বুঝি বুকটায়।
তাহসিন তার মায়ের পা দুটো আগলে ধরে বসে পড়ে।মায়ের পা ধরে করুন সুরে আর্তনাদ করে বলে,
"মা গো,মা?তুমি ছাড়া আমার যে আর কেও নাই।এমন কেন করো মা?ও মা!একটু দয়া করো।একটু দয়া করো মা।তুমি আমার কলিজাটা চেয়ে দেখো,বের করে দিতে একবারও ভাববো না।"
রুহানি বেগম বটি গলায় ধরে রেখেই বলেন,
"তারমানে তুই আমার কথা শুনবি না?"
"আমি বেঁচে থাকলেও প্রীতি মরে যাবে মা।ও মরে যাবে।আমি ওকে নিজ হাতে কিভাবে খু*ন করব বলো?"
"এত কথা শুনতে চাই না আমি।"
কথাটা বলে রুহানি বেগম তার গলায় আঘাত করতে চান।তাহসিনের মনে ভয় ঢোকে।তার মা একরোখা জেদি মানুষ।যা বলবেন তাই করবেন।ছোট থেকে তাহসিন তাই দেখে আসছে।
সে উঠে দাড়িয়ে দম বন্ধ করে বলে,
"আমি রাজি মা,আমি রাজি।তবুও তুমি এমন করো না।আমি রাজি জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে থাকতে।যেমনটা তুমি চাইবে তেমনটাই হবে।"
রুহানি বেগম শান্তির শ্বাস নিয়ে বলেন,
"তাহলে তারাতাড়ি আয়।সবাই অপেক্ষা করছে।"
রুহানি বেগম গলা থেকে বটি নামিয়ে বের হোন রুম থেকে।তাহসিন মাকে বের হতে দেখে ডুকরে কেঁদে ওঠে। তার ব্যাগ থেকে প্রীতির জন্য কেনা লাল বেনারসি শাড়ি টা বের করে বুকে চেপে ধরে।
অস্পষ্ট স্বরে বিরবির করে বলে,
"তোকে আর লাল শাড়িতে দেখার সৌভাগ্য হলো না আমার প্রীতি।আমি হেরে গেলাম আমার জন্মদাত্রীর কাছে।কাল থেকে তুই হয়তো আমাকে এক কাপুরুষ নামে আখ্যায়িত করবি।আমায় ক্ষমা করিস না প্রীতি,আমায় ক্ষমা করিস না।"
পূর্বে ঘটা ঘটনাগুলো মনে করে তাহসিনের বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বের হয়।তার ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে মেহরিমা তার বাহুতে গুতো দেয়।তাহসিন ভ্রু কুচকে তাকায় মেহরিমার দিকে।তাহসিনের মন চাচ্ছে ঠাস করে একটা থাপ্পর বসিয়ে দিতে এই মেয়ের গালে।সব নষ্টের মূল এই মেয়ে।আরেহ ভাই বাড়ির মধ্যেই তোকে প্রেম পিরিতি করতে হলো কেন।এখন এর দায়ভার তার কাধেও এসে পরেছে।
তাহসিনকে আর ভাবতে না দিয়ে মেহরিমা কোনরকম বলল,
"একটা পলিথিন দিতে বলুন না।আমার বমি পাচ্ছে।একটু তারাতাড়ি দিতে বলুন পলিথিন।তা নাহলে বের হয়ে আসবে এখনি।"
তাহসিন হাক ডেকে বাস কন্ডাক্টরকে ডেকে পলিথিন চায়।তবে পলিথিন আনার আগেই মেহরিমা বমি করে দেয়।তাহসিনের গায়ে এসে পড়ে তার ছটা।তাহসিন ছিটকে দূড়ে সরে দাড়ায়।তারাতাড়ি নিজে গিয়ে পলিথিন নিয়ে এসে মেহরিমার হাতে ধরিয়ে দেয়।বাস কন্ডাকটর বিরক্ত বোধ করল মেহরিমার কাজে।
মেহরিমা একটু স্বাভাবিক হলে ওড়না দিয়ে মুখ মুছে তাহসিনের দিকে তাকায়।যে তার দিকেই বিরক্তির চাহনি দিয়ে তাকিয়ে আছে।মেহরিমা তার ওরনা দিয়ে তাহসিনের শার্ট থেকে বমির ছিটেফোঁটা মুছে দিতে গেলে তাহসিন নিষেধ করে বলে,
"হয়েছে থাক।যা ঘটানোর ঘটিয়ে ফেলেছেন।কি একটা অবস্থা, আরেকটু আগে বলেননি কেন?
মেহরিমা মুখ কাচুমাচু করে বলে,
" আপনাকে অনেকবার ডেকেছিলাম শোনেননি।আমি মুখ চেপে ধরে অনেক আটকানোর চেষ্টা করেছি তবে সামলাতে পারিনি। "
তাহসিন তার ভুল বুঝতে পারে।প্যান্টের পকেট থেকে রুমাল বের করে শার্ট মুছে নিয়ে আবারও সিটে বসে পরে।
মেহরিমা ক্লান্ত হয়ে সিটে মাথা এলিয়ে দেয়।চাপা স্বরে তাহসিনকে বলে,
"আর কতক্ষণ লাগবে যেতে?আমার ভালো লাগছে না একদম।মাথাটা খুব ব্যথা করছে। "
তাহসিনের খারাপ লাগলো মেয়েটার জন্য।তবে পূর্বের ঘটনা মাথায় আসতেই তা নিমিষেই উধাও হয়ে গেল।তাহসিন কাঠকাঠ গলায় বলল,
"এতই যখন খারাপ লাগছে তাহলে বাসের জানালা দিয়ে লাফ দিন।বললে আমি পুরো জানালাটা খুলে দিচ্ছি।আমিও বেঁচে যাই আর আপনিও মুক্তি পেলেন।"
মেহরিমা কেমন করে যেন তাহসিনের দিকে তাকালো।তবে প্রতিত্তোরে কোনো কথা বলল না।
বাসের জানালা দিয়ে বাহিরে দৃষ্টিপাত করল।
তারপরে ধীর কন্ঠে সে তাহসিনকে বলল,
"এই জীবন যখন একবার আপনার সাথে জুরেছে তখন মৃত্যুর আগে অবধি মুক্তি আর আপনার দোরগোড়ায় এসে দাড়াবে না।"
-------
গ্রামে হইচই পড়ে গেছে।সবার মুখে মুখে রটেছে শহর থেকে তাহসিন সিকদার সুন্দরী বউ নিয়ে এসেছে।
গ্রামে পৌছাতে তাহসিনদের সকাল হয়ে গেছে। আর গ্রামে সকাল মানেই বাহিরে বহুত মানুষের আনাগোনা। যারাই মেহরিমাকে তাদের সাথে দেখেছে,মেহরিমা কে এটা জানতে চাইলেই রুহানি বেগম তাহসিনের বউ বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।তাহসিন তাই মায়ের উপর বেজায় বিরক্ত এ নিয়ে।আর মেহরিমা তো যেন কাঠের পুতুল,সে তাহসিনের পিছু পিছু হেটে চলেছে।
তাহসিনের পিছু হাঁটতে হাঁটতে মেহরিমা একটা গেট পেরিয়ে তাদের বাড়িতে এসে পৌছায়।আঙিনায় এসে তাহসিন দাড়িয়ে পরলে মেহরিমা তাহসিনের পিঠের সাথে ধাক্কা খায়।
রুহানি বেগম তাদের ঘরগুলোর দরজায় লাগানো তালা খুলছেন।
তাহসিন পিছু ঘুরে মেহরিমার দিকে তাকিয়ে বলে,
"এভাবে পিছু পিছু হাঁটছেন কেন?আশ্চর্য! "
মেহরিমা মাথা নিচু করে দাঁড়ায়। তাহসিন বিরক্ত হয়ে বলে,
"বোবা নাকি?কথা বলছেন না যে?দূর!কথা বলতে হবে না।মা তালা খুলে দিয়েছেন। যান ঘরে গিয়ে বসুন।"
মেহরিমা এবার বাড়িটাতে ভালোভাবে চোখ বুলায়।
মেঝে পাকা করা টিন সেটের একটা বাড়ি।বাড়ির সামনে আঙিনা।আঙিনা সহ বাড়ির চারপাশ ইটের পাচির দিয়ে ঘেরাও করা।নানান ধরনের ফুল ফলের গাছ দিয়ে ভরা বাড়িটার চারপাশে।
রুহানি বেগম যে রুমে গিয়েছেন,মেহরিমা সেই রুমে চলে যায়।রুহানি বেগম মেহরিমাকে বলেন,
"মাঝখানের রুমে খাওয়া দাওয়া করা হয়।তার পাশের রুমটা তাহসিনের। তুমি ওই রুমে গিয়ে নাহয় বিশ্রাম নাও।এখন থেকে ওটা তোমারও ঘর বুঝলে তো?"
মেহরিমা মাথা দোলায়।সে কথা না বলে রুহানি বেগমের ঘর থেকে বের হয়ে তাহসিনের রুমে চলে যায়।মেহরিমা ঘরটা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে।সেখানে একটা খাট,আলমারি,ড্রেসিংটেবিল এবং জামাকাপড় রাখার জন্য একটা ছোট ওয়ারড্রব।
ঘরটা বেশ পরিপাটি করে রাখা।মেহরিমা এবার নিজের দিকে তাকায়।তার মনে হলো তার থেকে এই ঘরটা বেশি পরিষ্কার। বমি করেছিল বিধায় তার কেমন যেন লাগছে।গোসল করা প্রয়োজন এখন।মাথা টাও কেমন ঝিম ধরে আছে।
মেহরিমা খাটের এক কোনায় গিয়ে বসে।তাহসিন ঘরে এসে মেহরিমাকে দেখে বিরক্ত প্রকাশ করে।
মেহরিমা আমতা আমতা করে বলে,
"আমার গোসল করা প্রয়োজন। গা ঘিন ঘিন করছে।ওয়াশরুম টা কোথায়?"
তাহসিন কপাল কুচকে বলে,
"আসছে বড়লোকের বেটি ওয়াশরুম খুজতে রুমের মধ্যে।বাহিরে গোসল করার জায়গা আর টয়লেট আছে।সেখানে গিয়ে গোসল করে আসুন।"
মেহরিমা কিছু বলতে নিলে তাহসিন বলে,
"সমস্যা নেই, আমার বাড়িতে মাও আছে।গোসল করার জায়গা আর টয়লেট ভালো করে বানানো হয়েছে।"
মেহরিমা তার সরল কন্ঠে বলে,
"কিন্তু আমার কাছে তো কোনো পোশাক নেই। পোশাক এনে দিলে ভালো হতো একটু।"
তাহসিন একটু ভেবে বলে,
"মায়ের শাড়ি এনে দিলে হবে?তাছাড়া আর কোনো পোশাক নেই মেয়েদের। "
মেহরিমা সায় জানায় তাহসিনের কথায়।
মেহরিমা আবারও আমতা আমতা করে বলে,
"আপনার নামটা?"
তাহসিন তাচ্ছিল্য হাসে।মেহরিমার প্রশ্নের জবাবে বলে, "যাকে কবুল বলে বিয়ে করেছেন তার নামটাও জানেন না?"
"শোনা হয়নি বা হয়তো আমি খেয়াল করিনি।তবে এখন খেয়াল রাখতে চাইছি।তাই জানাটা প্রয়োজন মনে হলো।"
তাহসিন ছোট্ট করে বলল,
"তাহসিন সিকদার। "
নিজের নামটা বলে তাহসিন ঘর থেকে বের হতে নিলে মেহরিমাও তার পিছু আসে।তাহসিন পিছনে মেহরিমাকে আসতে দেখে বলে,
"পিছু আসছেন কেন?"
"আপনি যাচ্ছেন তাই আমিও যাচ্ছি।"
"টয়লেট যাবো,যাবেন?চলুন একসাথে যাওয়া যাক।যত্যসব!"
--------
"ওরে হতভাগী মেয়েরে,তোর আশিক তো বিয়ে করে নিয়ে আসছে শহুরে মেয়েকে।কপালপোড়া বান্ধবীর আমার কপালটা বুঝি এইবার পুড়লো।"
বান্ধবী রেশমার কথা শুনে প্রীতি হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলে,
"চুপ থাক শয়তান মেয়ে।যে ছেলে কোনোদিন আমি ব্যতিত অন্য কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলেও তাকায় না। সে কিনা বিয়ে করেছে,এই কাহিনি আমাকে বলছিস তুই।সর সামনে থেকে হিংসুটে মেয়ে কোথাকার। "
প্রীতির কথা শুনে রেশমা কপাল চাপরে তার বাহু ধরে ঝাকাতে ঝাকাতে বলল,
"ওরে বোকা মেয়েরে,তাহসিন ভাই তোকে ধোকা দিয়ে অন্যত্র বিয়ে করে এসেছে।বিশ্বাস না হলে চল নিজের চোখেই দেখবি।"
রেশমার এমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলা কথা শুনে প্রীতির মনে ভয় ঢোকে।বুকে কেমন দারাম দারাম করে বাজছে।তাহসিন অন্যত্র বিয়ে কিভাবে করতে পারে?সে তো কথা দিয়েছিল।বলেছিল,শহরে নাকি বেশি সুন্দর দেখতে বেনারসি শাড়ি পাওয়া যায়।তাই তো মাকে নিয়ে গেল শহরে।তবে কি রেশমা সত্যি কথায় বলছে।তার ডাগর চোখজোড়ায় জলরাশি ধরা দেয়।
চলবে,,,,,,,
(এইযে আমার কুট্টুস পাখিরা?ফলো দেন না,রিয়েক্ট দেন না,গল্প বিষয়ক কোনো মন্তব্যও করেন না।চুপিচুপি এসে গল্প পড়ে যে চলে যান!এতে তো সুরাইয়ার মন খারাপ হয়।)