ফন্ট সাইজ:
থিম:
যতনে রাখিব তারে

১১তম পর্ব

লেখক: সুরাইয়া জান্নাত সুমী

#যতনে_রাখিব_তারে

#পর্ব_১১

#লেখনিতে_সুরাইয়া_জান্নাত_সুমী

(কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)

"মা!রান্না করো নাই আজকে?খিদে পেয়েছে প্রচন্ড। "

তাহসিনের কথায় মেহরিমা আর রুহানির ধ্যান ভঙ্গ হয়।মেহরিমা কপাল কুচকে নেয়।তাহসিন আশার আর সময় পেল না।গল্প শোনার মধ্যে যখন টানটান উত্তেজনা, ঠিক তখনি বা হাত দিতে হলো।মেহরিমা কপাল কুচকে রেখেই বলে,

"সকালের রান্না করা খাবার আছে।খেতে পারেন,তা নাহলে রান্নার পর।"

রুহানি বেগম ছেলের দিকে তাকায়।তার একমাত্র আশ্রয়স্থল তার ছেলে।হাত দিয়ে ইশারা করে তাহসিনকে নিজের কাছে বসতে বলেন রুহানি বেগম।তাহসিন মায়ের কাছে এসে বসে।

মাকে এক নজর পরোখ করে বলে,

"তুমি দিনদিন শুকিয়ে যাচ্ছো মা।খাওয়া দাওয়া ঠিক মতো করছো না তাই না?কত সুন্দর মুখটা তোমার এখন এইটুকুন হয়ে গেছে শুকিয়ে। "

রুহানি বেগম ছেলের হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলেন,

"মেহরিমার যত্ন নিবি তো বাবা?জোর করে মেয়েটাকে তোর সাথে জুড়ে দিয়েছি বলে আবার অবহেলা করিস না যেন।তোর বাবা আমাকে যেমন সব কিছুর উর্ধ্বে ভালোবাসতো আগলে রাখতো ঠিক তেমন করে মেহরিমাকে আগলে রাখিস কিন্তু।"

"এসব কথা পরে হবে মা।তুমি বিশ্রাম নাও।আজকে আমি রান্না করবো আর তুমি খাবে কেমন?"

রুহানি বেগম মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়।তার শরীরটাও তেমন সায় জানাচ্ছে না কোনো কাজ করতে।তাহসিন তার মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বের হয়।মেহরিমা এখনো রুহানি বেগমের দিকে তাকিয়ে আছে মায়া ভরা চোখে।এই মানুষটার এক জীবনে আল্লাহ এত জষ্ট নাই বা দিতেন তাতে তো আর খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যেত না।রুহানি বেগম মেহরিমার দিকে চোখ পাকিয়ে বললেন,

"এই মেয়ে চোখ মুছতে পারো না?সমুদ্র রেখে দিয়েছে চোখে।সেই কখন থেকে দেখছি চোখ থেকে পানি পড়ছে তো পড়ছেই তা আর থামার নাম নিচ্ছে না।চোখ মুছে আমার ছেলের সাথে গিয়ে কাজ করো যাও।"

মেহরিমার এবার টনক নড়ে। সে চটজলদি চোখ মুছে ঘর থেকে বের হয়।রুহানি বেগম একমনে উপরের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

মেহরিমা রান্নাঘরে এসে দেখে তাহসিন ইতিমধ্যে চাল ধুয়ে মাটির চুলায় তা বসিয়ে দিয়েছে।একহাতে কিছুক্ষণ পরপর খড়ি চুলার ভেতরে দিচ্ছে আর তরকারি কাটার জন্য সবকিছু সামনে নিচ্ছে।মেহরিমা তাহসিনের থেকে একটু দূরত্ব নিয়ে বসে বলে,

"আমাকেও কিছু কাজ দিন আমিও করি।"

তাহসিন কোনো কথা বলে না।তার মুখটা থমথমে রুপ ধারণ করেছে।মেহরিমা তর্জনী আঙুল দিয়ে তাহসিনকে ধাক্কা দেয়।তাহসিন তবুও তাকায় না।শার্টের হাতা দিয়ে তাহসিন তার চোখ মুছে নিল।মেহরিমা এবার নিজেও কেঁদে দেয়।তাহসিনকে আবারও তর্জনী আঙুলের সাহায্যে ধাক্কা দিয়ে বলে,

"আপনি সব শুনে নিয়েছেন তাই না?আমি আপনার ছায়া দেখেছি।আপনার মায়ের না অনেক কষ্ট জানেন?এখন থেকে আমরা উনাকে আর কষ্ট পেতে দেবো না কেমন?"

তাহসিন নিজের কাজে মনোযোগ দেয়।মেহরিমার কথার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলো না সে।মেহরিমা নিজের চোখ মুছে নেয়।

তাহসিন হঠাৎ মেহরিমার দিকে না তাকিয়েই বলল,

"আমার মায়ের জীবনে শুধু অতীতের কষ্ট টুকু, আমার বাবাকে হারানোর কষ্ট টুকু এবং সেই না পাওয়া স্মৃতিগুলোর কষ্ট টুকু রয়েছে।যা তিনি আজীবন ইচ্ছাকৃত বহন করে বেড়াচ্ছেন।"

মেহরিমা বুঝলো না তাহসিনের কথা।তবে সে বলতে চাইল,মানুষ তার স্মৃতি মুছে ফেলতে পারে না।

তাহসিন এবার মেহরিমার দিকে তাকায়।আর বলে,

"আমার না কেমন যেন লাগছে।আমি একটু মাকে দেখে আসি কেমন?আপনি একটু এখানে বসুন।ভাতটা একটু দেখবেন শুধু।আমি যাবো আর আসবো।পারবেন না এতটুকু করতে?"

"পারবো আমি।আপনি যেতে পারেন।"

মেহরিমা বুঝলো না তাহসিন এমন কেন বললো।তাহসিন রান্নাঘর থেকে বের হওয়ার পর মেহরিমার মনে পড়লো রুহানি বেগমের অসুস্থতার কথা তো তাহসিনকে বলাই হয়নি।

মেহরিমা চুলায় খড়ি ঠেলে দেয়।ভাতের মাড় উতলে উঠলে না বুঝেই খালি হাত দিয়ে ঢাকনা ধরলে গরম উত্তাপ হাতে লাগায় মেহরিমার হাত থেকে ঢাকনা দূরে পড়ে যায়।মেহরিমা পানিতে হাত চুবিয়ে রাখে।

আকস্মিক তাহসিনের আর্তনাদ শুনে মেহরিমা ভড়কে উঠে।সে দৌড়ে রান্নাঘর থেকে বের হয়।রুহানি বেগমের ঘরের সামনে আসলে তাহসিনের আর্তনাদ আরো জোরালো ভাবে শুনতে পায় মেহরিমা। মেহরিমা ভয়ে ভয়ে রুহানি বেগমের ঘরে ঢোকে।তাহসিন তার মাকে বুকে জরিয়ে ধরে ডুকরে কান্না করছে।মেহরিমার মনে হলো তার হৃদপিণ্ড থেমে গেছে।সে ধীরে ধীরে রুহানি বেগমের কাছে যায়।মায়ের নিথর দেহ বুকে জড়িয়ে নিয়ে এক সর্বহারা সন্তান আর্তনাদ করছে।মেহরিমা তাহসিনকে বলে,

"মায়ের কি হয়েছে?আপনি এমন করছেন কেন?আমার কিন্তু ভয় করছে।"

তাহসিন মায়ের নিতর দেহ বুকে জড়িয়ে রেখেই ভাঙা ভাঙা কন্ঠে মেহরিমার দিকে তাকিয়ে বলে,

"মা কথা বলছে না মেহরিমা। মা আমাকে ফাঁকি দিয়েছে।আপনার দায়িত্ব আমার কাঁধে বুঝিয়ে দিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছে।"

মেহরিমা এখন বুঝতে পারে কি হয়েছে।কিছুক্ষণ আগেই না মানুষটা নিজের মনের সব কথা মেহরিমার কাছে উগলে দিচ্ছিলো।তবে এখন কেন এমন হলো।এরজন্যই বুঝি রুহানি বেগম আজ বললেন তার মনের সব কথাগুলো।

মেহরিমা ওরনার আঁচল মুখে চেপে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে।ভত পুরে যাওয়ার গন্ধ সাথে দুটো মানুষের কান্নার আওয়াজে যেন নিশুতি রাতকেও কাবু করছে তাকে বোঝাতে যে তার থেকেও ভয়ংকর অন্ধকার কিছু সময় মানুষের জীবনেও আসে।

তাদের করা আর্তনাদ শুনে পাশের বাড়ি গুলো থেকে এক এক করে লোকজন এসে জমায়েত হয় সিকদার বাড়িতে।রুহানি বেগমের মৃত্যুর খবর শুনে প্রীতি,রেশমা সহ অনেক মানুষ আসলো। তাহসিনের এ অবস্থায় প্রীতি কি বলবে বুঝতে পারল না।

তাহসিনকে টেনেও সরানো যাচ্ছে না তার মায়ের থেকে।সে একনাগাড়ে বলেই যাচ্ছে,

"আমার আর মেহরিমার সুখের সংসার দেখতে চেয়েছিলে তো মা তাই না?দেখো না,আমি সব মেনে নেবো এ মুহুর্ত থেকে।তবুও তুমি যেওনা মা।তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে বলো?"

তাহসিনকে কোনোভাবেই সরানো যাচ্ছিলো না তার মায়ের থেকে।মেহরিমা এবার তাহসিনকে বোঝাতে নিজের কান্না গিলে নিয়ে বলে,

"এইযে শুনুন!মানুষ মারা গেলে তার জন্য দোয়া করতে হয়।এভাবে কান্না করলে তো মা আরো কষ্ট পাবেন বলুন।আপনি প্লিজ এভাবে কান্না করবেন না।আমাদের মায়ের জন্য বেশি বেশি করে দোয়া করতে হবে।একটু বোঝার চেষ্টা করুন।"

তাহসিন তবুও বুঝলো না মেহরিমার কথা।কি করে বুঝবে সে?মা ব্যতিত আর কে ছিল তার যে সে বুঝবে।এত তারাতাড়ি এমন ঘটনা কোন ছেলে মেনে নিতে পারবে?এই তো কিছুক্ষণ আগেও সব ঠিক ছিল।তবে এখনি আল্লাহ এমন হুকুম কেন দিতে গেলেন।আর কিছু সময় কি দেওয়া যেত না তাদের?নিজের কষ্টটুকু ভাগ করে সেই কষ্টের দুজন ভাগিদার রেখে রুহানি চললেন নিজের আসল ঠিকানায়।

অনেক কসরত করে তাহসিনকে সরানো গেলো তার মায়ের থেকে।নিথর দেহের রুহানিকে কিছু মহিলারা মিলে ইতিমধ্যে আঙিনায় রাখা চকিতে শুইয়ে দিলেন।মৃত মানুষকে এভাবে বেশিক্ষণ রাখা ঠিক নয়।তাই তারা সব নিয়মকানুন মেনে রুহানি বেগমকে গোসল করিয়ে দিলেন।

তাহসিন এখন শান্ত নির্জীব একজন বোবা প্রাণীর মত বসে আছে।নিজের আপন মানুষকে হারানোর পরেই বোঝা যায়, তারা আমাদের কি ছিল এবং তাদের মূল্য,অবদান আমাদের জীবনে ঠিক কতটা।প্রথমে চৌদ্দ বছর বয়সে বাবাকে হারাতে হলো।এরপর মায়ের শুরু হলো তাকে নিয়ে জীবনযুদ্ধে দু মুঠো খেয়ে বেঁচে থাকার লড়াই।কি করুন ছিল সেই দিনগুলো।মনে পড়লে এখনো তাহসিন কেঁপে ওঠে। আজ সেই সকল স্মৃতি এক এক করে যেন চোখের সামনে ভাসছে।

মেহরিমা তাহসিনের পাশে বসে।তাহসিনের দিকে তাকালে তার বুকটা কেঁপে ওঠে।তার নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে যায়।এখানে এসেছে থেকে মায়ের সাথে কথা হয়নি।

তাহসিন নিজে থেকেই মেহরিমা ডাক দেয়।মেহরিমা তার দিকে তাকালে সে হাত দিয়ে তার মাকে যেখানে রাখা হয়েছে সেদিকে ইশারা দিয়ে বলে,

"দেখেছেন?মানুষ কিভাবে পারে তার জেদ আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া শেষে নিজেকে আড়াল করে নিতে?তার জন্য আমার ভালোবাসা বিসর্জন দিলাম আর এখন সেই আমাকে বিসর্জন দিয়ে চলে গেল।আমাকে তার সঙ্গে নেওয়ার কথাটাও ভুলে গেলো।আপনার সাথে জীবন জুড়তে বলল।আপনাকে আগলে রাখতে বলল।আপনাকে ভালোবাসতে বলল।তবে সে কি জানে?

ভালোবাসা কোনো দয়া নয় যে চাইলেই যে কারো প্রতি চলে আসবে।ভালোবাসা এমন এক প্রাণঘাতী অনুভূতি যা একবার একজনের প্রতি চলে আসলে সে ব্যতিত অন্য কাউকে চোখেও দেখতে চাইবে না।তবে আপনি চিন্তা করবেন না।বউ হয়েছেন আমার।এখন অন্য কাউকে ভালোবাসার স্পর্ধা আমি করবো না।সব রকম চেষ্টা চলবে সেই অনুভূতিকে নিঃশেষ করার জন্য।আমার মায়ের ইচ্ছে অপূর্ণ থাকবে না ইনশাআল্লাহ।"

মেহরিমা তাহসিনের কথার বিপরীতে কি বলবে বুঝতে পারলো না।তাই সে চুপ করে শুধু শুনলো তাহসিনের কথা।

রাত পেরিয়ে ভোর হলো।মৃত্যুর পরে দাফন কার্য যত দ্রুত সম্ভব করা ভালো।তাই আর কেউ দেড়ি করতে চাইলো না।তাহসিনকে আর বলতে হলো না কিছু।নিয়তি মেনে জীবনধারণ করাই মানুষের ধর্ম।

তাই তাহসিন ও তার নিয়তি মেনে নিয়েছে।

বাকি মানুষদের সাথে মাকে শেষ বিদায় দেওয়ার জন্য নিজেও মাকে শুইয়ে রাখা খাটিয়ার এক কিনারে হাত লাগিয়ে খাটিয়া কাঁধে তুলে নেয়।ঠিক এভাবেই তো বাবার খাটিয়াও তাহসিনকে কাঁধে নিতে হয়েছিল।আজ তাকে সম্পূর্ণ ভাবে পৃথিবীর বুকে এতিম নামে আখ্যায়িত করে তার মা ও বিদায় নিলো দু-হাত মাটির নিচে।

শেষ দু মুঠো মাটি কবরে দিয়ে একধ্যানে মায়ের কবরের দিকে তাকিয়ে থাকে তাহসিন।তার বুক খালি করে তার মা অবশেষে বিদায় নিলো পৃথিবী থেকে।তাহসিনকে একা থাকতে দিয়ে সবাই সেখান থেকে প্রস্থান নেয়।রুহানি বেগমকে তার স্বামীর কবরের পাশেই দাফন করা হয়েছে।

তাহসিন মায়ের কবরের উপর নিজের মাথাটা রেখে দুহাতে কবর জড়িয়ে ধরে।

মেহরিমা বাড়ি থেকে বের হয়ে বাড়ির পেছনে তার শ্বশুর শাশুড়ীর কবরস্থানে চলে আসে। তাহসিনের কাছে না গিয়ে সে একটু দূরে দাড়িয়ে থাকে।একনজরে মেহরিমা তাহসিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।এক রাতের ব্যবধানে কি থেকে কি হয়ে গেলো।মানুষ মরণশীল তাই মৃত্যুকে সহজভাবে গ্রহণ করে নেওয়া উচিত সকল মানুষের।তবে তাহসিন তা করতে পারছে না।

তাহসিন মায়ের কবর আগলে ধরে আবারও ডুকরে কেঁদে ওঠে।

"আমার যত্ন নেওয়ার আর কেউ রইলো না মা।আমাকে একা করতে তুমিও আব্বার কাছে চলে গেলে।সবাই আমাকে একা করার পাঁইতারা করছিলে।অবশেষে আমিও একা হয়ে গেলাম।

শুধু সাথে থাকার জন্য রেখে গেলে নির্বোধ মেহরিমাকে।"

চলবে,,,,,

আপনাদের কি ভালো লাগছে না গল্পটা পড়তে?তাহলে যে কোনো রেসপন্স নেই কারো!আমি এতটা সময় নিয়ে লিখি!বাংলা টাইপিং করতে আমার অনেক সময় লাগে।

তবে আপনারা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছেন।

আজকে বলবেন একটু দয়া করে, আপনাদের অনুভূতি এই গল্প নিয়ে?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন