#নূরের_পথে_ফিরে_আসা
#নূরায়া_মেহনাজ
#পর্ব_০১
( নোট 🚫: এই গল্পে “আয়েশা” নামের এক আধুনিক মেয়ের জীবনের কথা তুলে ধরা হবে। যে শহরের চাকচিক্যের মোহে পড়ে ইসলাম থেকে ধীরে ধীরে দূরে চলে যায় কিন্তু জীবনের কঠিন মুহুর্তগুলো তাকে আবার ফিরিয়ে আনবে সত্য, তওবা ও নূরের পথে। এই গল্পের যাত্রায় শুধু আয়েশার নয়, তার চারপাশের মানুষদেরও পরিবর্তন ঘটবে)
*************************
ঢাকার বুকে তখন এক কর্মব্যস্ত সকাল। ইট-কাঠের এই মহানগরীর প্রতিটি কোণায় জীবনের তীব্র কোলাহল মিশে আছে। গলির মোড়ের দোকানগুলো থেকে ভেসে আসছে চা-সিগারেটের ধোঁয়ার কুন্ডলী। আর রিকশার টুংটাং ঘন্টাধ্বনি মিশে যাচ্ছে গাড়ির ক্লান্তিহীন হর্নে। এই যান্ত্রিক বিশৃঙ্খলার মাঝেই আধুনিকতার এক ঝলক নিয়ে একটি দামি সেডান গাড়ি এসে থামল শহরের নাম করা একটি ইউনিভার্সিটির গেটে।
গাড়ি থেকে নেমে এল এক তরুণী। তার হাতে দামী ফোন, কানে ওয়্যারলেস ইয়ারফোন, চোখে ব্রান্ডেড সানগ্লাস।
হিজাব? না, তরুণীর কাঁধ ছুঁয়ে থাকা অল্প কাপড়টুকু মাথায় জড়ানো সেটাকে অন্তত হিজাব বলে গণ্য করা যায় না। বাস্তবে তার কাছে পর্দা মানে ফ্যাশন। তরুণীর কাছে পর্দা ছিল একটি ফ্যাশন স্টেটমেন্ট, যা ইসলামের কোনো বিধান নয়।
আয়েশা ঢাকার নামকরা এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। ইন্সটাগ্রামে তার ফলোয়ার প্রায় এক লাখ। মেকআপ টিউটোরিয়াল, ফ্যাশন টিপস এবং লাইফস্টাইল ভ্লগ এগুলোই তার আত্মবিশ্বাসের একটি উৎস। ক্যাম্পাসে বন্ধুরা তাই তাকে এক নামেই চেনে - "ফ্যাশন কুইন।"
একদিন ক্লাসরুমে বসে আইসার বেস্টফ্রেন্ড রীমা বলল, "তোর নতুন রিলটা তো জাস্ট পুরো ভইরাল দোস্ত! ছয় হাজার লাইক পার হয়ে গেছে।
আয়েশা মুচকি হাসি দিয়ে সম্মতি জানায়, কি বলিস? মাত্র ছয় হাজার লাইক পড়েছে বলে এমন করছিস আর কয়েকদিন যেতে দে আমি তো ফেমাস কুইন হতে চাই। কথা বলার মাঝখানে আয়েশার চোখ গেল ক্লাসের সামনে বোর্ডে বড় করে লেখা একটি শব্দবন্ধের দিকে - " জীবনের উদ্দেশ্য "।
ক্লাসে স্যার তখন বলা শরু করল, আমরা কিসের জন্য বেঁচে আছি? এত দৌড়-ঝাঁপের মাঝে একবারও কি এই প্রশ্নটা নিজেদের করেছি?
এক মুহুর্তের জন্য আয়েশা থমকে গেল, " কখনো তো এভাবে ভেবে দেখিনি, যে আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য কি? আমরা কিসের জন্য বেঁচে আছি? এই প্রশ্নটাই হঠাৎ তাকে অজানা এক শূন্যতায় ঘিরে ফেলল।
রীমা তখনই বলে উঠল, "বাদ দে তো! চল, ক্যান্টিনে গিয়ে কফি খায়।
নূরায়ার ভাবনা আর বেশিদূর এগোলো না। দুজনেই একসাথে বের হলো ক্যান্টিনে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।
---------------------
বিকেলে বাসায় ফিরে আয়েশা দেখল, মা নামাজ পড়ছেন। মায়ের সাদা রঙের ওড়না মাথায় হিজাবের মতো বাঁধা। জায়নামাজে বসে দোয়া পড়ছেন৷ নামাজ শেষে মা স্নেহের দৃষ্টিতে তাকালেন। মা হেসে বললেন,
- আয়েশা মা আজকেও নামাজ পড়লি না?
আয়েশার কন্ঠে স্পষ্ট বিরক্ত। " মা এখন আমার সত্যি সময় নেই। আর আল্লাহ তো শুধু নামাজে থাকে না, মনেও থাকে৷ এটাতেই হবে।
মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সেজদার আলোয় উজ্জ্বল হওয়া মুখটিতে নেমে এল বিষাদের ছায়া।
- মনে থাকতে হয় ঠিকই, কিন্তু নামাজ হলো সেই বন্ধন যে বন্ধন না থাকলে হৃদয় শুকিয়ে যায়, আত্মা নিঃশেষ হয়ে যায়। জীবনের যতোই ব্যস্ততা,দৌড়ঝাঁপ, হাসি-আনন্দ থাকুক না কেনো, যদি এই বন্ধনটা না থাকে তাহলে ভেতরে ভেতরে এক অজানা শূন্যতা জমতে থাকে।
- নামাজের সময়টা একটি মিষ্টি মুহুর্ত। যখন মানুষ তার সৃষ্টিকর্তার সামনে মাথা নিচু করে বলে -
" হে আল্লাহ আমি পাপের পথ থেকে ফিরে এলাম।এ দুনিয়া আমাকে ক্লান্ত করে দিয়েছে। আমি তোমারই, আমাকে তুমি হেফাজত করো"।
রবের কাছে মন খুলে সবকিছু বলার পর মুহুর্তেই বুকের সব ভার যেন গলে যায় অশ্রুতে। সব ভয় মিলিয়ে যায় সেই সিজদার উষ্ণতায়৷ যে নামাজে দাঁড়ায় সে শুধু দুনিয়ার চিন্তা থেকে মুক্ত থাকে না, সে অনুভব করবে তার ভেতরের অন্যরকম এক শান্তিময় প্রশান্তি - যা কোনো টাকা, কোনো মানুষ, কোনো দুনিয়াবি সাফল্য দিতে পারে না৷ কারণ নামাজ এমন একটি ইবাদত, এমন একটি বন্ধন যা মানুষকে সবসময় আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত রাখে।
"যে বন্ধন ছাড়া হৃদয় পাথর হয়ে যায়,
চোখের পানি শুকিয়ে যায়,
আর হৃদয়টা পরিণত হয় মরুভূমিতে,
যেখানে আর কোনো নূরের আলো পোঁছায় না। "
- তাই বলছি আয়েশা মা, কখনো যদি মনে হয় জীবনের কোনোকিছু তোমার কাছে ভারী হয়ে উঠছে। তবে তুমি একবার সিজদায় পড়ে দেখো। সেই এক সিজদায় তোমার বুকের ভার হালকা করে দিবে। তোমার মরুভূমির মতো মন ভিজে উঠবে তওবার অশ্রুতে।
আয়েশা তার মায়ের কথাই কোনো উত্তর দিল না। দ্রুত নিজের ঘরে চলে গেল। মায়ের চোখের কোণের পানিটুকু, অন্তরের তীব্র কষ্টটুকু আয়েশার চোখ এড়িয়ে গেল।
রাতে আয়েশা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল সুন্দর করে ছেড়ে দিয়ে সেলফি তুলছিল। রুমের লাইট নিভিয়ে দিয়ে একটি ল্যাম্প জ্বালিয়েছে। যেন সেলফিটা নিখুঁত হয়৷
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবিগুলো পোস্ট করে আয়েশা একটি ক্যাপশন লিখল -
" নিজের মতো করে বাঁচো, কাউকে ব্যাখা দিও না।" মিনিটের মধ্যে শত শত লাইক, কমেন্টের বন্যা বয়ে গেল। "
কিন্তু আয়েশা বুঝতে পারছিল না। তার একাকী আত্মা তখনও এই সব লাইক কমেন্টের ভিড়েও নিঃশব্দে কাঁদছিল।
"শহরের কৃত্রিম আলোয় সে যত ঝলমলে হয়ে উঠছিল। তার অন্তরের নূর ঠিক ততটাই নিভে যাচ্ছিল। "
#চলবে_ইনশাআল্লাহ
( আসসালামু আলাইকুম সবাইকে৷ পর্বটি কেমন লাগলো অবশ্যই জানাবেন। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)