ফন্ট সাইজ:
থিম:
নূরের পথে ফিরে আসো (১ম খন্ড)

২য় পর্ব

লেখক: নূরায়া মেহনাজ

#নূরের_পথে_ফিরে_আসা

#নূরায়া_মেহনাজ

#পর্ব_২

সকালের নরম রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে আয়েশার ঘরে প্রবেশ করছে। আলোয় ঝলমল করছে চারপাশ। ঘড়ির কাটা তখন সকাল নয়টা ছুঁই ছুঁই। কিন্তু আয়েশা এখনো ঘুমে অচেতন। মায়ের ডাকে ঘুম ভেঙে গেল আয়েশার।

- মা আজ ফজরের নামাজটাও পড়লি না..?

আয়েশা বালিশে মুখ গুঁজে আলস্যভাবে বলল, "মা এত সকালে উঠতে পারি না, তুমি তো জানোই৷ আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাকে বুঝবেন।"

মা আর কথা বাড়ালেন না। তিনি মেয়ের যুক্তি শুনে নীরব রইলেন। শুধু মনে মনে মেয়ের জন্য রবের কাছে দোয়া চাইলেন। হে মহান রাব্বুল আলামীন তুমি তো বলেছ,

" নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। " ( সূরা আল-আনকাবুত ২৯:৪৫)

- তুমি আমার মেয়েকে হেদায়েত দান করো। সে যেনো ঠিক ভুলের পার্থক্য বুঝতে পারে। তাকে তুমি সঠিক পথ দেখাও৷ আমার মেয়ের মন এখন দুনিয়ার চাকচিক্যে এমনভাবে ডুবে গেছে যে সে আখিরাতের প্রশান্তিময় আলো দেখতে পাচ্ছে না৷ আমার রব তোমার কাছে একটাই প্রার্থনা আমার মেয়েকে নূরের পথে ফিরিয়ে নিয়ে এসো।

----------------------------

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে আয়েশা তার বন্ধুবান্ধবদের সাথে বসে আছে। সবার সামনে বসে ভিডিও করতে ব্যস্ত সে। একটি ট্রেন্ডিং গানের সাথে কিছু নাচের স্টেপগুলো প্রাকটিস করছে। আয়েশার চোখে মুখে তীব্র উত্তেজনা।

রিমা বলল, তুই তো দিন দিন ফেমাস হয়ে যাচ্ছিস রে। দেখে নিস কয়েকদিন পর বড় বড় স্পেনসাররা তোর সাথে কন্টাক্ট করবে।

আয়েশা হেসে বলল, "তাই তো চাই। ইনশাআল্লাহ এমন মুহুর্ত একদিন আসবে আমি খুব এক্সাইটেড। পরক্ষণেই আয়েশা নিজেকে সামলে নিয়ে মেকি হেসে বলল, 'না মানে,,, হাহাহাহা...দেখ আবার ধর্ম ঢুকাচ্ছি এর ভেতর। '

সবাই তখন হেসে ওঠে। তাদের এই হাসির মধ্যে যেন ফুটে উঠেছে একধরনের জয়োল্লাস, যেখানে ধর্মের কথা উচ্চারণ করাটাও একপ্রকার লজ্জার বিষয়! আয়েশা জানে না, সে যত দুনিয়ার চাকচিক্যে ডুবে যাচ্ছে ততই তার অন্তর ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। আর সেই তীব্র আধ্যাত্মিক শূন্যতা একদিন তাকে ভয়ংকরভাবে কষ্ট দেবে।

সন্ধ্যায় নিজের রুমে বসে আয়েশা ইনস্টাগ্রাম স্ক্রোল করছিল। হঠাৎ একটি ইসলামিক পেইজের পোস্ট তার সামনে আসল। সেখানে লেখা ছিল —

“ তোমাদেরকে যেই বড় বড় গুনাহ করতে নিষেধ করা হয়েছে, তোমরা যদি তা পরিহার করে চল তবে আমি নিজেই তোমাদের ছোট ছোট গুনাহ তোমাদের থেকে মিটিয়ে দেব এবং তোমাদেরকে এক মর্যাদাপূর্ণ স্থানে দাখিল করব। ” ( সূরা নিসা, আয়াত ৩১)

আয়েশা পোস্ট টার দিকে একজনরে তাকিয়ে আছে। কিন্তু পরক্ষণেই তার মন আবার পরিবর্তন হয়ে গেল সে অন্য একটি রিলস দেখতে শুরু করল। তবুও আয়েশার মনে একটি প্রশ্ন আসে — " যদি সবকিছু আল্লাহর কাছ থেকেই আসে তাহলে আমি কিসের এত অহংকার করছি?"

--------------

রাতে আয়েশা একটি ক্যাফেতে যায় তার বন্ধুর জন্মদিনে। সেখানে সবাই মিলে একসাথে হৈ-হুল্লোড়, ছবি তোলা, ভিডিও তৈরি করা, নাচ-গান এসবেই মেতে ছিল। সবই যেন স্বপ্নের মতো সুন্দর।

হঠাৎ আয়েশার চোখ পড়ল পাশের টেবিলে। সেখানে এক তরুণী হিজাব পড়া অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করছে। তার মুখে ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি। আয়েশা ভাবল মেয়েটা একা একা টেবিলে বসে সামান্য কুরআন তিলাওয়াত করছে তাও তার মুখে কত সুন্দর প্রশান্তিময় ঝিলিক ফুটে উঠেছে। তারপর আয়েশা দ্রুত এসব ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসল। আবারও মেতে উঠল বন্ধুদের সাথে আড্ডায় ।

আজ আয়েশা দেরি করে বাসায় ফিরল। রুমে গিয়ে দরজা ভিজিয়েই সে আবার ফোনে মনোযোগী হলো। অন্যদিকে তার মা সেজদায় বসে কাঁদছেন।

“ হে আমার রব! আমাকে এবং আমার সন্তানদেরকে সালাত কায়েমকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। ” আমার মনের সকল দোয়া আপনি কবুল করুন মালিক।

মায়ের চোখের সেই পানি আয়েশা দেখেনি, তার মায়ের ভেতরের কষ্টগুলো কখনো অনুভব করেনি৷

কিন্তু আল্লাহর নূর কখনো নিভে যায় না। তিনি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন, যতক্ষণ না তাঁর ভালোবাসার বান্দা নিজেই ফিরে আসে সেই চিরন্তন পথের দিকে।

রাত তখন গভীর। ঢাকা শহর তখন কৃত্রিম আলোয় ঝলমল করছে — কোথাও গাড়ির হর্ন, কোথাও মিউজিক, কোথাও বা তারুণ্যের উচ্ছ্বাসিত হাসির শব্দ। এই কোলাহলের বিপরীতে ঘরের কোণে এক মা সিজদায় নত হয়ে আছেন। অনেকক্ষণ ধরে তিনি কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। এখন দোয়া দরুদ পড়ছেন এবং দোয়া করছেন। তার প্রার্থনা শুধু মেয়ের দুনিয়াবী সুখের জন্য নয়,বরং তার চিরস্থায়ী শান্তির জন্য। চোখের পানি গাল বেয়ে পড়ছে তবুও ঠোঁটের কোণে এক নির্মল তৃপ্তির হাসি। কারণ তিনি জানেন তার এই নীরব আর্তি, আন্তরিক দোয়া একদিন কবুল হবে ইনশাআল্লাহ।

-------------------------

সকালে আয়েশার মা ফাতেমা বেগম তার মেয়ের রুমে ঢুকলেন। আয়েশা তখনও ঘুমে মগ্ন৷ তার পাশে রাখা ফোনটি এখনো চলছে। তিনি মেয়ের কপালে হাত রাখলেন। উষ্ণ হাতের স্পর্শে আয়েশা আধো ঘুমে বিরক্তি নিয়ে বলল,

- মা একটু ঘুমাতে দাও না প্লিজ!

মা মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, " আচ্ছা ঘুমা মা।"

ঘর থেকে বেরিয়ে এসে জানালার পাশে দাঁড়ালেন ফাতেমা বেগম। তিনি ভাবতে লাগলেন —

" নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে।" ( সূরা রা'দ ১৩:১১)

- "হে আল্লাহ!" আমার মেয়ের হৃদয়ে একটুখানি নূর দাও, শুধু একটুখানি...৷

************

বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে আয়েশা লক্ষ করল, আজ কলেজের জন্য বের হওয়ার সময় তার মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেননি। হাসিমুখে বলেনি হাত নেড়ে বলেনি "আল্লাহ হাফেজ" মা সাবধানে যেও। আজ ক্লাসেও বিশেষ মন বসলো না আয়েশার। পাশ থেকে রিমা বলে উঠল, " কি হয়েছে তোর? " আজ এত চুপচাপ কেনো?

আয়েশা নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। কিন্তু বুকের ভেতর সেই ভারি অনুভূতিটা রয়েই গেল।

বিকেলে হঠাৎ করেই তুমুল বৃষ্টি শুরু হলো। আয়েশা বাসায় ফিরল ভিজা শরীরে। আর মায়ের ঘরে ঢুকেই দেখল, মা সিজদায় নত। আয়েশা মুখে বিরক্তিভাব নিয়ে বলল, 'মা তুমি সবসময় এত নামাজ পড়ো কেন!"

মা মাথা তুললেন না। সিজদায় থেকেই তার কন্ঠস্বর কেঁপে উঠলো — " আল্লাহ যেন আমার মেয়েকে সঠিক পথে ফিরিয়ে নেন। "

আয়েশা কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে মনে মনে ভাবল, " তার মায়ের মনে এত কিসের কষ্ট? আমি কি সত্যি এতটাই দূরে চলে গেছি যে মা আমার জন্য সিজদায় বসে চোখের পানি ফেলে!"

#চলবে....

( ভুলত্রুটি হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন