#নূরের_পথে_ফিরে_আসা
#নূরায়া_মেহনাজ
#পর্ব_৫
⛔কপি করা নিষিদ্ধ⛔
হসপিটালে পৌঁছানোর পর ডাক্তার বলল, " দুঃখীত আমরা অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু মেয়েটাকে আমরা বাঁচাতে পারলাম না। "
আয়েশা স্তব্ধ হয়ে বসে পরলো। মনে হচ্ছে তার গোটা পৃথিবী থেমে গেছে। তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল রীমা। কতশত হৈ-হুল্লোড়, খুনসুটি আজ সবই স্মৃতির পাতায় রয়ে যাবে। রীমা আর নেই, তার ছোটবেলার সঙ্গী আর ফিরে আসবে না, ভাবতেই আয়েশার বুক মুচড়ে উঠল।
আয়েশার মনে তখন তার মায়ের পড়া সেই কুরআনের একটি আয়াত গুঞ্জরিত হলো —
" প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃ/ত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। "
( সূরা আলে-ইমরান, ৩:১৮৫)
কিছুসময় আগেও তো মেয়েটা কত সুন্দর হাসছিল। কিন্তু এখন?... এখন কেমন নিথর হয়ে পড়ে আছে মেয়েটা। কেউ কি বুঝতে পেরেছিলাম, ওর মৃ/ত্যু এত কাছে ঘনিয়ে এসেছে!" ভাবতেই আয়েশার শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো।
সেদিন বাড়ি ফিরে আয়েশা সারারাত ঘুমাতে পারলো না। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে রীমার হাস্যজ্জল মুখ, তার হাসি ,তার বলা কথাগুলো। আয়েশা এসব ভাবতে ভাবতে বিছানায় বসে কাঁদছে।
- "আমার রব!" আমি এতদিন তোমার কথা ভুলে ছিলাম। আজ বুঝলাম মৃ/ত্যু কবে, কখন, কীভাবে হঠাৎ করে সবার জীবনে ঘনিয়ে আসবে কেউ বলতে পারে না।"
আয়েশা কুরআনের দিকে হাত বাড়ালো। সেই মুহুর্তে ঘরে ঢুকলেন আয়েশার মা আমেনা বেগম। তিনি দেখলেন আয়েশা কুরআন শরিফের সামনে বসে আছে। তিনি অবাক হয়ে বললেন,
- " তুই কুরআন পড়বি?"
আয়েশা মাথা নেড়ে বলল, "হ্যাঁ, মা। আমি জানতে চাই, জীবনটা আসলে কি। "
কুরআনের পাতা খুলতেই চোখ পড়ল এই আয়াতে —
" তোমরা কোথায় যাচ্ছো?" ( সূরা আত - তাকভীর, আয়াত : ২৬)
যার অর্থ হলো, "কেনো তোমরা আল্লাহর আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছো এবং সত্যকে প্রত্যাখ্যান করছো।"
(এই আয়াতে বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর বিধানকে উপেক্ষা করে কোথায় যাচ্ছো, সেই প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে)
আয়েশা আয়াতটি পড়ে চুপ করে বসে রইল। একটা আয়াতের মাধ্যমেই যেনো সে তার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেল। আয়েশা বুঝল, এতদিন সে সত্যিই জীবনের আসল গন্তব্য থেকে হারিয়ে ছিল।
রাতের শেষ প্রহরে আয়েশা প্রথমবারের মতো কারো তাগিদ ছাড়াই নামাজ পড়ল। সে সিজদায় মাথা রেখে চোখের পানি ফেলছে এবং কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলছে,
-" হে আমার রব!" আমি তোমাকে ভুলে গিয়েছিলাম। তুমি আমাকে সঠিক পথ দেখিয়ে, সঠিক গন্তব্যে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছ। রীমাকে তুমি নিয়ে গেছ হয়তো এর মাধ্যমে আমার কোনো কঠিন পরীক্ষা নিয়েছো তুমি এবং এর মাধ্যমে আমি অনেক কিছু বুঝেছি। "
এভাবেই আয়েশা অনুশোচনা ও আত্মসমর্পণের মাধ্যমে মনের মধ্যে একরকম শান্তি খুঁজে পাচ্ছিল।
" নিশ্চয়ই বিপদের পর আসে সহজি।"
( সূরা আশ-শারহ, ৯৪:৬)
আয়েশার বুকের ভার হালকা হয়ে গেল। তার চোখের কোণে পানি জমে থাকলেও তার হৃদয়ে নেমে এসেছে এক গভীর অবিচল শান্তি। আয়েশা বুঝল, শুধুমাত্র মৃত্যুই নয়, জীবনের উদ্দেশ্য হারানোই ছিল আসল মৃত্যু।
★
সকালের স্নিগ্ধ আলো জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করছে। টেবিলের একপাশে পবিত্র কুরআন শরীফ রাখা৷ আয়েশা ধীরে ধীরে কুরআন টি হাতে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরল। কুরআন টি বুকে জড়িয়ে নেওয়ার সাথে সাথে তার অন্তরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছেয়ে গেল৷ যেন বহু বছর ধরে সে যেটার খোঁজ করছিল সেটা সে পেয়ে গেছে।
রীমার আকস্মিক মৃ/ত্যুর পর থেকে প্রতিদিন ফজরের আজান তার ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। প্রথম কয়েকদিন তার জন্য এটা ছিল এক কঠিন সংগ্রাম। আগে তার সকালে ঘুম ভাঙত না, ওজু করতে মন চাইত না। সে ঠিকমতো ইসলামের কোনো বিধান জানে না বলে কখনো জানার বা বোঝার চেষ্টাও করেনি। কিন্তু আস্তে আস্তে আয়েশার মন পরিবর্তন হলো পুরোটা। যখন তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে রীমার নিথর হয়ে পড়ে থাকা দেহটা। সাথে কুরআনের সেই আয়াতটি,
" সকল প্রাণীকেই মৃ/ত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। " ( সূরা আলে-ইমরান ৩:১৮৫)
এই আয়াত যেনো আয়েশার হৃদয়ে এক অমোঘ সংকেত। জীবন খুবই ছোট, সময় খুব কম। এই কথাগুলো উপলব্ধি করার পর কোনো কিছু তে আর আলস্য থাকে না।
একদিন নামাজ শেষে মুনাজাতে আয়েশা বলল,
-" আল্লাহ তুমি আমাকে বদলে দাও। আমি পুরোপুরি তোমার কাছে ফিরে যেতে চাই। "
আয়েশার মা আমেনা বেগম লক্ষ্য করলেন, আয়েশা এখন প্রতিদিন সকালে কুরআন তিলাওয়াত করে এবং সে শুধু তিলাওয়াত-ই করে না- সে একটি খাতায় আয়াতগুলো লিখে রাখে তারপর নিচে নিজের অনুভূতিগুলো লিখে তার অর্থ বোঝার চেষ্টা করে।
একদিন আয়েশা খাতায় লিখছিল,
"আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উদ্ধার পথ বের করে দেন। "
( সূরা আত-তালাক ৬৫:২)
এই আয়াতটি আয়েশাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিল। সে ভাবল, "আমার যত অস্থিরতা, যত ভয়, যত কষ্ট সবকিছুর সমাধান তো এখানেই! "
সেদিন থেকে আয়েশা ঠিক করলো প্রতিদিন অন্তত পাঁচ মিনিট কুরআন পড়বে এবং সেই আয়াতগুলো নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করবে।
রীমার মৃ/ত্যুর পর আয়েশার এই আমূল পরিবর্তন দেখে তার পুরো বন্ধুমহল অবাক। কেউ কেউ তো বিদ্রুপ করে বলে,
-"দেখ দেখ আয়েশা দিন দিন কেমন বোরিং হয়ে যাচ্ছে বলেই হাসতে থাকে। "
কেউ কেউ আবার বলে,
-"কিরে আয়েশা তুই তো কিছুদিন আগেও পার্টি কুইন ছিলি! এখন তসবিহ কুইন হয়ে গেলি! " এসব কথা বলে সবাই আয়েশাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করতে থাকে।
আয়েশা চুপ করে তাদের কথা শোনে, কিন্তু কিছু বলে না বা তাদের প্রতি কোনো রাগও জন্মায় না। সে শুধু মাথা নিচু করে হাসে। সে তার অন্তরে আল্লাহর দেওয়া নির্দেশনাটি মনে রেখেছে -
"আর রহমানের বান্দারা তো তারা, যারা বিনয় সহকারে পৃথিবীতে চলাফেরা করে আর মূর্খরা যখন তাদের সম্বোধন করে তখন তারা বলে - সালাম। "
(সূরা আল-ফুরকান ২৫:৬৩)
এই আয়াতটি আয়েশার অন্তরকে দৃঢ় করে তোলে। সে এখন বুঝে গেছে, পরিবর্তন সবসময় কোনো ঘোষণা ছাড়াই ধীরে ধীরে ঘটে। কিন্তু তার আধ্যাত্মিক প্রভাব হয় অমোঘ ও সুদূরপ্রসারী।
#চলবে....
( ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)