#নূরের_পথে_ফিরে_আসা
#নূরায়া_মেহনাজ
#পর্ব_৬
রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে আয়েশা একা ছাঁদে যায়। তারকা ভরা আকাশে তাকিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে আয়েশা বলে,
-" হে আল্লাহ! " আমি জানি তুমি আছো। আমি তোমার নিকটে আরো বেশি এগোতে চাই। "
মৃদুমন্দ বাতাসে চারিপাশ হয়ে উঠছে প্রশান্তিময়৷ আকাশও যেন আয়েশার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছে৷ আয়েশার মনে পড়ল নবী মুহাম্মদ (সাঃ) -এর হাদিস -
"যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে এক বিঘত অগ্রসর হয়,আল্লাহ তার দিকে এক হাত এগিয়ে আসেন।" ( সহীহ মুসলিম)
এই আয়াতটি আয়েশার চোখে কৃতজ্ঞতার অশ্রু এনে দেয়। মনে মনে সংকল্প করে, আমি আল্লাহর আরো নিকট যাবো। "
মা - মেয়ে এখন প্রতিদিন একসাথে বসে নামাজ পড়ে। একদিন আয়েশার মা আয়েশাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন,
-"তোমার এই পরিবর্তন দেখে মনে হয়, আমি আমার মেয়েকে আবার নতুন করে ফিরে পেয়েছি। "
আয়েশা হেসে বলল,
-" না মা উল্টো আমি নিজেকে নতুনভাবে পেয়েছি।এবার আমি সঠিক পথ বেছে নিয়েছি। "
মা মৃদু হেসে বললেন,
-" যে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, আল্লাহ তাকে পথ দেখান।" ( সূরা আশ-শূরা ৪২;১৩)
রাতে আয়েশা ঘুমানোর আগে কুরআনের এই আয়াতটি পড়ে -
" জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয়ের প্রশান্তি। "
(সূরা রা’দ ১৩;২৮)
চোখ বন্ধ করে আয়েশা মৃদুস্বরে বলল,
-হ্যাঁ! মহান আল্লাহ তায়ালা আমি পেয়েছি সেই প্রশান্তি। যা আমি এতদিনে ও পাইনি। তুমি আমাকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে এসেছো।
তারপর আয়েশা ঘুমানোর দোয়া পড়ে ঘুমিয়ে যায়। আয়ের হৃদয়ে এখন নীরব ভালোলাগা, যা শুধু আল্লাহর তরফ থেকেই আসে। "আলহামদুলিল্লাহ।"
★
আয়েশার জীবনে এল এক নতুন ভোর। নামাজ, কুরআন, দোয়া এগুলো এখন আর তার কাছে দৈনন্দিন নিয়ম বা বাধ্যবাধকতা নয়, বরং স্রষ্টার প্রতি গভীর ভালোবাসার এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। আয়েশা অনুভব করে - এই নূরের আলো শুধু নিজের মধ্যেই রাখলে চলবে না৷ যে মানুষদের সাথে সে একসময় অজ্ঞানতার পথে হেঁটেছিল তাদের হৃদয়েও এই আলোর স্পর্শ দেওয়া দরকার। আয়েশার হৃদয়ে জেগে উঠলো সেই মহান দায়িত্বের অনুভূতি “দাওয়াত” আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করা।
একদিন আয়েশা রান্নাঘরে এসে তার মাকে বলল,
-" মা আজ আমি নিজের হাতে রান্না করে তোমাদের খাওয়াতে চাই। "
ফাতেমা বেগম তার মেয়ের দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকালেন।
-" তুই রান্না করবি?"
-" হ্যাঁ মা। নবীজি (সাঃ) তো বলেছিলেন -
"তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার পরিবারের জন্য উত্তম। " ( তিরমিজি)
মা মৃদু হাসলেন। তার চোখে আনন্দ অশ্রু। তিনি বুঝলেন মেয়েটা সত্যিই আমূল বদলে গেছে। এখন সে শুধু ইবাদত করছে না, বরং ইসলামের সৌন্দর্য তার দৈনন্দিন জীবনেও ফুটিয়ে তুলছে। তার “দাওয়াত” শুরু হয়েছে সবচেয়ে কাছের মানুষ ও কর্মের মাধ্যমে।
একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়েশার এক পুরনো বান্ধবী সাবা তার কাছে এলো। সাবা বলল,
-" তুই এখন অনেক বদলে গেছিস, রে আয়ু।" এখন দেখি মাথায় সবসময় হিজাব বেঁধে থাকিস, নামাজ পড়িস৷ কিন্তু তোর কি মন খারাপ লাগে না, আগের যে লাইফস্টাইল ছিল তোর সেটা নিয়ে?
আয়েশা তার দৃঢ় কন্ঠে বলল,
-" মন খারাপ হবে কেন? বরং নিজের মধ্যে আমি অনেক শান্তি অনুভব করি৷ " তুই জানিস কুরআনে আল্লাহ তায়ালা কি বলেছেন? -
" আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জীবন হবে সংকীর্ণ। " ( সূরা ত্বাহা ২০:১২৪)
আমি আগে এই কথার গভীরতা বুঝতে পারিনি। কিন্তু এখন বুঝি। আমরা যত নিজের মন মতো স্বাধীনতা খুঁজি, ততই যেন এই পৃথিবীর জালে বন্দী হয়ে যাই। কিন্তু যখন আমরা আল্লাহর পথে আসি তখন হৃদয় তার সত্যিকারের প্রশান্তি খুঁজে পাই।
সাবা চুপ করে রইল। তার মনে কিছুটা কৌতুহল জাগল, যেটা আয়েশাকে সে বুঝতে দিল না।
আয়েশা অনেকদিন পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকল। তার একাউন্টে এবার কোনো ফ্যাশন টিপস নয়, বরং সে পোস্ট করল -
-" যখন কোনো কারণে তোমাদের হৃদয় ভারী হয়ে উঠবে, তখন বুঝে নিও তুমি মহান রাব্বুল আলামীনের থেকে দূরে সরে গেছো। আর নামাজ হচ্ছে সেই দরজা, যা তোমাকে আবার তাঁর কাছে ফিরিয়ে আনবে৷ তোমরা ফিরে এসো নূরের পথে। জীবনের আসল প্রশান্তি তো এখানেই। "
পোস্টটা আপলোড করার সাথে সাথে লাইক, কমেন্টস আসতে লাগল। আয়েশার পুরনো ফলোয়ারসরা রীতিমতো অবাক। কেউ কেউ কমেন্ট করলো, "আপনি ঠিক বলেছেন আপু। " আবার কেউ কেউ বলল, " এই পোস্টের মাধ্যমে আজ আমার চোখ খুলে দিয়েছে। "
আয়েশা ভাবল দাওয়াত কেবল বক্তৃতা নয় বরং হৃদয় থেকে হৃদয়ে ছোঁয়া দেওয়া। আল্লাহ নিজেই তার পথের দিশা দিচ্ছেন -
"তুমি তোমার প্রভুর পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে। " (সূরা আন-নাহল ১৬:১২৫)
এই আয়াতটি এখন আয়েশার জীবনের মূলনীতি হয়ে উঠেছে।
রীমার মৃত্যুর পর থেকে আয়েশার তার বান্ধবীর জন্য প্রায়ই দোয়া করত -
"আল্লাহ আমার বন্ধুর সকল গুনাহ তুমি মাফ করো। এবার আয়েশা আরো কিছু করার সিদ্ধান্ত নিল।
আয়েশা রীমার নামে একটি ছোট দান ও শিক্ষা প্রকল্প শুরু করল। নাম দিল “নূরের ছায়া”। যেখানে প্রতি শুক্রবার কয়েকজন সমমনা মেয়ে একত্র হয়ে কুরআন তিলাওয়াত করে, জীবনের সকল সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে আর একে অপরকে ভালো পথে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেয়।
একদিন আয়েশা বলল, " আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে ভুল পথে চলে যাই। কিন্তু যখন কুরআনের আলো আমাদের স্পর্শ করে তখন আমরা সঠিক ভুলের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারি। রীমার স্মৃতি এখন আমাদের জন্য নূরের ছায়া হয়ে থাকবে।"
সবাই কেঁদে ফেলল। রীমার নাম উচ্চারিত হলো একটি ভালো কাজের সাথে। এটাই আয়েশার কাছে ছিল তার বন্ধুর জন্য সেরা উপহার।
আয়েশা রাতে সিজদায় মাথা রাখল। চোখে মুখে তার কৃতজ্ঞতার হাসি।
-" হে আল্লাহ! " তুমি আমাকে সঠিক পথ দেখিয়েছো, তুমি আমাকে দিয়ে তোমার পথের দাওয়াত শুরু করিয়েছো। আমি চাই এই আলো কখনো নিভে না যাক। "
#চলবে_ইনশাআল্লাহ
( ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)