ফন্ট সাইজ:
থিম:
নূরের পথে ফিরে আসো (১ম খন্ড)

১৩তম পর্ব

লেখক: নূরায়া মেহনাজ

#নূরের_পথে_ফিরে_আসা

#নূরায়া_মেহনাজ

#পর্ব_১৩

যে শহরে একদিন আয়েশা হারিয়ে গিয়েছিল দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহে, সেই শহরেই আজ অন্যরকম এক আলোর বন্যা ছড়িয়ে পড়েছে। যেটা কিনা নূরের আলো যা বয়ে আসছে আয়েশার হৃদয় থেকে আর সেখান থেকেই অজস্র মানুষের মন ছুঁয়ে যাচ্ছে।

"নূরের ছায়া" প্রতিষ্ঠানটি এখন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের ছোট এই প্রতিষ্ঠানটি এখন বিশাল নেটওয়ার্ক হয়ে উঠেছে। প্রতিটি শহর, প্রতিটি জায়গায় ছোট ছোট "হিদায়াহ সার্কেল" গড়ে উঠেছে। সেখানে তরুণ তরুণীরা মিলে কুরআন তিলাওয়াত করে। জীবনের বাস্তব সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করে। আর একে অপরকে আল্লাহর পথে থাকতে সাহায্য করে।

এক মেয়ে তাদের পেজের কমেন্ট সেকশনে লিখেছে -

"আমি একসময় হতাশায় ডুবে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম।কিন্তু আয়েশা আপুর যে সকল ইসলামিক মোটিভেশনাল ভিডিও আছে, সেগুলো দেখে আমি বুঝতে পেরেছি মহান আল্লাহ তায়ালা আমাকে এখনো ভালোবাসেন। তার পাপী বান্দাদের তিনি ক্ষমা করে দেন। আগে আমি নামাজ পড়তাম না, কুরআন পড়তে পারতাম না। কিন্তু এখন আমি নিয়মিত নামাজ পড়ি, কুরআন শিখি। আর অন্যদেরও বোঝায়, যে তোমরা কোনো কারণে হতাশ হয়ো না। নামাজে দাঁড়াও, আল্লাহ কে স্মরণ করো ইনশাআল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে।"

আয়েশা কমেন্ট পড়ে খুব খুশি হলো। এবং আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করল।

একদিন আয়েশা তার সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রিত হলো। যে ক্যাম্পাসে একসময় সে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিত, বাইরে বাইরে ঘুরতে যেত। আজ সেখানেই তাকে বক্তা হিসেবে ডাকা হয়েছে।

আয়েশা যখন কলেজের গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছিল তখন সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। অনেকে ফিসফিস করে বলল,

"আরে আয়েশার এতটা পরিবর্তন ভাবা যায়!"

আরো অনেকে অনেক কিছু বলছিল। আয়েশা কোন দিকে না তাকিয়ে স্টেজে উঠে বলতে শুরু করলো-

"আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন সবাই?"

সকলে একসাথে বলে উঠল, "আলহামদুলিল্লাহ ভালো।" আপনি কেমন আছেন?"

আয়েশা হাসি মুখে বলল,

"আলহামদুলিল্লাহ সকলের দোয়ায়, আল্লাহর রহমতে আমি ভালো আছি। আমি একসময় নিজেকে ফ্যাশন কুইন ভাবতাম। এমনকি আপনারা তো সকলেই আমাকে চিনেন আমি আগে কেমন ছিলাম। আপনারা সবকিছুই দেখেছেন। একসময় আমিও আপনাদের মতো ভাবতাম আধুনিকতা মানে হলো, আলো ঝলমলে জীবন, পশ্চিমা সংস্কৃতিকে অনুসরণ করা, আর শহরের প্রচলিত স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়া।

আমার তখন খুব অহংকার ছিল। আমি ভাবতাম যারা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলেন তারা হয়তো পিছিয়ে আছেন, ব্যাকডেটেড টাইপের কিছু। তারা হয়তো জীবনটাকে উপভোগ করতে জানেন না। আমি মনে করতাম নিজেকে মুক্ত করে যা খুশি তাই করাটা আধুনিকতা।

কিন্তু আজ আমি আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলছি, আমি ভুল ছিলাম। আমি ভয়ানকভাবে ভুল ছিলাম!

আমার জীবনে যখন একটি দূর্ঘটনা ঘটল। যখন আমার কাছের, আমার খুব প্রিয় একজন বন্ধু আমার কাছ থেকে চিরতরে না ফেরার দেশে চলে গেল, তখন আমার হৃদয়ে গভীর শূন্যতা নেমে এসেছিল। আর অবশ্যই এটা আমার রবের নেওয়া একটি পরীক্ষা ছিল। যার মাধ্যমে হয়তো আমি একটি শিক্ষা পেয়েছি। তবে! তবে...আমার সাথে এই ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আমাদের এই তথাকথিত আধুনিকতা আমাকে কিন্তু শান্তি দিতে পারেনি। কিন্তু হ্যাঁ, শান্তি আমি পেয়েছিলাম একটা জায়গায়..! জানেন সেটা কোথায়? একমাত্র নামাজে দাঁড়িয়ে আমি সেই শান্তিটুকু খুঁজে পেয়েছিলাম। মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে আমি আমার সকল প্রকার মনের কষ্টের কথা উগরে দিয়েছিলাম। বিশ্বাস করুন আমি যে শান্তি তখন অনুভব করেছিলাম সেটা হয়তো কখনো আমি অনুভব করতে পারি নাই।

এটা আমাদের জানা উচিত যে, আমরা কিসের জন্য সৃষ্টি হয়েছি? আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য কী? আমরা কি দুনিয়ায় শুধু ভোগ-বিলাসিতার জন্য এসেছি? নাকি স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য? এই প্রশ্নের উত্তরগুলো যে খুঁজে পাবে। সে তার জীবনের সার্থকতা পেয়ে যাবে।

শত উপহাস, শত বাঁধা, শত কটুকথা উপেক্ষা করে নিজের ভুল স্বীকার করে ইসলামের পথে আসতে পারা, এটাই হচ্ছে আল্লাহর প্রতি তার বান্দাদের ভালোবাসা। আর এটাই দুনিয়াবি ভাবনা-চিন্তা থেকে মুক্তি পাওয়ার একটি রাস্তা।

এই পথে কোনো পরাধীনতা নেই, আছে শুধু প্রশান্তি। এই পথে কোনো ক্লান্তি নেই, আছে শুধু এক গভীরতম আনন্দ।

আপনারা ভয় পাবেন না। স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ান, নিজেকে চিনুন আর আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সেই পবিত্র সাহসটুকু হৃদয়ে ধারণ করুন। কারণ, যিনি আপনাকে, আমাকে সৃষ্টি করেছেন তিনি ছাড়া আর কেউ আপনাকে সত্যিকারের ভালোবাসতে পারবে না, শান্তি দিতে পারবে না।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলের আত্মাকে তাঁর নূরে আলোকিত করুন আমিন।"

পুরো হলরুম জুড়ে সকলে নীরব হয়ে গেছে। অনেকে তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে। আবার অনেকে আয়েশাকে নিয়ে হিংসা করতে ব্যস্ত।

আয়েশা বক্তব্য শেষে প্রধান শিক্ষকের রুমে গিয়ে বসলো। কিছু সময় পর সেখানে সকল শিক্ষকবৃন্দ আয়েশার মাথায় হাত দিয়ে দু"আ করলো, সে যেনো বহুদূর এগিয়ে যায় এবং সকল মানুষকে ভুল পথ থেকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে পারে।

রাতে আয়েশা ও তার বাবা মা খেতে বসেছিল। তখন আয়েশার বাবা পাশ থেকে আয়েশার মাথায় এক হাত রেখে বললেন,

" মামুনি আমি আর তোমার আম্মু খুব করে চেয়েছিলাম তুমি তোমার ভুলগুলো শুধরে নাও৷ তুমি যখন তোমার আম্মুর সাথে বাজে ব্যবহার করতে, উৎশৃংখল ভাবে চলাফেরা করতে, অনেক রাত করে পার্টি শেষ করে বাসায় ফিরতে আমি খুব কষ্ট পেতাম, তারপরও তোমাকে আমি কখনো কিছু বলিনি। কেন জানো? কারণ আমি আমার মামনিকে ভালোবাসি। তাকে বকা দিতে চাইনি অবশ্য এটা আমার ভুল ছিল। আল্লাহ মাফ করুন৷ কিন্তু মামুণি আমি তোমাকে নিয়ে এখন গর্ববোধ করি। যেদিন তোমার আম্মুর কাছে শুনলাম তুমি নামাজ পড়েছ তাও নিজ উদ্বেগে সেদিন আল্লাহর কাছে শুধু একটাই দোয়া করেছিলাম, "আমার মেয়েটা যেন শুধু একা না, অন্যদেরও হেদায়েতের পথে ডাকে।"

আয়েশা তার বাবার হাত চেপে ধরে বলল, "তুমি চিন্তা করো না আব্বু। আমি আর কখনো এমন কাজ করবো না যাতে তুমি কষ্ট পাও। আমার এতদিনের কর্মের জন্য আমাকে মাফ করে দিও আব্বু, নাহলে আমার রব আমাকে ক্ষমা করবেন না। কারণ বাবা মায়ের সন্তুষ্টিতে মহান আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্টি।"

মেয়ের কথা শুনে আশরাফ সাহেবের চোখে পানি চলে আসল। তিনি মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললেন,

"ধুর বোকা মেয়ে। বাবা মা কি কখনো তার সন্তানদের ওপর রাগ করে থাকতে পারে। আমাদের দোয়া সবসময় তোর সাথে আছে।"

আমেনা বেগম বসে বসে বাবা মেয়ের এমন আবেগপ্রবণ দৃশ্য দেখে চোখে পানি নিয়েও মুখে হাসলেন। এদিকে আয়েশা তৃপ্তি নিয়ে তার বাবার বুকে চোখ বুজে আছে৷ এবং পূর্বের করা সকল কাজের জন্য আবারও আল্লাহর কাছে সে তওবা করল।

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আয়েশা মায়ের রুমে আসল। মায়ের কোলে মাথা রেখে বলল,

"মা তুমি আমার প্রথম শিক্ষক। তুমি আমার দোয়ার দরজা।"

আমেনা বেগম মৃদু হেসে বললেন, "আল্লাহ তায়ালা বলেছেন -

" আমি তোমার দোয়ার জবাব দেয়, যখন তুমি আমাকে ডাকো।" ( সূরা আল-বাকারা ২:১৮৬)

দেখলি না মা, তিনি কেমন করে জবাব দিয়েছেন?

মায়ের কথায় আয়েশা শুধু হেসে তার মাথা নাড়াল। তারপর পরম আরামে চলে গেল ঘুমের রাজ্যে। আয়েশা বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।

★

পরদিন আয়েশা "নূরের ছায়া" টিমকে নিয়ে একটা মিটিং করল। আয়েশা বলল,

"এখন আমরা শুধু ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার সাথে সমাজ উন্নয়নের কাজও করব ইনশাআল্লাহ।"

মিটিং এ নতুন পরিকল্পনা করা হলো - দরিদ্র পরিবারের সকলের বৃত্তি প্রদান, ইসলামী কাউন্সেলিং সেন্টার, অনলাইন মানসিক সহায়তা প্রোগ্রাম এবং কুরআন মুখস্থ প্রতিযোগিতা এসকল কিছুর ব্যবস্থাপনা করতে হবে।

আয়েশা বলল, আমরা যদি ইসলামের পথে সকলকে আনতে পারি, তাহলেই এই দুনিয়া বদলে যাবে।"

সবাই একসাথে বলে উঠল, "ইনশাআল্লাহ।"

একদিন একটা মেয়ে আয়েশার সাথে ফোনে কথা বলে দেখা করতে চেয়েছিল। আজ আয়েশা সেই ছোট মেয়ে সাবিহার সঙ্গে দেখা করল। মেয়েটি কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

" আপু, আমি আগে খুব খারাপ পথে ছিলাম। আমি বুঝতে পারছিলাম না আমি কি করব। আমি অনেক কনফিউশান ছিলাম আমার কোনটা করা উচিত আর কোনটা করা উচিত নয়। তো আমি একদিন তোমার বলা কথাগুলো শুনলাম এবং বুঝলাম যে আল্লাহর পথে, ইসলামের পথে ফিরে যাওয়ার পথ সবসময় বান্দাদের জন্য খোলা থাকে। "

আয়েশা সাবিহার মাথায় হাত রাখল,

"সাবিহা আল্লাহর নিকট যাওয়ার রাস্তা কখনো বন্ধ হয় না। তুমি এক পা বাড়াও, মহান আল্লাহ তায়ালা তোমার দিকে দশ পা এগিয়ে আসবেন।"

সাবিহা চোখে পানি ও মুখে হাসি নিয়ে আয়েশাকে জড়িয়ে ধরল। আয়েশাও খুশি মনে আগলে নিল মেয়েটাকে৷

সেদিন আয়েশা একটি নদীর পারে এসে দাঁড়াল। তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে৷ আয়েশা সেদিকে তাকিয়ে বলল,

" হে আল্লাহ! আমি তোমাকে ভালোবাসি। আর আমি জানি তুমিও আমাকে ভালোবাস। কারণ, তুমি আমায় তোমার পথে ফিরিয়ে এনেছো।"

আয়েশার চোখ বেয়ে অশ্রু নামল। কিন্তু সেটা দুঃখের নয়, এটা ছিল তার সুখের কান্না৷ আয়েশা মনে মনে বলল,

"নিশ্চয়ই যারা বলে “আমাদের রব আল্লাহ”এবং তারা ইসলামের ওপর দৃঢ় থাকে। তখন ফেরেশতারা তাদের বলে - ভয় করো না, দুঃখ করো না বরং তোমাদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো।"

( সূরা হা-মিম আস-সাজদা ৪১:৩০)

"হে আল্লাহ!" আমার এই জীবন, আমার প্রতিটা শ্বাস সব তোমার জন্য।"

#চলবে_ইনশাআল্লাহ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন