ফন্ট সাইজ:
থিম:
নূরের পথে ফিরে আসো (১ম খন্ড)

১৪তম পর্ব

লেখক: নূরায়া মেহনাজ

#নূরের_পথে_ফিরে_আসা

#নূরায়া_মেহনাজ

#পর্ব_১৪

শহরের আলো ম্লান, কিন্তু আয়েশার হৃদয়ে নূর এখন জ্বলছে আরও উজ্জ্বলভাবে। সে শুধু নিজের জীবন নয়, অসংখ্য মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে।

❝সকল আয়াতের আলোয়,

তওবার অশ্রুতে,

একটি দোয়ার শক্তিতে❞

রাতের নিস্তব্ধতা এক ধরণের প্রশান্তি এনে দেয় আয়েশার মনে। আগে এই সময় সে সামাজিক কোলাহলে ব্যস্ত থাকত,আর আজ এসময় সে বসে থাকে কুরআনের পাশে। আয়েশা মনে মনে পড়ল -

—“ আস্তাগফিরুল্লাহ রাব্বি মিন কুল্লি যাম্বিন ওয়া আতুবু ইলাইহ।”

(অর্থ : আমি আমার রবের কাছে সকল গুনাহের জন্য ক্ষমা চাই এবং তাঁরই দিকে ফিরে আসি।)

আয়েশার হৃদয়ে এখন এক নতুন বোধ জাগ্রত হয়েছে। সে বুঝতে পেরেছে, তওবা মানে শুধু মুখে উচ্চারণ করা কিছু শব্দ নয় যেখানে বলা হয়, “আল্লাহ মাফ করো”। বরং তওবা হলো হৃদয়ের এক গভীর বিপ্লব, যেখানে মানুষ নিজের ভুলের স্বীকারোক্তি দেয় এবং সত্যিকার অর্থে আল্লাহর পথে ফিরে আসে।

একটি ক্লাসে বসে আয়েশা বলল,

—“ তওবা মানে শুধু অনুশোচনার অশ্রু নয়, বরং নিজের অতীতের পাপের শূন্যতায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞার সাথে নেক আমলের প্রদীপ জ্বালিয়ে দেওয়া।”

আয়েশা কুরআনের একটি আশ্বাসবাণী আয়াত পড়ে শোনাল -

❝ হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছো তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তায়ালা সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন।❞

( সূরা আয-যুমার ৩৯:৫৩)

শ্রোতারা নিঃশব্দে আয়েশার কথাগুলো শুনছিল। কেউ কেউ বলল “আস্তাগফিরুল্লাহ।”

★

আয়েশা এক নতুন উদ্যেগ নিয়ে কাজ করা শুরু করেছে। ❝তওবার সৌন্দর্য❞ এখানে মানুষ গোপনভাবে নিজেদের জীবনের তওবার গল্প পাঠাতে পারবে। যা আয়েশা তার পরিচয় গোপন রেখে সেগুলো প্রচার করবে। এই উদ্যেগের মাধ্যমে অনেকেই নিজেদের অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার প্রেরণা পায়।

প্রতিদিন শত শত মেসেজ আসে – কেই মাদকের অন্ধকার জগত থেকে ফিরে এসেছে, কেউ বা নামাজের শীতল ছায়ায় আশ্রয় পেয়েছে, কেউ আবার হারাম সম্পর্ক চিরতরে ছেড়ে দিয়েছে।

একদিন আয়েশা সকলের লেখাগুলো পড়ে দেখছিল। হঠাৎ একটি লেখায় তার বিশেষ নজর পড়ল। সেখানে লেখা ছিল –

“ আমি একসময় হারাম সম্পর্কে লিপ্ত ছিলাম। যেখানে পাপের কোনো শেষ ছিল না। কিন্তু একদিন আয়েশা নামের এক আপুর ক্লাসে আমি জয়েন হয়েছিলাম। সেখানে তিনি বলেছিলেন,

— আল্লাহ তওবাকারীকে এমন ভালোবাসেন, যেমন এক মা তার হারানো সন্তান ফিরে পেলে ভালোবাসে।” জানিনা কথাটায় কি এমন ছিল যা আমাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আমি সেদিন অশ্রুসিক্ত হয়ে কেঁদেছিলাম। আজ আমি পর্দা করি, নামাজ পড়ি। দোয়া করবেন আমার জন্য, আমি যে এই পথে স্থীর থাকতে পারি।”

আয়েশা মেসেজটি পড়ে বলল, “হে আল্লাহ, তোমার রহমত কত বিশাল!

★

স্থান : ঢাকা সেমিনার।

বিশাল হলরুমটি ছিল পিনপতন নীরবতায় ছায়া স্টেজে দাঁড়িয়ে আছে আয়েশা। তার চোখে নেই কোনো অহংকার, আছে শুধু নূরের স্নিগ্ধতা আর কন্ঠে শান্ত দৃঢ় আত্মবিশ্বাস।

আয়েশা ধীরে ধীরে মাইক্রোফোনের কাছে এল।

“ আসসালামু আলাইকুম, প্রিয় ভাই ও বোনেরা। কেমন আছেন আপনারা সবাই?”

সবাই একসাথে বলে উঠল,

-” আলহামদুলিল্লাহ”। আপনি কেমন আছেন?”

-” আল্লাহর রহমতে আলহামদুলিল্লাহ।”

“-আজ আমি আপনাদের সামনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা উপস্থাপন করতে চাই। আশা করছি আপনারা আমার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনবেন। আজ আমি আপনাদের সামনে যেভাবে দাঁড়িয়ে আছি, আগে কিন্তু আমি এরকম ছিলাম না। আমি এক পাপী বান্দা ছিলাম যাকে মহান আল্লাহ তায়ালা তার দয়ায় আমাকে আলোর পথে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছেন। আমার জীবন আপনাদের অনেকের মতোই ছিল - ভুলে, পাপে, পূর্ণ আর অস্থিরতায় ভরা।”

আয়েশা এক মুহুর্ত চুপ থেকে চোখে একরকম আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল,

-” ভাই ও বোনেরা! আমরা মানুষ আমাদের ভুল হবেই। কিন্তু মনে রাখবেন, পাপ আপনার শেষ গন্তব্য না বরং তওবা আপনার নতুন জীবনের শুরু।”

হল জুড়ে তৈরি হলো নীরব গুঞ্জন। প্রত্যেকটা কমবেশি মানুষের মনে আয়েশার কথাগুলো এক আঘাত হানল।

আয়েশা তখন শয়তানের সূক্ষ্ম প্রতারণার দিকটি তুলে ধরল,

- “ যখন আমরা কোনো পাপ করি, তখন শয়তান আমাদের কানে ফিসফিস করে বলে, “ তুমি অনেক পাপী। অনেক খারাপ কাজ তুমি করেছো। তোমার আর কোনো ক্ষমা নেই। তুমি আল্লাহর কাছ ফেরার অযোগ্য!”

আয়েশা একটি আয়াত পড়ে শোনাল -

❝“নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন, এবং যারা পবিত্র থাকতে চেষ্টা করে তাদের ভালোবাসেন।”❞ (সূরা আল-বাকারা ২:২২২)

“শয়তান চায় আমরা যেন হতাশ হয়ে যাই, আমরা যেন আল্লাহর রহমত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেই।”

আয়েশা এবার তার কন্ঠস্বরকে আরো করুণা ও আশ্বাসের সুর তুলে বলতে লাগলেন, যেন সে সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে বার্তা দিচ্ছে -

-“কিন্তু শয়তানের সেই ফিসফিসানির বিপরীতে আমাদের স্রষ্টা, আমাদের পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালা কি বলেন জানেন?” আল্লাহ বলেন,

-“আমার দরজা তোমাদের জন্য সবসময় খোলা৷”

— “এই একটি কথায় যথেষ্ট! আমাদের জীবনে যত অন্ধকার-ই থাকুক না কেন, আমার ভুল যতই বড় হোক না কেন,,, আল্লাহর তরফ থেকে তার দরজা কখনোই বন্ধ হয় না৷ তিনি তওবাকারীকে তাঁর ভালোবাসার চাদরে জড়িয়ে নিতে প্রস্তুত। শুধু আমাদের নিজেদেরকে সংশোধন করতে হবে৷”

—“ আসুন, আমরা আজ থেকেই আমাদের জীবনের নতুন শুরুটা করি। আমরা ভুল পথে গিয়ে যতই খারাপ কাজ করে থাকি না কেন তওবা করার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা আমাদের ক্ষমা করবেন। তওবা হলো সেই নদী, যা আমাদের সব পাপ ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে দিতে পারে। আপনারা শুধু সাহস করে বলুন, “ — হে আল্লাহ, আমি ফিরে এসেছি!”

মুহুর্তেই হলরুমের সেই নীরবতা ভেঙে গেল। শত শত মানুষের চোখ দিয়ে নেমে এল অনুশোচনার অশ্রু। হঠাৎ এক তরুণী উঠে এসে বলল,

“ আপু, আমি আজ থেকে তওবা করে নতুন জীবন শুরু করব ইনশাআল্লাহ।”

আয়েশা মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,

“আল্লাহ তোমার সঙ্গে থাকুন বোন।”

সেখানে আয়েশা শুধুমাত্র একজন বক্তা ছিল না, বরং ছিল একজন পথপ্রদর্শক। যে মানুষকে ধ্বংসের পথ থেকে সরিয়ে এনেছে এক চিরন্তন শান্তির পথে।

—---------------------------------

রাতের আকাশে আজ পূর্ণ চাঁদ উঠেছে। আয়েশা জানালার পাশে বসে দোয়া পড়ছে। তার চোখে পানি কিন্তু মুখে হাসি নিয়ে বলল,

-”হে আল্লাহ, আমি জানি তুমি আমাকে প্রতিটা মুহুর্তে দেখছ। আমার প্রতিটি তওবা তুমি গ্রহণ করো। তোমার ভালোবাসা ছাড়া পৃথিবীর কিছুই সুন্দর না।”

আয়েশার সামনেই ছিল কুরআন শরিফ। সে কুরআন খুলে একটি আয়াত পড়ল -

❝​“যে ব্যক্তি তাওবা করে, ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, আল্লাহ তার কুকর্মগুলোকে ভালো কাজে রূপান্তরিত করবেন।❞ (সূরা আল-ফুরকান ২৫:৭০)

এই আয়াতের প্রতিটি শব্দ আয়েশার হৃদয় শীতল করে তুলল। সে অনুভব করল, তার অতীতের অন্ধকার এখন আলোর একটি গল্পে পরিণত হয়েছে।

মানুষ এখন ❝নূরের ছায়া❞ প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হচ্ছে সারাদেশ থেকে। আয়েশা বলল,

“আমরা সবাই তাওবাকারী, আর আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ সেই, যে তার ভুল স্বীকার করে ফিরে আসে।”

তখনি এক বৃদ্ধা এসে বললেন, “মা, তোর মতো মেয়েরা থাকলে সমাজ আলোকিত হবে। তুই আল্লাহর নূরের সৈনিক।”

আয়েশা মাথা নিচু করে বলল, “না দাদি, আমি কেবল একজন তওবাকারী। যে এখনো আল্লাহর রহমত খুঁজে বেড়ায়।”

সকালে ফজরের নামাজ শেষে আয়েশা চুপচাপ জানালার পাশে বসে ছিল। আকাশে হালকা আলোর দেখা মিলেছে। চারপাশে ভোরের পাখির কিচিরমিচির ডাক ভেসে আসছে । আয়েশা ৎরে ঢুকে কুরআন খুলে পড়ল—

​“যারা ঈমান আনে ও আল্লাহর স্মরণে শান্তি পায়—জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয়ের প্রশান্তি।”(সূরা আর-রা’দ ১৩:২৮)

​আয়েশার ধীরে ধীরে বলল,

“হে আমার রব, এখন বুঝেছি—শান্তি কেবল তোমার কাছেই।”

তাওবা শুধু পাপ মোচনের উপায় নয়, বরং এটি মানুষকে নতুন জীবন দেয়। যেমন শুকনো মাটিতে বৃষ্টির ফোঁটায় তাকে ভিজিয়ে দেয় , তেমন তাওবা মানুষের হৃদয়ে নতুন নূর সৃষ্টি করে।

আয়েশা সবাই এখন সাহস দেয় অনুপ্রেরণা দেয় —যেখানে সে মানুষকে শেখাবে, লজ্জা করো না তোমার অতীতকে নিয়ে, বরং গর্ব করো তোমার তাওবায়।

​“নিশ্চয়ই, আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।”

(সূরা আন-নিসা ৪:৬৪)

আয়েশা মাথা নিচু করে সিজদায় পড়ে বলল— “হে আল্লাহ, যতবার আমি ভুল করব, ততবার তোমার দোরগোড়ায় ফিরে আসব, কারণ আমি জানি—তুমি কখনো তোমার বান্দাকে ফিরিয়ে দাও না।”

​সেই সিজদার অশ্রুতে আকাশের তারাগুলোও যেন ঝলমল করে উঠল—তাওবার আলোয়, আল্লাহর ভালোবাসায়, এক নতুন জীবনের সূচনায়।

#চলবে_ইনশাআল্লাহ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন